লালন ও আরশি নগরের পরশি

সেজান মাহমুদ | ২০ অক্টোবর ২০১৬ ২:৩৬ অপরাহ্ন

Lalon ১৭ অক্টোবর ছিল বাংলার এক ক্ষণজন্মা কবি ও দার্শনিক লালন সাঁই-এ মৃত্যুদিন। লালনের জন্মকাল নিয়ে অনেক তর্ক, বিতর্ক হয়েছে, তাঁর জীবৎকাল নিয়েও প্রচুর বাদ-বিসম্বাদ থাকলেও মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া হয় যে তিনি জন্মেছিলেন ১৭৭৪ সালে, আর ১১৬ বছরের সুদীর্ঘ জীবনশেষে মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯০ সালে। লালনের ভাব ও দর্শনের প্রভাব নিয়ে বোধকরি কেউ দ্বিমত করবেন না যে এক অনন্য, উদার, বিনীত দর্শন নিয়ে বাংলা গানকে বিশ্বজনীন আবেদন দিয়েছেন লানন। তাঁর দৈন্য গান যেমন জীবের তুচ্ছতা, দীনতা, অজ্ঞতা প্রকাশ বা আত্নসমালোচনার মধ্য দিয়ে এক মহাপরাক্রমশালী সত্ত্বার কাছে আত্নসমর্পনের পথ বাতলে দেয়, তেমনি সেই পরম অধরা কে বিমূর্ত রূপ থেকে মূর্ত করে আনে মানুষের মধ্যে, মানুষের কল্যাণে। লালনের ভাবদর্শনের প্রভাব যে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল বাউল কবিকুলের ওপরে পড়েছে তা গবেষণা করে বের করার প্রয়োজন পড়ে না। যেখানে লালনের এই যুগান্তকারী দর্শনের বিশ্বজনীন মূল্যায়ন ও বিস্তার প্রয়োজন সেখানে কুশিক্ষিত মোল্লারা লালনচর্চা কেন্দ্র (লালন একাডেমী), বা আখড়াগুলোকে ধোঁকাবাজ, বেশরিয়তি, বেদাতি আখ্যা দিয়ে “বাউল ধ্বংস ফতোয়া” পুস্তিকা রচনা করে বিলিবন্টন করেছে। বিশিষ্ট বাউল গবেষক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী জানান ১৯৮৪ সালে লালন একাডেমীর সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ফজলুল হক মিয়া লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাজার প্রাঙ্গণে ইসলামী সভা ও বেশরিয়তি পথ থেকে ফিরে আসতে বাউলদের জন্যে তওবা করার অনুষ্ঠান আয়োজন করে (সূত্রঃ লালনকে কে বাঁচাবে, মফিদুল হক)। এই ক্ষুদ্র পরিসরের লেখায় লালনের দর্শনের একটি দিককে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে আলোচনা করার প্রয়াস নেবো। এক্ষেত্রে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান আমার তুলনার মানদণ্ড। এই মানদণ্ড কেন তা নিয়ে সামান্য একটু ভণিতা করে নিই।

