লিবিয়ার ঈদ, খাদ্যাভ্যাস ও আতিথেয়তা

আবদুস সেলিম | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১১:৩৭ অপরাহ্ন

আশির দশকে–যখন মুয়াম্মার গাদ্দাফির সুসময়–আমিসহ বেশকিছু বাংলাদেশি ইংরেজি শিক্ষক লিবিয়ায় শিক্ষকতা করতে গেছিলাম। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সেই সময়ের বসবাসকে আমি একাধিক স্থানে ‘অসভ্যবাস’ সংজ্ঞায়িত করলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথার প্রতিধ্বনি করে বলতেই পারি ‘জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা।’ প্রায় চার বছরের একটানা সেই ‘অসভ্যবাসে’ আমার অভিজ্ঞতার অর্জন কম ছিলো না–অনেক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব ছিলো বলতেও দ্বিধা করব না।
লিবিয়া একটি বিশাল দেশ যার সাথে আরব মুসলমানদের সম্পর্ক সুনিবিড়। ইতিহাস বলে খ্রীস্টিয় ১৪৫ সালে সেপটিমাস্ সেভেরাস্ নামে এক রোমীয় সম্রাটের জন্ম হয়েছিল লেপটিস্ মাগনা নামে আফ্রিকার এক রোমীয় প্রদেশে যেটি বর্তমান লিবিয়ার অংশ যার নামকরণ হয়েছে বর্তমানে লেবদা বলে। এই সম্রাট ১৯৩ থেকে ২১১ পর্যন্ত রোমীয় সাম্রাজ্য শাসন করে। সেপটিমাস্ সেভেরাস্-এর তৈরী লেপটিস্ মাগ্না শহরের পূরাকীর্তি সংরক্ষিত আছে আজও যেখানে আমার যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল।

এর অনেক পরে সপ্তম শতাব্দীতে মিশর থেকে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব লিবিয়ায়। লিবিয় মুসলমানরা বিশ্বাসে সুন্নি প্রশাখার তবে সেখানে সংখ্যা লঘু ক্রিস্টান ধর্মাবলম্বীও আছে। এক সময় বেশকিছু ইহুদি বসবাস করতো। মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে অধিকাংশ ইহুদিই লিবিয়া ছেড়ে চলে যায় যদিও ত্রিপলি শহরে এখনও একটি বড় ইহুদি উপাসনালয় আছে। বলা হয় শেষ লিবিয় ইহুদির মৃত্যু হয় ২০০২ সালে।
লিবিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। লিবিয়া বিভিন্ন সময়ে একাধিক বিদেশী শক্তি দ্বারা শাসিত হয়েছে-যেমন য়ূরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা। প্রাচীন লিবিয়া, রোমীয় লিবিয়া, ইতালি শাসিত লিবিয়া এবং আধুনিক লিবিয়া-এই ছয় পর্যায়ে লিবিয় রাজনৈতিক ইতিহাস বিভক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্র শক্তির আধিপত্যে–কারণ সেই সময় লিবিয়া ইতালির অধিনস্ত ছিল-লিবিয়ার শাসন ব্যবস্থায় ইংরেজ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ১৯৪৪ সালে নির্বাসিত রাজা ইদ্রিস মুক্ত লিবিয়ার শাসনকর্তা হয় এবং ১৯৬৯-এ কর্ণেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতা দখল করে যার শাসন আমল সমাপ্ত হয় ২০১১-তে মার্কিন আগ্রাসনে। ফলে দেখা যায় রাজনৈতিকভাবে লিবিয়া যতই বৈচিত্রময় হোক না কেনো-লিবিয়া প্রধানত একটি সুন্নি মুসলিম দেশ যেখানে মানুষের জীবনযাত্রায় ইসলামি সংস্কৃতি ও চালচলনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। আরবি ভাষাভাষি এই দেশটির সর্বমোট জনসংখ্যা আশির দশকে ছিলো মাত্র পঁচিশ লক্ষ যে সময়ে আমি লিবিয়ায় ছিলাম, যার মধ্যে কর্মরত আমার মতো বিদেশীও অন্তর্ভূক্ত, অথচ লিবিয়া ছিলো আফ্রিকার দশটি শীর্ষ স্থানীয় তেল উৎপাদক দেশের একটি। স্বাভাবিকভাবেই লিবিয়ার প্রতিটি মানুষই বিত্তবান। এমন একটি দেশে ঈদ উৎসব বা অন্যান্য উৎসব, খাদ্যভ্যাস এবং আতিথেয়তার সংস্কৃতি কেমন ছিলো স্বল্প পরিসরে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

