সেলিমের জন্য

ফরহাদ মজহার | ১৯ জানুয়ারি ২০০৮ ২:৪১ অপরাহ্ন

আমি যাদের সঙ্গে ষাট ও সত্তর দশকে বড় হয়েছি, এক ঘরে থেকেছি, গাদাগাদি করে এক ঘরে তিনচারজন ঘুমিয়েছি, তারাশংকরের রাইকমল পড়ে জগৎময় শ্রীমতি রাধিকাকে দর্শন করে বেড়িয়েছি তাদের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সেলিম আল দীন। আজ বুঝতে পারি ঘনিষ্ঠ হবার বিস্তর
sad-2000.jpg………
২০০০ সালে জনৈক ছাত্রের তোলা সেলিম আল দীনের ছবি, মাহবুব মোর্শেদের সৌজন্যে পাওয়া
………
কারণের মধ্যে একটা কারণ ছিল সেলিম নোয়াখালির আর আমিও নোয়াখাইল্যা। না, নোয়াখাইল্যা বলে ওর সঙ্গে আমার উঠতি যৌবনের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছিল বলা যাবে না। কিন্তু সংবাদ হিশাবে সকলকে বলে রাখা ভাল—আমি ও সেলিম আল দীন আমাদের মাতৃভাষা বলতে নোয়াখাইল্যা ভাষা বুঝতাম—ঘরে আম্মার সঙ্গে যে-ভাষায় দৈনন্দিন কথা বলি সেই কথাশৈলীর বাকমাধুর্য, ধ্বনি ও কলিজার ভেতর থেকে পদ প্রকরণ তৈরির কারখানার আওয়াজ রহস্যজনক ব্যাপার-স্যাপার হয়েই আমাদের তাড়া করত। সোজা কথা, প্রমিত ভাষা বলে কোনো স্থির ও খাপ খাপ ভাষা আছে সেটা আমরা মানতাম না। কসম খোদার। সব ভাষাই ভাষা, যদি যুৎ মতো কওন যায়—এটা আমাদের চেয়ে খিস্তিখেউড়ে পারঙ্গম আর কোন্ শালা জানত? যদিও নিষ্ঠুর এই প্রমিত সমাজের সাংস্কৃতিক অত্যাচার ও নিপীড়নে আমাদের ভাষাচর্চা প্রকাশ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবং আমরা ভদ্রভাবে প্রমিত ভাষায় নির্ভুল ব্যাকরণে কাব্যগুণ সম্পন্ন বাক্য উচ্চারণ করতে শিখেছি আমাদের দুষমণদের চেয়েও ভালভাবে। এই কিছুদিন আগেও সেলিমের সঙ্গে যখন দেখা তখন পুরানা খিস্তিগুলো দুই জনেই আবার খানিক চর্চা করে নিয়েছি। জীবন দারুণ জিনিস।

সেলিম এতো তাড়াতাড়ি মরবার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল বোঝার উপায় ছিল না। সাইমন জাকারিয়া আমাকে জানাল আপনি চলে আসুন—ল্যাব এইডে আছে সেলিম। এটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। আমি সাইমনকে বললাম, সাইমন, নাকে টিউব দেওয়া লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা সেলিমকে দেখলে সাইকলজিকালি আমি ভয়াবহ ভাবে এফেক্টড হবো। সাত আট দিন আর কিছুই করতে পারব না। আপনি কি চান আমিও গিয়ে ল্যাব এইডে সেলিমের পাশে শুয়ে পড়ি? সাইমন বলল, আপনার দেখার দরকার নাই, কিন্তু এখানে ঘুরে যান। আপনি যদি না আসেন তাহলে আরো অসুস্থ হয়ে যাবেন।

মৃত্যুর প্রতি ওর নিজের দারুণ আকর্ষণ ছিল। যৌবনে মৃত্যুর স্বাদ নেবার তীব্র তাগিদে প্রায়-অনড় আত্মহননের সিদ্ধান্ত থেকে তাকে নিবৃত্ত করবার ক্ষেত্রে আমাকে যে কী বেগ পেতে হয়েছিল সেটা একমাত্র আমিই জানি। ওর অনুপস্থিতিতে এই কেচ্ছা আমার আর কখনোই বলা হবে না। বলার আর দরকারও নাই। ইদানীং নিজেই বলত, ‘আমি তো যাইতে ছিলাম, ওস্তাদ ঠ্যাকাইয়া দিল…।’

