মোহাম্মদ রফিকের কবিতা: যেহেতু সে ধুলো মাখে, ধুলোর চেয়েও অগণন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২৩ অক্টোবর ২০১৬ ১:৩৯ অপরাহ্ন


কবিকে রেহাই দেবে কে?

মাগো, তবে কাদের বাড়ির খুদে
ভরে উঠল ভাঙাথালা
কান্নায়, চিৎকারে

মাগো, তবে কাদের ঘরের ত্যানা
আমাকে জড়িয়ে নিল
রক্তহিম সরোবরে

মাগো, তবে কাদের গ্যাঁজালো পান্তা—
পেটের ভিতরে ঢুঁড়ছে
বেদম হাত পা

মাগো, মা কাদের সোহাগে ঘেন্নায়
ভিড়মি খেতে খেতে যেন
ফুল ফুটছে তারা ডাকছে

শরীরের কন্দরে কন্দরে ক্ষত ফাটছে
যেন মসলা পিষে পিষে কেউ
মাগো, ধুয়ে ফেলছে পাটা।

(মাগো, মা; মোহাম্মদ রফিক)

Mohammad Rafique-3এইভাবে একজন কবি জাগিয়া উঠেন ভাঙনের মুখোমুখি। দেশকাল, গোত্রজাতপাতহীন এই দেশে যখন কবিরা চিৎকার করিয়া বলিতে থাকেন ‘আমাদের কোন দেশ নাই’ তখন মোহাম্মদ রফিক দেখাইয়া দেন, না, কবিতা আসমান হইতে নাজিল হয় না, অন্যভাষা বা দেশ হইতে ধার করিয়া বদলানো শব্দাবলীতে কিংবা আইডিয়াতে হইয়া ওঠে না, কবির কাব্যবোধ অবশেষে কিংবা সবশেষে পানি পায় নিজভূমেই— দেশজ পৈঠায়।

মোহাম্মদ রফিক, তিনি রচিয়াছেন ‘মোছো রক্ত, পৈঠার ওপরে কালসিঁটে এই/লড়াই চলবেই’— বাংলাদেশের চিরায়ত পোড় খাওয়া মানুষের সুখ দুঃখ, প্রত্যাশা, বিড়ম্বনা, প্রেম আর জীবনের জটিল অনুভব তুলিয়া আনিয়াছেন নিজের রক্তমাংস খুঁড়িয়াই। তুলিয়া আনিয়াছেন এই মাটির ভৌগোলিক স্পন্দন, তার অন্তঃস্থিত আন্দোলিত প্রকৃতি, লাঞ্ছিত আর একরোখা মানুষের সংগ্রাম ও পরাজয়। লোকজ জীবনের এইরূপ আধুনিক প্রকাশ তাহাকে পৌঁছাইয়া দিয়াছে অন্যান্য কবিদের তুলনায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক অবস্থানে। উত্তীর্ণ এক ভিন্নমাত্রায়। ফলত, তার কবিতার স্বরও একেবারে আলাদা— যে স্বর একান্তই তাঁর গভীর ধ্যান, সাধনা, অভিজ্ঞতা আর নিশ্চিত বিশ্বাসেই বলিতেছি, বোধের ফসল।

যদিও বরাতে কিছুই যায় আসে না তথাপি অ্যাকাডেমিশিয়ান পণ্ডিতগণ মাঝেমধ্যেই মোক্ষম বাক্যে নিজেদের প্রজ্ঞার চি‎হ্ন রাখিয়া দেন। যেমতি অরুণ সেনের মতো ঋদ্ধ সাহিত্যবোদ্ধা তাঁকে উদ্দেশ্য করে লিখিয়াছেন, ‘মোহাম্মদ রফিকের কবিতার আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ঘটে যায় বাংলাদেশের আবিষ্কার’। কি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে হুঙ্কারে কি মানবতার চুড়ান্ত অপমানের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ রফিকের কবিতা ঝলসাইয়া উঠিয়াছে ধাঁ চকচকে খড়্গ হইয়া এমনকি তাঁর দুর্বলতম কাব্যগ্রন্থ ‘খোলা কবিতা(১৯৮৩)’য়-ও।

