বিজ্ঞানীদের কেন সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয় পড়া উচিৎ

নাহিদ আহসান | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১:৪০ অপরাহ্ন

বিজ্ঞান ও সাহিত্য নিয়ে কোথায় যেন একটি রেষারেষি আছে। বিজ্ঞানকে অনেক সময় ভাবা হয় যুক্তিপূর্ণ এবং তা শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সাহিত্যকে ভাবা হয় আবেগনির্ভর, কল্পনাশক্তি দ্বারা চালিত।
আসলে বিজ্ঞানেও আবেগ ও কল্পনার ভূমিকা আছে। আইনস্টাইনের ভাষায়:
“I’m enough of an artist to draw freely on my imagination, which I think is more important than knowledge. Knowledge is limited. Imagination encircles the world.”
আর গবেষণার বিষয়বস্তুর প্রতি আবেগ না থাকলে বিজ্ঞানী কাজ করবেই বা কিভাবে?
পক্ষান্তরে অযৌক্তিক সাহিত্য বা যে-সাহিত্য তার পূর্ববর্তী ইতিহাসের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নেই সেটাই বা কেমন সাহিত্য? তাই বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়সমূহ পরষ্পরের পরিপূরক। বিজ্ঞানকে মানবিক এবং সাহিত্যকে ভাবালুতা মুক্ত করতে “যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে, মুক্ত কর হে বন্ধ” পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার।
অনেকেই মনে করেন, বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের মানবিক বিষয়সমূহ পড়ার দরকার নেই। ইতিহাস, সাহিত্য, রাষ্ট্র বিজ্ঞান সবই যেন অগুরুত্বপূর্ণ এবং হালকা বিষয়। ব্যাপারটি ঠিক তার উল্টো। সাহিত্যের ছাত্রের যেমন বিজ্ঞান জানা জরুরী, বিজ্ঞানের ছাত্রদের তেমনি সাহিত্য, কমিউনিকেশন স্কিল, ইতিহাস, রাজনীতি সর্ম্পকে জানা থাকা দরকার। এটা আপনার জন্য অপশনাল নয়, এটা আবশ্যিক।

সাহিত্য ও ইতিহাসের গুরুত্ব

অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবী দেখতে কেমন তা সাহিত্য আপনাকে শেখাতে পারে। আপনি যখন একটা মুভি দেখেন তখন সেই পরিচালকের দৃষ্টিতে, অভিনেতাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর দিকে তাকান। সাহিত্যও সেরকম পৃথিবী সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। যাদের অভিজ্ঞতা আপনার চেয়ে আলাদা তারা কিভাবে চিন্তা ভাবনা করে তা শিখতে পারবেন। দেখবেন যে অধিকাংশই আপনার মত চিন্তা ভাবনা করেনা, বরং মানসিকতার দিক দিয়ে আপনি সংখ্যালঘুদের একজন। আপনি সাহিত্য-পড়ুয়া বিজ্ঞানী হলে বিষয়টির মোকাবেলা করতে পারবেন।
পৃথিবীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানা থাকা জরুরী। একজন বিজ্ঞানী তার ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি। আপনার সাথে যারা কাজ করবেন তারা ভিন্ন মানুষ। ভিন্ন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছেন। তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি আলাদা এটা যখন বুঝতে পারবেন তখন আপনার জন্য অন্যদের সাথে কাজ করা সহজ হয়ে যাবে। আপনি যাদের জন্য কাজ করছেন, যাদের সাথে কাজ করছেন,পাশে নিয়ে কাজ করছেন তাদেরকে বুঝতে পারা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা ঠিক না। তাই অন্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির পেছনের ব্যাকরণ আপনার জানা দরকার। যেমন পূর্ব পশ্চিমের দুজন মানুষ কাজ করছেন একসাথে, তাদেরকে বাসায় নিমন্ত্রণ জানালে একজন হয়তো পাচঁ মিনিট আগে আসলেন, অন্যজন আধঘন্টা পরে আসবেন। তাদের পোশাকও বিপরীত মেরুর। আপনার মানসিকতা যাই হোক না কেন। তাদের আচার আচরণ মেনে নিতে হলে আগে তাদের মানসিকতা বুঝতে হবে।

