আবদুল মান্নান সৈয়দ: “কবিতা আবেগের উত্তাল দশা ছাড়া লেখা সম্ভব না ”

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ৩ আগস্ট ২০১৬ ৭:৩৯ অপরাহ্ন

Mannan

……………………………………………………………………..

আবদুল মান্নান সৈয়দ একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচক। শুরুর দিকে লিখেছেন অশোক সৈয়দ নামে। ১৯৪৩ সালের ৩ আগস্ট অখণ্ড বাংলার পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনায় জন্মেছিলেন তিনি। তাঁর বাবা সৈয়দ এ এম বদরুদ্দোজা এবং মা আনোয়ারা মজিদ। দেশভাগ পরবর্তি দাঙ্গার কারণে মুসলমান পরিবারের আবদুল মান্নান সৈয়দরা ১৯৫০ সালে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (মেট্রিকুলেশন বা মেট্রিক), ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ (ইন্টারমিডিয়েট)এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। প্রথমে সিলেটের এম সি কলেজে প্রভাষক পদে চাকরির মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজে কিছুকাল এবং জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৮ সালে উক্ত কলেজ থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রথম রেসিডেন্ট স্কলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২— ২০০৪ সাল পর্যন্ত নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। মাসিক সাহিত্য পত্রিকা শিল্পতরুতে তিনি দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন।

আবদুল মান্নান সৈয়দের কাব্য-অভিযাত্রা শুরু হয় ১৯৬০ সালেই। পাঁচ দশক ধরে লেখা অব্যাহত রাখেন। তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। তাঁর কবিতায় কখনো মৃত্যুচেতনা, কখনো রোমান্টিকতা, কখনো সুররিয়ালিজম, প্রতীকধর্মী আবার কখনো এ্যাবসার্ডিটির প্রতিফলন দেখা যায়। একজন মননশীল ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষক হিসেবে আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর লেখার বিষয় ও রচনা রীতিতে বারবার পরিবর্তন এনেছেন। তিনি কবিতায় প্রায়ই চাঁদ, সূর্য, আকাশ ও মেঘকে চিত্রকল্পের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দ ছন্দ বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা করেছেন। প্রবোধচন্দ্র সেন ও শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন তাঁর ছন্দবিষয়ক শিক্ষক। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য সমালোচক ও সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ ও নজরুল সাহিত্য নিয়ে অসামান্য সব কাজ করেছেন। তিনি ফররুখ আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, সমর সেন, বেগম রোকেয়া, আবদুল গনি হাজারী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, প্রবোধচন্দ্র সেন— প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদকের জীবনীমূলক গবেষণাকর্ম উপহার দিয়েছেন। কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-গবেষণা, কাব্যনাটক, স্মৃতিকথাসহ তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা দেড়শতাধিক। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭), নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫), কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২), পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি (১৯৮৩), মাছ সিরিজ (১৯৮৪) তার গুরুত্বপূর্ণ কবিতার বই। সত্যের মতো বদমাশ (১৯৬৮), চলো যাই পরোক্ষে (১৯৭৩), মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা (১৯৭৭) আবদুল মান্নান সৈয়দের ছোটগল্পের বই। পরিপ্রেক্ষিতের দাসদাসী (১৯৭৪),অ-তে অজগর (১৯৮২), গভীর গভীরতর অসুখ (১৯৮৩), ক্ষুধা প্রেম আগুন (১৯৪৪), শ্রাবস্তীর দিনরাত্রি (১৯৯৮) তার লেখা সুখপাঠ্য উপন্যাস। জীবনানন্দ দাশের কবিতা (১৯৭৪),নজরুল ইসলাম: কবি ও কবিতা, করতলে মহাদেশ (১৯৭৯), ছন্দ (১৯৮৫), রবীন্দ্রনাথ (২০০১), আবদুল গনি হাজারী (১৯৮৯), সৈয়দ মুর্তজা আলী (১৯৯০), প্রবোধচন্দ্র সেন ((১৯৯৪) তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও জীবনীগ্রন্থ।

এছাড়া লিখেছেন নাটক ও কাব্যনাটক। সম্পাদনা করেছেন সমালোচনা সমগ্র: জীবনানন্দ দাশ (১৯৮৩),বাংলাদেশের কবিতা (যৌথ, ১৯৮৮), সমর সেনের নির্বাচিত কবিতা ((১৯৮৯), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলী (প্রথম খন্ড-১৯৯০, ২য় খন্ড-১৯৯২), মাইকেল মধুসূদন দত্ত: শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯২) ও শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ: বেগম রোকেয়া (২০০২)— এ বইগুলি।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ও আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের ফররুখ আহমদ স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৯৮ সালে নজরুল পুরস্কার (চুরুলিয়া, বর্ধমান, পশ্চিম বাংলা), ২০০১ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট কর্তৃক নজরুল পদক; ২০০০ সালে তালিম হোসেন পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কার এবং ২০০২ সালে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ষাটের দশকের কবি আবদুল মান্নান সৈয়দকে আমি প্রথম দেখি ২০০৭ সালের কোন এক সন্ধ্যায় আজিজ মার্কেটের দোতলায়, ভক্ত-পরিবেষ্টিত দশায়। তুমুল সাহিত্য আড্ডা চলছিলো সেখানে। বিষয়, কবিতার লক্ষ্য। অনেকক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে শুনে জাহাঙ্গীরনগরের বাসে ক্যাম্পাসে যেতে যেতে ভাবছিলাম, আহা! এই প্রাণখোলা মানুষটার সাথে যদি আড্ডা দেয়া যেতো!

