জীবনগাঁথা

কাজী লাবণ্য | ৭ নভেম্বর ২০১৬ ৮:২৬ অপরাহ্ন

Afsanমুখে শত বলিরেখার জ্যামিতিক নকশা। ছানি পড়া চোখে শতায়ু ফ্রেমের গোল মলিন কাঁচের চশমা। দাঁতবিহীন গাল দুটি ভেতরদিকে তোবড়ানো। মাথায় দু/চারটি শনের মত চুল ফুরফুরে বাতাসে উড়ছে। বাড়ির সামনে অজস্র ঘটনার সাক্ষী প্রাচীন অশ্বত্থ বা পাকুড় গাছটির গোড়ায় বসে বৃদ্ধা পরীবিবি আকুল হয়ে কাঁদছে। চোখের পানি শুকিয়ে গ্যাছে, গলা দিয়ে আর কোন শব্দ বেরুচ্ছেনা তবু সে গুনগুন করে কেঁদেই চলেছে। আজ তিনদিন ধরেই সে কাঁদছে। বুড়ির একমাত্র সন্তান পাঁচ সন্তানের জননী এলিজা বা এলিজাবেথ তিনদিন আগে মারা গেছে, রেখে গেছে ছেলে বউ, মেয়ে জামাই, নাতী নাতনী আর বৃদ্ধা মা পরীবিবিকে। অশীতিপর বৃদ্ধা ধুসর শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে দূরে বহুদূরে… শূন্য দৃষ্টি ঘুরেফিরে স্থির হয় সেই সেইখানে। সে যেন এজনমের কথা নয়, অন্য এক জনমের কথা। সে যেন কত শত যুগ আগের কথা- এত কথা, এত ব্যথা, এত ছবি কেন আকুলিবিকুলি করছে,সব যেন আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে বায়োস্কোপের মত।

**
ওইতো খাঁ বাড়ির উঁচু বারান্দায় মোটা থামের পাশে আম্মা (বাড়ির কত্রী) দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বলছেন-
-বাহ্‌ ভারী মিষ্টি বউ হয়েছেতো, তা তোমার নাম কি? বসো মা বসো। ওমা! মেয়ে দেখি কথা বলে না! কিরে মনু বউ যে কথাই বলে না, আরে তোর মুখেও দেখি কথা নাই।
বিশাল এক বপু আর স্বল্প বুদ্ধির মানুষ মনোয়ার কোন কথা না বলে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি নিয়ে মাথা আরো বুকের সাথে লাগিয়ে দেয়। নতুন বউকে কাছে বসিয়ে কিছুক্ষণ কথা টথা বলেন আম্মা, বউ উপলক্ষ্যে খাবারের আয়োজন করেছেন, খেয়ে যেতে বলেন, তারপর এক জোড়া স্বর্ণের চুড়ি দিয়ে আশির্বাদ করেন।
নয়নখালি গ্রামের প্রাচীন বৃহৎ এবং ধনী বাড়ীটি হচ্ছে খাঁ বাড়ী। এই বাড়ীর বিভিন্ন ধরনের কাজের মানুষদের একজন হচ্ছে এই মনোয়ার বা মনু। সে ছোটবেলা থেকেই টুকটাক ফাই ফরমায়েস খাটত তারপর ধীরে ধীরে বড় হলে এখন সে দুধেল গরুগুলির দেখাশোনা করে। এরা বংশানুক্রমিকভাবেই এই বাড়ীতে কাজ করে আসছে। মনোয়ারের মাও এ বাড়িতে রান্নার কাজ করত, তখন ছোট্ট মনোয়ার যাকে সবাই আদর করে মনু বলে ডাকত – বাড়ীর আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করত। এ বাড়ীতেই বেড়ে ওঠার ফলে বাড়ীর সকলেই বিশেষ করে আম্মা মনুকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখেন। বিয়ের জন্যই সে গত কয়েকদিন ধরে আম্মাকে বলে ছুটিতে ছিল, আজ সে আম্মাকে বউ দেখাতে নিয়ে এসেছে।
