শারদীয় উৎসব বাংলার সবার

সাহানা মৌসুমী | ৯ অক্টোবর ২০১৬ ৮:১১ অপরাহ্ন

31_Puja_Kolabagan_071016_0014বাংলার শরতের অনুষঙ্গগুলো সত্যিই অনন্য। নীল আকাশে শাদা মেঘ। নদীর বাতাসে দুলতে থাকা তীরঘেঁষা কাশবন। শিশিরভেজা ঘাসে ঝরা শিউলির গন্ধমাখা ভোরবেলা। আর শারদীয় দুর্গোৎসবের বর্ণিল সম্ভার। ঢাকের শব্দে- শঙ্খ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠা বাংলার গ্রাম-গঞ্জ-শহর-বন্দর। ধূপের প্রাচীন গন্ধে যেন ভেসে আসে বাংলার হাজার বছরের আধ্যাত্মিক ইতিহাস।
তিন হাজার বছরেরও আগে- আর্যদের সেই ঋক সংহিতার যুগ থেকে শুরু হওয়া নানা উপচারের যজ্ঞ অনুষ্ঠান যেন ইতিহাসের পাতা থেকে নেমে আসে মণ্ডপে মণ্ডপে। বিশেষ করে বাংলায় সনাতন ধর্মের আরাধনার যে ধরণ ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার নান্দনিক রূপটা চোখে পড়ার মতো। এই নান্দনিকতা এসেছে এই নদীভরা দেশের শ্যাম ছায়াঘন অববাহিকার হাজার ধরণের ফুল-ফল-পত্রপল্লবের সৌন্দর্যময়তা থেকে।শারদীয় পূজায় ফুলের অঞ্জলিতে- নদীজল ভরা ঘটে- লতাপাতায়- মঙ্গলদীপে- হাতে আঁকা আলপনায়- সুরের ব্যঞ্জনায় যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তার নন্দনতাত্বিক মূল্য অসামান্য।
দেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ-এ উৎসবের লতা পাতায় জড়ানো এক অনুষঙ্গ। বাংলার নয় রকমের গাছের পাতা দিয়ে গড়া দেবী দুর্গার আরেক রূপ- নবপত্রিকা। নয় ধরণের পাতা- তাই নাম নবপত্রিকা। ধানপাতা- হলুদপাতা- অশোকপাতা- বেলপাতা- ডালিমপাতা-কচু আর মানকচুর পাতা-জয়ন্তিপাতা আর কলাপাতা। এই নয়টি গাছের পাতা আবার বাঁধা হয় নীল অপরাজিতার লতা দিয়ে। এরপর সেই বৃক্ষ প্রতিমাকে পরানো হয় বাংলার তাঁতির হাতে বোনা লালপেড়ে শাড়ি। এ প্রতিমার নাম কলাবউ। সমৃদ্ধির প্রতীক। যথার্থই, বৃক্ষ ছাড়া আর কী হতে পারে সব অর্থে সমৃদ্ধির প্রতীক- এই পরিবেশ বিপর্যয়ের যুগে? বাংলার ধানপাতা- হলুদপাতা- তাঁতের লালপেড়ে শাড়ির এই উৎসব কি তবে সব বাঙালির নয়!

সন্ধিপূজায় যে দীপ ধূপ আরতি পুষ্পাঞ্জলি আর একশো আটটি দীপের দীপমালা দিয়ে দীপাঞ্জলি হয়- সে দীপ গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে জ্বলা মাটির প্রদীপ। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অপরাধে কবিকে হত্যা করা হলে যে দীপের শিখা হয়ে তিনি বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়তে চেয়েছিলেন- সেই মাটির প্রদীপ! আর ধূ্পের সুগন্ধী ধোঁয়া হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষকে কীট-পতঙ্গমুক্ত পরিবেশ আর ধ্যাননিমগ্ন হবার প্রণোদনা দিয়ে আসছে। আর এই একশো আট সংখ্যক দীপ- আমাদের মনে পড়ে আরেক কবিকে! তাঁর সেই একশো আটটা নীলপদ্মের কথা – বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনা-হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে- কেবল বরুণার জন্যে!
এই মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে প্রতিবাদে উচ্চকিত কবির মরে গিয়ে মাটির প্রদীপ হয়ে দুঃখী বাংলার ঘরে ঘরে একটুখানি আলো হয়ে জ্বলার ইচ্ছেটা কি আমাদেরও নয়! আর একশ আটটি নীলপদ্মের কাব্যগাঁথা?

