আমি মুজিব বলছি

আনিসুর রহমান | ১৪ আগস্ট ২০১৬ ৯:২৯ অপরাহ্ন

Mujibবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখালেখির পরিমাণ ও পরিধি বিশাল। স্মৃতিচারণ থেকে শুরু করে কবিতা, চলচ্চিত্র, জীবনী, গবেষণা ও মূল্যায়ন, কোনোটারই কমতি নেই। অন্যদিকে দেশে বিদেশে অর্বাচীনরাও বসে নেই। সুযোগ পেলেই মহান এই মানুষটির সাথে মৃত্যুর পরেও বেয়াদবি করে। এই মানুষটি একটি জাতির আধুনিক রূপকার, একটি রাষ্ট্রের স্থপতি। প্রত্যন্ত জনপদ টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিয়ে কিভাবে তিনি ধাপে ধাপে বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের স্থপতি হলেন, দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্তির পথ দেখালেন তার অনেক কিছু অনেকের লেখায় নানাভাবে উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তাঁর মনের কি অবস্থা তা কিছুটা ঘটনা পরম্পরায় কিছুটা কল্পনায়, গদ্য-পদ্যের মিলিত বয়ানে নাট্যমঞ্চের জন্যে লেখা একটি মনোলগ বা স্বগত সংলাপ: আমি মুজিব বলছি।

মনে পড়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা । তিনিই আমার আর্দশ, তিনিই আমার নতো। তাই আজ এই নির্জন কারাগারে তাঁর কথাই সবার আগে মনে পড়ে। তিনি আমাকে কাছে টেনে নিলেন কি করে? তাঁর সাথে আমার পরিচয় হলো কিভাবে, কোন ভোরে?
তিনি আমাকে দেখালেন দেশ ও রাজনীতির নানা পথ।
আরো মনে পড়ে, কলিকাতা মেডিকেল কলেজের অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তার আমার চোখের অপারেশন করে। সেই থেকে চশমা আমার শুরু।
বয়স আমার ষোল, ডাক্তারের পেছন ঘুরে বছর কয়েক নষ্ট হয়ে গেল। পড়ালেখায় পেছনে পড়ে গেলাম।
কাজ নেই, পড়া নেই। রোজ রোজ স্বদেশীদের নজরে পড়ে যাই। সুভাষ বসুর দলের ভক্ত হয়ে যাই।
ঐ বয়সে বুঝে যাই, ইংরেজদের এই দেশে থাকার অধিকার নাই।
স্বদেশীদের মিটিংয়ে ভিড় করি, গোপালগঞ্জ-মাদারীপুর যাওয়া-আসা করি।
মাদারীপুর এসডিও সাহেব আমার দাদাকে হুঁশিয়ারি করেন।

আমি যে বালক অনেক পরে তা বুঝতে পারি।
ভালো কাজে যারাই বাগড়া মারে, তাদের চালে ঢিল পড়ে।
আমরা ছাত্ররা মুষ্টি সংগ্রহ করি। গরিব ছাত্রদের জন্য জায়গির খোঁজ করি।
ভালো কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা আমার বাড়ে আর বাড়ে।
ডানপিটে হলাম যে কী করে।
রোগবালাইয়ের খপ্পরে পড়ে, পড়ালেখার বয়স চার বছর গেলো বেড়ে।
দলের কেউ মার খেলে প্রতিপক্ষের রক্ষা নাই। ডানপিটেদের দলের ডাকসাইট নেতা হলাম যে কী করে।
আব্বার কাছে নালিশ আসে।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক সাহেব আর শ্রমমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেব আসবেন গোপালগঞ্জে।
আমি হলাম স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতা।
হিন্দু ছেলেরা বেঁকে বসলো।
কি কারণ? কংগ্রেস ওদের করেছে বারণ।
তারই বা কি কারণ কি?
হক সাহেব মুসলমান, সোহরাওয়ার্দী সাহেব মুসলমান।
এই প্রথম বুঝলাম, মনে মনে ধাক্কা খেলাম।
আমি তো এর আগে ভাবিনি, বুঝিনি, কল্পনা করিনি।
হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি প্রাণ সমানে সমান।
কন্তিু কিসে ভেদ?
সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমার নাম ও ঠিকানা টুকে নিলেন।
ফিরে গিয়ে চিঠি দিলেন।
আমিও জবাব দিলাম।
পুলিশ আমাদের ধরে, তারপর হাজতে ভরে,
প্রথম জেলজীবন ১৯৩৮ সালে।
এর নাম বাঙালির কপাল।
আমাদের দলের ছেলেদের কেউ যদি ধরে,
ছিনিয়ে আনি মারপিট করে।

১৯৩৯ সাল।
শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করি কলকাতা গিয়ে।
গোপালগঞ্জে ফিরে সংগঠন করতে লেগে পড়ি।
অসুস্থ শরীরে পরীক্ষা দিয়া পাশ করি।
পড়ালেখা আর কি করি?
রাজনীতি আর সভা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করি।
বাবার খেলাধূলা আর রাজনীতিতে নিষেধ নেই,
তবে তিনি চান পড়ালেখাটাও যেন ঠিকঠাক করি।
মাথায় ঢুকে যায় পাকিস্তান আনতেই হবে;
তাছাড়া বাংলার মুসলমানের মুক্তি নাই, মুক্তি নাই।
আজাদ পত্রিকায় যা লেখে তাই সত্য মেনে যাই।

১৯৪১ সাল।
ছাত্রলীগের সম্মেলন,
ফরিদপুরে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহিম খাঁ এলেন,
সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে, সবকিছু পণ্ড করে।
আমরা সকলেই বুঝে যাই,
পাকিস্তান ছাড়া আমাদের মুক্তি নাই।
ছাত্রত্ব শেষ হবার পরেও
পদ আকড়ে ধরে থাকে বছরের পর বছর;
এই রকম নেতা দিয়ে কি হবে?
এইটা শেখ মুজিব মেনে নেয় কিভাবে?
শহীদ সাহেব সবকিছু সামলান,আমাদের শান্ত করেন,
ইসলামিয়া কলেজে আমার জনপ্রিয়তা বাড়ে আর বাড়ে।