বিয়েতে দুতিনটে শাড়ী পেয়েছে পরীবিবি। কিছু কাঁচের চুড়ি, কানের দুল, চুলের রঙিন ফিতা, একজোড়া পায়ের মল- মলজোড়া দিয়েছে মনোয়ার আর বলেছে এগুলো কখনই যেন পরী না খোলে। আর নাকে একটি নাকছাবি দিয়েছে পরীর বাবা। শাড়ী গুলির মধ্যে একখানা আছে টুকটুকে লাল, সেটিই সবথেকে প্রিয় পরীর কাছে এবং সেই সঙ্গে মনুও একমত হ্যাঁ সবচাইতে এই শাড়ীখানাই সুন্দর।
প্রতিদিন সকালে গোসল সেরে লাল শাড়ি পরে চুল টুল আঁচড়িয়ে পায়ে মল পরে ছোট্ট ঘরটিতে সে যখন হাঁটাহাঁটি করে মনুর চোখ যেন সরে না, মন ভরে না ইচ্ছে করে কাজে কামাই দিয়ে সারাদিন বউয়ের হাঁটা চলা, নড়াচড়া দেখে আর রূপার মলের ঝুনঝুন বাজনা শোনে।
পরী লক্ষ্মীমন্ত গুছানো মেয়ে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে মনোয়ার সহ তার এক ঘরের ক্ষুদ্র সংসারকে আপণ করে নেয়। সারাদিন খাঁ বাড়ির কাজ কাম সেরে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সাজানো গুছানো ঘর, পরিপাটি বউ দেখে মনুর মনে খুশী আর ধরেনা। খেতে বসে দেখে কাঁসার থালা বাসন, ঘটি বাটি, গ্লাস চামুচ সোনার মত ঝকঝক করছে। সেদিন রাতে পরী ডিম রান্না করেছে, ঘরের পেছনে ঝোপালো গাছ থেকে সজনে পাতা তুলে ভাজি করেছে আবার বুদ্ধি করে আমরুল পাতা তুলে রসুন বাগার দিয়ে খাটা করেছে- খেতে দারুণ সুস্বাদু হয়েছে। দুজনে খেতে বসে টুকটুক করে সারাদিনের গল্প করে,মনু তাকিয়ে দেখে একটাই মাত্র ডিম সেটা পরী মনুর পাতেই দিয়েছে,সে ভেঙ্গে আধখানা ডিম পরির পাতে তুলে দিলে পরী সংকোচে বলে উঠে-
-তোমরা সারাদিন খাটাখাটনি করেন গোটা ডিমটা তোমরাই খাও! কন্ঠ যেন ডিমের কুসুমের মতই মাখা মাখা।
-তোক ছাড়ি মুই একলাই ডিম খাইম, সেটা কি হয় পাগলি, খা তুই আধ খানা খা। পরীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে! এত ভাগ্য তার! মানুষটা এত ভালো!
বিয়ের এতদিনেও একদিনও সে গালাগালি ত দুরের কথা একটা ধমকও দেয় নাই। তাই সে মন প্রান লাগিয়ে সংসার করে, আপ্রাণ চেষ্টা করে স্বামীকে তুষ্ট রাখতে।
গড়িয়ে গড়িয়ে মাস যায় বছর যায়, পরীর সংসারও গায়ে গতরে কিছুটা হৃষ্টপুষ্ট হয় অর্থাৎ আর একটা ঘর তোলে সে সঙ্গে মুরগির খুপড়ি, ছাগল রাখার ঘর, উঠানের কোনে একটু জায়গা ঘিরে রান্নার ব্যবস্থা। ঘরের কোনে লাউগাছ ডগা- পাতা ছড়িয়ে লকলক করে উঠে যায় চালে। বিয়ের সময় বউয়ের মুখ দেখে এ, ও কিছু টাকা দিয়েছিল তা দিয়ে সে মনুকে দিয়ে একটি ছাগল ও এক জোড়া মুরগি আনিয়ে নিয়েছে। সারাদিন সে এক দন্ড বসে থাকে না, মুরগি ছাগল গাছপালার যত্ন করে, কদিন পর পরই কাদা- পানি গুলে ঘরের দেয়াল, মেঝে, উঠান, চুলা লেপে নেয় আবার সেই লেপার মাঝে আঙুল দিয়ে চমৎকার নকশা আঁকে শুকানোর পর দেখতে ভারি সুন্দর লাগে। মনুকে দিয়ে খাঁ বাড়ি থেকে পাট আনিয়ে সে শিকা তৈরি করে প্রয়োজনমত ঘরের বিভিন্ন জায়গায় টাঙ্গিয়েছে, সেগুলিতে আবার নানা রঙের কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঝালর দিয়েছে।
