বব ডিলানের সাক্ষাৎকার: আবেগ তারুণ্যে মানায়, প্রজ্ঞা প্রবীণে

আবদুস সেলিম | ১৮ অক্টোবর ২০১৬ ১০:৫২ অপরাহ্ন

bob-4বব ডিলান এই সাক্ষাৎকার দেন তার ‘শ্যাডো ইন দ্য নাইট’ প্রকাশনা কালে যেখানে তিনি শিল্পের প্রকাশশৈলী এবং ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলেন এবং তার জীবন ও দর্শনের উপর প্রভাব বিস্তারকারী দুর্লভ অন্তর্দৃষ্টির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। রবার্ট লাভ-এর নেয়া এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল Independent পত্রিকায় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। এটি বাংলায় তর্জমা করেছেন অধ্যাপক অনুবাদক আবদুস সেলিম। বি. স.
প্রশ্ন: সমালোচক-প্রশংসিত একাধিক মৌলিক গানের পর আপনি এই রেকর্ডটি কেনো প্রকাশ করলেন?
উত্তর: এটাই তো সঠিক সময়। সত্তর দশকের শেষা-শেষি উইলি (নেলসনের) ‘স্টারডাস্ট’ রেকর্ড শোনবার পর থেকেই বিষয়টা নিয়ে আমি ভাবছিলাম। ভাবছিলাম আমিও তো এমন একটা কাজ করতে পারি। তাই দেখা করতে গেলাম কলাম্বিয়া রেকর্ডস-এর প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার ইয়েটনিকফের সাথে। খুলে বল্লাম তাকে যে আমি উইলির মতো একটা মানসম্পন্ন রেকর্ড বের করতে চাই। সে বল্লো: করুন, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আপনাকে আমরা কোনো পারিশ্রমিকও দিতে পারবো না এবং তা বাজারজাত করতেও সাহায্য করতে পারবো না। তবুও যদি চান করতে পারেন। ফলে ওটা বাদ দিয়ে আমি স্ট্রিট লিগাল করলাম। এখন বুঝি ঈয়েটনিকফ সম্ভবত সঠিকই ছিলো। মানসম্পন্ন রেকর্ড করার সময় তখনও আমার হয় নি।
বছরের পর বছর আমি অন্যের গাওয়া ঐসব গান শুনেছি আর অমন গান করার জন্যে অনুপ্রাণিত হয়েছি। অন্যরাও আমার মতো ভাবতো কিনা জানি না। রড [স্টুয়ার্টের] মানসম্পন্ন গান শুনতে আমি বেশ উৎসাহী ছিলাম কারণ আমি বিশ্বাস করতাম ঐসব গানের ভেতর যদি কেউ কোনো পরিবর্তন আনতে পারে সে কেবল রডই পারবে। কিন্তু রড আমাকে হতাশ করেছে। রড এক মহান গায়ক কিন্তু ৩০টা অর্কেস্ট্রা পেছনে বসিয়ে রডকে গান করানো সম্পূর্ণ ভুল। আমি কারও উপার্জনের অধিকার খর্ব করতে চাই না। কিন্তু কোনো গায়ক তার হৃদয় দিয়ে গান গাইছে কিনা সেটা সহজেই বোঝা যায়। আর রড যে তার মনপ্রাণ সংযোগ করে গানগুলো গায়নি সেটা আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে। গানগুলো শুনলে মনে হয় কণ্ঠস্বরকে রেকর্ডে উচ্চারিত করে সংজোযন করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ঐজাতীয় গান কখনও ভাল হয় না।
আমরা যেসব গানের সাথে বেড়ে উঠেছি এবং বিষয়টা নিয়ে তেমন ভাবতি হইনি, বেশ জানি রক এন রোল ঐ জাতীয় গানকেই বিনাশ করতে এসেছিল–যেমন, মিউজিক হল, ট্যাংগো, চল্লিশের দশকের পপ গান, ফক্সট্রটস, রাম্বাস, আরভিং বার্লিন, হ্যারল্ড আরলেন, হ্যাম্যারস্টেইন। এরা সবাই খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। আজকের গায়করা এসব গীতবাদ্য ও গানের কথা ভাবতেও পারে না।

শেষ পর্যন্ত আমরা যখন রেকর্ড করতে গেলাম আমার নির্বাচনে ছিলো ৩০টি গান যার মধ্যে এই রেকর্ডের দশটি এক বিশেষ নাটকীয়তার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি গানই কোনো না কোনোভাবে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত। শব্দ পরীক্ষণ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন মঞ্চে গানগুলো আমরা বারবার বাজিয়েছি কোনো বাচনিক মাইক ছাড়াই এবং দেখা গেছে সবাই সব গানই স্পষ্ট ও আলাদাভাবে শুনতে পেরেছে। এসব গান সাধারণত পরিবেশিত হয় পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্কেস্ট্রার মাধ্যমে। কিন্তু আমি পরিবেশন করেছি মাত্র পাঁচপ্রস্থ ব্যান্ডের মাধ্যমে–অর্কেস্ট্রার অভাব মোটেও অনুভব করিনি। অবশ্য কোনো এক প্রযোজক এক বলতেই পারতো: “তারের বাদ্যযন্ত্রগুলো এপাশে আর বাতাসের যন্ত্রগুলো ওপাশে রাখাল ভাল হয়।” কিন্তু আমি তা করতাম না। আমি কি বোর্ড কিংবা গ্র্যান্ড পিয়ানোও ব্যবহার করতাম না। পিয়ানো শুধু বিশাল জায়গা জুড়েই থাকে না, বরং এধরনের গানের উপর অযথা কর্তৃত্ব খাটাতে চায় যা আমি মোটেও পছন্দ করি না।
প্রশ্ন: আপনার পুরোনো ভক্তদের কাছে গানগুলো কিছুটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, তাই না?
উত্তর: হওয়া উচিৎ না। আমি এ পর্যন্ত অনেক ধরনের গানই গেয়েছি। আমার স্ট্যানডার্ড গানও তারা শুনেছে।
প্রশ্ন: গানগুলোর মধ্যে বেশ কটি আপনার ছেলেবেলা থেকেই জানা, তাই না? বেশ কিছু গান অনেক পুরোনোও।
উত্তর: হ্যাঁ, জানা। আমার পছন্দের গান আমি কখনও ভুলি না।
প্রশ্ন: আপনার গান করার ধারাটা ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর: একবার গানটা জানা হয়ে গেলে খুঁজে দেখতে হয় অন্যরা গানটা কিভাবে গেয়েছে। এক গান থেকে অন্য গান শুনতে শুনতে আমরা মেলাতে ও আলাদা করতে থাকি এবং একসময় এক সমীকরণ মাত্রায় পৌঁছায়। যেমন হ্যারি জেমস্ কিংবা পেরেজ প্র্যাডোর ধারাও শুনেছি অনেকবার। আমার পেডাল স্টিল-বাদক যে কোনো সুর তোলায় অসাধারণ। সে সহজ সাধারণ থেকে কঠিনতম সুর বাজাতে ওস্তাদ। মাত্র দু’টো গিটার আছে আমাদে– তারমধ্যে একটাই শুধু পালস বাজায়। স্ট্যান্ড-আপ ব্যাস সম্মিলিত সুরের তালটা ধরে রাখে। অনেকটা লোক সঙ্গীতের মতো। মানে যেমন বিল মনরোর ব্যান্ডে কোনো ড্রাম নেই। হ্যাংক উইলিয়মসও ড্রাম ব্যাবহার করতো না। অনেক সময়ই ড্রামের শব্দ ছন্দের রহস্যময়তাকে নষ্ট করে। আমি এই গানগুলো শুধু একভাবেই রেকর্ড করি, আর সেটা হলো ফ্লোরে খুবই অল্প সংখ্যক মাইক্রোফোনের মাধ্যমে। হেডফোন, ওভারডাব, ভোকাল বুথ, এবং আলাদা ট্র্যাকিং ছাড়া। আমি জানি পদ্ধতিটা খুবই পুরোনো, কিন্তু ঐ ধনের গানের জন্যে এই পদ্ধতিটাই সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হয় আমার। কণ্ঠসঙ্গীত রেকর্ড করার সময় আমি মাইক্রোফোন থেকে ছয় ইঞ্চি দূরে থাকি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রেকর্ড করার সময় কালেই একাধারে মিক্স করা হয় যাকে বলে বোর্ড মিক্স। আমরা গানটা ইঞ্জিনিয়রকে কয়েকবার গেয়ে শোনাই। তারপর সে নিজেই মাইক্রোফোনগুলো জায়গা মতো স্থাপন করে। তাকে বলাই থাকে, সে যতবার শুনতে চায় আমরা শোনাতে রাজি। এভাবেই প্রতিটা গান আমরা করি।
প্রশ্ন: পুরো পদ্ধতিটাই ভীষণ আন্তরিক পরিবেশে হয়। আপনিও বোধহয় সেটাই চান।
উত্তর: একদম ঠিক। এই গানগুলো আমরা ক্যাপিটাল স্টুডিওতে রেকর্ড করেছি যেটি এধরনের রেকর্ডিংয়ের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী। আমরা কিন্তু কোনো আধুনিক বা নতুন যন্ত্র ব্যাবহার করিনি। ইঞ্জিনিয়রের পুরোনো দিনের কিছু যন্ত্রপাতি পড়েছিলো। সে-ই ওগুলো খুঁজে খুঁজে এনেছিলো।
প্রশ্ন: আপনিই কি গানগুলো সাজিয়েছিলেন?