দ্রুতই তাঁর বইপত্র যোগাড় করলাম। মাসতিনেক লাগলো মান্নান সৈয়দ পড়তে। তখনকার জাহাঙ্গীরনগরে বন্ধুদের আড্ডায়, প্রান্তিকের আড্ডায় মান্নান সৈয়দের ভক্ত হিসেবে আমার প্রসঙ্গ আসা শুরু করলো। খুব সম্ভবত তারই ধারাবাহিকতায় ২০১০ এর শুরুতে আমার অগ্রজ, কবি ও সাহিত্য সম্পাদক শামীম রেজা যখন একটি দৈনিক পত্রিকার ‘গুড স্টার্ট’ এর কথা ভাবছিলেন, তখন আমাকে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি সাক্ষাৎকার নেবার কথা বলেন। মূলত তারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎসাহে এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া। দুই-তিন-দফা বৈদ্যুতিন তারবার্তা আদান প্রদান করে আমরা সাক্ষাৎকারের জন্য প্রশ্নমালা ঠিক করেছিলাম।

কিন্তু প্রশ্নমালা আর কবির সাথে সাক্ষাতের দিনক্ষণ ঠিক করলে হবে কি! কবিকে পাওয়াই হয়ে পড়লো মুশকিল। কবি সে-সময়টায় প্রায় সারাক্ষন কানে ফোন লাগিয়ে রাখেন। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেন, বাসায় খেতে খেতে কথা বলেন, শিডিউল নিয়ে আসা তরুণ কবিকে বাসার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে তার সামনে পায়চারি করে কথা বলেন। এবং সেই কথা যে সে কথা না, তরুণীভজানো আলাপ। এ দেখে ভালো লাগে যে কবি মন লাগিয়ে প্রেম করছেন।

পরপর দুদিন কবির বাসায় গিয়ে একটি বাক্যও রেকর্ড করতে না পেরে ফিরে এলাম। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর থাকি। সেখান থেকে ঢাকা আসা প্রতিদিন এবং ব্যর্থমনোরথে ফিরে যাওয়া কি যে কষ্টকর তা বলে বোঝানো যাবে না। তৃতীয় দিনে মান্নান ভাই কথা দিলেন আজ আর কোন নড়চড় হবে না। ২০১০, আগস্ট মাসের প্রথমদিন, আমি গেলাম কবির বাসায়, গ্রীনরোডে। গিয়ে দেখি কবি নেই। ফোন করলাম, এনগেজড। দশ মিনিট অন্তর অন্তর ফোন করি আর এনগেজড। দু-ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে তখনকার বসুন্ধরা সিটি, যেখানে শামীম (রেজা) ভাইয়ের পত্রিকা অফিস সেখানে ফিরলাম। সকাল ১০ টা থেকে দাঁড়িয়ে থেকে, তখন বাজে তিনটা। আমি ক্লান্ত, ধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত— সাততলায় উঠলাম কিছু খাবো বলে, গিয়ে দেখি একটা কোনার টেবিলে কবি এক তরুণীর সাথে বসে আছেন। রাগে তখন আমার গা জ্বলছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে আমি বিরক্তও। গিয়ে বললাম, সাক্ষাৎকার না দিলে না দেবেন, তা আপনার একান্ত ইচ্ছা। কিন্তু এভাবে আমাকে হয়রানী করার তো কিছু নাই।

উনি প্রায় ধরা পড়ে গেছেন এমন ভঙ্গি করে জিভ কাটলেন। আমি হেসে ফেললাম। বললাম আপনার জন্মদিন আর মাত্র দুদিন পর। পত্রিকা থেকে আমাকে তাগাদা দেয়া হচ্ছে। আপনি ইন্টারভিউ দিবেন কি দিবেন না বলেন!

মান্নান ভাই আমাকে কথা দিলেন, জন্মদিনের সকালটা তিনি আমার জন্য রাখবেন। হায় কে জানতো সেই জন্মদিন শেষ জন্মদিন হবে! ২০১০ সালের ৩ আগস্ট, কবির সাতষট্টিতম জন্মদিনে আমরা সকাল দশটার দিকে আলাপ করতে বসি, সেই আলাপ দুটি বিরতি দিয়ে শেষ হয় বিকেল তিনটার দিকে। যে দৈনিক পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিলো সেখানে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশটুকু প্রকাশিত হয় ৫ই সেপ্টেম্বর কবির জীবনাবসানের দুদিন পর। আর্টস-এ কবির দেয়া সর্বশেষ এ সাক্ষাৎকারটির পূর্ণাঙ্গরূপ প্রকাশিত হচ্ছে তার জন্মদিন উপলক্ষে।

……………………………………………………………………..