এভাবে বছরের পিছে বছর চলে যায়, কিন্তু যা হবার তাতো হয়না। আজকাল পরির মন প্রায়ই খারাপ থাকে। বিয়ের বছরখানেক পর থেকেই শাশুড়ি ননদ, পাড়ার বৌ ঝিরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করত পরী টক খাচ্ছে কিনা, বমি করছে কিনা! তারা পরস্পরের গা টেপাটেপি করত, হাসি ঠাট্টা করত। কিন্তু এখন আর কেউ হাসেনা, ঠাট্টা করেনা, ফিসফাস করে না। স্পষ্ট করেই তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে নানা রকম কঠিন কঠিন কথা বলে। সেদিন চাচী শাশুড়ি সম্পর্কের একজন তাকে ঈশারা করে বলছিল-
-ও মনুর মা! ভালো করি বুজা যায়ছে হামার মনুর বউ আঁটকুড়ী, বানজি, অর আর ছাওয়া পোয়া হবার নয়। চিকিসসা পাতি, তাবিজ কবজ তো কম করলেন না। এ্যালা ওগুলা বাদ দেও, হামার মনুর ফির বিয়ার ব্যবস্থা কর, ছাওয়া পোয়া হউক, হামরা ইলা নাতি পুতির মুখ দেখি। আরো কদ্দিন ঢ্যাং ঢ্যাং করি খালি কোল দেখমেন! তোমরা যদি কন তা মোর গোরোত এ্যানা ভালো চেংড়ির খোঁজ আছে…
অপর পক্ষের তেমন কোন উত্তর না পাওয়ায় চাচী কিছুটা ঝাঁঝের সঙ্গে আবার বলে-
-মনুর মা! এই হ্যাসকারি না করেন। ম্যাগের ফাঁকে ফাঁকে বেলা হইছে ম্যালা, কয় বচ্চর তো হয়া গেল, নাতি পুতি দেকার হাউস আচে না! তোমরা ভাবি চিনতি দেখ, মুই আইতোত এ্যালা আসিম এ্যালা।
তারপর সে খিল ধরা কোমরের পেছনে হাত দিয়ে বহু কষ্টে টান হয়ে দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে বলে
-যাও কোষ্ঠা বাড়ি, এ্যানা শাগপাতা তুলি আনো, আজ বউটা বোলে প্যালকা আন্দিবে। ঘরে তরকাই মরকাই কিচ্চু নাই, আর হইচে একগুলা মুগির বাচ্চার মোতন গেদাগেদি ছইলপইল… সেগলার আক্কসের মোতন ভোক নাগে… সাদা ভাত খাবারে চায়না। মোরে হইচে যত মরন…
এরকম বহু ধরনের বহু কথা শুনতে শুনতে পরীর গা সওয়া হয়ে গেছে, এখন আর কান্না পায়না। প্রথম দিকে এসব কথা শুনলেই সে ঘরে গিয়ে আকুল হয়ে কাঁদত –হে খোদা সবার ছাওয়া পোয়া হয়, মোর পরে যার বিয়া হইছে তারও দুই একটা হইছে মোর ক্যানে হয়না! হে আল্লাহ মোর যে মা হবার মন চায়…
গোড়ার দিকে মনে হত আজ না হোক কাল ঠিকই হবে। কিন্তু আজ কাল করতে করতে তো সাত/আট বছর পার হয়া গেল। ঝার, ফুক দোয়া তাবিজও ত কম হলনা। পরী বাইরে বরাবরই চুপচাপ, কিছুটা শক্ত ধাঁচের কিন্তু গত কিছুদিন ধরে সে ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পরেছে। দুশ্চিন্তায়, দুর্ভাবনায় পরীর বড় অস্থির লাগে। সে কিছুতেই ভেবে পায় না কি করবে! পাড়ার বাতাসে পরীর নাম বাঁজা, আঁটকুড়ী, অক দেখলে কু-সাইত হইবে ইত্যাদি কথা ভেসে বেড়ায়। সব কথাই পরীর কানে আসে, সে কেবল আল্লাহ্‌কে ডাকে। আল্লাহ্‌ কি তার ডাক শুনবে না!
