উপনিষদের ফার্সী অনুবাদ সিরর-ই-আকবর এবং শাহযাদা দারাশুকোহ

আনিসুর রহমান স্বপন | ১০ অক্টোবর ২০১৬ ৭:৩০ অপরাহ্ন

upanishad-comboরেডিও তেহরানের বাংলা অনুষ্ঠানে এবং সাজমানে তাবলীগাতে ইসলামীর (আইপিও) বাংলা বিভাগে দীর্ঘ দশ বছর (১৯৮৬-৯৬) কাজ করার সুবাদে ফার্সী ভাষা ও সাহিত্য এবং পারস্য-দর্শনের সাথে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে। ঢেঁকি যেহেতু স্বর্গে গেলেও ধান ভানে সেহেতু ইরান-ইরাক এবং ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের প্রচন্ড চাপ ও বিপদের মাঝেও অব্যাহত রাখতে হয় শেকড়ের-সন্ধান। মধ্য-তেহরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য-দাপ্তরিক এলাকা মায়দুনে ভালী আসরের (ওয়ালী আছর স্কয়ার) ‘কেতাব ফুরুশীয়ে হাশেমীতে’ (হাশেমী বুক শপ) অগায়ে হাশেমী ও তার ভাই অগায়ে আলী (জনাব হাশেমী ও জনাব আলী) নামে দুই সহোদর মালিক আমাকে সন্ধান দিলেন দারাশুকোহর করা উপনিষদের ফার্সী অনুবাদ।
ভারত-সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্রের এ অনুবাদ সুদূর তেহরানে বসে পেয়ে কিঞ্চিৎ বেশী মূল্যেই সংগহ করতে হলো। লাল টুকটুকে রেক্সিনে সুন্দর বাঁধাই করা প্রচ্ছদের উপর সোনালী হরফে গ্রন্থ, গ্রন্থকার, অনুবাদক ও সম্পাদকের নামসহ সংস্কৃত লেখা ‘উপনিষদ’ শব্দ যুক্ত খন্ড দুটি।

এর মধ্যে প্রথম খন্ডে ৬৯৬ পৃষ্ঠা। শুরুতে ১০ পৃষ্ঠার টাইটেল, প্রিন্টার্স লাইন ও মুখবন্ধের পর আছে ৩৪৪ পৃষ্ঠ।
তেহরান সংস্করণের সম্পাদক ডঃ তারা চাঁদ ও ডঃ সাইয়েদ মহম্মদ রেজা জালালী নায়েনীর ভূমিকা।
এ ভূমিকার মধ্যে ও গ্রন্থের দু’খন্ডের বিভিন্ন অংশে দারাশুকোহ’র জীবন ও কর্ম সংশ্লিষ্ট চিত্র, পান্ডুলিপির ছবি এবং ভারতীয় রাষ্ট্র নেতাদের কাছে এ সংস্করণ হন্তান্তরের আলোকচিত্র রয়েছে। নতুন পৃষ্ঠা নং দিয়ে এরপর ৩৪২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ফার্সীতে সিরর-ই-আকবর নামে দারাশুকোহ’র করা উপনিষদের অনুবাদ। পৃষ্ঠা সংখ্যার ক্রমন্বয় রক্ষা করে শুরু করা দ্বিতীয় খন্ডের ৪৯০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঁচশ মুদ্রিত পৃষ্ঠায় এ অনুবাদ সুদীর্ঘায়িত হয়েছে।
প্রয়াত ডঃ তারা চাঁদ ভারতবর্ষের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী লেখক, গবেষক, অধ্যাপক। নেহেরুর মন্ত্রীসভায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষা মন্ত্রীত্বের সময় তিনি এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজ্য সভার সদস্য এবং ইরানে ভারতীয় দূতাবাসেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডঃ জালালী নায়েনীর সহযোগিতায় দীর্ঘ ৪ বছর ফার্সী-সংস্কৃত পাঠ-পর্যালোচনা করে তিনি দারাশুকোহর অনূদিত উপনিষদ সম্পাদনা করেন। এরপর ডঃ নায়েনী আরো ৪ বছর ধরে ফার্সীভাষী পাঠকদের জন্যে এতে ব্যবহৃত ‘সংস্কৃত’ শব্দের অর্থ ও ভাষ্য রচনা করেন।
অবশেষে দীর্ঘ ৮ বছর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ফার্সী ১৩৪০ (ইংরেজী ১৯৬২) সালে তেহরান থেকে এ গ্রন্থের প্রথম আধুনিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
১৯৬৩ সালের মার্চে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়াদিললীতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপললী রাধাকৃষ্ণনন এবং প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহেরুর কাছে এ গ্রন্থের কপি হস্তান্তর করেন সম্পাদকদ্বয়।
এভাবে তিনশতাধিক বছর পর ভারতেরই এক যুবরাজের সাধনার ফসল হাতে তুলে নেন তাদের উত্তরসূরীরা।