শিমুল সালাহ্উদ্দিন:
প্রথমেই আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমাদের প্রিয় জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ দিয়ে শুরু করা যাক। সচরাচর একজন নতুন লেখক প্রথম পর্যায়ে নিজের ভাষা হাতড়ে বেড়ান। অথচ আপনি যেন সেই অভিমন্যু, গর্ভাবস্থাতেই ব্যুহভেদ করতে শিখেছেন। যখন নিজস্ব রণভূমিতে প্রবেশ করলেন, আপনি তখনই সম্পূর্ণ সমরাস্ত্র সজ্জ্বিত। তো এই যে জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছের তৈরি সমস্ত ভাসানের সমস্ত উড়াল, আপনার হাতে বাংলা কবিতার এই নতুন নির্মাণের পূর্ব ইতিহাসটা আমরা জানতে চাই। প্রশ্নটা আমি ১৯৬৮ সালের অর্থাৎ ষাটের দশকের `কণ্ঠস্বর’-এর কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দের কাছে করতে চাই।
আবদুল মান্নান সৈয়দ: ৬৮ সাল তো পারি দিয়ে এসেছি ৪০ বছরের বেশি। ফলে তখনকার মনোভাব আমি তো পুরোপুরি বলতে পারবো না। তখনই কেন, এখনো আমি খুব নির্জনতর মানুষ। নির্জন, তবে জীবনানন্দের সাথে আমার তফাৎ হচ্ছে আমি নির্জন তবে উদ্ধত। অনেকে ভাবে দাম্ভিক বা নাক-উঁচু। আমার ধারণা তা নয়। তবে এখনকার ভাবনা আমি যেটা বলবো তা হলো, আমার একটি লেটো পিরিয়ড আছে। নজরুলের মতো। পিরিয়ডটা হলো আমার সেভেন এইট থেকে এম.এ পাশ পর্যন্ত। আমি বিরামহীন লেখালেখি করতাম আর ছবি আঁকতাম। আমার কঠোর আব্বা, কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন, চাচারা মেধাবি ছাত্র, আমাকে বাধ্য করলেন লেখাপড়া করতে। আমাকে বাধ্য করেছেন যেন আমি এম.এ পাশ করি। এইজন্যে ১৯৬৫ সালকে আমি ধরি আমার আত্মপ্রকাশের বছর। এম.এ পাশের পর আমি বেরিয়ে আসি, পুরো স্বাধীন। আব্বা আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন। লেটো পিরিয়ড আমি বলছি, নজরুলের অর্থে বলছি, সব লেখকের একটা এরকম পিরিয়ড থাকে, মাইকেলের ছিলো, ইংরেজী কবিতা লেখার সময়টা, আমার এই লেটো পিরিয়ডটা আমার এম.এ পাশের পর। ওই পিরিয়ডে আমি নিজেকে ক্রমাগত শিক্ষিত, সংস্কৃত করার চেষ্টা করেছি। আর আমি তখনও লোকজনের সাথে মিশতে পারতাম না, এখনো পারি না। আমি এতো নির্জন, এতো অসামাজিক, এতো আত্মমগ্ন এবং উগ্র টাইপের মানুষ। এইসব মিলিয়ে আমি তখন শিল্প সাহিত্যের দিক-বিদিক হাতড়ে বেড়িয়েছি। স্কুলে থাকতে আমাদের ব্যাকরণ বইয়ে, জগদীশ গুপ্তের ব্যাকরণ বইয়ের শেষে, ছন্দ থাকতো, আমি সেখান থেকেই ছন্দ শিখে নিয়েছিলাম। আমি প্রথমদিকে মনে করতাম ছন্দ ছাড়া কবিতা হতে পারে না। ইউনিভার্সিটিতে উঠে আমার কোন লাভ হয়নি, লাভ এইটুকু হয়েছে ছন্দটা আমি শিখতে পেরেছি। শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী আমাদের ছন্দের ক্লাস নিতেন। ছন্দের একটি খাতা আমার ছিলো। স্যারের কাছ থেকে ছন্দের পাঠ আমি নিয়েছি সেটা আমি ভুলতে পারি না। স্যারকে, আমার মহান শিক্ষককে, শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে এই সুযোগে আমি সালাম জানাই। আর প্রবোধচন্দ্র সেনকে আমি সালাম জানাই। আমার ছন্দ শিক্ষার পাঠ প্রবোধ চন্দ্র সেন স্যারের কাছেও।
Mannan-2
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পরে তো আপনি প্রবোধচন্দ্র সেনের জীবনী লিখেছেন—