তবে চারিদিকে যে এত কথা, এত ফিসফাস, যন্তর মন্তর, কিন্তু মনুর মুখে কোন কথা নেই। সে নির্বিকার। সে একদিনও এ ব্যাপারে পরীকে কিছু বলেনি, যদিও পরী মনে মনে কাঁটা হয়ে থাকে যদি সে কিছু বলে! আজকাল দিনশেষে মনুর ফেরার সময় ঘনিয়ে এলেই পরীর হাত পা অসাড় হয়ে আসে, আজ বুঝি ফিরে এসে সে কি না কি বলবে!
যদিও আজ পর্যন্ত সংসারের সকল ব্যাপারেই নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছেকে মনু আলাদাভাবে নেড়ে চেড়ে দেখেনি। নির্ভরযোগ্য বউয়ের ইচ্ছেকেই নিজের ইচ্ছে ভেবে সব ব্যাপারে পরীর কথাতেই সায় দিয়েছে। এতগুলো বছর পার হয়েছে, পরী আর সেই লাজুক লাজুক কাঁচা পরী নেই, একটু মোটা সোটা গিন্নি বান্নী হয়েছে। মনু পরীকে আরো ভারি একটি নাকছাবি তৈরি করে দিয়েছে। আজও দিনের আলোয় বা রাতে হারিকেনের আলোয় পরীর নাকছাবি ঝিকমিক করে উঠলে মনুর মন ভালো হয়ে যায়, আজও পরী সমান আন্তরিকতায় মনুর যত্ন করে। এখনও তাদের ঘর গেরস্থালীর মধ্যে কোন অশান্তি নেই, অভাব আছে কিন্তু তা নিয়ে নিত্য ঝগড়া কাজিয়া নাই, তারা দুজনে ভালই আছে। কিন্তু মনে মনে পরী ভালো নেই, মনে বড় অশান্তি, বড় ভয়, বড় দুর্ভাবনা।
মনু বড় ভাল মানুষ। তার স্বভাব চরিত্রে কোন দোষ পায়না পরী। তবে ইদানীং বড় অস্থির দেখায় তাকে। পরী হোমিও ওষুধ ঠিকমত খাচ্ছে কিনা, শাশুড়ির আনা পানিপড়া খাচ্ছে কিনা, পড়াতেল মাখছে কিনা হাতে গলায় তাবিজ গুলো ঠিক আছে কিনা সব খোঁজ খবর নেয়। বড্ড শংকিত হয়ে পরে পরী। মনু আর কতদিন ভালো থাকবে, কতদিন কেবল পরীর মাঝে মনটাকে ধরে রাখতে পারবে? পরীর সংসার কি আর টিকবে না!
একদিন সন্ধ্যাবেলার কথা, হাস, মুরগি, ছাগল ঘরে তুলে হারিকেনের চিমনী মুছতে বসেছে পরী। এক্ষুনী আজান হবে পানি মুখে দিয়ে রোজা ভাঙতে হবে সন্তান লাভের আশায় সে প্রায়ই রোজা করে এজন্যে সে খুব দ্রুত হাত চালিয়ে কাজ করছিল, কিন্তু হাত যেন নড়তেই চায় না, কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করে না, মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে সামনের সজনে গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে গেছে, তার ডালে বসে দুটি ঘুঘু ঠোঁটে গলায় জড়িয়ে আছে…
-ভাবী আছ নাকি?