এবার পারলাম না। ফলে ল্যাব এইডে গেলাম। তাকে যারা ভালবাসে তাদের ভিড়ের মধ্যে দেখলাম শিমূল ইউসুফ কাগজে নাম লিখে লিখে টাকা তুলছে। ওকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হবে। ভাল যে সেলিমকে দেখতে দেওয়া হচ্ছে না। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু আমি ভিড় দেখতে থাকলাম। অসুখ ও মৃত্যু মানুষের জীবন সম্পর্কে অকথা কুকথা বলে বেড়াচ্ছে। চতুর্দিকে কানাকানি। কিছুই বোঝার উপায় নাই, ঠোঁট নড়া ছাড়া। কিম্বা যে-আওয়াজ শুনছি সেইসব জীবন ও মৃত্যু বিষয়ক তত্ত্বকথা হয়ে যাবার কারণে ব্যাখ্যা না করলে তাদের আর বোঝার উপায় থাকছে না। মনে মনে ভাবলাম একটা কবিতা লিখব। শিরোনাম হবে, ‘ল্যাব এইডে সেলিম আল দীন’। রাস্তায় নেমে এসে মনে হোল, এই ধরনের কোনো কবিতা লেখা যাবে না। কারণ ঢাকা শহরকে আমার আমার এখন নাকে টিউব লাগানো অক্সিজেন দেওয়া লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা মনে হতে পারে, কিন্তু সেটা সাময়িক। আমি তো আসলে সেলিমকে দেখি নি। ডাক্তার কাউকেই ভিড়তে দিচ্ছে না। আমি শুধু ল্যাব এইড দেখলাম। ফলে কবিতাটা সেলিমের ওপর না হয়ে ল্যাব এইডের ওপর হবে। এডভারটাইজমেন্ট হয়ে যাবে।

সেলিম কবি হতে চেয়েছিল। নাটকও যে আসলে কবিতা এই সত্য তাকে বোঝাতে, যদ্দূর মনে পড়ে আমাকে বেগ পেতে হয়েছিল। বোঝাবার একটা বিশেষ দায় ছিল আমার। ষাট দশকে আগামি দিনের যে সব নায়কেরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সামনের সারিতে আসবার পাঁয়তারা করছিল তাদের দুর্দান্ত শ্লোগান ছিল: “প্রথম বিপ্লবের খুন বেরুবে ভাষা থেকে।” এই শ্লোগান এখন অসামান্যই মনে হয়। বিদ্যমান চিহ্নব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া, ওলোট পালট লণ্ডভণ্ড করে দেওয়া, চিহ্নে চিহ্নে একটা খুনোখুনি ঘটিয়ে দেবার যে তীব্র নান্দনিক তাগিদ আমরা বোধ করেছিলাম তার চরিত্র ছিল আগাগোড়াই রাজনৈতিক। তখন নতুন জনগোষ্ঠি হিশাবে বাংলাদেশের আবির্ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই শ্লোগানের সহজ সরল মানে হচ্ছে যতক্ষণ ভাষা বা বিদ্যমান চিহ্নব্যবস্থায় ভাঙন না ঘটানো যাচ্ছে, একটি জনগোষ্ঠির বৈপ্লবিক রূপান্তর অসম্ভব। সেই রূপান্তর শুধু আর্থ-সামাজিক নয়—রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সর্বোপরি ভাবুকতার। এই শ্লোগান মনে রেখে সেলিমসহ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিন আমরা শরিফ মিয়ার কেন্টিনে আট আনার বিরিয়ানি খেতে খেতে বিচার করেছি ছাপাখানা থেকে ‘কবিতা’ নামে যা মুদ্রিত হয়ে বার হয় তাকে কবিতা গণ্য করতে হবে এমন কোনো কথা নাই। কবিতা ও গদ্যে যেমন ফারাক নাই, কবিতা ও নাটকের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নাই। বাংলাদেশের কবিতা থেকে কীভাবে কাব্যচর্চার নতুন মাধ্যম হিশাবে নাটক স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করল সেই ইতিহাস জানলে সত্তর দশকে বাংলাদেশের নাটকে আসলে কী ঘটেছে তার তাৎপর্য বোঝা যাবে। এই দিকটা ধরতে না পারলে সেলিম আল দীনের নাটকের তাৎপর্য বোঝা দুঃসাধ্যই হবে বলে আমার ধারণা। চিহ্নব্যবস্থা হিশাবে মৌখিক বা মুদ্রিত ভাষার সঙ্গে মঞ্চের ভাষার পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মঞ্চ নিজেই নিজের গুণে ভাষাচিহ্ন। সেই ভাষা দিয়ে কাব্য রচনা সম্ভব—এই কাজটি শুরু করবার পেছনে যে ঐতিহাসিক মুহূর্ত রয়েছে, সেলিম আল দীন সেই মুহূর্তের সন্তান। শুধু তার নাটক দিয়ে তাকে চেনা যাবে না যদি সেই মুহূর্তের বিচার আমরা না করি।

