রবার্ট ব্রাউনিং সম্পর্কে হোর্হে লুইস বোর্হেসের বক্তৃতা

আবদুস সেলিম | ২৫ আগস্ট ২০১৬ ৩:৪৯ অপরাহ্ন

Jorge Luis Borgesহোর্হে লুইস বোর্হেস ১৯৬৬ সালে বুয়েনোস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের উপর পঁচিশটি বক্তৃতা দেন। এগুলো বহু বছর পর স্প্যানিশে মার্তিন আরিয়াস এবং মার্তিন হাদিস-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। আর ২০১৩ সালে এই বক্তৃতাগুলো ক্যাথেরিন সিলভার অনুবাদে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় প্রফেসর বোর্হেস নামক গ্রন্থে। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত উনিশ নাম্বার বক্তৃতাটির বাংলায় তর্জমা করা হলো। তর্জমা করেছেন অধ্যাপক ও অনুবাদক আবদুস সেলিম।

ক্লাশ ১৯
রবার্ট ব্রাউনিং-এর কবিতা।
আলফন্সো রেইয়েস-এর সাথে আড্ডা।
দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক।
বুধবার, নভেম্বর ৩০, ১৯৬৬

রবার্ট ব্রাউনিং-এর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমরা আজ আলোচনা করবো। মনে পড়ে একবার ব্রাউনিংকে তাঁর একটি কবিতার ব্যাখ্যা দেবার অনুরোধ করা হয়েছিলো। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, কবিতাটা আমি অনেক আগে লিখেছি। যখন লিখেছিলাম তখন আমি এবং আমার ঈশ্বর জানতেন এর সঠিক ব্যাখ্যা। বর্তমানে শুধুমাত্র ঈশ্বরই জানেন এর মূল অর্থ। স্পষ্টতই তিনি প্রশ্নটির উত্তর এড়িয়ে গেছেন।
ব্রাউনিং এর কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু কবিতা নিয়ে আমি আলোচনা করেছি। প্রসঙ্গত একটি কবিতা আমি আপনাদের কাছে সুপারিশ করবো যদিও তার সঠিক ব্যাখ্যা আমি দিতে পারবো না, এমনকি ভাসাভাসা ব্যাখ্যা দেওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার লেখা সম্ভবত সবচাইতে বিস্ময়কর কবিতা এটি। কবিতাটির শিরোনাম ‘চাইল্ড রোলান্ড টু দ্য ডার্ক টাউয়ার কেইম’। চাইল্ড শব্দটির অর্থ সাদামাটা শিশু নয়, এ শিশু প্রাচীনকালের অভিজাত শিশু অর্থে ব্যবহৃত আর তাই এর ইংরেজি বানানটি হয়েছে Childe অর্থাৎ চাইল্ড শব্দটির সাথে একটি e জুড়ে দেওয়া আছে শিশুটিকে অভিজাত বংশীয় বোঝাবার জন্য। এই পংক্তিটি শেক্সপিয়র থেকে নেয়া (কিং লিয়র, তৃতীয় অঙ্ক, চতুর্থ দৃশ্যে গ্লসটারের জেষ্ঠ্যপুত্র এডগার-এর উক্তি: Childe Roland to the dark tower came,/ His world was still ‘Fie, foh and fum,/ I smell the blood of a British man.)। এটি মূলত একটি হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন গাথার অংশ। ব্রাউনিং-এর সবচাইতে বিস্ময়কর কবিতা বোধ করি এটিই। মহান মার্কিন কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ ‘মানিটোবা চাইল্ড রোলান্ড’ শিরোনামে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। কবিতার বিষয়বস্তু হলো: তিনি এক সময় একটি কবিতা মিনেসোটার এক খামারের একটি ছেলেকে পড়ে শুনিয়েছিলেন কিন্তু ছেলেটি এর বিষয়বস্ত কিছুই বুঝতে পারেনি– সম্ভবত যিনি কবিতাটি পড়ে শুনিয়েছিলেন তিনিও কিছু বোঝেননি– কিন্তু কবিতার অন্তর্গত অব্যাখ্যাত অস্পষ্ট রহস্যময়তা কিভাবে তাদের উভয়কেই আচ্ছন্ন করেছিলো সেটিই ছিল মূল। পুরো কাব্যশরীর আকীর্ন ছিল এক জাদুময় অনুপুঙ্খে। ঘটনাকাল মধ্যযুগ বলে প্রতীয়মান হয়। উল্লেখ্য ঐতিহাসিকভাবে মধ্যযুগ নয়। গ্রন্থে বর্ণিত মধ্যযুগীয় বিপথগামী নাইটদের গল্পগাথা মাত্র– যেমন দন কিহোতের বর্ণনায় মেলে।

Browing‘দ্য রিং অ্যাড দ্য বুক’ নিয়ে আলোচনার আগে আমি উল্লেখ করতে চাই অনেকটা এলোমেলোভাবেই, ব্রাউনিং-এর আরও একটি কবিতার কথা। এর মধ্যে একটি হলো, ‘মিস্টার স্লাজ, দ্য মীডিআম’। কবিতার মূল চরিত্র মৃত মানুষের আত্মার সাথে যোগাযোগের এক মাধ্যম রূপে চিহ্নিত যদিও সে আসলে ভন্ড মাধ্যম। এই ভন্ডামির মাধ্যমে সে এক মার্কিন কোটিপতির কাছ থেকে বেশ অর্থ হাতিয়ে নেয় স্ত্রীর মৃত্যুর কারণে তার শোকাহত মানসিক বিপর্যয়ের সুযোগে। প্রয়াত স্ত্রীর আত্মার সাথে ঐ বিপত্নীক মার্কিনীর সংযোগ স্থাপনের ভন্ড মাধ্যমের অভিনয় করতো মিস্টার স্লাজ। কিন্তু একদিন সে ধরা পড়ে যায় ঐ মার্কিনি কোটিপতির কাছে। মার্কিনি তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার হুমকি দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক এক সমঝোতায় আসে এই শর্তে যে মিষ্টার স্লাজ তার প্রতারণা জীবনের আদ্যপান্ত গল্প তাকে বর্ণনা করে শোনাবে। মিষ্টার স্লাজ বলে বিভিন্ন মানুষের কাছে মৃতের আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের গল্প শুনে তার একসময় ধারণা হয়েছে এই মাধ্যমের কথা বলে মানুষের সুযোগ নেয়ার একটা