এডওয়ার্ড অ্যালবি’র অভিজ্ঞানহীন নান্দনিক জীবনাবসান

আবদুস সেলিম | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ৭:০৩ অপরাহ্ন

Albeeনাট্যকার এডওয়ার্ড অ্যালবি গতকাল (১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬) ৮৮ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি সর্বমোট সতেরটি নাটক, বেশকিছু প্রবন্ধমালা এবং তার নিজ নাটক দ্য জ্যু স্টোরির জন্য সঙ্গীত রূপরেখা রচনা করে গেছেন তার এই দীর্ঘ নান্দনিক জীবনযাত্রায়।
বিংশ শতাব্দীর একজন প্রথম সারির মার্কিন তথা বিশ্বের নাট্যকার হিসেবে এডওয়ার্ড অ্যালবিকে গণ্য করা হয় ইউজিন ও’নীল, আর্থার মিলার এবং টেনেসি উইলিয়ামস-এর সাথে। অ্যালবি একমাত্র নাট্যকার যিনি তিনবার পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
চরিত্রের সুক্ষ্ম চিত্রনের কারণে অ্যালবির ওপর চেখভ এবং টেনিসি উলিয়ামসের প্রভাবের বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না, যদিও অ্যালবি ‘ল্যাবেলিং’ বা গায়ে অভিজ্ঞান লাগানো পছন্দ করতেন না।
এডওয়ার্ড অ্যালবি-র জম্ম ১৯২৮ সালে। অ্যালবি গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশক থেকে নাটক লেখা শুরু করেন। পরবর্তি কয়েক বছরে তাঁর রচিত বেশ ক’টি একাঙ্কিকা লক্ষনীয়ভাবে লোকগ্রাহ্য হয়ে ওঠে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৫৯-এ রচিত দ্য জু স্টোরি। কিন্তু অ্যালবির খ্যাতি মূলত ১৯৬২-তে তার প্রথম লেখা পূর্ণাঙ্গ নাটক হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এর মাধ্যমে যেটি এলিজাবেথ টেইলর ও রিচার্ড বার্টন-এর অভিনয়ে ১৯৬৬ সালে চলচ্চিত্রায়িত হয়।