কবিতা যখন নাটকে রূপ নেয় এবং ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবার দুঃসাহস দেখায় তখন মঞ্চপরিকল্পনা বা আঙ্গিকের দিক থেকে কোথায় কীভাবে তাকে ভাঙতে হয় তার পরীক্ষানিরীক্ষা হিশাবে একটি নাটক লেখার কুকর্মে আমি নিজের অজান্তেই জড়িত হয়ে পড়ি। সেলিমসহ বন্ধুবান্ধবদের উৎসাহে। প্রজাপতির লীলালাস্য আমাদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। মুজিব বিন হক, এখন ন্যুইঅর্কে, নাটকটি মঞ্চস্থ করে এবং সেলিমসহ আমার বন্ধুবান্ধব প্রায় সকলেই বিপুল উৎসাহে সেই নাটকে জড়িত হয়ে যায়। বাংলাদেশের আগামি দিনের রাজনীতি কী হতে যাচ্ছে বা কী হবে একদিকে তারই আগাম বয়ান ছিল এই নাটক—অন্যদিকে নাট্যকলা নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার পথ দেখাবার জন্য বিদ্যমান কায়কারবার ভাঙচুর করে বেরিয়ে আসার তাগিদ শুরু হয় তখন থেকেই। সেলিম তখনও নাটক লেখা শুরু করে নি। আমার ঘনিষ্ঠ কবি বন্ধুদের কেউই তখন নাটক লিখবার সাহস জোগাড় করতে পারে নি। সেলিমের কবিতা লিখবার ঘোর তখনও কাটে নি। কিন্তু ইতোমধ্যে কয়েকটি দুর্দান্ত ছোটগল্প লিখে ফেলেছিল সে। অথচ গদ্যে তার আকর্ষণ স্থায়ী হয় নি। হঠাৎ নাটক সেলিম আল দীন, সাযযাদ কাদির, শাহনূর খান ও আরো অনেককে রাহুর মতো গ্রাস করতে শুরু করে। নাটক নিয়ে কবিদের মধ্যে হই চই পড়ে যায়।