অবশ্য এর আগেও জয়পুর হতে দারাশুকোহ অনূদিত ফার্সী উপনিষদের একটি সংস্করণ তিন খন্ডে মুদ্রিত হয়েছিল। তবে ভারতবর্ষ ও বৃটেনে রক্ষিত বিভিন্ন ‘ফার্সী’ ও ‘সংস্কৃত’ পান্ডুলিপি এবং মুদ্রিত-সংস্করণ অবলম্বনে তুলনামূলক পাঠ পর্যালোচনা পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে ডঃ তারা চাঁদ ও নায়েনী আলোচ্য সংকলনের সংস্করণ তৈরী করেন।

বুৎপত্তিগত দিক হতে উপ+নি+সদ+ক্বিপ= ‘উপনিষদ’ শব্দের অর্থ গুরুর কাছে উপবেশন করে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান।
শংকরাচার্য কঠোপনিষদের ভাষ্য রচনা করতে গিয়ে বলেছেন ‘উপ’ শব্দের অর্থ নিকটে, ‘নি’ অর্থ নিশ্চিত রূপে, নিঃশেষ করে, ‘সদ’ অর্থ জীর্ণ, বিনাশ, গমন বা ত্যাগ করা। অর্থাৎ যে বিদ্যা মানুষের জন্ম-মৃত্যুর কারণ বা অবিদ্যাকে নিঃশেষে জীর্ণ বা বিনষ্ট করে সেই বিদ্যার নাম হচ্ছে ‘উপনিষদ’। অবিদ্যা বা অজ্ঞানকে নাশ করে যে বিদ্যা, জীবকে যা পরমব্রহ্মের কাছে নিয়ে যায়, পরম ব্রহ্মপ্রাপ্তি সাধন রূপ সেই পরাবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যাই ‘উপনিষদ’। উপনিষদের অনেক শাখা প্রশাখা রয়েছে।
দারাশুকোহ ১০৮টি উপনিষদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পান্ডুলিপি ও পাঠ পর্যালোচনা করে ৫০টিকে সংস্কৃত থেকে ফার্সীতে অনুবাদের জন্যে বেছে নিয়েছিলেন।
প্রখ্যাত ফরাসী পন্ডিত ও ভারততত্ববিদ অ্যাঁকেতিল দ্য পেঁর(Anquetil Du Perron) অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে ভারতবর্ষ সফরে এসে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার দরবারের ফরাসী রেসিডেন্ট ম. জেত(M.Gentil)এর মাধ্যমে ফার্সীতে দারাশুকোহর অনূদিত উপনিষদ-এর একটি পান্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। ম. বার্ণিয়ে (M. Bernier ) তা ফ্রান্সে নিয়ে যান।
পেঁর ফার্সী হতে লাতিন ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় এ গ্রন্থের অনুবাদ করেন। লাতিন অনুবাদটি ১৮০১/২ সালে গ্রন্থকারে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হলে পাশ্চাত্যে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ার এ গ্রন্থ পাঠ করে মুগ্ধ হন। তিনি একে পাশ্চাত্যের জন্যে উনবিংশ শতকের সবচেয়ে মূল্যবান আবিস্কার হিসেবে বর্ণনা করে জীবনের পরম প্রশান্তিদায়ক রূপে উল্লেখ করেন। তার উদ্যোগে জার্মানীতে শুরু হয় উপনিষদ চর্চা।
জার্মানির আরেক দার্শনিক শেলিং এবং ভারতত্ত্ববিদ পন্ডিত ম্যাক্সমুলার এ মহাগ্রন্থ চর্চা ও অনুবাদে এগিয়ে আসেন। রাজা রামহোমন রায় প্রথম ইংরেজীতে উপনিষদের অনুবাদ করেন। পরবর্তীকালে মার্কিন কবি দার্শনিক র‌্যালফ ওয়াল্ডো ইমার্সন উপনিষদের আত্মা-অন্তর্যামী তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বিশ্ব আত্মাতত্ত্ব প্রচার করেন।
কবি টি এস ইলিয়ট ‘ওয়াষ্ট ল্যান্ড’ কাব্য গ্রন্থের একটি কবিতায় দাম্যত, দত্ত, দয়ধ্বর্ম এ তিনটি ‘দ’ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।
‘উপনিষদ’ সম্পর্কে এ সাধারণ আলোচনার পর আমরা আধুনিক বিশ্বে ‘উপনিষদ’ চর্চার উৎস ও সূত্র দারাশুকোহ’র জীবন এবং কর্ম নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন ‘দারাশুকোহ’র সঠিক মূল্যায়ন এখনো বাংলা ভাষায় দুর্লভ। তাই এক্ষেত্রেও আমরা মুলতঃ ফার্সি উৎস ও সূত্রের উপইে নির্ভর করেছি।