লোলুপ দুর্নীতিবাজ অপদার্থের দারুণ কামড়ে
অনুর্বর মাঠ-ঘাট, ছিন্ন ভিন্ন সমাজ-কাঠামো
রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুঁজিবাদী কালো থাবা লালরক্ত ঢালে;

… আবার আকাশ জুড়ে তৃতীয় বিশ্বের ভাঙ্গাঘর
ঠেলে ঢোকে জলপাই লেবাস্যা দেবতা, একই চালে
পায়ে, কালো বুট; হাতে, রাইফেলের উদ্যত সঙ্গিন…

… এবার থামাও শালা। শুয়োরেরা ইয়ার্কি থামাও
এইভাবে…’’

এইভাবে যিনি বলেন, অথচ সেই কবিরও রেহাই রয় না এই ঘোর তমসাকালে। কবিদের রেহাই কিংবা মুক্তি নাই। অনবরত আবিষ্কারে আবিষ্কারে তাঁর ধ্যান প্রিয়তম বাংলাদেশ বিনে যেনবা আর কিছু নয়। সারাক্ষণ দেশ-মাকে লইয়া ঘোর অমাবস্যার ভেতরেও দেখেন আশার ফুলকি। লিখে যান—

‘শীত, শীত
দু’ হাঁটুতে সিঁধিয়েছে মৃত্যুভীতি
মনে লয় আসন্ন বিলয় সর্বমানুষের

দ্যাখ, দ্যাখ
ন্যাড়া কঞ্চিতে ধরেছে ফুল পূর্ণিমার।”

(কালাপানি;২০০৬)

বৈশাখী পূর্ণিমা থেকে পূর্বাহ্নে সামগান

আমার কবি মোহাম্মদ রফিক যাঁর চেতনায়, মননে, মর্মে, কর্মে লোকপরম্পরা বা লোকমিথ, ভূগোল বা ইতিহাস কিছুই খুঁড়িয়া তুলিয়া আনিতে বাদ রাখেন নাই। কীর্তিনাশা হইতেই সূচিত হইয়াছে এই মালার গ্রন্থন। দীর্ঘকালপথ পার হইয়া আজও যা অব্যাহত এই জরাবার্ধক্য-অসুস্থাবস্থায়ও।

অরুণ সেন বলিতেছেন ‘ধুলোর সংসারে এই মাটিতেই (১৯৭৬) কিন্তু মোহাম্মদ রফিক এর কবি স্বরূপ নির্দিষ্টতা ও স্বকীয়তা পেল। কবিতাগুলোর রচনাকাল ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর মধ্যে।’ সূচনা যেইখান হইতেই ভিত্তি পাক না কেন, লোকপূরাণে মোহাম্মদ রফিক এর শিকড় চড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর সাংস্কৃতিক বোধবিক্ষণ।
কীর্তিনাশা (১৯৭৯), গাওদিয়া(১৯৮৬), কপিলা(১৯৮৩), স্বদেশী-নিঃশ্বাস তুমিময়(১৯৮৮), মেঘ এবং কাদায় (১৯৯১), রূপকথার কিংবদন্তী (১৯৯৮), মৎস্যগন্ধা(১৯৯৯), বিষখালি সন্ধ্যা(২০০৩), নোনাঝাউ (২০০৭), দোমাটির মুখ(২০১০) এবং এবং এ পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ পূর্বাহ্নে সামগান (২০১৬) ও দুটি গাঁথাকাব্য (২০১৬){এ কোন বেহুলা ও সে ছিলো বেদেনি} হইতে এ কাব্যনাসিকাউঁচু অধমের পর্যবেক্ষণে মোহাম্মদ রফিক তাই ইউনিক এক কাব্যজগতের স্রষ্টা, যিনি তাঁর ট্রিমেন্ডাস স্বাতন্ত্র্যে মুগ্ধ করিয়া রাখেন আমার একান্ত নির্জন।

তোমার মুখের পর নামে ছায়া আতুর সন্ধ্যার
ভেজা— ছায়া, খালের কিনারে ঘেঁষে পড়ে আছে নাও
…ছম ছম তোমার মুখের পর ক্রমে নামে ছায়া
কিছু আলো অন্ধকার কিছু চেনা কিছু বা অচেনা;