আমি যখন আশির শুরুতে ঢাকায় দীর্ঘদিন পরবাস থেকে প্রত্যাবর্তন করি, সেলিম আল দীন ততোদিনে বড় নাট্যকার। আমি মনোযোগ দিয়ে ওর নাটক দেখি। নাসির উদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনায় নাটকগুলো খুব সাড়া ফেলে। সেই সময় সেলিমের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে একটা ভুল মন্তব্য করে বিপদে পড়ে যাই। আমি একদিন সেলিমকে বলি, ‘ওস্তাদ যা দেখতাছি তা তো বাচ্চুর জিনিস, বাচ্চুর কাজ—আপনার কাজ কই?” বলাবাহুল্য, যদি আজ আমি সেলিম সম্পর্কে বলতে গিয়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফের অসাধারণ নাট্যপ্রতিভার কথা একই নিঃশ্বাসে না বলি, সেলিম যতোই রাগ করুক, নিজের বিচারবুদ্ধির কাছে আমি অপরাধী হয়ে থাকব। এই দুইজন তো অবশ্যই—একই সঙ্গে আজ আমাকে ঢাকা থিয়েটারের প্রতিটি নাট্যকর্মীর কথাও বলতে হবে। কারণ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও ঢাকা থিয়েটার ছাড়া নাট্যকার ‘সেলিম আল দীন’কে আলাদা ভাববার কোনো দরকার নাই। সমবায়িক বা সামষ্টিক শিল্পচর্চা কখনই একজন ব্যক্তির ওপর দাঁড়ায় না। এটা সকলের জিনিস, সকলের ফসল। তার মানে এই নয় যে সেলিমের কিম্বা নাসির উদ্দীন ইউসুফের নিজস্বতাকে আলাদা করে বিচার আমরা করব না। নিশ্চয়ই করব। তখন কিছু কিছু নাটক অন্য নাটকগুলো থেকে আলাদা হয়ে যায়। যেমন চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি। সেলিমের লেখা আমার সবচেয়ে প্রিয় নাটক। এখানে সেলিমকে আলাদা ভাবে পাই। আমার বড়ো সাধ একদিন আমি বাংলা ধ্বনাত্মক শব্দ ও তার নাট্য সম্ভাবনা বিচার করতে গিয়ে এই নাটকটি নিয়ে কিছু কথা বলার অবসর পাব। এইসব জায়গাগুলোতে নজর দিলে বোঝা যায় নিজের নাটক সম্পর্কে সেলিমের তত্ত্বগত ধারণা আমাদের বিপদেই ফেলে দেয়। যে সব তত্ত্ব সেলিম বলত বা লিখত, আমি কখনোই সেইসব সিরিয়াসলি গ্রহণ করি নি। এতে তার রাগও ছিল আমার ওপর। আমার ভয় ওর নাট্যতত্ত্ব ওর নাটকের আসল দিকগুলোকে নজরের বাইরে নিয়ে যায়, আড়াল করে ফেলে। এতে ওর প্রতিভার মৌলিক দিকগুলো ধরিয়ে দেওয়ার কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে তার বন্ধুদের খামাখা বহু বাড়তি পরিশ্রম করতে হতে পারে। ঠিক তেমনি সেলিমের নাটক বা ঢাকা থিয়েটারের কাজ নিয়ে অন্যদের মতামতও। যেমন, প্রাচ্য নিয়ে কথাবার্তা বা আদিখ্যেতা আমার চোখে পড়েছে। প্রাচ্য নাটকের কথা বলছি না। ‌পাশ্চাত্যের বিপরীতে প্রাচ্য নিয়ে গৌরব করার কথা বলছি। অথচ সেলিমের নাটক বা ঢাকা থিয়েটারের প্রয়াস আগাগোড়াই আধুনিক পাশ্চাত্য নাটক মঞ্চস্থ করার অধিক কিছু নয়, অধিক কিছু ভাবার কোনোই কারণ নাই। এতে দোষের কিছুই নাই। মঞ্চের বাইরে যাবার তুমুল সাধ, ইচ্ছা ও সংকল্প থাকা সত্ত্বেও দুই একটি ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে ঢাকার নাট্যান্দোলন মঞ্চ থেকে কখনোই রাজপথে নামে নি। বরং মঞ্চ থেকে লাফিয়ে ঢুকে পড়েছে টেলিভিশন বা মিডিয়ার জগতে। ‘গ্রাম থিয়েটার’ গ্রামীণ হওয়ার অসীম সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঢাকা থিয়েটার গ্রাম থিয়েটারে রূপান্তরিত হয় নি। নাসির উদ্দীন বাচ্চুর অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তি সত্ত্বেও। ‘প্রাচ্যবাদী’ হওয়ার মধ্যে বিশেষ গৌরব অন্বেষণের চেষ্টা খামাখা। ওর মধ্য দিয়ে ভারতীয় নাট্য ইতিহাসের উচ্চবর্ণ ও অভিজাত নাট্যধারাকেই পাশ্চাত্যের বিপরীতে ‘প্রাচ্য’ নাম দিয়ে গৌরবান্বিত করবার চেষ্টা থাকে। ঢাকা থিয়েটারের জন্য এটা প্রশংসাতিলক নয়, সীমাবদ্ধতাই বরং। সাম্রাজ্যবাদের চরিত্রলক্ষণ অনুযায়ী ‘প্রাচ্য’ কিম্বা লোকায়ত নাটক বা থিয়েটার সেখানে একান্তই ‘কাঁচামাল’ জোগান দিয়েছে কেবল। অর্থাৎ বাংলাদেশের লোকায়ত প্রকরণ, আঙ্গিক কিম্বা অনেকে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা একান্তই নাটকের ‘কাঁচামাল’ ছাড়া আর কিছু হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা সেই তর্ক খোলা মনে আমাদের করতে হবে। ঢাকা থিয়েটার বাংলাদেশের নাটকে
praccho11.jpg…….
প্রাচ্য নাটকের একটি দৃশ্য
…….
যে বিশাল অবদান রেখেছে তাতে তার কিছুই ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। সেলিম, ইউসুফ ও ঢাকা থিয়েটারের বিচার করেই আগামি দিনের বাংলাদেশের নাটককে পথ সন্ধান করতে হবে—এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ঢাকা থিয়েটার প্রাচ্য-টাচ্য কিছু নয়, নিজ গুণেই ঢাকা থিয়েটার। একমাত্র ঢাকা শহরেই সেলিম ইউসুফ ও নাট্যকর্মীদের আন্দোলনে তার ঐতিহাসিক আবির্ভাব সম্পন্ন করতে পেরেছে।—অন্যত্র কোথাও তা হতে পারত না। এবং, সেলিম আল দীন—শুধুই সেলিম আল দীন। তাকে তার মৌলিক অবদানের জায়গা থেকেই—আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির শ্রেণীগত ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বিচার করতে হবে।

