গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ৯ আগস্ট ২০১৬ ১২:০১ পূর্বাহ্ন

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩৮
এক ভুল ধরে অবাক করে দেয়ার আগ পর্যন্ত সারাদিনভর এইসব শোনার ধৈর্য ছিল আউরেলিয়ান সেগুন্দোর। ফের্নান্দা পাত্তা দেয় না ওকে, কিন্তু গলার স্বর নীচু করে। সেই রাতে খাবার সময় আত্মকথনের কান ধাপা লাগানো গুনগুনানি ছাপিয়ে যায় বৃষ্টির শব্দকেও। মাথা নীচু করে খুব কম খেয়ে আগেভাগেই শোবার ঘরে চলে যায় আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। পরের সকালে নাস্তার সময় ফের্নান্দার গা কাঁপছিল, যেন রাতে ভাল ঘুম হয় নি। ওর মনে হচ্ছিল ভেতর থেকে সমস্ত বিদ্বেষ বের করে দিয়ে এখন সে সম্পূর্ন মুক্ত। তারপরও যখন স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করে যে খাবার জন্য একটা কুসুমসিদ্ধ ডিম দেয়া যায় কিনা, গত সপ্তাহ থেকেই ডিম ফুরিয়ে গেছে– এই উত্তর সহজভাবে না দিয়ে; যেসব পুরুষরা নিজেদের নাভীতে তেল দিয়ে বসে বসে সময় কাটায় আর পরে খাবার টেবিলে ভরত পাখীর যকৃত চায় তাদের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় গালমন্দ করতে থাকে। বরাবরের মতই আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বাচ্চাদের নিয়ে যায় বিশ্বকোষ দেখাতে আর ফের্নান্দা ভান করে মেমের শোবার ঘর গোছানোর। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো তার বিরবিরানি শুনতে পায়; নির্লজ্জ না হলে এই নিস্পাপ শিশুদেরকে বিশ্বকোষের মধ্যে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ছবি দেখাতে পারত না। বিকেলে যখন শিশুরা সিয়েস্তা নিচ্ছিল আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বারান্দায় গিয়ে বসলে ফের্নান্দা তাকে উত্তেজিত করার লক্ষ্যে অনুসরন করে, জ্বালিয়ে মারে ভনভনে মাছির মত, ওর চারপাশে ঘুরতে থাকে, বলতে থাকে যখন পাথর ছাড়া বাড়িতে খাওয়ার জন্য কিছুই নেই তখন তার কর্তা পারস্যের সুলতানের মত বসে আছে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়, কারণ হচ্ছে সে এক অপদার্থ, এক পরগাছা, নিষ্কর্মার ঢেঁকি, গালে ঘষার পাউডারের পাফের চেয়ে নরম তুলতুলে ননীর পুতুল, মেয়েদের উপর নির্ভর করে জীবন কাটিয়ে দেয়, আর মনে করে সে হোনাস-এর বউকে বিয়ে করেছে যে নাকি তিমির গল্প শুনে নিশ্চিন্ত হয়েছিল। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো দুঘন্টা যাবৎ শুনে যায়, ভাবলেশহীন, যেন সে বধির, শেষ বিকেল পর্যন্ত যখন ঢাকের আওয়াজের প্রতিধ্বনির মত মাথা পাগলকরা শব্দগুলোকে আর সহ্য করতে পারে না।
-“দয়া করে চুপ কর” –অনুনয় করে।
