৮৭তম দিনে তারা এবং আমি

রুবাইয়াৎ সিমিন | ৫ জানুয়ারি ২০১৭ ১২:৫৬ অপরাহ্ন

monish.jpgমুহূর্তের পর মুহূর্ত বেদনার্ত মনে বসে থেকে সে বেরিয়ে আসে মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার বাষ্পযুক্ত শ্বাস ফেলে ঢুকে যায় খোলা স্নানাগারে।
নিষ্পলক কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র অপেক্ষা তার, ৮৭তম দিন আজ।
ইশ, ওর আসবার দিনও সব ঠিক ছিল! দু’দিন অন্তর বদলেছে পানি, জেট যুক্ত করে তার মাঝে আবার কখনো পরম মমতায় কিংবা খুব তাড়াহুড়োয় বদলেছে ডুবে থাকার জায়গাটা । কাউকে বলে আসলে বোঝানো যায় না অনেক কিছুই যেমন এখন বোঝানো যাচ্ছে না নিজেকেই। এমনটা কি করে হল! অসাবধনতা, পুরো ব্যাপারটাই ঘটে গেছে তার অসাবধানতায়।
সেবার যেবার পাহাড়ে গেল সবাই মিলে সেবারও কি কম কাণ্ড হলো?
সবার সাথের সব কিছু যেমনটি নিয়ে গিয়েছিল তেমনটিই ফেরত আসলো, আসলো না শুধু ওগুলোই। পরে ড্রাইভার, গাইড কতজনকে ফোন করে খুঁজে পেতে আনা গেলো তবুও।

মনে আছে, খুব মনে আছে বৃষ্টিভেজা দিনে অনেক ছবি তোলা হল, আনন্দ আড্ডা হল। তারপর এসে পরম মমতায় ভিজিয়ে দিল ফেনিল; জেট পাউডারে তৈরী ফেনিল বুদবুদে। কয়েকটি গোল গোল হাওয়াভর্তি বড় আকারের বুদবুদ হাতের উপর দিয়ে ভেসে গেল রংধনুর ন্যায় বর্ণচ্ছটা তৈরী করে। ইশারা! কত রকমের ইশারা চলে জগতে। এই ভেসে ভেসে যাওয়া ব্যাপারটাই বা কম কি? ক’টা বুদবুদে ক’টা রংধনু তৈরী করেছিল, কোনরূপ কি কোন ঈঙ্গিতমূলক ব্যাপার ছিল! অথচ প্রায় দু’ কি তিনদিন অন্তর ও বদলেছে পানি, নতুন পানি, নতুন করে বানানো জেট পাউডারের গোলা; তার মধ্যে পরম মমতায় অপেক্ষা, উপযুক্ত সময়ের না পর্যাপ্ত সময়ের অপেক্ষা!

আচ্ছা মেয়েরা কুহুকিনী না হলে বোধহয় জগতের কোন নিয়মই ঘটত না।
বলল বেশ করে আর অমনি ঘটে গেল ব্যাপারটা। না বললে হয়ত চলত আরো বেশ কিছুদিন, কিংবা সব সময়ই তেমনটিই ঘটে যেত যেমনটি চলছিল।
সকল বিশ্বাসের জায়গাটিতে বরাবরের মত আবার একটি ঘা খেল সে। পাশ মুড়ে শোবার চেষ্টাটা করে রেহাই নেই ভেবে আবার উঠে বসে একদৃষ্টিতে চেয়ে রয় আর কানে বাজে ঝর্ণার কলতান নিয়ে আছড়ে পড়া হাসির শব্দ।
উহ … আর পারা যায় না। মেয়েটা পারেও। খারাপ একটা। কি যে হবে তার কে জানে।

একদিন স্বপ্নে দেখে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে সে। কি বলছে কুহকিনীটা আবার!