১৬১৫ খ্রীঃ এর ২০ মার্চ (২৯ সফর ১০২৪ হিজরী) মোগল সম্রাট ‘শাহজাহান’ ও সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের জেষ্ঠপুত্র দারাশুকোহর জন্ম হয়। মোগল সিংহাসনের ভাবী উত্তারাধিকারী হিসেবে নবজাতককে দেয়া হয় “গুল-ই-আওয়ালীন-ই-গুলিস্তান-ই-শাহী” (শাহী বাগিচার প্রথম ফুল) উপাধি।
শাহজাদা-দারাকে শৈশব থেকেই শিল্পকলা-বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতি-আদব-কায়দা-রসম রেওয়াজের পাশাপাশি সমরবিদ্যাতেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
আরবী ফার্সী তুর্কী হিন্দী সংস্কৃত ভাষাতে তিনি বুৎপত্তি অর্জন করেন।
১৬৩২ খ্রীঃ চাচা শাহযাদা পারভেজের বালিকা কন্যা করিমউননিসা ওরফে নাদিরা বেগমের সাথে কিশোর দারাশুকোহর বিয়ে হয়।
১৬৩৩ সালে দারাকে ১২ হাজার জাট এবং ৬ হাজার সওয়ারের আঠার হাজারী মসনবদারী দেয়া হয়।
১৬৩৪ খ্রীঃ তাদের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণের কিছুদিন পরেই মৃৃত্যুবরণ করে।
সন্তান হারানোর বেদনায় মানসিকভাবে বিপর্যপ্ত দারা এ সময়ে সুফীবাদ ও আধ্যাত্ম সাধনার প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
১৬৩৪ সালে লাহোরের প্রখ্যাত সুফীসাধক মিঞা মীরের সাথে তার পরিচয় হয় এবং তিনি তার মুরীদ হন। এরপর আধ্যাত্ম সাধনার প্রতি তার ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে যায় মোল্লা শাহ বাদাখশানারীর কাছে। তিনি এ সাধকেরও শিষ্যত্ব নেন। অনুসারী হন কাদেরিয়া তরিকার।
শাহ মুহীবুললাহ এলাহাবাদী, শাহ দিলরুবা, গোসাই বাবা লাল, সারমাদ প্রমুখ হিন্দু-মুসলিম সুফী ও আধ্যাত্ম-সাধকের সাথে দারার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো।