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি জীবনী লিখেছি শুধু নয়, উনি বিভিন্ন সময়ে আমার সম্বন্ধে কমেন্ট করেছেন। সেগুলো সব ইতিবাচক শুধু নয়, কিন্তু সেটাও কেউ কেউ অন্যভাবে দেখে, যা নিয়ে অনেক কথা আছে। যাই হোক এইসব মিলিয়ে আমি প্রবলভাবে ছন্দের অনুসারী ও অনুগামী ছিলাম। কিন্তু আমার ব্যক্তিস্বভাবের মধ্যে একটা কোথাও দ্রোহী ব্যাপার আছে। ফলে, আমি যখন বেরুলাম, মানে ১৯৬৭ সালে যখন বইটা ছাপা হলো, লেখাগুলো আরো বেশ আগের লেখা, আমার ১৭, ১৮, অর্থাৎ কুড়ি বাইশ অর্থাৎ প্রায় ৬১, ওখানে আছে ৬২ সালের লেখা, অনেক কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছি, একটা বিশুদ্ধ সনেট সেদিন খুঁজে পেলাম, যাই হোক আমার প্রথম বই যখন বেরুলো তখন সেটা প্রায় ছন্দহীন, টোটাল টানাগদ্যে, এইটা আজকে আমাকে বলতে হবে, আমার লেখা বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িক কবিদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রভাব ফেললো। যেহেতু আমরা সমসাময়িক সেহেতু এর উদ্গাতা কে, সেটা একটু হয়তো ধোঁয়া-আচ্ছাদিত হয়ে পড়লো, কিন্তু আলটিমেটলি কেউ তো কারো নকল করতে পারে না। ফলে, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছকে আপনারা আজকে চল্লিশ বছর পর, আপনারা তরুণরা খুঁজে বের করেছেন। আরেকটি ধারণা এর সাথে যোগ করি, আমার এখনকার কবিতা, আমাকে অনেক ছেলেমেয়েরা বলে, আমি ইয়াংদের সাথে অনেক মিশি, শামীমই ( কবি শামীম রেজা) বলে, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এর পর আপনার এখনকার কবিতা কি হচ্ছে! এগুলো আমি শুনেছি, শামীম ফটোকপি করে তরুণদের পড়তে দিয়েছে, হয়তো আপনাকেও পড়তে দিয়েছে, তবে আমি মনে করি, আমি এখন যেগুলো লিখছি, সেটাও আশা করি চল্লিশ বছর পর বিবেচিত হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমার প্রশ্ন ছিলো মান্নান ভাই আপনার প্রস্তুতিপর্বটা …
আবদুল মান্নান সৈয়দ: প্রস্তুতিটা ছিলো আমার ঐ কালের প্রস্তুতি। লেটো পিরিয়ডের। যখন আমার আব্বা আমার লেখা প্রকাশিত হতে দিচ্ছেন না। এবং আমি একটা খাঁচার মধ্যে। আমি বলি যে, লেখাপড়ার সতেরো বছর আমার সশ্রম কারাদণ্ড। পাশ না করলে চলবে না— এই ছিলো আব্বার হুঙ্কার। আব্বা আমার স্বভাব জানতেন। যে আমার লেখাপড়া হতো না, সে হুঙ্কার না হলে। আমাকে না খেয়ে মরতে হতো। ফলে আমি নিজেকে শিক্ষিত সংস্কৃত করেছি আমার এই সশ্রম কারাদণ্ড পিরিয়ডে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার সমসাময়িকদের মধ্যে এর প্রভাব ছিলো বলতে চাচ্ছেন এবং আপনিই প্রথম শুরু করেছিলেন…
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমিই শুধু প্রথম না, বলতে পারেন একমেবাদ্বিতীয়ম। অন্তরাত্মা কিন্তু নকল করা যায় না। আপনারা যদি স্বাক্ষর দেখেন তাহলে দেখবেন। অনেকেই এমন লিখেছেন। কিন্তু অন্তরাত্মাকে তো কেউ নকল করতে পারবে না। পারে না। ওটা নকল করা যায় না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবিতায় আপনার শুরুটা কেমন ছিলো? আজ এই ৬৭ বৎসর বয়সের তারুণ্যে শুরুর সময়টার সাথে বর্তমানটাকে কিভাবে তুলনা করবেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: দেখুন, আমি কবিতা লিখি, বহুকাল থেকেই কবিতা লিখি, প্রায় প্রথম থেকেই। পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। আমার প্রথম কবিতা বেরোয় ১৯৫৯ সালে, কবিতার নাম হচ্ছে ‘সোনার হরিণ’, ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকীতে, তখন খুব পপুলার কাগজ, ডাকে পাঠিয়েছিলাম। ছন্দোবদ্ধ কিন্তু কিছুটা ভাঙা ছন্দ ছিলো। কারণ ছন্দ তখনো পুরোপুরি আমার আয়ত্বে ছিলো না। শিমুল, আপনার প্রশ্নটা কি ছিলো?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কবি হওয়ার শুরুটা—