পথ উন্মুক্ত আছে, কারণ অনেক মানুষইতো আসলেই প্রতারিত হতে চায়– অর্থাৎ যারা তার দ্বারা প্রতারিত হয়েছে ঐ ক্রুদ্ধ বিপর্যস্ত মার্কিন ভদ্রলোকসহ যে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবে বলে শাসাচ্ছে–এরা সবাই যদিও তার বন্ধুপ্রতিম, কিন্তু যখন ধোয়াটে মিথ্যার সম্মুখীন হয় তখন তারা তা বিশ্বাস না করে পারে না। সে আরও বর্ণনা করে তার প্রথম প্রতারণা ছিল হোমারের হাতের লেখা দেখিয়ে মানুষের মনে বিশ্বাস সৃষ্টি করা। এই বিশ্বাস সৃষ্টি করতে সে গ্রীক অক্ষরগুলোকে বন্ধনীতে রেখে ঐ হাতের লেখাকে অকৃত্রিম রূপে চালিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং ক্রমে নিজের উপর যখন যথেষ্ট আস্থা প্রস্তুত হয়ে যায় এবং নিজেকে উন্নততর কাজে সক্ষম বলে ভাবতে থাকে তখন সবার অলক্ষ্যে পরিকল্পনা করে কিভাবে তার উপরে ঐ মার্কিনির আস্থা নতুন পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা সম্ভব। মিষ্টার স্লাজ এভাবেই মার্কিনি ভদ্রলোককে তার মৃত স্ত্রীর আত্মার সাথে কথোপকথনের ভন্ড মাধ্যম হিশেবে হাজির করে। এক ভন্ড অভিনয়ের মাধ্যমে সে নিজেই ঐ মহিলার স্বামী রূপে প্রেমের আলাপচারিতা শুরু করে যা মার্কিনি ভদ্রলোকের মোটেও পছন্দ হয় না এবং ফলে সে মিষ্টার স্লাজকে প্রহার করতেও উদ্যত হয়। মিষ্টার স্লাজ তার প্রতারণার ঘটণাগুলো এভাবেই বর্ণনা করতে থাকে এবং ক্রমে একসময় কবিতারও সমাপ্তি ঘটে। কবিতাটি দীর্ঘ কারণ ব্রাউনিং ভন্ড মাধ্যম বিষয়ে বিশদ পড়াশুনা করেছেন। কবিতার উপসংহার কিন্তু পাঠকের সম্পূর্ণ কল্পনাতীত, বিশেষ করে মিষ্টার স্লাজের মতো ভন্ড মানুষকে যারা পছন্দ করে না তাদের জন্যে। শেষাংশে দেখা যায় মিষ্টার স্লাজ, যাকে ঐ মার্কিনি ভদ্রলোক প্রহার করতে উদ্যত হয়েছিল, স্বীকার করে যে সে যে বর্ণনা তাকে দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য এবং সে এবিষয়ে কোনই প্রতারণা করেনি। সে আসলে ঐ মৃত মহিলার চিঠিগুলো তার কোটের আস্তিনের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল যেখান থেকে সে উদ্ধৃতি দিত। মিষ্টার স্লাজের বক্তব্য, “যাইহোক না কেন, আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি মৃতের আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারটিকে উড়িয়ে দেয়া যায় না, কারণ পরকাল বলে একটা কিছু আছে।” অর্থাৎ যদিও কেন্দ্রীয় চরিত্র স্বীকার করছে যে সে একজন প্রতারক কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে পরকাল বলে কিছু নেই কিংবা আত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই। এতেই বোঝা যায় ব্রাউনিং দুর্বোধ্যতা ও আত্মার অস্তিত্ব করতে পছন্দ করতেন। উদাহরণ স্বরূপ বর্তমান এই ভন্ড মিষ্টার স্লাজ, প্রতারক হয়েও ঈশ্বরে বিশ্বাসী।

লাতিন শব্দ ‘মেমরাবলিয়া’ শিরোনামে একটি ছোট কবিতা আছে যার অর্থ স্মরণীয় বিষয়াবলী। এই শিরোনামটি, আমার ধারণা আহরিত হয়েছে বিখ্যাত সুইডিয় মরমি কবি সুইডেনবুর্গ বর্ণিত কয়েকটি বিক্ষিপ্ত দৃশ্যাবলি থেকে। কবিতাটি দুই ভদ্রলোকের সংলাপভিত্তিক, তারা কথোপকথনরত অবস্থায় আবিষ্কার করে তাদের একজনের সাথে নিরিশ্বর কবি শেলীর সাক্ষাৎ হয়েছিল–সেই প্রতিভাবান কবি যার বিশাল প্রভাব পড়েছিল তরুণদের উপর। অন্য ভদ্রলোক একথা জানার পর তাকে জিজ্ঞেস করে, “তাই, আপনি শেলীর সাথে কি নিয়ে কথা বলেছিলেন? তার সাথে সত্যিই আপনার দেখা হয়েছিল? উনি আপনার সাথে কথা বলেছিলেন, আপনি ওর প্রশ্নের জবাব দিতে পেরেছিলেন?” বিষয়টা অবিশাস্য তবুও তো সত্যি। এরপর ভদ্রলোক জানালো একবার তাকে এক অনাবাদী জমি হেটে পেরুতে হয়েছিল। জায়গাটার একটা নাম সম্ভবত ছিল–এবং সন্দেহাতীতভাবে জায়গাটার কোনো হিতকর ব্যবহারও ছিল, কোনো অভীষ্ঠ উদ্দেশ্যও ছিল নিশ্চয়, এই বিশ্ব চরাচওে স্থানটির কোনো স্থিরকৃত নিয়তিও ছিল অবশ্যই। কিন্তু ভদ্রলোক সবই ভুলে গেছে। সব, সবকিছু–ঐ যে পাড়ি দেয়া দীর্ঘ দিগন্ত সবই মুছে গেছে। যেটুকু মনে আছে তা হলো ঈগল পাখির একটি পালক। পালকটি সে ঐখানে কুড়িয়ে পেয়েছিল–তুলে বুকে আটকে রেখেছিল–সেই ঈগলের পালক। বাকী সবই ভুলে গেছে সে। জীবনে তো এমনই ঘটে। সবকিছু ভুলে গেছে কিন্তু শেলীর সাথে সাক্ষাতের কথা স্মৃতিতে জ্বল-জ্বল করছে।
এ বছর আমার আলফনসো রেইয়েস-এর সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি আমার সাথে বিশিষ্ট মেক্সিকান কবি অথন্-এর বিষয়ে আলাপ করলেন, বললেন, ‘তাহলে আপনি অথনকে চেনেন?’ এরপরই দ্রুত ব্রাউনিং-এর একটি কবিতার উল্লেখ করে তার প্রথম স্তবকটি আবৃত্তি করে শোনালেন:
আহ , তুমি কি শেলীকে স্পষ্ট দেখেছিলে,
তিনি কি তোমাকে দেখে একদন্ড দাঁড়িয়েছিলেন?