১৬৪৯ সনে পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আব্বাছ মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত আফগানিস্তানের কান্দাহার দখল করে নেন। মোগল বাহিনী ৩ বার চেষ্টা করেও তা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।
১৬৫৩ সালে এক বিশাল বাহিনীসহ দারাশুকোহকে কান্দাহার পুনরুদ্ধারে পাঠানো হলেও যুবক শাহযাদা শোচনীভাবে পরাজিত হন।
ইতমধ্যে যুবরাজোচিত শৌর্য-বীর্য ও অন্যান্য গুণাগুণের চেয়ে অথর্ব, অযোগ্য এবং সুফী তরীকার নামে অনৈসলামী কার্যকলাপে লিপ্ত কাফের, মুরতাদ হিসেবে দারার দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে।
এসত্বেও ১৬৫৫ সালে সম্রাট শাহজাহান জেষ্ঠ পুত্র হিসেবে ‘দারাশুকোহকেই মোগল সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার বা যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করেন। উপাধি দেন “শাহে বুলন্দে ইকবাল” (ভাগ্যকাশের বিশাল অধিপতি)। এলাহাবাদ, পাঞ্জাব, সুলতান, কাবুলের সুবেদারীও দেয়া হয় দারাকে।
কিন্তু এসব জাগতিক কর্মকান্ডের চেয়ে আধ্যাত্মসাধনাতেই তিনি বেশী ব্যস্ত থাকেন। প্রশাসনিক তৎপরতা, সামরিক অভিযানের বদলে মহাসত্যের স্বরূপ সন্ধানে, পরমআত্মার সাথে মিলনের পথ অন্বেষণের সাধনাতেই কেটে যেতো তার অধিকাংশ সময়।
এহেন অপরিণাম ও অদূরদর্শিতার ফলশ্রুতিতেই সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার পর মোগল সিংহাসন নিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে ১৬৫৯ সালে তিনি সামুগড়ের যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত ও বন্দী হয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে নিহত হন।
দারাকে যতোই ‘মুরতাদ’, ‘কাফের’ বলা হোক না কেন তার সাধনা ছিলো ইসলামী সুফীতত্ত্ব এবং তরীকত-নির্ভর।
‘কাদেরিয়া তরিকায়’ ইহ ও পারলৌকিক মুক্তির সাধনা করেছেন তিনি আমৃত্যু। কোরানিক ও বৈদিক ধর্মাদর্শকে তিনি একই একেশ্বরবাদী আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করতেন।
সুফীতত্ব ও বেদান্ত দর্শনকে মনে করতে সমদর্শী। তার রচনাবলীতেও এ দৃষ্টিভঙ্গী পরিস্ফুট।
দারাশুকোহর প্রথম গ্রন্থ হচ্ছে সফিনাতুল আওলিয়া। ১৬৪০ সালে লেখা গ্রন্থের ৮টি অধ্যায়ে তিনি শতাধিক ‘আশুলিয়া’ দরবেশের জীবনী আলোচনা করেছেন। এর প্রথম অধ্যায়ে মহানবীর (সঃ) চার খলিফা (রাঃ আঃ), বার ইমাম (রহঃ)সহ ইসলামের প্রথম পর্যায়ের সুফী সাধকদের বর্ণনা রয়েছে।
এর পরের ৫টি অধ্যায়ে ‘কাদেরিয়া’ ‘নক্সবন্দীয়া,’ ‘চিস্তিয়া,’ ‘কুবরিয়া’ ও ‘সোহরাবর্দীয়া’ তরিকা নিয়ে আলোচনা। ৭ম অধ্যায়ে অন্যান্য ‘তরীকার’ সুফী সাধক এবং ৮ম অধ্যায়ে মহিলা সুফী সাধিকাদের বিবরণ রয়েছে এ গ্রন্থে।