ফের্নান্দা উল্টো গলা চড়ায়। “আমার চুপ করার কোন কারণই নেই”-বলে “যে শুনতে চায়না, সে দূর হয়ে গেলেই পারে।” ফলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। তাড়াহুড়ো না করে উঠে দাঁড়ায় সে যেন আড়মোড়া ভাঙবে, আর এই সম্পূর্ণ সংযত ও নিয়মবদ্ধ ক্রোধের সঙ্গে একের পর এক বেগনিয়া, ফার্ন, অরেগানোর টবগুলো তুলে মেঝের উপর আছড়ে ফেলে ভাঙতে থাকে। চমকে উঠে ফের্নান্দা। আসলে এপর্যন্ত বিড়বিড়ানিতে উৎপন্ন নিজের ভিতরের প্রচন্ড ক্ষমতার কথা সমন্ধে তার সঠিক কোন ধারণা ছিল না; কিন্তু তখন কোন সম্ভাব্য সংশোধনের চেষ্টা করার জন্য অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। কোন ভার লাঘবের অরোধ্য স্রোতে মাতাল হয়ে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ভাঙে শোকেসের কৃষ্টালের সেট কোন তাড়াহুড়ো না করে;বাসন কোসনের সেটটা থেকে একটার পর একটা বের করে মেঝেতে আছড়ে ফেলে ধুলোয় গুড়িয়ে দেয় সেগুলো, সুশৃংখলভাবে, শান্ত অবস্থা্‌, যে রকম ধীরে সুস্থে সে বাড়িটাকে টাকার নোট দিয়ে মুড়ে দিয়েছিল সেই একইভাবে ভাঙে বোহেমিয় ক্রিস্টালের সেট দেয়ালে ছুড়ে ছুড়ে, ভাঙে হাতে অংকিত ফুলদানি, নৌকায় বসা ফুল হাতে কুমারীদের চিত্রকর্ম, সোনার গিল্টি করা ফ্রেমওলা আয়নাগুলো, ভাঙে বৈঠকখানা থেকে শুরু করে ভাড়ার ঘর পর্যন্ত যতকিছু ভাঙা সম্ভব, ইতি টানে রান্নাঘরের পানি রাখার বিশাল মাটির পাত্রটা দিয়ে যেটা উঠানের মাঝখানে আছড়ে ফেলায় বোমাফাটার আওযাজ হয়। এরপর হাত ধোয়, মোমদেয়া লিনেনের কাপড়টা গায়ে চড়ায়, আর মধ্যরাতের আগে ফিরে আসে হাতে লবনদেয়া শক্ত কিছু মাংসের ছড়া, কয়েক বস্তা গুবড়ে পোকাওয়ালা চাল ও ভুট্টা, আর শুকিয়ে যাওয়া কলার ছড়া নিয়ে। এরপর থেকে ঘরে আর খাবারের অভাব পরে না।
আমারান্তা উরসুলা ও ছোট্ট আউরেলিয়ানোর স্মৃতিতে বৃষ্টির যুগটা সুখস্মৃতি হিসেবেই থাকে। ফের্নান্দার কড়াকড়ি সত্ত্বেও ওরা উঠোনে জমা পানিতে হুটোপুটি করত, টিকটিকি ধরে টুকরো টুকরো করত, আর সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের অসর্কতায় প্রজাপতির পাখনার ধুলো স্যুপের মধ্যে ফেলে মিথ্যেমিথ্যি বিষাক্ত করার খেলা খেলত। ওদের সবচেয়ে মজার খেলনা ছিল উরসুলা। সে ছিল ওদের কাছে ভাঙাচোড়া বিশাল এক পুতুল যেটাকে ওরা এক কোনা থেকে আরেক কোনায় নিয়ে বেড়াতো রঙিন কাপড়চোপড় পরিয়ে, মুখে ভুষোর কালি ও আসাতো গাছের ফলের লাল বীজের গুড়োর মুখোশ এঁকে, আর একবারতো প্রায় গাছকাটার কেচি দিয়ে চোখ দুটোই উপরে ফেলেছিল; একইভাবে যেভাবে ব্যাঙ ধরে ওগুলোর চোখ উপরাতো। তার আবোলতাবোল বকবকানি ওদের যে আনন্দ দিত সেরকম আনন্দ ওরা আর কিছুতেই পেত না। সত্যি সত্যিই বৃষ্টির সময়ের তৃতীয় বছরে তার মাথার মধ্যে কিছু একটা ঘটে থাকবে, কারণ ধীরে ধীরে সে হারিয়ে ফেলে বাস্তবতা, গুলিয়ে ফেলে তার জীবনের সুদূর অতীত ও বহমান সময়কে এমনভাবে যে একবারতো তার পরদাদী পেত্রনিলা ইগুয়ারান-এর মৃত্যু শোকে টানা তিনদিন বাঁধভাঙা কান্নায় কাটায়, যাকে গোর দেয়া হয়েছে শতবছর আগে। বিভ্রান্তির এমন গভীর অবস্থার সুদূরে যায় সে যে সে মনে করত ছোট্ট আউরেলিয়ানো হচ্ছে তার কর্নেল ছেলে যাকে সেই সময় বরফ চেনাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর হোসে আর্কাদিও, যে তখন সেমিনারিতে লেখাপড়া করছে সে হচ্ছে জিপসীদের সঙ্গে উধাও হওয়া বড় ছেলে। পবিবার নিয়ে সে এত কথা বলে যে বাচ্চারা এমনসব লোকজনদের সঙ্গে কাল্পনিক সাক্ষাতের কথা ভাবতে শিখে যে সব লোক যে শুধুমাত্র অনেক আগে মারা