কিন্তু আজ, বলাবাহুল্য নাট্যবিচার করতে বসি নি। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর— বিশেষত শহরের শিল্পচর্চার জগতে সেলিম আল দীন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রতিভাবান নাট্যকার। সেখানে সেলিম কোথায় বা কয় নম্বরে তার বিচার নাট্যামোদীরা করবেন। সাধারণ ভাবে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা শ্রেণীগত পরিমণ্ডলের বাইরে কদম ফেলতে পেরেছে কিনা সেই তর্ক আমাদের করতে হবে, কিন্তু সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও ঢাকা থিয়েটারকে তাদের যথাযথ স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিয়ে। এতোটুকুই আজ আমার কথা।

আমার বন্ধু সেলিম আল দীন ছিলেন কবি। তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন, নাটক যে কাব্য এটা তিনি নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে কাজ করে দেখিয়ে দিতে পেরেছেন, এতে আমি গর্বিত। আমি যখন শহীদ মিনারে ওকে শেষবার বিদায় জানাতে যাই তখন আমার মধ্যে মিশ্র অনুভূতি হয়েছিল। কতো মানুষ আজ এসেছে এখানে, তাকে শ্রদ্ধা জানাবার ভালবাসার মানুষের অভাব তো দেখলাম না। ভারি সুন্দর এই প্রস্থান বা ওর ভাষায় ‘শূন্য হয়ে যাওয়া’। কিন্তু ফিরে আসার জন্য।

কেমন হবে সেই প্রত্যাবর্তনের রূপ? বাংলা নাটকে? বাংলা কাব্যে?

৫ মাঘ ১৪১৪। ১৮ জানুয়ারি ২০০৮। শ্যামলী।

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (21) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুলিফকার — জানুয়ারি ২১, ২০০৮ @ ৬:০৮ অপরাহ্ন

      এক বসায় পড়ে ফেললাম সদ্যপ্রয়াত সেলিম আল দীনকে নিয়ে ফরহাদ মজহারের লেখাটি। এরকম আরো যারা সেলিম আল দীনকে কাছ থেকে দেখেছেন পযবেক্ষণ করেছেন তাদের কাছে অনুরোধ রইলো সেলিম আল দীনকে নিয়ে লিখতে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — জানুয়ারি ২১, ২০০৮ @ ১১:২৩ অপরাহ্ন

      “সব ভাষাই ভাষা, যদি যুৎ মতো কওন যায়—এটা আমাদের চেয়ে খিস্তিখেউড়ে পারঙ্গম আর কোন্ শালা জানত? যদিও নিষ্ঠুর এই প্রমিত সমাজের সাংস্কৃতিক অত্যাচার ও নিপীড়নে আমাদের ভাষাচর্চা প্রকাশ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবং আমরা ভদ্রভাবে প্রমিত ভাষায় নির্ভুল ব্যাকরণে কাব্যগুণ সম্পন্ন বাক্য উচ্চারণ করতে শিখেছি আমাদের দুষমণদের চেয়েও ভালভাবে। এই কিছুদিন আগেও সেলিমের সঙ্গে যখন দেখা তখন পুরানা খিস্তিগুলো দুই জনেই আবার খানিক চর্চা করে নিয়েছি। জীবন দারুণ জিনিস।”
      …..