রিসালাই হকনামা নামে ১৬৪৬ সালে রচিত গ্রন্থে দারগুকোহ সূফীতত্ত্ব ও সাধনার ৬টি স্তর বা পর্যায় বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে আলম-ই-নসুত (জাগরণ), আলম-ই-তাবকুত (নিদ্রা), আলম-ই-মালকাত (স্বপ্নহীন নিদ্রা), আলম-ই-লাহুত (আর্শীবাদ) সম্পর্কে প্রথম ৪টি অধ্যায়ে বর্ণনা রয়েছে। বাকী দুটি অধ্যায়ে রয়েছে হামা-উস্ত বা ওহাদাতুল ওজুদ (সৃষ্টির তত্ত্ব বা অবিনশ্বরত্ব বা দ্বৈতাদ্বৈত) সম্পর্কিত বর্ণনা।
ত্রিশটি মঞ্জিল বা অধ্যায়ে বিভক্ত তরিকাতুল হাকীক্বাত (সত্যের সন্ধান/পথ) নামক অপর গ্রন্থেও প্রায় একই বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন দারা।
শতাধিক সুফী সাধকের চিরন্তন বাণীর উদ্ধৃতি সংকলন হাসানুতুল আরেফিন বা সাথীয়াত (সাধকদের সুবচন) । দারাশুকোহ ১৬৫৩ সালে এ গ্রন্থনা করেন।
কবীরপন্থী সাধক বাবা লালের সাথে ১৬৪৯ সাথে দারার সাক্ষাৎ হয়। তাদের দুজনের মধ্যে সাধনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সারমর্ম সংকলন করেন দারার সচিব চন্দ্রভান ব্রাক্ষন। মাকালামত (কথপোকথন) নামে ১৬৫৩ সালে রচিত এ গ্রন্থটিতে ‘হিন্দু’ তথা ভারতীয় দর্শনের সাথে দারার সরাসরি পরিচয় ও অনুভূতি প্রথম ধরা পড়ে।
ভারতীয় ও ইসলামী দর্শনের মধ্যে সাদৃশ্য ও সমন্বয় প্রমানের জন্য ১৬৫৬ সালে দারাশুকোহ মাজমায়ুল বাহরাইন (মহাসমুদ্র সঙ্গম) গ্রন্থটি রচনা করেন। এ উভয় দর্শনে দারার গভীর বুৎপত্তি এবং অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ এ গ্রন্থে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
এর পরেই দারাশুকোহ ফার্সীতে শ্রীমদ্ভাগবত-গীতার অনুবাদ করেন।
১৬৫৭ সালের ২৬ জুন (সোমবার) ‘সিরর-ই- আকবর’ (শ্রেষ্ঠতম গুপ্ত রহস্য বা মহত্তম বাণী) নামে ৫০টি উপনিষদ-কাহিনী ফার্সীতে অনুবাদ শেষ করেন দিল্লীর ‘নিযামাবাদ’ প্রাসাদে।
কাব্যরসিক দারাশুকোহর লেখা ফার্সী গজল ও চতুর্পদী রুবাই সংকলিত হয়েছে তার দিওয়ান-এ (কাব্য সংকলনে)।
‘সত ভূমিকা’ নামে আধ্যাত্ম সাধনায় ষড়-স্তর নিয়ে রয়েছে তার হিন্দী ভাষায় রচিত পুস্তিকা ।
গোস্বামী নরসীমা সরম্বতীকে তিনি ‘সংস্কৃতে’ পত্র লিখেছেন। ১৬৪১/৪২ সালে প্রিয়তমা স্ত্রী নাদিয়া বেগমকে দেয়া ‘ক্যালিওগ্রাফি ও চিত্র সংকলনের ভূমিকা লিখেছেন দারা ।
যোগবশিষ্ঠ নামে সংস্কৃত গ্রন্থের পরিমার্জিত শুদ্ধ ফার্সী সটিক অনুবাদও করেছেন দারাশুকোহ।
দাবার সমস্ত রচনাবলী ও জীবন দর্শনের বক্তব্য এক ও অভিন্ন। আর তা হচ্ছে পরমসত্য ও সত্ত্বা এক ও অভিন্ন। সমস্ত ধর্ম ও দর্শনের মূল বাণী ও উদ্দেশ্য অভিন্ন এবং তা হচ্ছে পরমাত্মার সাথে মিলনের পথ খুঁজে বের করার জন্যে জ্ঞান সাধনা। বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে চর্চা মানুষের মধ্য হতে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সংকীর্ণ সাম্প্রাদায়িকতা ও অন্ধ-কুসংস্কারের উচ্ছেদ করবে।
সুফীবাদ ও দর্শনের প্রতি দারার অাসক্তিই তাকে উপনিষদ চর্চায় ব্যাপৃত করে।
ইসলামী সুফী মানসুর হাল্লাজের ’আনাল-হক (আমিই পরম সত্য, চরম অস্তিত্ব)’ তত্ত্ব তাকে বেদান্ত দর্শনের সত্যম-প্রজ্ঞা-আনন্দ>সত্যম-জ্ঞান-অন্যতম> মৎ-চিৎ-আনন্দ’ তত্ত্বের সাদৃশ্য সন্ধানে ব্যাপৃত করে।
‘হতৎ ভই তৎ’, ‘তৎ তত্ত্বমসি’, অহম ব্রহ্মসি’ প্রভৃতির মধ্যে তিনি নিত্যানিত্য দ্বৈতাদ্বিত, সর্বেশ্বর, একেশ্বরবাদ তত্ত্বের মধ্যে দারা সুফীতত্ত্বের উৎস ও ছায়া খুঁজে পান।
আল কোরআনের আল-ওয়াকেয়াহ সুরা ৭৭ থেকে ৮০ আয়াতে পরম প্রভুর কাছ থেকে নাযেলকৃত গ্রন্থের রহস্য ‘কিতাবুন মাকনুন’-এ লিপিবদ্ধ রয়েছে বলে উল্লেখ করায় তিনি উপনিষদকে সেই সুরক্ষিত গুপ্ত রহস্যপূর্ণগ্রন্থ বা কিতাবুন মাকনুন হিসেবে মনে করে ‘উপনিষদ’ চর্চায় আত্মানিয়োগ করেন।
কেননা দারাশুকোহর মতে উপনিষদেই নিহিত রয়েছে এক, একক, সর্বেশ্বরবাদের মূল সূত্র গুপ্ত রহস্য। যুগে যুগে নাজেলকৃত ঐশী গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও রহস্যের সূত্র উপনিষদেই নিহিত রয়েছে। অনুবাদের জন্যে উপনিষদ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দারার এ মানসিকতা স্পষ্টভাবেই ধরা পড়েছে।