আমার প্রাথমিক অভিজ্ঞতায় আমি বলতে পারি যেহেতু লিবিয় মুসলমানরা সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলো তাদের ঈদ উদযাপন আমাদের থেকে তেমন ভিন্ন কিছু ছিলো না। ঈদকে আনন্দোৎসব হিসেবে পালন করা হতো রাষ্ট্রীয়ভাবেই। তবে অন্যান্য (মুসলিম) ধর্মীয় দিবসগুলো-যেমন শবে কদর বা শবে বরাতের কোনো ছুটি থাকতো না–বলা যায় এই ধর্মীয় দিনগুলো কখন আসতো বা যেতো অনেক সময়ই তার খোঁজ মিলতো না। রোজার সময় কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকতে দেখিনি। অনেক সময় রেস্তোরাঁ বেয়ারাদের জিজ্ঞেস করতে শুনেছি ক্রেতা মুসলমান কিনা, তবে খাবার পরিবেশন করতে দ্বিধা দেখিনি। সম্ভবত ব্যাপারটি অন্যান্য আরব মুসলিম দেশে ভিন্নতর। তাছাড়া আমার এ অভিজ্ঞতা রাজধানী ত্রিপলি শহরের। একটা বিষয় আমি অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি সেটি হলো লিবিয়রা ফিতরা বা যাকাত দিতো কাদের। কারণ ওখানে ফকির বা অভাবি তো ছিলো না কেউ। বিষয়টি আমার কাছে পরিস্কার হয়নি যদিও গুজব শুনেছি আমাদের উপমহাদেশের কর্মরত অনেকেই এগুলো নিতো। তবে আমি নিজে কখনও এমন প্রমাণ পাইনি। ঈদুল আযহায় কোরবানী দিতে দেখেছি যা প্রধানত সীমাবদ্ধ ছিলো উট, দুম্বা এবং ভেড়ার ভেতর। ত্রিপলি এবং বেনগাজী শহরে গরু কোরবানী আমার চোখে পড়েনি। এর একটি কারণ সম্ভবত লিবিয়ায় গরুর অপ্রতুলতা। যতদূর জানি লিবিয়ায় গরুর ও ভেড়ার মাংসের প্রধান সরবরাহকারী ছিলো ইতালি। লিবিয় ভেড়া ও দুম্বার মাংস খুবই ব্যয়সাধ্য যাকে বলা হতো ‘খারুফ্ ওয়াতনি’। গরীব-মিসকিনদের মধ্যে মাংস বিতরণও আমার দৃষ্টিতে পড়েনি এবং কারণ সেই একই–জনসাধরণের স্বাচ্ছন্দ্য। ত্রিপলি শহরে ‘মায়দানুল আখ্দার’ বা গ্রীন স্কয়ারে ঈদের নামাজ হতো–জানিনা ঐ মাঠটির নাম এখনও তাই আছে কিনা।
লিবিয়দের খাদ্যাভ্যাসে আরবদের মিল আছে, বিশেষ করে আফ্রিকি আরবদের। তবে ইতালীয় প্রভাবে লিবিয়রা পাস্তা, পিৎজা এবং ম্যাকারুনি খেতে বিশেষ অভ্যস্ত। লিবিয় পাস্তা ও পিৎজা অত্যন্ত সুস্বাদু, আমার নিজ অভিজ্ঞতায় তা বলতে পারি। গ্রামীণ লিবিয়দের একটি প্রিয় খাবার মিষ্টি খেজুর ও উটের দুধ। খেজুর দিয়ে একাধিক মিষ্টান্ন রান্নার প্রচল ঈদপার্বনে লক্ষনীয়–আমাদের দেশে সেমাই রান্নার মতো। একটি পছন্দের মিষ্টান্নর নাম মনে পড়ছে: মাগরুদ।

আর একটি সুস্বাদু খাবার হলো ‘বাজিন’–আটা আর স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত সস, টমেটো পুরি, হলুদ, মরিচগুড়া, আলু, মুরগির মাংস বা মাছ দিয়ে এই খাদ্যটি প্রস্তুত করা হয়, বিশেষ করে বিয়ে, ঈদ বা অতিথি সৎকারের সময়ে। আমার ব্যক্তিগত পছন্দের খাবার ‘কুসকুস্’ এবং ‘লেবরাক’ বিশেষ করে ‘লেবরাক’ যেটি প্রস্তত হয় চাল, টমেটোপুরি, মসলা, রশুন, লবন এবং টুকরো বা কিমা মাংস একসাথে করে আঙ্গুর গাছের পাতায় মুড়ে গরম ভাপ দিয়ে। এই খাবারগুলো ঈদের সময়ে অবশ্য রন্ধনীয়। স্বাভাবিকভাবেই একটি দেশ বা জাতির খাদ্যতালিকা দীর্ঘ হবে কিন্তু আমি যে খাদ্যগুলোর নাম এলোমেলোভাবে বর্ণনা করলাম সেগুলো ঈদ বা বিশেষ আতিথেয়াতার তালিকায় সংযুক্ত হতে দেখেছি। শুধু একটি খাদ্যের উল্লেখ করে এই পর্বটি শেষ করব সেটি হলো আরব দেশে সীমের বিচি বা ‘বিন’ জাতীয় উপাদান ব্যবহারে একটি বিশেষ খাদ্য প্রস্তুত করা হয় যার নাম ‘ফাসুলিয়া’ এর মধ্যে ভেড়ার মাংস, আলু, টমোটোর ঝোল এবং অন্যান্য মসলা দেয়া হয়। এই ‘বিন’ আবার সিদ্ধ করে লবন, ও জলপাইয়ের তেল দিয়ে ভর্তা বানিয়ে ‘খুব্জ’ বা লম্বা একধরনের ফ্রেঞ্চ রুটির সাথে সকালের নাস্তা করা হয়। বলতেই হবে এই সাধারণ খাবারটিও অসাধারণ!

