সাইমন জে. অর্টিজ-এর কবিতা

মুহাম্মদ সামাদ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১২:১০ অপরাহ্ন

saimonসাইমন জে. অর্টিজ একাধারে কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। অগ্রগামী আদিবাসী আমেরিকান এই কবির জন্ম ১৯৪১ সালের মে মাসে। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁচিশের অধিক। অনূদিত হয়েছেন ইতালীয়, স্প্যানিশ ও চীনা ভাষায়। দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রবীণ এই আমেরিকান অধ্যাপকের আগ্রহের ক্ষেত্র আদি আমেরিকানদের ভূমি-অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, শিল্প-সাহিত্য ও সৃজনশীল লেখালেখি বিষয়ের নতুন ভাবনায় ও পাঠদানে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাকোমা পুয়েবলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সন্তান সাইমন জে. অর্টিজ মার্কিন যুক্তরাষ্টের আদিবাসীদের একজন প্রতিনিধিত্বকারী কবি ও সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে সর্বদা সক্রিয়। কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ সামাদ।


টিকে থাকতে

To Insure Survival

তুমি সামনে বেরিয়ে আসো
ভোরবেলা পর্বতের গায়ে
পাথরের রঙ বদলায়
ধরিত্রীর সব রঙ
নীল থেকে লাল হয়ে যায়।

দাদি-মাকড়সা কথা বলে,
হাসি আর বেড়ে ওঠা
জামাকাপড় বুনন
জীবন সৃজনে
এক সুঁতোয় একত্রে বেঁধে
তাদের পরিয়ে দেয়া;
সবকিছু এই সব কিছু।

শিশু, তুমি বের হয়ে আসো
সূর্যোদয়ের সময় সেই দূরারোহ পর্বতগাত্রের মতো নগ্ন,
মায়ের রক্তের দাগ ছাড়া যা কিছু কর্তিত;
কেবল তোমার চোখ মিটমিট করে দীপ্তি নাও
আর নিঃশ্বাস আঁকড় ধরতে চেষ্টা করো।

পাঁচ দিনের মধ্যেই
গান গাইতে গাইতে
নাচতে নাচতে
উপহার হাতে
তারা আসবে; পাথর
কণ্ঠধ্বনি নিয়ে,
চারাগাছ ঘণ্টাধ্বনি নিয়ে।
তারা আসবেই।

দেখো, তাদের আসতে হবে।

কথন
Speaking

মাটির ওপর দাঁড় করিয়ে রাখতে
তাকে আমি নিয়ে যাই
বাইরে গাছের নিচে,
লক্ষ বছরের পুরনো ঝিঁঝির শব্দ শুনি,
আমরা কাঁচপোকার ধ্বনি শুনি।
পিপীলিকা আসে আমাদের কাছে;
আমি বলি
‘এই আত্মজ আমার।
এই বালক তোমার দিকে চেয়ে আছে।
আমি তার কথাই বলছি।’

ঝিঁঝি পোকা, কাঁচপোকা,
পিপীলিকা নিযূত বছর
আমাদের পাহারায় রাখে;
আমাদের কথা শোনে।
আমার পুত্রের মুখে
আধো আধো বুলি ফোটে
কিছু কথা, হাসি গুড়গুড় করে।
বৃক্ষ ঘরঘর শব্দ ছাড়ে।
এই বালকের কাছে তারা
আমার কথন শোনে।

ঝড়
Storm

সিয়ুস জলপ্রপাতের
এক রেড ইন্ডিয়ান যুবক
কারাগারে বছরের পর বছর ধরে
বাধ্য হয়ে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে।
অন্যজনের শাস্তি হয়েছিলো মাত্র তিরিশ বছরের!
আরও দুজন বিচারের অপেক্ষায় আজীবন কারাদ-,
অথবা মৃত্যুদন্ডের।

এই বছরগুলোতে আমাদের
দরকষাকষি লড়তে হয়েছে।
পনের বছর, তিরিশ বছর, যাবজ্জীবন।
মৃত্যুদ-।

তোমার ঘাড় ঝুলে পড়ুক, গভীর নিঃশ্বাস নাও;
মুহূর্তের জন্যে ঝড় ঝিমিয়ে পড়েছে।
এক ক্ষণিক উষ্ণতার শুরু হলো গতকাল,
তাপমাত্রা এখনও শূণ্যের নিচে।

পুরুষের রাগে শুধু ঝড়ের তা-ব।

সংস্কৃতি ও ব্রহ্মান্ড
Culture and the Universe

গিরিখাতে গভীর অন্ধকারে,
দুই রাত আগে
কেবল অর্ধেক-চাঁদ ও নক্ষত্রপুঞ্জ,
শুধু নিছক পুরুষ।
প্রার্থনা, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও অস্তিত্ব।

