‘প্রণীত জীবন’-এর অবসান

মোস্তফা তোফায়েল | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

Syed+Shamsul+Haq_26092016_0001বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। বাংলাদেশে আধুনিকতার চর্চা, বিশেষত গদ্য সাহিত্যে বা কথাসাহিত্যে খুব বেশি দিনের নয়। এ দিক থেকে অগ্রণী অবস্থানে আছেন সৈয়দ হক, যিনি তাঁর সব কটি উপন্যাসেই আধুনিক।
‘প্রণীত জীবন’ সৈয়দ শামসুল হকের আত্মজৈবনিক উপন্যাস। Sons and Lovers যে বৈশিষ্ট্য ও আবেদনে লরেন্স-এর আত্মজৈবনিক উপন্যাস, ‘প্রণীত জীবন’ও সৈয়দ হকের তা-ই। Sons and Lovers এ লরেন্স তাঁর জন্ম, শৈশব, কৈশোর ও বয়োপ্রাপ্ত হয়ে ওঠার জৈবনিক-মনোজাগতিক বর্ণনা দিয়েছেন পল মোরেল নামক এক চরিত্রের আখ্যানে। ‘চেতনাপ্রবাহ তত্ত্ব’ নামে যা বাংলায় অনূদিত – ইংরেজিতে Stream of Consciousness – তার প্রয়োগ সৈয়দ হকের ‘প্রণীত জীবনে’ আছে লেখকের উত্তম পুরুষে। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘যুগান্তর’ সাহিত্যপাতায় ‘দুটি লাল পাখি’ নামক প্রবন্ধে সৈয়দ হকের প্রশংসা করে বলেছেন যে তিনিই বাংলা সাহিত্যে কনফেশনাল সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃত। কনফেশনাল সাহিত্য বিবেচনায় নিয়ে আসা হলে ‘প্রণীত জীবন’কেই মানতে হবে সৈয়দ হকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে।
সৈয়দ হকের আরো একটি কনফেশনাল সাহিত্য প্রকৃতির উপন্যাসের নাম ‘বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল’। ‘খেলারাম খেলে যা’ একই ধাঁচে লেখা উপন্যাস। এটি তিনি লিখেছেন পঞ্চাশ দশকের শেষ প্রান্তে, রংপুর জেলা পরিষদ ডাকবাংলার দুই নম্বর কক্ষে এক সপ্তাহ অবস্থানকালে।

কুড়িগ্রাম তাঁর স্বর্গাদপী গড়িয়সী, অধ্যয়নং তপঃ”। এ গুণে গুণান্বিত তিনি, বাংলা সাহিত্যে আর এক মধুসূদন- “সতত হে নদ তুমি, পড়ো মোর মনে”। মধুসূদনের সতত মনে পড়া নদ কপোতাক্ষ, গ্রাম সাগরদাঁড়ি; সৈয়দ হকের ধরলা নদী, গ্রাম-জলেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। জলেশ্বরী নামটি সৈয়দ হকেরই আবিষ্কার, তাঁর কলম থেকে আসা আদরের পুরস্কার, কুড়িগ্রমবাসীর প্রতি। ২০১২-র ১ ডিসেম্বর আমরা কুড়িগ্রামে তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছি, মানপত্রটি আমারই লেখা ছিল, যার প্রশংসা করেছিলেন পাশের আসনে বসে থাকা আনোয়ারা সৈয়দ হক, কথাসাহিত্যিক। জীবনে তো বটেই, মরণেও সৈয়দ হক কুড়িগ্রামের মাটির ঘ্রাণে ওমর খৈয়ামী শয়নসুখ সন্ধান করেছিলেন সে অনুষ্ঠানে। আমি তাঁর চোখে জল দেখেছিলাম। আমাদের পৌর মেয়র তাঁর অনাগত পারলৌকিক বসবাসের জন্য এক খণ্ড জমি দানের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