খালের কিনার ঘেঁষে একা নাও পড়ে থাকে একা।

দেখিয়া লউন পাঠক, আমার বয়ান মিলাইয়া লউন আপনার অধ্যায়ন অনুধ্যানের সহিত, ষাটের প্রতিষ্ঠিত কবিগণ যেইখানে নিষ্ক্রিয়প্রায়, গীতলতা আর রোমান্টিকতা থেকে বাহির হইতে না পারার দায়ভার লইয়া আক্রান্ত চক্ষুস্মানতায় সেইখানে মোহাম্মদ রফিক তৈয়ার করিয়া লইয়াছেন তাঁর নিজস্ব ধ্রপদি পথ। এইখানেও তাঁর সেই একলা নাওয়ের মাঝির মতোন পড়িয়া থাকা। মোহাম্মদ রফিকের কবিতা দেখিলেই, পড়িলেই, অনুধাবনের পাটাতনে রাখিলেই চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জনপূর্বক বোঝা যায় এইটি বাংলাদেশের কবিতা। গাওদিয়া, কীর্তিনাশা, কপিলা সহ মোহাম্মদ রফিকের কাব্যের ভিতর দিয়া পাওয়া যায় অখণ্ড বাংলাদেশের আশা ও আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র।

যেইখানে আধুনিক কবিতার তর্কাতীত(!) দুই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ টাইম(সময়) এন্ড স্পেস (ভূগোল) ফকফকাভাবে দেখিতে পাওয়া যায়। ধুলোর সংসারে এই মাটি মোহাম্মদ রফিকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থ হইতে শুরু করিয়া, ১৯৭১ এর স্বাধীনতার যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে, একের পর এক কাব্যগ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায়, প্রত্যাশা, নৈর্ব্যক্তিকতা ও নৈরাশ্য সব মিলাইয়া এক জটিল অনুভব রফিকের কবিতাকে আক্রমণ করিয়াছে— যার চাপাচাপি আসিয়া পড়িয়াছে প্রকৃতিতে, জীবনে, মানুষ ও তার সমাজকে হৃদয়ঙ্গম করিয়া দেখিবার অন্দরমহলে ।

গীত ক’ কুবের’… অন্য জলে জাল ফেলে শীতে কাঁপে রাত্তির মহীম… তীব্র ইন্দ্রিয়সচেতন এই কবি বাংলা উপন্যাসের অতিচেনা চরিত্রের চকিত অবলম্বনে কিংবা তার নানা অনুষঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের দ্বন্দ্বকে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন তাঁর স্বকীয় বাক্প্রতিমায়। নদী ও জলের ক্যানভাসসহ ফুটাইয়া তুলিয়াছেন বাংলাদেশের গ্রামের দুঃসহ বাস্তব। আবার কখনো রূপকথা আর কখনোবা বাস্তবতা জায়গা বদল করিয়া নিয়াছে। জায়গা করিয়া নিয়াছে গ্রামীণ ছড়া, হাজার বছরের পুরনো পুঁথির সুর। কপিলার মর্মন্তুদ সেই কাহিনীতে এক বণিতার মুখে একি সংলাপ এঁটে দিয়েছেন কবি—

অ্য মাগী তুই ফ্যাচরফ্যাচর দাঁত ক্যল্যায়া অত্তো হিহি
এ্যত্তো বড়ো অসুখ লইয়া কোন মুহে তর হাসন আয় যে

ক্ষয়ের রোগী হাসির লগে দাঁতের গোড়ায় অ ছ্যামড়ী তর
পুঁজের মতোন আজ মরিবি না হলি তো কাল মরিবি

অ মাসী তুই ঐ যে দ্যাখ না
দোরের গোড়ায় বেলির কুঁড়ি
মুখটি টিপে ক্যামনে হাসে
অরে একবার ক্যান জিগাও না

সন্ধে হলি পায়ে আলতা ঠোঁটেঁ আলতা চোখে কাজল
একবার কাঁদস একবার হাসস বুকের আঁচল খুইল্যা পইড়্যা
একবার উইঠ্যা গুনগুনায়া গাইতে থাহস জানলা খুইল্যা
গাঙ্গের পানে ভোলা নায়ের সুজন মাঝি ফ্যালফ্যালাইয়া
অ মাসী তুই এট্টু দ্যাখ না
গাঙ্গের জোয়ার ক্যামনে ক’রে
নিজের বুকে মোচড়ানি দেয়
অরে একবার ক্যান জিগাও না

