হাজার ও এক রাত্রির গল্প বলার কৌশল

নাহিদ আহসান | ৫ অক্টোবর ২০১৬ ২:৪৮ অপরাহ্ন

One nightহাজার এক রাত্রির ( আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা) শহরজাদকে কে ভুলতে পারে? গল্প বলে যে বদলে দিয়েছে জালিমের হৃদয়। কথায় বলে শিক্ষক আনন্দ পান যখন তিনি দেখেন দুর্বল ছাত্রকে তিনি কিছু শেখাতে পেরেছেন। ভাল ছাত্র তো শিক্ষক নিরপেক্ষ। যেভাবেই হোক সে ভাল করার চেষ্টা করবে।
আমাদের দেশে পাঠকপ্রিয় হলে সমালোচকের হাতে নাস্তানাবুদ হতে হয়। জনপ্রিয় লেখককে মনে করা হয় সস্তা লেখক। কিন্তু রামায়ণ,মহাভারত, ইলিযাড কিন্তু জনপ্রিয়। এই সব কঠিন ভাষায় লেখা কিভাবে্ জনপ্রিয় হল? হবে না কেন এর গল্পগুলো যে মানুয়ের জীবনের গল্প। আর গল্পকথকরা যুগে যুগে সাধারণ মানুষদের বুঝিয়েছেন তাদের মত করে, তাদের ভাষায়।
রাম সীতাকে পরিত্যাগ করেছেন লোকভয়ে? কিন্তু অন্যদিক দিয়ে তিনি তাকে খুব ভালও বাসেন। আসলে এটা তার আত্মত্যাগ। তিনি রাজধর্ম পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন। হোমারও ছিলেন একজন কথক। তিনি যখন বর্ণনা করেন,‘মহাবীর হেক্টর যুদ্ধে যাচ্ছেন কিন্তু একই সাথে তিনি ভাবছেন তার স্ত্রীর কথা। এই বিধবা রমণী কিভাবে কাল যাপন করবেন’, তখন মানুষকে তা স্পর্শ করে। কারণ তারাও তো জীবনের মহানদী সাঁতরে পার হচ্ছে। এইসব দ্বন্দ্ব, বীরত্ব গাথাঁ সরল ভাষায় গল্পের মত করে বলেছেন- গল্পকথকেরা । তাই তা দু’মলাটের ভেতর গল্পগুলো কারাবাস করেনি।
শিল্পী হিসেবে আপনার কর্তব্য কি?
শুধুই বোদ্ধাদের জন্য লিখবেন? তারাতো আগে থেকেই সব বোঝেন।
নাকি আপনি চান মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে?সত্যজিৎ রায় কিন্তু ভরা প্রেক্ষাগৃহ দেখলে খুশী হতেন। কোন বিশ্ববিখ্যাত ফিল্ম ক্রিটিক কি বলেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ বটে তবে এর চেয়ে খুশির বিষয় তার কাছে ছিল – সাধারণ মানুষ তার ছবি ভীড় করে দেখছে।
তাহলে কি আপনি তরল বিষয়ে লিখে জনপ্রিয় হবার চেষ্টা করবেন? কখনই না। আপনার চ্যালেন্জ তো সেটাই আপনার বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি জিবরাইলের ডানায় ভর করে র্মত্যমানবের কাছে পৌঁছাবে। আপনার ভাষা হবে সেই জিবরাইলের ডানা।
শুনেছি একটি পাইন বনের ভেতর দিয়ে হেটেঁ যাওয়ার পর কেউ আর আগের মানুষ থাকেন না। পাইনের সৌর্ন্দয, ঝিরিঝিরি পাতার বাতাস, ঋজুতা মানুষকে বদলে দেয়। শিল্প সাহিত্য সেই পাইন বনের হাওয়া।
নজরুল যখন বলেন, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে।–তখন যতক্ষণে সমালোচকরা খুন শব্দের প্রয়োগ যুক্তিযুক্ত কিনা সে সম্পর্কে আলোচনা শেষ করেন, তার অনেক আগেই তা জনগণের হৃদয়ে পৌঁছে সেখান থেকে তাদের খুনে মিশে যায়।

বোদ্ধা বুদ্ধদেব বসু বৃথাই তাকে ‘চিরশিশু চির কিশোর’ বলেছেন ও তার জনপ্রিয়তা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন।
তবে জনমনের কাছে পৌঁছানো সব মহৎ সাহিত্যের পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে উঁচু মানের শিল্পিত ভাষা, চিন্তার জটিলতা বাধাঁ হয়ে দাঁড়ায়।বিপরীতে আবার কিছু জনপ্রিয় ফিকশন প্রকাশিত হবার সাথে সাথে পাঠকের মন কেড়ে নেয়। এ্ইসব জনপ্রিয় বইয়ে কিছু বাঁধা বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন, এগুলো হয় ঘটনাপ্রধান, চিন্তাপ্রধান নয়। গোয়েন্দা গল্প, অ্যাডভেন্চার, রোমান্স, কৌতুকময় ঘরানার লেখা –মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকে।
আবার কিছু কিছু বিরল লেখক লিখে ফেলেন এমন কোন বই যা একই সাথে জনপ্রিয় এবং চিরায়ত। তারা জনপ্রিয় লেখকদের কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন আবার কল্পনার উদ্দামতা, জোরালো বক্তব্য, স্বর্গমর্ত্য সংযোগকারী ভাষার কারণে চিরায়ত সাহিত্যের তালিকায় জায়গা করে নেন। যেমন একালের গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস।
কিছু সাহিত্য আছে যেখানে মধ্যবর্তী একজন নবীর দরকার হয়। যেমন আমাদের দেশে পুঁথিপাঠকেরা প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য মানুষের নিকটবর্তী করেছেন।
আমার বাবার কবর দেখে গ্রামের পথ বেয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে যখন হেটেঁ আসছিলাম, তখন পথপ্রদর্শক বললেন,“সাবধান, সাপ”। একটু পরে কেশে নিয়ে ফিসফিস্ করে বললেন, এই সাপই লক্ষীন্দরের বাসরঘরে আছিলো। এক্কেবারে সুতার মতো ”। উনি তো একজন মুসলমান।কথা শুনে মনে হলো ক্রন্দনরত বেহুলা, সেই সাপ সব তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। পুথিঁপাঠ, যাত্রা পালা এইসব মধ্যর্বতিনী – মানুয়ের রক্তে পেীঁছে দিয়েছে অক্ষরবন্দী কাহিনী।
যেসব লেখক একহাতে জনরুচি, অন্যহাতে শিল্পসৌষ্ঠবের লাগাম ধরে সন্তরর্পণে অশ্ব চালনা করে যুগ পার হয়ে যান, তারাই যে শ্রেষ্ঠ লেখক তা কিন্তু নয়।
আমার দাদা বা নানা সেই অর্থে শিল্প সংস্কৃতির ধার ধারেন না তবু নজরুলের কবিতা তাদের মুখস্ত। তারা যখন আবেগভরে আবৃত্তি করতেন তখন মনে দ্বিধা জাগতো। মুসলমান কবি বলেই কি এই আবেগ? নাকি নজরুলই পৌছেঁ গেছেন?
তবে আমার মনেহয় এটা তার যুগ পার হয়ে জনরুচির কাছে পৌঁছানোর এক ধরনের কমি্উনিকেশনের দক্ষতা। তাই বলে তিনিই কি শ্রেষ্ঠ? একই কথা জসীমউদ্দিনের ক্ষেত্রেও খাটে। তার ‘কবর’ কবিতা কিন্তু সাঙঘাতিক কমিউনিকেটিভ। তার কাল ও একালকে র্স্পশ করে গ্রাম ও শহরের অডিয়েন্স র্নিবিশেষে। তাই বলে এটাই কি শ্রেষ্ঠ?
এমন অনেক লেখা আছে -সমকালেও বিদগ্ধ বলয়ে সমাদৃত থাকে, যুগ পার হয়েও তাই থাকে। যেমন : এলিয়টের কবিতা, ইবসেনের নাটক।
আবার একই লেখকের বিভিন্ন লেখার অডিয়েন্স ভিন্ন হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের গল্প ও উপন্যাস চিরকালই সমালোচকদের চোখ ধাঁধায়। কিন্তু তার গান (সব গান নয় ) সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায় সেকাল ও একালে। রবীন্দ্রনাথের গ্ল্প জনপ্রিয় করতে হলে মিডিয়ার সাহায্য নিতে হয়- যা নাটক সিনেমার মাধ্যমে তার ভাষা সরলীকরণ করে মানুয়ের কাছে পৌছেঁ দেয়।

