মায়াবতী

শারমিন শামস্ | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১১:৫২ পূর্বাহ্ন

Anondo(বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া সিমিকে ভেবে…)
মায়াবতীকে তাদের বাড়ির কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে রিকশা ঘুরিয়ে আমি চলে এসেছিলাম। তারপর সারারাত তার সাথে আমার আর কোন কথা হয়নি ফোনে। সকালে জানলাম, মায়াবতী আত্মহত্যা করেছে। বন্ধু হুমায়ূন ফোন করে খবরটা আমাকে দিল। আরো বললো, দোস্ত, একটু সাবধানে থাক। তোরে নিয়ে টানাহ্যাঁচরা করবো পুলিশ।
হুমায়ূনের কথা সঠিক। পুলিশ আমাকে নিয়ে যথেষ্ট টানাহ্যাঁচরা করলো। তিনবার থানায় ডেকে পাঠালো। একেক বার দশ থেকে পনেরো ঘণ্টা বসিয়ে রেখে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আমাকে এমন পর্যায়ে নিতে চাইলো, আর একটু হলেই আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে বলতাম, সব দোষ আমার। মায়াবতীর মৃত্যু, তার আত্মহত্যা, তার অপমান, তার বেদনা, বিমর্ষতার সব দায় এই আমি, মোহম্মদ রাকিবুল ইসলাম, এই আমি মাথা পেতে নিলাম।
কপাল ভালো, এরকম কিছু ঘটলো না। কেস পরিস্কার। পাড়ার মোড়ে প্রতিদিন যে ছেলেগুলি জোট পাকিয়ে মায়াবতীকে যথেচ্ছ অপমান করতো, তাদের উপর খেপে গিয়ে সেদিন ঘুরে দাঁড়িয়ে তর্ক ঝগড়া করেছে মায়াবতী। তারপর সেই ছেলের দল বাড়ি এসে শাসিয়ে গেছে মায়াবতী আর তার বাড়ির লোকদের। বলেছে, তারা তাকে কাপড় খুলে ন্যাংটো করে পুরো পাড়ায় চক্কর দেয়াবে। বাপ মা ভাইয়ের সামনে তারে ধর্ষণ করে এই বাড়িতে বসেই পোলাও মাংস খেয়ে পার্টি করবে- এরকম অজস্র হুমকি দিয়ে বীরদর্পে বেরিয়ে গেছে ছেলের দল।

