আন্দজে ভাইদা: `কেবল সান্ধ্য বিনোদন দেয়া চলচ্চিত্রকার হিসেবে আমার কাজ নয়’

নাদির জুনাইদ | ১৩ অক্টোবর ২০১৬ ৬:২৫ অপরাহ্ন

Andresশিরোনামের উক্তিটি থেকেই চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি পোল্যান্ডের বরেণ্য এই চলচ্চিত্রকারের মনোভাব বোঝা যায়। চলচ্চিত্রকে আন্দজে ভাইদা কেবল ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনের উপকরণ হিসেবে দেখেননি। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দর্শককে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন। চেষ্টা করেছেন যেন দর্শক চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে আগ্রহী হয়; চলচ্চিত্র যেন সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা দর্শকদের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে পোল্যান্ডের ছবি শৈল্পিক উৎকর্ষের জন্য সমাদৃত। কখনো সরাসরি, আবার কখনো অপ্রত্যক্ষভাবে তুলে ধরা রাজনৈতিক বক্তব্যও পোল্যান্ডের চলচ্চিত্রের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। এমন ছবি তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশেও যেখানে চলচ্চিত্রে হালকা ও অন্তঃসারশূন্য বিনোদন প্রদানের চর্চা নির্মাতা বা দর্শক কাউকেই আকৃষ্ট করেনি। সেই সময়ে সোভিয়েত বলয়ে থাকা পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহের চলচ্চিত্রে সোশালিস্ট রিয়েলিজম ধারা প্রাধান্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরার সরকারি তাগিদ ছিলো। ভাইদার প্রথম ছবি আ জেনারেশন (১৯৫৫) এই গতানুগতিক নির্মাণশৈলী প্রত্যাখ্যান না করলেও ছবিতে পোল্যান্ডের কমবয়সীদের উপর যুদ্ধের প্রভাব যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিলো তা দর্শকদের জন্য সৃষ্টি করেছিলো ভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ। পোল্যান্ডের আরেক বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার রোমান পোলানস্কি এই ছবিতে একটি কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পোলানস্কি জানিয়েছেন, ‘ভাইদার প্রথম ছবি পোল্যান্ডের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রভাবিত করেছিলো গভীরভাবে। আর এই ছবির মাধ্যমেই সূচনা হয় পোলিশ চলচ্চিত্রের।’ পরবর্তী বিভিন্ন দশকে ভাইদার কাজ সমৃদ্ধ করেছে পোল্যান্ড এবং সারা বিশ্বের চিন্তাশীল চলচ্চিত্রের ধারা। যে ধরনের চলচ্চিত্র একই সাথে শিল্পমাধ্যম এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর দর্শকের মধ্যে সাম্প্রতিক সময় সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে যা হয়ে ওঠে সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

নব্বই বছর বয়সে গত সপ্তাহে মারা গেলেন আন্দজে ভাইদা। পোলিশ চলচ্চিত্রকে অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাজ-সচেতন চলচ্চিত্রকারদের চিন্তাসমৃদ্ধ ছবি তৈরিতে আগ্রহী এবং অনুপ্রাণিত করেছে ভাইদার কাজ। ২০০০ সালে ভাইদাকে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেয়া হয় সম্মানসূচক অস্কার। ২০০৬ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁকে দেয়া হয় সম্মানসূচক গোল্ডেন বেয়ার। ম্যান অফ আয়রন (১৯৮১) ছবির জন্য তিনি পেয়েছেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার গোল্ডেন পাম। তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্যরে ছবি কানাল (১৯৫৬) কান চলচ্চিত্র উৎসবে পায় সিলভার পাম আর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপ্রেসকি পুরস্কার অর্জন করে তাঁর তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি অ্যাশেজ অ্যান্ড ডায়ামন্ডস (১৯৫৮)। প্রমিজড ল্যান্ড (১৯৭৪) ছবির জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি পেয়েছেন গোল্ডেন প্রাইজ। আমরা দেখতে পাই ছবির মাধ্যমে দর্শককে সমাজ আর রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা করানোই ছিলো এই পরিচালকের লক্ষ্য। আর নিজের বক্তব্য তিনি প্রকাশ করেছেন নান্দনিকভাবে আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র ভাষার মাধ্যমে। ছবিতে কাহিনির সাথে সঙ্গতি রেখে তিনি ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন ধরনের নির্মাণশৈলী। পটভূমি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে তাঁর ছবির পদ্ধতি বা ফর্ম। আর সবসময়ই তা থেকেছে গতানুগতিকতা-মুক্ত। প্রকৃতপক্ষে ভাইদা যে ধরনের গভীর বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, তাঁর ছবির সংলাপ যেভাবে দর্শককে নিজের মনের এবং সমাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করেছে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই নির্মাণশৈলী হয়ে ওঠে নান্দনিকভাবে উদ্ভাবনী। এই ধরনের ছবিতে পরিচালক ছবির ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, সাধারণ দর্শকের বিনোদন চাহিদা তৃপ্ত করে আর্থিক মুনাফা নিশ্চিত করা কখনোই পরিচালকের উদ্দেশ্য নয়। তিনি দর্শককে ছবির কাহিনি এবং নির্মাণ পদ্ধতি দিয়ে সজাগ এবং উদ্বিগ্ন করতে চান। ফলে দর্শক-প্রিয় হালকা চলচ্চিত্র কৌশল ভাইদার মতো সমাজ-সচেতন চলচ্চিত্রকারের কাজে থাকার কথাও নয়।