তুমি কি তাঁর সাথে আবারো কথা বলেছিলে?
কি বিস্ময়কর অভিনব ঘটনা সে যে এক!
তারপর শোনালেন:
এক ঝরা পালক, এক ঈগলের পালক
তারপর বাকী সব ভুলে গেছি আমি।

আবার আর এক কবিতা যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী এক মানুষের কাছে এসে হাজির হয়ে এক প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক বলে এই বিশ্ব আসলে এক ক্রন্দন উপত্যকা মাত্র। মৃত্যুপথযাত্রী উত্তর দেয়, ‘আমার চোখে কি এই বিশ্ব ক্রন্দন উপত্যকা? না শ্রদ্ধেয় যাজক, অবশ্যই নয়।’ তারপর সেই অসুস্থ মানুষটি ধর্মযাজককে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় তার স্মৃতিতে যে বিশ্ব তার সাথে ক্রন্দন উপত্যকার বিন্দুমাত্র মিল নেই। তার স্মৃতিতে যা রয়েছে তা হলো, একটি বাড়ি, একটি গ্রামের বাড়ি যেখানে বাস করতো এক নারী, সম্ভবত কোনো পরিচারিকা যার সাথে তার ছিলো প্রণয়ের সম্পর্ক। শোবার বিছানার পাশে টেবিলে রাখা ওষুধের বোতলগুলো নিয়ে সেই অসুস্থ মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি তার বাড়িটির অবস্থান দেখিয়ে ধর্মযাজককে বললো ‘ঐ যে পর্দাগুলো সবুজ বা নীল রঙ্গের যা সুস্থ মানুষদের কাছে এখনও সুন্দর, কিন্তু ওগুলোই আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ঐ বাড়ির পর্দার কথা, কেমন ছিলো সেগুলো, বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটা সব, সব কারণ আমি ঐ পথ বেয়ে ব্যাস্তসমস্ত হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছে যেতাম এক দরোজার সামনে, আর আমার সেই প্রেমিকা দাড়িয়ে অপেক্ষা করতো আমার জন্যে। আমি জানি, বললো সে, এ সবই এসময়ে বেমানান, এসবই আশোভন, কিন্তু আমি তো এখন মৃত্যুপথযাত্রী।’ সে তারপর স্বীকার করলো সেই পরিচারিকার সাথে তার অবৈধ প্রেমের স্মৃতি এখনও প্রখরভাবে জাগরুক, তার মনে শুধু এই ঘটনাই এই মুহুর্তে তার মনে পড়ছে– এই শেষ মুহূর্তে তার জীবনের এটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি এবং স্মৃতিতর্পণে তার কোনো বিবেকদংশন নেই।
আর একটি কবিতা আছে যার কেন্দ্রচরিত্র ক্যালিবান। ব্রাউনিং শেক্সপীয়র-এর সাহিত্যকৃতির সৃজন উৎস বিষয়ে একটি বই পড়েছিলেন। সেই বই থেকে প্যান্টাগনিও দেব-দেবী বিষয়ে জানতে পারেন যেখানে এক তেবস্্ নামে এক দেবতার উল্লেখ ছিলো। প্যান্টাগনিও ইন্ডিয়ানদের আশ্রয়ে ‘ক্যালিবান আপন সেতেবিস’ শিরোনামে ব্রাউনিং একটি কবিতা রচনা করেন।
‘লাভ অমাঙ দ্য রুইনস’ নামে একটি কবিতা আছে যার ঘটনাক্রম রোমের এক গ্রামাঞ্চল। একটি লোক যাকে আমরা মেষের রাখাল বলে মনে করতে পারি। এই লোকটি একটি শহরের ধ্বংসস্তুপ নিয়ে কথা বলে–বর্ণনা করে এই ধ্বংসস্তুপ একসময় ছিলো এক জমজমাট শহর। বলে রাজা রাজরার কথা, হাজার হাজার ঘোড়সওয়ারের কথা, ভোজনসভার কথা, যেমনটা পাওয়া যায় অ্যাংলো-স্যাক্সন শোকগাথা ‘দ্য রুইন’-এ। সেই বর্ণনার পর সে তার এক মেয়ের সাথে এই শহরে প্রতিদিন দেখা করার কথা বলে। মেয়েটি তার জন্যে অপেক্ষা করতো, তার চোখে সে দেখতো এক প্রেমের আচ্ছনতা এবং একদিন তাকে সে তার ভালবাসার কথা বলেই দেয়, তারপর দুই বাহুতে ঘনিষ্ঠ জড়িয়ে ধরে। তার চূড়ান্ত বক্তব্য ছিলো সারা বিশ্বে ভালবাসাই উৎকষ্টতম এবং ভালবাসা ব্যাতীত তার আর কিছুরই প্রয়োজন নেই। তার কাছে রাজা-বাদশাহর কিইবা মূল্য? দুঃখজনক হলেও সত্যি আমি উল্লেখ করতে প্রায় ভুলেই গেছি যে ব্রাউনিং প্রেম ভালবাসা নিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছেন, এমনকি শারীরিক ভালবাসা নিয়েও। এই ভালবাসাই হলো আমাদের আজকের আলোচ্য গ্রন্থের মূল বিষয়। আমাদের পরবর্তী আলোচনার বিষয় হবে প্রি রাফাইলাইট ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা দান্তে গ্যারিয়েল রসেটি। এই ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠা ব্রাউনিং-এর অনেক পরে। তবে ব্রাউনিং-এর এক অন্যতম কাব্যগ্রন্থ হলো ‘দ্য রিং অ্যাড দ্য বুক’। এই গ্রন্থটি এক অভূতপূর্ব কৌশলে রচিত।

