বব ডিলানের আত্মজীবনী: `মনে হচ্ছিল সবই মিথ্যে, সবই কল্পনা’

নাহিদ আহসান | ১৫ অক্টোবর ২০১৬ ৮:১৭ অপরাহ্ন

Dylanলো লেভি লিডস মিউজিক পাবলিশিং কোম্পানির প্রধান আমাকে ট্যাক্সি করে নিয়ে গেল পিথিয়ান মন্দিরে,৭০ ওয়েষ্ট ষ্ট্রীটে ছোট্ট রেকর্ডিং স্টুডিওটি দেখাতে যেখানে বিল হ্যারি এবং তার সহযোগীরা, ‘রক এরাউন্ড দ্য ক্লক’-এর রেকর্ডিং করেছিল।
তারপর গেলাম আমরা জ্যাক ডেম্পসির রেষ্টুরেন্টে, ৫৮ ব্রডওয়েতে। সেখনে পৌঁছে আমরা খোলা জানালার সামনে রেড লেদার দিয়ে মোড়ানো একটি বুথে বসলাম। লো লেভি আমাকে জ্যাক ডেম্পসির সাথে পরিচয় করিয় দিলেন যিনি ছিলেন একজন বড় মাপের বক্সার।
জ্যাক আমার দিকে তাকিয়ে তার কব্জি ঝাঁকালো,‘তুমি ‌একটা বাচ্চা ছেলে, হ্যাভি ওয়েট শুরু করার জন্য একেবারেই হালকা পাতলা। আরেকটু ওজন বাড়াও। আরেকটু ভাল ড্রেস আপ কর। চেষ্টা কর নিজেকে যাতে আরেকটু ধারালো দেখায়। অবশ্য রিংয়ে তোমাকে ফ্যাশন নিয়ে অত চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু প্রতিদ্বন্দীকে পেটাতে হবে আচ্ছামত। ভয় পেলে হবে না।”
লেভি বললো,“আরে জ্যাক, ওতো বক্সার না। গান লেখে। আমরা ওর গানগুলো এবার বাজারে আনছি।”
“ও, আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে …..শুনবো তোমার গান। আগে বের হোক তো। গুড লাক, খোকা।”

জানালার বাইরে তীব্র বাতাস বইছিল। মেঘেরা যেন বাতাসের সাথে লড়াই করে অগ্রসর হচ্ছিল। ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছিল তুষারকণা। সন্ধ্যার লাল আলো জ্বালা রাস্তাগুলোতে ছিল মানুষের ভীড় ও ধাক্কাধাক্কি। এরই মধ্যে খরগোশের ফারের কানটুপি পরা ফুটপাথের দোকানী, চেস্টনাট বিক্রেতারা হাকাহাকি করে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এসবের কোন গুরুত্ব ছিল না আমার কাছে।

আমি লীড মিউজিকের সাথে একটি কন্ট্রাক্ট সাইন করছি, আমার গানগুলো প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, এর চেয়ে বড় ব্যাপার চারপাশে আর কোথায় কি থাকতে পারে? আমার গানের সংখ্যা অবশ্য খুব বেশী না। তবুও লো আমাকে ১০০ ডলার অগ্রিম দিল ভবিষ্যতের রয়ালিটির জন্য যা আমার কাছে যথেষ্ট মনে হচ্ছিল।

লোর অফিসে গিয়ে আমি আমার গিটার কেসটি খুলে বসলাম। গিটারটি নিয়ে বাজাতে শুরু করলাম। ঘরটি ছিল খুবই অগোছালো। অনেকের লেখা গান পড়েছিল তালগোল পাকিয়ে। বুলেটিন বোর্ডে রেকর্ডিংয়ের তারিখ, সাদা লেবেল লাগানো কালো ধাতুর প্রলেপযুক্ত ডিক্স; বিনোদন জগতের মানুষদের সাইন করা ফটো- জেরি ভেল, আলর্মাটিনো, অ্যন্ড্রজ সিস্টারদের(লো এদের একজনকে বিয়ে করেছেন) চক্চকে পোরট্রেট -সবকিছু ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আরও ছিল প্যাঁচানো রীল, কালো কাঠের ডেক্সের ওপর দুনিয়ার হাবিজাবি রাখা।

‘জন তোমার সম্পর্কে অনেক উচুঁ ধারণা পোষণ করে। জন হচ্ছে জন হ্যামড যাকে বলা চলে প্রতিভার অন্বেষক ও জহুরী। বিলি হলিডে, টেডি উইলসন, চার্লি ক্রিশ্চিয়ান, ক্যাব ক্যালাওয়ে, ব্যানি গুডম্যান, কাউন্ট ব্যাসি, লিওলেন হ্যাম্পটন যার আবিষ্কার। এ‌সব গায়ক সারা আমেরিকায় সঙ্গীতকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। জন এদের সৃষ্টিকে মানুষের চোখের সামনে নিয়ে এসেছেন। এমনকি তিনি বেসি স্মিথ-এর শেষ রেকর্ডিংয়ের সেশনটিও পরিচালনা করেছেন।
তিনি আসলে একজন কিংবদন্তী যে কিনা আমেরিকান অভিজাতদের একজন। জনের শৈশব কেটেছে উচ্চবিত্তদের মাঝে- স্বচ্ছলতা ও বিলাসিতার মধ্য দিয়ে। তবে এ‌ই নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার হৃদয়ের একান্ত ধ্বনি তিনি সঙ্গীতের জন্যই বরাদ্দ রেখেছিলেন। অনুসরণ করেছেন গানের জগৎকে –আধ্যাত্মিক, জ্যাজ কিংবা ব্লু। জীবন দিয়ে তিনি তাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন ও রক্ষা করেছেন। কেউ তার সামনে দাঁড়াতে পারেনি। তারও নষ্ট করার মত সময় হাতে ছিল না।
আমার মনে হলো আমি স্বপ্ন দেখছি, যখন আমি কলম্বিয়া রেকর্ড-এর জন্য তার তত্ত্বাবধানে সাইন করছিলাম। মনে হচ্ছিল সবই মিথ্যে, সবই কল্পনা।
কলম্বিয়া গানের ভুবনে ছিল একটি দিক-নির্দেশনা। এখানে পা রাখাই আমার জন্য বিশাল একটা ব্যাপার ছিল। নতুনদের আগমনের জন্য অবশ্য ফোক মিউজিক কোন সদর দরোজা ছিল না। ছিল বিকল্প কোন প্রবেশপথ।