Vaida-1তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ছবি কানাল (১৯৫৬) নির্মিত হয় নিও-রিয়েলিস্ট ধারায়। ১৯৪৪ সালে দখলদার জার্মান নাৎসি বাহিনির কবল থেকে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ মুক্ত করার জন্য পোলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের বিবরণ তুলে ধরা হয় এই ছবিতে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত শহর এই ছবিতে হয়ে ওঠে একটি প্রধান চরিত্র, আর যুদ্ধের বিপদের মধ্যেও দেখা যায় কমবয়সী মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে ভাবছে জীবনের কথা, আর সেই ভাবনা নিয়েই তারা প্রতিমুহুর্তে মুখোমুখি হচ্ছে মৃত্যুর। ছবির শুরুতেই শোনা যায় ভয়েস ওভার ন্যারেশন, সেই বর্ণনায় যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধারা এক একটি আলাদা চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয় দর্শকের কাছে। যুদ্ধের দানবীয়তায় যে শহর নরকে পরিণত হয়েছে সেই পটভূমিতে কাহিনি তুলে ধরার জন্য ভাইদা যথার্থভাবে ব্যবহার করেছেন নয়া-বাস্তববাদী ধারা, যেন প্রকৃত লোকেশনে চিত্রগ্রহণের মাধ্যমে দর্শকের কাছে ধ্বংসলীলার সঠিক বিবরণ তুলে ধরা যায়। আবার সত্তরের দশকে পোল্যান্ডের রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত এবং অস্থির সময়ে তৈরি ম্যান অফ মার্বল (১৯৭৭) ছবিতে শুরু থেকেই ভাইদা ব্যবহার করেছেন ঝাঁকুনিযুক্ত শট যা ক্যামেরা ট্রাইপডে না রেখে হাতে নিয়ে তোলা হয়েছে। এমন দৃশ্য দর্শককে প্রতিদিনের কষ্টকর বাস্তব অভিজ্ঞতার কাছাকাছি নিয়ে আসে। চলচ্চিত্রের মধ্যেই দেখানো হয় এক তরুণ চলচ্চিত্র-শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র ডিগ্রি অর্জনের জন্য ফিল্ম স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী ছবি তৈরির চেষ্টা করছে। দেখা যায় মুভি ক্যামেরা নিয়ে সেই শিক্ষার্থী নিজেই ধারণ করছে বিভিন্ন দৃশ্য। ছবিতে ব্যবহার করা হয় ‘সিনেমা ভেরিতে’ পদ্ধতি যেখানে চলচ্চিত্র-নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং যাদের সাক্ষাতকার নেয়া হচ্ছে তাদের সাথে কথোপকথনের দৃশ্য তুলে ধরা হয়। ফলে ছবি হয়ে ওঠে আত্মবাচক বা সেল্ফ-রিফ্লেক্সিভ। দর্শকের পক্ষে চলচ্চিত্রের গতানুগতিক বিনোদনমূলক বিভ্রমে বিভোর হয়ে বিনোদন পাবার কোনো উপায় থাকে না। এই ধরনের ছবি দর্শককে বোঝায় এখানে কোনো কল্পনার জগৎ তুলে ধরা হচ্ছে না। বরং চলচ্চিত্র কিভাবে তৈরি করা হয় তা দেখানোর মাধ্যমে দর্শককে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাবতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাস্তবতা সম্পর্কে চিন্তা করার এই পরিস্থিতি দর্শককে করে তোলে সক্রিয়। আর তখনি পরিচালকের দেয়া রাজনৈতিক বক্তব্য দর্শক সঠিকভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হন।