      “প্রমিত” দুষমণদের সাথে লড়াই করার যে ধরন রপ্ত করেছিলেন ফরহাদ মজহার এবং সেলিম আল দীন (অর্থাৎ “ওদের” চেয়েও ভালভাবে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করতে পারা), সেটি শেষমেশ তাঁদের “নিজস্ব” ভাষাচর্চার কী উপকারে এল জানতে কৌতূহল হয়। প্রমিত বাংলার ধ্বজাধারীদের প্রমিত বাংলা দিয়েই মোকাবিলা করতে গিয়ে নিজেরাই কি তাঁরা প্রমিত বাংলার বড় প্রবক্তা হয়ে যান নি? নির্ভুল ব্যাকরণে প্রমিত বাংলায় কাব্যগুণমণ্ডিত বাক্যরচনার যে পাঠ তাঁরা নিয়েছিলেন, তার মোহমায়া ছেড়ে আর বেরিয়ে আসলেন কই? শেষমেশ, দরজা বন্ধ করে দুই বন্ধুতে খিস্তিখেউরের চর্চা করেই নিজ ভাষাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে? কাগজে আসবে না ওরা?

      ফরহাদ মজহারকে অনেক ধন্যবাদ, এরকম শোকের দিনেও তিনি তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে অবিচল থেকেছেন বলে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শেখ নাসির উদ্দিন — জানুয়ারি ২২, ২০০৮ @ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন

      ভাল লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিধান রিবেরু — জানুয়ারি ২২, ২০০৮ @ ১২:৪৮ অপরাহ্ন

      প্রমিত বাংলা মানে তো এমন একটি বাংলা যা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি সাধারণ বাংলা। চাটগাঁর মানুষ যখন সিলেটি মানুষের ভাষা বুঝবে না তখন ব্যবহৃত হবে এই প্রমিত বাংলা। কিন্তু এই প্রমিত বাংলাকে শত্রু ভেবে এর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষলা করার কিছু নেই বলেই আমার মনে হয়। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হবে–অবশ্যই প্রয়োজনের খাতিরে–জোর করে নয়।

      বিধান রিবেরু

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন masud karim — জানুয়ারি ২২, ২০০৮ @ ১১:১২ অপরাহ্ন

      শুনতে পাই হাতহদাই-এর কথা, এও শুনতে পাই–সে নাটকে নোয়াখাইল্যা ভাষার নির্যাস অনেক নোয়াখাইল্যাই পাননি। আপনারা মুখে মাতৃভাষার কথা যত বলেন তত মাতৃভাষায় কাজ করেন না। প্রমিত-আঞ্চলিকের বিতর্ক তুলে এক ধরনের মিশ্র ভাষাই সৃষ্টি করেন, যা টিভি নাটক ও মঞ্চ নাটক ছাড়া আর কোথাও শোনা যায় না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এম. দুলাল — জানুয়ারি ২৩, ২০০৮ @ ৫:০৬ অপরাহ্ন

      অতুলনীয়। হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিপ্লব রহমান — জানুয়ারি ২৩, ২০০৮ @ ৮:৩৪ অপরাহ্ন

      অসাধারণ! সেলিম আল দীনকে নিয়ে লেখা এইটিই বোধহয় এ পযর্ন্ত পড়া সবচেয়ে অসামান্য লেখা। ফ.ম. কে আন্তরিক ধন্যবাদ।।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রম্য রহিম — জানুয়ারি ২৫, ২০০৮ @ ১০:০৭ অপরাহ্ন

      ফরহাদ মজহার,ধন্যবাদ অণুপ্রাণিত করবার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সামিন মোহাম্মাদ — জানুয়ারি ২৬, ২০০৮ @ ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ…।
      অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুলতানা শিরীন সাজি — জানুয়ারি ২৮, ২০০৮ @ ১১:০১ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ। একটানা পড়লাম। আরো অনেক জানার ইচ্ছে থাকলো। এমন একজন মানুষকে যারা কাছের থেকে দেখেছেন তাদের শূন্যতা ভাবলে সত্যি মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এইসব চলে যাওয়া দাগ রেখে যায়…। এত গভীর তা, দিনে দিনে বাড়ে শুধু।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাকির হোসেন — জানুয়ারি ২৯, ২০০৮ @ ৯:৪০ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহমুদ হাসান কায়েশ — ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০০৮ @ ৭:১০ অপরাহ্ন