১৯৪৩ সাল।
বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে।
লাখ লাখ ভুখা লোক গ্রাম থেকে শহরে ঢুকছে।
খাবার নাই, কাপড় নাই;
ইংরেজরা যুদ্ধের জন্যে সকল নৌকা বাজেয়াপ্ত করেছে; জব্দ করেছে ধান চাল খাবারের গুদাম,
ব্যবসায়ীরা পেয়েছে মগের মুল্লুক;
দশ টাকার চাল চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করে।
প্রতিদিন রাস্তায় লোক থাকে পড়ে,
অনাহারে,
অর্ধাহারে।
শহীদ সাহেব সাপ্লাই মন্ত্রী হবেন
আর খামোখা বদনাম নিবেন।
কিছু কি করতে পারবেন?
শহীদ সাহেব যথাসাধ্য চেষ্টা করেন।
গ্রামে গ্রামে লঙ্গরখানা খোলেন।
চাল আটা ময়দা জোগাড় করেন।
ইংরেজের কথা হলো বাংলার মানুষ যদি মরে, মরুক।
যুদ্ধে সাহায্য আসে যুদ্ধের জিনিস প্রথমে। তারপর ট্রেনে জায়গা খালি পেলে, মানুষের খাবার বহন করে।
ছি! ছি! ছি!
নিমক হারাম ব্রিটিশ!
ইংরেজ, এই করে, বাংলার বুকে দুর্ভিক্ষ আমদানি করে।
শহীদ সাহেবের হুকুমে লেখাপড়া ছেড়ে,
দুর্ভিক্ষপতিত মানুষেদরে বাঁচাবার জন্যে
আমিও ঝাঁপিয়ে পড়ি।
রাতদিন ভুখা মানুষের সেবা করি।
আমার শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।
ছোটবেলায় রেণুর সাথে বিয়ে হলেও আমাদের ফুলশয্যা হয় ১৯৪২।
রেণু আমাকে যত্নআত্তি করে, সুস্থ করে। এ কথা আমি ভুলি কি করে?
জীবনের পণ সত্য হলে, জীবনে কেহ হারে না।
নানাজন নানা কথা বলে, আব্বার কান ভারি করার চেষ্টা করে আমার আগোচরে।
আব্বার সায় পেয়ে পেয়ে আমি মজে থাকি রাজনীতি নিয়ে।
আব্বা কথা বলেন। এক এক করে প্রশ্ন করেন।
কেন পাকিস্তান চাই? কি হবে এই আন্দোলন করে?
আমিও জবাব দিয়ে যাই বিশদ ব্যাখ্যা করে,
পাকিস্তান না হলে, বাংলার মুসলমান বাঁচবে কি করে?
হক সাহেবের ভুল রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু বলতে গিয়ে খটকায় পড়ে যাই।
আব্বা নিষেধ করেন। মা নিষেধ করেন। গ্রামের মানুষরা বলেন, আর যাই বলতে চান, বলে যান, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না।
ভিন্ন উপায়ে পাকিস্তান আন্দোলনের যুক্তি আমাদের তুলে ধরা চাই।
পাকিস্তান আমরা চাই। এক নয় দুই পাকিস্তান, পশ্চিমে এক, পূর্বে আরেক বাংলা।
আমাদের পাকিস্তানে হিন্দুরাও থাকবে; মুসলমানরাও থাকবে।
আমি পাঠ নিয়েছিলাম সিপাহী বিদ্রোহ থেকে; তিতুমীর আর শরীয়তুল্লাহ থেকে; ফকির আর সন্ন্যাসীদের আন্দোলন থেকে।
আমার বন্ধু ননীকুমার দাস কাকার বাসায় থাকে; আমাদের বাড়িতে আসে যায়। ওদের বাসায় আমিও যাই। একদিন কেঁদে কেঁদে ননী জানায়, ওর কাকি ওকে বলেছে, ওকে দিয়ে সারা ঘর ধুইয়েছে আর
ওদের ঘরে আমার পদধূলি মুছেছে,
আমি মুসলমান।
আমি কষ্ট পাই।
আমি বলি, আমি যাবো না;
তুই আসিস ননী, তুই আসিস ভাই।
অনেক হিন্দুও জেলে গিয়েছে, ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে। এইভাবে হিন্দু-মুসলমান ব্যথায় ও স্বপ্নে এক থেকেও
দুইয়ে মিলেনি। মিলানোর চেষ্টা তো কেউ করেনি।
বুঝেছেন বটে কেউ কেউ। চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাস বসু
হুঁশিয়ার করেছেন হিন্দুদের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন।
কাজ হয়নি। তাঁদের কথা বাংলার মুসলমান, বাংলার হিন্দুরা বুঝেনি, মানেনি।
এইভাবে হিন্দু ও মুসলমান হয়ে গেলো দুই মেরু।
আর হাশিম সাহেব যুক্তি নিয়ে হাজির হলেন,
চেষ্টা তদবির করলেন,
পাকিস্তান মানে হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়। পাকিস্তান মানে হিন্দু ও মুসলমান এক সাথে থাকা, মিলেমিশে থাকা।

দিল্লিতে মুসলিম লীগ সম্মেলন।
সমস্ত ভারতবর্ষের মুসলমান নেতাদের দিল্লি আমন্ত্রণ। দিল্লির লালকেল্লা, জামে সমজিদ, কুতুব মিনার দু’চোখ ভরে দেখবো। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগায় যাবো।
কলকাতা থেকে দিল্লি রওনা দিলাম বড় আশা করে।
দিল্লির মাঠে জিন্নাহ সাহেবসহ অন্য নেতারা বক্তৃতা করেন।

শহীদ সাহেবকে খুব মনে পড়ে,
কারাগারের এই অন্ধ গহ্বরে।
একবার বেরিয়ে এলাম শহীদ সাহেবের সাথে রাগ করে।
রাগে-ক্ষোভে কষ্টে চোখে জল পড়ে।
শহীদ সাহেব আমাকে ফিরিয়ে নিলেন;
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
স্নেহের ঠাঁইটুকু পাই।
তিনি এক সিংহহৃদয়ের মানুষ। বড় মন তাঁর। বড় মানুষ তিনি।
শহীদ সাহেবকে আমি অন্তর দিয়ে চিনি।
হাশিম সাহেবের লেখা আমাদের পাকিস্তান দাবির মেনিফেস্টো পড়ে দারুণ হৈচৈ পড়ে শহরজুড়ে, সারা দেশজুড়ে।
জমিদারি উঠে যাবে, ব্যাপারটা দারুণ বটে।
আমরা লেখাপড়া আর কী করি। রাতদিন পার্টির কাজ করি।
পাকিস্তান যদি আনতে না পারি, কি হবে লেখাপড়া করে?
ছিঃ মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী। অনেক লাভের আশায় কী করলো, খাবার ও কাপড় লুকিয়ে গুদামে ভরলো; কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করলো।
দশ গুণ দামে বিক্রি করে বেশি বেশি মুনাফা করতে লাগলো।
শহীদ সাহেব টের পেলেন। লাল বাজারে তল্লাশি চালিয়ে হাজার হাজার গজ কাপড় উদ্ধার করলেন।
লোকজন ক্ষেপে গিয়ে মাড়োয়ারিদের পাকড়াও করলো। মাড়োয়ারিরাও কম কিসে? আইন পরিষদের সদস্যদের টাকা দিয়ে কিনে আর বেঁচে লীগ সরকারের পতন ঘটালো।
এও কি সহ্য করা যায়?
মাড়োয়ারিরা টুপি-পাগড়ি পরে কলকাতার রাস্তায় উল্লাস করে।
একদিন দলবলে তাদের দিলাম ধাওয়া।
ঠেঙানি কাকে বলে।
আমার মাথায় ঢুকে না নেতারা এভাবে টাকা নেন। হায়! এঁদের হাতে দেশ ও জনগণের ভালোমন্দ!
আমরা ছাত্র ছিলাম, দেশকে ভালোবাসতাম, দেশের জন্য কাজ করতাম।
এই খান বাহাদুরদের দ্বারা পাকিস্তান আসবে, দেশ স্বাধীন হবে, ইংরেজ তাড়ানো হবে- আমার বিশ্বাস হয় না। আমার বিশ্বাস আসে না।
মনে বল পাই না।
খান সাহেব, খান বাহাদুর, ব্রিটিশ খেতাবধারী বাংলার জমিদার-জোতদাররা পাকিস্তান আনেনি। বাংলার কৃষক এদের কথা শুনেনি। বাংলার মানুষ এদের বিশ্বাস করেনি। বাংলার মানুষ, গ্রামের কৃষক মুসলিম লীগকে কাছে টেনেছে, ভরসা রেখেছে।
শহীদ সাহেব ও আবুল হাশিম সাহেবের কথায় ভরসা রেখেছে।
ইংরেজদের বিরুদ্ধে আমাদের আছে জাতক্রোধ। ইংরেজ হারলে হবে অবধারিত প্রতিশোধ।
কিন্তু তাই বলে হিটলারের অপকর্মকে সমর্থন করি কি করে?
কোথাও যখন ইংরেজ হারে, মনের কোথাও কেন যেন ভালোলাগা টের পাই।
ইংরেজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ আমরা। এই কথা ভুলি কি করে?
আমরা ইংরেজেরও নই, হিটলারেরও নই,
তাই ভাবি, আহা সুভাষ বসু থাকলে দেশটা বুঝি স্বাধীন হয়ে যেত। কি যে ভালো হতো!
আবার ভাবি, তাতে কি বাংলায় মুসলমানের দুর্দশা কমতো?
আবার ভাবি, যে নেতা দেশের স্বাধীনতার জন্য
সবকিছু ছেড়েছুড়ে বিদেশে দেশের জন্য লড়াই করেন;
সে নেতা কিছুতেই সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না।
সিঙ্গাপুর থেকে সুভাষ বসু বক্তৃতা করেন।
বাংলায় এসে তাঁর বক্তৃতা শুনি আর উত্তেজনা, ভালোলাগায় সুদিনের পথ গুনি।
ইংরেজ চলে গেলে, জাপান আসলে, দেশের স্বাধীনতা কি আসবে?
না!
না! না! কিছুতেই না।
জাপান যখন চীন আক্রমণ করে, এই ভয়টাই আমার মাঝে কাজ করে।
আমরা চাই স্বাধীনতা। আমরা চাই ইংরেজ খেদাও।
ভারতবর্ষে ভারত ও পাকিস্তানের পতাকা উড়াও।
হিন্দু ও মুসলমান মিলেমিশে থাকবে। পাকিস্তান অংশে মুসলমান ও হিন্দু এক সুরে গান গাবে। ভারত মানে মুসলমান বিদ্বেষ নয়। পাকিস্তান মানে হিন্দু নাশ নয়।
আমি মিথ্যা বলি না, ফাঁকি পাড়ি না। তাই মনের কথা মুখে বলি।
ছোট বড় ভেদ নাই; ঠাস ঠাস সত্য বলে যাই।
আমি ভয় পাই না, সততাই আমার পথ।
আমরা জানি, আমাদের খবর ছাপে এমন কাগজ তো নাই।
আমরা সকলে দিনরাত কাজ করি।
আমার আছে কাজের নেশা। কাজ ফেলে পণ্ডিতি কথাবার্তা শুনে পণ্ডিত হবো, তা আমারে দিয়া হবে না।
জীবন থেকে পালাবো না, কাজ থেকেও না।
রাজনীতিতে সংকীর্ণতা ও উদারতা দুইয়ের সাথে পরিচিত হলাম ছাত্র থাকাকালেই।
রাজনীতির শুরুতেই বুঝে গেলাম শহীদ সাহেব উদারতার প্রতীক। আর খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব তার বিপরীত ধারা।
জীবন ও রাজনীতিতে সত্য থেকে পালাবার চেয়ে মোকাবিলাই সঠিক পথ।
সত্য থেকে পালাবার নাম হীনমন্যতা, কাপুরুষতা ও নিচতা।
রাজনীতিতে, নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাস খুব দরকার;
যার প্রমাণ অসংখ্যবার দিয়েছেন শহীদ সাহেব।
কিন্তু তা হলে হবে কী, তাঁকে হারতে হয়েছে অনেক বার, নিচ ও হীনমন্য মানুষদের কাছে।
বাঙালি মুসলমানের দুই গুণ, মুসলমান আর বাঙালি।
আমরা খুব পরশ্রীকাতর। অন্যের ভালোয় আমাদের শরীর কামড়ায়। অন্যের ভালো আমরা দেখতে পারি না, সইতে পারি না। পোশাকে আর দুই-একটি মন ভোলানো কথায় সব ভুলে যাই।
টুপি পাগড়ি পরলেই হলো, আমরা পীর বলে পূজা করি, মাথা ঠুকে সালাম করি। লোকটা জানে না ধর্মের কিছুই, বাঙালি তার খোঁজ নিবে না। যে কারণে বাঙালি ঠকে, বাঙালি গরিব থাকে। বাঙালি পরাধীন থাকে। অনেক গুণে গুণী আর অনেক ধনে ধনী বাঙালি শোষিত থাকে, গরিব থাকে।
ব্রিটিশরা আদতে ব্রিটিশ। রবার্ট ক্লাইভের রক্তের ধারা
ওরা মুছবে কেমনে?
এই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আসল উদ্দেশ্য গোলমাল জিইয়ে রাখা। কংগ্রেসকে খুশি করা। আমাদের পাকিস্তান আন্দোলনকে অস্বীকার করা।
গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা নেতৃত্ব দিবে; সংখ্যালঘিষ্ঠের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং ন্যায্য মতামত গ্রাহ্য হবে। গণতন্ত্র এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি ওখানেই। হায়রে ব্রিটিশÑ কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না।
আমরা দিল্লি যাচ্ছি। স্টেশনে স্টেশনে ট্রেন থামে। বাংলার প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবকে দেখবে, শহীদ সাহেবের কথা শুনবে লোকজন। তাঁর কথা শুনার জন্য লোকজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেন। শহীদ সাহেব যদি একটু না থামেন, ট্রেন যদি একটু না থামে, মানুষ বড় কষ্ট পাবে। এটা কি ঠিক হবে?