সত্তরের দশকে এবং আশির দশকের শুরুতে পোল্যান্ডে রাজনৈতিকভাবে অশান্ত সময়ে ভাইদা তৈরি করেন উইদাউট অ্যানেসথেশিয়া (১৯৭৮) ও ম্যান অফ আয়রন। নিজে একজন বামপন্থী হওয়া সত্বেও সমাজতান্ত্রিক পোল্যান্ডে সরকারি দমনমূলক আচরণ এবং মানুষের মুক্তচিন্তার সুযোগ না থাকার সমালোচনা ভাইদা তুলে ধরেন এই ছবিগুলোতে। এখানেও পরিচালক ব্যবহার করেন হ্যান্ড-হেল্ড ক্যামেরার ঝাঁকিযুক্ত শট, বিভিন্ন নিউজরিলের দৃশ্য। বিনোদনের মাধ্যমে পরিচালক তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরতে চাননি। কারণ গতানুগতিক বিনোদনের মাধ্যমে দেয়া সমাজসচেতন বক্তব্য দর্শককে উদ্বিগ্ন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে দর্শক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হয় না, বরং বিনোদনে বিভোর হয়ে ভুলে থাকে সমাজের সমস্যার কথা। ভাইদার রাজনৈতিক ছবির বক্তব্য ও নির্মাণশৈলী তাই প্রথাবিরোধী এবং প্রতিবাদী, দর্শককে তা উপস্থাপিত বিষয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। এই চেষ্টা শিল্পী হিসেবে ভাইদার সততার পরিচয় তুলে ধরে নিশ্চিতভাবে। পোল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত পরিচালক এমন ছবি তৈরি করেছেন যা সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা তুলে ধরেছে। একজন সচেতন চলচ্চিত্রকার এবং শিল্পী হিসেবে ভাইদা সরকারের সব আচরণের অন্ধ সমর্থক হননি।

তাঁর প্রথম দিকের ছবিগুলিতে আত্মবাচক পদ্ধতি ব্যবহার করা না হলেও বিভিন্ন সুচিন্তিত দৃশ্যের মাধ্যমে দর্শকের মনে গভীর অভিঘাত তৈরির চেষ্টা চোখে পড়ে। ভাইদা প্রথমে ছিলেন ফাইন আর্টসের ছাত্র। সরকারি ফিল্ম স্কুলে চলচ্চিত্র নিয়ে লেখাপড়া শুরুর আগে তিন বছর তিনি ছিলেন পেইন্টিংয়ের ছাত্র। ভাইদার ছবির বিভিন্ন দৃশ্যের শৈল্পিক রূপ পেইন্টিংয়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ আর দক্ষতা থাকার ইঙ্গিতই বহন করে। তাঁর প্রথম দিকের ছবিগুলিতে বিভিন্ন দৃশ্যে দেখা যায় নাটকীয়তা, উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলার জন্য এক ধরনের অতিরঞ্জন যা বারোক ধাঁচের শৈল্পিক রীতির অনুরূপ। অ্যাশেজ অ্যান্ড ডায়ামন্ডস নির্মিত হওয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে তৈরি ট্রিলজি। তিনটি ছবিতেই চোখে পড়ে বারোক রীতির ব্যবহার। অ্যাশেজ অ্যান্ড ডায়ামন্ডসও সমকালীন ছবি। যুদ্ধোত্তর পোল্যান্ডে রাজনৈতিক দ্বন্ধের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালকের বিষণ্নতা আর সমালোচনা স্পষ্ট হয়েছে এই ছবিতে। ছবির প্রধান চরিত্র তরুণ পোলিশ মুক্তিযোদ্ধা মাচেকের চরিত্রটি সারা ইউরোপেই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হতাশ, বিভ্রান্ত, ক্ষুব্ধ তারুণ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।

