হক ভাই, আপনি আমার বিশ বছর বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন

আনিসুর রহমান | ১২ অক্টোবর ২০১৬ ১১:০৮ পূর্বাহ্ন

Syed+Shamsul+Haq_26092016_0001গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষাবধি থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যে সময়ে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বিদ্যালয় ও কলেজ জীবনের সময়কাল–এর কোনো পর্যায়েই সৈয়দ শামসুল হকের সাথে তো দূরের কথা তার নামটির সাথেই আমার পরিচয় ঘটেনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বুট ও জলপাই রঙের পোশাকের দাপটের সাথে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্দরে ও বাহিরে যেভাবে সাম্প্রদায়িকীকরণ চলছিল, তার ফল হিসেবে আমাদের সৈয়দ শামসুল হকের মতো কবিরা লেখকরা পাঠ্যপুস্তক থেকে নির্বাসিত হন।
আমার বাবা প্রান্তিক চাষী এবং আমাদের গ্রামটি একেবারে অজপাড়াগা দিগরবাইদ যা মধুপুর থানা সদর থেকে সাড়ে তিন মাইল ভেতরে। যেখান থেকে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা অথবা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কোন বইয়ের সাথে পরিচয় হবার সুযোগ আমার ছিল না। মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালীন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা প্রথম পড়েছি, আমার আজও সে কথা মনে পড়ে। ঐ বয়সে কবিতা আর কি বুঝি!
তারপর ১৯৯৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর কয়েকজন বন্ধুবান্ধর মিলে মধুপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করি এবং সাহিত্য পরিষদ থেকে অজনিকা নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। অজনিকা’র সম্পাদকের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হলে মধুপুরের কবি শামীম পারভেজের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। তিনি তখন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের ছাত্রাবাসে থাকেন। অজনিকা সাময়িকীটি ধারদেনা করে ময়মনসিংহের এক অফসেট ছাপাখানা থেকে ছাপিয়েছিলাম। তখন শামীম ভাইয়ের সাথে আমার বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল। শামীম ভাই সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে আমাকে কিছুটা ধারণা দিয়েছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন শামীম ভাই ‘চন্দ্রাবতীর কয়েকজন সন্তান’ নামে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর বছর খানিক পূর্বে অকাল প্রয়াত হয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে তার একটি কথা আজও মনে পড়ে, সৈয়দ শামসুল হক সাহিত্যের বহুবিধ শাখায় বিচরণ করলেও তিনি নিজেকে কবি হিসেবে দেখতেই পছন্দ করেন।