border=0তখনকার বড় রেকর্ড কোম্পানিগুলো যেন এলিটদের জন্য এবং মহাশুদ্ধ ও পবিত্রীকৃত সঙ্গীতের জন্য বরাদ্দ ছিল। আমার মত কাউকে এখানে কখনোই স্বাগত জানানোর কথা না, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া।

জনও ছিল অনন্যসাধারণ মানুষ। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের গানের রেকর্ড করার কথা তার নয়। তার দূরদৃষ্টি ছিল। তিনি আমাকে দেখেছিলেন, আমার গান শুনেছিলেন। আমার অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করেছিলৈন। আমি ভবিষ্যতে কী লিখতে পারি এ সম্পর্কে তার ধারণা ছিল।

তিনি আমার গানের ভেতর ব্ল‌ু, জ্যাজ এবং ফোক-এর ঐতিহ্যের ধারা খুঁজে পেয়েছেন –যা নতুন যুগের ছন্নছাড়া আজগুবি গান নয়। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে এবং ষাটের শুরুতে আমেরিকার গানের জগৎ যেন ছিল কিছুটা ঘুমন্ত। জনপ্রিয় রেডিওগুলো ছিল নিশ্চল এবং ফাঁকা বিনোদনে পূর্ণ।

এটা ছিল বীটলস্ আসার আগের বছরের কথা। দ্য হু এবং দ্য রোলিং স্টোন যার মধ্যে কেবল নতুন প্রাণের সঞ্চার শুরু করেছিল। আমি তখন গাইতাম কিছু ঝাঁঝালো ফোক গান। তা ছাড়া যা গাওয়া হচ্ছে সেগুলোর সাথে রেডিওর অন্য কোন পরিবেশনার কোন মিল ছিল না এবং সেগুলোর কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও ছিল না– তা জানার জন্য কোন জরিপের দরকার হতো না। কিন্তু জন আমাকে বললো এগুলো তার পছন্দের তালিকার উপরের দিকে নেই। যদিও সে সচেতন ছিল এর ভেতরকার শিল্পিত প্রয়োগগুলোর ব্যাপারে। তিনি যা বললেন তা হলো, “আমি আন্তরিকতাটা বুঝতে পারছি।” যদিও তিনি তখন খুব কর্কশ ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন, তবুও তার চোখের তারায় ছিল সমঝদারিত্ব।
পিট সিগারকে তখন সবেমাত্র একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। যদিও পিট সিগার তার আবিস্কার ছিল না। পিট কয়েক বছর ধরে কাছাকাছিই ছিলেন। জনপ্রিয় ফোক গ্রুপ দ্য ওয়েভার-এর সাথে ছিলেন তিনি, কিন্তু ম্যাকার্থি যুগে তিনি কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় কঠিন সময় পার করলেও গান গাওয়া তিনি ছাড়েননি। পিট সিগার সম্পর্কে বলার সময় হ্যামান্ড বেশ স্পর্ধিত ভঙ্গিতেই বলতো যে পিটের পূর্বপুরুষরা মেফ্লাওয়ার চড়ে এসেছিল এবং তার আত্মীয়স্বজনরা বাঙ্কার হিলস-এর যুদ্ধে যিশুর স্বার্থে লড়াই করেছিল। “ভাবতে পার এই শুয়োড়ের বাচ্চাগুলো তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে? এদের মুখে চুনকালি মাখানো উচিৎ।”

“আমি তোমাকে সব বলবো” সে বললো, “তুমি একজন মেধাবী তরুণ। তুমি যদি একাগ্রতা আনতে পার কাজে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার তাহলে আর পিছু তাকাতে হবে না। আমি তোমাকে সাহায্য করবো। তোমার গান রেকর্ড করবো। তারপর দেখ কী হয়।”
এটাই যথেষ্ট ছিল আমার জন্য। তিনি আমার সামনে একটা কন্ট্রাক্ট রাখলেন এবং আমি তৎক্ষণাৎ সেটা সই করলাম। বিস্তারিতভাবে পড়লাম না। উকিল বা উপদেষ্টা কাউকে প্রয়োজন মনে হলো না। আমার সামনে যা-ই আছে খুশী মনে গ্রহণ করাই সমুচিৎ মনে করলাম।

(বব ডিলানের আত্মজীবনী Chronicles-এর প্রথম খন্ডের প্রথম পর্বের অংশবিশেষের অনুবাদ)

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com