ফরাসি বিপ্লবের আগে ও পর থেকে দেকার্ত, ভলতেয়ার, রুশো, কোমত, কোজেভ, সার্ত্র, ব্যুভয়া যেভাবে বিশ্বময় দার্শনিক আধিপত্য নিয়ে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানকে সামনে এনেছিলেন তা কুড়ি ও একুশ শতকের লাকাঁ, বার্থ, আলথুসার, ফুকো, দেরিদা, দেলুজ বা লিওতারদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তার কারণ বহুবিধ। ইউরোপীয় রাজনৈতিক আধিপত্য খর্ব হওয়া বোধকরি তার একটি কারণ। অন্যদিকে দর্শনের ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিকতা কোন একক ব্যক্তিত্বের আধিপত্যের পথে বাধা। তারপরও সামগ্রিকভাবে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান বিশ্বময় নিজস্বতায় জ্বলজ্বলে ও প্রখর। গত ও বর্তমান শতাব্দীর তাত্ত্বিক বা দার্শনিকদের মধ্যে জাক লাকাঁ সবচেয়ে ক্ষেপাটে, স্বতন্ত্র ও অনিবার্য। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী-মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে সাইকোঅ্যানালিসিসের এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন; সেই সংগে সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য, দর্শন, মানব-সত্ত্বা ও শিল্প বিশ্লেষণের নতুন ধারা। পৃথিবীতে নানারকমের সাইকোঅ্যানালিসিসের ধারা আছে, যেমন এনালিটিক্যাল, রিলেশনাল, ইন্টারপারসনাল, ও আধুনিক সাইকোআ্যানালিসিস। তিনি যে ধারাটি সৃষ্টি করেছেন তা একেবারেই আলাদা। তাঁর এই ধারা ব্যক্তিসত্ত্বাকে বিভাজিত করে মন বা চেতনার কেন্দ্রবিন্দুকে শুধু খোলাই করে দেয় না; উপরন্তু মানব জীবন, তার ভাষা আর অপূর্ণ ইচ্ছার কুয়াশাচ্ছন্ন ঘেরাটোপকে সামনে এনে হাজির করেন বহুরকমের তাত্ত্বিক অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে।
জাক লাকাঁর জন্ম ১৯১৫, মৃত্যু ১৯৮১ সালে। অর্থাৎ তিনি সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের ব্যাপক প্রভাব দেখেছেন, দেখেছেন মার্কসীয় তাত্ত্বিকদের দাপট ও পলায়নপরতা। সেই সংগে বিশ্বময় ভাষাতাত্ত্বিকদের নতুনতর আন্দোলন যা তাঁর পদ্ধতিতে প্রভাব রেখেছে ব্যাপকভাবে। তাই জাক লাকাঁকে এতো দূর্বোধ্য মনে হয়। জাক লাকাঁকে বুঝতে হলে তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি খোলাসা করা দরকার। এখানে সংক্ষেপে সেটাই চেষ্টা করবো। প্রচলিত বাংলা ভাষায় সাইকোআ্যানালিসিস এর অর্থ মনোসমীক্ষণ, মনোবিকলন, মনোবিশ্লেষণ, ও মতিবিভাজন (আরও থাকতে পারে) আছে। এখানে বলে নেয়া ভালো যে ভাষার বিবর্তন, নতুন ভাষা সৃষ্টি ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তাকে আমলে ধরেই এই আলোচনা করছি। জাক লাকাঁ তার পদ্ধতির ক্ষেত্রে বলেন, ‘সাইকো-আ্যানালিসিসের মাধ্যমে সত্ত্বার যে বিভাজন উন্মোচিত হয় তা আত্নতা-মন বা চৈতন্য বা মতির কেন্দ্রবিন্দু, এবং বান্দা বা কর্তার সচেতন স্বীকারোক্তি, তার আচরণ ও সংস্কৃতি এর মধ্য ঘটে থাকে’। এখানে দেখা যায় যে লাকাঁর মতে বিভাজন ঘটছে সত্ত্বার, মন বা ‘মতি’র নয়। তাছাড়া সাইকোঅ্যানালিসিসকে ‘মতিবিভাজন’ বললে (বিশেষ করে লাকাঁনিয়ান পদ্ধতিতে) তা অসম্পূর্ণ হয়। সেখানে বাদ পড়ে যায় আত্নতা, বান্দা বা কর্তা, আচরণ এবং সংস্কৃতি। আমরা যদি এ বিষয়গুলোকে ধারণ করার মতো জুতসই শব্দ না পাই, প্রয়োজনে সাইকোঅ্যানালিসিস-ই বলি, তাতে তো কোন ক্ষতি নেই। ‘সাইকি’ এর বাংলা ‘মতি’ বলার আরেকটা সমস্যা হতে পারে। পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রে আমি কোন জ্ঞান-উপদেশ বয়ান না করে (তা আমার সাধ্যের বাইরে) বলতে চাই যে কতগুলি সাধারণ নিয়ম যেমন মূল শব্দটির মানে, তার প্রয়োগ, নিজ ভাষায় তার মানে ও প্রয়োগ ও সংস্কৃতি বিবেচনায় নেয়া জরুরি মনে করি। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বা আমেরিকান বিশেষজ্ঞগণ মানসিক রোগের যে তালিকা দিয়েছেন তাতে অনেক রোগই আছে যার সংগে ‘মতি’র কোন প্রত্যক্ষ যোগ নেই। তাছাড়া বাংলা ভাষায় ‘মতি’র ব্যবহার যেমন ‘মতিভ্রষ্ট’, ‘মতি-গতির ঠিক নাই’, ‘মতি-ভ্রম’ ইত্যাদির সঙ্গে নেতিবাচক দ্যোতনা (কনোটেশন) জড়িয়ে আছে যা মানসিক রোগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক স্টিগমা আরও বাড়িয়ে দেবে। যেমন, কেউ কি বলবেন একজন প্রতিবন্ধী শিশুকে যে ‘একজন মতিরোগী’ এসেছে? অথচ একজন প্রতিবন্ধী (মতিরোগের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত) শিশুর চিকিৎসা করেন একজন ‘সাইক্যায়াট্রিস্ট’ (‘মতিরোগ’ বিশেষজ্ঞ?)। তারপরও পরিভাষা নিয়ে এই বিচারের ভার আমি ভাষা-বিজ্ঞানী, ভাষার অর্থশাস্ত্রবিদ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী (শুধু চিকিৎসক নন) তাঁদের ওপর ন্যস্ত করে আমার মূল আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি।
লাকাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়েই কয়েকপ্রস্থ লেখা যেতে পারে, তবু সংক্ষেপে কতগুলি মৌলিক বিষয় খোলাসা করার চেষ্টা করছি। লাকাঁ তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি ধার করেছেন ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, গণিতশাস্ত্র এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে। যেমন ফ্রয়েডের আবিস্কার করা অজ্ঞান মন, ইদিপাস কম্পপ্লেক্স, অবদমিত কামনা ইত্যাদি সবই আছে, কিন্তু লাকাঁ তাঁর ব্যাখ্যায় এদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো একেবারে পালটে দিয়েছেন এবং তা দিয়েছেন আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের (ষ্ট্রাকচারালিজম) মধ্য দিয়ে। লাকাঁ তাঁর ‘মিরর স্টেজ’ বা আয়নার ব্যাখ্যা করেন যা দিয়ে প্রাচীন বিশ্নেষণমূলক তত্ত্বে তাকে বলা হয় ‘ইমাগো’। যেমন একটি শিশু নিজেকে যখন আয়নায় দেখে, সে দেখে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিশেবে- যার হাত, পা, মাথা সব আছে। সে নিজেকে তুলনা করতে পারে আরেকজন পরিণত মানুষের সঙ্গে। কিন্তু সে যখন হাঁটতে যায় এবং পারে না, কিম্বা সে বুঝতে পারে তার অসম্পূর্ণতা, তা তাকে পীড়া দেয়, তাড়িত করে এবং সে তখন নিজেকে নিজের থেকে আলাদা করে নেয়। এই আলাদা করার আরেক নাম