হৃদয়-কলমে লেখা: হৃৎকলমের টানে

সৈকত হাবিব | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

Syed+Shamsul+Haq_26092016_0001“ছয় দশকের অধিককাল ধরে সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন অজস্র ও বিচিত্র রচনা। তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, অনুবাদ, কলাম, আত্মজৈবনিকসহ বহুমাত্রিক রচনা। এজন্যই তিনি আমাদের সব্যসাচী লেখক।
“তাঁর সৃজন-জীবনের যে কটি রচনা কালের অমরতায় অভিষিক্ত হয়েছে, তার মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘হৃৎকলমের টানে’। অনেক বছর আগে সাময়িকপত্রের পাতায় যখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল এই রচনারাশি, তখনই তা পাঠকহৃদয়ে চিরকালের মতো জায়গা করে নিয়েছিল। কারণ সৈয়দ হক তাঁর হৃদয়ের নিবিড় নির্যাস কলমে ঢেলে এই রচনাটি লিখছিলেন। একই শিরোনামে এর গ্রন্থভুক্ত হবার ইতিহাসও বেশ পুরনো। আর বইটি বহুদিন ধরেই অমুদ্রিত। তাঁর ভক্ত-পাঠকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবার পুরো বইটিই একসঙ্গে প্রকাশ করেছে নান্দনিক।”

উপরের কথাগুচ্ছ লিখিত হয়েছিল ২০১৪ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হৃৎকলমের টানের অখণ্ড সংস্করণের ফ্ল্যাপে, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের আহ্বানে। লেখার সময় মগজে ছিল একদা ‘সংবাদ সাময়িকী’তে প্রতি সপ্তাহে চমৎকার লেটারিংয়ে (কাইয়ুম চৌধুরীর করা?) হৃৎকলমের টানে প্রকাশিত হওয়া, আমার অনিয়মিত পাঠ আর পরবর্তী সময়ে ইউপিএল প্রকাশিত একটি সুশোভন বইয়ের স্মৃতি। কিন্তু বইটি দীর্ঘদিন বাজারে ছিল না এবং অনেক লেখা ওতে ছিলও না, যা এ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে এই বইটির অখণ্ড প্রকাশের ঘটনাই ছিল আনন্দের। আর আমার মতো অর্বাচীনের জন্য এ তো বিরাট সৌভাগ্যের ঘটনা যে, সৈয়দ হক চেয়েছেন যে আমি বইটির একটি ফ্ল্যাপ লিখি! তাঁর অর্ধবয়সী এক লিখিয়ের জন্য এটি নিশ্চয়ই বড় প্রাপ্তি। এজন্য তাঁকে আবারও সকৃতজ্ঞ স্মরণ করি।

২.
যাকে বলে ভারিক্কি ধাঁচের প্রবন্ধ, সৈয়দ হকের কলম বোধ হয় তাতে ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত নয়। কারণ রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর পর শিল্পসৃজনে যিনি সবচে ব্যাপক ও বিস্তৃত (কারণ গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক-শিশুসাহিত্য-অনুবাদ-গান-চলচ্চিত্র-চারুকলা সব মাধ্যমেই তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। আর বাংলাদেশে তো তিনি তুলনারহিত।), তাঁর হাতে কথিত ‘সিরিয়াস প্রবন্ধ’ আমরা তেমন পাইনি বলেই মনে হয়। কিন্তু এটাই বোধহয় আমাদের জন্য শাপে বর হয়েছে। এই ‘বর’ হলো তাঁর বিস্তৃত আত্মজৈবনিক ও কলামধর্মী রচনা। তাঁর প্রাবন্ধিক সত্তা, যদি তেমন কিছু থেকে থাকে, তা সবচে প্রস্ফুট এ-জাতীয় রচনায়। এর দুটি বিশিষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে: তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকা (২০০০ সংস্করণ) এবং মির্জা গালিবকে নিয়ে তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর-এর ভূমিকাটি। একটিতে আমরা দেখি তাঁর কবিতা-সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি ও সমালোচনার জবাব; অপরটিতে গালিব ও তাঁর ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহ-সময়ের সঙ্গে তাঁর নিজের জীবন ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গকে মিলিয়ে নিয়ে একটি বয়ান। (অবশ্য, এই বইয়ের ভূমিকাটাই বা বাদ দিই কেন!)
অন্যদিকে হৃৎকলমের টানের মতো কলাম/জর্নালধর্মী রচনাতে টুকরো টুকরো লেখাজুড়ে তৈরি হতে থাকে বহু বহু প্রবন্ধ-প্রদেশ, যেগুলোর সামগ্রিক পাঠ আমাদের বোধের মহাদেশের সঙ্গে সংযোগ করিয়ে দেয়। প্রবন্ধর সঙ্গে এর মোটা পার্থক্য এই যে, প্রবন্ধ প্রায়শ হয়ে থাকে নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণী, গাম্ভীর্যপূর্ণ, ক্লান্তিকর রকমের দীর্ঘ, উদ্ধৃতিবহুল আর পাণ্ডিত্যের দড়িতে শক্ত করে বাঁধা (যদিও বাংলাভাষায় সুখপাঠ্য প্রবন্ধও কম নেই)। কিন্তু হৃৎকলমের টানের মতো রচনায় লেখক স্বয়ং ব্যক্তিগত ‘আমি’ হয়ে বিরাজ করেন এবং তাঁর আত্মগত উপলব্ধির নির্যাস ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে থাকে। এতে পন্ডিতের চেয়ে রসজ্ঞর পরিচয় ভালো ফোটে এবং ভাষায় একটি আটপৌরে ভাব থাকে, যা পাঠককেও ঘরের মানুষ করে তোলে। আর এই ‘আমি’টি যখন হন কোনো কবি-লেখক-শিল্পী, তখন এর ভেতর বহু ধরনের নৈর্ব্যক্তিকতা জড়িয়ে থাকলেও সেই আমিটিকে তাঁর নিজের মতো ধরা যায়। তাঁর কথা ও বোধের ভেতর থাকে আত্মবিবেচনার উজ্জ্বল আলো। ফলে তাঁর বহু উপলব্ধির ভেতর আমরা আবিষ্কার করি আমাদেরও অন্তর্কথন। তখন লেখক ‘আমি’র সঙ্গে বহু পাঠক আমির ঐকতান সৃষ্টি হয়, উভয়ের বোধের জায়গাজমি আল ভেঙে একাকার হয়ে যায়। লেখকে-পাঠকে এক অন্তরঙ্গ সেতু তৈরি হয়।