কোনো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক মনন অনেকটা বাঁধা থাকে তাদের সঙ্গীত-বীণার তারে তারে। গানের ইন্দ্রধনু মানুষকে ভাসতে শেখায় সপ্তবর্ণা কল্পনায়। সুরে-ছন্দে মানুষ পায় সৌন্দর্যবোধের মানবীয় পাঠ। দু’ তিন দশক আগেও দেশজুড়ে শহরে গ্রামে শারদীয় পূজামণ্ডপ থেকে মাইকে ভেসে আসা আশ্চর্য সুন্দর সব গানের সুরে মন হারায়নি কার! রাতের নির্জনতায় যে শোনে নি সেই দূর থেকে ভেসে আসা সুর- সে জানেনা তার অনির্বচনীয় সুষমা!

রবীন্দ্রনাথ ভোজ্য বিষয়ে বলেছিলেন, ‘…কাব্যে সে কথা হবে না মানানসই/ তুচ্ছ শোনাবে, তবু সে তুচ্ছ কই।’ বাসনার অন্যতম অধিষ্ঠান রসনায়! এ উৎসবে হিন্দু বাড়িতে লুচি তরকারি, নানা নিরামিষ পদ, ডাল, বিভিন্ন ধরণের চাটনি, কিংবা অন্তত নারকেল নাড়ু- মোয়ার স্বাদ পায় নি এমন অভাগা কি কেউ আছে দেশে!সাধারণভাবে বাঙালি ডাল ভাত মাছ আর বিলাসরূপে মোগলাই- এর পাশে এসব খাবারও তো আমাদেরই খাবার। খাদ্যের প্রকরণ- বিশেষত্ব-পরিবেশন-সৌন্দর্য এসবও কোন অঞ্চলের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যে অধ্যাত্মবোধে পূজারী-ভক্ত প্রতিমার সামনে প্রণত হন- কোনো এক করুণাময়ী মাতৃরূপকে আশ্রয় করে একান্ত আরাধনায় পৌঁছে যেতে চান মঙ্গলময় ঈশ্বরের সান্নিধ্যে- সেটা তাঁর নিজস্ব ধর্মবোধ। একেশ্বরবাদীর অধ্যাত্মবোধের সাথে এর ভিন্নতা থাকতে পারে।বস্তুত, নিরাকার স্রষ্টার আরাধনার অন্য এক অতুলনীয় ব্যাপ্তি ও সমগ্রতার দিক রয়েছে। আর নিরীশ্বরবাদীর প্রত্যক্ষণ-নির্ভর বিশ্ব ও সমাজ-চেতনা এবং মানবীয় উপলব্ধির ধরণও আলাদা।

কিন্তু যুগ যুগ ধরে বাংলার আহার- পরিধেয় আর প্রকৃতির যে সব চিহ্ন, সাংস্কৃতিক যে সব অনুষঙ্গ শারদীয় দুর্গোৎসবে যুক্ত হয়ে আছে তার উত্তরাধিকার সকল বাঙালির। প্রকৃতি-নির্ভর এই উৎসবের সৌন্দর্য- এই পলিমাটির দেশ, এই ষড়ঋতুর দেশ থেকে সৃষ্টি। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস রূপায়িত হয়ে ওঠে এই উৎসবের আচার-অনুষ্ঠানে। এই উৎসব তাই বাংলাদেশের সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। এ উৎসব বাংলার সবার।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — অক্টোবর ১০, ২০১৬ @ ১২:২২ পূর্বাহ্ন

      যদিও সংস্কৃতি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান, তবু তার মৌল মোটিফগুলো দৃশ্যমান । লেখাটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছি । সাহানা মৌসুমীর এই লেখাটি আরও একবার পড়তে চাই । বিজয়ার শুভেচ্ছো এবং ধন্যবাদ, আপনাকে, সাহানা মৌসুমী !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শোহেইল মতাহির চৌধুরী — অক্টোবর ১০, ২০১৬ @ ৫:২২ পূর্বাহ্ন