-কা-য়-, অ ধলা ভাইজান! আইসো বইসো বলে পরী মোড়াটা এগিয়ে দ্যায়- কিছুক্ষণ ভালো মন্দ কথা বলার পর পরী বলে-
-ভাইজান, তোমরা এ্যানা বইসো, মুই এলায় আইসোচো…
ধলার একটি পোশাকি নাম থাকা সত্ত্বেও যেহেতু তার গায়ের রঙ দুধের মত সাদা তাই গ্রামের সবাই তাকে ধলা নামেই ডাকে। গ্রাম সম্পর্কে মনুর ভাই মানে পরীর দেবর হয়। পরী এই মানুষটাকে বড়ই পছন্দ করে। কেমন যেন ভদ্রলোকের মত তার চলন বলন অনেকটা খাঁ বাড়ির পুরুষদের মত লাগে। বাসস্টান্ডে তার একটি সাইকেল মেরামতের দোকান আছে, দিনরাত সে দোকানেই থাকে। সংসারে একা মানুষ বাড়িতে খুব কম থাকে। আর দোকানে বাড়িতে যেখানেই থাকে কানের কাছে একটা রেডিও বাজতেই থাকে। গ্রামের অন্যান্য ছ্যাবলা মানুষের মত সে নয়। বেশ কম কথা বলে, যা বলে শহরের মানুষের মত করে বলার চেষ্টা করে। সে পরীকে বেশ পছন্দ করে, পরীর প্রতি তার বিশেষ প্রশ্রয়টুকু পরী টের পায়। কথায় বলে মেয়েদের পেছনেও দুটো চোখ থাকে, কথা মিথ্যা নয়। মেয়েরা অনেক কিছুই বুঝতে পারে। তবে পরী এটাও বোঝে যে মনু তাকে খুব ইজ্জত করে। এর মধ্যে খারাপ কিছু নেই।
তার একার নির্জন সংসার, বাড়িতে মা বোন বউ কেউ নাই, খাওয়া দাওয়া সব বাইরে বাইরে, বা মাঝে মাঝে নিজেই হাত পুড়িয়ে আলুভাতে খেয়ে নেয়। ভালো মন্দ কিছু রান্না হলে প্রায়ই পরী ধলার ঘরে দিয়ে আসে। পরীর রান্না ধলা খুব পছন্দ করে। একেবারে চেটেপুটে খেয়ে নেয়। তাছাড়া গ্রামের আর দশজন মেয়েদের মত পরী মুখরা নয়,অলস নয়, গুছিয়ে সংসার করে, সব কিছুর মধ্যেই তার একটা রুচি আছে, সে কঠোর পরীশ্রমী একটি মেয়ে এসব দেখে পরীকে ধলার বড় ভালো লাগে। এই ভালোলাগায় অন্যকিছু নেই। ধলাও বড় ভালো মানুষ। মাঝে মাঝেই সে পরীকে এটা সেটা এনে দেয়, কখনও ছোট মাছ, নতুন সবজি, মৌসুমী ফল যেমন- তেতুল, বরই, পানিফল, ডেউয়া,আবার কখনও বুট বাদাম ভাজা, তিলেরখাজা, গরম জিলিপি ইত্যাদি কিংবা কখনও ছোট মাছ বা শুটকি, কখনও কিছুটা মাংস এনে দিয়ে বলে- একটু তেল ঝাল দিয়ে মজা করে রান্না করতো আজ ভালই ভোজ হবে, মনুদাও খুশী হবে। রাতে খেতে বসে মনু সত্যিই খুব খুশী হয় তিনজন মিলে অনেক রাত পর্যন্ত গুলতানি চলে।
মনুকে বসিয়ে রেখে এরইমধ্যে ঘরে গিয়ে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে রোজা ভেঙ্গে নামাজ সেরে আবার এসে মনুর থেকে একটু দূরে বসে পরী।
-কি খবর ভাবী, আছ কেমন? কয়দিন থেকে আসতেই পারি নাই। একদম সময় পাচ্ছিনা, রাতে ফিরতে ফিরতে তোমরা সবাই ঘুমে কাঁদা হয়ে যাও…
-এইত ভাই আছি, হামার আর ভালো থাকা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে পরী। সারাদিন রোজা শেষে এই মাত্র সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এসেছে, তখনও চোখ মন ভেজা, সে মাথা নিচু করে থাকে। ধলা সবই বুঝতে পারে। সমস্যা ত আর আজ নুতন নয়।
-আমি ত সবই জানি ভাবী, কবে থেকে মনুদাকে বলি ডাঃ এর কাছে যেতে তা সে কই শোনে আমার কথা
-দোষ তো মোর ভাই। মোর জন্যই ত সে বাপ হওছে না, মুই বাঁজা, মুই আঁটকুড়ী, মোর মুখ দেখলে বোলে… পরীর কন্ঠ বুজে আসে, চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়তে থাকে। ধলা খুব বিচলিত হয়…