আর এই ব্যাপারটি ঘটতে থাকতে হৃৎকলমের টানের বই-ভূগোলে আমাদের যাত্রা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই।
অনেক সময় দেখা যায় ভ্রমণে গন্তব্যর চেয়েও যাত্রাপথটুকুই বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই লেখাসকলও তেমন একটি অনুভূতি দেয় যখন এর পাঠ সম্পন্ন হয়। এখানে বরং যাত্রাটাই আসল। কারণ, আমরা ভুলে যাই আমাদের কোনো গন্তব্য ছিল কিনা। কিংবা প্রতিটি লেখাই আমাদের গন্তব্যর কিনারায় নিয়ে গিয়ে নতুন যাত্রার আমন্ত্রণ জানায়। এবং আমরা ক্রমাগত পৃষ্ঠাসমূহের ভেতর ডুবে যেতে থাকি।

৩.
শিল্পী বা লেখকমাত্রই কি কপট? কিংবা মুখোশময়? কী ব্যক্তিগত, কী সৃজনক্রিয়া তাঁকে তো বহু ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। অনেক চরিত্র, অনেক মাধ্যম আর বহু বিষয়ে তাঁকে কাজ করতে হয়। আর যদি একই ব্যক্তির সৃজনশীলতা থাকে বহু দিগন্তে, তাঁকে কি সরলভাবে পাঠ করা যায়? মুখ ও মুখোশের পার্থক্য কি সহজে নির্ণয় করা যায় কিংবা খোলসের ভেতর লুকোনো তাঁর সত্তাকে কি পুরোপুরি পাঠ করা যায়? নানা কারণেই সৈয়দ হকের ক্ষেত্রেও এ জিজ্ঞাসা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। এবং অনেক সময়ই এটি এক ধরনের গোলকধাঁধা তৈরি করে। যদিও বলা হয়, সৃষ্টির ভেতরেই থাকে ব্যক্তি-শিল্পীর চেহারা-চিহ্ন, কিন্তু সব সৃষ্টির ভেতর থেকেই কি তাকে আবিষ্কার করা যায়? হৃৎকলমের টানে পড়তে পড়তে মনে হয়, হ্যাঁ, এখানে ব্যক্তি-মানুষটার ভেতরটাও অনেকটা পড়ে ওঠা যায়। লেখকের সত্য ও ব্যক্তির সত্য প্রায় একই গুচ্ছে মিলিত হয়।