বিদেশী ভাষায় উপনিষদের প্রথম অনুবাদ হিসেবে যেমন দারাশুকোহর সিরর-ই-আকবর ঐতিহাসিক গুরুত্বের অধিকারী তেমনি মূলানুগ বিশ্বস্ততার দিক থেকেও তা অতি উচ্চমানের। সংস্কৃত মূলের সাথে মিলিয়ে পাঠ পর্যালোচনা করলে পন্ডিত ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই এতে অনেক গবেষণার খোরাক পাবেন।
মধ্যযুগীয় রাজ ও সামন্ততন্ত্রের মধ্যে একরকম এজন উদার প্রগতিশীল এবং ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানী পন্ডিত ও সাধক সত্যিই দুর্লভ।
দারাশুকোহর সমস্ত রচনার মধ্যে উপনিষদের অনুবাদ সিরর-ই-আকবার হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম।
সংস্কৃত ও ফার্সী ভাষা, ভারতীয় ও ইসলামী দর্শনে গভীর বুৎপত্তি এতে সুস্পষ্ট এবং সিরর-ই-আকবার অনুবাদ আশ্চর্যরকম মূলানুগ। উভয় দর্শনের মধ্যে সাদৃশ্যপূর্ণ ভাব, ভাষা, পরিভাষা তিনি যেখানে প্রয়োজন হয়েছে সেখানে ব্যবহার করেছেন। যোগ করেছেন শঙ্করাচার্যের মতো মনীষীদের ভাষ্য। যেখানে প্রয়োজনীয় ফার্সী প্রতিশব্দ বা পরিভাষা পাননি সেখানে মূল সংস্কৃত শব্দই রেখে দিয়েছেন।
সংস্কৃতে উপনিষদের বিভিন্ন ভাষ্য, সংকলন ও সংস্করণের পাঠভেদ ফার্সী অনুবাদেও লক্ষণীয়। তবে দারা প্রধানতঃ দিল্লী ও বেনারসের পন্ডিতদের সংকলিত উপনিষদকে সিরর-ই-আকবার অনুবাদের জন্যে বেছে নিলেও অন্যান্য সংকলনের সাথে পাঠ-ভেদেরও পর্যালোচনা করেছেন।
আমরা এই জ্ঞানী মনীষীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাচ্ছি।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাহানা মৌসুমী — অক্টোবর ১০, ২০১৬ @ ৮:৫২ অপরাহ্ন

      তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। ভাল লাগল। সম্রাট শাজাহানের এই দার্শনিক-পুত্র প্রণীত উপনিষদের ফার্সি অনুবাদ কেউ বাংলায় তর্জমা করলে আরও ভাল লাগবে। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shamsul Alam Mukul — অক্টোবর ১১, ২০১৬ @ ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

      An honest man’s try to explain an honest way to reach almighty creator, who was misunderstood at his time.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খালেদ সাইফুদ্দীন আহমেদ — অক্টোবর ১১, ২০১৬ @ ১:৪৭ অপরাহ্ন

      চমৎকার উপস্থাপনা
      برای شما آرزوی موفقیت می کنم

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন muhammad samad — অক্টোবর ১১, ২০১৬ @ ৪:১৩ অপরাহ্ন

      It’s amazing. I knew about it but not to the extent presented by the author. Thank you very much Mr. Swapan.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. S. Hoque — অক্টোবর ১২, ২০১৬ @ ১২:৫৭ অপরাহ্ন

      Dear Mr.A.R .Swapan
      Thank you very much for your valuable , informative article of one of unfortunate mughal prince.can you give me information about these books either in English or bengali print , where to buy and get copies in Iran.
      Regards
      Dr. Hoque.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন A R Swapan — অক্টোবর ১২, ২০১৬ @ ৯:২৪ অপরাহ্ন

      Thanks all who shown their keen interest about the article on Upanishad translated by Mughal crown prince Dara Sukoh.
      If you want to get more details with photos about this article, you can contact with bdnews24.com or can send your e-mail address to me.
      My next article would be send to the editor of this site on ‘Avesta or Zind Vesta’, the forgotten holy book of Zoroastrians.
      With hope for your continuous touch and support.

      Anisur Rahman Swapan

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — অক্টোবর ১৩, ২০১৬ @ ৬:৪৭ অপরাহ্ন

      “কোরানিক ও বৈদিক ধর্মাদর্শকে তিনি একই একেশ্বরবাদী আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করতেন। সুফীতত্ব ও বেদান্ত দর্শনকে মনে করতেন সমদর্শী।”- কী অসামান্য অনুধাবন ! এই জ্ঞান এবং চিন্তা এবং চিন্তার প্রকাশ আজকের এই পৃথিবীতে সবচে’ জরুরী । একটি ভালো এবং অতি সময়োপযোগী লেখা । লেখকের কাফেলায় আমিও আছি ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — december ২০, ২০১৬ @ ১০:৩৪ অপরাহ্ন

      It is not only amazing to get all such valuable information about Upanishad in Persian, English, French and other languages. I would like to thank Mr. Swapan through bdnews24.com for his valuable contribution, and would also request him to mail me a few facsimili copies of the Persian version by the ever-memorable mughal prince, Dara Sikoh. My email address is: tofayel.mostafa54@gmail.com . Shall remain grateful to Mr. Swapon .

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Barun Kumar Rahut — মার্চ ১১, ২০১৭ @ ৩:১৪ অপরাহ্ন

      ভালো লাগল….। এধরণের রচনা পড়ে নতুনদের অনেক জানার আছে বলে মনে হয়

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com