লিবিয়রা বা আরবরা ‘লেজানডারি’ ভাবে অতিথিপরায়ন। ঈদে বন্ধুদের বা আত্মীয়দের আমন্ত্রণ করে খাওয়ানো লিবিয়ায় আমাদের দেশের মতোই একটি সাধারণ শিষ্টাচার।
এটি প্রমাণে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার একটি মাত্র বর্ণনাই যথেষ্ঠ। আমার এক লিবিয় সহকর্মী ছিলো, নাম খলিফা তালহা–ইংরেজির শিক্ষক। এক ঈদুল আযহায় সে আমাকে আমার পরিবারসহ রাতের খাবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে। আমাদের সেই আমন্ত্রণে খাদ্যের প্রবাহ শুরু হয়েছিলো সন্ধ্যে সাতটায় এবং সেই খাদ্যস্রোত রাত দশটায়ও যখন বন্ধ হচ্ছিলো না তখন আমরা দু’হাত জোড়া করে ক্ষমা চেয়েছিলাম। একটি বিষয় বলে রাখি, বিয়েতে বা ঈদের দাওয়াতে আরবরা একসাথে একটি বিশাল থালায় সবাই মিলে খেতে পছন্দ করে। এতে নাকি ভ্রাতিত্বে বন্ধন দৃঢ় হয়। আমার বন্ধু বিদেশে পড়াশুনা করে জানতো এই সংস্কৃতির প্রচল আরব দেশে বা লিবিয়ার বাইরে নেই। তাই সে খাবার পরিবেশন করেছিলো ভিন্ন-ভিন্ন প্লেটে। তবে টেবিল-চেয়ার নয়, মেঝেতে ফোমের বিছানায়। জীবনের সেই দুর্লভ অভিজ্ঞতা সত্যিই অমূল্য।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রকৌঃ মসির উদ্দীন শেখ — সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৬ @ ১১:৩৯ অপরাহ্ন

      সেলিম ভাই, অসংখ্য ধন্যবাদ। খুব ভাল লাগলো এত বছর পরে সেই পুরনো দিনের কথাগুলো নতুন করে হুবহু জানতে পেরে। আমি সেই সময় (১৯৭৯-১৯৮৫) সপরিবারে আল আজিজিয়াতে ইলেকট্রিসিটি ডিপার্টমেন্টে কর্মরত ছিলাম। আপনিও সে সময় কিছুদিনের জন্য সুগ আল খামিস-এ কর্মরত ছিলেন।
      এ ধরনের আরো লেখা আশা করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abdus Selim — সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৬ @ ৯:১৮ পূর্বাহ্ন

      Thanks a lot Mr. Sheikh. I wish to write a memoirs on Libya soon.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Raqib Jahan — সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৬ @ ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

      Thank you very much for reminding old days of my childhood. It is a nice piece of writing. I was in Libya during (79-87) with my parents initially at Sirte and later at Jaref (the village where Muammar’s family & kins lived which 75KM away from Sirte). Since we used to live in village so we had experience of village hospitality of Libyans. Since we were very few foreigners there we were actually loved by them. Memories of regular invitation to their weddeing, Sunnate Khatna ceremonies with kuskus, makruna and ayesh (may be bijan what you mentioned)and barbeque lambs, freedom to pluck apples, grapes, mishmish (apricot), khuk (peach) from their orchard whenever we wanted are still very much alive to our mind.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Al Amin Chowdhury — সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৬ @ ৪:২৮ অপরাহ্ন

      Travel story is best for all. Because Every body have no ability to tour every country…..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shajeda Nasrin Sweet — সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৬ @ ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

      khub bhalo laglo lekhati pore, soto belar kotha mone pore gelo, 1979-1990 porjonto Libya’r sriti asole bholar moto na, kono kharap sriti nei,tobe majhe moddhe soto selera miskeen bolto amader, tokhon kharap lagto, esara khabar, athitiota, niarapotta, bondhutto shoboi mone rakhar moto, khub mone pore……….

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com