দু’দিন পরে গতর খাগী মইরা যহন পইড়া রবি
ধনচাবনে কুকুর আইসা টান্যা লইবো শিয়াল খাবো
বাবুরা সব ভুইলা গিয়া অন্য মাগীর ঘর টোয়াইবো
ভুল কইর্যাক কেউ তোর কথাডা খালি ঘরডা খোঁজ নিবো না

অ মাসী তুই পায়ের মলডা
হাতের বাজু কানের লকেট
খুইল্যা নিবি তারপরে না
পা ছড়াইয়া কাঁদতে বইবি

অ মাসী হোন ঐ টুহুতেই আমি খুশী বেজায় খুশী
ও পারেতে কালোরঙ্গা বৃষ্টি পড়ে এ পারেতে
লঙ্কা গাছটি রাঙ্গা টুকটুক গুণবতী ভাইরে আমার
আমের পাতা জামের পাতা ছুটছে এবার পাগলা ঘোড়া

অ মাসী তুই বল না দেহি
পাগলা ঘোড়া দেখতে ক্যামন
ছুইট্যা চলে পাঁজর ভাইঙ্গা
ক্যামনে তারে সামলে রাহি
অ মাসী তুই পোড়ামুখী জবাব না দি কানতে বইলি

(কপিলা/ মোহাম্মদ রফিক)

কীর্তিনাশা; কপিলা; মাটি কঠিন আকাশ দূর

মোহাম্মদ রফিকের কবিতা যাপনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, জীবন-জীবিকা, লোকপূরাণ আর চলমান বঞ্চিত শোষিত সমাজ-বাস্তবতা প্রবহমান পরম্পরাজাত। এই ক্ষেত্রে তাঁর আকরণ-প্রকরণকলা অভিনব না হইলেও ঐতিহ্যকে তিনি উৎপাদিকা শক্তির সহজাত করিয়া লইয়াছেন। লোকজপ্রতীতির বেশ অনেকগুলো পরম্পরায় নতুন বিন্যাসসেতু নির্মাণ করিয়াছেন। সহজাত করিয়া লইয়াছেন। বেহুলা লোকমিথকে জীবনানন্দ যে নতুন ঢঙে বিন্যস্ত করিয়াছিলেন, তিনি তাহা অনুসরণ করেন নাই। বরং নতুন বেহুলার ভেলা সাজাইয়া সাপে কাটা স্বামীর বর্ণনায় বা প্রতিকী ব্যঞ্জনায় যান নাই মোহাম্মদ রফিক। তিনি এই লোককাহিনীর আধুনিকোত্তর উপস্থাপনাই করিয়াছেন। প্রকৃত কবি তার ভৌগোলিক ইতিহাসকে ধারণ করিয়া থাকেন তাঁর বোধে, চেতনায়, চিন্তায়। বাংলাদেশ নদীবিধৌত ব-দ্বীপ আকৃতির একটি ভূখণ্ড। যাঁর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া রহিয়াছে অসংখ্য নদী। এইখানকার মানুষের ইতিহাস তাই নদীকেন্দ্রীকই বটে! গ্রামীণ জলকাদায় মানুষের বাড়িয়া উঠা, পরিপূর্ণতা লাভ। কিন্তু এই জলকাদায় স্নাত জীবনের প্রকাশ কতটা সহজসাধ্য? আর যেই কবি নাগরিক জীবনের জটিল পাকে আবর্তিত থাকিয়া তাঁর মুহূর্তসমূহ ব্যায় করিয়াও গ্রামীণ জীবনের হাসি কান্না সুখ দুঃখ ক্ষয় ক্ষরণ অনুবাদ করিয়াছেন নিজের অনুভূতি দিয়া, নাগরিক পোষাকেও তিনি আপাদমস্তক গ্রামীণ। মনের গহনে যাঁর সর্বক্ষণ নদী-মাঝি-নাও-নাওয়ের পাল দোলে তার জন্য কী বাক্যই বা চলিতে পারে!