-ভাবী শোন, কাঁদবে না, চোখ মোছ, কার দোষ, কেন কিছু হচ্ছে না সেটা ডাঃ না দেখানো পর্যন্ত বলা যাবে না। এমন তো হতে পারে মনুদার কারনেই কিছু হচ্ছে না। তুমি মনুদাকে খুব তাড়াতাড়ি ডাঃ এর কাছে পাঠাও, বা দুজন একসাথে যাও। সন্তান হওয়ার ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রী দুজনের সমান ভুমিকা। অনেক সময় পুরুষের কারনে বাচ্চা হয়না, আবার কখনও স্ত্রীর কারনেও বাচ্চা হয়না এই সব নানা কথা ধলা বুঝিয়ে বলে আর পরীও আজ এই অজানা কথাগুলি চোখ বড় বড় করে শোনে। সন্তান হবার ব্যাপারে নারী পুরুষের ভূমিকা, সঠিক সময় ইত্যাদি নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে অনেক প্রশ্ন করে পরী। আজ যেন সে বেপরোয়া। সব কিছু তাকে জানতে হবে। বুঝতেই হবে।
-শোন কাউয়া ঘটক আজকাল মনুদার সাথে প্রায়ই গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর করে– ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে না। এই শুনে তুমি আবার মন খারাপ করনা। কাউয়ার ব্যাপারটা আমি দেখব। তুমি ধৈর্য্য ধরো। আর খুব শিগগরই ডাঃ এর কাছে যাও। আচ্ছা এখন আমি যাই, পরে আবার আসব। ও আচ্ছা, এই নাও তোমার কলার টাকা। কিছু টাকা বাড়িয়ে দিলে পরী তা হাত বাড়িয়ে নেয়। প্রায় সময় গাছের কলা, কলার মোচা, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি সে বল্টুকে দিয়ে বিক্রির জন্য হাটে পাঠায়। ভাসুরের ছেলে বল্টু নিয়ে গিয়ে ধলার কাছে দিয়ে আসে। বিক্রি টিক্রি করে ধলা টাকা পয়সা পরীর হাতে দ্যায়। গাছের বিভিন্ন জিনিস শাশুড়ি জাকে দিয়ে নিজেরা খেয়ে যা থাকে পরী বিক্রি করে করে কিছু টাকা পয়সা জমিয়েছে। ধলা নিজের ঘরে গিয়ে সর্বক্ষণের সঙ্গী রেডিওটি ছাড়ে সেখানে গান বাজে- “হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ পাখিটি ছাড়িল কে…
কাউয়া ঘটকের কথায় পরীর বুকে যেন শেল বেঁধে তার সমস্ত শরীর ভেঙ্গে পড়তে চায়। কাউয়া ঘটক এ অঞ্চলের নামকরা ঘটক যার পেছনে লাগে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়েই ছাড়ে।
পরী সংসারের চারিদিকে তাকায়- এই সংসারের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গায় পরীর হাতের স্পর্শ। ঘরের পেছনে একটি আম গাছ লাগিয়েছিল, সেটাতে কবছর ধরে ঝেপে আম ধরে। তার ওপাশে কলার বিশাল ঝোপ হয়েছে সেখানে একটা না একটা গাছে কলার কাঁদি সব সময় লেগেই থাকে। হাঁস মুরগি দিয়ে খুপড়ি এখন ভর্তি। এক ছাগল থেকে এখন ছোট বড় অনেক ছাগল হয়েছে। ঘরের শিকায় বিভিন্ন ছোট বড় হাঁড়িতে সারা বছরের জন্য কত রাজ্যের জিনিস! কবছর আগে বাড়ি ঘিরেছে মাটির দেয়াল দিয়ে তখন মনু মাত্র দুদিন কাজে কামাই দিয়েছিল, বাকি কাজটা পরী একাই একটু একটু করে শেষ করেছে। এই সংসার, এই গেরস্থালী, এই পরিপাটি নিটোলতা পরী একটু একটু করে, তিল তিল করে গড়ে তুলেছে। এ-ই স-ব তার একার। এসব ছাড়া সে এক মুহূর্তও বাঁচবে না।
এসবের ভাগও সে আর কাউকে দিতে পারবে না।
আর মনু? তার ভালো মানুষ স্বামী?