‘প্রণীত জীবনে’র শুরুতেই লেখক স্মরণ করেন তাঁর জন্মস্থল কুড়িগ্রাম এবং আবে কাওসার ধরলা নদী। এই ধরলা তাঁর কাছে কখনও ধরলা, কখনও জলেশ^রী। তিনি জলেশ^রীর পাড়ে জীবনযাপন করেন না, জীবনযাপন করেন ঢাকার গুলশানে। কিন্তু জলেশ্বরী- ধলেশ্বরী নদীতীরের পিসির মেয়ে, “ঘরেতে এলো না সে তো, মনে তার নিত্য যাওয়া আসা।” তিনি শ্বেতপ্রভা-ধল্লা-ধবলা-ধরলাকে জলেশ্বরী নামে ডাকেন, মীথ্ সৃষ্টি করেন। তিনি লেখেন,
“১৯৩৭ সালের দিকের কথা, ধরলা তখন ভাঙতে শুরু করেছে ভোগডাংগা, পাটেশ্বরীর দিক্টা।
পেছনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম যে স্মৃতি-ছবিটি স্পষ্ট দেখে উঠি, হিসাব করে দেখি সে আমার বছর আড়াই বয়সের। বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি ধরলা নদীর পাড়ে। বিকেল হয়ে এসেছে। লাল রঞ্জন ধরেছে আকাশে। নদীর পানি বেগুনি। নদী একটি বাঁক নিয়েছে। ফুলে উঠেছে বর্ষার পানিতে। কল্কল্ খল্খল্ করে দুরন্ত স্রোত বয়ে যাচ্ছে নদীর বুকে। আমরা দুজন স্থির দাঁড়িয়ে আছি বর্ষার উম্মত্ত ধরলার পাড়ে। ধরলা গ্রাস করছে মাটি। পাড় ছোটাছুটি করছে। কিন্তু বাবা-ছেলে আমরা দুটি স্থির এবং বিষণœ। কেন বিষণ্ন? আজ রাতেই আমরা ধরলা পাড়ে আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি দক্ষিণে, তখনকার কুড়িগ্রাম শহরের শেষ প্রান্তে। বাড়িটি এখন নদীর কামড়ে থরথর করে কাঁপছে।”
১৯৫৫ পর্যন্ত যে কুড়িগ্রাম, সে কুড়িগ্রাম তার মহকুমা আদালত, জেলখানা, হাই স্কুল সব হারিয়েছে: বন্দর, ঘাট, গরুর গাড়ির বাথান। নদীর ভাঙনে সহসাই সর্বস্বান্ত হয়েছিল ঐতিহাসিক শহরটি। সৈয়দ হক লেখেন:
“শুধু কি আমরাই সেদিন বাড়িটি ছেড়ে ধরলার পার থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাই? সরে আসেন উকিল নজির হোসেন খন্দকার আর আবদুর রহমান মিয়া মোখতারও তাঁদের বাস তুলে। ভাঙনের নদী আমাদের শুধু অন্যত্র সরিয়েই দেয় না, ওই দুই প্রতিবেশী থেকেও আমাদের তফাৎ করে দেয়। উকিল ও মোখতার সাহেব, আমার বাবার দুই প্রাণবন্ধু, তাঁদের স্ত্রী দুজন আমার মায়েরই যে আত্মার একান্ত আশ্রয়-ওঁরা রেল ইষ্টিশনের সড়কে লাগোয়া দুটি বাসায় উঠে যান; বহু পরে এখন সে ইষ্টিশনও সরে গেছে; আমরা সরে আসি আরও দক্ষিণে লাশকাটা ঘরের পাশ দিয়ে নুড়িপাথর বিছানো মীর জুমলার সড়ক ধরে বাজারের কাছাকাছি শহরের মসজিদমুখী গলিতে। এই মীরজুমলা সড়ক এখন পুরাতন থানা রোড নামে পরিচিত।”

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ হয়েছিল ১৯৩৯-৪৫ সালে। কুড়িগ্রামে পড়েছে এই যুদ্ধের অভিঘাত। তিনি লেখেন,
“তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কাল। কুড়িগ্রাম ছেয়ে গেছে গোরা সৈনিকে। চারদিকে তাদের ছাউনি, ট্রেঞ্চ; পোষ্টাপিস, রেল ইষ্টিশন সবখানেই তারা; ইষ্টিশন মাষ্টাার বসে আছেন টুলে, আর তাঁরই টেবিলের ওপর পা তুলে সিগারেট ফুঁকছে সাহেব সোলজার; পোষ্টাপিসে টেলিগ্রাফের টরেটক্কা চালাচ্ছে গোরা; ডাকবাংলো দখল করে নিয়েছে, ফুলবাগানে তাদের ট্রাউজার শুকোচ্ছে। আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে চলছে মিলিটারি কনভয়; মাথার ওপর বিন্দুর মতো উড়োজাহাজ উড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের জন্য আসাম বরাবর রাস্তা বানানোর ঠিকা পেয়ে নসর মিঞা বড়মানুষ হয়ে পড়েছেন। বাতাসে উড়ছে টাকা।”
” মনে পড়ে সেই এক গোরা সৈনিকের কথা; সে তার অবসরে ডাকবাংলোরই প্রাঙ্গণে এক জবাগাছের ছায়ায় বসে বই পড়ত; আমি কিছুটা দূরে উবু হয়ে বসে একমনে তাকে দেখছি। সে আমাকে একদিন তার টিফিনের বাক্সো দেয়; তার ভেতরে দুটো শুকনো বিস্কুট, একফালি মাংস, একটি চুয়িংগাম, একটি সিগারেট ও দুটি দেশলাই কাঠি। বাক্সো থেকে সে সিগারেটটি হাতে রেখে আমাকে বিস্কুট মাংস খাওয়ার জন্য বলে; আমি খাই; মাংসের নতুন স্বাদ পাই; অনবরত তার ইংরেজিকথনের এক বর্ণ বুঝি না, কিন্তু গৌরব বোধ করি যে আমারই সঙ্গে সে কথা বলছে। একদিন সে আমাকে ছবিওয়ালা একটি বইও দেয়-ইংরেজি কবিতার বই। সেই আমার প্রথম হাতে পাওয়া, স্পর্শ করা সাহিত্যের ইংরেজি বই আর রসনার বিলিতি রোষ্ট।”
লেখক সৈয়দ হক বয়সের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে চলেন। এডোলেসেন্স-এর কথা বলেন এবং বলেন কুড়িগ্রামের নিষিদ্ধ পল্লীর কথা, মহকুমা শহর কুড়িগ্রামের কথা।
“আবদুল খলিফার কাছে যাই, দিনের পর দিন ধরনা দিই রঙিন ছিটের জন্য; একদিন মহাত্মা তিনি আমাকে পল্লীর দিকে আঙুল তুলে বলেন, ছিট তো আমার কাছে নাই, ছিট আছে শান্তির কাছে। গলির মধ্যে যা, শান্তির খোঁজ কর, তাঁই তোমাকে জামার ছিট দিবে।” এই পল্লী নিষিদ্ধ পল্লী। সৈয়দ হক তখন ছিলেন কিশোর, তাঁর ডাক নাম ছিল বাদ্শা।
Stream of Consciouseness- আধুনিক উপন্যাসের উপাদান।
“আর আমাকে পায় কে? গলির ভেতরে যাই। গলির বাসাগুলো বেড়ার আড়ালে; বেড়ার ফাঁকে দরজা, একের পর এক সেই দরজায় দেখি একজন করে নারী পিঁড়ি পেতে বসে আছেন। লাল চওড়া পেড়ে সাদা শাড়ি, পানের রসে ঠোঁটও তাঁদের টুকটুকে রাঙা। কিন্তু কই, চোখমুখে তো আমার মা খালার মতো মায়া নেই, তার বদলে কী একটা যে খরশান সেখানে। গা আমার শীতল হয়ে আসে। একটি মুখ মনে পড়ে, বসন্তের দাগকাটা দাগকাটা মুখখানি; তিনি আমাকে দেখেই চোখ পাকিয়ে বলে ওঠে, এই চ্যাংড়া, হেথায় ক্যানে?