গিয়েছে তাই-ই নয়, তারা জীবন যাপন করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ে। ছাইয়ে ভর্তি চুল ও এক লাল রুমালে বাঁধা মুখ নিয়ে কাল্পনিক আত্মীয়জনদের মাঝে আনন্দে বসে থাকে উরসুলা যাদের কথা সে সমস্ত খুঁটিনাটিসমেত বাচ্চাদের মুখে শুনেছে, যেন সত্যি সত্যি ওদের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছে। উরসুলা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে এমন সব বিষয় নিয়ে কথা বলে যা কিনা তার নিজের জন্মের আগে ঘটেছে, তাদের কাছে যে সমস্ত খবর সে পেত তা উপভোগ করত, আর যে সমস্ত আত্মীয়ের মৃত্যু হয়েছে হাল আমলে তাদের নিয়ে কান্নাকাটি করে ঐসব আত্মীয়দের সঙ্গে। এই ধরনের ভুতুরে সাক্ষাতের সময় উরসুলা সবসময়ই জানার জন্য প্রশ্ন করত কে যুদ্ধের সময় সেন্ট জোসেফের প্রমাণ আকারের প্লাষ্টারের মূর্তিটি নিয়ে গিয়ে বৃষ্টি না ধরা পর্যন্ত জিম্মা রেখেছিল, আর এটা বুঝতে শিশুদের বেশী সময় লাগে না। এভাবেই আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর মনে পড়ে যায় যে একমাত্র উরসুলাই চেনে সেই মাটি চাপা দেয়া সম্পদের অবস্থান কিন্তু এসমন্ধে করা সমস্ত প্রশ্ন ও কারসাজিই বিফল হয়, কারণ মনে হতো যে খ্যাপামির মধ্যেও গোপন কথাটা ফাঁস না করার মত সুস্থতা সে বজায় রাখতে পেরেছে আর সে কথাটা একমাত্র তাকেই বলবে যে প্রমাণ করতে পারবে যে সে-ই চাপা দেয়া সোনার প্রকৃত মালিক। সে এতই চালাক ও কঠোর ছিল এ ব্যাপারে যে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো যখন তার আনন্দোৎসবের এক সঙ্গীকে সম্পদের মালিক সাজিয়ে তার কাছে পাঠায় তখন সে সুক্ষ্ন সব প্রশ্নের জালে লোকটাকে জড়িয়ে ফেলে, আর পাতা ফাঁদটাকে ধরে ফেলে। উরসুলা গোপনীয়তাকে সঙ্গে নিয়ে গোরে যাবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে সে উঠান ও উঠানের পিছনে জমা পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা কাটার ছুঁতোয় এক দল লোক ভাড়া করে। আর নিজে নেমে পরে মেটাল ডিটেক্টর ও লোহার শিক দিয়ে মাটির নীচে খোঁজার কাজে। কিন্তু তিন মাসের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার পরও সোনার কোনো লক্ষনই মেলে না। তাসের মাটি খোড়ার লোকদের চেয়েও ভাল দেখতে পারে এই আশায় পিলার তেরনেরার শরণাপন্ন হয় সে কিন্তু পিলার বলতে শুরু করে যে উরসুলা নিজে তাস কেটে না দিলে যে কোন প্রচেষ্টাই বিফল হবে। অন্যদিকে পিলার গুপ্তধনের অস্তিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত করে পুংখানুপুংখ জানায় যে সাত হাজার দুশ চৌদ্দটি স্বর্ণমূদ্রা ক্যানভাসের থলের মধ্যে তামার তার দিয়ে শক্ত করে প্যাঁচানো, আর তা পোঁতা আছে উরসুলার বিছানাকে কেন্দ্র করে একশত বিশ মিটারের ব্যাসার্ধের একটি বৃত্তের মধ্যে। কিন্তু তাকে সতর্ক করে দেয় যে বৃষ্টি থেমে পরপর তিন তিনটি জুন সমস্ত কাদাকে ধুলোয় পরিণত না করলে সেগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তথ্যের এই অাধিক্য ও সুক্ষ্ন অনিশ্চয়তা আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর কাছে এমন