তারা বেরিয়ে গেলে মায়ের আহাজারি আর বাপের বিমর্ষ মুখ পিছনে ফেলে নিজের ঘরে যেতে উদ্যত মায়াবতী যখন, তখন পিছন থেকে ছোট দুই ভাই বোন, যাদের কী না সে প্রাণের অধিক ভালোবাসতো বলেই জানতাম, তারা খ্যানখ্যানে স্বরে বলেছে, তোমার মত বড় বোন থাকাটাই পাপ। কাল থেকে নিশ্চয়ই আমাদের ইশকুল টিশকুল বাদ দিয়ে ঘরেই থাকতে হবে, এই তোমার জন্যই!
আর কিছু ঘটেনি এরপর। নিশ্চুপ মায়াবতী ফিরে গেছে নিজের ঘরে। গভীর রাতেও মা দেখেছেন ইজেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছে সে। অবাক হননি মা। মেয়ে তার এমনি, পাগলাটে, কেউ বোঝে না একে। এক বুক বিষন্নতা আর দুশ্চিন্তা নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে গেছেন তিনি।
হয়তো এরপর, ভোরের আলো যখন ফুটিফুটি, হয়তো ফজরের আজান, হয়তো পাখির ডাক, এইসব শব্দমণ্ডলীর ভিতরেই কোন এক ফাঁকে সিলিং ফ্যানে একখানা ওড়না বেঁধে ঝুলে পড়েছে মায়াবতী। আর তার প্রেমিক, এই আমাকে, পরপর তিনদিন থানায় বসিয়ে রেখে একের পর এক প্রশ্ন করেছে পুলিশ। ওই ছেলের দলে ছিল সাত বা আটজন। তাদের একজন ধরা পড়ে স্বীকারোক্তি দেবার পর তারে নিয়েই পুলিশের ‌আপাতত ছুটোছুটি চলছে। লাভের মধ্যে লাভ, আমার ব্যাপারে তারা ক্ষ্যান্ত দিয়েছে। আমি বাদ।
পুলিশের কারণে মায়াবতীকে নিয়ে শোক করার অবসরটুকুও আমার ছিলনা। বছর ঘুরলেই আমরা বিয়ে করবো, এমন একটা সুপ্ত ভাবনা আমার মনে দোল খেলেও, মায়াবতীর সাড়া ছিল কি ছিল না, জানাই হয়নি। নিজের বাপ মা ভাই বোনের জন্য জান দিয়ে খাটতো সে। অভাবের সংসারে চারুকলা পাঠের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে দিনরাত এই পুতুল বানানো, সেই শাড়ি ডিজাইন, এই বিয়ে বাড়ি, সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চসজ্জা চলছিলোই। কিন্তু এলাকাটা বড্ড খারাপ। বলেছিলাম আমি, মায়াবতী সাবধানে থাকো, ওই ছেলেগুলো বড্ড চামার নোংরা। মায়াবতীও জানতো। কিন্ত ওই পথটা ধরেই যেতে আসতে হত দুইবেলা। কী করার আছে!

মায়াবতী মারা গেছে এই আকস্মিক শোক নিয়ে আমি পুলিশের হয়রানি পার করলাম। সেসব শেষ হলে কিছুদিন ঘুরলাম পথে পথে। এক নিরুত্তাপ অবসাদ আমাকে ঘিরে ধরলো। সারাদিন রোদে রোদে ঘুরি। খিদে তৃষ্ণা পায় না। মাথার ভিতরে জ্বরের মত একটা ঘোর নিয়ে বেশ কয়েকটা দিন চলে গেল। রাতে হোস্টেলের আধময়লা বিছানাটায় শুয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ি। ইয়ারদোস্তরা এসে কপালে হাত রাখে। এক ধরনের তীব্র বেদনার বোধ হতে থাকে। আমি নিজেকে সামলে নিই। আমি কখনো ভাবি নাই, মায়াবতী এভাবে মরতে পারে। সে বড্ড শক্ত ধাঁচের মেয়ে ছিল। সে হিসেবে আমি মুখচোরা, ভিতু আর পলায়নপর মানুষ। ছেলেগুলো মায়াবতীকে প্রতিদিন যা ইচ্ছে তাই বলে যন্ত্রণা দিচ্ছে জেনেও আমি কখনও প্রতিবাদ করে দুটো কথাও শুনিয়ে আসতে পারি নাই ওদের। বরং মায়াবতীকেই বলেছি, তুমি বুঝে শুনে চলো। মায়াবতীও কখনও আমাকে বলেনি, প্রতিবাদ করো, কিংবা আমাকে রক্ষা করো, আমাকে নিরাপত্তা দাও। কিচ্ছু না। কোনদিন চোখের ভাষাতেও সাহায্যের কোন আর্জি জানায়নি সে। হোস্টেলের নোংরা বিছানায় শুয়ে আমি এইসব ভাবি। আজ বাদে কাল যাকে নিয়ে আমার সংসার পাতার কথা সে হুট করে গলায় দড়ি দিয়ে মরে গেলে জীবনের স্বাভাবিক স্রোতে ফিরে আসা বড় কঠিন। আমি সেই কঠিন পরীক্ষাকেন্দ্রে বসে সময় পার করছিলাম।
মায়াবতী চলে গেল বলে জীবন থেমে থাকলো না, সে এক গৎবাধা কথা ও রীতি। এরই মধ্যে মায়াবতীকে নিয়ে মিডিয়া, ফেসবুকে তোলপাড়। মানববন্ধন, মিছিল এইসবও হয়েছে। কিন্তু সেই একজনই পুলিশের হাতে ধরা। বাকিরা পলাতক। এদের মধ্যে সরকারের এক মন্ত্রির ভাতিজা আর এদের ছাত্রসংগঠনের বড় নেতার চ্যালাচামুন্ডা কয়েকজন। ফলে প্রতিবাদ আরো বেশি, একই সাথে মামলা মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনাও ততই প্রকট। বিচার টিচার হবে, এমন আশা করা আমিও ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমার প্রেমিকা মায়াবতী, তাকে আমি কতকাল মনে রাখবো এই মুহূর্তে আমি তা জানি না, কিন্তু বুকের ভিতরে দলা পাকানো এক অসম্ভব বোধ আমাকে ক্রমাগত আরো কুণ্ঠিত আর অথর্ব করে রাখলো। সেই বোধের উৎস কোথায় আমি জানি। কিন্তু আমি সেটা নিয়ে নিজের সাথেও বোঝাপড়ায় যেতে পারিনা।