বিয়ের পর থেকে এতগুলো বছর ধরে সে স্বামীর চওড়া বুকে মুখ ডুবিয়ে ঘুমিয়েছে…
স্বামী তার পর হয়ে যাবে! সেখানে ভাগ দখল নেবে আরেকজন! আজানের শব্দে চমকে উঠে পরী। কখন এশার নামাজের সময় হয়ে গেছে। অজু করে সে ঘরে যায় জায়নামাজে বসে দুহাত তুলে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। এভাবেই দিন কাটতে থাকে…
কদিন ধরে পরীর অসম্ভব মন খারাপ। সে দুশ্চিন্তায় পাগল প্রায়। সে খায় না, নায় না, এত প্রিয় ভরা সংসার, গাছপালা, হাঁস মুরগি সেদিকে সে ফিরেও তাকায় না। তারপর সে মনে মনে শক্ত কসম করে
“মোর সংসার যেমন করি হউক মুই রক্ষা করিম, যা করা লাগে তাই করিম”। পেছনে হাত ঘুরিয়ে এলোচুলের গোছা শক্ত করে বেঁধে নেয় সে।

**
পরীবিবি কোনদিন স্কুল কলেজে পড়েনি, পুঁথিগত কোন রকম বিদ্যা শিক্ষাই তার নেই। বিশ্বে নারীর অবস্থান, নারীর অধিকার, নারী দিবস কিছুই সে জানে না। পৃথিবীর জ্ঞান ভান্ডারের কোন খবরই সে রাখে না। তবে প্রকৃতিই তাকে কিছু স্বাভাবিক জ্ঞান বুদ্ধি, বিবেচনা বোধ দিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই চারপাশের পরিবেশ, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের দৈনন্দিন জীবন থেকে আহরিত অভিজ্ঞতায় সে এটুকু বোঝে কিছু একটা তাকে করতে হবে, হবেই। কেবল একটা বাচ্চার কারনে তার সাজানো সংসার ভেঙ্গে যাবে! স্বামী পর হয়ে যাবে!
পরী নিজের দিকে তাকায়, নিজেকে নিয়ে ভাবে- আজ পর্যন্ত কোনদিন সে অসুস্থ্য হয়নি, তার শরীর কখনো খারাপ করে না, সে ভালো রকম হিসেব নিকেশ করে দেখে তার কোন মেয়েলি সমস্যা নেই, তাহলে ঘটনা কি? সেদিনের ধলার কথা গুলো তার খুব মনে পড়ে। সে সব কিছু বোঝার চেষ্টা করে। তার মাথায় ঘুরপাক খায়- “বাচ্চা হওয়া না হওয়ার জন্য কেবল নারীই দায়ী নয়”। তারপর সে কি এক সিদ্ধান্ত নিয়ে শক্ত, দৃঢ় হয়ে উঠে দাঁড়ায়।
প্রতি বছর প্রচন্ড শীতে স্বামীকে সে বুকের ওম যেমন দেয়, তেমনি হারিকেনের আলোতে কাঁথাও বানিয়ে দেয়, গরমে তাকে সারারাত পাখার বাতাস দেয়, এবারে একটি সন্তানও সে তাকে দবে । দেখা যাক কি হয়…

ঘোর বর্ষাকাল। কদিন ধরে এক নাগারে বৃষ্টি হবার পর, আজ আকাশ ধরে এলেও গুড়ি গুড়ি, ফিনফিনে বৃষ্টির চাদর ঝরছে। চারিদিকে প্যাঁচপ্যাচে কাঁদা। হাঁস মুরগি, গরু ছাগল ভিজে একাকার হয়ে ঘরের কোনে কোনে আশ্রয় নিয়েছে। কাকগুলো সত্যিকারের কাকভেজা হয়ে সজনে গাছটায় জবুথবু বসে আছে। মানুষের দুর্গতির অন্ত নেই…