মাচেকের ভূমিকায় অভিনয় করেন ভাইদার প্রিয় অভিনেতা বিগনিউ সিবালস্কি। সিবালস্কির কালো চশমা পড়া, সাহসী কিন্তু আত্মপ্রশ্নে জর্জরিত বিভ্রান্ত অবয়বের মধ্যে সেই সময়ে ইউরোপের হতাশাগ্রস্ত তরুণরা যেন নিজেদেরকেই দেখতে পেয়েছিলো। ছবির প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় নিজের পার্টির নির্দেশে প্রতিপক্ষের একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করতে গিয়ে মাচেক ভুল করে অন্য দুজন মানুষকে হত্যা করে। দ্রুতই এই ভুল তারা বুঝতে পারে এবং মাচেককে আবার নির্দেশ দেয়া হয় সঠিক মানুষকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় এক হোটেলে মাচেকের সাথে হঠাৎই দেখা হয়ে যায় সেই নেতার কিছুক্ষণ আগেই যাকে মাচেক হত্যা করতে গিয়েছিলো। বার বার মাচেকের সাথে হোটেলে দেখা হতে থাকে সেই নেতার যাকে হয়তো কালই সে হত্যা করবে। হোটেলের বাইরে ঘুরতে যেয়ে সেই সন্ধ্যায় মাচেক এক চার্চে দেখতে পায় তার গুলিতে আজই প্রাণ হারানো সেই দুজন মানুষের মৃতদেহ। হোটেলের জানালা দিয়ে মাচেক হঠাৎই এক সময় পাশের কক্ষে দেখে ক্রন্দনরত এক তরুণীকে। জানা যায় নিহত দুজনের একজনের সাথে এই তরুণীর বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। এই দৃশ্যগুলির সাথে ভাইদার ক্যামেরা বার বার দেখায় মাচেকের অপরাধবোধে ক্লিষ্ট মুখ। জানা যায় মাচেক এবং তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সদস্যরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একসাথে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কিন্তু বিজয়ের পর নতুন সময়ে তারা ধ্বংস করছে একে অপরকে। যে সময়ে একসাথে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার কথা সেই সময় নিজেদের মধ্যে আত্মঘাতী সংঘাতে লিপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো। মাচেকের মধ্যে আমরা দেখতে পাই অনুশোচনা আর বোধোদয়। এক দৃশ্যে সে চিৎকার করে বলে: ‘আমি আর কিছুই চাই না, আমি কেবল বাঁচতে চাই। আমি কেবল দিনের পর দিন মানুষ হত্যা করতে আর লুকিয়ে থাকতে চাই না।’ কিন্তু বোঝা যায় মাচেকের দলের নেতারা তাকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দেবে না। শেষ দৃশ্যে পুলিশের গুলিতে রক্তাক্ত মাচেক তীব্র হতাশা নিয়ে পথে ছুটতে ছুটতে লুটিয়ে পড়ে। উজ্জ্বল, সাহসী যে মাচেক দেশের জন্য সম্পদ হতে পারতো রাজনৈতিক স্বার্থ আর হঠকারিতার শিকার হয়ে সে হারিয়ে যায় চিরতরে সেই দেশ থেকে যে দেশের মুক্তির জন্য সে যুদ্ধ করেছিলো। নিজ দেশের অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি ভাইদার তীব্র সমালোচনা স্পর্শ করে শুধু পোল্যান্ডেরই না, সারা বিশ্বের দর্শকদের।