উত্তর: না। মূল তালিকায় ৩০টা গান ছিল। সবগুলো আমরা মেলাতে পারিনি। আর তেমন চেষ্টাও করিনি। যেটা আসলে করতে হয়েছিলো সেটা হলো গানগুলোর চালিকাশক্তির মূল অনুসন্ধান করা। ফলে শুধুমাত্র ঐ প্রয়োজনীয় অংশগুলোই আমরা নিয়েছি। এসব ক্ষেত্রে নিজের সহজাত প্রজ্ঞার উপর আস্থা রাখতে হয়।
প্রশ্ন: আপনি কি একই গানের একাধিক ভাষ্য শোনার পর সব ছেড়ে-ছুড়ে আপনার স্বাদবোধকে সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে একান্ত নিজের ভাষ্য সৃষ্টিতে উদ্যোয়ী হন?
উত্তর: বলতে কি আপনিতো জানেনই এসব গান দীর্ঘ সময় ধরেই গাওয়া হয়েছে। আমি সেই গানগুলোই নির্বাচন করি যেগুলো সবাই জানে কিংবা মনে করে জানে। আমি তাদেরকে একটি নতুন দিকে নিয়ে যেতে চাই, দেখাতে চাই ঐ গানগুলোর আরও এক অনন্য বিশ্ব আছে। বোঝাতে চাই গানের শব্দগুলোতে বিশ্বাস করতে হবে এবং ঐ শব্দগুলো সুরেরই মতো সমান তাৎপর্যপূর্ণ। গানে বিশ্বাস এবং তার সাথে নিজেকে মেলাতে না পারলে গান গাওয়ার কোনো অর্থ নেই। যেমন ঐ গানটা “সাম এনচ্যানটিং ঈভনিং” কিংবা “অটাম লিঈভ্স্”। গানদুটো গাইলেই ভালবাসা আর হারাবার এক গভীর অনুভূতি স্পর্শ করে। এমন না হলে গান গাইবার কোনো যুক্তি নেই। গভীর একটি গান। স্কুল পড়ুয়া কোনো ছেলে এ গান গাইতে পারবে না। সবাই ফ্র্যাংক [সিনাত্রা]র গল্প করে। করাই তো উচিৎ। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ নির্বাচক। সবাই যেভাবে ভাবতো উনি সেভাবে কখনই ভাবতেন না। তার নির্বাচন ছিলো সর্ব অর্থে মগ্নচৈতন্যের। একাজ তিনি সহজেই করতে পারতেন কারণ তিনি গল্পের মতো সহজ পথে গানের গভীরে ঢুকে যেতেন। আজকের যুগের পপ গায়কদের মতো ফ্র্যাংক শ্রোতার উদ্দেশ্যে গান গাইতো না, শ্রোতাকে গানের ভেতর নিয়ে যেতো। স্ট্যান্ডার্ড গানের গায়করাও পপ-গায়কদের মতোই। আমি কখনই শ্রোতার জন্যে গান গাইতে চাইনি। আমি শ্রোতাকে সাথে নিয়েই গইতে চেয়েছি। ফ্রাংক-এর কাছে ঐ নিমগ্নতার শিক্ষা অনেক আগেই আমি পেয়েছি।
Bob-1প্রশ্ন: সবাই যাকে আ্যমরিকান সংবুক বলে গানগুলোকে সেই সুবিস্তৃত ধাারারই বলে মনে হয়। লক্ষ্য করেছি ফ্র্যাংকও ঐ ১০টি গান রেকর্ড করেছিলেন। গানগুলো করার সময় আপনার কি তাঁর কথা মনে ছিলো?
উত্তর: একটা কথা বলি। এ গানগুলো গাইলেই ফ্র্যাংক-এর কথা আপনার মনে আসতে বাধ্য। কারণ তিনি তো এক পর্বত। ঐ পর্বতেই তো আপনাকে আরোহন করার চেষ্টা করতে হবে– যতটুকু উপরেই উঠুন না কেনো। এমন কোনো গান নেই তিনি করেননি। তিনিই একমাত্র গায়ক যার সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে আপনি যে গানটা করছেন সেটি তিনি গেয়েছেন কিনা।
প্রশ্ন: ষাটের দশকে ফ্র্যাংক-এর “এব টাইড” ভাষ্য কিভাবে আপনাকে আক্রান্ত করেছিলে। তার কথা অপনি লিখেছিলেন। কিন্তু সেই তিনি এও বলেছিলেন, ঐ ধরনের গান আমি শুনতে পারতাম না। গানটা সময় উপযোগী ছিলো না।”
উত্তর: একদম ঠিক। আমার অতীতে এমন ঘটনা একাধিক ঘটেছে। অনেক কিছুই আমি বাদ দিয়ে আমার নিজের পথে চলেছি। আমার একান্ত নিজস্ব একটা বিশ্ব আছে যাকে নিয়ে আচ্ছন্ন থাকি যে বিশ্ব আর কারও নয়। “এড টাইড” এমন একটা গান যার সাথে আমি পেড়ে উঠেছি। এটা একটা হিট গান, পপ গান। রয় হ্যামিল্টনও গানটা গেয়েছে–রয় এক অসাধারণ গায়ক। গানটাও গেয়েছে রাজকীয় গায়কীতে। ফলে গানটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় রয়ের মাধ্যমেই। পরে ফ্র্যাংক-এর গাওয়া “এড টাইড”-এর রেকর্ড শুনি কারো এক বাড়িতে। যদিও গানটা আমি শতাধিক বার শুনেছি কিন্তু ঐ দিন প্রথম যেন মনে হলো এ গান আমি ঠিক শুনিনি। আমি এখনও মনে করি গানটা আমার ঠিক জানা নেই। ফ্র্যাংক যে কিভাবে গানটা করেছেন আমার জ্ঞানের বাইরে। গায়কী আপনাকে সম্মোহিত করে ফেলবে সহজেই। আমি কখনও এমন চূড়ান্ত পর্যায়ের শিল্পকর্ম শুনিনি বলা যায় সর্ববিচারে সর্বোত্তম শিল্প।
প্রশ্ন: সম্ভবত গানটি তাঁর সময়ের বিচারে অতি নিখুঁত বা পরিপূর্ণ হয়েছিল?