ইদানিং অনেক কবি তাঁদের কবিতায় লোকজ বিষয়সমূহ আনিবার চেষ্টা করিতেছেন। কখনো কখনো প্রমিত চলতি ভাষার সহিত আঞ্চলিক কথ্যভাষা প্রয়োগ করিয়া গ্রামীণ বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা করিতেছেন। আসলে যাহা অভিজ্ঞতার সৎ অনুবাদ নহে, যাহা নিজের বোধ হইতে উৎসারিত হয় না তাহা একসময় ভাঙিয়া পড়িতে বাধ্য।
মোহাম্মদ রফিক এইক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র- বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সফলতম এক কবি।

সনৎকুমার সাহা নির্মাণ-এর পত্রিকার আলোচনায় খুব স্পষ্ট করিয়া রফিকের প্রবণতাকে চিহ্নিত করিয়াছেন “আসলে তাঁর কবিতা নিয়ে একটা প্রত্যাশার জায়গা এর ভেতরে তৈরি হয়ে গেছে। মেলান তিনি তাকে প্রত্যক্ষ জীবনের চলমানতার সঙ্গে, তার নিরাময়হীন দুঃখ-যন্ত্রণার সঙ্গে, নিষ্ঠুর-নির্বিচার আঘাতে বিহ্বলতা ও বিক্ষোভের সঙ্গে, কামনা ও কামনা-রিক্ততার সঙ্গে, আশা ও আশাভঙ্গের সঙ্গে। প্রকৃতি গড়ে তোলে অনুভবের শরীরী প্রতিমা; মানব-মানবীর জীবন-তৃষ্ণা ও অসহায় ভাগ্যলীলা তার বিপুল বিস্তারে মেশে। একাকার হয়। রূপে রূপে প্রতিরূপে একে অন্যের স্পন্দন তোলে। প্রতিধ্বনি জাগায়। তবে কবিতা তাঁর এসবের চাক্ষুষ বিবরণমাত্র নয়। আসলে দৃশ্যমান বাস্তবতা জায়গা করে দেয় তার অন্তর্লীন সত্তাকে। ঠিক যেমন, তেমন হয়তো নয়, রফিক তাকে যেভাবে তাঁর জাগ্রত চেতনায় প্রতিফলিত হতে দেখেন, তেমন।”

মেঘে এবং কাদায় রূপকথা কিংবদন্তি

শৈশব মানুষের জীবনের এক হিরন্ময় অধ্যায়। মানুষ সারাটাজীবন তাহাকে— সেই স্মৃতিকে রোমন্থন করিতে থাকে। হয়তো কখনো ভারাক্রান্ত হইয়া পড়ে, বেদনাসিক্ত হয়। রফিকের কাব্যের সহিত একই যাত্রায় যেন তারই এক হৃদস্পর্শী চিত্র। একটা চাঁপা আর্তনাদ যেনো বা পংক্তিতে পংক্তিতে মাখাইয়া রহিয়াছে। এ যেন এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের বিদীর্ণ অনুবাদ। হায়রে নায়ের মাঝি! জীবনটাই তাঁহার হারাইয়া যায় নাও বাইতে বাইতে। তারও যে এক মানবিক জীবন রয়েছে। রয়েছে মানবিক দুঃখবোধ হাহাকার। কেইবা শোনে তার জীবনের অন্তর্লীন গীত। নাও বাইতে বাইতে একদিন সেও নাও, পাল, গলুই, স্রোতস্বীনি নদী হইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত সে যেন আর ভিন্ন কোনও মানুষ রয় না। একদিন তাঁর বুকেও স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি খা খা হাহাকার করিয়া ওঠে। আজ আর নদীর সেই উত্তাল যৌবন নাই। ধূ ধূ চরে শুধু শূন্যতার মায়াজাল। কিন্তু মাঝির নৌকাটা যে আজও রহিয়াছে। নাওয়ের শরীরে জমিয়া আছে হাজার বছরের জীবনের উপাখ্যান। জমিয়া আছে কত মৃত্যু, কত শোকগাঁথা। আজ রহিয়াছে শুধু একলা মাঝি, সেই সব মরিয়া যাওয়া সময়ের রোমন্থন। সে যে চিরজীবনের তরে আঁটকাইয়া গিয়াছে নাওয়ের গলুইয়ে— বহু স্বপ্ন লইয়া যেই বাংলাদেশ নামের একটা দেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, অথচ যতই দিন গেছে স্বপ্নগুলো যেন ততই ফ্যাকাশে হইয়া গিয়াছে।