অ্যালবি-র পুরো নাম এডওয়ার্ড ফ্রাঙ্কলিন অ্যালবি। ১৮ দিনের শিশু এডওয়ার্ডকে রিড অ্যালবি এবং ফ্র্যানসিস্ অ্যালবি তাঁদের পুত্র হিসেবে দত্তক নেন যার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর নামের সাথে অ্যালবি পরিবারের নাম সংযুক্ত হয়। অ্যালবি পরিবার যথেষ্ট সম্পদশালী ছিলেন। অ্যালবি তেমন মেধাবী ছাত্র ছিলেন না এবং ১৯৪০ সালের শেষার্ধে তাঁর দত্তক মাতা-পিতার সাথে সর্ম্পক ছেদ করে স্বাধীন জীবন যাপন শুরু করেন। অ্যালবি স্বীকার করেন তিনি কখনই তাঁর দত্তক পিতা-মাতার সাথে স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন না। পড়াশুনাতেও তাঁর মনোযোগ না থাকার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন তাঁর দত্তক পিতা-মাতা তাঁকে ‘কর্পোরেট ঠগ’ বানাতে চেয়েছিলেন বলে তিনি তথাকথিত শিক্ষিত হতে চাননি।
যদিও অ্যালবি ঘোষিতভাবেই সমকামী, স্পষ্টতই তিনি কখনও ‘সমকামী লেখক’ রূপে নিজের পরিচিতির পক্ষপাতী নন। সম্ভবত এর কারণ সেই অভিজ্ঞানহীন নান্দনিকযাত্রা। এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘একজন সমকামী পুরুষ বা নারীর নিজেকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে তাঁর লেখায় উপস্থাপন করা সমীচীন। আমি সমকামী লেখক নই। আমি একজন লেখক যে স্বভাবে সমকামী।’
পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্ রচিত হয় ১৯৬২ সালে। নাটকটি ঐ সালেই ব্রডওয়েতে মঞ্চায়িত হয়। অ্যালবি রচিত এটিই প্রথম নাটক যেটি ব্রডওয়ের মঞ্চে আসে। তিন বার পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নাট্যকারের বিশ্ব পরিচিতি মূলত হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এর কারণেই।
অ্যালবির নাটকের বিশেষত্ব হলো তাঁর অতুলনীয় নাট্য-কৌশল, জীবনযাত্রার গভীর বাস্তববাদী সংবীক্ষণ, এবং থিয়েটার আভ দ্য অ্যাবসার্ডের আমেরিকীকরণ যেটি মূলত সূচিত হয়েছিল ইউরোপীয় নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেট ও ইউনেস্কো কর্তৃক গত শতাব্দির ষাটের দশকে। যুদ্ধ পরবর্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেসব নাট্যকারদের মাধ্যমে নাট্যচর্চা এক নতুন মাত্রায় উচ্ছৃত হয় অ্যালবি তাঁদের অন্যতম। যদিও হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এ প্রচুর প্রতীকের ব্যবহার আছে–নাটকটি বাস্তব মানব-মানবীর বাস্তব উপাখ্যান এবং তাদেরই কুহকী জীবন-যাপনের গল্প। একজন ইতিহাসের বিশ্ববিখ্যাত অধ্যাপক ও তার স্ত্রীর এক মধ্যরাত্রির একান্ত পার্টি যেখানে দু’জন তরুণ দম্পতি উপস্থিত, অ্যালবি তাঁর চতুর ও অসাধারণ নাট্যকৌশল ও সংলাপ বিন্যাসে বিগত যৌবন, দুই দম্পতির আদর্শিক সম্ভাবনাময় জীবনের অসফলতার বর্ণনা তুলে ধরেছেন যুগপৎ বাস্তব অযৌক্তিক ও হাস্যকর ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে। মানতেই হবে নাটকটি আপাতদৃষ্টে অভিপ্রায়ের অস্পষ্টতা ও অনিশ্চয়তার চক্রে আবর্তিত, কিন্তু গভীরে প্রোথিত আছে এক সুদূরপ্রসারী অনুমান আর সে অনুমানটি হলো, শিক্ষায়তনিক জীবন-যাত্রার গতি-প্রকৃতি। তবে তারও অন্তরে আরও একটি সূক্ষ্ন বিষয় স্পষ্ট করেছেন অ্যালবি, দাম্পত্য জীবনের কৃত্রিম সমন্বয়। লক্ষ্যনীয় নাটকটির নামকরণ হয়েছে বিখ্যাত ইংরেজ নারীবাদী লেখক ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এর নাম সংযোজনে। ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এর মৃত্যু ১৯৪১-এ, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। উল্ফ্ যুদ্ধের সময়ের সবচাইতে আলোচ্য ও বিখ্যাত ‘মডার্নিস্ট’ লেখক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জীবনে তিনি একাধিকবার ‘বাইপোলার ডিজঅর্ডার’ রোগের শিকার হন। এমন একজন নারীর, যে নারী সমাজে প্রতিষ্ঠিত, নারীবাদী, মেধাবী এবং সর্বোপরি মানসিক ভারসাম্যহীন তার স্বামীরূপে একজন পুরুষ নিজেকে কেমন পরিস্থিতিতে আবিস্কার করবে, যুদ্ধপরবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে, তারই একটি যৌক্তিক ও অযৌক্তিক নাট্যরূপ হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্
কিন্তু নাটকের আরও একটি মাত্রা আছে। সেটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তি সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষায়াতনের জীবন-যাত্রা। আপাতদৃষ্টে যে জীবনকে মনে হয় ভদ্রস্থভাবে শান্ত, পরিচ্ছন্ন। সত্যি বলতে কি ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এর লেখা পড়ে যে ধ্রুপদী জীবনে এই শিক্ষকরা উদ্বুদ্ধ হয়েছে এবং তারই বিপরীত সেইসব শিক্ষক যারা জীবনের কোন নবতর অর্থ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে–তাদেরকে নিয়ে যে দ্বন্ধ-সংঘাত অ্যালবি তাকেই প্রতিপাদ্য করেছেন এই নাটকে। যখন কোন মানুষকে-বিশেষ করে শিক্ষায়তনিক পেশায় আপন মেধার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় নামতে হয়, কিংবা অন্য কোনো চোরাপথে তা অর্জন করতে হয় সেখানে রাজনীতি কিংবা বৈবাহিক/রক্ত-সর্ম্পকের সুবিধাপ্রাপ্তির বিবেচনা প্রাধান্য পায়–সেখানে নাটকীয় ও মানসিক টানাপোড়েনের জন্ম নেয় নিঃসন্দেহে। তারই উজ্জ্বল উদাহরণ হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্-এর চরিত্র মার্থা, জর্জ, নিক এবং হানি।