উত্তর: নিখুঁত? ফ্র্যাংক সিনাত্রাকে নিখুঁত বা পরিপূর্ণ বলার সাহস ছিল বলে আমার মনে হয় না। বার্ড [চার্লি পার্কার] এবং ডিজি [জিলেসপি]র পাশাপাশি কেরুয়াক তার গানও শুনেছেন। কিন্তু ঐ সময়ে আমি নিজে ফ্র্যাংক সিনাত্রার রেকর্ড কিনি নি–যদি তোমার প্রশ্নের মূল কারণ সেটা হয়ে থাকে। ফ্র্যাংক-এর প্রভাবে আবিষ্ট হয়ে কখনই তার গান আমি শুনিনি। আমি তার গান রেকর্ডে শুনতাম, সব জায়গাতেই সে রেকর্ড শোনা যেত কোনো না কোনোভাবে। বিভিন্ন গান সুইং মিউজিক, কাউন্ট ব্যাসি, রোমান্টিক ব্যালাড, জ্যাজ, ব্যান্ডস্। কোনো একটি নির্দিষ্ট গানে আবদ্ধ থাকা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু যেমন বল্লাম, তাঁর গান না শুনে উপায় ছিলো না–গাড়িতে বসেই হোক কিংবা জিউকবক্সে। বয়স যাই হোক ঐসময়ে ফ্র্যাংক সিনাত্রা আপনার সঙ্গী হতে বাধ্য। অবশ্য চল্লিশের মতো ষাটের দশকে কেউই ফ্র্যাংক সিনাত্রাকে শ্রদ্ধা করতো না। তবে অনেক জিনিসই যেমন আমরা ভাবতাম স্থায়ী হবে, হয়নি। কিন্তু ফ্র্যাংক ঠিকই স্থায়ী হয়েছেন।
প্রশ্ন: এই অ্যালবামটাকে কি আপনি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন? এই গানগুলোর অনেক ভক্ত আছে যারা মনে করতে পারে আপনি সিনাত্রাকে ছুঁতে পারেন নি।
উত্তর: ঝুঁকি? ল্যান্ড-মাইন-পোতা মাঠ হেঁটে পার হবার মতো ঝুঁকি? নাকি বিষাক্ত গ্যাস ফ্যাক্টরিতে কাজ করার ঝুঁকি? রেকর্ড বের করার মধ্যে কোনো ঝুঁকি নেই। ফ্র্যাংক সিনাত্রার সাথে আমার তুলনা? ঠাট্টা করছেন? তাঁর নামের সাথে আমার নাম উচ্চারণ করাটাই তো বিরাট শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। তাঁকে কেউই স্পর্শ করতে পারবে না। শুধু আমি কেনো, কেউই না।
প্রশ্ন: ফ্র্যাংক-এর কাছে এই অ্যালবামটা কেমন লাগতো বলে আপনার মনে হয়?
উত্তর: মাত্র পাঁচ প্রস্থ ব্যান্ড দিয়ে ঐ গানগুলো গেয়েছি দেখে অবশ্যই অবাক হতেন। তবে কোনো না কোনো বিচারে গর্বিতও হতেন।
প্রশ্ন: আর কি ধরনের সঙ্গীত শুনে আপনি বড় হয়েছেন?
উত্তর: প্রথম দিকে, রক এন রোলের আগে, আমি বড়বড় ব্যান্ড মিউজিক শুনেছি। প্রধানত রেডিওতে। তাছাড়া বাবা-মার সাথে হোটেলে গিয়ে ব্যান্ড শুনেছি। আমাদের জিউকবক্সের মতো বিশাল রেডিও ছিলো যার সাথে একটা রেকর্ড প্লেয়ারও ছিলো। পিয়ানোসহ অন্য অনেক আসবাবপত্র আগের বাড়িওলা রেখে গিয়েছিলো। রেকর্ড প্লেয়ারে ৭৮ আরপিএম রেকর্ড বাজতো। আমরা যখন বাড়িটাতে আসি তখন রেকর্ড প্লেয়ারে একটা রেকর্ড চড়ানো ছিলো লাল লেবেল সাঁটা, সম্ভবত কলাম্বিয়া রেকর্ড। রেকর্ডটা সম্ভবত বিল মনরো কিংবা স্টানলি ব্রাদার্সের আর গানটা ছিলো, “ড্রিফটিং টু ফার ফ্রম মোর”। জীবনে এমন সুন্দর গান এর আগে আমি শুনিনি। কখনও না। এই গানটাই আমাকে আমার আগের শোনা গতানুগতিক গান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।
বিষয়টা বুঝতে হলে আপনাকে জানতে হবে আমি কোথা থেকে এসেছি। আমি সুদূর উত্তরের বাসিন্দা। আমরা দিনভর রেডিও শুনতাম। সম্ভবত আমিই শেষ প্রজন্ম কিংবা বলা যায় কাছাকাছি প্রজন্ম যে বড় হয়েছে টেলিভিশন না দেখে। ফলে আমরা রেডিওই শুনতাম। ঐসব অনুষ্ঠানের অধিকাংশই ছিলো নাটক। আমাদের কাছে ঐটাই ছিলো টেলিভিশন। যাকিছু শুনতাম তাই কল্পনায় ছবি হয়ে যেতো। এমন কি যে মানুষের গান শুনতাম তাকে দেখতে না পেলেও কল্পনায় তাকে রূপ দিয়ে ফেলতাম। এমনকি তাদের পোষাক আষাকও স্পষ্ট দেখতে পেতাম মনে মনে– তাদের চালচলন–সব, সব। যেমন জিন ভিনসেন্ট। আমার কল্পনায় তার চেহারা ছিলো লম্বা, ছিপছিপে, সোনালী চুলের তরুণ।
bob-2প্রশ্ন: রেডিও নাটক ছাড়া আর কী শুনতেন?
উত্তর: উত্তরে রেডিও স্টেশনের নাম ডায়ালে লেখা থাকতো না। সেখান থেকে মূলত প্রি-রক-এন-রোল অর্থাৎ কান্ট্রি ব্লুজ প্রচার করা হতো। আমরা স্লিম হারপো বা নাইটনিল স্লিম এবং গসপেল গ্রুপস্, ডিবসি হামিং বার্ডস, ফাইভ ব্লাইন্ড বয়েজ অব অ্যালাবামা শুনতাম। আমার বসবাস এতই উত্তরে ছিলো যে জানতামই না অ্যালাবামাটা কোথায়। এছাড়া অন্যান্য সময়ে জিমি রীড, ইউলনি হ্যারিস, এবং লিটল ওয়াল্টার-এর ব্লুজ শুনতাম, একটা রেডিও স্টেশন ছিলো শিকাগোর বাইরের, সারাক্ষণই পল্লী গ্রামের গান বাজাতো, যেমন রাইলি পাফেট, আঙ্কল ডেভ ম্যাকন, ডেলমোর ব্রাদার্স। প্রতি শনিবার রাতে ন্যাশভিল থেকে প্রচার হতো ওলে অপরি। হ্যাঙ্ক উলামস্ আমার বহু আগে শোনা–তার বেঁচে থাকার সময়েই। ওপরি দলের অধিকাংশই, হ্যাঙ্ক ছাড়া, আমি যে শহরে খেলাধুলা করেছি সেখানকার বাসিন্দা ছিলো যেমন ওয়েব পিয়ের্স, হ্যাঙ্ক স্নো, কার্ল স্মিথ, পোর্টর ওয়াগনার। এদের সবাইকেই আমার সামনেই বড় হতে দেখেছি।
এক রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি রেডিও শুনছিলাম। সম্ভবত স্রেভেপোর্ট, লুজিয়ানার বাইরের কোনো কেন্দ্র। আমি জানতামও না লুজিয়ানাটা আসলে কোথায়। গানটা ছিলো দ্য স্টেপল্ সিংগারদের “আনক্লাউডি ডে”। দারুণ রহস্যময় গান যা আমি আগে কখনও শুনিনি। যেন মনে হচ্ছিলো রহস্যময় এক কুহেলিকা চারদিক ছেয়ে ফেলছে। পরের রাতেও গানটা আবার শুনলাম। মনে হলো আগের চেয়েও রহস্যময়তা ঘণ হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা কী?
এটা কিভাবে সম্ভব? যেন আমার অশরীরি অস্তিত্বের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। বাদ্য যন্ত্রটা কী? ট্রেমলো গিটার? ট্রেমলো গিটারটা কী? আমার ধারণাই নেই। জীবনেও এ যন্ত্র আমি দেখিনি। তালটাও আমার অজানা। গায়ক যেন আমার ভেতর থেকে আমার এক আমাকে টেনে বের করে আনছে। দ্বিতীয়বার শোনার পর আমার মনে হলো সে রাতে আমি আর বোধহয় ঘুমোতে পারব না। আমি জানতাম এইসব স্টেপল সিংগাররা অন্যান্য গস্পেল গ্রুপ থেকে ভিন্নতর, কিন্তু ওদের আসল পরিচয়টা কী?