…ওই ধর্ষিতার চুল লেপ্টে আছে মেঘে মেঘে,
ছেঁড়াখোড়া সারাটা আকাশ
ভেঙে বৃষ্টি মধ্যরাত
কাদাবালু মাখামাখি ধড়
ভাসিয়ে ভূবন জন্ম নেয় সোঁদ শ্যাওলা পুকুরের পাড়;

শত শত রক্তপদ্ম ওই চোখ খুলছে ঘুম ঠেলে
এবং একফালি লা-ওয়ারিশ বাহুঠ্যাঙ্,
মারণযজ্ঞের ভষ্ম উপচে উঠে আসছে কাষ্ঠখণ্ড, মুখে অগ্নি,

ধিক ধিক শরমে কুঞ্চিত, সে আমার মাতৃভূমি, নিরুদ্ধ স্বদেশ।

(মুখ/ মোহাম্মদ রফিক)

স্বদেশের দুর্যোগময় সময়ে লাঞ্ছিত নারীর বেদনার মতোন। মা আর মাতৃভূমি যেন সমার্থক হইয়া পাশাপাশি রেলপাতের মতোন চোখের সামনে দাঁড়াইয়া থাকে।। মাতৃভূমির উপর নিপীড়ন যেনও কোন মমতাময়ী নারীর উপরেই নির্যাতন। সময় এক নিষ্ঠুর দানব। সবকিছুই গ্রাস করিয়া লইয়া অতীত হইয়া যায় । তবুও সেই অতীতের খুড়ের রক্তাক্ত দাগে আমাদের ইতিহাস, আমাদের প্রকৃত পরিচয়। দেশ কাল পাত্র একই যোগসূত্রে গাঁথা এইখানেই। যখন অতীত ফিরিয়া আসে সাথে আসে দেশ, জয়নুলের ছবির মানুষেরা। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে শেকড়সন্ধানী বলিয়া একটা কথা প্রচলিত হইয়াছে যাহা মোহাম্মদ রফিকের ক্ষেত্রে বাহুল্যের মতোন। মোহাম্মদ রফিক সেই কবি যিনি শেকড়সন্ধানি নহেন বরং তিনি শেকড়ের মধ্যেই ডুবিয়া আছেন। শেকড়ের ভেতরেই তার নিত্য বসবাস। নদীর অতলে বাস করিয়া যিনি জলের ঘ্রাণ পান। মানুষের প্রাণের কথা শুনিতে তাঁকে আয়োজন করে কান পাতিতে হয় না। প্রতিনিয়ত তাহারাই যেন তাঁর সাথে কথোপকথনে ব্যস্ত। যার ফলশ্রুতিতে, তাঁর কবিতায় ফিরিয়া ফিরিয়া আসিয়াছে গ্রামীণ কাদামাটির গন্ধমাখা আটপৌঢ়ে জীবনের বাঁক। যেইখানে জেলে আছে, নাও আছে, আছে গ্রামীণ গাঁথা, গ্রামীণ কৃষক। কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমাদের পূর্বপুরুষের কথা, আমাদের অতীত ঐতিহ্যের কথা, আমাদের আদি ও অকৃত্রিম জীবনের গান সুরের মূর্চ্ছনা ছড়ানো ধ্রুপদের উন্মোচন। এক যাদুকরী আবেশে যা পৌঁছাইয়া দেয় চেনা-জানা পরিবেশের উৎস্যভূমিতে। ইতোঃপূর্বে যা আমাদিগের দৃষ্টি অনুভূতির অগোচরেই থাকিয়া গিয়াছিল। অনেকে হয়তো তথাকথিত আধুনিকতার মন্ত্রবলে এইসব আকরণ-প্রকরণ কে খারিজ করিয়া দিতে চান গেঁয়ো বলিয়া। কিন্তু প্রকৃত আধুনিকতা তাদের বোধে এখনো আসে যে নাই এই ব্যাপারে নিশ্চিত হইতে সময় লাগে না, পঞ্চইন্দ্রিয় সবল থাকিলেই হয়। কারণ, আধুনিকতা হইলো নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্য হইতে, সেই পরিবেশের নৈর্ব্যাক্তিক উপস্থাপনা। কিন্তু আমাদিগের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ভৌগোলিক পরিবেশকে অগ্রাহ্য করিয়া পাশ্চাত্য প্রভাবে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা সত্যিই হাস্যকর। এক্ষণে এই প্রসঙ্গে আমার কাছে বড় কবি জসিমউদ্দীনের একখানা গপ্পো মনে পড়িতেছে। বইয়ের জগৎ সম্পাদক আহমাদ মাযহার একদিনে আড্ডায় এই গল্পটা বলিতেছিলেন। জসিম উদ্দিন গিয়াছেন মার্শাল টিটোর দেশ যুগোস্লাভিয়ায় কিংবা ইয়োগোস্লাভিয়ায়। এক সাহিত্যসভায় কবিকে প্রশ্ন করা হইয়াছে আপনাদের দেশের সাহিত্য লইয়া কিছু বলুন। আপনাদের কবিতার ধারা লইয়া কিছু বলুন। কবি প্রথমত বিব্রত হইলেন, পরবর্তিতে হাসিয়া কহিলেন ‘আমাদের দেশের কবিতার ধারা দুইটা, একধারায় বড় কবি আমি, আরেকধারায় বড় কবি শামসুর রাহমান, তিনি অবশ্য আমাদের দেশের কবিতা লেখেন না, আমি তাই উনাকে বড় কবি মানি না, আমি আমার গ্রামসর্বস্ব দেশের কথা লিখি’।