অ্যালিয়েনেশন । এখানে অবশ্যই বলে নেয়া উচিত যে এই অ্যালিয়েনেশন-এর তাত্ত্বিক ভিত্তি লাকাঁর নয়, তিনি ধার করেছেন মার্ক্স, হেগেল ও কোজেভ-এর দার্শনিক তত্ত্ব থেকে। এই আলাদা করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তার বেড়ে ওঠার জন্য। একে হয়তো ‘স্ববিচ্ছিন্নতা’ বলা যেতে পারে। এই আলাদা করতে গিয়ে কেউ কেউ খেই হারিয়ে ফেলে- কখনও স্বপ্নময়তায়, কিম্বা অলীক কল্পনায়, বা হ্যালুসিনেশনে। এইখানেই বীজ রোপিত হতে পারে কোন কোন মানসিক রোগ বা মেন্টাল ডিসঅর্ডারের। (এখানে যা বললাম তাও খুব সংক্ষেপে বলা, লাকাঁ, এক্রি, পৃষ্ঠা ২-৫, ১৯৪৯)।
এখানে শিশু নিজেকে আয়নায় দেখছে ভাষার সিগনিফায়ার (পদ) এর মতো আর নিজের প্রতিকৃতির অর্থ খোঁজার চেষ্টা করতে থাকে ‘সিগনিফায়েড’ হিসেবে। এখানে শিশুর মনের অবস্থা পোস্ট-স্ট্র্রাকচারালিজমের সমস্যার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে যে ভাষা আর বাস্তবতা খুব সহজে সমসুরে বাধা থাকে না। লাকাঁ এই ব্যাখ্যার মাল মসলা ধার নিয়েছেন সুইস ভাষাতাত্ত্বিক, স্ট্র্রাকচারালিজম এর প্রবক্তা ফারদিনাঁ সস্যুর এবং রোমান ইয়াকবসন থেকে। শিশু যখন বড় হতে থাকে তখন সে দুটো জিনিস লক্ষ্য করে, বাবার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে তার যৌন-পার্থক্য (ছেলে বা মেয়ে) এবং বুঝতে শেখে ভাষা, যেমন কান্না তার কাছে একটি সংকেত (সিগনাল), প্রতীক (সাইন) নয়- যা দিয়ে সে জানান দিতে পারে তার প্রয়োজন (ক্ষুধা, অস্বস্তি ইত্যাদি)। যখন সে একটি প্রতীককে বুঝতে পারে তখন এটাও বুঝতে পারে যে একটি প্রতীকের তখনই কোন মানে হয় যখন তা অন্য কোন প্রতীক থেকে আলাদা। কাল্পনিক (ইমাজিনারি), প্রতীকী ব্যঞ্জনা (দ্য সিমবোলিক) এবং ভাষার বাইরে বর্ণনাতীত বা অনির্বচনীয় (দ্য রিয়েল) ও লাঁকার পদ্ধতিতে জায়গা করে নেয়। সাস্যুরের ভাষাবিজ্ঞানে সিগনিফায়ার হলো ‘সাউন্ড’ আর সিগনিফায়েড হলো ‘থট’, বাংলায় হয়তো ‘শব্দ বা শ্রুতি’ ও ‘দৃশ্যকল্প’ বলা যায়। যেমন জীবনানন্দের ‘পাখির নীড়’ (সিগনিফায়ার) বললে সঙ্গে সঙ্গে যে অপেক্ষা ও প্রশান্তির দৃশ্যকল্প (সিগনিফায়েড) ভেসে ওঠে । কিন্তু তাতেও সব বলা হয় না, এই শব্দ ও ভাবের সম্পর্ক চিরকালই বিমূর্ত। ইয়াকবসন বলেন এই শব্দের (সিগনিফায়ার) অন্তর্বর্তী সম্পর্ক হতে পারে রূপক অর্থে (মেটাফোরিক) অথবা স্ব-দ্যোতনায় (মেটোনাইমিক) বা শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক হিসেবে। অন্য প্রসঙ্গে আমি আগেও অন্যত্র লিখেছি যেমন কবিতায় প্রেমিকার চোখ নিয়ে একজন লিখছেন ‘মুক্তাশুভ্রদশর্নরাজি অপাঙ্গ বিস্তৃত আঁখিকমল’, একজন লিখছেন ‘আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্রের মতো মারাত্নক তোমার চোখ’, বা ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’, এখানে চোখ চোখই থেকে যাচ্ছে, কিন্তু পালটে যাচ্ছে শব্দের কারুকাজ, আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যাচ্ছে দৃশ্যকল্প বা ইমেজ বা ভাবনা যা জাগতিক বস্তুর বাইরে তৈরি করছে অন্য কোন জগৎ। এই শব্দগুলোই সিগনিফায়ার আর দৃশ্যকল্প বা ভাবনা সিগনিফায়েড।