Vaida-3অ্যাশেজ অ্যান্ড ডায়ামন্ডস ছবির প্রথম সিকোয়েন্সটিতে বিভিন্ন বিপরীত দৃশ্যের ব্যবহার ভাইদার চিন্তাশীলতার পরিচয় তুলে ধরে। একটি চার্চের বাইরে মাচেক এবং তার দুই সঙ্গী অপেক্ষা করছে রাজনৈতিক নেতার গাড়ি আক্রমণের জন্য। নির্জন সেই স্থানে আমরা শুনতে পাই অনেক পাখির মিষ্টি ডাক। হঠাৎ এক ছোট মেয়ে হাতে ফুল নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে এসে তাদেরকে বলে চার্চের দরজাটি খুলে দেয়ার জন্য। যারা মানুষ হত্যা করার জন্য অপেক্ষা করছে তারা মৃদু হেসে ছোট মেয়ের জন্য চার্চের দরজা খুলতে চলে যায়। একজন মেয়েটাকে কোলে করে উঁচুতে তুলে ধরে যেন মেয়েটি বেদীর উপর ফুল রাখতে পারে। এমন সময় দূরে দেখা যায় নেতার গাড়ি। মেয়েটিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে যুবকরা দ্রুত হাতে তুলে নেয় স্টেনগান। তারপর মাচেক গুলি করে ঝাঁঝড়া করে দেয় এগিয়ে আসা গাড়ি। যখন ক্লোজ শটে গাড়িতে নিথর হয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ দেখানো হয় তখন পেছনে দেখা যায় চার্চের দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি। অন্য আরেকজনকে গুলি করার পর সেই লোকটি চার্চের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে পড়ে যায়। যেখানে বহু মানুষ শুনতে পায় শান্তি, পবিত্রতা আর দয়ার কথা সেই স্থানে নিরস্ত্র একজন মানুষের মৃতদেহ গড়িয়ে পড়ে গুলির ধাক্কায়। চার্চ, যীশুর মূর্তি, ছোট মেয়ে, ফুলের পাশাপাশি এই সিকোয়েন্সে আমরা দেখি ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র, গুলিতে মানুষের জামায় আগুন ধরে যাওয়া, মানুষের যন্ত্রণাজর্জরিত মুখ আর করুণ মৃত্যু। পাখির সুমিষ্ট ডাকের পাশে শোনা যায় গুলির কর্কশ শব্দ। নিষ্পাপতা আর নির্মমতার দৃশ্য পাশাপাশি রেখে তৈরি এই মন্তাজের মাধ্যমে ভাইদা দর্শক-মনে সৃষ্টি করেন এক গভীর অস্থিরতা। আমরা বুঝতে পারি পরিচালক মুখোমুখি হতে চান সত্যের। তাঁর চলচ্চিত্র প্রকাশ করে জীবনের জটিল দিক। যে জটিলতা সম্পর্কে সচেতন না হলে সমাজ কেবল বিপদগ্রস্তই হতে থাকবে।

ভাইদার ছবির বিভিন্ন দৃশ্য প্রায়ই দর্শকের মনে আঘাত করে। কানাল-এ দেখা যায় খুব আকর্ষণীয় চেহারার এক তরুণী শুয়ে আছে একটি স্ট্রেচারের উপর। তার শরীরের নীচের অংশ চাদর দিয়ে ঢাকা। যুদ্ধরত এক পোলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিচিত এই তরুণীকে দেখে এগিয়ে এসে তার শরীর কেমন তা জানতে চায়। মেয়েটির মুখ বিষণ্ন, কিন্তু শারীরিক ব্যথার যন্ত্রণা নেই সেই লাবণ্যময় মুখে। ছেলেটির প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি জানায় তার আঘাত তেমন মারাত্মক নয়। তার পরমুহূর্তেই হাসপাতালের লোক মেয়েটিকে সহ স্ট্রেচার বহন করে নিয়ে যায়। মেয়েটির শরীর থেকে চাদর সরে যায় আর আমরা দেখি খুবই রূপবতী সেই তরুণীর একটি পা উরু থেকে পুরোটাই কাটা। সেই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা। এক তরুণীর সুন্দর মুখ আর তার উরু থেকে কাটা পা এই তীব্র ব্যথা জাগানো বৈপরীত্য দেখে নির্বাক হয়ে যেতে হয় ছবির দর্শককেও। ম্যান অফ মার্বল ছবিতে একটি দৃশ্যে দেখা যায় একটি বুলডোজার দিয়ে মাটি কেটে সমান করা হচ্ছে। দৃশ্যটি পোল্যান্ডের উন্নয়ন তুলে ধরছে মনে হলেও পরের দৃশ্যেই দেখা যায় একই বুলডোজার একের পর এক উপড়ে ফেলছে সুন্দর ফুল ফুটে থাকা চেরি গাছ। যান্ত্রিক অগ্রগতি যে মানুষের নান্দনিক উন্নতিও নিশ্চিত করবে তা মনে করার কোনো কারণ নেই এই মন্তাজ দৃশ্য তাই স্পষ্ট করে। ভাইদার ছবির সংলাপে সবসময়ই দেখা যায় গভীরতা। কানাল ছবিতে যুদ্ধে অংশ নেয়া এক তরুণী বলে: ‘যখন তুমি কাউকে ভালোবাসবে তখন মরে যাওয়া বেশি সহজ।’ অ্যাশেজ অ্যান্ড ডায়ামন্ডস ছবিতে দুই জন মানুষকে হত্যা করার পর সেই এলাকার রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে ধরে সাধারণ মানুষ। একজন প্রশ্ন করে: ‘আর কতো মানুষকে মরতে হবে? গত কয়েক বছরে এই দেশে কি যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ মারা যায়নি?’ সত্তরের দশকে তৈরি তাঁর অধিকতর রাজনৈতিক ছবিগুলির সংলাপেও উঠে আসে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা। ম্যান অফ মার্বল-এ তরুণ চলচ্চিত্রকার যখন একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে ছবি তৈরি করতে চায়, তখন ফিল্ম স্কুলের শিক্ষক তাকে নিরুৎসাহিত করতে থাকেন। তরুণ চলচ্চিত্রকারকে বলা হয়: ‘এমন ছবি কি আমি চাই, সমাজ চায় বা দর্শকরাই কি দেখতে চায়?’ কিন্তু ভাইদা ম্যান অফ মার্বল ঠিকই তৈরি করেন। অর্থাৎ দেশের কর্তাব্যক্তিরা এবং চলচ্চিত্র দর্শকরা প্রথাবিরোধী, গতানুগতিকতামুক্ত ছবি দেখতে না চাইলেও স্রোতের বিপরীতে থেকে সাহসী, সমাজসচেতন ছবি তৈরি করতে হবে ভাইদার রাজনৈতিক ছবি সেই বক্তব্যও তুলে ধরে।