আমার স্কুল ডেস্কে বসে বসে ওদের কথা ভাবতাম। এক সময় টুইন সিটিতে গিয়ে স্টেপল্ সিংগারদের গাওয়া এলপি ধরে দেখেছিলাম। ওর মধ্যে একটা গান ছিলো “আনক্লাউডি ডে”। নিজেকে মনে হলো ভীষণ সৌভাগ্যবান। কাভারটা খুব মনযোগ দিয়ে দেখলাম যেমন সবাই দেখে। ম্যাভিস্ কে তা আমি জানলাম। সেই মূল গায়িকা পপসকেও চিনলাম। রেকর্ডের পেছনে এসব তথ্যই দেয়া ছিলো। তেমন বিস্তারিত নয় কিন্তু আমার জানার জন্যে যথেষ্ট। ছবিতে ম্যাভিসকে মনে হলো আমার বয়সী। তার গান আমাকে অভিভূত করতো। ফলে স্টেপল সিংগারদের গান আমি বেশি শুনতাম, অন্য সব গস্পেল গ্রুপদের চেয়ে অনেক বেশি। আমি আধ্যাত্মিক গান ভীষণ পছন্দ করি। মনে হয় এই গানগুলো যেমন সত্য তেমনি আন্তরিক। একইসময়ে আমাকে যেন মাটির উপর দাঁড় করিয়ে দিত আবার শূণ্যে কোথাও নিয়ে যেতো। ম্যাভিস এক অসাধারণ গায়িকা– দারুণ গভীর, দারুণ রহস্যময়ী। ঐ অল্প বয়সেই আমার মনে হতো জীবন আসলেই রহস্যময়। এসব ঘটনা আমার জীবনে লোকগীতির আবির্ভাবের আগে। তখন আমার স্বপ্নই ছিলো রক এন রোল, বলা যায় রক এন রোলের প্রথম প্রজন্মের গায়ক গায়িকারা–বাডি হোলি, লিটল রিচার্ড, চাক বেরি, কার্ল পার্কিনস, জিনি ভিনসেন্ট, জেরি লি লুইস। তারা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সঙ্গীত করতো। ভীষণ রকমের তাৎক্ষণিক। শুনলে মনে হতো কাপড় জামায় আগুন ধরে যাবে। গানগুলো ছিলো কৃষ্ণ সংস্কৃতি ও পল্লীগীতির সংমিশ্রণ। আমি যখন প্রথম চাক বেরি শুনি আমার ধারণাই ছিলো না সে কালো। ভেবেছিলাম সে সাদা পল্লীগীতির গায়ক। এও জানতাম না সে একজন বড় মাপের কবি ছিলো। কি সুন্দর কথা, ফ্লাইং আক্রস্ দ্য ডেজার্ট ইন আ টিডাব্লুএ(TWA), আই স এ ওয়ম্যান ওয়াকিং ক্রস দ্য স্যান্ড। সি বিন ওয়াকিং থার্টি মাইলস্ অনরুট টু বম্বে টু মিট আ ব্রাউন-আইড হ্যান্ডসাম ম্যান।” অনেক পরে বুঝেছি এমন ধরনের গীতিকবিতা লেখা কতটা কঠিন। সঙ্গীত ব্যাবসায় চাক বেরি একজন কেউকেটা হতে পারতো–জ্যাজ গায়ক, ব্যালাড গায়ক রুচিবান গীটার বাদক সবই। কিন্তু সেসব উচ্চাশা তার ছিলো না। তার ভেতরে এক ঐশ্বরিক উপাদান ছিলো। পঞ্চাশ বা একশ বছরের ব্যাবধানে সে ধর্মীয় প্রতিভূ হয়ে যেতে পারতো। চাক বেরি একজনই হয়– শারিরিক এবং মানসিক– উভয় ভাবেই। সামনা সামনি দেখলে অনেক সময়ই মনে হবে সে বেতাল। কিন্তু বেতাল কে না? তাকে গিটারে অবিরাম আট রকমের সুর বাজাতে এবং গান করতে হতো, সেই সাথে গানের মাঝে ধুয়া ধরতেও হতো। মানুষ মনে করে গান গাওয়ার সাথে বাজনা বাজানো সহজ কাজ। কথাটা ঠিক নয়। টুং টাং করা আর সত্যি অর্থে বাজনা বাজানো। এক জিনিষ নয়। সবাই এটা পারে না।
প্রশ্ন: তার ব্যান্ডে সেই তো মূল গীটার বাদক ছিলো।
উত্তর: একমাত্র গীটার বাদক ছিলো। হ্যাঁ। ওর সাথে ছিলো জেরি লি [লুইস] এবং আরও দু’একজন। এই লোকগুলোর মধ্যে এক ধরনের অভিজাত শক্তি ছিলো যে শক্তি দিয়ে তারা রক এন রোলকে এমন এক মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলো যা আজও আমাদের গর্বের বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা এই রক এন রোল ছিলো কালো ও সাদা মানুষের সম্মিলিত অবদান যেন এক সুতোয় বাঁধা–একসাথে ঢালাই করা– এ বাঁধন বা ঢালাই খোলার চেষ্টা করা মানে ঐ শিল্পের মৃত্যু ডেকে আনা।
bob-3প্রশ্ন: একেই কি আপনি বলবেন সঙ্গীতের বর্ণ-মিশ্রণ যা এর অন্তর্নিহিত সংকট?
উত্তর: বর্ণ-সংস্কার বহুদিন থেকেই ছিলো। নগরপতিদের জন্যে যা ছিলো রীতিমত হুমকি স্বরূপ। বিষয়টা তাদের বোধগম্য হবার পর এটিকে নিবৃত্ত করা তাদের প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে এবং করেও–যেমন ঘুষ কেলিঙ্কারি ইত্যাদির সমাধান করা। প্রথমে কৃষ্ণাঙ্গ উপাদানগুলোকে সোল মিউজিক এবং শ্বেতাঙ্গ উপাদানগুলোকে ইংলিশ পপে পরিবর্তিত করা হয়। চাক বেরিরা একে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। আমি মনে করি রক এন রোল আসলে কান্ট্রি ব্লূজ এবং সুইং ব্যান্ড মিউজিকের সংমিশ্রণ–শিকাগো ব্লুজ আর আধুনিক পপ নয়। আসল রক এন রোলের মৃত্যু কখন? ১৯৬১, ১৯৬২? রক এন রোল আমার ডিএন-এর অংশ, ফলে আমার রক্ত থেকে কখনই রক এন রোল উধাও হতে পারেনি। [হাসি]। আপনার প্রশ্নটা আমি ভুলে গেছি।
প্রশ্ন: আমরা আপনার জীবনে ম্যাভিস-এর প্রভাব এবং তার প্রতি আপনার প্রেমাসক্তির কথা আলাপ করছিলাম।
উত্তর: ওহ!, ম্যাডিস। যেমন বলছিলাম, আমি স্টেপল সিংগারদের ছবি দেখলাম। মনে মনে নিজেকে বল্লাম, শোনো, তুমিও একদিন ঐ মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে ওদের সাথে ছবি তুলবে। দশ বছর পর, তাই হলো। কিন্তু ব্যাপারটা এমনই স্বাভাবিকভাবে ঘটলো যে মনে হলো আমি আজীবনই, বহুবার ওদের সাথে ছিলাম। অন্তত মানসিকভাবে তো ছিলামই।
প্রশ্ন: ভাবছিলাম উডি গাথরি রেকর্ডের গাদা থেকে তরুণ বয়সে গান খুঁজে খুঁজে বের করা আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কিংবা ভাবুন মিক [জ্যাগার] এবং কিথ [রিচার্ডস] সারা লন্ডন শহর চষে বেড়াতো ব্লুজ রেকর্ডের জন্যে। অথচ এখন ইনটারনেটে সব পাওয়া যায়–শুধু এক বোতামের চাপে ইতিহাসের সব রেকর্ডের সঙ্গীত তাৎক্ষণিক হাজির। এতে কি সঙ্গীত আগের চাইতে উন্নততর হয়েছে? কিংবা নিকৃষ্ট? অন্তত মূল্যায়নের বিচারে?