অধ্যাত্মবাদীদের কথার মত মনে হয় যে আগষ্ট মাস হওয়া সত্ত্বেও আর ভবিষ্যদ্বাণীর শর্তানুযায়ী কমপক্ষে তিন বছর অপেক্ষার কথা থাকলেও সে খোঁড়ার কাজে আরও জোর দেয়। প্রথমেই যা তাকে আশ্চর্য করে, যদিও তা একই সঙ্গে তার বিভ্রান্তিকেও বাড়িয়ে দেয় তা হচ্ছে যখন সে প্রমাণ করতে পারে যে উরসুলার বিছানা থেকে উঠানের পেছনের দেয়ালের দূরত্ব হচ্ছে সঠিকভাবে একশত বাইশ মিটার। ফের্নান্দা যখন ওকে মাপতে দেখে তখন ভয় পেয়ে যায় যে যমজ ভাইয়ের মত সেও কিনা পাগল হয়ে গেছে এই ভেবে, আর তার আশংকা আরও বাড়ে যখন কাটা নালটাকে আরও এক মিটার গভীর করে খুড়তে বলে। এই উন্মাদনাকে শুধুই তুলনা করা চলে তার প্রপিতামহের সঙ্গে যখন সে খুঁজছিল আবিষ্কারের গলিসন্ধি আর এতে করে আউরেলিয়ানো হারিয়ে ফেলে তার শরীরের অবশিষ্ট চর্বির থলে। যমজ ভাইয়ের সঙ্গে অতীতকালের চেহারার সামঞ্জস্য আবার ফিরে আসতে শুরু করে আর সেটা শুধু চেহারায়ই নয় বরঞ্চ উড়ুক্কু ভাব ও উদাসীনতাটাও। বাচ্চাদের সঙ্গে আর সে সময় কাটায় না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাঁদায় মাখামাখি হয়ে রান্নাঘরের এককোনে খাবার খায়, আর মাঝে মাঝে শুধুমাত্র সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। যেমনটি কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি যে সে এমন কাজ করতে পারবে তাই করতে দেখে ফের্নান্দা তার একগুয়েমিকে ভাবে পরিশ্রম, লোভকে স্বার্থত্যাগ, জেদকে অধ্যাবসায়, আর তার কুঁড়েমি নিয়ে রাগারাগির জন্য বিবেকদংশন অনুভব করে। কিন্তু করুণাভরা এই মিটমাটের অবস্থা তখন আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর ছিল না। উঠান ও উঠানের পেছনভাগ শেষ করে গলাপর্যন্ত মৃত ডালপালা ও পচাফুলের জলভুমি জুড়ে বাগানের মাটি ডান থেকে বামে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে, বাড়ির পূবদিকের ভিতে এমন এক গভীর গর্ত খোড়ে যে এক রাতে জেগে ওঠে মাটির নীচ থেকে আসা শব্দে ও সারা বাড়ি কাঁপতে থাকায় ভূমিকম্প হচ্ছে মনে করে, আর তিনটি ঘরের পড়ে যাবার অবস্থা হয় তখন। আর গাঁ-কাঁপানো এক ফাটলের সৃষ্টি হয় বারান্দা থেকে ফের্ণান্দার কামরা পর্যন্ত। এর জন্য অবশ্য আউরেলিয়ানো সেগুন্দো তার অভিযানে ইতি টানে না। এমনকি যখন তার শেষ আশার আলোও নিবে যাচ্ছিল, যখন একমাত্র তাসের ভবিষ্যদ্বাণীকেই মনে হচ্ছিল কাজ চালিয়ে যাবার জন্য একমাত্র কারণ, তখনও নয়। সে বাড়ির ক্ষতিগ্রস্থ ভিতটাকে মজবুত করে ফাটলটা ভরাট করে চুন-সুড়কি দিয়ে, আর খুঁড়তে থাকে বাড়ির পশ্চিম দিকটা, ওখানেই ছিল পরের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ যখন বৃষ্টিটা শান্ত হতে শুরু করে, মেঘগুলো শুরু করে সরে যেতে, আর বোঝা যায় যে কোন সময় আকাশ পরিস্কার হয়ে যাবে। তা-ই হয়। এক শুক্রবারে বেলা দুটোর সময় দুনিয়া আলোকিত হয় এক ইটের সুড়কির মত লাল গাঢ় সূর্যের আলোয়, যা ছিল পানির মত ঠান্ডা আর পরের দশ বছরে কোন বৃষ্টি হয় না।