এখানেই ভাষার অনন্য ক্ষমতা কোন কিছুর কাঠামো পালটে দেয়ার। শিশুর বেড়ে-ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতে থাকে তার ‘অজ্ঞান’ মন । এক সময় যা ছিল শুধু ছবি, একটি বস্তু অথবা ছোট্ট অভিজ্ঞতা যেমন মায়ের স্তন, স্পর্শ, আদর তা একসময় হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় মানে শিশু ভুলে যায়। শুধু রয়ে যায় অস্পষ্ট অভিঘাতের নকশামালা-এই অভিঘাতগুলো এখানে সিগনিফায়ার। ব্যক্তির ‘অজ্ঞান’-এ জমে থাকে এই অভিঘাতগুলোর সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা যার প্রকৃতি দরজার খিল-আঁটার মতো আলাদা করে রাখে চেতন মনের সতর্কতা থেকে। শিশু জানে এই মায়ের শরীর তার নয়, তাই সে তার কামনাগুলো অবদমিত রাখে। লাকাঁর মতে মানুষ যেন এই কামনার দাস। আর এই কামনা অশেষ, চক্রাকার-যেখানে শেষ সেখানেই তার শুরু। যেমন কামনা না করতে চাওয়া তো আরেকটি কামনা। কি মজার! লাকাঁ বলেন ‘ম্যান’স ডেজায়ার ইজ দ্য ডেজায়ার অব আদার্স’। এই ‘আদার’ তিনি ধার করেছেন দার্শনিক হেগেল ও কোজেভ থেকে, যা ফ্রয়েডও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এর মানে দুইরকম: পর (দ্য আদার পারসন) এবং পরের মতো (আদারনেস)। এমনকি পরের আকাঙ্ক্ষাও তার আকাঙ্ক্ষা হতে পারে। এই অবদমিত কামনা বা আকাঙ্ক্ষাই নির্ধারণ করে দেয় আমরা মানুষ হিসেবে কে কেমন। লাকাঁর মতে এই অজ্ঞান মন যেন ভাষার মতোই শূন্যতায় ভরা। ভাষা যেমন কোন কিছুর অর্থের পার্থক্য খোঁজা আর যা নেই তার অস্তিত্ব খোঁজার এক শেষহীন প্রক্রিয়া, তেমনি মানুষের অজ্ঞান মন ক্রমাগত এই ‘অধরা’, স্পর্শহীনকে খুঁজে বেড়ায়।
এই যে সংক্ষেপে পৃথিবীর একজন অন্যতম, সমকালীন দার্শনিকের তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিলাম, আমি এখানে সেই দার্শনিক লাকাঁর সঙ্গে লালনের ভাব ও দর্শনের অভূতপূর্ব মিল খুঁজে পাই; লালন বলেন,
‘বাড়ির পাশে আরশি নগর / সেথা এক পরশি বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’।
সেই পরশিই যেন ‘আদার পারসন’ অথবা আমাদের নিজস্ব ‘আদারনেস’। কিন্তু লাকাঁর তত্ত্বজ্ঞানে জটিলতার এখানেই শেষ হয় না। তিনি বলেন মানুষের অজ্ঞান মন যেন এই ভাষার ‘সিগনিফায়ার’-এর মতো অসংখ্য শিকল তৈরি করে যার ‘সিগনিফায়েড’ বেশীরভাগ সময়েই ‘অধরা’ থেকে যায়, কারণ তা সেই শিশুকাল থেকেই অবদমিত। ‘সিগনিফায়েড’গুলো পিছলে লুকিয়ে যায় ‘সিগনিফায়ার’-এর তলে। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন আমরা যা বলি কখনই তা কাটায় কাটায় নির্ভুলভাবে বোঝাই না, বা যা আমরা বোঝাই তা কখনও কাটায় কাটায় নির্ভুলভাবে বলি না। এই চাপা-থাকা অনেক কিছুই রয়ে যায় আমাদের অজ্ঞান মনে। কখনও অজ্ঞান মন থেকে আসল অর্থ নিজের অনিচ্ছাতে বের হয়ে আসতে পারে, যাকে বলা হয় ফ্রয়েডের বিখ্যাত ‘স্লিপ অফ দ্য টাং’। এভাবে ‘সিগনিফায়ার’গুলোর তলে ‘সিগনিফায়েড’-এর লুকিয়ে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লাকাঁ পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘ সময় জড়িয়ে থাকা ইউক্লিডিয়ান ধারণা যে একই শূন্যতায় দুটি বস্তু বা ‘পদার্থ’ একসঙ্গে থাকতে পারে না, তাকে একেবারে গুড়িয়ে দেন। বিষয়টি আমি খোলাসা করতে চাই বাংলায় একটি ধাঁধাঁ দিয়ে।