দিল্লি দেখি আর ভাবি ব্রিটিশ চলে যাবে; ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে; এই দিল্লির ওপর আমাদের কোনো অধিকার থাকবে না।
দিল্লির লালকেল্লা, কুতুব মিনার, জামে মসজিদ মুসলিম শিল্পের অনন্য নিদর্শন।
আজমীর শরীফের বিরাট লেকের চারপাশে শহর গড়ে উঠেছে। একপাশে মোঘল আমলের কীর্তি। সম্রাট শাহজাহানের কীর্তিই বেশি।
ইচ্ছা হয় আজমীর শরীফ থেকে যাই। থাকা নিষেধ। রাতে যদি পুলিশ ধরে নেয়, ছাড়াবে কে এই বিদেশ বিভূইয়ে?
পাকিস্তান আমাদের দাবি। এই দাবি হিন্দুর বিরুদ্ধে নয়। এই দাবি বাংলার মানুষের অধিকার আদায়েরÑ সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, যে দলেরই হোক, এই দাবি স্বাধীনতার। এই দাবি সকল ধর্মের, সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। এই দাবি প্রতষ্ঠিতি না হলে বাঙালরিা পাকস্তিান দযিে কি করব?
আমরা চাই, ব্রিটিশরা চলে যাক, সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, ভারতবর্ষ মুক্তি পাক, বাঙালরিা অধকিার ফরিে পাক।
মানুষের মধ্যে একজন পশু এবং একজন মানুষ থাকে।