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0তখন মাকন্দ ছিল এক ধ্বংসস্তুপ। কাদাজলভরা রাস্তা ছিল আসবাবপত্রের ভগ্নাবশেষে ভরা, জন্তুজানোয়ারের কংকাল আচ্ছন্ন ছিল লাল লিলিফুলে, আর ছিল আগন্তকদের স্মৃতিচিন্থ যারা যেমন হঠাৎ করে এসেছিল সেই একইভাবে পালিয়েছে হঠাৎ করে। কলাজ্বরের সময়ে তাড়াহুড়ো করে বানানো বাড়িগুলো ছিল পরিত্যাক্ত। কলা কোম্পানি তাদের নির্মাণ করা সবকিছু খুলে ফেলেছে। আগেকার সেই তার-ঘেরা শহরে পরে আছে শুধু ভাঙাচোরা ইটপাথর। কাঠের বাড়িগুলো, শীতল বিকেল যেগুলোর ঝুল বারান্দায় তাসের আড্ডা বসত, ওগুলো যেন বছর কয়েক পর মাকন্দকে দুনিয়া থেকে মুছে দেবার আগাম দৈববার্তা বহন করছে। সেই সর্বগাসী ঝঞ্ঝা মানুষের একমাত্র যে চিন্থ রেখে গেছে তা হচ্ছে দমবন্ধ করে ফেলার মত বুনো পানসী ফুল দিয়ে ঢাকা এক গাড়ির মধ্যে পাট্রিসিয়া ব্রাউনের এক দস্তানা। মাকন্দ পত্তনের সময়ে যে মায়াভরা অঞ্চলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া অভিযান চালিয়েছিল যেখানে পরে কোম্পানি গড়ে উঠেছিল, সেটা এখন পচা শেকড় ভরা জলাশয় যার দূরদিগন্তে বহুবছর ধরে দেখা যায় নিঃশব্দসাগরের ফেনা। প্রথম রোববারে শুকনো জামা পড়ে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো যখন গ্রামটাকে চিনতে বের হয় তখন সে একধরনের কষ্টে ভোগে। এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া লোকজন, যারা কলাকোম্পানির ঝড় এসে কাঁপানোর আগ থেকেই মাকন্দ-তে বাস করত তারা সবাই প্রথম দিকের সূর্যলোকে উপভোগ করছিল রাস্তার মাঝে বসে। তখনও ওদের ত্বকে ছিল সবুজ শ্যাওলা আর বৃষ্টির দ্বারা কোনায় আবদ্ধ থাকায় ছাতা ধরা গন্ধ, কিন্তু হৃদয়ের গভীর ছিল, যে গ্রামে জন্ম নিয়েছে সেটাকে পুনরুদ্ধারের তৃপ্তি। তুর্কদের রাস্তাটা পুনরায় আগের পর্যায়ে ফিরে যায়; যে সময়ে আরবীয়রা পায়ে স্যান্ডাল পরে কানে মাকড়ি লাগিয়ে সারা দুনিয়া ঘুরে গুয়ামায়া-র (টিয়া জাতীয় পাখী-ম্যাকাও) সঙ্গে হাবিজাবি বদল করতে করতে মাকন্দের এক রাস্তার মোড়ে পেয়ে যায় জীবনভর যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়াবার হাত থেকে মুক্তি। বৃষ্টির ফলে বাজারের মালামালগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, খোলা দোকানের দরজাগুলিতে ঝোলানো পর্দা দখল করে বসেছে শৈবাল, জিনিষপত্র দেখানোর কাউন্টার খেয়ে ফেলেছে উঁই পোকায়, আর দেয়াল খেয়েছে আর্দ্রতা, তারপরও আরবদের তৃতীয় প্রজন্ম বসেছিল একই জায়গায়, বাপদাদাদের মতই একই মনোভাব নিয়ে; মিতভাষী, ভয়হীন, সময় ও বিপর্যয়ের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। একই রকম জীবন্ত বা মৃত যেমনটি ছিল অনিদ্রা রোগ মহামারীর পর, যেমন ছিল কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বত্রিশটি যুদ্ধের পর। জুয়ার টেবিল, ভাজাভুজির দোকান, শুটিং করার জায়গা, যেখানে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিত ও ভবিষ্যৎবানী করত সেই জায়গা, এসব কিছুর ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়ানো আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওদের এই আশ্চার্যজনক মনোবল ও উদ্যাম দেখে তার স্বভাবজাত সরাসরি প্রশ্ন করে, যে তারা কোনো রহস্যময় শক্তির বলে এই প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে টিকে আছে, কোন বালের কাজটাই বা তারা করেছে টিকে থাকার জন্য, আর প্রশ্ন শুনে একের পর এক, দরজায় দরজায়, এক কৌশলি হাসি ও স্বপ্নীল দৃষ্টিক্ষেপ করে, কোনরকমের পূর্ব-আলোচনা ছাড়াই, সকলে একই উত্তর দেয় -“সাতার কেটে”।