১৯৯৭ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হবার আগে সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে আর কোনো ধারণা আমার মাথায় ছিলো না। পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন যে পঠনেও কত টানাপোড়েনের কারণ হয় তা প্রতিনিয়ত হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।
সত্যি কথা বলতে কি ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হবার সাথে সাথে অধিকাংশ ছাত্র-শিক্ষকের আচরণে টের পেতে থাকলাম এটা যেন ঢাকা শহরের সুবিধাবাদী উচ্চ-মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত বড়লোকদের সন্তানদের একটি ক্লাব। যেখানে আমি যেন অনাহূত এক আগন্তুক। তারপর জেনে গেলাম ঐ বিভাগ থেকে বুদ্ধদেব বসু শ্রেণীকক্ষে উঁকি না দিয়ে করিডোর মাড়িয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ইতিহাস গড়েছেন। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল হাসান, মুহাম্মদ নরুল হুদার মতো প্রতিভাবানরা ইংরেজি বিভাগের কৃত্রিমতাকে উপেক্ষা করে এক একজন কবিতার জগতে দাপটের সাথে রাজত্ব করেছেন। এর মধ্যে সৈয়দ শামসুর হক, এবং আবুল হাসান গ্রাম থেকে এসেছেন। একজন কুড়িগ্রাম থেকে আরেকজন বরিশাল থেকে। এমনকি হুদা ভাই এসেছেন কক্সবাজারের দরিয়াপার থেকে। এই সত্য জেনে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচি। আবুল হাসান অকাল প্রয়াত হয়েছেন কয়েক দশক আগেই। তাই ভরসা আর সাহস আমার সৈয়দ শামসুল হকেই।
সত্য বলতে দ্বিধা নেই কেন যেন এরপর থেকে ইংরেজি বিভাগ আমার কাছে তুচ্ছ মনে হতে থাকে। বিভাগে যাই করিডোরে ঘুরঘুর করি। কবিতার পোকা মাথায় ঢুকে গেল অক্সফোর্ড অভিধান ঘাটাঘাটি কি আর ভালো লাগে? কিন্তু কূলকিনারা পাই না কিছুতেই। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, দিন দিন ইংরেজি বিভাগে আমি অনাহুত হতে থাকি। এর মধ্যে জহরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হবার সুবাদে অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে। তারপর কবিতা উৎসবের সুবাদে জেনে যাই তিনি একজন কবিও। সম্ভবত ১৯৯৮ কিংবা ১৯৯৯ সালে ২৭ ডিসেম্বর সকালে সামাদ স্যার নিয়ে গেলেন গুলশানে কবি সৈয়দ শামসুল হকের বাসায় – সেই থেকে জেনে গেলাম তিনি ছোট বড় সকলের হক ভাই। এই প্রথম কোনো বিশাল আঙিনা সমেত ঢাকা শহরের বড়লোকের বাসায় আন্তরিক আতিথেয়তা পেলাম। দিনটি ছিল হক ভাই’র জন্মদিন। হক ভাইয়ের সাথে আমার অল্প একটু কথাবার্তা হয়েছিল। কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ, তার চাহনি ও হাত বাড়িয়ে দেওয়া সবকিছুর মধ্যে এতোটা আন্তরিকতা অনুভব করলাম। আমি সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। দিনটা এক রকম ভালোলাগা ঘোরের মধ্যে ছিল। এরপরে বেশ কবার নানা উপলক্ষে তাঁর বাসায়, কবিতা উৎসবে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে হক ভাইয়ের সাথে আলাপ করার সুযোগ হয়েছিল।
একবার জাতীয় কবিতা উৎসবে পশ্চিম বঙ্গের কবি মন্দাক্রাান্তা সেন এসেছিলেন। আমি হক ভাইকে সালাম দিয়েছি। তিনি খেয়াল করেননি। পাশেই মন্দাক্রান্তার দিকে এতোটাই মেনাযোগ দিয়েছেন, আমার মতো ছোটখাটো লিকলিকে এক বালক তার নজরে পড়ে কি করে? তারপর অল্পবয়সী এক জেদ ও অভিমান চেপে বসে আমার মাঝে, না প্রতিষ্ঠিত মানুষের ছায়ায় আমার কি আসে যায়?
আর কোনোদিন হক ভাই’র বাসায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রে কবিতা উৎসবের দফতরে হক ভাইয়ের সহধর্মিনী আনোয়ার সৈয়দ হকের সাথে দেখা হলে বলতে পেরেছিলাম আমি আপনাদের বাসায় বেশ কবার গিয়েছিলাম। এমনকি আন্তরিক আতিথেয়তাও পেয়েছিলাম।
