মোঃ দরবেশ আলী খান: আমার পিতার মুখ

বিপাশা আইচ | ৮ অক্টোবর ২০১৬ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

আমরা এক সময় পিরোজপুরে থাকতাম। আমার শৈশব কেটেছে সেখানে। আমার আব্বা মোঃ দরবেশ আলী খান পিরোজপুর সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। সেই সুত্রে আমাদের পিরোজপুরে বসবাস করতে হয়েছিল বেশ কয়েক বছর। তারপর আব্বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন বলে আমরা ঢাকায় চলে আসি।
কিন্তু পিরোজপুরের সেই দিনগুলো আমার মনে বিশেষভাবে দাগ কেটে আছে। আজকের যে আমি, আমার বিশ্বাস, জীবন বোধ, ভালোবাসা তার অনেকটাই পিরোজপুরে তৈরি হয়েছে। জীবনের অনেকটা জুড়ে আছে আমার জন্মস্থান, আমার নানা বাড়ি খাজুরিয়া ও পিরোজপুর।
আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি ঢাকায়। তবুও মনে হয় ঢাকার থেকে বেশি পেয়েছি খাজুরিয়া ও পিরোজপুরে। খাজুরিয়া ছিল একটা অজ পাড়াগাঁ। পিরোজপুর ছিল সাবডিভিশন শহর, অর্থাৎ অর্ধেক গ্রাম।
Darbesh-1
তার মানে এই হল যে শহরের চেয়ে গ্রাম আমাকে বেশি টানে। লরা ঈঙ্গলস ওয়াইল্ডারের মতো ঘাসের বনে, নদীর তীরে ছুটোছুটি করে জীবন কাটানোর স্বপ্নও দেখেছি বহুদিন। যদিও বুঝতে পারি এখন আর গ্রামে গিয়ে বসবাস করা সম্ভব নয়। শহরের জীবনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
আমরা যখন পিরোজপুরে থাকি প্রিন্সিপাল হিসেবে আব্বা যথেষ্ট ভালো রোজগার করতেন। কিন্তু আমরা কখনই কোন বিলাসিতায় অভ্যস্ত ছিলাম না। আব্বা গরীব আত্মীয় স্বজন, এমনকি স্বল্প পরিচিত গরীব ছাত্রদেরও লেখাপড়ার দায়িত্ত নিতেন। এমনকি দল বেঁধে প্রতিদিন গরীব ছাত্ররা আমাদের বাসায় এসে ভাত খেয়ে যেতো। তাই আমরা ভাইবোনেরা বছরে একবার মাত্র নতুন কাপড় পেতাম। তাও ঈদের সময় নয়। ঈদে আব্বা যেসব নতুন কাপড় কিনতেন সেগুলো আমরা পেতাম না। গরীব আত্মীয় স্বজনদের সেগুলো দিয়ে দেয়া হতো। মনে মনে খুব কষ্ট পেলেও মুখে কোনদিন সে কথা বলিনি।
অনাড়ম্বর জীবন যাপনের এবং সবকিছু অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়ার যে শিক্ষা আব্বা সারা জীবন শিখিয়েছিলেন তা ঠিক মতো শিখতে পারিনি। আবার ভুলতেও পারিনি পুরোপুরি।

Dorbesh Ali-1পিরোজপুরে হরি কবিরাজ নামে একজন কবিরাজ ছিলেন। তাকে আমরা কবিরাজ দাদু বলে ডাকতাম। ছোট খাটো অসুখ হলে কবিরাজ দাদু আমাদের বাসায় আসতেন। ধবধবে সাদা ধুতি পান্জাবী পরে থাকতেন সবসময়। মা তাকে বসিয়ে রেখে অনেকক্ষণ ধরে নানান রকম গল্প করতেন। বাড়ির সবার সম্পর্কেই নানান রকম অসুখের বর্ণনা করতেন। কার পেটব্যথা, কারো কাশি, ঘুমের ঘোরে কে বেশি নড়াচড়া করে এমন অভিযোগও থাকতো। দাদু খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব শুনতেন। দুএক দিন পর আবার আসতেন, সাথে নিয়ে আসতেন নানা রকম ওশুধ। গাঢ় খয়েরী রঙের গোল গোল বড়ি। সাদা কাগজের পুরিয়ার ভেতর থাকতো বড়িগুলো। পুরিয়াগুলোর উপরে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা থাকতো ওশুধ খাওয়ার নিয়মাবলী। নিয়মগুলো এখনো কিছু কিছু মনে আছে । যেমন ” আদা,জল, নিশিন্দা পাতার রস ও মধু সহযোগে প্রত্যহ প্রাতে ও গোধূলিতে সেব্য।”
কখনো বা গোলমরিচ গুড়ো, শটি গাছের শিকড় বাটা, বাসক পাতার রস আরো কতো কি দিয়ে ওশুধগুলো খেতে হতো। বিভিন্ন ধরনের পাতা, শিকড়ের রস, মধু সব মিলিয়ে খেতেও বেশ ভালো লাগতো। অনেকটা এখনকার চ্যাবনপ্রাসের মতো।

পুরো ব্যাপারটা আমি খুব পছন্দ করতাম। কারণ এই অজুহাতে অর্থাৎ পাতা শেকড় বাকড় জোগাড় করার জন্য মায়ের অনুমতি নিয়েই জংগলে জংগলে প্রচুর ঘোরাঘুরি করা যেত। বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করতাম বলে আমাকে বোনা বলে ডাকা হতো। এই স্মৃতিগুলোই আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। আহা কখনোই আর সেই দিনগুলোতে ফেরা সম্ভব নয়। জীবন আমাকে উদার হাতে অনেক কিছু দিয়েছে। আবার কেড়েও নিয়েছে অনেক।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — অক্টোবর ৯, ২০১৬ @ ২:১২ অপরাহ্ন

      কী চমৎকার স্মৃতিগদ্য। বিপাশা আপার লেখা আরো বেশি পড়তে চাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাহরিয়ার হাসান — অক্টোবর ১০, ২০১৬ @ ৪:৪৭ অপরাহ্ন

      অনেক শুনেছি যার নাম, আজ দেখতে পেলাম তার ছবি, আমার বাবা – মার প্রিয় শিক্ষক, আমার কলেজের সেই খ্যাতনামা অধ্যক্ষ স্যার।

      স্যারের বইয়ের কোন অনলাইন সংস্করন আছে কি?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com