১৯৪৭ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দুরা মুসলমান দেখলে আক্রমণ করে। মুসলমানরা হিন্দু দেখলে আক্রমণ করে। একদল হিন্দু মুসলমানদের রক্ষা করে। একদল মুসলমান আবার একদল হিন্দুকে রক্ষা করে।
কে কার বিরুদ্ধে লড়ে? কে কার মাথায় লাঠি মারে? এক ভাই আরেক ভাইয়ের মাথায় লাঠি মারে। আরেক ভাই ভাইকে রক্ষা করে।
কলিকাতার পরে নোয়াখালী, আরো অনেক জায়গায় দাঙ্গা লেগে যায়।
করবো কি? যাবো কোথায়? গেলাম বয়রা ও আসানসোল। দাঙ্গা আক্রান্ত মানুষের সেবা করে কলিকাতায় ফিরি দেড় মাস পরে অসুস্থ শরীরে।
ভারতবর্ষের রাজনীতি বড়ই জটিল। ব্রিটিশরা পালাতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু কিভাবে?
১৯৪৭এর জুন মাস; ঘোষণা হয়ে গেল। কংগ্রেস রাজি হলো, ভারত ভাগ হবে। তাদের লাভ বাংলা দুই ভাগ। বাংলার এক ভাগ ভারতের, আরেক ভাগ পাকিস্তানের।
শহীদ সাহেবের পক্ষে তাঁর অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করলেন, কলকাতা হবে বাংলার রাজধানী।
আহা, তিনিও জানেন না, আমরাও বুঝিনি। বাংলার ভাগ্যের ওপর ছুরি চলে; কলকাতা চলে গেলো ভারতের দখলে।
শহীদ সাহেব, হাশিম সাহেব আর শরৎ বসু দিল্লি গেলেন পৃথক বাংলাব দাবি নিয়ে। মহাত্মা গান্ধীর মুখে কথা নেই, নেহেরুর মুখেও কথা নেই। প্যাটেলে খারাপ ব্যবহার করেন; আর শরৎবাবুকে অপমান করেন। বলে দিলেন, শরৎবাবু পাগলামি ছাড়েন।
বড়লাট মাউন্ট ব্যাটেন তলে তলে কংগ্রেসের হয়ে কাজ করলেন। তাঁর ¯^প্নÑ একই সাথে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের গভর্নর হবেন।
ব্রিটিশদের হারামিগিরি বোঝা বড় দায়।
হিসাব সোজা। বাংলার লোকসংখ্যা সমগ্র পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হবেন; জিন্নাহ সাহেবও তাঁকে ভালোবাসেন। তাই ষড়যন্ত্র শুরু হলো।
যেদিন জিন্নাহ সাহেব মারা গেলেন, পাকিস্তান ও ষড়যন্ত্র এক সূত্রে গেঁথে গেল।
ভুল তো মানুষের হয়। ভুল আমারও হয়। ভুল স্বীকার করে সংশোধন করে নেই। এতে দোষ নাই।
শহীদ সাহেব, মহাত্মা গান্ধী, ব্যারাকপুর চলেন, আমিও যাই।
গান্ধীজি সুরা পড়েন, তারপর রামায়ণ। মহাত্মাজির বক্তৃতায় লোকজন আওয়াজ তোলেন, ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’।
সত্যি গান্ধীজি জাদু জানেন।
যাঁরা কাজ করেন তাঁরা ভুলও করেন। যাঁর কাজ না করে শুধু নিন্দা করেন, তাঁদের কোনো ভুল হয় না। তাঁদের দিয়ে কোনো কাজও হয় না।
আমি হলাম কাজের মানুষ। যা ভাবি তাই করি। ভুল হয়, শুধরে নিই।
ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুই রাষ্ট্র হলো। গান্ধীজি শহীদ সাহেবকে নিয়ে ভারতজুড়ে নানা জায়গায় সভা করলেন।
গান্ধীজি শহীদ সাহেবকে কতদিন রক্ষা করবেন? হিন্দুরা তাঁকে মেরে ফেলতে চায়। কয়েকবার তার ওপর হামলা করেছে। তাঁর বাড়িতে বোমা মেরেছে। শহীদ সাহেব তবুও কলকাতা ছেড়ে আসবেন না।
পূর্ববঙ্গে যাতে দাঙ্গা না হয়, সেই দিকটা নিয়ে কাজ করতে হবে।
ভারতবর্ষে শহীদ সাহেব একমাত্র নেতা, যিনি সাহস করলেন পাঞ্জাব, দিল্লি, জয়পুর ঘুরে ভয়াবহ দাঙ্গা ¯^চক্ষে দেখে এলেন।
ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর শহীদ সাহেব প্রথম পূর্ববাংলায় এলেন, বরিশালে সভা করবেন।
নিখিল মুসলিম ছাত্রলীগ নেতাদের কেউ আর ছাত্র নেই। কমিটি হয়েছে ১৯৪৪ সালে। পাকিস্তান হলো বলে নতুন সংগঠন করবো।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে সকলেই রাজা। অলি আহাদ মুসলিম শব্দে আপত্তি তোলে। আমি বলি, নামে এমনকি আসে যায়? সবে তো পাকিস্তান হলো, নীতি-আদর্শ ঠিক থাকলে পরে নাম পাল্টানো যাবে। নীতি, আদর্শ ও কাজ আসল কথা।
পাকিস্তান রাজনীতির প্রতি পদে ভুল পথে চলতে লাগল। বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো। প্রথমে ভাষা সংস্কৃতিতে আঘাত করলো। বেশির ভাগ জনগণের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে তোড়জোড় শুরু হলো।
আমরাও কম কিসে? বাংলাকেও রাষ্ট্র ভাষা করতে হবে।
ভাষা আন্দোলন হলো। গ্রেফতার হলাম অনেকেই।
পাকের পাকিস্তান প্রতি পদে পদে নাপাক হতে লাগলো। একদল ভুল নেতা, আর আমলা শুরু থেকে ফায়দা লুটে গেল।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অনেক স্কুলছাত্রও ছিল। এদের একজনের বয়স ছিল দশ। ওর নামে জিন্দাবাদ দিলাম। এর নাম মনোবল। মনোবল না থাকলে সকল থেকেও কিছুই থাকে না।
উর্দু নিয়ে গাঁজাখুরি মূর্খতা শুরু হলো। উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই ভাষা ছিল না। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পশতু, বেলুচিস্তানে বেলুচ ভাষা।
দুনিয়ায় কত মুসলিম, কত শত ভাষা। ভাষার আবার ধর্ম কি? উর্দু আবার ইসলামি! শুনলে শরীরে জ্বালা ধরে।
বাংলা পাকিস্তানের শতকরা ৬৬ ভাগ লোকের ভাষা।
নেতা ভুল করলে, ভুল পথে এগোলে জনগণের অধিকার আছে প্রতিবাদ করার। এটাই গণতন্ত্রের রীতি।
জিন্নাহ সাহেব নেতা হতে পারেন। তাই বলে অন্যায় কি চাপিয়ে দিতে পারেন? না, পারেন না। তিনি কী করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করেন! মাথায় ঢোকে না, মানতে পারি না।
দেশটা একের পর এক ভুলের ওপর চলতে লাগল।
দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামাও বাড়লো, খাদ্য সমস্যা দেখা দিল। অতি উৎসাহী সরকারি অফিসাররা গরিবের ওপর জুলুম করে টাকা জোগাড় করে।
আমি এসব শুনে দেখে সহ্য করি কি করে?
কষ্টে গরিব কাঁদে। গরিব মরে। পাকিস্তানের ঘাড়ে দোষ পড়ে।
আমি আর শহীদ সাহেব চেষ্টা করি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করি। কিন্তু সরকার হাঁটে তার উল্টা পথে। সরকার ভালো চোখে দেখে না, সহযোগিতা করে না। উল্টা টিকটিকি লাগায়।
যাবো কোথায়? আমরা বলি কী আর সারিন্দা বাজায় কী।
যিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করলেন, তারই যদি পাকিস্তানে থাকার জায়গা না হয়, তাহলে সে দেশ যাবে কোথায়? শহীদ সাহেবের এই অবস্থা।
পালাবার মানুষ আমি না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করেই যাবো। দেশ ও জীবনের শেষ দেখে নিবো।

১৯৪৮, ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহ সাহেব মারা গেলেন।
নাজিমুদ্দিন বড় লাট, নুরুল আমিন মুখ্যমন্ত্রী হলেন। আর ঠেকায় কে? শহীদ সাহেবকে তাঁরা গণপরিষদ থেকে বের করে দিলেন। এই না হলে খাজা নাজিমুদ্দিন, এই না হলে নুরুল আমিন। ক্ষমতা কাকে বলে। নিচতা কাকে বলে।
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে আমরা ভালোবাসি, এর মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।
পাকিস্তান হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের ওপর উৎপাত শুরু হলো।
চাকরির নিশ্চয়তা নাই, থাকার জায়গা নাই। ছাত্র বাড়ে, কাজ বাড়ে, লোকবল বাড়ে না। এই অবস্থা চলছেই।
এই অবস্থায় আমি এবং ছাত্ররা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে জড়ায়ে যাই। ধর্মঘট হয়।
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে গ্রেফতার হলাম। আন্দোলন চাঙ্গা হলো।
১৯৪৭ সালে যে মুসলিম লীগকে বাংলার মানুষ পাগলের মতো সমর্থন দিলো, সেই দলকে মানুষ দুই-এক বছরের মাথায় ফিরিয়ে দিলো। কেন? কারণ কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অভাব।

১৯৪৯, ২৩ জুন।
আমি জেলে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হলো। মাওলানা ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সেক্রেটারি, আমি জয়েন্ট সেক্রেটারি।
পাকিস্তানের সৃষ্টির পর সংগঠনের সাম্প্রদায়িক নামের দরকার নাই। তা বুঝি। তবে সময় এখনো আসে নাই অসাম্প্রদায়িক নাম ব্যবহার করার।
এরকম ভেবেই আওয়ামী লীগের সাথে মুসলিম শব্দটি যোগ হয়ে গেল।
জেলে বসে এই আমার ভাবনা ছিল।
জেল থেকে মুক্তি পেলাম।
এবার যুদ্ধ শুরু করা যায়, শামসুল হক সাহেবের কথায় এমন ধারণা পাওয়া যায়।
দেশ স্বাধীন হয়েছে, মানুষের দুঃখ কষ্ট কমেনি। বিনাবিচারে রাজনৈতিক কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে।
পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প গড়ে, বাংলায় খাদ্যাভাব বাড়ে।
বাংলার মানুষ কী করছে, কি নিয়ে বাঁচি?
আব্বা ও রেণুর মুখোমুখি হই। মনের কথা তাদের কই।
শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না;
কিন্তু পাকিস্তানের মুসলিম লীগ এই সত্যটিই মানে না।
মুসলিম লীগ ১৪৪ ধারা জারি করে সভা পণ্ড করে। মাওলানা ভাসানী সাহেব হাত তুলে মোনাজাত করেন। সকলেই হাত তুলি। পুলিশ-সেপাইরা হাত তোলে। ভাসানী সাহেব মোনাজাতে বক্তৃতার সব কথা বলে ছাড়েন।
মুসলিম লীগের গুণ্ডারা এতো অন্যায় করে। আমরা এসব মোকাবিলা করি, সাহসের সাথে।
ঢিল মারলে পাটকেল খেতে হবে। যদি একজনকে মারলে ফাঁসি হয়, তাহলে যারা হাজার হাজার লোককে হত্যা করে তাদের কি হবে? তাদের গুলি করেই মারা দরকার।
লিয়াকত আলি খান দেখে যান বাংলার মানুষ কী চায়। আমরা মিছিল করে বাংলার মানুষের মুক্তির গ্লোগান ধরি। পুলিশ হামলা করলো মিছিলে। অনেকেই গ্রেফতার হলো। আমি আহত। মাওলানা সাহেবের নির্দেশ, আমি যেন গ্রেফতার না হই।
গোপন রাজনীতি আমার পছন্দ নয়। বিশ্বাসও নাই গোপন রাজনীতিতে।
লিয়াকত আলী খান জনগণের প্রধানমন্ত্রী না হয়ে একটি দলের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। তিনি গণতন্ত্র মানেন, কিন্তু বিরোধী মত বা সরকারের সমালোচনা সহ্য করবেন না, তা তো হবে না।
কী ব্যাপার, কেন পালিয়ে বেড়াবো? ভাসানী সাহেবের উত্তর, ‘তুমি লাহোর যাও। সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোরে আছেন।’
কৌশল করে অনেক কষ্টে লাহোর পৌঁছলাম।