তুমি পরছ সেটা? না, ফিতাটাই পরানো হয়নি।
ও আচ্ছা, পাঠিয়ে দিতে পোস্ট করে, কথার জবাবে উত্তর আসে- সেটাই করা যেত।
একটা কথার জের ধরে এত কিছু হয়ে গেল আবার বলে কিনা পাঠিয়ে দিতে, ফিতা লাগাতে। সে ভাবল যে সে দেখল কি করে ওটাকে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো ওপ্রান্ত থেকে সেদিন যে দেখালে শুকিয়ে-টুকিয়ে একেবারে হা করে কেলিয়ে রয়েছে তবে সেটা কী ছিল? কেলিয়ে থাকাই তো বলতে হয় কিন্তু কি আশ্চার্য সেদিন ও সে স্বপ্নে দেখেছিল কি সুন্দর এক জোড়া মাছ হয়ে তারা ফেনার বুদবুদ ভেদ করে উপরে উঠে আসছে আবার নিচের স্বচ্ছ পানিতে নেমে যাচ্ছে। স্বপ্ন-অলীক কল্পনার পাখায় ভর করে যদি সত্যিই ওগুলো মাছ হয়ে যেত তবে বেশ হত, সময়ের ধারাবাহিকতায় ওগুলোকে নিয়মিত জলসেবা করা যেত। বেশ সুন্দর এক জোড়া মাছ!

না না এ হয়না– বলে সে আবার ঢুকে যায় স্নানাগারের মধ্যে। সেখানে স্বপ্নের মাছ জোড়া মাছ হয়ে যাবার পরিবর্তে তার দিকে সুস্পষ্টভাবে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে চেয়ে আছে এই মুহূর্তের করণীয় খুঁজে না পেয়ে। বেদনার্ত মনের কান্না ভাষা খুজেঁ না পেয়ে নিষ্পন্দ হয়ে তাকিয়ে রয়; সমাধান কি করা যেত না কোনভাবেই! ও কোনভাবেই বোঝে না শুকিয়ে-টুকিয়ে কেলিয়ে থাকবার ব্যাপারটা তাই আবার জানতে চায়, কিন্তু তুমি দেখলে কি করে আর কোথায় কিভাবে? উত্তর আসে, কেন তুমিই তো দেখিয়েছিলে মনে পড়ে না সাদার মধ্যে একটু কালো আর লালের আভাওয়ালা শেলাইয়ের পাশ দিয়ে পাশ দিয়ে (সশব্দে ঝরে পড়ে হাসি)।

কি রকম ছিল বলত। আবার মনে পড়ে যায় প্রথম দেখার দিনের মুগ্ধবোধের কথাটা। পরে তার ব্যাবহারেই বা কমতি ছিল কি! বরং প্রথম পরিচয়ের পর ব্যাবহারের মধ্য দিয়ে আরও বেশী আপন হয়ে গিয়েছিল তারা। শুধুই কি তারা তার নিজেরও কি ভাললাগা তৈরি হয়নি তাদের প্রতি? হয়েছিল, এক ধরনের ভাললাগা। সৌন্দর্যবোধের সাথে একধরনের ভাললাগার বোধ তাই তো সে সব সময় তাদের প্রতি ছিল বিশেষ যত্নবানও।
কত কত দিন সে তাদের দেখেই শুধু অন্যদের সাথে চলে গিয়েছে; সর্বতভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ীত্বের ব্যাপারে তার ছিল সজাগ দৃষ্টি। যে দৃষ্টির এতটুকুও হেরফের হয়নি আজ বেশ কয়েক বছরেও। এই যত্নবানতার ব্যাপারটি নিয়ে অবশ্য নিকট জনেরাও কম উক্তি করেনি। কতগুলি তো রীতিমতন সকলের মধ্যে ছড়িয়েও গিয়েছিল। সক্কলে মিলে সে কি কম কথা শুনেছে। সে গর্বিতই বোধ করত যে তারা শুধুই তার আর কারো নয়। এবং এই পাওয়া তার বেশ দীর্ঘস্থায়ী পাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
সেবার ওই যে সেই মেয়েটি যে প্রজাপতির পাখায় ভর করে আসতো তার কাছে যখন তখন সেও হারিয়ে যায়নি, সেও ছিল। একদিন বলেছিল তার মুগ্ধতাবোধের কথা। শুনে এমনি করে হেসেছিল বেশ অনেকক্ষণ। বলেছিল তোমার তো অবশ্যই ওদের বিকল্প ভালবাসা তৈরি করে রাখা উচিত নতুবা তাদের অবসানে প্রাণ বাঁধবে কী প্রকারে? স্পস্টতই ঠাট্টা ছিল,পারতও বটে। সর্বক্ষণ এক সুরলহরী যেন বা! তারপর কী যেন হয়ে গেল একদিন স্রেফ হারিয়ে গেল সময়ের আবর্তনে; বহুদিন পর একটি বার্তা পেয়েছিল- ‘ফোন করো’, তারপর আর কোন খোঁজ নেই। তারও সেটা করবার কথা মনে হয়নি বা এমনটি নয় কিন্তু হয়ে ওঠেনি। আর বলতই বা কী যে আমি তোমার কথা অনুযায়ী চলে দেখিনি তাই আমার সকল কাজ শেষ হয়েও হয়নি।
এই মুহূর্তে বিছানায় গা এলিয়ে বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গিয়েছে তার ভাবনার জগতে বিচরণ। কান্নার শব্দ আসছে কি? আসলে কান্না তার মনে। একক মনে, উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির বোধের দ্বারা আক্রান্ত মনের কান্না। আচ্ছা বেশ মনে আছে গত মাসেও সে একবার একদিন ভাবলো আজ তো বেশ একটু সময় আছে ব্যয় করবার মত কিন্তু করি করি করেও সময় বের করা হলো না।