‘হরির ওপরে হরি হরি শোভা পায়, হরিকে দেখিয়া হরি হরিতে লুকায়’ -এর মানে কি? এখানে ‘হরি’ বিষ্ণু বা নারায়ণের এক নাম আবার ‘হরি’ দিয়ে অন্য দুই দেবতা ও বহুবিধ জিনিসকে বোঝাবার রীতি ছিল। যেমন: জল, পদ্মপাতা, ব্যাঙ, সাপ, কোকিল, সিংহ ইত্যাদি। তাহলে এই বাক্যের অর্থ হতে পারে,
‘জলের ওপরে পদ্মপাতায় ব্যাঙ শোভা পায়, সাপকে দেখে ব্যাঙ পানিতে লুকায়’।
এখানে জলের ওপরে পদ্মপাতা তার ওপরে ব্যাঙ ইত্যাদি পদার্থ আলাদা আলাদা অবস্থান করছে। লাকাঁর মতে এবার অর্থগুলো এক করে দিলে কী হয়? ’
‘জলের ওপরে জল, জল শোভা পায় জলকে দেখে জল জলেতে লুকায়’।
লালন যেমন আরও বলেন,
‘গেরাম-বেড়ে অগাধ পানি/ ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে।
বলবো কি সেই পড়শির কথা/ ও তার হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাইরে
ও সে ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর / আবার ক্ষণেক ভাসে নীরে।
এভাবে একই শূন্যতায় একাধিক পদার্থ থাকতে পারে, যা লাকাঁ ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর বিখ্যাত রেলস্টেশনের জানালা দিয়ে দেখা দুটি ‘বাথরুম’-এর দরজা দিয়ে। একজন দেখছে একই জায়গায় দরজায় লেখা ‘জেন্টলমেন’ অন্যজন দেখছে একই জায়গায় দরজায় লেখা ‘উইমেন’। লাকাঁর পদ্ধতির অনেক কিছুই পরাবাস্তবতার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যা লাকাঁর ক্ষেত্রে দুর্বোধ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। লাকাঁকে বুঝতে হলে তাই মনোবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, দর্শন, গণিতশাস্ত্র চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন। লাকাঁর সাইকোঅ্যানালিসিস পদ্ধতি শুধু চিকিৎসায় নয়, বরং শিল্প-সাহিত্য বিশ্লেষণে ব্যবহার করা যায়, এখানেই হচ্ছে তাঁর দার্শনিক অভিধা, নান্দনিক ব্যাপ্তি। লাকাঁ আধুনিক জ্ঞানের ভান্ডারে নতুন করে খোরাক জোগান, একই সঙ্গে তৈরি করেন নতুন বিতর্কের। লাকাঁকে আরও পরিপূর্ণভাবে বুঝতে হলে তাঁর সমসাময়িক তাত্ত্বিক যেমন দেরিদা, আলথুসার, ফুকো, ও দেলুজকে আলোচনায় আনা জরুরি। লাকাঁর অনিবার্যতা, তাঁর সঙ্গে সমসাময়িকদের, সম্ভবত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তাত্ত্বিকদের বিরোধ ও সন্ধি নিয়ে একালের ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান। আর একালের ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানের খোলা দরজায় ঢুকতে হবে লাকাঁর হাত ধরেই। অথচ বাংলা ভাষায় ও বঙ্গদর্শনে এই হাত ধরার সমস্ত আয়োজন রেখে গেছেন লালন সাঁই, যার ভাবদর্শন ও পদ্ধতিকে মূল্যায়নের পরিবর্তে ঝেটিয়ে বিদায় করছি আমরা জাতীয়ভাবে। এজন্যেই চিৎকার করে বলতে হয়, লালনকে কে বাঁচাবে?