আপনি আপনার দেখা মানুষদের প্রতিচ্ছবি হুবহু কোন বইয়ে খুঁজে পাবেন না তবে বই আপনাকে মানুষের চরিত্র বুঝতে সাহায্য করবে। বই মানে সাহিত্যের বই। আপনার গবেষণার আগে বা পরে বহু মানুষের সাথে আপনাকে কথা বলতে হবে। সেটা ছাত্র হতে পারে, সহকর্মী হতে পারে, কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান এমনকি রাজনীতিবিদও হতে পারে। তারা আপনার গবেষণার ব্যাপারে কি ধরনের চিন্তা ভাবনা করছেন এবং অর্থায়নে কোনো ভূমিকা রাখবেন কিনা তা আপনার জন্য জরুরী। সাহিত্যের বই অন্যকে বোঝার ক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করবে।

প্রেক্ষাপট

গবেষনার জন্য পুরো পৃথিবীকে বাদ দিয়ে মনোযোগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করতে হয় কারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র র্নিদিষ্ট। বিপরীতে বাস্তব পৃথিবীকেও মাথায় রাখতে হয় এবং একটি গবেষণা কিভাবে পৃথিবীকে প্রভাবিত করবে তা সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা থাকা উচিৎ ।
সাহিত্য এ ক্ষেত্রে তেমন সাহায্য করতে পারবেনা। কিন্তু এখানে ইতিহাস ও দর্শন সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতা কার কার হাতে, কারা এবং কি কি বিষয় ও বস্তু পৃথিবীর প্রধান নিয়ন্ত্রক। আদর্শিক ও অন্যান্য কি কি কারণে বিশ্ব আজ বিভক্ত তা একজন বিজ্ঞানীর জানা উচিৎ। এটা আপনাকে গবেষণার বিষয় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।

আপনি কোন বিষয়টির প্রতি আগ্রহী সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোন বিষয়যটি বর্তমান পৃথিবীতে অগ্রাধিকার পাবে সেটাও বুঝতে হবে ।
এটা বলা হচ্ছেনা যে বিজ্ঞানীদের সব জানতে হবে বা এসব বিষয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। তবে জগৎ ও তার চালিকাশক্তি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা, আপনার চিন্তা ভাবনাকে একটি র্নিদিষ্ট খাতে প্রবাহিত করে তাকে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। যেমন একটি প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ সম্পর্কে জানা থাকলে অন্যগুলোও সহজে বোঝা যায়।

যোগাযোগ

আপনি বিজ্ঞানী, আপনি রির্সাচ নিয়ে ব্যস্ত আর পৃথিবী আপনাকে খুজেঁ নেবে–ব্যাপারটা এত সহজ নেই বর্তমান বিশ্বে। আপনি কি করছেন সবাইকে জানান। এইজন্য যোগাযোগ ও জনসংযোগে দক্ষতাও আপনার জন্য জরুরী। জনবিচ্ছিন্ন উঁচু টাওয়ারে বসবাস আপনার সাধের গবেষণা কর্মটির প্রতি একধরনের অবিচার। লিখতে হবে প্রাঞ্জল ভাষায়। আর ব্যাপারটিও আপনি শিখতে পারেন সাহিত্যের পাঠ থেকেই।