      মানুষটার সাথে কখনো কথা হয়নি কিন্তু তার লেখা আমার কাছে অসম্ভব ভালো লাগতো বিশেষ করে তার চাকা, অসাধারণ বর্ণনা। তার নাটকগুলো ছিলো খুবই চমৎকার । যা আমাদের পুরো নাট্যভাণ্ডার পরিপূর্ণ করেছে। তার লেখাগুলো পড়লে তাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nur Siddiqui — জানুয়ারি ১৫, ২০০৯ @ ৩:১১ অপরাহ্ন

      লেখাটি ভাল লাগল।

      আমার প্রিয় শিক্ষক সেলিম আল দীনকে নতুন করে চিনবার সুযোগ করে দেবার জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার জীবনের অপার বিস্ময়-সেলিম আল দীন। একজন মানুষ পাগলের মতো লিখতে পারেন, ভালবাসতে পারেন, আদর করতে পারেন, বন্ধুত্ব করতে পারেন, অভিমান করতে পারেন — সেলিম আল দীনকে না চিনলে জানা হতো না।

      – Nur Siddiqui

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শোভন — জানুয়ারি ১৭, ২০০৯ @ ৬:৫৩ অপরাহ্ন

      হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আপনি লেখার শেষ লাইনে লেখলেন “কেমন হবে সেই প্রত্যাবর্তনের রূপ? বাংলা নাটকে? বাংলা কাব্যে?”

      – শোভন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমিনুল বারী শুভ্র — জানুয়ারি ১৮, ২০০৯ @ ১২:১১ অপরাহ্ন

      অসাধারণ। লেখাটি আগেই পড়া ছিল, সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পরপর । আবার পড়ার লোভ সামলানো গেল না । বন্ধুত্বের ভেতর এবং বাইরে সমান ক্রিটিক্যাল থেকে সেলিম আল দীন ও আমাদের নাটকের অতুলনীয় একটি পর্যবেক্ষণ এ লেখাটি।

      ফরহাদ মজহারের জন্য শুভকামনা।

      – আমিনুল বারী শুভ্র

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আমিনুল — এপ্রিল ৯, ২০০৯ @ ২:০৬ পূর্বাহ্ন

      আমরা কেমন জানি, সব কিছু ভুলে যাই অতি সহজে…।

      – আমিনুল

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হারূন রশীদ — সেপ্টেম্বর ২৭, ২০০৯ @ ১০:১২ অপরাহ্ন

      ভুলতে ভুলতেই যা টিকে থাকবে সেটাই আসল।

      -হারূন রশীদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইম বিন মুজিব — জুলাই ২৪, ২০১১ @ ১২:০৭ অপরাহ্ন

      লেখককে ধন্যবাদ, লেখাটি ভাল লাগলো।

      আধ্যাপক সেলিম আল দীনের প্রতি আমার সবসময়ের মত আগাধ শ্রদ্ধা আর ভালবাসা রইলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shoumyo Dasgupta — আগস্ট ১০, ২০১২ @ ৮:০৭ অপরাহ্ন

      Oshamanyo lekha. Ayto moromi ar aykishonge muhurter jonyeo Farhad Mazhar tnaar shuteekhno medha ke abege bheshe jete dyan ni, hridou to medhar opoorbo balance niye alochona korechhen. Protita line theke shikhlam.

      Amader jader Bangladesher aborter baire theke Selim Al Din er natok porar shoubhagyo hoyechhe tara tnaake ekta classic natok-kar hishebe jaantam. Ajke tanr manobik dik ta dekhte pelam ei lekhar madhyome. Er poreo je analysis theke jaay shekhane Farhad Mazhar ki obyortho ebong Bangladesher shangskritik shotyoke ki gobheer bhabe tule dhorechhen ei lekhay.

      Anek dhonyobad ei gurutwopurno godyotir jonyo.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com