উত্তর: আপনি যদি সাধারণ জনগোষ্ঠীর একজন হয়ে থাকেন আর এইসব সঙ্গীত যদি আপনার সংগ্রহে থাকে তাহলে আপনি কী শুনবেন? একসাথে কতগুলো গান একটানা আপনি শুনতে পারবেন? আমার তো মনে হয় আপনার মাথা জ্যাম হয়ে যাবে, সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে যাবে। আগের দিনে আপনি যদি মেমফিস্ মিনি শুনতে চাইতেন তাহলে আপনাকে পুরো সংকলনটাই শুনতে হতো যার মধ্যে ঐ মেমফিস্ মিনির গানগুলো রয়েছে। আর আপনি যদি মেমফিস্ মিনি আগে কখনও শুনেও থাকেন তবে হঠাৎই আবিস্কার করে থাকবেন এই গায়িকার গান সান হাউস অ্যান্ড স্কিপ জেমস্ এবং দ্য মেমফিস জাগ ব্যান্ডেও রেকর্ডকৃত ছিল। এবং তারপর সম্ভবত সেই মেমফিস মিনিকে আরও অনেক জায়গাতেও খুঁজে পেতেন–একটা গান এখানে, আর একটা ওখানে। ফলে এক সময় খুঁজে বের করবার চেষ্টাও করতেন কে এই মেমফিস্ মিনির গায়িকা। সে কি এখনও বেঁচে আছে? সে কি কিছু বাজায়? সে কি আমাকে কিছু শেখাতে পারে? তার সাথে কি আড্ডা দেয়া সম্ভব? তার জন্যে কি কিছু করতে পারি? ওর কি কিছুর প্রয়োজন আছে? কিন্তু এখন আপনি যদি মেমফিস্ মিনি শুনতে চান তাহলে হাজার বার শুনতে পারেন। তখন আপনার মনে হতে বাধ্য, “এ তো জলের মত সহজ!” আর এই অতি সহজ ব্যাপারটা আর উপভোগ্য থাকে না।
Bob-5প্রশ্ন: এই অ্যালবামের গানগুলো যেভাবে সাজানো আপনি কি শ্রোতাদের সেভাবে শুনতে বলতে চান? নাকি অ্যাপল যেভাবে একটা একটা করে বাজারজাত করে সেভাবে?
উত্তর: রেকর্ডের ব্যাবসায়িক দিকটা আমার এখতিয়ার নয়। তবে এটা ঠিক আজকাল গান শোনার পদ্ধতিটা বদলে গেছে। আমার আশা শ্রোতারা যেন যেকোনো প্রকারেই হোক সবগুলো গানই শোনে। কিন্তু! বিশ্বাস করুন আর নাই করুন আমি গানগুলো সেই অনুক্রমেই রেকর্ড করেছি যেভাবে আপনি শুনছেন। তবে ব্যাপারটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটা গান রেকর্ড করতে অন্তত তিন ঘণ্টা লাগে। এর মধ্যে মিক্সিং নেই। একদম সরাসরি। ক্যাপিটলের বড় বড় একো চেম্বার আছে। সম্ভবত তার দু’একটা ব্যবহার করাও হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রযুক্তি যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করেছি। প্রযুক্তি আসলে অতীতে বহু ধরনের ক্ষতি করেছে।
প্রশ্ন: এই রেকডিংটা কি গবেষণাধর্মী ছিলো?
গবেষণার চেয়েও বেশি। প্রশ্নটা ছিলো রেকর্ডিংটা কি সঠিক করা যাবে কিনা। আমরা কাজটা করেছি পুরাতন পদ্ধতিতে, অন্তত আপনারা সবাই তাই বলবেন। তবে ওভাবেই আমি রেকর্ডিং করে থাকি। আশি কিংবা নব্বুয়ের দশকের আগে আমি ইয়ারফোন ব্যাবহার করিনি। ইয়ার ফোন আমার পছন্দ নয়।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যন্ত্রটা দূরত্ব সৃষ্টি করে?
উত্তর: হ্যাঁ। মাথার ভেতর ভজঘট লাগিয়ে দেয়। আমি কখনই ঐ জিনিষটা কানে লাগিয়ে কাউকে স্বাভাবিকভাবে গান করতে শুনিনি। আসলে ওটা এক ধরনের ভুল নিরাপত্তাবোধ দেয়। আমাদের অনেকেরই ইয়ারফোনের প্রয়োজন হয় না। স্প্রিংস্টিন বা মিক এটি ব্যাবহার করে বলে মনে হয় না। অন্য অনেকেই করে অবশ্য। তবে না করাই ভাল। প্রয়োজন হয় না– বিশেষ করে সাথে যদি ভাল ব্যান্ড থাকে। রেকর্ডিং স্টুডিও প্রযুক্তিতে ঠাসা। প্রত্যেকটির নিজস্ব ব্যবহার আছে আর সেটা কাজে লাগাতে অনেক কিছু সমন্বয় করতে হয়। আমি যাকে মনে করি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং এটি সময়ের কারণে কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। আমার জানা মতে রেকর্ডিং স্টুডিওগুলো সবসময় ভাড়া থকে। ফলে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে তাকে ব্যবহার করতে চায়। যে স্টুডিও প্রযুক্তিগতভাবে যত আধুনিক সে স্টুডিওর তত বেশি চাহিদা। কর্পোরেট ব্যাবসা সবকিছু নিয়ে বসে আছে, এমন কি রেকর্ডিং স্টুডিও। বলতে কি মার্কিন জীবনের সবকিছুকে অধিকার করে বসে আছে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। উপকূল থেকে উপকূলে গিয়ে দেখুন সবাই একই পোষাক পরছে, একই চিন্তায় চিন্তিত, একই খাবার খাচ্ছে। সবই গতানুগতিক।
প্রশ্ন: অ্যালবামের প্রথম গানটা নিয়ে আলাপ করি যেটি হলো, “আম এ ফুল টু ওঅনট্ ইউ।” আমি জানতে চাচ্ছি গানের ভেতর ভগ্নহৃদয়ের যে আকুতি সেটা কিভাবে ফুটিয়েছেন। ফ্র্যাংক সিনাত্রা এই গান লিখেছিলেন তাঁর মহিয়সী প্রেমিকা আভা গার্ডনার-এর জন্য। আপনি একবার লিখেছিলেন একজন গায়ক আবেগকে রূপ দেয় এক প্রকারের রসায়ণের মাধ্যমে। আপনি বলেওছেন, “আমি ব্যাপারটা অনুভব করতে পারছি না। আমি যা করছি তা হলো শুধু আউড়ে যাচ্ছি।” কথাটা কি সত্যি?
উত্তর: ঠিক বলেছেন। আপনি অতিভাষণ করেন নি। দেখুন, বিষয়টি সম্পূর্ণই প্রকাশশৈলীর– প্রতিটি গায়কেরই তিন, চার বা পাঁচ ধরনের প্রকাশশৈলী থাকে এবং এগুলোকে বিবিধ মিশ্রণে ব্যবহার করতে হয়। কিছু কিছু প্রকাশশৈলী সময়ে আপনি বর্জন করেন আবার নতুন কিছু গ্রহণ করেন। কিন্তু এগুলো আপনার প্রয়োজন যেমন– আরও দশটা জিনিষ প্রয়োজন। আপনাকে জানতে হবে অন্যরা কোনটা জানে না যেটা আপনি করছেন। গানের সাথে প্রকাশশৈলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আপনার এ ধারণাও স্পষ্ট হতে হবে আপনি কতগুলো প্রকাশশৈলী একই সাথে ব্যবহার করছেন। একটি নির্দিষ্ট শৈলী কার্যকর হয় না। তবে এটাও ঠিক একাধারে তিনটি প্রকাশশৈলী ব্যবহার করাও ঠিক নয়, যদিও প্রয়োজনবোধে একটির পরিবর্তে অন্যটি ব্যবহার করতেই পারেন। তাই ঠিকই বলেছেন, বিষয়টি রসায়নের সংমিশ্রণই বটে।
Bob-Harison
ছবি: ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ জর্জ হ্যারিসনের সাথে বব ডিলান।

বিষয়টি অভিনেতা হবার মতো নয় যেখানে আপনি আপনার নিজ অভিজ্ঞতাকে উপাদান হিসাবে ব্যবহার করতে পারেন। যেমন শেক্সপিয়ার-এর অনেক নাটকের চরিত্র চিত্রণে আপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। কিন্তু একজন অভিনেতা অন্য একজন হবার ভান করে, একজন গায়ক তা করে না। এটাই হলো পার্থক্য। দুঃখজনক হলো আজকের গায়ককে খুবই স্বল্প আবেগ সম্পন্ন হয়ে গান গাইতে হয়। এই বিষয়টি এবং যেহেতু সবাই চায় তার গান হিট রেকর্ড হোক– গানে কোনো বুদ্ধিমত্তা বা সৃষ্টিশৈলী দেখাবার সুযোগ থাকে না।
বলতে কি হিট গান একজন গায়ককে অতীতের গর্তে ঠেলে দেয়। অনেক গায়কই আছে তাদের অতীতের হিট গানের নিরাপদ আশ্রয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আপনি যদি আজকালকার কান্ট্রি মিউজিক শুনে থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন আমি কী বলতে চাইছি। এ গানগুলো এতো নিরামিষ কেনো? আমার ধারণা প্রযুক্তিই এর মূল কারণ। প্রযুক্তি খুবই যান্ত্রিক এবং আবেগের বিপরীতমুখী। মানুষের সাথে আবেগের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বলতে কি এই প্রযুক্তি-নির্ভরতা এবং আবেগহীনতা সবচেয়ে ক্ষতি করেছে কান্ট্রি মিউজিকের। আমার অ্যালবামের গানগুলো সেই মানুষদের লেখা যারা বহু আগেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। আমিই বলা যায় গানগুলোর জনপ্রিয়তা হারাতে সাহায্য করেছি। কিন্তু একটা কাজ অন্তত হয়েছে সেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের নতুনভাবে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি–যেমন দা ভিঞ্চি বা রেনোয়া কিংবা ভ্যান গগ। আজকের যুগে তাদের মতো কেউ আঁকে না। কিন্তু অমন আঁকার চেষ্টা তো ভুল হতে পারে না। তাই “আই এ্যাম ফল টু ওয়ান্ট ইউ” গানটা আমি জানি। গাইতেও পারি। গানটির প্রতিটি শব্দ আমাকে স্পর্শ করে, মানে গানটাকে আমি অনুধাবন করি। যেন মনে হয় গানটা আমিই লিখেছি। ‘ওন্ট ইউ কাম সি মি, জেন-” এর চেয়ে এই গানটি গাওয়া আমার জন্যে সহজ। একসময় ব্যাপারটা অমন ছিলো না। এখন অন্যরকম। কারণ “কুইন জেন” সম্ভবত একটু পুরোনো হয়ে গেছে। আমি ঐ যুগ পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু এই গানটা পুরোনো হয়নি। এর সাথে মানুষের আবেগের সম্পর্ক আছে। যা এক অবিনশ্বর অনুভূতি। এই গানগুলোর মধ্যে কোনো ভান নেই। একটি ভুল শব্দও নেই। গীতিময়তা এবং সাংগীতিকভাবে গানগুলো চিরন্তন।

প্রশ্ন: আপনি কি গানগুলো লিখতে পারলে গর্ব বোধ করতেন?