স্থানীয়দের মধ্যে হয়তবা পেত্রা কর্তেস-ই ছিল একমাত্র মানুষ যার নাকি ছিল আরবদের মত মনোবল। সে দেখেছে ঝড়ের ফলে তার খামারের ও আস্তাবলের শেষ বিপর্যয়, কিন্তু তার পরও খাড়া রেখেছে সে বাড়িটাকে। শেষের বছরটায় সে অনেক জরুরীবার্তা পাঠিয়েছিল আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর কাছে, আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো উত্তর দিতো যে সে জানে না কবে তার বাড়ি ফিরবে, কিন্তু যখন ফিরবে সাথে করে নিয়ে যাবেএক বাক্স সোনার মোহরশোবার ঘরটাকে পাথর দিয়ে মুড়ে দেবার জন্য । ফলে সে হৃদয়ের গহীনে গর্ত খুঁড়ে, এমন এক শক্তি খোঁজে যে শক্তি তাকে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও বেঁচে থাকতে দেবে, আর পেয়ে যায় ন্যায়সংগত এক প্রচন্ড রোষ যার দ্বারা সে প্রতিজ্ঞা করে প্রেমিকের উড়িয়ে দেয়ার ও মহাপ্লাবনে ধ্বংস হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের। এমনই কঠোর সিদ্ধান্ত ছিল সেটা যে শেষ খবর পাবার আট মাস পর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো যখন তার বাড়িতে ফিরে আসে তাকে পায় সবুজ বর্ণের, চুল উস্কোখুস্কো, চোখের পাতা বসা, আর চামড়া ভরা খোসপাচড়া, কিন্তু ছোট ছোট কাগুজের টুকরোয় লিখে যাচ্ছে নম্বর লটারী করার জন্য। আউরেলিয়ানো সেগুন্দো নির্বাক বনে যায়, আর ওদিকে সে ছিল এতই চিকন, এতই গম্ভীর যে পেত্রা কর্তেস বিশ্বাসই করে না যে, যে-তাকে দেখতে এসেছে সে তার সারাজীবনের ভালবাসা, বরঞ্চ ভাবে এসেছে তার জময ভাই।
-“পাগল হয়েছ” – বলে সে-“হাড়গোর লটারী করবে”
তখন পেত্রা কর্তেস তাকে শোবার ঘরের দিকে তাকাতে বলে আর আউরেলিয়ানো সেগুন্দো দেখে খচ্চরটা। সেটার চামড়া লেগে ছিল হাড়ের সাথে মালকিনের মতই, কিন্তু সেটা ছিল এতই জীবন্ত যে তাও ছিল মালকিনের মত একই রকম। পেত্রা কর্তেস ওটাকে খাইয়েছিল তার রোষের সঙ্গে, আর যখন আর কোন ঘাস, ভুট্টা বা শিকড় অবশিষ্ট থাকে না তখন সেটাকে আশ্রয় দেয় নিজের শোবার ঘরে, আর খাওয়ায় সুতির গায়ে দেবার চাদর, পারস্যের গালিচা, ভেলভেটের বিছানার চাদর, মখমলের পর্দা ও সোনার সুতো দিয়ে এম্ব্রয়ডারি করা রাজকীয় বিছানার রেশমী ঝালর।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৬ @ ৯:১৭ অপরাহ্ন

      I must appreciate Anisuzzaman for his continuous effort to go on vigoriously and successfully with the translation of my most favorite epic novel, One Hundred Years of Solitude. The novel is indeed a wonder in the history of literature, and Anisuzzaman is surely going on with the truest spirit of the treatise.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com