arabian-2হাজার একরাত্রির গল্পের কথক শহরজাদ, তার কিছু বিরল বৈশিস্ট্যের কারণে সমকাল ও চিরকালে স্হান পেয়েছেন। যদিও জল্লাদের রক্তপাতের জবাবে আস্তিন থেকে অজস্র রক্ত গোলাপ বের করে উপহার দেয়া ছাড়া সাহিত্যিকের করার কিছু থাকে না, তবু এটাই তাদের প্রতিবাদ। শহরজাদও তাই করেছেন। হৃদয় জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাবার কৌশল হিসেবে তিনি অঢেল বিনোদন, টানটান উত্তেজনার যোগান দিয়েছেন। বাস্তব ও কল্পিত চরিত্রের আমদানী করেছেন।
এখানে আমরা তার একই সাথে জনপ্রিয় ও কালোত্তীর্ণ হবার বিভিন্ন কৌশলের দিকে একটু নজর দেবো্।
একবার আমি একজন নামজাদা গল্পকারের বড় গল্প পড়তে গিয়ে রীতিমত হোঁচট খেলাম। গাছতলায় এসে বসেছেন এক সাধু। তার বর্ণনা দিচ্ছেন লেখক দেড় পাতা জুড়ে। পাঠকের কল্পনা করার কোন সুযোগই নেই। অথচ শহরযাদ এক আচড়ে চরিত্র এঁকেছেন। অযথা বর্ণনা বাড়াননি।
শহরজাদ তার গল্পে জীন পরী আমদানী করেছেন। কিন্তু কেন? কেন না মানুয়ের ভেতর এক শিশু বাস করে। সে চোখ বড় বড় করে অলৌকিকের আস্বাদ নিতে চায়। শুধু বাস্তব চরিত্র দিয়ে তাদের মনোজগৎকে রাঙানো যায় না। যদিও তারা জীন পরী তবু তারা এখানে- চিন্তা ভাবনা করে মানুষের মত। তবে তাদের কর্মক্ষমতা আলাদা–উড়তে পারে, যাদু করতে পারে। এক রাতে মুহূর্তের ভেতরে সবচেয়ে সুন্দর ছেলেটিকে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের সাথে বিয়ে দেবার জন্য উড়িয়ে নিয়ে চলে যায় কায়রো থেকে বাগদাদ। জনগণের সাথে সমালোচকদের পার্থক্য হলো, কাল্পনিক চরিত্র বা ঘটনা তাদের যদি পছন্দ হয়, তবে তারা এটা মেনে নেয়। লাতিন আমেরিকার অনুমোদনের অপেক্ষা করেনা।
ইশপের গল্পের মত জীবজন্তুর গল্প আছে এখানে যারা মানুষের মত চিন্তা করে। তবে এরা বেশীর ভাগই আসলে মানুষ। জাদুবলে গরু ছাগল, ভেড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিটি গল্পে যে খুব শিক্ষণীয় কিছু থাকে তা নয়। গল্পের মূল বক্তব্য হচ্ছে ভালর ভাল হয়, মন্দের মন্দ। তবে অনেক গল্পে ভালরও মন্দ হয়।
শহরজাদ আসলে বাদশাহকে ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছেন, পৃথিবীতে কত ধরনের মনস্তত্ত্ব আছে। খারাপ পুরুষ, নারী বা জ্বীন যেমন আছে, তেমনি ভাল পুরুষ, নারী বা পরীরও অভাব নেই। কিন্তু এই কথা কখনো তিনি সরাসরি উল্লেখ করেন নি। গল্পকার এখানে চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহকে কথা বলতে দিয়েছেন। অজস্র চরিত্র উপস্হাপনের মাধ্যমে শহরজাদ বাদশাহের ধারণা যে ভুল তা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। দক্ষ মনোচিকিৎসকের মতই তিনি বাদশাহকে ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলেছেন।