উত্তর: একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে যে আমি গানগুলো লিখিনি। অন্যের লেখা গান গাইতেই আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। অবশ্য পছন্দ হলে। গানগুলো কিভাবে গাওয়া হয় সেটা আমার জানা থাকে বলে আমি আরও বেশি স্বাধীনতা নিতে পারি। গানগুলো আমি বুঝি। ৪০/৫০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে গানগুলোর সাথে আমার পরিচয়। গানগুলোর অর্থও গভীর। ফলে ঐ গানের সাথে আমি কোনো অপরিচিত গায়ক নই। আমি যে সব গান লিখেছি তা আমার মনে হয়… জানি না কি বলা উচিৎ… আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যান, অনেক কিছু দেখেন। আমি শেক্সপীয়রের নাটক দেখতে পছন্দ করি, মানে, সেটা যদি অন্য ভাষাতেও হয়, আমি দেখি। এসব নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাই না। দেখি, কারণ শেক্সপীয়র আমার প্রিয়। আমি ওথেলো, হ্যামলেট, মার্চেন্ট অব ভেনিস দেখেছি বছরের পর বছর। কিছু কিছু মঞ্চায়ন অন্যগুলোর চেয়ে আরও ভাল। অনেক ভাল অনেকটা ভাল-খারাপ গান শোনার মতো অভিজ্ঞতা।
প্রশ্ন: আপনার গাওয়া “লাকি ওল্ড ম্যান” আমার ভীষণ পছন্দ। এ গানটা গাইবার পেছনে আপনার আকর্ষণ কী ছিলো? গানটা নিয়ে আপনার কোনো স্মৃতি আছে কি?
উত্তর: ওহ্, ও গানটা আমি আগে কখনও জানতাম না। আমার বয়সী এমন কেউ নেই যে এ গানটা জানে না। মানে বলতে চাচ্ছি, গানটা শত শত বার রেকর্ড হয়েছে। আমি নিজেও কনসার্টে গেয়েছি। তবে একথাও সত্যি গানটা অতি সম্প্রতিই আমার মনে গেথে গেছে।
প্রশ্ন: তাহলে আপনি গানটা কিভাবে করেন?
উত্তর: আমি গানটাকে বিশ্লেষণ করে প্রথমে লক্ষ্য করি সেখানে আমার কি করার আছে। প্রায় সব গানের ভেতরই একটা সেতু বন্ধন আছে আর সেটাই শ্রোতাদের শুধুমাত্র গীতিকাব্য থেকে দূরে সরিয়ে একঘেয়েমি ঘুচিয়ে দেয়। কিন্তু আমার গানে তেমন কোনো সেতুবন্ধন সেই কারণ গীতিকাব্যে সেসব কিছু কোনো সময়েই ছিলো না। কিন্তু “অটাম লিঈভস্”-এর মতো গানে কোনটা এর আসল বাস্তবতা আর কোনটা নয় সেটা খুঁজে বের করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এরিক ক্ল্যাপটন কিভাবে গানটা গায়, শুনেছেন নিশ্চয়। সে গানটার প্রথম কটি লাইন গায়, তারপর টানা ১০ মিনিট গিটার বাজায় তারপর আবার গায়। সে হয়তো, গান থামিয়ে আবারও গিটার বাজিয়েছে, আমার ঠিক মনে নেই। কিন্তু আপনি যখন গানটা শুনবেন বুঝতে হবে গুরুত্বটা কিসের উপর? অবশ্যই গিটার বাজাবার উপর। এখন বিষয়টা হলো, এরিক-এর জন্যে এটা ঠিক আছে, কারণ সে একজন দক্ষ গিটারবাদক আর যে গানই সে রেকর্ড করে তার ভেতরই গিটারকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু সবাই এটা করে না বা করতে পারেও না। বিষয়টা “অটাম লিইভস”কে হৃদয়ে স্থাপন করা নয়। একজন কৃত্যশীল্পির সে সুযোগ সবসময় হয়ও না। আবার সুযোগ পেলেও তার সদ্ব্যবহার করা হয়ে উঠে না। এসব গানের গীতিকাব্য সর্বদাই সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়। প্রতিটি গান একটা একটা করে অর্থবহভাবে শনাক্ত করতে হয়। এসব গানের ভেতর অন্তর্গত না হলে গাওয়া যায় না। তবে ভান তো সবাই করতেই পারে। কিন্তু আমি সেটা পারব না।
প্রশ্ন: আপনি কি দু’ একটা গানের সুর নিয়ে কিছু বলবেন?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। এইসব গানের সুর অবিশ্বাস্য। প্রতিটি গানের ভেতর এক ধরণের ক্ল্যাসিক্যাল সুরের রাগ মিশ্রিত আছে। কারণটা কি জানেন? কারণ এই গানের সুর রচনাকারীরা ক্ল্যাসিক্যাল সুরের পাঠ নিয়েছে। তারা সঙ্গীততত্ত্ব বেশ বুঝতো। তারা সঙ্গীত শিক্ষায়তনে তালিম নিয়েছে– যেমন মোৎসার্ট, বাখ শিখেছে– পোল সিমেন একটা পুরো গান মোৎসার্টের সুরে রচনা করেছে। এরা সবাই বিটোভেন কিংবা লিস্টজ বা চাইকোভস্কির সুরের শিক্ষা নিয়েছে। চাইকোভস্কি শুনলে আপনি অনেক সঙ্গীতেরই সুর দিতে পারবেন–বিশেষ করে বাণিজ্যিক গীতিকার হিসেবে।
বেশিরভাগ গানই দু’টি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের দ্বারা লেখা–সঙ্গীতকার ও গীতিকার। আমার জানা মতে আরভিং বার্লিন হলো এমন একজন যে একাধারে সঙ্গীতকার এবং গীতিকার, গীতও লিখেছে এবং তার সুরও দিয়েছে। এই লোকটা আপাদমস্তক এক প্রতিভাবান ব্যক্তি। অর্থাৎ তার এমন এক প্রতিভা যা দেবার জন্যেই উদগ্রীব। ক্ল্যাসিক্যাল নিয়ে তার অবশ্য তেমন উৎসাহ নেই- অন্তত আমার জানা মতে। কিন্তু অন্য সব গীতিকারকেই কোনো না কোনো সঙ্গীতকারের উপর নির্ভর করতেই হয়।
প্রশ্ন: এই গানগুলোর বর্তমান শ্রোতা অবশ্যই অতিতের শ্রোতাদের চেয়ে পৃথক হতে বাধ্য। ফলে নিজেকে কি সঙ্গীত ও প্রত্মতাত্ত্বিক বলে মনে হয় আপনার?