যদিও দ্য জ্যু স্টোরি অ্যালবির লেখা একাঙ্কিকা নাট্যকৃতির অংশবিশেষ, এই নাটকটিকেই মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার মাইলফলক শিল্পপ্রচেষ্টারূপে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নাটকটির অন্তর্গত শক্তি হল, অসম্ভব এবং বাস্তবতার দ্বন্ধ, মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং প্রাচুর্য ও প্রান্তিক অস্তিত্ব, যা অ্যালবি সম্ভবত তার একান্ত জীবন যাপনের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছিলেন বিত্তবান জীবনকে স্বচ্ছন্দে পরিত্যাগ করে।
border=0অ্যালবি’র কোনো নাটক বাংলাদেশে মঞ্চায়িত হয়েছে বলে আমি অবগত নই, তবে তার দ্য জ্যু স্টোরি নাটকটি মূল ইংরেজি ভাষায় তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আইয়ুব ক্যাডেট কলেজ (সারদা ক্যাডেট কলেজ), সারদা’র শিক্ষার্থীরা ১৯৬৯ সালে অভিনয় করেছিল, যেখানে আমি শিক্ষকতার কর্মসূত্রে নিয়োজিত ছিলাম। আমি নিজেও সম্প্রতি অ্যালবি’র হু’জ আফ্রেইড আভ ভার্জিনিয়া উল্ফ্ নাটকটি বাংলায় ভাষান্তরিত করেছি, যেটি গত সপ্তাহে মুদ্রাঙ্কিত হয়েছে, বুক কর্ণার কর্তৃক। অ্যালবির নাটক বাংলাদেশে মঞ্চায়নে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সাংস্কৃতিক অগম্যতা (cultural incompatibility)।
এডওয়ার্ড অ্যালবি’র একটি উল্লেখ্য উদ্বৃতিযোগ্য উক্তি If you’re willing to fall interestingly, you tend to succeed interestingly. অর্থাৎ ‘যদি আপনার এক আকর্ষণীয় জীবনাবসানের ইচ্ছে থাকে, তবে আকর্ষণীয় সাফল্যের চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করুন।’ এডওয়ার্ড অ্যালবি নিঃসন্দেহে তাই করেছেন।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত আবদুস সেলিমের আরও লেখা:

লিবিয়ার ঈদ, খাদ্যাভ্যাস ও আতিথেয়তা

দ্বৈত ও অদ্বৈতের প্রসারিত যাত্রা

দূর থেকে দেখা শহীদ কাদরী

রবার্ট ব্রাউনিং সম্পর্কে হোর্হে লুইস বোর্হেসের বক্তৃতা

মায়া অ্যানজুলোর কবিতা: বিস্ময়কর নারী

শহরে অচেনা মাছ

সংস্কৃতি ও ধর্ম: আরববিশ্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে

মানুষের জাদুবিশ্বাস ও ধর্মাচারের সোনালি বৃক্ষশাখা

আমার বন্ধু আবদুল মান্নান সৈয়দ

নৃত্য শুধু নৃত্য নয়

কার্লোস ফুয়েন্তেসের প্রবন্ধ:
মৃত্যু

মান্নান-এর বিশ্বাস

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com