৪.
সৈয়দ হক হৃৎকলমের টানে লেখা শুরু করেন ঠিক তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তির এক মাস পর, ১৯৮৬-র জানুয়ারি থেকে। ইতিমধ্যে তাঁর শিল্পযাত্রার বয়সও পেরিয়ে গেছে তিরিশ বছর। শিল্প-সাহিত্যের বহু মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে আর জীবন ও জীবিকার তাগিদে ততদিনে তাঁর ঝুলিতে জমেছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি। সঙ্গে পাঠ-দেখা-শোনা-স্মৃতি-সঙ্গ-স্বপ্ন। এসবের কতক হয়েছে ধূলিতে মলিন আর কতক আছে সজীব-সপ্রাণ। আছে হারানো-প্রাপ্তি, অর্জন ও বিসর্জন। আছে দেশ ও দেশের বাইরে আর অন্তরের গোপন প্রদেশে গূঢ়গভীর ভ্রমণ। এই সব, আর বহু বিচিত্র উপাদান ও অনুষঙ্গ যেন অসংখ্য কোলাজের ভেতরে একটি গ্রন্থ-ক্যানভাসে গ্রথিত হয়েছে। প্রতিটি টুকরো লেখার পর ঈষৎ দীর্ঘ শাদা স্পেস যেন আমাদের খানিক থামতে ও চিন্তা করতে বলে। কিন্তু এই ভাষাচিত্র এমন গতিময় যে, পরের লেখাটিও আমাদের ডেকে ভেতরে নিয়ে যেতে থাকে আর আমরা নিজের অজান্তেই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পাঠ করে যেতে থাকি। এভাবে বইটি আমাদের প্রায়-সশরীর ভ্রমণ করিয়ে নেয় লেখকের বিগত জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত ও সময়। আবার একই সঙ্গে হয়ে ওঠে আত্মজীবনীর খসড়া কিংবা তাঁর সময়েরও জীবনী। কোন সে সময়? যখন একটি শহীদ মিনারের জন্ম হয়, একটি জাতির স্বাধীন স্বদেশ হয়, বহু রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বপ্ন সৃষ্টি ও ভঙ্গ হয়, এই ভূগোল স্বৈরশাসকের হাতে রক্তাক্ত হয়, অগুনতি প্রতিভা আর শিল্প বিকশিত হয়। বলা যেতে পারে, বাঙালি জাতির সবচে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের খ- খ- মুহূর্ত। আর এ সময়পর্বে লেখক ‘আমি’র বোধেরও ক্রমাগত নতুন নতুন জন্ম হয়। এই সব কথা তাঁর হৃদয়-কলম বলে যেতে থাকে কখনো নদীর মৃদু স্রোতের মতো, কখনো তীব্র ঘূর্ণির মতো, কখনো কখনো গল্পদাদুর আসর জমানোর মতো। সেখানে পান্ডিত্যর নিবিড় নির্যাস থাকলেও নেই পন্ডিতিপনা; অধ্যয়নের কঠোর প্রয়াস থাকলেও নেই ভাষা-কোষ্ঠকাঠিন্যর অধ্যাপকপনা; বরং আছে খোলা প্রান্তরের অনুভূতি, সাক্ষর ও সচেতন যে কেউ যার মধ্য দিয়ে সহজে হেঁটে যেতে পারে। আর সংগ্রহ করে নিতে পারে বহু শস্য।

৫.
প্রিয়তম পাঠিকা ও পাঠক, যদি আপনি ওপরের কথাগুচ্ছ পাঠ করে থাকেন, লক্ষ করেছেন নিশ্চয়ই যে, আমি উদ্ধৃতিপরায়ণ লেখক নই। এটি যদিও সজ্ঞান প্রয়াস, তবু এ রচনায় আছে বিশেষ কারণ। বইটির প্রায় প্রতিটি খণ্ড রচনাতেই এমন সব উক্তি/বচন রয়েছে, সেগুলোর কিছু কিছু দিয়ে রচনাটি অনায়াসেই মেদবহুল করা যেত। আর তাতে আপনারও অন্ধের হস্তীদর্শন হতো। কিন্তু যেখানে খুব সহজেই আপনি সমুদ্রস্নান করতে পারেন, সেখানে কয়েক আঁজলা পানি গায়ে মেখে কী লাভ! বইটি তেমনি আমাদের অন্তর্গত স্নানের অনুভূতি দেয়।
আর কিছু কিছু বই আছে, যা কেবল লেখককেই পাঠ করায় না, তার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকে আমাদের নিজেদেরও পাঠ। হৃৎকলমের টানের ভেতর দিয়ে আমাদের অন্তর্গত পাঠও অনেকটাই সম্পন্ন হয়।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — অক্টোবর ৩, ২০১৬ @ ১০:১৯ অপরাহ্ন

      The style of essay writing that I observe in the writing of Saikot Habib is one worth hearty congratulations. I appreciate his prose and also appreciate the hearty way he has demonstrated in his tribute to Syad Shamsul Haque, the pride of our nation.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com