মাস তিনেক পরে চারুকলা ঠিক করলো মায়াবতীর স্মরণে একটা আর্ট এক্সিবিশন হবে। একজন তরুণ শিক্ষক আমাকে ডেকে কিছু দায়িত্ব দিলেন। এর মধ্যে মায়াবতীর বাসায় গিয়ে বাবা মা’র অনুমতি নিয়ে ওর নিজের আঁকা কিছু ছবি নিয়ে আসতে হবে, এক্সিবিশনের জন্য।
আজ যাই কাল যাই করে করে সময় পার করলাম। শেষে বাধ্য হয়ে এক্সিবিশনের চারদিন আগে একটা রিকশা নিয়ে রওনা হলাম মায়াবতীদের বাড়ির উদ্দেশে। দীর্ঘদিন পর সেই পাড়ায় ঢুকে এক তীব্র অস্থিরতা টের পেলাম নিজের ভিতরে। রিকশায় বসেই তাকালাম সেই মাঠের পাশের নিচু পাঁচিলটার দিকে। ফাঁকা। কেউ নাই। আগে জমজমাট থাকতো। ছেলেগুলো পা ঝুলিয়ে বসে থাকতো দিনরাত আর সকলকে পরখ করে করে দেখতো। এখন কেউ নাই। একটা ঘেয়ো কুকুর পাঁচিলের গা ঘেষে শুয়ে আছে। মাঠে কয়েকটা বাচ্চা ব্যাট বল নিয়ে খেলছে। এসব দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পলেস্তারা ওঠা সবুজ গ্রিলওয়ালা একতলা বাড়িটার দরজায়।