উত্তর: না। এগুলো সবই আমার নিজের পছন্দের গান এবং আমি মনে করি এর আবেদন সবার কাছেই এক। আমি আশা করবো গানগুলো যেমন আমাকে টানে তেমনি সবাইকেই টানবে। আবেদন সবার কাছেই এক, আমি আশা করবো গানগুলো যেমন আমাকে টানে তেমনি সবাইকেই টানবে। এটা ভাবা ঠিক হবে না যে এই গানগুলো নতুন শ্রোতা সৃষ্টি করবে কিংবা সবাই ভাববে একটা নতুন কিছু সঙ্গীত জগতে হাজির। তাছাড়া আমি মঞ্চের উপর থেকে দর্শকদের এক ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখি।
প্রশ্ন: সেটা কেমন?
উত্তর: অবশ্যই সব শ্রোতার প্রতিক্রিয়া এক হয় না। সবাইকে এক কাতারে ফেলা সম্ভব নয়। সবাই এক রকম নয়। দর্শকদের মধ্যে পোষাকেও তফাৎ আছে যেমন টাই স্যুট পরা একজনের পাশে টি-সার্ট এবং কাউবয় বুট পরা কেউ বসতেই পারে। সান্ধ্য পোশাক পরা মহিলার পাশেই ঘরোয়া পোশাকের মেয়েকেও দেখা যায়। বিভিন্ন ধরণের মানুষ। বয়সের সাথে চারিত্রিক বৈশিষ্ঠের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একবার এলটন জন-এর এক অনুষ্ঠানে গেছিলাম। মজার ব্যাপার লক্ষ্য করলাম–প্রায় তিন প্রজন্মের শ্রোতা সেখানে উপস্থিত। কিন্তু সবাই প্রকাশ্যে একই রকম, এমন কি বাচ্চারাও। মানুষ এই প্রজন্ম বিষয়টা নিয়ে বড় মাতামাতি করে, বিশেষ করে গান নিয়ে। কিন্তু সব প্রজন্মের রুচি একরকম বা ভিন্নতর হলেই ক্ষতিটা কী? সেসব মানুষের রুচি সহজগম্য তাদের নিয়ে আমি মোটেও সুখী নই। আসলে বয়স নিয়ে আমার কোনো বাড়াবাড়ি নেই। বরং প্রাপ্তবয়স্ক তারুণ্যের বাজারটা এই গানগুলো বুঝতে এবং মূল্যায়ন করতে অক্ষম।
প্রশ্ন: এই গানগুলোর মধ্যে যে রোমান্টিকতার জাদু স্পর্শ আছে তা অত্যন্ত প্রাচীন, কারণ আধুনিক রোমান্টিকতায় কোনো প্রতিরোধ বা পিছটান নেই। বর্তমানে সবাই ডেট করে, তারপর বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ে। পুরোনো দিনের সেই মিষ্টি প্রতিশ্রুতির কোনো অস্তিত্ব নেই। এরপরও কি আপনার মনে হয় গানগুলো বর্তমান যুগের তরুণ তরুণীদের গতানুগতিক জীবনযাপনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে?
উত্তর: আপনিই বলুন। মানে বলতে চাচ্ছি, প্রভাব ফেলার কোনো কারণ তো খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু ‘গতানুগতিক’ শব্দটার মানে কী? ‘কাঁচা’ মন? এমন শব্দ আমি ব্যবহার করবো না। কারণ শব্দটার মধ্যে কোনো জোর নেই। এই গানগুলো, প্রভাব ফেলুক বা নাই ফেলুক, অত্যন্ত গুণসম্পন্ন। কারও কাছে যদি বস্তাপচা গতানুগতিক মনে হয়, কিছুই করার নেই। মানুষের জীবন এখন অনেক ব্যাভিচার ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে ডুবে আছে। এক সময় না এক সময় বিষয়গুলোর সমাধান পেতেই হবে, নইলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ব্যাভিচার মানুষকে শেষ করতে পারে না আমরা আসলে ব্যাভিচারের শনৈ শনৈ মোহনীয় প্রভাব লক্ষ্য করতে পারছি– যেদিকেই তাকাই, বিলবোর্ড থেকে শুরু করে সিনেমা, খবরের কাগজ থেকে সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রপত্রিকা–সব জায়গায়। এই গানগুলো ঐ মোহনীয় ব্যাভিচারমুক্ত। রোমান্স কখনও পুরোনো হয় না। কারণ রোমান্স তো প্রগতিশীল। হতে পারে বর্তমান গণমাধ্যমের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। না পারলেই বা ক্ষতি কী?
প্রশ্ন: আপনি একসময় বলেছিলেন আপনার সঙ্গীত ব্যবসায় প্রবেশ পাশের দরজা দিয়ে কারণ সেই সময়ে কেউ ভাবতই না লোকগীতি সঙ্গীত ব্যবসায় ভাল করতে পারবে। অথচ আজ আপনি আমেরিকান গানের বিশাল এক প্রতিভূ রূপে উপস্থিত। তাহলে কি শেষমেষ আপনি সদর দরজা দিয়েই সঙ্গীত ব্যবসা জগতে প্রবেশ করলেন?
উত্তর: বলতে বাধা নেই ঘটনাটা তাই ঘটেছে। সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হয়। জীবনে এমন ঘটনাও ঘটে, আপনাকে এক দিন দরজার চাবিটা দেয়া হলো ঠিকই কিন্তু আপনি সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। কিন্তু তেমনটা আমার হয়নি। লোকসঙ্গীত আমার জীবনে ঠিক সময়েই হাজির হয়েছে। দশ বছর পরেও নয় বা আগেও নয়। কারণ তা হলে আমি বুঝতেই পারতাম না ঐ গানগুলোর মূল্য আসলে কী। ওগুলো জনপ্রিয় গান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেই সময় লোকগীতির অবমূল্যায়ন করা হয়েছে হয় বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে অথবা বিটলসরা গানগুলোকে হত্যা করেছে। সম্ভবত ঐভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আর পারছিলো না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে বর্তমান সময়ে এটি সঙ্গীত হিশেবে দারুণ প্রকম্পমান। বহু মানুষ গানগুলো, আমার জানা মতে, আগের চেয়ে আরও ভাল গায় এবং বাজায়। এটা পপ রাজ্যের কোনো অংশ নয়। আমি লোকসঙ্গীতের সেই জায়গাটাতেই ঢুকেছি যখন আর কেউ জানতই না এমন একটা রাজ্যের অস্তিত্ব আছে। ফলে পুরো জায়গাটা জুড়েই আমার অস্তিত্ব। আমি গান লেখা শুরু করি, করতে বাধ্য হয়েছি কারণ আমি তো আসলে নরকের আগুনের মতো রক এন রোল গায়ক হতে পারতাম না। কিন্তু অাগুন-গান লিখতে পারতাম।

প্রশ্ন: আপনার অনেক গানই বয়স বাড়ার কথা বলে। আপনি একবার বলেছিলেন মানুষ অবসর নেয় না। মানুষ বিলীন হয়ে যায়, তার ভেতরের উদ্যম স্তিমিত হয়ে আসে। এখন আপনার বয়স ৭৩, একজন প্রপিতামহ।
উত্তর: দেখুন, বয়স তো সবারই বাড়ে। তরুণ্যে আবেগই মানায়। তাই না? তরুণরা আবেগপ্রবণ হয়। প্রবীণদের হওয়া উচিৎ প্রাজ্ঞ। অর্থাৎ আমরা তো অনেক দিন বাঁচলাম– কিছু জিনিষ তো তরুণদের জন্যেও ছেড়ে দেয়া উচিৎ। এই বয়সে তরুণ সেজে তো লাভ নেই। তাতে বরং দুঃখ পাবারই সম্ভাবনা।

প্রশ্ন: আপনার সাথে যারা সাক্ষাতে আসে তাদের সাথে সময় কাটাতে ও আলাপাচরিতা করতে আপনার নিশ্চয় ভীষণ আনন্দ হয়।
উত্তর: খেলোয়াড়দের মতো নয় যারা সারাদিনই সচল। টেনিস খেলুড়ে রোজার ফেডেরার যেমন। সারা বছরই ব্যস্ত। বলা যায় বছরের ২৫০ দিনই, প্রতি বছর, বছরের পর বছর। ফলে বিষয়টা আপেক্ষিক, হ্যাঁ, মানুষের কাছে আপনাকে যেতেই হয়। তাদেরকে আপনার কাছে আনা সম্ভব নয় যদি না আপনার ভেগাস বা কোথাও খেলার চুক্তি থাকে। কিন্তু সুখ–অনেক মানুষই বলে জীবনে নাকি সুখ নেই –কখনই স্থায়ী হয় না। তবে একথা তো ঠিক আত্মনির্ভরশীলতা সুখ বয়ে আনে। সুখ আসলে এক ধরণের পরম প্রাপ্তি। বলতে কি এ নিয়ে আমি ভাবি না। এক মুহূর্তের সুখ–যেমন ভাল খাবার খেয়ে বলা আমি খেয়ে দারুণ সুখ পেলাম–তার মানে এই নয় পরের বারের খাওয়াটাও সুখ বয়ে আনবে। জীবনে টানাপড়েন আছেই আর সময়কে আপনার সঙ্গী বানাতে হবেই, তাই না? সত্যি বলতে কি সময়ই হলো আপনার পরমাত্মীয়। বাচ্চারা সর্বদাই খুশি। কিন্তু তারা জীবনের টানাপড়েনের সাথে এখনও পরিচিত হয়নি। আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি সুখটা আসলে কী জিনিস। এর কোনো সংজ্ঞা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রশ্ন: আপনি কখনও সুখের দেখা পেয়েছেন?