আমি একেবারে এলিয়ে পড়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলি, আমি শান্তির কাছে যাব।
শুনেই সেই নারী দেহ দুলিয়ে উঠে দাঁড়ান, খপ্ করে আমার হাত ধরে গলা বাড়িয়ে কলকল করে ভেতরমুখে ডাক দেন, ওলো শান্তি, তোর কাছে মানুষ আসিছে। এই অবেলায় কাঁই আসিল? বলতে বলতে যিনি উঠোন পেরিয়ে আসেন, মাঝপথেই তিনি থমকে দাঁড়ান পল্লীতে আসা‘মানুষটি’কে দেখে। এ যে একেবারে দুগ্ধপোষ্য বালক! মনে পড়ে, দুয়ারে দাঁড়িয়েই তাঁকে আমি বলি সব কথা-কেন আমার আসা, আর কে আমাকে পাঠিয়েছে। তিনি আমাকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যান। ভেতরে পা দিয়েই দেখি পূজাবাড়ির মতো ছিমছাম পাট পাট ঝাড় দেয়া বিশাল উঠোন, উঠোনে ছোট ছোট কুটির। তারই একটিতে শান্তি আমাকে নিয়ে গেলেন। ঘরে ঢুকেই চোখ আমার জুড়িয়ে যায়। মাটির মেঝে কাদার সদ্য লেপনে তকতকে। এক পাশে একটি চৌকি, টানটান চাদর পাতা, ফুলের নকশা-কাটা বালিশ, বাঁশের বেড়ার গায়ে রঙিন ছবি-কল্পনা হয় এখন, রবি বর্মার আঁকায় উর্বশী মেনকারা নৃত্যের ভঙ্গিমায় মুনিঋষিদের ধ্যান ভঙ্গ করছেন।
নিষিদ্ধ পল্লীর শান্তি জানে, তরুণ বয়সে ‘শরম’ একটি অবশ্যম্ভাবী উপাদান। ‘শান্তি’ সুধায় ‘খাও, শরম না করিও।’
তিনি আমাকে বিছানার পরে বসিয়ে নিজে বসেন মাটিতে। কত কথাই না বলেন, আজ স্পষ্ট মনে নেই; আজ তাকে শুধু দেখতে পাই আমার মনের ভেতরে সবুজ চাঁদরে ঢাকা চৌকির কিনারে থুতনিটি রেখে বসে আছেন। আব্ছা যেন শুনতেও পাই, তিনি আমার নাম জিগ্যেস করছেন, পরিচয় নিচ্ছেন, বাড়িতে কে আছেন, কজন ভাইবোন। আমাকে তিনি বসিয়ে রেখে বাইরে গেলেন, একটু পরেই ফিরে কাঁসার থালায় সন্দেশ নিয়ে। বললেন, খাও, শরম না করিও।
হাত ধরে আমাকে নিয়ে উঠোন পার করে চলেছেন তিনি তারপর। নারীরা চাপা কৌতুকে নিরীক্ষণ করছেন তাঁদের সখী শান্তিবালার অসময়ের এই ছোট বাবুটিকে।”
সেই কুড়িগ্রাম, জলেশ্বরী, সৈয়দ শামসুল হকের ‘দেশ’। সৈয়দ হক স্মরণ করেন তাঁর পিতাকে। তাঁর পিতারও পরম প্রিয় পীঠস্থান ছিল ধরলাতীরের কুড়িগ্রাম। তিনিও চিরনিদ্রা যাপন করছেন সেই মাটিতে।
“সেই কুড়িগ্রাম যেখানে পরবর্তী জীবনের সবটুকু তিনি কাটিয়েছেন; যার নদী, নিসর্গ, মানুষকে তিনি গভীর ভালোবেসেছেন, যে কুড়িগ্রামে তাঁর পুত্রকন্যা সবার জন্ম হয়েছে, যেখানে তিনি তাঁর বড় ও ছোট ভাইকে এনে বসত করিয়েছেন, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে আমরা যখন তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিয়ে যেতে চেয়েছি, তিনি বারবার বলেছেন, এখান থেকে আমাকে তোরা নিয়ে যাস না, আমরা টিকিটও করে ফেলেছি, যাত্রার সব আয়োজন শেষ, কিন্তু ট্রেন আসার মাত্র আধ ঘন্টা আগে তিনি, কুড়িগ্রামেই তিনি এখন ঘুমিয়ে আছেন, সেই কুড়িগ্রাম যে কুড়িগ্রাম এখন আমাদের দেশ যে কুড়িগ্রামের মানুষ ও ভূগোল-কাঠামোর ওপর আমি গড়ে তুলেছি আমার গল্প-উপন্যাস-নাটকের প্রধান অঞ্চল-জলেশ্বরী।”

জাহাজঘরের পরিচিতি