বহুদিন পর আমাকে পেয়ে নিশ্চুপ নির্বাক বাড়িটার ততোধিক নির্বাক লোকগুলো আমার সামনে পাথরের মূর্তির মত বসে রইলো বহুক্ষণ। টুকটুক করে কথা বলে চললাম আমি একাই। জানলাম, এখনো হুমকি ধামকি চলছেই। মামলা উঠিয়ে নেবার, পাড়া ছেড়ে চলে যাবার আদেশও আছে। এইসব কথা হয়। দু’পক্ষই গোপনে শ্বাস ফেলি। কথা আর কিছু আগায় না। একসময় আমি এক্সিবিশনের কথাটা জানালাম। শুনে মায়াবতীর মা নীরবে উঠে পা বাড়ালেন বা দিকের কোনার ঘরটার দিকে। আমিও উঠলাম, পায়ে পায়ে এগোলাম ঘরের দিকে। বুকের ভিতরে অচিন কোন পাখি স্তব্ধ বসে থাকে যদি, তবেই কি এমন ঝিম ঝরা বিষাদে পেয়ে বসে মানুষকে হঠাৎ?আমি জানিনা।
একটা ছোট্ট ঘর। সবুজ গ্রিলের জানালার কাঠের পাল্লা। ঐপাশে একটা পেয়ারা গাছ। ঢাকা শহরে এরকম জায়গা এখনো আছে অল্পস্বল্প। মায়াবতী তেমনি এক আধা মফস্বল আধা রাজধানীর মেয়ে। ছবি আঁকা মেয়ে। একটা সুতি শাড়িতে, ঘন কাজলে, লাল টিপের মেয়ে। আমার প্রেমিকা।
ঘরটা অগোছালো না। আবার গোছানোও বলা চলে না একে। মায়াবতী এলোমেলোই ছিল। ব্যাগের মধ্যে হাজারো জিনিস নিয়ে ঘুরতো, কখনো নিজের প্রয়োজনের জিনিসখানা একবারে খুঁজে পেত না। এই নিয়ে কিছু বললে হাসতো শুধু। ঘরটা সেই মায়াবতী ধরনেই। আলনায় কয়েকটা শাড়ি, বহুবার এগুলো পরতে দেখেছি ওকে। একপাশে চুড়ির আলনা, আয়না- তাতে কয়েক রঙের টিপ, বিছানার পাশে অজস্র বই। বাঁ দিকের কর্নারে ইজেল, টেবিলে রং তুলি চারকোল তেল ব্রাশ এন্টিকাটার। কোনের দেয়ালে দশ বারোটা ছবি রাখা। ইজেলে আটকানো একটা, অসমাপ্ত মনে হয়। মা বললেন, মরার রাতেও এটাতে রং ছুঁইয়েছে। বেছে বেছে সাতটা ছবি নিয়ে নিই। অসমাপ্তটাসহ। ট্যাক্সি ডাকি। ছবিগুলো গুছিয়ে তুলে নিজেও উঠে পড়ি। হাত নেড়ে বিদায় জানাই বারান্দায় নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে। ট্যাক্সিতে রেডিও চলছে। কখনও গান, কখনও সংক্ষিপ্ত সংবাদ। আমি রাস্তায় চলতে থাকা মানুষ দেখি।

পুনশ্চ
একটা খা খা মাঠের পাশে এবড়ো খেবড়ো পথ, না রাজধানীর, না শহরতলীর। পথের পাশে নিচু পাঁচিলে বসে আছে ছয় সাতটা দাঁড়কাক। কুকুরটাও আছে। অদূরে রিকশায় ফিরে যাচ্ছে কেউ। এদিকে ফেরানো মুখ রিকশা আরোহীর, অবাক হয়ে সে দেখছে মেয়েকে। দাঁড়িয়ে আছে মেয়ে নগ্ন, আকাশে ছড়ানো দুই হাত, কপালে লাল টিপ, চুল উড়ছে হাওয়ায়। একটা পা নাচের ভঙ্গিতে তুলে আছে মাটির একটু উপরে। আর কী অসম্ভব এক আনন্দের হাসি চোখে মুখে। আকাশে মেঘ আছে, গুমোট আলোর রঙ পুরো ক্যানভাসে। এক্সিবিশনের বিশাল হলরুমে মায়াবতীর অসমাপ্ত ছবিখানার সামনে দাঁড়িয়ে আমি, মায়াবতীর প্রেমিক, নিজেকে খুঁজি- কখনো চলন্ত রিকশায় আরোহীর মুখে, কখনো দাঁড়কাকে, কখনো ঘেয়ো কুকুরের অলস চাউনিতে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রশিদা আফরোজ — সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৬ @ ১:৫৫ অপরাহ্ন

      একটানে পড়ে গেলাম। সাবলীল ঝরঝরে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মামুন — december ৬, ২০১৬ @ ৮:২০ অপরাহ্ন

      চমৎকার। ঝরঝরে লেখা। শেষ লাইনটা মারাত্মক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com