উত্তর: জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আমরা সুখের দেখা তো পাই কিন্তু জিনিসটা তরল জলের মতো হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে যায়। যতক্ষণ কষ্ট বিরাজমান ততক্ষণ সুখের অস্তিত্ব থাকবেই। একজন হতভাগ্য মানুষ কিভাবে সুখী হবে? অর্থ কি মানুষকে সুখী করে? অনেক কোটিপতি আছে যে হয়তো ৩০টা গাড়ি কিনতে পারে কিংবা কোনো খেলার দল, সে কি আসলেই সুখী? তাকে আরও সুখী করবে কি?
কোনো বাইরের দেশকে তার অর্থ বিলিয়ে দিলে সে কি সুখী হতে পারবে? তার নিজের দেশের শহর গড়া বা বেকারত্ব ঘোচানোতে অর্থ দেয়ার চেয়ে কি ঐ কাজটা তাকে বেশি সুখ দেবে? আমি অবশ্য তাদের এসব কাজ করতেই হবে বলছি না, কারণ আমি সমাজতন্ত্রের কথা বলছি না। কিন্তু তারা তাদের অর্থ দিয়ে কী করে? তারা কি তা সৎ পথে খরচ করে? সৎ পথ বা সততা কি জিনিস তা যদি না জানেন তবে গ্রীক অভিধানে দেখে নিন। এর ভেতর কোনো ভাবপ্রবণতার অবকাশ নেই।
প্রশ্ন: তার মানে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন?
উত্তর: বলতে গেলে, অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ আমেরিকায় অনেক জিনিসই সঠিক নয়। বিশেষ করে শহরতলীতে। সেখানে ভাল মানুষ আছে যারা ভাবে অনেক ভাল কাজ করতে পারে। এই অর্থবান মানুষগুলো শিল্পকারখানায় সহজেই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে সক্ষম। কিন্তু কেউ তাদের তেমন কোনো সদোপদেশ দেয় না। বসে আছে ঈশ্বরের নির্দেশনার জন্যে।
প্রশ্ন: আপনার মেধা নিয়ে একটু আলাপ করি। জর্জ ব্যালশিন-এর মতো মেধাবী কোরিওপ্রাফার নিজেকে তার নিজের কাব্যপ্রতিভার দাস মনে করে। অন্যদিকে পিকাসো নিজে তার শিল্পসৃষ্টির প্রক্রিয়ার সর্বেসর্বা মনে করতো। আপনি নিজের মেধাকে সময়ের বিচারে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
উত্তর: (হাসি) পিকাসোর সাথে নিজের অবস্থানকে বদল করতে পারলে ভাগ্যবান মনে করতাম, মানে সৃষ্টিশীলতার বিষয়ে বলছি। সিনাত্রার মতো, শুধু একজন পিকাসোই জন্মেছে। যদি জর্জ, মানে কোরিওপ্রাফারের কথা বলেন, তো বলবো আমার অনুভূতিও তারই মতো। শিল্পসৃষ্টি কর্মপ্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়।
প্রশ্ন: বিষয়টি কি অপাথির্ব?
উত্তর: সম্পূর্ণভাবে। সর্বতোভাবে। এ এক নিয়ন্ত্রণহীন বিষয়। আক্ষরিকভাবে এর কোনো ব্যাখ্যাই সম্ভব নয়। কিন্তু হয়তো এভাবে বলা যায়: আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, অনুষ্ঠানে আমার কোন গানটা গাওয়া ঠিক হবে? কী গান আমার কাছে নেই? সাধারণত কোনটা নেই, শুরুটা সেখান থেকেই হয়। সব গানই আমার কাজে লাগে। দ্রুত লয়ের, ধীর লয়ের, কম গুরুত্বপূর্ণ, ব্যালাড, রাম্বাস। সরাসরি সম্প্রচারে এ সবই কাজ লাগে। আমি বহুদিন ধরে চেষ্টা করছি শেক্সপিয়রের নাটকের আবহ দিয়ে গান তৈরি করতে। ফলে তেমনি কোনো গান দিয়েই সাধারণত শুরু করি। একবার কোনো বিষয় মনে ধরলে আমি সারাক্ষণ ভেতরে ভেতরে সেটা নিয়ে খেলা করি যতক্ষণ না হঠাৎই ধারণাটা স্পষ্ট হয়। এবং তারপরই পেয়ে যাই সেই সঙ্গীতের চাবিটা। আসলে ধারনাটাই হলো মূল ব্যাপার। যেনো এডিসন-এর বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগেই চারিদিকে বিদ্যুতের আলো জ্বলেই ছিলো। লেনিন-এর তত্তাবধানের আগেই সমাজতন্ত্রের অস্তিত্ব ছিলো! ফলে সৃজনশীলতা মূল ধারণাকে জোগান দিতে পারঙ্গম। আর ধারণার মূলে কাজ করে উৎসাহ, উদ্দীপনা। তবে এটাও ঠিক শূন্যের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা কোনোই কাজে আসে না।
প্রশ্ন: আপনি আমার এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিলেন এ জন্যে আমি কৃতজ্ঞ।
উত্তর: কারণ প্রশ্নগুলো আকর্ষণীয় ছিলো। শেষবার সে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম তাতে ঐ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ভদ্রলোক সঙ্গীত ছাড়া আর সবকিছুই জানতে চেয়েছিলো। বোঝেনি যে আমি আসলে একজন সঙ্গীতকার। ষাটের দশক থেকেই এই আমার অভিজ্ঞতা–যেন একজন চিকিৎসক মনঃচিকিৎসক, অধ্যাপক কিংবা রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। কেন? এসব প্রশ্ন কেন আমাকে করছেন?
প্রশ্ন: সঙ্গীতজ্ঞকে তাহলে কি বিষয়ে প্রশ্ন করা উচিৎ?
উত্তর: সঙ্গীত বিষয়ে! শুধুমাত্র সঙ্গীত বিষয়ে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন QAMRUN NESSA HASAN(menoka) — অক্টোবর ১৯, ২০১৬ @ ১২:২৭ অপরাহ্ন

      Selim sir, excellent and unique.
      Like it very much.
      Know many things about Bob Dylan.
      He deserved the Nobel Prize.
      Thanks.
      Qamrun Nessa Hasan (Menoka)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফ আহমদ — অক্টোবর ১৯, ২০১৬ @ ১২:৫৬ অপরাহ্ন

      একটি চমৎকার ইন্টারভিউ, ভাল লাগলো।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com