আপনাদের মধ্যে কেউ ‘রাশমনো’ বলে সেই চমৎকার জাপানী চলচ্চিত্রটি দেখেছেন কিনা জানি না। আকুতোগাওয়ার লেখা গল্পাশ্রয়ে এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত, যিনি ব্রডওয়ের প্রথম জাপানী অনুবাদক ছিলেন। এই গল্পে যে শিল্পকৌশল ব্যাবহার করা হয় (এবং চলচ্চিত্রেও) তা ব্রাউনিং-এর ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’-এরই অনুকরণ। তবে ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’ চলচ্চিত্রটির চেয়েও অধিকতর জটিল। বিষয়টি বোধগম্য কারণ গ্রন্থ চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশি জটিল হতেই পারে। ছবিতে আমরা এক সামুরাই-এর গল্প পাই। এই সামুরাই তার স্ত্রীকে নিয়ে একটি জঙ্গল পাড়ি দিচ্ছিল, পথে এক ডাকাত তাদের আক্রমন কওে, ডাকতের দৃষ্টি স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারপর আমরা পাই একই গল্পের তিনটি ভিন্ন-ভিন্ন ভাষ্য। একটি ঐ সামুরাই-এর বর্ণনায়, অপরটি ডাকাতের এবং শেষটি এক ডাইনির মুখে ঐ মহিলার বিদেহী আত্মার। প্রতিটি গল্পই ভিন্নতর যদিও তিনজনই ঐ একই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। ব্রাউনিং প্রায় একই পদ্ধতি ব্যবহারে সচেষ্ট হয়েছেন, কিন্তু তার পদ্ধতিটি ছিলো কঠিনতর, কারণ ব্রাউনিং সত্যকে উম্মাচন করতে চেয়েছেন। বইটির নামকরণ থেকেই শুরু করা যাক: ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’। এর ব্যাখ্যা এভাবে দেয়া যায়: ব্রাউনিং বলতে চেয়েছেন একটা আংটি প্রস্তুত করতে– এবং আংটি আসলে বইয়েরই রূপক হিশেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যে বইটি তিনি রচনা করতে প্রস্তুত হয়েছেন বা লিখতে শুরু করেছেন– প্রয়োজন এক ধাতব সংমিশ্রণ। আংটি কখনো খাঁটি সোনা দিয়ে প্রস্তুত সম্ভব নয়। সোনার সাথে আরও অবর ধাতুর মিশ্রণ প্রয়োজন। ফলে এই গ্রন্থ, অর্থাৎ ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’ রচনায় ব্রাউনিংকে– এই বিনয়টি ব্রাউনিং-এর অন্যতম বৈশিষ্ট– সোনার সাথে কিছু যদি মেলাতে হবে এবং সেই খাদটি হলো তাঁর কল্পনা। ব্রাউনিং বলছেন তিনি পাকা ধাতু পেয়েছেন। ফ্লোরেন্স-এর এক জায়গায় পাওয়া এই বইটির নির্যাস বের করে তার কল্পনার সংমিশ্রণে তিনি কাব্যগ্রন্থটি রচনা করবেন, কারণ বইটি আসলে এক শতাব্দী আগে রোমে ঘটে যাওয়া এক অপরাধের বিচারের কাহিনী। ফ্লোরেন্সের ঐ বইটি ইংরেজিতে অনূদিত হয় এবং এভরিম্যান্স্ লাইব্রেরি সেটি মুদ্রণ করে। বইটি আপনাদের পরিচিত শিরোনাম“দ্য ওল্ড ইয়েলো বুক’-এর অন্তর্গত। গ্রন্থটিতে সেই অপরাধের বিচারের সম্পূর্ণ বর্ণনা মুদ্রিত হয়েছে কিন্তু বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এতই উদ্ভট ভাবে যে পাঠকদের মনে হবে এটি একটি বিভৎস গল্প। গল্পটি এক কাউন্টকে নিয়ে। এই কাউন্ট এক কিষানি মহিলাকে বিত্তবান ভেবে বিয়ে করে। বিয়ের পর মহিলাকে ত্যাজ্য করে এক মঠে আটকে রাখে। মহিলা পরবর্তীতে ঐ মঠ থেকে পালিয়ে তার বাবা-মার কাছে চলে যায়। একদিন সেখানে কাউন্ট এসে হাজির। তার সন্দেহ মহিলা দুশ্চরিত্রা– কোনো এক ধর্মযাজকের সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত। কাউন্ট তার সাথে একদল খুনিও নিয়ে আসে। তারা জবরদস্তি বাড়িতে ঢুকে মহিলাকে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে কাউন্টকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হয়। বইটিতে এরপর খুনির জবানবন্দিসহ কিছু চিঠিপত্র সংযোজিত হয়েছে। ব্রাউনিং এই বইটি বারবার পড়েন এবং এই বিভৎস গল্পটি প্রায় কণ্ঠস্থ করে ফেলেন। গল্পে শেষ পর্যন্ত তার স্ত্রী হত্যার দায়ে কাউন্টকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এই গল্প পড়ার পর ব্রাউনিং মূল সত্য উদঘাটনে উদ্যোগী হন এবং ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’ রচনা করেন।
‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’-এ এই গল্পটি আমার মনে হয় অন্ততপক্ষে দশ বার পুনরাবৃত্তি করা হয়–সেই একই গল্প। যেটি সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক এবং মৌলিক সেটি হলো– রাসমনোর সাথে যার কোনো মিল নেই–ঘটনাটি ব্রাউনিং-এর গ্রন্থে মূলত, অপরিবর্তিতই থেকে যায় এবং একই ঘটনার পুনঃপুনঃ বর্ণনার কারণে পাঠকদের তা মুখস্থ হতে সময় লাগে না। বৈপরিত্যটি শুধুমাত্র প্রতিটি চরিত্রের একান্ত মতামতে। সম্ভবত ব্রাউনিং পত্রাকারে বর্ণিত (epistolary novel) গল্প বলার পদ্ধতি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ছিলেন যেটি অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ভীষণ প্রচলিত ছিল। আমার মনে হয় গ্যেটের Die-Wahlverwandtschaften এই ধরণের রচনারীতির মধ্যে পড়ে। তিনিও উইলকি কলিন্স্-এর উপন্যাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। কলিন্স্ গোয়েন্দা রহস্যের দীর্ঘ বর্ণনাশ্রয়ীতাকে হালকা করার মানসে পত্রাকারে গল্প বলার পদ্ধতিটি গ্রহণ করেন। গল্পের বর্ণনাটি তিনি চরিত্র থেকে চরিত্রান্তরে অতিক্রম করাতে চেয়েছেন। তবে একথাও ঠিক সামাজিক ব্যাঙ্গ রচনার জন্যও এই পদ্ধতিটি উপযুক্ত। যেমন একটা পরিচ্ছেদে একজন চরিত্র কাহিনি-কখন করছে। সে বর্ণনা করছে কোনো একজনের সাথে কোনো একটি বিষয়ে কথোপকথন হয়েছিল তার এবং কিভাবে তার সাথে কথা বলে সে মুগ্ধ হয়েছিল। পরবর্তী পরিচ্ছেদে দেখা যায় সেই কথোপকথনের সময় উপস্থিত তৃতীয় একজন বলছে ঠিক উল্টো কথা। সে বলছে মুগ্ধ হওয়া দূরের কথা, ঐ ব্যক্তির কথাবার্তা তার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর মনে হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে দু’জনের বক্তব্যের মধ্যে একটি বৈপরীত্য ও ব্যাঙ্গ স্পষ্টতই উপস্থিত এবং সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটাই এক ধরণের খেলায় পরিণত হয়েছে।

ব্রাউনিং এই বিষয়টি তাঁর লেখায় গ্রহণ করেছিলেন এবং ফলে বিভিন্ন মানুষকে দিয়ে তিনি একই গল্প বলিয়েছেন। কিন্তু পার্থক্যটা হলো এই গল্প বলাটা উনি অনুক্রম অনুযায়ী করেননি। অর্থাৎ, একজন চরিত্র অপরজনের কাছে গল্পটি সম্প্রদান করেনি–প্রত্যেকটি চরিত্র তাদের সম্পূর্ণ গল্পটি বলেছে–সেই একই গল্প, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। ব্রাউনিং তাঁর লেখার প্রথম অংশ উৎসর্গ করেছেন এলিজাবেথ ব্যারেটকে যিনি তখন প্রয়াত। ফলে ব্রাউনিং বলছেন তিনি প্রায়ই তাকিয়ে দেখতেন আকাশের কোন অংশটি সবচাইতে নীল এবং ভাবতেন এলিজাবেথ ব্যারেট ঠিক সেখানেই আছেন। আমার প্রথম পংক্তিগুলো এখনও মনে আছে: ‘আহ্, আমার গীতল ভালবাসা, অর্ধনারীশ্বর, অর্ধবিহঙ্গ, এক মূর্তিমান বিস্ময়, এক বুনো কাম-বাসনা।’ এর পরই পাই কাব্যের প্রথম সর্গ যার শিরোনাম ‘হাফরোম’। সেখানেই পরিচয় ঘটে সত্য ঘটনার সেই সব চরিত্রের মুখ থেকে যারা সেই খুন হওয়া মহিলা পমপিলিয়াকে দেখেছে। অবশ্য এই গল্পগুলো যারা বলেছে তাদের কোনো অনুক্রম অনুসরণ করা হয়নি। তবে এরা সবাই পমপিলিয়ার রূপে বিমোহিত এবং খুনির অপরাধে নিশ্চিত। তারা সবাই একমত স্ত্রীকে হত্যা করে কাউন্ট অন্যায় করেছে। এরপরে রয়েছে আর একটি পরিচ্ছেদ। এই পরিচ্ছেদের নামকরণও হয়েছে ‘হাফ-রোম’। এখানে একজন ভদ্রলোক আবার এই গল্পটিই বলছে যার বয়েস উল্লেখ নেই। ভদ্রলোক গল্পটি শোনাচ্ছে তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে। তার গল্পটি এমন: কাউন্ট তার স্ত্রীকে হত্যা করে কোনো অন্যায় করেনি। ভদ্রলোক কাউন্টের পক্ষে অর্থাৎ হত্যাকারীর পক্ষ নিয়েছে। তারপর আমরা পাই ‘তারতিউম কুইড’কে। এই চরিত্রটি তার গল্প বলে–তার মতে–নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে: খুন হওয়া মহিলা এবং খুনী উভয়ই আংশিকভাবে সঠিক। তবে তার গল্প বলার ভঙ্গিটি ছিল দ্বিধাবিভক্ত।