আবদুল মান্নান সৈয়দ: হ্যাঁ। আমার কবিতা কিছুকাল পরে পরেই আমার নিজের কাছে একঘেয়ে লাগে। তখন আমি ভেবেছি আর কবিতা লিখবো না। যদিও এখন আবার লিখছি। কেন লিখছি জানি না। আমি আবেগতাড়িত না হয়ে কবিতা লিখি না। ফলে আমার মাঝে মাঝে গ্যাপ পড়েছে। আপনি আমার কোন বইয়ের সাথে কোন বইয়ের মিল পাবেন না। এটা, আমার একটা অন্তঃশীল স্রোত আছে, ফলে আমি হয়তো কবি-ও নই। আমি সারাক্ষণ কবিতা লিখতে পারি না। আমি মনেও করি না যে কবিতা সারাক্ষণ লেখার বিষয়। আমি অসম্ভব আবেগী মানুষ। আমার বিপদ এবং সম্পদ হচ্ছে একটি জিনিস, সেটা হচ্ছে আমার আবেগ। আমি মানুষকে ভালোবাসি, এবং ভালোবাসা দিতে গিয়ে আমি আহত হই। পরে আমি একেক সময় একেক বিষয়ে আকৃষ্ট হয়েছি, কোন একটা আমার গভীর ভেতরে যদি আলোড়িত না করে আমি কবিতা লিখি না। তো এইভাবে আমার কবিতা আপনার, একটা যাত্রা, পথ— সেটা সম্পূর্ণ হবে, একটা বৃত্ত সেটা চিহ্নিত হবে, যেকোন বয়সে, হয়তো আমার মৃত্যুর পর। মৃত্যুর আগে সেটা আমি বলতে পারি না। আমার ভেতরে প্রচণ্ড একটা অসম্ভব, অতৃপ্তি আছে। কিন্তু বাইরে আমি খুব শান্ত স্বভাবের লোক। কিন্তু আমার ভেতরে অবিশ্রাম যে আলোড়ন চলছে সেটা বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না। যে কারণে অনেক সময় আপনাকে চিনতে পারবো না, হয়তো দুর্ব্যবহার করে বসলাম, এটা আপনাকে বুঝতে হবে আমাকে যে আমি অত্মমগ্ন একজন মানুষ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে আপনি বললেন, আপনার কবিতা একঘেয়ে লাগে, এর কারণেই কি আমরা দেখি যে আপনার কোন কাব্যগ্রন্থের সাথে কোন কাব্যগ্রন্থের মিল নেই! যেন সতত আপনি নতুনের সাধনা বা নতুনের আবাহন তৈরি করে যাচ্ছেন, সবসময় নিরীক্ষা করছেন—
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমার ভেতরে একটা অনুসন্ধানের স্রোত চলতে থাকে। সতত। এ অনুসন্ধানের কোন শেষ নেই। ফলে এখন আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি নিজেকে পরিচয় দেবো আমি একজন বৈজ্ঞানিক। আমার এই টেবিল, মেঝে, সারা বাড়িই আমার লেখার জায়গা। যেকোন জায়গায় বসেই আমি লিখতে পারি। তাই আমার বাড়িটিকে আমি বলি ল্যাবরেটরি। আমার কোন জায়গা লাগে না। যেকোন রাস্তায় দাঁড়িয়েও আমি লিখতে পারি। যেকোন সস্তা রেস্টুরেন্টে, যেকোন নামী জায়গায়। তো এটা কেন বলছি! আমার কবিতা, গল্প, গবেষণা, প্রবন্ধ, নাটক সবরকমের লেখালেখি, বিচিত্র চর্চা এটা আমার জীবনানুসন্ধানের ব্যপার। আমার টেবিলে একটিমাত্র ছবি। আমি যখন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম, ওখানে গবেষণার বিষয় ছিল আলাদা, কিন্তু আমার টেবিলে একটিমাত্র ছবিই আপনি দেখবেন, সেটা নিউটনের ছবি। এবং আমার কাছে সব বিজ্ঞানীরা আমার আদর্শ। আমি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, স্যার জগদীশ বসু এদের আমি অনুরক্ত। এবং আমার কথা হচ্ছে আমার সমগ্র সাহিত্য যদি আপনারা একটি বিজ্ঞান চর্চা হিসেবে দেখেন তাহলে হয়তো কেউ একটা সামগ্রিকতা পেতেও পারে। তাই আমার বাড়িটাকে আমি বলি, ল্যাবরেটরি। অথবা আমার বাড়িটাকে কারখানা বললেই বোধহয় ভালো হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিউটনের কথা বলতেই মনে এলো। অনেক সমালোচক সময় এবং স্থান অর্থাৎ টাইম এন্ড স্পেস কে কবিতার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। আপনার কবিতার ক্ষেত্রে এই দুটি স্বতন্ত্র বিষয়কে উহ্য রেখেছেন বলেই অনেকে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে অর্থাৎ টাইম এন্ড স্পেস সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি যে কবিতা লিখতে চাই, খুবই দুঃখের কথা, পঞ্চাশ বছর ধরে লিখছি, অথচ সেই কবিতা আমি লিখতে পারি নাই। নিঃসময় কবিতা, সময়হীন কবিতা, দেশকালহীন কবিতা, কেননা আমার জন্ম হয়েছে এই দেশে নয়, ভিন্ন একটি রাষ্ট্রে, আমি বর্ধিত হয়েছি আরেকটি রাষ্ট্রে, আমি এখন আছি আরেকটি রাষ্ট্রে, আমি ১৯৫০ সালে এদেশে চলে