যাদুর ব্যবহার এই গল্পগুচ্ছে প্রচুর। যেমন :একজন ব্যক্তি একটি কুকুর নিয়ে ঘরে ঢুকেছেন। তার মেয়ে সাথে সাথে পর্দা করে বলে উঠে, ‘পরপুরুষ ঘরে এনেছেন কেন? এতো আসলে মানুষ। যাদু করে কুকুর বানিয়ে রাখা হয়েছে।’
হ্যারি পটার সিরিজের জনপ্রিয়তার কথা মনে পড়ে যায়। যাদু কিন্তু এখনও মানুষের কাছে তুমুল প্রিয় একটি বিষয়।
অসাধারণ কল্পনাশক্তির ব্যবহার প্রতিটি গল্পে। সিন্দাবাদের অভিযানের কথা তো সবাই জানেন। প্রতিটি অভিযানই নতুনত্বে ভরপুর। সেই হীরের পাহাড় আর রকপাখীর গল্প! কিংবা আলীবাবা চল্লিশ চোর এ মর্জিনার বুদ্ধিমত্তা; অথবা আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের জ্বীনের সেই ইচ্ছা পূরণের ক্ষমতা- সবই অনন্যসাধারণ।
তিনটি আপেলের গল্প -ম্যাকবেথের কথা মনে করিয়ে দেয়। সরোবর জুড়ে রঙিন মাছেদের সেই্ গল্প –যারা আসলে মানুষ কিন্তু ডাইনীর যাদুতে হয়ে গেছে মাছ–বিনোদনে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। গল্পগুলোতে কিছু কিছু ব্যাপার ঘুরেফিরে আসলেও কল্পনার উদ্দামতার জুড়ি মেলা ভার।
গল্পগুলো সাজানো হয়েছে, গোলাপকুড়ির পাপড়ির বিন্যাসের মত। একটির ভেতর আরেকটি জড়িয়ে আছে। কোন গল্পের ভেতরের কোন চরিত্র হঠাৎ গল্প বলা শুরু করে। সেই গল্প থেকে আবার আরেকটি গল্প শুরু হয়।