ধরা যাক আপনার উদ্ভাবন অসামান্য কিন্তু সেটা যদি আপনি পৃথিবীকে সঠিক সময়ে জানাতে ব্যর্থ হন তাহলে এর পরিণতি ভয়াবহ। আর্নেস্ট স্টেকলবার্গ এক যুগ আগে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স-এর পুরো থিওরী আবিষ্কার করেন। ফাইনম্যান , সুইংগার, এবং তোমোনাগার নোবেল জিতে নেন এক যুগ পরে ওই একই কাজ করে তাদের ভাষাগত দক্ষতার কারণে। আর আর্নেস্ট স্টেকলবার্গ কেউ চেনেনা। কারণ তিনি লিখেছিলেন জটিল দুর্বোধ্য এক জার্নালে খামখেয়ালী সব প্রতীক ব্যবহার করে। লিখতে হবে প্রাঞ্জল ভাষায়।
অনেক সময় দেখা যায়,সুদূর গ্রামাঞ্চলে চমকপ্রদ কিছু উদ্ভাবন করেছেন প্রতিভাবান কোন বিজ্ঞানী। কিন্তু কিছুদিন পরেই তা চাপা পড়ে যায়। এর কারণ হয়তো ভাল কোন জার্নালে তা প্রকাশ করতে পারেন নি। কিংবা সঠিক জায়গায় যোগাযোগের অভাব। কিংবা বাস্তব জগত সর্ম্পকে ওয়াকিবহাল নন বলে কোনো মুনাফাখোর বা মধ্যসত্ত্বভোগীর শিকার।

সাহিত্য ও বিজ্ঞান দুটোই কিন্তু সৃজনশীলতা। বিজ্ঞান নির্দিষ্ট উপসংহারের দিকে ধাবিত, সাহিত্যের উপসংহার মুক্ত। পাঠককে বিচিত্র অনুভূতি ও চিন্তার দিকে ধাবিত করা তার লক্ষ্য। বিজ্ঞান জ্ঞান আহরণ ও শিল্পসাহিত্য তা প্রকাশ শেখায়। একটি ব্যক্তি নিরপেষ্ক, অন্যটি ব্যক্তিনির্ভর। ‘আমারি চেতনার আলোয় পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠলো রাঙা হয়ে’ নাকি আমি না থাকলেও তারা লাল ও সবুজ?

এমন না যে আমরা মানবিক বিভাগ ও বিজ্ঞান বিভাগ দুটো ভাগে ভাগ করি বলে বিজ্ঞান অমানবিক। তবে মানবিক বিভাগে অধ্যযন বিজ্ঞান বিভাগকে আরও মানুষের নিকটে নিয়ে আসে। যেমন সায়েন্স ফিকশনের লেখকরা বিজ্ঞানকে মানুয়ের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
আপনি কি বলতে চান তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অন্যপ্রান্তে পাঠক কিভাবে গ্রহণ করছে তাও গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য পাঠকের সাথে সেতু বাঁধার নক্সা আপনাকে জানাবে। ইতিহাস ও দর্শন বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আপনার গবেষণাকে দেখার সুযোগ করে দেবে। রাজনীতি ও বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা বিজ্ঞানের বাস্তবপ্রয়োগ সম্পর্কে শেখায়। তাই একজন বিজ্ঞানীর শুধু বিজ্ঞান জানলে চলে না।

তথ্যসূত্র: Chad Orzel, a professor at Union College

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত নাহিদ আহসানের আরও লেখা:

গুচ্ছ কবিতা

নাহিদ আহসানের তিনটি কবিতা

নাহিদ আহসানের একগুচ্ছ কবিতা

নাহিদ আহসানের কবিতা

নাহিদ আহসানের সাতটি কবিতা

পি বি শেলীর দীর্ঘ কবিতা: ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: সিরিয়াস সাহিত্যের গুরুত্ব, নতুন আয়রনম্যান ও এলবির প্রয়াণ

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ওমর শামস — সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৬ @ ২:২৩ অপরাহ্ন

      I’m enough of an artist to draw freely on my imagination, which I think is more important than knowledge. Knowledge is limited. Imagination encircles the world.” – আইনস্টাইনের এই বক্তব্য ক-জন বুঝতে সক্ষম? উপরি-উপরি সবাই এক্টা আন্দাজ করতে পারে। যারা আইনস্টাইনের কাজ পড়েছে, বুঝেছে তারাই এর মর্ম কিছু বুঝবে। বাংলাদেশে হাতে গোনা।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com