এসেছি, নৌকায় পালিয়ে, আমার মাতৃভূমি ছেড়ে, যে তার মাতৃভূমি ছাড়েনি, যে বাস্তুহারা নয়, সে বুঝতে পারবে না দেশভাগের যন্ত্রনা কি! ১৯৪৭ সালের যে দাঙ্গা, যে দেশভাগ সেটার কথা সবাই জানে কিন্তু সবাই জানেনা যে ১৯৫০ এ-ও খুব বড় একটা দাঙ্গা হয়েছিল, হিন্দু মুসলমান, তখনও হিন্দুরা এদেশে ছিলেন অনেক, মুসলমানরা ওদেশে ছিলেন অনেক, পঞ্চাশের দাঙ্গায় হিন্দুরা অনেকে চলে যান এখান থেকে এবং মুসলমানরা অনেকে চলে আসেন ওখান থেকে। আমি আমার নানা নানীর খুব আদরের ছিলাম। আব্বা সরকারী চাকরী করতেন, আব্বা অবসর নিয়ে এদেশে চলে আসেন। কিন্তু আমি ওদের সাথে থেকে যাই। আমাকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল একটি নৌকায়। তো আমাদের নৌকা পথ হারিয়ে ফেলেছিল। সেই ১৯৫০ এর দাঙ্গার স্মৃতি আজও আমার মনে রক্তাক্ত ক্ষত তৈরি করে আছে। এই জিনিসটা আমার ভেতরে, খুব ভেতরে অসম্ভব রকম হতাশা তৈরি করেছে। আমি যে এতো হতাশাপ্রবণ বলেন আপনারা, হতাশাপ্রোথিত, হতাশাবাদী একজন লোক। আমি যখন আড্ডায় থাকি তখন আমাকে দেখে বুঝতে পারবেন না, আমি হাত পা নেড়ে কথা বলছি, তখন বোধহয় আমি অভিনেতাও, তখন আমাকে দেখে লোকে মনে করবে এর চেয়ে সুখী লোক বোধহয় পৃথিবীতে আর নেই। কিন্তু বাড়িতে আমি যতক্ষণ থাকি, আমি শুয়ে থাকি, বেশিক্ষণ কথা বলতেও কষ্ট হয়, তবে মূল কথা, আমার জীবনাভিজ্ঞতা, পঠন পাঠন, তাতে উইলিয়াম ব্ল্যাকের লেখা, কোলরিজের লেখায় কিন্তু এটা আছে। স্পেসহীনতার জেশচার আছে। কিন্তু সেলিম সারওয়ার ( ষাটের দশকের কণ্ঠস্বরগোষ্ঠি কবি) আমাকে বললো, মান্নান ভাই, আপনার লেখাতেই আমি রীতিমত গবেষণা করে দেখিয়ে দিতে পারি, কিভাবে আপনি স্থান, কাল দেশকে তুলে ধরেছেন। আসলে কোন লেখকের পক্ষে তার দেশকালের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার লেখার বিচার তো আর আমি করতে পারি না, সেলিম সারওয়ার যখন বললো যে আমি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি, আপনার লেখায় কিভাবে আছে দেশ কাল সমাজের ছবি। কি বলবো সমালোচকদের। উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনাতো আর কম হয়নি আমাকে ঘিরে। তবে, আমার উচ্চারণ একটু পরোক্ষ, প্রত্যক্ষ নয়। দেশকালের বাইরে লেখা সম্ভব নয়। উইলিয়াম ব্ল্যাকও যেতে পারেননি, কোলরিজও পারেননি, মান্নান সৈয়দও পারেননি। আর এদেশের নেমক খেয়েছি আমি, এদেশে আমি জন্মগ্রহণ করিনি, এদেশ থেকে যা পেয়েছি সেটা তো কম নয়! আমার মতো লেখক কিছু পাওয়ার কথা নয়, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ কিছু মানুষের প্রতি, অনেক মানুষ, বিশেষ করে তিনজন সম্পাদকের কথা আমি বলবো, সিকান্দার আবু জাফর, আব্দুল গণি হাজারি, এবং হাসান হাফিজুর রহমান। এই তিনজন সম্পাদকের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। আমার কবিতার প্রথম সমালোচক আমি যদি একটু দম্ভও দেখাই এক্ষেত্রে, শওকত ওসমান। তিনি আমার প্রথম সমালোচক, এবং কবিতার বইয়ের সমালোচক। আমি দম্ভ দেখাবো না কেন! শহীদ কাদরী এবং আব্দুল মান্নান সৈয়দের কবিতার বইয়ের প্রথম সমালোচক শওকত ওসমান। আমারটা বাংলা ভাষায়, সমকালে, এবং শহীদ কাদরীরটা, ইংরেজী ভাষায় হলিডে পত্রিকায়। কাদরী ভাইয়ের সাথে যখনই দেখা হতো আমার, নিঃশব্দে, হয়তো আড্ডা ছেড়ে আর সবাই উঠে গেছে, উনি হাসতেন, বলতেন যে মান্নান, নামটা বলেই একটা হাসি, উনিতো অসম্ভব সুরসিক লোক, গত ঈদে উনি একঘন্টা দেড়ঘন্টা কথা বলেছেন, ফোনে, ঈদের দিন, উনি আমাকে প্রায়ই বলেন যে, দেখেন মান্নান, বিশ্বসাহিত্যের পাঠক শওকত ওসমান, উনি দুজনকে আসলে কবিস্বীকৃতি দিয়েছেন, আমাকে (শহীদ কাদরী), এবং আপনাকে (আবদুল মান্নান সৈয়দ)। সেটা ছিলো আমার বইয়ের লিখিত প্রথম সমালোচনা কিন্তু! কাজেই আমি যদি একটু ভুলে দম্ভ দেখিয়ে ফেলি!