      ধর্ম নয় ধর্মাচারের মধ্যে যুক্ত থাকা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের সূত্রে উৎসবগুলোকে শুধু ধার্মিকের নয় মানুষের দাবী করার এই মৌল চেতনাকে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাই আমাদের পৃথিবীতে। ধন্যবাদ সাহানা মৌসুমীকে তিনি অনুষঙ্গগুলো ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন আমাদেরকে। ধর্ম যে অধুনা বিশ্বময় আতংক তৈরি করে রেখেছে তার বিপরীতে আমরা হয়তো সংস্কৃতিকে খুঁজে পাবো ধর্মাচরণে, খুঁজে ধর্মাতিরিক্ত সার্বজনীনতাকে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন arif — অক্টোবর ১১, ২০১৬ @ ১১:০৮ পূর্বাহ্ন

      First of all This festival is not for everyone. It is a religious festival Which belongs to the believer of that religion and it contains activity of rituals to their GODS. I do not understand how come it became festival for all. My advise to the author when you write something please write about the fact not about your own feelings.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Khan Asad — অক্টোবর ১২, ২০১৬ @ ৫:১৯ অপরাহ্ন

      “কিন্তু যুগ যুগ ধরে বাংলার আহার- পরিধেয় আর প্রকৃতির যে সব চিহ্ন, সাংস্কৃতিক যে সব অনুষঙ্গ শারদীয় দুর্গোৎসবে যুক্ত হয়ে আছে তার উত্তরাধিকার সকল বাঙালির।” এই উপলব্দিটা গুরুত্বপুর্ন অসাম্প্রদায়িক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। ধর্মাচারের বহিরাবরণ ভেদ করে, সংস্কৃতিকে দেখা, দেখতে প্যারাটা সম্ভব হলে, ধর্ম যার যার কিন্তু উৎসবটা সবার হয়ে উঠতে পারে।

      চমৎকার সুখপাঠ্য লেখা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খুররম — অক্টোবর ১২, ২০১৬ @ ৭:৩৯ অপরাহ্ন

      সাহানা, ঐ লোক যেহেতু ইংরেজিতে লিখেছে, আমিও তাই ইংরেজিতেই জবাব দিলাম। তাকে উল্লেখ করিনি। শেষ দুটো লাইন তাকে উদ্দেশ্য করে আরও স্পষ্টভাবে বলা। তবে চাইলে লাইন দুটো বাদ দিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমি ওখানে মানে bdnews-এর মন্তব্যে লেখাটা দিতে পারছি না। সাবমিট হচ্ছে না কোনো কারণে। লেখাটার আসল কথাটা হলো ritual আর festival-এর পার্থক্য ঐ লোক বুঝতে বুঝতে পারেনি। বা বুঝতে চাচ্ছে না। যেহেতু আমি মন্তব্য দিতে পারছি না- যে কোনো উপায়ে এই লেখা এভাবে বা এর থিম নিয়ে আপনি বা অন্য কেউ যদি ওখানে মন্তব্যে দিতে পারে আমি খুবই খুশি হবো। কারণ ঐ মৌলবাদীকে একটা জবাব অবশ্যই দেওয়া দরকার।
      Very well written article by Shahana Moushumi. She has described some of the cultural aspects of the festival very nicely and in detail. Especially the significance of 108 number of ‘Nilpoddo’ and the nine number of leaves from nine different trees. This indicates the value and importance of trees and greenary in and around our life. In order to emphasise this importance a prominent poet says ‘Green is the eternal tree of life’. Also we see the mention of 108 ‘Nilpoddo’ in a poem of love written by famous bengali poet of modern times Sunil Ganguly. The author of this article already mentioned it in her article without mentioning the name of the
      poet though.
      Every religious ceremony has two vital parts. One is the ritual part. And the other is festival. We should not confuse one with the other. Ritual is the religious part, celebrated and followed by the believers of that particular religion. But the festival and the festivity part is open to all and enjoyed by all. This part includes arts, potteries, songs, dances, food etc. This is why Muslims go to Puja Mondop to see the Protima, enjoy the songs and dances. This is why we have a popular saying in bengali – ‘ধর্ম যার যার। উৎসব সবার।’ This is the main theme of this article written so gracefully by Shahana Moushumi.
      Those who question the all encompassing nature of the festivity part of a religious ceremony is because they are unable to understand the difference between rituals and festivity. Or they do it intentionally as they have other agendas.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com