শীতে আমার প্রাণ যায় যায়। শহীদ সাহেব জিগান আমার কিছু লাগবে কি না। আমি বলি, না লাগবে না। তাঁর পকেটের অবস্থা আমি জানি।
তিনি ঘুরে ঘুরে কম্বল, মোজা, সোয়েটার কিনলেন, মাফলার কিনলেন। আমাকে হোটেলে পৌঁছে কাপড়গুলো আমার হাতে দিলেন। তারপর কাপড়গুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এইগুলা তোমার জন্য।’
এই হলেন শহীদ সাহেব।
আমি উর্দু পারি না। বাংলা আর উর্দু মিলিয়ে খিচুড়ি বলি।
আমি লাহোর ছেড়ে আসি। শহীদ সাহেবকে বিদায় জানাই। বুকটা আমার খা খা করে। আবার কবে দেখা হবে, কে বলতে পারে?
লাহোর থেকে দিল্লি হয়ে কলকাতায় এলাম।
ট্রেনে আমাকে কৌশলে চলতে হয়।
ছদ্মবেশে চলি। কুলির বেশ ধরি, লুঙ্গি কাঁচিয়ে পড়ি। কাঁধে বিছানা, হাতে ব্যাগ।
গোয়েন্দারা আমার ঠিকানা জানে না; ধরতেও পারলো না।
হক সাহেব ও অন্যরা জেলের অত্যাচার সহ্য করেন। আমার মনে শান্তি পাই না। উনাদের কাছে গেলে একটু শান্তি পাবো। জেলেই কি ঢুকে যাবো?
গোপালগঞ্জ পৌঁছে রিকশায় উঠে বসলাম। রিকশাওয়ালা গোপালগঞ্জের। ওকে বিশ্বাস করা যায়। ও কিছু জানতে চায়। ওকে বলা যায়।
রেণু আর ছেলেমেয়েদের জন্য মায়া বেড়ে যায়।
দেশসেবায় নেমেছি। ত্যাগ স্বীকারের ব্রত নিয়েছি। টুঙ্গিপাড়া ছেড়ে যেতে হবে ঢাকায়।
রেণু ঢাকা আসতে চায়। আমার সাথে থাকতে চায়। আমি রাজি হই না। কোথায় উঠবে? কোথায় থাকবে? আত্মীয়¯^জনকে কষ্ট দিতে চাই না।
বাড়ি থেকে রাতে রওনা দিলাম। দিনে রওনা দিলে হাসিনা কাঁদবে। কামাল তো কিছু বুঝে না।
বিদায় বেলায় রেণুর চোখে জল। ওকে নতুন করে কি বলবো? সব তো বলেছি।
ঢাকায় চলে এলাম নানা পথ ঘুরে।
পরদিন দুপুরে খেতে বসব, পুলিশ এসে হাজির আমার ঘরে। বললাম, ‘কী বলবো আপনাদের। আপনাদের পথ চেয়ে বসে আছি।’
মাওলানা ভাসানী সাহেব, শামসুল হক সাহেব এবং আমি।
শামসুল হক সাহেবের অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগলো। তিনি রাত-বিরাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিৎকার করেন। জিকির করেন। সহ্য করা ছাড়া উপায় নাই। সহ্য করে যাই।

লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, নুরুল আমিন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী। অত্যাচারের সীমা ছেড়ে গেছে।

১৯৪৯ সাল।
৩৬৫ দিনের ২০০ দিন রাজবন্দীরা অনশন করে।
মুসলিম লীগ ক্ষমতার মোহে অত্যাচার করে। লিয়াকত আলী খান বাঙালি-পাঞ্জাবি বিভেদ সৃষ্টি করে শাসন করতে চান; যেমনটা করে গেল ব্রিটিশরা।
নুরুল আমিন নামে বাংলার প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতার কলকাঠি আমলারা নাড়ে। নুরুল আমিন কেবল তাদের কথায় ওঠ-বস করেন।
আমরা জেলে। আমাদের নিয়ে কে কথা বলবেন? সোহরাওয়ার্দী সাহেব বিবৃতি দিলেন। খবরের কাগজগুলো তা ছাপালো।
শামসুল হক সাহেবের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেলো। মাওলানা সাহেবের ইত্তেফাক বন্ধ হয়ে গেলো। তিনি মানিক ভাইকে বললেন, ‘পত্রিকাটি তুমিই চালাও।’
১৯৫০ সালের শেষের দিকে মাওলানা সাহেব আর হক সাহেব মুক্তি পেলেন।
কন্তিু মাওলানা সাহেব আবার জেলে ফিরে এলেন।
কারাগারের অন্ধকার কামরায় আমাকে একা রাখা হয়। কেন? কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়ার জন্য। এ যে কী কষ্ট ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ কী বুঝবে!
আমাকে তারা মুক্তি দিল, একই সঙ্গে গ্রেফতার করলো। কতটা বর্বর চিন্তা ওদের ভেতরে কাজ করতে পারে।
অনেক হিন্দু এদেশে যারা মানুষকে মানুষ মনে করে; অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

১৯৫১ সাল। আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
আমি আমার মুক্তি দাবি করে অনশন শুরু করলাম।
সর্বত্র অবিচার চলছেÑ চাকরি, ব্যবসা বাণিজ্যে। এখন বাংলা ভাষার ওপরও অবিচার শুরু হলো।
আমি অনশন করি। কারা কর্তৃপক্ষ আমার নাক দিয়ে জোর করে খাবার ঢোকায়। এরা আমাকে মরতেও দেবে না।
আমার নাকে ঘা হয়ে গেছে। ওজন কমে গেছে।
হার্টের অবস্থা কাহিল। বিছানা থেকে উঠি সে শক্তি নাই। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