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ওমর শামস — অক্টোবর ২০, ২০১৬ @ ১১:১৩ অপরাহ্ন

      ধান ভানতে শিবের গীত। // ফ্রয়েড লাকাঁ-য় লালন চিত ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেজান মাহমুদ — অক্টোবর ২১, ২০১৬ @ ৫:০০ অপরাহ্ন

      মেধায় ধারণ সীমিত যার
      পার মনে হয় ভীষণ অপার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ZAHIRUL ISLAM — অক্টোবর ২৪, ২০১৬ @ ২:২২ অপরাহ্ন

      Dear Mr. Mahmud,

      Thank you for the article. I am wondering whether you have ever noticed or read the article written by Salimullah Khan with similar title and analysis almost 15 years ago. Perhaps wise people think alike.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেজান মাহমুদ — অক্টোবর ২৬, ২০১৬ @ ৯:৩৩ পূর্বাহ্ন

      ভাই জহিরুল, আপনি যেহেতু প্রসঙ্গটি তুললেন তাই দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনার হিসাবের ১৫ বছরের কথা মতো ২০০২ সালে লাকাঁ নিয়ে কোন লেখা আমি পড়িনি। কিন্তু ২০০৭ সালে লাকাঁ কে নিয়ে ওনার প্রথম লেখা “তত্ত্বজ্ঞান ও মতিবিভাজন” (প্রথম আলোতে প্রকাশিত) লেখার কোথাও লালনের নামও ছিল না। সেই লেখার সমালোচনা করে আমি যখন “তত্ত্বজ্ঞান ও মতি বিভাজনের অঙ্গ বিভাজন” লিখলাম (দুটো লেখাই প্রথম আলোতে আছে), সেখানেই প্রথমে লালনের ‘আরশি নগরের পড়শি’ কে ব্যাখ্যা করলাম লাকাঁ দিয়ে, কিম্বা লাকাঁ কে ব্যাখ্যা করলাম আরশি নগরের পড়শি দিয়ে। তারপর দেখলাম তিনি আস্ত একটা চ্যাপ্টার লিখে ফেলেছেন লাকাঁ ও আরশি নগরের পড়শি নিয়ে তাঁর বইতে। এগুলো শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। কারণ, লাকাঁর ইন্টারপ্রিটেশন একটি মৌলিক কাজ। আপনারা এর সত্যতা জানতে চাইলে আমি টাইম লাইন দিয়ে লেখাগুলো এখানে কপি করে দিতে পারি। তবে যদি ২০০২ সালে (১৫ বছরের আগের হিসাবে) যদি তিনি লিখে থাকেন তবে অন্য কথা (যদিও তার সম্ভাবনা কম) কারণ যে গ্রন্থ নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘এক্রি দ্য কমপ্লিট এডিশন’ ইংরেজিতে আমাদের হাতে আসে ২০০৬ সালে। সুতরাং আপনিই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কিভাবে কী ঘটে থাকতে পারে। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ZAHIRUL ISLAM — অক্টোবর ২৭, ২০১৬ @ ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন

      Dear Mahmud Bhai,

      Salimullah Khan wrote this article in 2001 and it was published in a national daily and then reprinted in a little magazine titled Ocheton, published in 2001 by World Literature Centre and fortunately I was the editor. Later this article was included in his book, Ami, Tumi, She. It is also worth to mention that the french edition of Écrit was available to Salimullah Khan at that time including most of the published seminars of Lacan. Many of us went to Alliance Française to read Lacan in French inspired by Salimullah Khan. Moreover he has been offering series of seminars on Lacanian concepts since 2001 which was one of the most exciting intellectual events in Dhaka. I appreciate your interest in Lacan and I welcome you to the Lacanian universe. You are my Lacanian brother but Salimullah Khan is the founding father of the Lacanian school in Dhaka. We should not hesitate to acknowledge the pioneer.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেজান মাহমুদ — অক্টোবর ২৭, ২০১৬ @ ৫:০০ অপরাহ্ন

      Me. Zakirul Islam, He wrote about Lacan long before but show me the article where he mentioned about Arshi Nagarer
      Porshi and interpreted through Lacanian concepts. My point is not about whether he wrote about Lacan but specific interpretation. The article published in daily, the one I critiqued has no mention of Lalon.
      If you can shade some lights, please feel free to do so.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ZAHIRUL ISLAM — অক্টোবর ২৮, ২০১৬ @ ১১:১৬ অপরাহ্ন

      Dear Mahmuud Bhai,

      I am sending you the article of Salimullah Khan titled Arshinagar kemon shohor othoba Freud er abishkar o mohatma Lalon Fakir which was published in 2001 where he interpreted the concept of Porshi and Arshinagar through Freudian lacanain concepts. I will search you on Facebook and send you the photographic image of each page of the article directly from the Ocheton published in 2001.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেজান মাহমুদ — অক্টোবর ২৯, ২০১৬ @ ২:৫৩ অপরাহ্ন

      ভাই জহিরুল, আপনাকে আমি উত্তর দিয়েছি লেখাটা পড়ে। লেখার শিরোনাম থেকে এবং আপনার ম্যাগাজিনের মূল বিষয় থেকেই বোঝা যায় যে তিনি লালনের কথা বলেছেন মূলত ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সেখানে লাকাঁর কথা উল্লেখ মাত্র। এই লেখাটির বিষয়বস্তু লাকাঁ না। বরং প্রথম আলোতে প্রকাশিত লেখাটিই লাকাঁ নিয়ে তাঁর প্রথম লেখা। সেখানে এই একই লাকাঁনিয়ান ধারনাকে তিনি রাধা-কৃষ্ণের অনুষঙ্গে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। যার উত্তরে আমি বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছি যে তাঁর ইন্টারপ্রিটেশন প্রশ্ন সাপেক্ষ, এমন কি মূল ধারণা গুলো রীতিমতো উলটাপালটা হয়ে গিয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সম্মান করি এবং মনে করি সেই সময়ে ঐ লেখাকে কেন্দ্র করে তাঁর আচরণ রীতিমত অপেশাসুলভ ছিল। অনেকেই আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্যন্ত করেছিলেন। কিন্তু এগুলো একেডেমিক আলোচনা এবং এখানে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। হ্যাঁ, ভাই আবারো বলছি, আপনার পাঠানো লেখার শিরোনাম-ই বলে দিচ্ছে যে ওটা মূলত লালন এবং ফ্রয়েডের আবিষ্কার, লাকাঁর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছিল না।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com