জাহাজ ঘরেই ছিল কাত্যায়নী প্রেস প্রথমে, পরে এর পাশেই হয় ‘ইওর প্রেস’। ইওর প্রেসকে ঘিরে ষাটের দশকে গড়ে ওঠে কুড়গ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রদীপ্ত অঙ্গন। সেই সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনের আব্দুল করিম সরকার আজো বেঁচে আছেন। এখন ধরলা নদীর ভাঙনের ফলে শহর দূরে সরে গেছে, আদি কুড়িগ্রাম এখন পুরোনো শহর বলে পরিচিত। সেই তখনকার কুড়িগ্রামে প্রধান সড়কের ওপর ছিল জাহাজঘর নামে একটি বাড়ি, জাহাজের আকারে সেই ঘরটি আছে।
“ভোগডাঙা থেকে চলে আসার এক সপ্তাহের ভেতরেই স্থলবন্দী সেই জাহাজের গলইপ্রান্তের একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সিদ্দিক তাঁর ডিসপেনসারি বসালেন। ঘরটি অবিকল একটি দোতলা জাহাজের অনুকরণে তৈরি; দুপাশ দিয়ে চলে গেছে প্রধান দুটি সড়ক, মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজ যেন বা নোঙর ফেলে। সে ঘরে কয়েকটি দোকান আছে, আছে তখনকার কুড়িগ্রামের প্রথম ও একমাত্র ছাপাখানা কাত্যায়নী প্রেস, যে প্রেস থেকে সিদ্দিকের প্রথম বই ছাপা হয়ে বেরিয়েছিল। প্রেস এবং জাহাজঘরটির মালিক ছিলেন ব্যাং বকশী, তাঁর আসল নাম বহু আগেই লোকে বিস্মৃত হয়ে গেছে; কিংবদন্তির মতো তাঁর নাম লোকের মুখে মুখে ফিরত; কুড়িগ্রামের আদি বাসিন্দা নন, পাবনা থেকে এসেছিলেন। আমাদের পরিবারের মতো তাঁরও পরিবারের শেকড় তখন কুড়িগ্রামে।”

জাহাজ ঘরের প্রতিষ্ঠাতা ব্যাং বাবু
“সিদ্দিকের কাছে শুনেছি, ব্যাং বকশী প্রথম জীবনে ছিলেন সাধারণ এক ম্যাজিশিয়ান; সামান্য উপকরণ আর জনা দুই সহকারী নিয়ে তিনি গ্রামগঞ্জে ম্যাজিক দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর এই ভ্রাম্যমাণ জীবনে একদা তিনি কুড়িগ্রামে আসেন; কুড়িগ্রামের পল্লী অঞ্চলের মানুষেরা তাঁকে দৈব ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ বলে ধারণা করে; তারা তাঁকে অনুরোধ করে কুড়িগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য। জাদুর প্রতি আদিম মানবের ভয়মিশ্রিত বিস্ময় কুড়িগ্রামের মানুষেরা তখনো অনুভব করত, এখনকার মতো নিছক একটি বিনোদন- মাধ্যম একে মনে করত না।”
বীণাপাণি নাট্যমন্দির, সতীশ পার্ক ও সাধারণ পাঠাগার
“ব্যাং বকশীও সম্ভবত তাঁর ভ্রাম্যমাণ জীবনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন; উপার্জনের সামান্যতা তাঁকে কিষ্ট করে ফেলেছিল; প্রস্তাবটি অবিলম্বে তিনি গ্রহণ করেন; কুড়িগ্রামে তিনি বাসা বাঁধেন। দেশ থেকে স্ত্রীকে নিয়ে এলেন; ম্যাজিক ছেড়ে বাণিজ্যে মন দিলেন; শিল্পে যা সম্ভব হয়নি, বাণিজ্যে তা এবার হলো, লক্ষী তাঁর ঘরে বাঁধা পড়লেন। অচিরে তিনি কুড়িগ্রামের প্রধান এক ব্যবসায়ী ও ভূস্বামী হয়ে উঠলেন। তবে, কুড়িগ্রামে অন্য বহিরাগতদের থেকে তিনি ছিলেন একবারেই আলাদা চরিত্রের মানুষ; সম্পদ তিনি অর্জন করেছেন ঠিকই, পাশাপাশি কুড়িগ্রামের জন্য সে সম্পদ ব্যবহার করে অনেক কিছু করেওছেন। ম্যাজিক সেই কবে ছেড়ে দিলেও তাঁর মনের ভেতরে শিল্পের শেকড় একটা থেকেই গিয়েছিল; নিজের বসতবাড়ির পাশেই তিনি স্থাপন করেন ‘বীণাপাণি নাট্যমন্দির’; শৌখিন নাটকের দল গড়ে তোলেন; কুড়িগ্রামে সাধারণ পাঠাগার প্রতিষ্ঠায় তাঁর উদ্যম ও অর্থ দান করেন; পিতার নামে সতীশ পার্ক রচনা করেন। ধরলা নদীগর্ভে সেটি বিলীন হয়ে যায়।”