১৯৫২, ২১শে ফেব্রæয়ারি। ঢাকায় ভীষণ গোলমাল হলো। ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’।
চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঢাকার কত লোক মারা গেছে? জানা কষ্টকর।
অবস্থা এ রকম কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী এক জায়গায় হলেই শ্লোগান দেয়; ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তায় বের হয় আর শ্লোগান দেয়।
রাজনীতির অপরিণামদর্শিতার ফল। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষার কথা বলে মিস্টার জিন্নার মতো নেতাও বাধা না পেয়ে ফিরে যেতে পারেন নাই। সেখানে খাজা সাহেব এবং তাঁর দলবলের অবস্থা কি হবে? একটা বিশেষ গোষ্ঠী, যারা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করেছে, তারাই তাঁকে জনগণ থেকে যাতে দূরে সরে পড়েন তার বন্দোবস্ত করলো। সাথে সাথে তাঁর সমর্থক নূরুল আমিন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
আমার চোখের সামনে রেণুর মুখ ভেসে ওঠে। রেণুর দশা কি হবে? তার তো দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোট ছেলেমেয়ে দুইটার অবস্থাই বা কি হবে? ছেলেমেয়ে দুইটাকে একবার দেখতেও পেলাম না। আর দুই-একদিন বাঁচলে বাঁচতেও পারি।
ডাক্তার এসে বলেন, ‘আপনাকে মুক্তি দিলে যাবেন তো?’
মুক্তি দিলে যাব, না দিলে যাব না। তবে আমার লাশ মুক্তি পেয়ে যাবে।
জেলার মুক্তির আদেশ পড়ে শোনান। আমি বিশ্বাস করতে চাইলাম না। এর আগে এরকম প্রহসন তো তারা করেছে।
একজন নিঃস্বার্থ দেশকর্মী, ত্যাগী নেতা শামসুল হক সাহেব আজ দেশের কাজ করতে গিয়ে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে পাগল হয়ে বের হলেন। এ দুঃখের কথা কোথায় বলবো? যিনি পাকিস্তান আন্দোলন করলেন তিনিই পাকিস্তানের জেলে পাগল হলেন! শত চেষ্টা করেও শামসুল হক সাহেবের চিকিৎসা করাতে পারলাম না।
নির্বাচনে দাঁড়ালাম। গরিব মানুষ দোয়া করে, সাহায্যও করে, যে যা পারে। আমি ওয়াদা করি মনে মনে, গরিব মানুষেরে ধোঁকা দেবো না জীবনে।
রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার কেন? ধোঁকাবাজ ফাঁকিবাজ বড় বড় মোল্লারা ফতোয়া দিয়েই যায় এক এক করে। আমাকে ভোট দিলে ইসলাম যাবে! আরও কত কী বলে। যতসব তুঘলকি কাণ্ড।
দুনিয়ায় মুসলিম লীগের মতো কোনো ক্ষমতাসীন দল এভাবে পরাজয় বরণ করে নাই।
যুগ যুগ ধরে পুঁজিপতিরা তাদের শ্রেণিস্বার্থে রাজনৈতিক কারণে গরিব শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধায় আর ফায়দা লুটে নেয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে কে প্রতিবাদ করে? কেউ সাহস পায়, কেউ ভয়ে কেটে পড়ে।
আমাকে আবার জেলে নেওয়া হচ্ছে। একটা কথা বলে যাই আমার কর্মী সমর্থকদের উদ্দেশে, এই অন্যায় আদেশ নীরবে মেনে নেবেন না আপনারা। প্রকাশ্যে এর বাধা দেবেন। দেশবাসী প্রস্তুত আছে। শুধু নেতৃত্ব দিতে হবে আপনাদের। জেলে অনেকের যেতে হবে। তবে প্রতিবাদ করে জেল খাটাই উচিত।
রেণুকে কি বলবো?
পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে, কর্মীরা কাঁদে। আমি বলি, কেন কাঁদছিস? এই তো আমার পথ। একদিন তো বের হব আমি।
ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার সহকর্মীরা কে কোথায়?
আমি বলি, জানলেও বলবো না।
ওঁদের মনে কী করে আশা জাগে, আমি ওঁদের সব বলে দিব!
আমি জেলে, বিবৃতি দেওয়ার কেউ নাই। ভাসানী সাহেব বিলাতে। শহীদ সাহেব জুরিখ হাসপাতালে।
জনতা জেলখানা আক্রমণ করে। জেলারদের বাড়ি ঘেরাও করে। খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে তাদের নিবৃত্ত করে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে কোথায় বাহবা পাবো, উল্টো মামলা খাই।
এই অবস্থা পাকিস্তানের হলে আমরা কোথায় যাই! পালাবো? শেখ মুজিব পালাবার মানুষ নয়।
জেলাররা কেন জেলের বাইরে এসে গুলি করবে? সেই গুলিতে নিরীহ মানুষ কেন মরবে?
মামলা চলে আর চলে। সাক্ষী তো মেলে না।
যে করে চুরি সে যেন সাধু। আর যে ঠেকায় চুরি তার সাথে ঝাড়িঝুড়ি বাহাদুরি। ক্ষমতার দাপটে জেলে পুড়ি। এরকম হলে প্রশাসনের খেতাপুড়ি।
সরকারের টিকটিকি আমার চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। বন্ড নেবার ধান্দায় পায়চারি করে। দরকার হলে সরকারকেই বন্ড দিতে বলে দেবেন। বিনা বিচারে কাউকে যেন জেলে আটকে না রাখেন।
না বুঝে, জনগণের সাথে কথা না বলে, নেতা যখন নিজের গুরুত্ব হারাবে, তখন কি করবো? মন খারাপ করা ছাড়া, ক্ষেপে যাওয়া ছাড়া কি উপায় আছে আমার?
শহীদ সাহেব জার্মানি থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে আইনমন্ত্রী হয়ে গেলেন! আমি তাঁর সাথে যোগাযোগ করব না। তাঁকে টেলিগ্রামও করব না। আমার প্রয়োজন নাই।
ষড়যন্ত্রকারী ষড়যন্ত্রের ধারাপাতে লাভের কয়েন গোণে।
আমার কপালে জেল। জেলে ঢুকি আর বের হই। কোথায় পরিবার-পরিজন, আত্মীয়? সঙ্গী সন্তান ভাই বোন বাবা মা?
এর নামও জীবন। জেলখানা আমার জন্য হয়েছে তীর্থভূমি। বের হই আর ঢুকি।
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা তারা বাংলার নামটাও পাল্টাবার চায়। কিন্তু কেন? তারা বাঙালির নামটাও ভুলিয়ে দেবার চায়। শুধু থাকবে মাটি। তা-ই তাদের ইচ্ছা। বাংলা নিয়ে তাদের যত ভয়। যদি বলি পাঞ্জাবি ইসলাম যায় না? যদি বলি সিন্ধি ইসলাম যায় না? যদি বলি বাঙালি, শুধু তাতইে কি ইসলাম থাকে না?
বাঙালি শুনেই ওদের গায়ে জ্বালা ধরে। বিশ্বাসের কোনো আগা-মাথা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। কিন্তু ভাষা সংস্কৃতি জাতীয়তা অত সহজ ব্যাপার নয়। আমি বললাম, আমাদের দেশ বাংলা, আমাদের বাংলা নামেই ডাকুন। তারা মানলো না। তারা শুনলো না।
এভাবে তো চলে না।
পাকিস্তানের রাজনীতি সামরিক, বেরসামরিক আমলাদেগর পেটে ঢুকে গেল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নানা দেশে জাতীয় নেতৃত্ব সংহত হলো। আর আমাদেরও কপাল!

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে পুলিশ গুলি ছুড়ে অকারণে। ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আমরা জিতলাম। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে শহীদ সাহেবকে ফজলুল হক সাহেবকে কাজ করতে দিলো না। যুক্তফ্রন্ট সরকারকে টিকতে দিলো না।
পাকিস্তান সংবিধান পেল। উর্দুর সাথে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হলো।
হায়রে বাঙালির কপাল, আমাদের সাধের পাকিস্তানে কমিউনিজম নিষিদ্ধ? আমাদের কবিগুরু রবিঠাকুরও নিষিদ্ধ?
আসল কথা ওরা বাঙালিকে দাবায়ে রাখতে চায়। দাবাতে দাবাতেই জেনারেল আইয়ুব খান মার্শাল ল দিয়ে দিলেন। পাকিস্তানের ক্ষমতা নিয়ে নিলেন। বাকি থাকল কি? গেটের দারোয়ান যেন বন্দুকের জোরে বাসার অন্দরে ঢুকে পড়ে।
দেশে দেশে প্রগতিশীল সমাজবাদী রাজনীতির বিকাশ ঘটছে। নেতৃত্বের অগ্রযাত্রায় আমাদের মনেও আশা জাগে।
শহীদ সাহেব পরপারে চলে গেলেন! ভাসানী সাহেবও চলে গেলেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে! আমি বড্ড একা হয়ে পড়ি।
শহীদ সাহেব ছাড়া কোনো নেতা বাঙালির হৃদস্পন্দন বুঝতে পারেন নাই। আমি শহীদ সাহেবের কাছ থেকে শিখেছি। তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে যাবো দেখি ঠেকায় কে? সৎ পথে থাকিব, জীবনটাই বাজি রাখলাম। হারি জিতি নাহি লাজ।
আমি আশা দেখি, স্বপ্ন দেখি। উদ্যম তারুণ্য আমাকে স্বাধীন বাংলার মুক্ত বাংলার আশা জাগায়। আমি গুনগুন করে গাই, আমরা করবো জয় একদিন।
আমার দৃঢ়তায় শাসকগোষ্ঠী পেরে ওঠে না। আমরা মানুষের সমর্থন পেতে লাগলাম। জেলখানা আমার জন্য দ্বিতীয় বাসভূমি।
মানুষ ক্ষেপে যায়, আন্দোলন করে
মারো লাথি ভাঙো তালা
যতসব বন্দীশালা।