ভেতরে ভেতরে হক ভাইয়ের প্রতি আমি ঈর্ষান্বিত হতে শুরু করেছি। লেখালিখির ভূত দিন দিন আমাকে গ্রাস করছে। এদিকে পঠনপাঠনের দৈন্য আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল প্রতিদিন। আমি না পারি পেছাতে, না পারি এগোতে। এমন সময় প্রকাশিত হলো হক ভাইয়ের ‘মার্জিনে মন্তব্য’। হক ভাই নিজে বলে গেছেন। ‘মার্জিনে মন্তব্য’ বইটি একজন তরুণকে পনের থেকে বিশ বছর এগিয়ে নিবে। আর কারো বেলায় না ঘটলেও আমার বেলায় ঘটেছে তাই। হক ভাই আপনি আমার বিশ বছর বাঁচিয়ে দিয়েছেন। একবার সংক্ষিপ্ত আলাপে কথাটা হক ভাইকে বলতে পেরেছিলাম। তিনি কিছু না বলে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। হক ভাই আপনার ঐ তাকানোতে দূরের পথের ঈশারা ছিল কি?
হক ভাই সত্যিই আপনি আমাকে অনিশ্চয়তার চোরাবালি থেকে উদ্ধার করলেন। তা না হলে প্রান্তিক চাষীর ছেলে হয়ে আজও আমি লেখালেখিতে টিকে আছি কোন ভরসায়? একটি ঘটনা বিবৃত করে হক ভাই সম্পর্কে আমার কথা এই পর্বে শেষ করছি। হক ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখে। সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখে স্টকহোমের সুইডিশ লেখক সংঘের আয়োজনে লেখক ভবনে বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যের উপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন সুইডিশ কবি অরনে ইয়নসন যিনি ২০০৭ সালে আমাদের জাতীয় কবিতা উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। হক ভাই এবং আনোয়ার ভাবীর সাথেও অরনের আলাপ পরিচয় হয়েছিল। এই আলোচনা অনুষ্ঠানে অরনে আমার কাছে জানতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে আন্তর্জাতিক মান কতদূর এবং কিভাবে বিবেচিত হবে? এখানে উল্লেখ্য যে এই আলোচনায় আমার সাথে অংশ নিয়েছিলেন লেখক ইমদাদুল হক মিলন, কবি মাহমুদুল আমিন এবং নরওয়ের অনুবাদক জন ওয়াই জোনস। এক প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম আমাদের বড় লেখক সৈয়দ শামসুল হক পরলোকগত হলেন। যাকে তোমরা চিনো, কেউ কেউ। রবীন্দ্রনাথকে চেনো সকলেই। রবীন্দ্রনাথ আমাদের দ্বিতীয় পাসপোর্ট। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক শিক্ষক।
দ্বিতীয় শিক্ষক বুদ্ধদেব বসু। বুদ্ধদেব বসুর পরে যে নামটি আমাদের বলতে হবে তিনি সৈয়দ শামসুল হক। তাঁকে যদি আন্তর্জাতিক মানদন্ডে দেখতে চাও তাহলে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ব্রিটিশ কবি টি.এস. এলিয়টের সাথে তুলনা করে দেখো। যদিও হক ভাই’র সৃষ্টির পরিমান টি.এস এলিয়টের চেয়েও অনেকগুণে বেশি।
হক ভাই একই সাথে তাঁর সময় দেশ, জনগোষ্ঠিী, ইতিহাস ও ভাষাকে ধারণ করেছেন তাঁর তিন শতাধিক সাহিত্যকর্মে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ওমর শামস — অক্টোবর ১২, ২০১৬ @ ৫:৪৩ অপরাহ্ন

      হক ভাই আমার মামা, এই জাতীয় আলোচনা বাংলাদেশেই সম্ভব ! “বুদ্ধদেব বসুর পরে যে নামটি আমাদের বলতে হবে তিনি সৈয়দ শামসুল হক। তাঁকে যদি আন্তর্জাতিক মানদন্ডে দেখতে চাও তাহলে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ব্রিটিশ কবি টি.এস. এলিয়টের সাথে তুলনা করে দেখো। যদিও হক ভাই’র সৃষ্টির পরিমান টি.এস এলিয়টের চেয়েও অনেকগুণে বেশি। ” ???

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনিসুর রহমান — অক্টোবর ১৫, ২০১৬ @ ২:৫১ পূর্বাহ্ন

      `. . . বাংলাদেশেই সম্ভব`| বাংলাদেশ নিয়ে এতো কপাল কুচকানো কেনো? নাসা`র মার্কিন মুল্লুকে রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু আর সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে কোন ধরনের আলোচনা সম্ভব সেটা তো জানা গেলো না|

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com