Arabian-3যত ব্যস্তই থাকুক, সবাই আরব দেশে শুধু গল্প শুনতে চায়। ফাঁসীর আসামী জল্লাদকে গল্প শোনাতে চায়। জল্লাদ আগ্রহ প্রকাশ করে। জেলে চালাকি করে জ্বীনকে বোতলে পুনরায় পুরে ফেলে। তারপর সেই বোতলের ভেতরের জীনকে সে শিক্ষামূলক গ্ল্প শোনাতে চায়। সেও রাজী হয়। এর অর্থ হচ্ছে- গল্প ছিল আরব সমাজের বিনোদন। এখনও আরব দেশগুলোতে গল্প বলা ও শোনার রেওয়াজ আছে। এটা তাদের পারর্ফমিং আর্টের একটি জনপ্রিয় ধারা।
আরব্য রজনীর গল্পগুলো বিভিন্ন লেখকের দ্বারা শত বছর ধরে সংগৃহীত হয়। বলা হয় এসব ইসলামের স্বর্ণযুগের আমলের (সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর) গল্প।
মূল গল্পটি হলো শাহরিয়ারের স্ত্রী বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তার ভাইয়ের স্ত্রীও তাই। তাই বাদশাহ শাহরিয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, রাজ্যের সব কুমারী মেয়েকে একে একে বিয়ে করবেন। আর রাত পোহালেই মেরে ফেলবেন।
শহরজাদ বিয়ের পর বাসররাতে, তার আদরের ছোটবোন দুনিয়াজাদকে গোপনে বলে, বাদশাহের সামনে তাকে গল্প বলার অনুরোধ করতে। তারপর বাদশাহের অনুমতি নিয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। প্রায়ই সে তুঙ্গ মুহূর্তে গল্প থামিয়ে দেয়। এইভাবে সে বাদশাহের কৌতূহল জাগিয়ে রেখে আয়ু বৃদ্ধি করে। ‘তারপর কি হলো?” মানুষের এই অসীম কৌতূহল বিস্ময়কর। এই কৌতূহল জাগ্রত রাখতে হয় গল্পকারকে। গল্প কথক শহরজাদ খুব সহজেই এটা করেছেন।
গল্প লেখকের চাইতে গল্পকথকের যেটা সুবিধা -সেটা হলো তার উপস্হাপনা। পারফর্মিং আর্টে তাকে দক্ষ হতে হয়। তিনি প্রয়োজন মত কণ্ঠস্বর উঁচু করতে পারেন, নীচু করতে পারেন। কখনোবা ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে ফিসফিস করে কথা বলেন। প্রয়োজন হলে দুএক কলি সুর করে গেয়ে ওঠেন। এই গল্পসংগ্রহে অনেক কবিতা আছে, শহরজাদ কি সেসব সুর করে গাইতেন?

Arabian-5আসলে শহরজাদ বাস্তব চরিত্র তো? নাকি তিনি কোন গল্পকারের গল্পের চরিত্র যে গল্প বলে?
শহরজাদ সম্ভবত উচুঁ দরের পারফর্মার ছিলেন। তার গল্প বলার দৃশ্যগুলোও নিশ্চয় দেখার মত ছিল।
তিনি তার গল্পে বাস্তব চরিত্র ব্যবহার করেছেন। যেমন:খলিফা হারুনুর রশীদ। আরব্য রজনীর গল্প যে পড়েছে বা শুনেছে তার মস্তিষ্কে চিরকালের মত গেঁথে গেছে এই ছবি – বাদশাহ ছদ্মবেশে হেটেঁ বেড়াচ্ছেন শহরের পথে পথে –উজীর নাজীরের কথায় বিশ্বাস না করে নিজের দুচোখের উপর ভরসা রাখছেন।
শহরজাদের গল্পের সংখ্যাও তার শক্তিকে ধারণ করে। এক টুনটুনি একবার এক সোনারমোহর পেল। সে রাজাকে গিয়ে বললো ‘রাজার ঘরে যা আছে, আমার ঘরে তা আছে।’ আসলেই কি তাই? রাজার আছে হাজার হাজার মোহর, টুনির আছে এক মোহর। তাই মোহর থাকলেই কেউ রাজা হয়ে ওঠে না। শহরজাদের আছে হাজার গল্প। তাই তো সে গল্পের রাণী।
জনপ্রিয় গল্পের একটি উপাদান হাস্যরসের প্রয়োগ, এইসব গল্পে তার অভাব আছে। আবার সিরিয়াস গল্পের মত গল্পগুলো দার্শনিক বা জটিল মনস্তাত্তিকও নয়। তবে ঝরঝরে ভাষার মধ্য দিয়ে সেকালের বিচিত্র আরব সমাজকে আমরা দেখতে পাই। বোঝা যায় সওদাগরী, ব্যবসা, কারিগরী, পোশাক ও গালিচা বুনন ইত্যাদি ছিল এই জনপদের মূল পেশা।
প্রায়ই দেখা যায় রমণীরা ক্রীতদাসের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এসব মেয়েদেরকে ঢালাওভাবে দোষারোপ না করে –অন্যভাবে চিন্তা করা যায়। সেটা হলো তবে কি দাম্পত্যে, প্রেমে ও শয্যায় তারা আধিপত্যবিরোধী? বাদশাহের সাথে বন্ধুত্বপূ্র্ণ সম্পর্ক সম্ভব না। বাদশাহ হয়তো তাদের সুখ ও সমস্যা নিয়ে ভাবেন না। তাই এই প্যাসিভ সর্ম্পকে তারা আবদ্ধ থাকতে চাননি? শহরজাদ বিশ্লেষক নন। তাই তিনি তাদের দোষারোপ করেছেন। সমাজের চোখে তাদের দেখেছেন। শাস্তিতে আহ্লাদিত হয়েছেন।
শহরজাদ গল্পে যৌনতার ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এত সাবলীলভাবে বলে গেছেন যেন কোন ব্যাপারই না। তবে কি সে সমাজে শারীরিক প্রসঙ্গ ঘেরাটোপে বন্দী ছিল না? অবশ্য আরবদেশে সাহিত্যে যৌন অনুষঙ্গের ব্যবহার ছিল আগে থেকেই। অথবা আমরা এটা ধরে নিতে পারি যে গল্পকার হিসেবে এটা তার গল্প জমানোর কৌশল? অনেক সময় গল্পগুলো চসারের ক্যান্টারবেরী টেলসের মত তা শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