কিন্তু পোল্যান্ডের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশে উইদাউট অ্যানেসথেশিয়া এবং ম্যান অফ মার্বল-এর মতো প্রথাবিরোধী রাজনৈতিক ছবিও বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। আপোষহীনভাবে তৈরি করা ভাইদার চিন্তাশীল ছবি অন্য পোলিশ চলচ্চিত্রকারদেরও বক্তব্যধর্মী ছবি তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করেছে এবং বহু দর্শকও এই ধরনের ছবি বোঝার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। ভাইদা তাই দেখেছেন তাঁর দেশে সত্য প্রকাশ করা প্রতিটি রাজনৈতিক ছবিই বাণিজ্যিকভাবে সফল। পোলিশ সাহিত্য অবলম্বনে তৈরি করা চলচ্চিত্রের প্রতিও দর্শকের আকর্ষণ যথেষ্ট। ভাইদা লক্ষ্য করেছেন তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক ছবিতে বাস্তবের নানা সমস্যা তুলে ধরার পরও রাষ্ট্র তা প্রচারে বাধা দেয়নি যা নির্দেশ করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিদ্যমান বাস্তবতা নিয়ে আলোচনায় ভীত ছিলো না। এমন সামাজিক পরিবেশই পোল্যান্ডে চিন্তাঋদ্ধ ছবির ধারা সমৃদ্ধ করেছে। ভাইদা একের পর এক তৈরি করেছেন সেই ধরনের ছবি যা মানুষের মাঝে সৃষ্টি করেছে রাজনৈতিক সচেতনতা। যেসব সমাজে চলচ্চিত্র বলতেই মনে করা হয় দর্শককে বিনোদন যোগানোর মাধ্যমে বাণিজ্যিক লাভ নিশ্চিত করা সেখানে তরুণদের মধ্যে চিন্তাশীল, সমাজসচেতন ছবি তৈরির আগ্রহ সৃষ্টি হবে না তাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মান নিয়ে এবং কোন্ ধরনের ছবির নির্মাণ এখানে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়া উচিৎ। অন্য অনেক বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকারের মতো আন্দজে ভাইদাও নিজের কাজের মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের নাম অক্ষয় করে রেখেছেন। আন্দজে ভাইদার চলচ্চিত্র বাংলাদেশে ভাল এবং চিন্তাশীল ছবি নির্মাণে আগ্রহী চলচ্চিত্রকার এবং চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে তাই প্রত্যাশা।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nira — অক্টোবর ১৩, ২০১৬ @ ৮:০৯ অপরাহ্ন

      Apnar likha ta pore valo laglo. Apni je movie gulor kotha likheechen shegulo dekhte agroho bodh korchi.

      Thank You..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Naadir Junaid — অক্টোবর ১৩, ২০১৬ @ ৯:০৬ অপরাহ্ন

      Many thanks for going through it and for your comment

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Robin — অক্টোবর ১৪, ২০১৬ @ ৯:৩০ পূর্বাহ্ন

      Waiting for your Aynabaji review.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ema — অক্টোবর ১৪, ২০১৬ @ ৬:১৪ অপরাহ্ন

      Thank you for analyzing Andrzej Wajda and his works for us, the common cine goers.
      The story line of ‘Ashes and Diamonds’ seems to be so much contemporary for our 1971 context. May be this is the quality of all great films that they present the issues which are universal in nature, eternal in charm and appeal and hold mirror to the society.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com