বাঙালির ছয়দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ছাত্রদের এগার দফা এসব তো আর কিছু না, মানুষের মুক্তির এক একটি ধাপ।
পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা বেছে নিল হামলা, মামলা ষড়যন্ত্র। জেনারেলরা ক্ষমতার কুমির। তাঁরা সবকিছুতে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজেন। সুগন্ধ ওদের নাকে ঢুকে না। ভালো কথা ওদের কানে যায় না। শুভবুদ্ধি ওদের মগজে নাই।
আমি তো জেলে। মেয়ে বড় হয়। মেয়ের বিয়েও হয়। জেলেই আসে দেখা করতে মেয়ে আর মেয়ের জামাই। কী দেবো ওদের? কী দিয়ে আশীর্বাদ করবো? জামাইকে হাতের ঘড়িটাই খুলে দিলাম। মেয়ে হাচিনাকে দোয়া করলাম।
মামলা চলে। আমার জন্য কে কথা বলবে? ভাসানী ছাড়া আর কে আছেন? কেউ নেই। সাংবাদিক কেউ তো আসে না। ভয় আর ভয়।
বিচার চলে, শুনানি চলে।
আমাকে চেনে না এমন ভাব করে ফয়েজ। আমি বলি, ফয়েজ, বাংলায় থাকতে হলে শেখ মুজিবকে চিনতে হবে।
লাভই হলো। জেনারেলরা বুঝে গেল ফয়েজ আহমেদ আমাকে চেনে না। ফয়েজ এই সুযোগে একের পর এক রিপোর্ট করে গেল।
এই বিপদে কে পারে? কে উদ্ধার করে আমারে? কার এমন সাহস, হিম্মত আছে? মাওলানা ভাসানী যদি কিছু একটা করেন।

ভাসানী পল্টনে জনসভা করে বলে দিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেল সাহেবরা, শেখ মুজিবসহ সকল বন্দীকে মুক্তি দিন। তারপর দয়া করে আমাদের ওয়ালাইকুম আচ্ছালাম নিন।

১৯৬৯। গণআন্দোলন হলো, মুক্তি পেলাম।
তারপর এক জেনারেল গেলেন, আরেক জেনরেল এলেন।

নির্বাচন হলো। আমার দল আওয়ামী লীগ ও আমি জয় পেলাম।
ওরা কথা শুনে না। ক্ষমতা ছাড়ে না। ক্ষমতা ওদের রোগ। ওরা ক্ষমতার রোগে পঙ্গু। কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, ওরা এসব মানে না। ভালো পথে চলতে জানে না। একের পর এক বাহানা। গোল্লায় গেছে ওদের বিবেক।
তারপর?
দেশকে অন্ধকারে ঠেলে, গোলাবারুদ আর অস্ত্র ঢেলে পাকিস্তানী মিলিটারি শহরের মানুষের ওপর গুলি চালায়। সারা দুনিয়া এসব খবর জানে। কিন্তু ওদের লজ্জা নেই, বিবেক নেই।

আমাকে গ্রেফতার করা হয়। আমি মুক্তি পাই। আবার আমি জেলে! বোঝা মুশকিল, আমি জেলে ঢুকছি না বের হচ্ছি। তাই ব্যাগ আমার গোছানোই থাকে। রেণু জানে, হাসনিা জানে, আমার দেশের মানুষেরা জানে।

৭ মার্চ এসে গেল।
আগে কথা হলো, কি বলি?
মিটিং হলো, শলাপরামর্শ হলো।
স্বাধীনতার ঘোষণা দেব কী দেব না। দিলে কি হবে? না দিলে কি হবে? দিলেও কিভাবে দিব? না দিলেও জনতাকে শান্ত করবো কি করে? আমি কী করি।

রেণু বলে কে কি বললো, কে কি ভাবলো, তার চেয়ে বড় কথা তুমি সবকিছু জানো। দেশের মানুষকে জানো এবং বোঝ। সেইভাবে উপস্থিত বুদ্ধিতে যা মুখ দিয়ে বের হয়, তাই বলে এসো।
তারপর রেসকোর্স ময়দান
এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে আমি ইপিআরের ওয়ারলেসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিলাম। এরপর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করে।
আমার ঘনিষ্ঠরা সবকিছু জানে কিভাবে কি করতে হবে। তাজউদ্দীনকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। কোথায় কার সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
তাজউদ্দীন ইন্দিরাজির সাথে দেখা করতে পারলে অনেক কাজ হয়ে যাবে। তাজউদ্দীনকে গ্রেফতার করে ফেললে ভারি বিপদ হবে।
আমি ধরা দিয়েছি বুদ্ধি করে। আমি পালিয়ে গেলে নানা অপপ্রচার ছড়িয়ে দিতে পারে পাকিস্তানি সেনারা। আর আমার খোঁজে পুরো দেশ ছাড়খার করে দিতে পারে। এর সবকিছু আর কেউ না জানলেও রেণু জানে।
তাজউদ্দীনের সাথে ইন্দিরাজির কথা হলে অনেক পরিকল্পনা সহজ হয়ে যাবে।
অন্য দেশের সাহায্য, কূটনীতি বড় বেশি দরকার। ইন্দিরাজি পারবেন সে দিকটা সামাল দিতে।
ভয় আমেরিকা আর চীনকে নিয়ে। ভরসা ইন্দিরাজি আর রাশিয়া। মার্কিন আর চীনের চাপ সামাল দিতে পারবে, সে বিশ্বাস আমার বাঙালির ওপর আছে। আমাকে মেরে ফেললেও বাঙালি স্বদেশকে শত্রুমুক্ত করে ছাড়বেই। ৭ মার্চ আর ২৬ শে মার্চে সে নির্দেশনা দিয়েছি। তারপর মরলেও শান্তি।

রেণুর কথা আজ খুব মনে পড়ে। হাসিনা আজ কি করে?
রেহানা, কামাল, জামাল, রাসেল– ওরা কি বেঁচে আছে?
ওরা কি নিরাপদ?
হাসিনার বাচ্চাটা কি ঠিক মতো হলো? ওর ছেলে হলো না মেয়ে হলো? ওয়াজেদই বা এখন কোথায়?
আমি আজ জেলে। কোনো খবর নাই। দেশের খবর নাই। কারো খবর নাই আমার কাছে।
আজ অনেকের মুখ মনে পড়ে। শহীদ সাহেবের কথা মনে পড়ে। আব্বার কথা মনে পড়ে। মায়ের মুখটা মনে পড়ে। শামসুল হক সাহেব তো এক রকম জেল থেকে বের হলেন পাগল হয়ে। ভাসানী সাহেব কেমন আছেন? কোথায় আছেন? কে জানে!
তাজউদ্দীন কি সরকার গঠন করতে পারলো? যুদ্ধে কি পাকিস্তানি সেনারা জিতে যাবে? না! তা হতে পারে না।
দেশটা স্বাধীন হলেই শান্তি; শত্রুমুক্ত হলেই শান্তি।
কবিগুরু রবিঠাকুর মহাত্মাজি তিতুমীর হাজি শরীয়তুল্লাহ আজ আপনারা দেখুন, স্বর্গ থেকে দেখে যান– বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনারা শত্রুতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুনিয়ার মানুষ কি সব খবর জানে? জানতে পারে?
বাঙালি যখন মরতে শিখেছে
কেউ তাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

বাঙালির জয় হবেই। ইনশাআল্লাহ!

আমি জেলে। নানা কথা। নানা বিষয়। নানা লোভ। নানা ভয়। নানা হুমকি। ওরা পারে নাই, পারে নাই। বাঙালির ওপর বিশ্বাস আমি হারাই নাই।
জেলের ভেতর কবর খুঁড়ে কত ফন্দি ফিকির করে পাকিস্তানিরা।
দেশের কোনো খবর আমি পাই না। কিছুই জানি না।
জেনারেল আসেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো আসেন। তখন বুঝি ওদের ব্যাটে-বলে মিলেনি। ওরা পারেনি।
ওরা বোঝাপড়া করতে চায়। বদলাতে চায়। একসাথে থাকতে চায়।
আমি বলি, আজ কোনো কথা নয়। আগে দেশে যাবো, আমার মানুষের সাথে কথা বলবো। তারপরে বলবো আমরা এক সাথে থাকবো কি থাকবো না।
পাকিস্তান থেকে লন্ডন
লন্ডন থেকে দিল্লি
দিল্লী থেকে ঢাকা
বাংলাদেশ স্বাধীন।
বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স লোকে লোকারণ্য।

আমরা চেষ্টা করি স্বাধীন বাংলাদেশে ঘুরে দাঁড়াতে। কিন্তু ওদের ষড়যন্ত্র থামে না, খায়েশ মেটে না। আমেরিকা, পাকিস্তান, চীন– বড় শক্তিগুলো আমাদের ভালোটা মেনে নেয় না। আমরা ভালো থাকি চায় না। চারদিকে ষড়যন্ত্র, শত্রুতা।
বিপদের পূর্বাভাস।
আমি জানি, রেণু বোঝে, আমার ঘনিষ্ঠরা বোঝে। আমি বুঝেও না বোঝার ভান করি।
মোস্তাক আসে বন্ধু হয়ে ছায়া হয়ে, অতি ভক্তি চোর যেমন করে।
আমাদের সার্বভৌমত্ব কারো সহ্য হয় না। আমরা ভালো থাকি, ওরা চায় না। আমেরিকা খাদ্য দেবে বলে দিলো না। জাহাজ ফেরৎ নিয়ে গেল।
বাসন্তীকে জাল পরিয়ে ছবি ছাপিয়ে দুনিয়াকে দেখালো।
যাবো কোথায়?
রাজাকার, মীরজাফর, গোলাম আযম
এদের বিশ্বাস করা দায়। বিশ্বাস না করেই যাবো কোথায়?
আমরা চাই ভালো থাকতে, বন্ধুত্ব করতে। শত্রুতা নয় কারো সাথে।
আলেন্দের চিলি আর শেখ মুজিবের বাংলাদেশ। অবাক মিল।
জাতিসংঘে আমি বাংলাতেই বক্তৃতা করি। বিশ্ব জানুক বাংলাদেশ ভাষাভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র।
আপনারা সবকিছু জানেন এবং বোঝেন…


শেষ বেলায়।
১৯৭৫।
আমরা চাই বন্ধুতা, ওরা করে চালাকি।
আমার দেশে খাদ্য দরকার, ওদের খাদ্য আছে। মানুষের জীবন নিয়েও চালাকি। আমরা ওদের শয়তানি ভুলে গিয়ে শান্তি চেয়েছি। এক সাথে চলবো ঠিক করেছি।
আমেরিকা খাদ্যশস্য পাঠাবে। কিন্তু সমুদ্র বন্দরে খাদ্যবাহী জাহাজ নোঙর না করে মাঝপথ থেকে ফেরত নিয়ে গেল তারা। তাতে কার লাভ হলো? ওদের? ওরা এরকমই চেয়েছিল।
মানুষ না খেয়ে মারা গেল। দুনিয়ার মানুষ জানলো শেখ মুজিবের স্বাধীন দেশে মানুষ না খেয়ে মরে।

সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে চাইলাম আমি। এরকম এক ব্যবস্থা চালু করতে হবেÑ কেউ আমাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে, সে সুযোগ পাবে না।
গরিব যাতে না খেয়ে মারা না যায়
আমাদের দেশ সকল মত পথ ধর্ম বর্ণ ও গোত্রের
শ্রমিক, কৃষক সকল পেশাজীবী মানুষের জন্য
এক সমাজবাদী ব্যবস্থার নাম আমাদের বাকশাল।

১৯৭১-এ দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে নাই। একদল লোক আমাদের পেছনে লেগে আছেÑ আমাদের দুর্নাম করে ছাড়বে। আমাদের চোখে-মুখে চুনকালি মাখাবে, তারপর নিস্তার পাবে। মনে একটুও স্বস্তি নাই।

আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে যাবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশে বক্তৃতা করবো।
জীবনে বহু বক্তৃতা করেছিÑ হাটে, ঘাটে, জাহাজে, নৌকায়, ট্রাকে, বাসে, মাঠে জনসমুদ্রে। আচার্য হিসেবে এই প্রথম।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কত স্মৃতি, কত মিছিল; আন্দোলন অনশন গ্রেফতার হুলিয়া। কত কী!
এখন বাস্তবতা ভিন্ন।
ব্রিটিশদের খেদালাম। পাকিস্তানিদের তাড়ালাম। এখন স্বাধীন বাংলাদেশ। আমি স্বাধীন দেশের হতভাগ্য মানুষের নেতা, তাদের রাষ্ট্রপতি।
রবিঠাকুর বলে গেছেন,
সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি।
এখন আমাদেরও মানুষ হবার পালা। শান্তি স্বস্তি সুস্থ জীবনের পথে আমাদের চলা। ঠিক বলিনি, রেণু?
‘রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো’ রেণু বললো।
তা ঠিক।

এই কে? কে গুলি করে এখানে?
সেনাপতি শফিউল্লাহ তুমি কোথায়? তোমার সেনারা আমার বাড়িতে গুলি ছুড়ছে।
আমাকে কোনোভাবে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বললো সেনাপতি শফিউল্লাহ্।
এই, শেখ মুজিব কি পালাবার মানুষ? পালাবার জন্য কি দেশ স্বাধীন করেছি?
তোদের সাথে আমাকে যেতে বলছিস কেন? তোরা কি চাস?
কামাল জামালকে মেরেছিস কেন? জবাব দে!
সাবধান! আর একটা গুলি করবি না!
এই তোরা থাম, থাম বলছি!
তোরা আমার সাথে বেয়াদবি করিস! তোরা আমার দিকেও বন্দুক তাক করছিস? তোরা এতো বেয়াদব!
এই জন্যই কি দেশটারে স্বাধীন করেছিলাম?

[ বঙ্গবন্ধুর শরীরে গুলি লাগে। তিনি লুটিয়ে পড়েন। মহাজীবনে প্রবশে করতে করতে তিনি অস্ফূট কণ্ঠে উচ্চারণ করেন ]
হে আল্লাহ, হে মাবুদ, হে আমার প্রভু! তুমি বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশকে চরিকাল হেফাজত করো।
জয় বাংলা।

গ্রন্থপঞ্জি
অসমাপ্ত আত্মজীবনী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
মধ্যরাতের অশ্বারোহী (অখণ্ড), ফয়েজ আহমদ, অনন্যা
শেখ মুজিব আমার পিতা, শেখ হাসিনা, আগামী প্রকাশনী
দেয়াল, হুমায়ূন আহমেদ, অন্যপ্রকাশ
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, প্রাথমিক তথ্যবিবরণী থেকে চূড়ান্ত রায়, স্বপন দাশগুপ্ত সম্পাদিত, মাওলা ব্রাদার্স
রক্তঝরা নভেম্বর ১৯৭৫, নির্মলেন্দু গুণ, বিভাস প্রকাশনা
আমার পিতা, বদরুদ্দীন উমর, শ্রাবণ প্রকাশনী
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরী, ১৯৪৭-৪৮ প্রথম খণ্ড, প্রতিভাস প্রকাশনী
তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা, শারমিন আহমদ, ঐতিহ্য
১০ মূলধারা ৭১, মঈদুল হাসান, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Muhammad Samad — আগস্ট ১৫, ২০১৬ @ ৯:৪৪ পূর্বাহ্ন

      This is valuable write-up. I deeply appreciate our promising poet-writer Anisur Rahman.

      Dr. Muhammad Samad
      Professor
      Dhaka University

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ishtiak — আগস্ট ১৬, ২০১৬ @ ৪:৫৩ অপরাহ্ন

      Sorry I dont have bengali front to write.

      After reading this, it is hard to express my views in English. I never read books, not even my academic book, I used googled and use other sources.
      I dont even know what is this, an article? Blog? Documentary?
      But Sir U just made my day.I was emotionally attached with this writing. Respect Sir.
      Sheikh Mujibur Rahman once said to the delegation of KSA, – ” the only difference between you and me is you are a Rich Sheikh”. But if he was alive I would say to him that no one would be richer then the Bangabandhu. I wish I would seen him. May Allah keep him to Jannat.
      Thanks Mr Anis Sir

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com