কবিমাত্রই জানেন, কবিতা হইলো জীবনের গভীরতর অনুসন্ধান, ছন্দ। যে ছন্দ-সুর ঐন্দ্রজালিক মোহে আচ্ছন্ন করিয়া পাঠককে লইয়া যাইবে আরো গভীরতর কোন অনুভবের কাছে, গর্দানে প্রেয়সীর শ্বাসাঘাতের মতোন। কিন্তু কবিতার বিষয়, আকরণ-প্রকরণ যখন আরোপিত হয়, শব্দ ও অনুষঙ্গ যখন দূরবর্তী মনে হয় তাহার ভিতরে পৌঁছা অসাধ্য-দুরূহ হইয়া ওঠে তখন। সাম্প্রতিক কবিরা আধুনিক হইতে চাহিয়া এই অপচেষ্টাই করিয়া যাচ্ছেন। উহাতে তাহারা যেন নিজেদেরই প্রকৃত জীবন হইতে দূরে সরাইয়া দিচ্ছেন। যেন, হারান বুঝেছে, এই বাঁচা ঠিক বেঁচে থাকা নয়;

ইতিপূর্বে দেখা গিয়েছে আমাদের প্রধান কবিরা লেখালেখির একটা পর্যায়ে আসিয়া পূনরাবৃত্তির দোষে আক্রান্ত হইয়াছেন। যাহার ফলে তাহাদের সেইসব কবিতা আমাদের কাছে, আমার নিকটে একঘেয়ে হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু মোহাম্মদ রফিক দীর্ঘদিন লেখালেখির পরও এ বিষয়ে সচেতন ভাবেই ব্যতিক্রম। তাঁর প্রতিটি কবিতাই যেন পূর্ববর্তী কবিতা হইতে ভিন্নতর। প্রতিটি কবিতাই যেন ভিন্নমাত্রিক অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়া যায় পরানে আমার। তবে মোহাম্মদ রফিকের কবিতা পাঠ করতে হলে যে মনোযোগি, নিবেশী প্রস্তুতপাঠকের প্রয়োজন হয় সেরকম পাঠক আশপাশে খুব কম দেখি বলিয়া আফসোস হয়। এমনকি তরুন, অর্ধতরুণ, বয়সে বড় কবিগণের মধ্যেও আমি সেই পাঠাভ্যাস দেখিনা, আমার কবির ৭৪তম জন্মদিনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া তাঁর কাব্যজীবনের দীর্ঘায়ূ কামনায় এই কথকতার যবনিকা টানিতেছি। আশা করি, আজিকার দিনের তরুণতূর্কীরা মোহাম্মদ রফিক পাঠ করিয়া নিজেদের ঋদ্ধ করিতে ভুলিবে না।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com