পথ থেকে পথে সৈয়দ শামসুল হক। সিনেমার কাহিনি, চিত্রনাট্য, সঙ্গীতে তিনি পারদশী হয়েছিলেন অভিজ্ঞতা থেকেই।
“ঘুমন্ত একটি শহর হঠাৎ জেগে ওঠে বিস্ময় নিয়ে; যেন এক গরিব হঠাৎ পেয়ে গেছে গুপ্তধন; কলসির পর কলসিভরা সোনার মোহর যেন টুংটাং করে গড়িয়ে পড়ছে চত্বরে। কিন্তু সমুদ্র তাকে ডাকে। এখানে আমি কী করছি? সমুদ্র তো জীবনেরও এক উপমা, সমুদ্র তো জীবনেরও কারক; মন্থনে মন্থনে লবণের ভেতর থেকেই তো উঠে এসেছিল অমৃত। ঢাকায় সে মরে যায়, জন্ম নেয় বোম্বাইয়ে। চলচ্চিত্র তাকে হাতছানি দেয়। কুড়িগ্রামের তাজমহল টকিজ তার করোটির ভেতরে তীব্র ঘন্টা বাজিয়ে সিনেমার পর্দায় চিত্র প্রেক্ষণ করতে থাকে। কিন্তু তার গুরু, চিত্রপরিচালক কামাল আমরোহী ততোধিক সতত অস্থির; বালক তখন কৈশোরের শেষ প্রান্তে-সেও তার আশ্রয় হারায়।”
যৌবনে সৈয়দ হক বোম্বাই গিয়েছিলেন। কার্ল মার্ক্স পড়েছেন, পড়েছেন ইংরেজি সাহিত্য। বারংবার নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন।
“যৌবনে প্রায় উপনীত কিশোর সমাজতন্ত্রের পাঠ পায় বোম্বাই নগরীতে অশোকের কাছ থেকে। কার্ল মার্ক্স-এর বাঁধানো বই-ফিকে নীল কাপড়ে; যতই মোহন হোক বাঁধানোয়, সাদা পৃষ্ঠার ঘ্রাণে ও মুদ্রণে, বাক্যের অর্থ ভেদ করে উঠতে তার স্বেদ ঝরে। আর্থার কনান ডায়াল, জর্জ বার্নাড শ, টি এস এলিয়ট। পড়ো, পড়ো, পড়ো, না পড়লে লেখক হবে কী করে! বইয়ের ভেতরে নতুন জন্ম নিয়ে ভ‚মিষ্ঠ হয়ে সে প্রায়-যুবক। তারপর পাসপোর্ট প্রবর্তিত হয়; সীমান্তে। এখানে আমি কী করছি? সে ফিরে আসে ঢাকায়। সাহিত্যের প্রাঙ্গণে সে এক কোণে এসে দাঁড়ায়-ভীরু কুন্ঠিত বাহিরে, অন্তরে কী সৃজনের উদ্দাম বর্ষণ তার! বোম্বাইয়ে যে মরে যায় ভিক্টোরিয়া টার্মিনালে ট্রেন ধরার সঙ্গে সঙ্গে, ঢাকায় তার আবার জন্ম হয়।

“এখানে আমি কী করছি? পেছন ফিরে আজ যখন নিজেকেই আমি দেখি, আমার মনে হয়, ওই জিজ্ঞাসাই আমাকে স্থান থেকে স্থানে, সম্পর্ক থেকে সম্পর্কে, সাহিত্যের মাধ্যম থেকে মাধ্যমে এত দূর পর্যন্ত তাড়না করে নিয়ে এসেছে।
এখানে আমি কী করছি? আপনাকেই তাঁর পুনপৌনিক প্রশ্ন। পথ তাকে বেঁধে রাখতে পারে না।
“একটি জীবনের ভেতরে অনেক জীবন আমি পার করে এসেছি; মৃত্যুর আগেই আমি অনেক মৃত্যু ভোগ করে, অনেক ছাইগাদা অথবা সবুজ ঘাসের নিচেই সমাহিত থেকে, কখনো বিষ্ঠা কখনো অমৃতের ভেতর থেকে আবার জেগে উঠেছি, যেন প্রসূত হয়েছি আমারই ভেতর থেকে। ”
সৈয়দ হক একটি নাম, বর্তমান বাংলা সাহিত্যের একটি অধ্যায়, একটি ধ্রুবনক্ষত্র। তবে, এই ধ্রুবনক্ষত্র কি শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজারের মতই ধ্রুবনক্ষত্র? “As fixed as the northern star?” তিনি কি Dramatic Irony-র জালে নিজেই নিজেকে বন্দি করছেন? হাসনাত আব্দুল হাই কালের খেয়ায় মন্তব্য করেছেন, রবীন্দ্রনাথ- নজরুলের পর সৈয়দ শামসুল হকই সেরা।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com