বিপুল বিশালতায়
আমরা ছাড়িয়ে গেছি আমাদের।
আঁধারই আলো।
পাথর বর্ধিষ্ণু।

আমি জানি না মানবজাতি
সংস্কৃতি বুঝে কি না:
সহৃদয় হওয়ার
ধীশক্তি সহজ নয়।

রঙিন কাঠের লাঠি আর পালকের সাথে
যাত্রা করি গিরিখাতের ভিতর দিয়ে
পাথরের দিকে;
মধ্যশীতে
এ এক বিশাল সমাগম।

আমরা দাঁড়িয়ে পড়ি।

ঢুকে যাও আমার ভিতরে।
শান্ত ধ্যানের ভিতরে
বিশ্বলোক গান করে।

আমরা নীরব
তোমাদের মধ্যে আছি আমি ।

যে কারণে আমাদের অভিজ্ঞতা
সংস্কৃতির জরুরি– তা না জেনে
আমরা স্বয়ং গিরিখাদে।

পাথরের দেওয়াল,
ঘূর্ণিয়মান আমাকে
নক্ষত্র আর স্বর্গের মাঝামাঝি
শান্ত ও নীরব রাখে।

সর্বোপরি, এটি মানবজাতিও নয়
কোনো সংস্কৃতিও নয়, যা
আমাদের সংকীর্ণ করে।
এটি বিশালতা
যেখানে আমরা প্রবেশ করি না।
এটি একটি নক্ষত্রপুঞ্জ
যাদেরকে আমরা আপন ভাবতে দিই না।

আমার বাবার গান
My Father’s Song

আজ রাতে কিছু বলতে গেলেই
আমার বাবার কথা মনে পড়ে।
তার কণ্ঠস্বর, হঠাৎ আঁকড়ে ধরা,
তার সুক্ষè অন্তরের গভীরতা,
কোনো কিছুর আবেগ মথিত কম্পনে,
তার গান
ছেলেকে কেবল কিছু বলেছিলো।

এক বসন্তে আমরা ভুট্টা বুনেছি জমিতে
বহুবার বুনেছি আমরা
তবে ঠিক এ সময়
আমার দুহাতে স্যাঁতসেঁতে
নরম বালির কথা মনে পড়ে।

একটা সময় থেমে
বাবা আমাকে দেখিয়ে দেয়
লাঙলের উল্টো রেখা;
আর্দ্র নরম বালির মধ্যে
লাঙলের ফলা খুঁড়ে ফেলে
এক ইঁদুরের গুহাশ্রয়।

বাবা খুব আলগোছে পাটল বর্ণের
ইঁদুর ছানাকে হাতের তালুতে রেখে
আমাকে তাদের ছুঁয়ে দিতে বলে।
আমরা তাদের ক্ষেতের কিনারে নিয়ে
রেখে দিই আর্দ্র মাটির ছায়ায়।

শীতের স্নিগ্ধতা, বালুর উষ্ণতা
নেংটি ইঁদুর আর
আমার বাবার কথা খুব মনে পড়ে।

ভালোবাসার বন্ধনে
To Gather Them with Love

বৃক্ষহীন পাহাড়ের ঠিক ওপারে
তৃণভূমিতে নারী-পুরুষেরা
একে অপরের খুনি।
কান্না, আমরা শুনি না।
জ্ঞান, আমরা বুঝি না।
একে অপরকে লুকোনোই
আমাদের সুমধুর অনুভূতি।
কান্না, ভীতি আর প্রজ্ঞা
আমরা বহন করতে পারি না।
আমাদের দৃষ্টি আর প্রেম
অবশ্যই পৌঁছে যাবে
ভীতিপ্রদ পাহাড়ের গায়ে;
আর, সেই নিহত পুরুষ ও রমণীদের
ফিরিয়ে আনতে হবে পবিত্র জীবনে।

পাখির গান: তিন
Bird’s Song: Three

সে তার সামনে আর
চারিদিকে
দম নিয়ে নিয়ে
মহাশূণ্যের ভিতরে যাত্রা শুরু করে;

তার পরিস্কার গলা
এই গান গায়Ñ
সম্ভবত আগামীকাল বৃষ্টি হবে।

টানটান চামড়ায়
মৃদু গুণ গুণ
তারপর অঝোর ধারায়।

পরের দিনও বৃষ্টি হয়েছিলো
সে গেয়েছিলো অন্য গান।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শ্বেতা — সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬ @ ১২:৫৩ অপরাহ্ন

      বিদেশী কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে কবির ভাষারীতি, শব্দ ব্যবহারের বৈশিষ্ট এবং এর সাথে জীবনের যে আশ্চর্য চিত্রকল্প একেঁছেন তা অভাবিতভাবে বিস্মিত করে!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com