এরপর আমরা প্রথমে পাই ধর্মযাজকের কৈফিয়ত এবং পরে আদালতের বক্তব্য। সবশেষে আসে বাদি পক্ষ ও বিবাদি পক্ষের আইনজীবীদের আত্মপক্ষ সমর্থন। তারা উভয়ই আইনী ভাষার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, ফলে তাদের বক্তব্যে গল্পের কোনো ছোঁয়াই থাকে না। তারা শুধুমাত্র আইনি মারপ্যাঁচের মধ্যেই আটকে থাকে। অর্থাৎ গল্পের আঙ্গিকের বাইরে থেকে তাদের কথোপকথন ঘুরপাক খায়।

তারপর রয়েছে মহিলা আসলে কি বলতে পারতো। আর সব শেষে আমরা পাই মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কাউন্টের মুখ থেকে একধরণের স্বগতোক্তি। এখানে দেখা যায় কাউন্ট তার ছলচাতুরী সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে, মিথ্যা কথা থেকে বিরত হয়েছে সব সত্য কথা বলেছে। সে বর্ণনা করেছে কিভাবে ইর্ষা তাকে কুরেকুরে খেয়েছে, কিভাবে তার স্ত্রী তাকে প্রতারণা করেছে, কিভাবে ঐ মহিলা এবং তার আত্মীয় স্বজনরা প্রতারণার কর্মকান্ডে অংশিদার হয়েছে। কাউন্ট যখন তাকে বিয়ে করে তখন তার ধারণা ছিলো সে একজন বিত্তবান মহিলাকে বিয়ে করছে। কিন্তু এই ধারণা সর্বৈব মিথ্যা ছিলো আর ঐ মহিলা এই ধারণা দিয়ে তাকে ঠকিয়েছে। এই সব কথা বলতে বলতে এক সময় ভোর হয়ে যায়। আতংকে সে লক্ষ্য করে সকালের ধূসর আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তাকে বধ্যমঞ্চে নেবার জন্যে প্রহরীরা হাজির হয়। আর তখনই তার শেষ কথা শোনা যায়: ‘পমপিলিয়া তুমি কি ওদের আমাকে হত্যা করতে দেবে?’ এটাই সেই মহিলাকে খুন করা মানুষটার চূড়ান্ত উচ্চারণ ছিলো। এরপর সংযুক্ত হয় পোপের বক্তব্য। পোপ এখানে অবতীর্ণ হন প্রজ্ঞা এবং সত্যের প্রতিনিধি রূপে। তার মতে হত্যাকারীর মৃত্যুদন্ড হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সবশেষে ব্রাউনিং তাঁর নিজস্ব কিছু মতামত তুলে ধরেন।

আমি ব্রাউনিংকে কাফকার সাথে তুলনা করেছি। আপনাদের ‘ফির্য়াস্ অ্যান্ড স্ক্রুপ্ল্স্’ কবিতাটার কথা মনে আছে নিশ্চয়। আমি এই কবিতায় ইমানদার ও ঈশ্বরের মধ্যে যে সম্পর্কের অস্পষ্টতা আছে তার কথাও বলেছি। একজন ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ প্রার্থনা করে ঠিকই কিন্তু তার সেই প্রার্থনা শোনার কেউ আছে কিনা সে জানে না অর্থাৎ তার বক্তব্যে অংশ নেবার আদৌ কারও অস্তিত্ব আছে কিনা সে বিষয়ে সে নিশ্চিত নয়। কিন্তু এই গ্রন্থে–আর এখানেই ব্রাউনিং এবং কাফকার মধ্যে মৌলিক তফাত–ব্রাউনিং নিশ্চিত তিনি শুধুমাত্র তাঁর কল্পনার উপর নির্ভরশীল নয়, কারণ ব্রউনিং-এর দৃঢ় বিশ্বাস সত্যের অস্তিত্ব আছে। ব্রাউনিং এও জানেন এই বিশ্বে অপরাধী ও নিরপরাধী উভয়ই বর্তমান। তার বিশ্বাস অস্পষ্টতার এক অনিবার্য আকর্ষণ আছে–মানুষের সাথে এই বিশ্বব্রক্ষান্ডের সম্পর্কে এক ধরনের রহস্যময়তা বিরাজমান। এবং তার প্রয়োজনও আছে। কিন্তু সর্বোপরি তিনি মনে করেন সত্যে বিশ্বাসই চূড়ান্ত। ব্রাউনিং মনে করেন তিনি এই গ্রন্থটি পুনঃরচনা করেছেন সেই অপরাধ রহস্যের ভেতর তার কল্পনাক্তি প্রয়োগ কওে, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার অভিপ্রায়ে। আর সেই সত্য প্রতিষ্ঠা তিনি করতে পেরেছেন অবর ধাতুর সংমিশ্রণে যেমন সোনাতে খাঁদ মেশানো হয় আংটি প্রস্তুতে। তার অবর ধাতু হলো কল্পনা।
ব্রাউনিং মূলত ছিলেন আশাবাদী। ‘রাবাই বিন এজরা’ নামে তাঁর একটি কবিতা আছে। রাবাই বিন এজরা ছিলেন একজন হিস্পানি ইহুদি ধর্মযাজক। চেষ্টারটন বলছেন ব্রাউনিং যখন বিশ্বব্রক্ষান্ড, মানুষ ও আমাদের আশা আকাক্সক্ষা সম্পর্কে চূড়ান্ত সত্য উচ্চারণ করতে চান তখন তিনি তাঁর চিরায়ত অভ্যাস অনুযায়ী কোনো এক অজানা মধ্যযুগীয় হিস্পানি ইহুদি ধর্মযাজকের মুখ দিয়ে সেই সত্যকে বলিয়ে নেন যাকে কেউ হয়তো মনেই রাখেনি কিংবা হয়তো শুধু এটুকুই আমরা জানি যে তিনি টলেডোর অধিবাসী ছিলেন এবং পরবর্তিতে ইতালিতে বসবাস করতেন। এবং তাঁর মন্দ ভাগ্য নিয়ে সর্বদাই অভিযোগ করতেন। এই ধর্মযাজকের এমনই মন্দভাগ্য যে তিনি যদি মোমবাতি বেচার ব্যাবসা শুরু করেন তবে দেখা যাবে সূর্য আর কখনও অস্ত যাবে না আর যদি কফিনের কাপড় বেচতে শুরু করেন তবে হঠাৎই মানুষ অমরণশীল হয়ে যাবে। ব্রাউনিং র‌্যাবাই বিন এজরার মুখ নিয়ে উচ্চারণ করান এই বিশ্ব সম্পর্কে তারই নিজস্ব ধারণা। আমরা যা কিছু করি এবং এই পৃথিবীতে আমাদের কাছে যা কিছু অধরা থাকে তারই কথা। আরও বলেন স্বর্গে গিয়ে আমরা কি পাব কিংবা পাচ্ছি, বলেন যা কিছু আমাদের জীবনে ঘটছে, যাকিছু দেখছি তা শুধুমাত্র একটি বৃত্তের অংশ মাত্র। আমাদের দৃষ্টিতে যাকিছু ধরা পড়ে তা সবই অসম্পূর্ণ কিংবা একটা বাঁক মাত্র–এক অজানা বৃত্তের ভেতর আবর্তমান আংশিক আনন্দ, পরিপূর্ণতা নিয়েই আমাদের অস্তিত্ব। ব্রাউনিং বার্ধক্যকে শুধুমাত্র ক্ষয়ে যাওয়া বলে মনে করতেন না বরং ভাবতেন এ এক অঙ্গচ্ছেদ, এক দরিদ্রীকরণ। এতদসত্ত্বেও বার্ধক্য এক পরিপূর্ণতা কারণ বার্ধক্য আমাদের প্রাজ্ঞ করে। তিনি এসবই বিশ্বাস করতেন। এই কবিতাটিও ব্রাউনিং এর এক মহৎ রচনা যার উপসংহারটা এমন: বার্ধক্যই হলো তারুণ্যের শুদ্ধতা।
আমি অসম্পূর্ণতা ও প্রসারিত বৃত্তের রূপক দিয়ে আমার বক্তব্য শুরু করেছিলাম। ব্রাউনিং-এর উপর পঠনপাঠনের এক বিস্তৃত তালিকা আছে। তার উপর একটি এনসাইক্লোপিডিয়াও রচিত হয়েছে যেখানে প্রায়শ চোখে পড়বে তার কবিতার দুর্বোধ্য ব্যাখ্যা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ‘চাইল্ড রোলান্ড টু দ্য ডার্ক টাউয়ার কেইম’ কবিতাটির বিষয়বস্তু জীবব্যবচ্ছেদ। এছাড়া আরও উদ্ভট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তবে আমার ধারণায় ব্রাউনিং বিষয়ে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং সুপাঠ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছে চেষ্টারটন এই শতাব্দীর প্রথম দশকে, ১৯০৭ অথবা ১৯০৯ সালে। এটি ‘ইংলিশ মেন অব লেটার্স’ সিরিজের একটি অনবদ্য প্রকাশনা। চেষ্টারটন-এর জীবনী পড়তে গিয়ে যে বইটি তার সেক্রেটারি মাইসি ওয়ার্ড-এর রচনা– আমি আবিস্কার করি এতে চেষ্টারটন ব্রাউনিং-এর কবিতার যতগুলো উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা সবই ভুল। কিন্তু এই ভুলের কারণ চেষ্টারটন ব্রাউনিং এতই মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন যে কোনো উদ্ধৃতি ব্যাবহার করার সময় তিনি ব্রাউনিং-এর মূলপাঠ দেখার কোনো প্রয়োজনই বোধ করেননি। দুঃখজনক যে ‘ইংলিশ মেন অব লেটার্স’- এর সম্পাদক, ভার্জিনিয়া উলফ-এর পিতা, লেসলি স্টিফেন ভুলগুলো শুদ্ধ করে দিয়েছেন। বরং এই সংযোজন না থাকলে ব্রাউনিং-এর মূল কবিতার সাথে তুলনা করে চেষ্টারটন-এর উদ্ধৃতি পাঠ করলে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হতো। দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো সংশোধন করা হয়েছে এবং মুদ্রিত গ্রন্থে ব্রাউনিং-এর মূলপাঠ সংযোজন করা হয়েছে। চেষ্টাটনের স্মৃতিতে ব্রাউনিং-এর কবিতাগুলো কেমনভাবে রূপান্তরিত হয়েছে তা দেখতে পেলে পাঠকরা চমৎকৃত হতে পারতেন।
আমি এক ধরনের দুঃখ অনুভব করছি। আমার মনে হচ্ছে ব্রাউনিং-এর উপর আমি অবিচার করেছি। কিন্তু এও সত্যি এশুধু ব্রাউনিংকে নিয়ে নয়, সব কবির ব্যাপারেই এই অবিচার হয়ে থাকে। সবচেয়ে ভাল হতো যদি আমরা সরাসরি তাদের প্রশ্ন করতে পারতাম। সে যাই হোক, আমি নিশ্চিত ব্রাউনিং-এর প্রতি আপনাদের কৌতূহলী করে তুলতে সক্ষম হয়েছি। দুঃখ হলো, যেমনটা আগেও বলেছি, ব্রাউনিং তাঁর সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন কাব্যে। যদি তা না করতেন তবে তাঁর পরিচিতি এক উচ্চপর্যায়ের ইংরেজি ঔপন্যাসিক এবং একজন মৌলিক ছোটগল্প লেখক হিশেবে হতে পারতো। একথাও অনস্বীকার্য তিনি যদি গদ্য রচনায় নিয়োজিত হতেন তবে তার অপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত কাব্য-সঙ্গীত থেকে আমরা বঞ্চিত হতাম। মানতেই হবে ব্রউনিং ছিলেন ইংরেজি কাব্যের একজন পরিপূর্ণ মাস্টার। তিনি ছিলেন টেনিসন অথবা সুইনবার্ণ-এর মতই দক্ষ, অথবা তাদের সবার মত। তবে এতে কোনই সন্দেহ নেই যে ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’ গ্রন্থ–যে গ্রন্থে একই গল্প বারংবার বলা হয়েছে–গদ্যে রচনা করলেই ভাল হতো। ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’ গ্রন্থের সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা হলো– যে ব্যাপারটায় আমি এখন ফিরে যেতে চাই–যদিও প্রতিটি চরিত্রই এই একই ঘটনা বর্ণনা করছে এবং তাদের বর্ণনায় কোনোই অমিল নেই, মানুষের গভীর মনস্তত্বে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে সেটি হলো আমরা প্রত্যেকেই মনে করি আমিই সঠিক। যেমন, কাউন্ট স্বীকার করে যে সে খুনী, কিন্ত এই খুনী শব্দটি অনেক বিবেচনায়ই অতি সর্বজনীন। এই ধারণাটি আমরা পাই অন্য গ্রন্থ পাঠে। আমরা ম্যাকবেথ অথবা দস্তয়ভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট পড়লে দেখতে পাব ম্যাকবেথ কিংবা রাসকলনিকভ সত্যিকার অর্থে কোনো খুনী নয়। খুনী শব্দটি আসলে অতীব স্খূল। আমরা লক্ষ্য করি ঘটনাক্রম কিভাবে তাদেরকে খুন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যার সাথে সত্যিকার খুনীর কোনো মিল পাওয়া যায় না। মানুষের কর্ম দিয়েই কি তাকে সজ্ঞায়িত করা সমীচিন? মানুষ কি অপরাধ করতে পারে না, আর সেই অপরাধ কি যৌক্তিক হতে পারে না? শত-সহস্র কারণেই মানুষ অপরাধ করতে পারে। ম্যাকবেথ-এর প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় তিন ডাইনিকে যারা আসলে নিয়তিরই প্রতিভূ। ডাইনিগুলো ভবিষ্যৎবাণী করে আর তাই ম্যাকবেথ বুঝতে পারে এরা যাকিছু বলছে তা সত্যি হবে এবং তার নির্ধারিত নিয়তি হলো তার রাজা ডানকানকে হত্যা করা এবং সেই হত্যার কারণে আরও হত্যার সাথে জড়িয়ে পড়া। সেই একই জিনিষ আমরা দেখতে পাই ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক’-এ: কোনো চরিত্রই মিথ্যা বলে না এবং প্রত্যেকেই মনে করে তাদের বক্তব্যে যুক্তি আছে। অবশ্য ব্রউনিং বিশ্বাস করেন এদের মধ্যে কেউ না কেউ দোষী এবং এই দোষীদের একজন ঐ কাউন্ট, যদিও কাউন্ট নিজে মনে করে স্ত্রীকে হত্যা করার জন্য যৌক্তিক ছিল, বিশেষ করে পারিপার্শিক পরিস্থিতির কারণে।
চেষ্টারটন তার ব্রাউনিংকে নিয়ে রচিত গ্রন্থে অপরাপর আরও মহান কবিদের নিয়েও আলোচনা করেছেন। যেমন তিনি মনে করেন হোমার সম্ভবত ভেবেছিলেন ‘আমি সবাইকে এই বিশ্বের সত্যের কথা শোনাবো। সেই সত্যতার প্রকাশ হবে উচ্চন্ড নগরের পতনের মাধ্যমে, সেই নগরের প্রতিরক্ষার মাধ্যমে’। আর তাই তিনি রচনা করেছেন ইলিয়াড। তারপর অন্য একজন কবি, যার নাম চেষ্টারটন বিস্মৃত হয়েছেন, বলছেন, আমি এই বিশ্বের মোক্ষ সত্যের কথা বলবো, আর সেটা বলবো ন্যায়বান মানুষের দুঃখকষ্টের বর্ণনার মাধ্যমে, তার প্রতি তার বন্ধুদের ঘৃণার মাধ্যমে, ঈশ্বরের অমোঘ বাণীর মাধ্যমে’। সেই কবি লিখেছেন দ্য বুক অব জব। আরও এক কবি বলেন, ‘আমি সবাইকে বিশ্বের সত্যের সন্ধান দেব, আর তা হবে নরকের, শুদ্ধির এবং স্বর্গের ভেতর দিয়ে এক কাল্পনিক অথবা স্বাপ্লিক যাত্রার মাধ্যমে। আর সেই কবি হলেন দান্ত। ওদিকে শেক্সপীয়র স্ম্ভবত ভাবতে পারতেন, ‘আমি সত্যের কথা বলবো এক পুত্রের গল্পের মাধ্যমে যে এক প্রেতাত্মার কাছে জানতে পারে তার মা ছিলো দুচ্চরিত্রা এবং খুনী’। তিনি লিখলেন হ্যামলেট। কিন্তু ব্রাউনিং যা করেছেন তা বিস্ময়কর। তিনি বল্লেন, আমি এক ফৌজদারী মামলার বর্ণনা পেয়েছি যেটি উদ্ভট এক ব্যাভিচারের গল্প, খুনের গল্প, মিথ্যা ও প্রতারণার গল্প। আর সেই গল্পের উপর ভিত্তি কওে, যে গল্প নিয়ে সারা ইতালি তোলপাড় হয়েছিলো, এখন যে গল্প ইতালি বিস্মৃত হয়েছে, সেই ইতালির মানুষদের কাছে আমি বিশ্বের সত্যকে উদ্ঘাটন করবো এবং তিনি রচনা করলেন ‘দ্য রিং অ্যান্ড দ্য বুক।’
আগামী ক্লাসে আমি ইতালির বংশোদ্ভুত মহান কবি দান্তে গ্যাবরিয়েল রসেটিকে নিয়ে আলোচনা করবো। আমার আলোচনার সূত্রপাত হবে তার ব্যক্তিগত করুণ জীবন যাপনের বর্ণনা দিয়ে। তারপর তার রচিত দুটি কিংবা তিনটি কবিতা নিরীক্ষা করবো। তবে অবশ্যই তাঁর লেখা বেশ কটি সনেটও আমরা পড়বো, কারণ তাঁর সনেটগুলো ইংরেজি ভাষায় রচিত সর্বোৎকৃষ্ট কাব্য।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com