নিষ্ঠুরতায় এই গল্পগুলো ভয়ঙকর। মানুষকে কানা বা খোজা করা হয় অহরহ। তলোয়ার দিয়ে তৎক্ষণাৎ গর্দান নেয়া হয়। এক গল্পে এক শাহজাদী প্রেমে পড়ে বিয়ে করেন সামান্য এক বস্ত্র বিক্রেতাকে। তারপর তার বর একধরনের মশলাযুক্ত খাবার–যা শাহজাদীর অপছন্দ– প্রচুর খাওয়াতে উনি রাগের চোটে বিয়ের রাতেই কেটে ফেলেন নতুন বরের বুড়ো আঙ্গুল।
জাদুকর, দৈত্য, কানা, খুরমা বিক্রেতা, নিগ্রো ক্রীতদাস, নাবিক ,নেকাব পরিহিতা অপরূপ রমণী –মিছিলের মত এইসব চরিত্র একের পর এক আসে। যেন এক বিশাল পারস্য গালিচায় খচিত নানা রঙের ছবি।
শহরজাদী বাদশাহের হৃদয়ের পরিবর্নতন ঘটান শিল্পের যাদুকরী রুমাল দুলিয়ে। বিনোদনের বুননে বহু রং, সুতা, নক্সা ও কৌশলে। শিল্পীর কাজই তো এই। তিনি আসলেই বড় বাজীকর।
বাদশাহ্ শাহরিয়ার মৃত্যুদন্ড রদ করেন। কারণ এক হাজার এক রাত পার হবার পর শহরজাদ যে এখন তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও তিন সন্তানের জননী।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত নাহিদ আহসানের আরও লেখা:

গুচ্ছ কবিতা

নাহিদ আহসানের তিনটি কবিতা

নাহিদ আহসানের একগুচ্ছ কবিতা

নাহিদ আহসানের কবিতা

নাহিদ আহসানের সাতটি কবিতা

পি বি শেলীর দীর্ঘ কবিতা: ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: সিরিয়াস সাহিত্যের গুরুত্ব, নতুন আয়রনম্যান ও এলবির প্রয়াণ

বিজ্ঞানীদের কেন সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয় পড়া উচিৎ

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com