কদিন থম ধরে থাকার পর আজ পরী অনেক সময় নিয়ে সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করেছে, ভালো একটা শাড়ি পরেছে, চুলে তেল দিয়ে টান টান করে চুল বেঁধেছে, চোখে কাজল দিয়েছে আর এই প্রথম পায়ের মল জোড়া খুলে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে পরেছে…
চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, বাইরে ঝিঁঝিঁদের জোড়ালো কোরাস, কাদায় পিচ্ছিল উঠান,এ উঠান সে উঠান পেরিয়ে পা টিপে টিপে সন্তর্পনে হাঁটতে থাকে সে। হাতের তালুর রেখার মতই পরিচিত গন্তব্যের গলি কাজেই পা ফেলতে কোন সমস্যা হয়না। যেতে যেতে অন্ধকারে নরম থকথকে কিসের উপর যেন পা পরল- গন্ধে বুঝল গোবর। দুর্বা ঘাসে ঘষে ঘষে পা মুছে একের পর এক পা ফেলতে থাকে সে…
এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্বের পথ অথচ পথ যেন ফুরোতেই চায়না। তবে স্থিরসংকল্প জানে পথকে একসময় ফুরাতেই হয় – ফুরালো। পরী তার জীবনমুখী হাত রাখল দরোজার কড়ায়…
বৃষ্টি বাদলার রাতে কোন এক হাট ফেরত মানুষের গানের সুর দূর থেকে শোনা যায়। পাকুড় গাছের বাদুর গুলো নিজেদের মধ্যে কেন যেন ডানা ঝাপটায়। দূরে ট্রেনের হুইশেল দূর থেকে আরো দূরে মিলিয়ে যায়।

**
বিয়ের প্রায় ৯/১০ বছর পরে মনুর বউয়ের সন্তান হয়েছে। কন্যা সন্তান। সকলেই খুশী। খাঁ বাড়ির আম্মা পর্যন্ত সন্তান দেখতে এসেছেন, সঙ্গে কত কিছু যে এনেছেন! শিশুর মুখ দেখে যেমন তিনি অবাক তেমনি খুশীও।
-কিরে মনু, তোর মেয়ে যে মেমসাহেবদের মত দেখতে হয়েছেরে! কি সুন্দর চাঁদপানা মুখ হয়েছে! আর গায়ের কী রঙ! মাশাল্লাহ!
কন্যাকে দেখে তিনি একটি চেইন দিলেন আর নাম রাখলেন- “এলিজাবেথ” মনু পরীর মেয়ে নাকি দেখতে রানী এলিজাবেথ-এর মতই হয়েছে। যদিও পরে পাড়ার মানুষ সারাজীবন ধরে কেবল এলি বা এলিজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

**
-নানীমা, উঠো হাঁটো ঘরত যাই। আর কান্দেন না। কান্দিতে কান্দিতে তো শ্যাষ হয়া যাওচেন নানীমা। পরম মমতায় বলতে বলতে বড় নাতনী, এলিজার মেয়ে এসে পরীবিবির হাত ধরে। বৃদ্ধা ফ্যাল ফ্যাল করে বোবা দৃষ্টিতে নাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
পরীবিবির এত কিছুর ফল যে সন্তান, যে সন্তান পরীবিবির জীবন- সমাজ সংসার রক্ষা করেছিল, নিজেও সে দীর্ঘদিন সংসার করে স্বামী সন্তান সন্ততি আর অশীতিপর বৃদ্ধা মাকে রেখে অজানা কোন জগতে চলে গেল।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহমুদ রিজভী — নভেম্বর ১২, ২০১৬ @ ৭:৩১ অপরাহ্ন

      আমাদের চেনা জীবনের গল্পকেই সাবলীলভাবে উপস্থাপনের জন্য লেখককে অভিনন্দন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com