এ এক বেশ খেলা খেলা একটা ব্যাপার চলছিল এই প্রায় তিন মাসে। প্রতি তিন বা চার দিন অন্তর পানির খেলা। পুরাতনটুকু গড়িয়ে ফেলে দিয়ে নতুন পানিতে তাদের সহ্য ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখবার মত করে একটু ছুইয়ে আবার সুগন্ধি ফেনায় নিমজ্জন। মাঝেমাঝে তার নিজেরও যে ওদের সাথে নিমজ্জনের ইচ্ছেটা জাগত না তা নয়। তাদের সুখী ভালবাসাপূর্ণ জীবনের প্রতি তার একধরনের আকাঙ্ক্ষা ছিল সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নে সে যত্নবান ছিল তাদের প্রতি।
সে ভাবে, একান্ত করেই ভাবে খেলাটার প্রতিও তার একধরনের মায়া বা অভ্যস্ততা জন্মে গিয়েছিল, নচেত এটুকু তো তার খেয়াল করবার কথাই ছিল যে এমনতর একটি ভয়াবহ ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। সে কি এতটাই মোহগ্রস্থ ছিল যে মাছ, এক জোড়া সোনালী মাছের স্বপ্নে সে ঘটে যেতে দিল ব্যাপারটা আর সোনালী মাছের ব্যাপারটাও তো শুধু স্বপ্নে দেখেছিল সে যেমনটা কখনই বাস্তবে ঘটা সম্ভব না। তবে মুগ্ধতার বোধ কি তাদের থেকে সরে সোনালী মাছের প্রতি বেড়ে গিয়েছিল!

আজ আর প্রয়োজন নেই তার পানি বদলাবার কিম্বা ফেনা তৈরি করবার কিম্বা স্নানাগারের একটি প্রান্ত যা সে দীর্ঘদিন যাবত দখলিকৃত করে রেখেছিল, তাও আজ মুক্ত হবে সকল দিক থেকে এও এক প্রকার ভাল হল বলে ভাবতে ইচ্ছে করে কিন্তু তারপর বারবার কি শুন্য স্থানটির উপর তার চোখ পড়বে না? পড়বে তো। তখন কি সে ভাবতে বসবে মধুরতম স্মৃতির সময়গুলির কথা?

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Selina Akhter — জানুয়ারি ১১, ২০১৭ @ ৪:২৯ অপরাহ্ন

      I am usually used to read only, never comment on anybody’s writing. This is the first time I feel to say something. Honestly speaking, the writing which expresses some feelings/monologues of the writer, not very systematic, starts suddenly and stops without any conclusion or hints any background story. I could not understand what is really happened in the expression. Sometime, we face/imagine some irregular thinking which does not have any clear idea, or shape. In this similar context I enjoyed the expression. Keep going.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রুবাইয়াৎ — জানুয়ারি ১২, ২০১৭ @ ৪:০২ অপরাহ্ন

      selina akhter, ধন্যবাদ আপনাকে গল্পপাঠ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার জন্য।
      আরো কিছু লিখতে গিয়ে এই কথাগুলো আমার স্মরণে আসবে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com