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা। আপনি তো দাম্ভিক না। ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি মনে করি, একটা বয়সে এসে আমি গভীরভাবে ঈশ্বর বিশ্বাস করতাম। হ্যা আমি প্রবলভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসী, এবং বিশ্বাসী আমার ঈশ্বরত্বেও। কিন্তু আমার সাহিত্যকে কি আমি বিভাজন করেছি? আমার সমগ্র সাহিত্যে কি কোথাও বিভাজন আছে? এইখানে লোকে ভুল করে। যাই হোক আমার কথা হলো, শেষ বিচারে এদেশের সাহিত্যবোদ্ধারা যদি আমাকে বৈজ্ঞানিক হিসেবে বিচার করে তবে বোধহয় আমার প্রতি কিছুটা সুবিচার করা হবে।
Mannan-1
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তরুণদের আপনার কাব্য নিয়ে একধরনের যুগপৎ আগ্রহ ও বিভ্রান্তি লক্ষ্য করি, তারা আপনার জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এর থেকে মাছ সিরিজ এ যে সহজিয়াধারা, সচেতন বাকপরিবর্তনের যাত্রা এটাকে ঠিক পজিটিভ হিসেবে দেখে না। এ ব্যাপারে আপনার উপলব্ধির কোন দিকটি আপনাকে অগ্রগামী করে বলে আপনি মনে করেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: মাছ সিরিজ এবং জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, যে দুটি বইয়ে আমি তরুণদের আগ্রহ দেখেছি, আপনারও আগ্রহ দেখছি, এই দুটো বই, এর বাইরে আমার কাছে কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, সকল প্রসংশা তাঁর, আমার মাতাল কবিতা পাগল গদ্য, এই কটি বই, আপনি ঝট করে বলছেন বলে মনে হচ্ছে আপনার প্রস্তুতি ভালো, আমার তো সব বইয়ের কথা মনে নেই, পঞ্চাশ বছর ধরে লিখছি, তো তরুণরা আশির দশক পর্যন্ত সব গ্রুপই আমার কাছে আসতো, পরে আমিই ওদের আসা বন্ধ করে দিই, আমিতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নই, আমাকে উঞ্ছবৃত্তি করে খেতে হয়— কাজেই, নব্বই দশকে আমার ছাত্রছাত্রীও আছে, যারা কবিতা লেখে, আপনাদের দশকের আছে, তো আমি এখন একটু অবাক হয়ে-ই দেখি, সবসময়ের তরুণদের সঙ্গে আমার ক্লোজ সম্পর্ক হয়। তারা আমার কবিতা বোঝে, পছন্দ করে, এমনকি প্রভাবিত হয়। কিন্তু আমার সমসাময়িকদের কারো সঙ্গে প্রকৃতার্থে আমার কোন সম্পর্ক নেই। কি কারণে জানি না, আমারই দোষ, আমারই দোষ, আমি কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারি না, আমার নিজের মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা। (হাসি)। এই-টা আমার দুর্ভাগ্য। আমার যে ক্রমচলমানতা এইটার ফলে আমার বিবাদ বেধে যায় আমার অনুসারীদের সাথে। আর মাছ সিরিজকে যারা সহজ কবিতা মনে করে তাদের কবিতার বোঝাপড়া নিয়ে ভাবতে হবে। মাছ সিরিজ পুরোটাই সিম্বলিক বা প্রতীকী কবিতা। খুব সহজ অর্থ বাইরে, নরম খোলস, কিন্তু ভেতরে খুবই ঋদ্ধ, ভেতরে কুসুম। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ তো বাইরেও সহজ নয়, বাইরের আবরণটা এর শক্ত কাঠামোয় ঢাকা, যেনো ঊটপাখির ডিমের খোলস। কবিতায় আমি সচেতনতায় বিশ্বাস করি না, আমি বিশ্বাস করি অচেতনতায়, বিশ্বাস করি অবচেতনেই থাকে কবিতা। আমার ইচ্ছার বাইরে আমার কবিতা। আমি যে কবিতা লিখতে চাই না, আমার জীবন-অভিজ্ঞতার কথা আমি লিখতে চেয়েছি। গত কিছুকাল ধরে লিখতে পারবো না বলেও আমি লিখছি, এই যে চারটে প্রেমের কবিতার বই এবং একটা গল্প, লেখা আমার আসছে, লেখা আসলে আমি যেতে দেই না, লেখা আমাকে আক্রান্ত করে, আমি আক্রান্ত হই এবং লিখি। প্রেমের কবিতা কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে যেসব লিখেছি তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে, আমি যে প্রেমের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছি, আমার সমসাময়িক, অনুজরা তার ভেতর দিয়ে যায়নি। ফলে কবিতা পড়েই বোঝা যায় কোনটা অভিজ্ঞতাজাত, আর কোনটা নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কবিতায় নামধামসহ বিভিন্ন নারীর উপস্থিতি জাজ্বল্যমান। ডালিয়া, মীরা, জেরিনা, ড-কে— এমন যাদের সামনে রেখে আপনার অনেক কবিতাই লেখা তারা কি আপনার কল্পনার পরী? না বাস্তব জগতের কেউ? এরা আপনার বেঁচে থাকাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: ড দিয়ে ডালিয়া নামটা একটা বয়সে গিয়ে প্রকাশ করেছি। তার প্রকৃত নামই ডালিয়া। প্রসঙ্গত বলি, নেরুদার ছিল ডালিয়া, ওরিয়েসের ছিল ডালিয়া, তাই মান্নান সৈয়দেরও তো ডালিয়া না থেকে পারে না! তবে সব নামই যে আসল নাম তাতো নয়।
আমার কবিতাকে, শিল্প সাহিত্যকে, বেঁচে থাকাকে বিরাটভাবে এরা প্রভাবিত করেছে। কতভাবে যে এরা তোলপাড় করেছে আমাকে! আমার অস্তিত্বকে মূল্যহীন মনে করি আমি। কিন্তু এরা এসে কয়েক বছরে আমার অস্তিত্বকে মূল্যবান করেছে। আমি জীবন সম্পর্কে পুরোটা আশাহীন। কিন্তু আমার এ ১০ বছর যা আপনাদের হওয়া উচিৎ, ঘটনাচক্রে আমার হয়ে গেল। আপনাদের তো হচ্ছেই। কিন্তু আমিও তো অংশীদার হয়ে গেলাম। সেটাতো অদ্ভুত একটা বিষয়। এরা যে আমার অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকাকে মূল্যবান করেছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার সমালোচকদের প্রবল অভিযোগ: ষাটের সমসাময়িক উত্তাল যে সময়ের সন্তান আপনি, যে সময়ের মধ্যে এই ভূ-খণ্ড পেরিয়েছে অনেক ঐতিহাসিক পরিক্রমা, সেই সময়ের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় না আপনার কবিতায়— এ প্রসঙ্গে আপনার কি মতামত।
আবদুল মান্নান সৈয়দ: ভুল। ”চল্ উদ্বাস্তুরা চল্” নামে একটা কবিতা আছে আমার। কবিতাটির কলকাতা থেকে একটি সংকলন বেরিয়েছে। কার যেন সম্পাদনায়। সেখানে এই কবিতাটাই আছে। আর কারো কোন বাংলাদেশের কবিতা নেই। সেখানে এই কবিতাটি, কেননা ঐ লোকেরা বোঝে যারা এখান থেকে গেছে। একটা কথা এখানে বলতেই হবে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে লক্ষ লক্ষ মুসলিম এখানে এসেছে, তারা নিজের আত্মপরিচয় লুপ্ত করে দেয়নি। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছে ওরকম সরাসরি নেই, কিন্তু সেখানে ডালিয়ার উপস্থিতি আছে— ‘তোমার একটি চোখ রেখে গেছ আমার নিকটে’— আমার উচ্চারণ যতই নজরুলের মত করার চেষ্টা করি, কীভাবে যেন রবীন্দ্রনাথের মত হয়ে যায়। কাল ছিলো ডাল খালি আজ ফুলে গেছে ভরে— এসব কবিতা আবেগের উত্তাল দশা ছাড়া লেখা সম্ভব না। রবীন্দ্রনাথ শেষদিকে এত অনুসৃত হতেন যে, তিনি সরাসরি বই-ই বের করার পক্ষপাতী ছিলেন। আমাদের রবীন্দ্র-বিশারদেরা তো শুধু বিবৃতি দেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রিয়ংবদা দেবীর কিছু কবিতা তার গ্রন্থে অর্ন্তভূক্ত করেন। কিন্তু আমার নকল করে যারা কবিতা লিখছেন সেগুলো এত দুর্বল যে, সেগুলো আমার বইয়ে নেয়ার মত না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: (হা হা হা হা) অন্য প্রসঙ্গে যাই মান্নান ভাই, আপনি আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছতেই ব্যতিক্রমী এক কাব্যপ্রতিমার নির্মাণ করেছিলেন। আধুনিক সেই কাব্যচিন্তার সাথে আপনার গবেষিত সাহিত্যিকগণ যেমন, নজরুল, শাহাদৎ হোসেন, কায়কোবাদ-এর কাব্যাদর্শ অনেকটাই বিপরীতমুখী। এই যে দ্বান্দ্বিক অভিনিবেশ এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত জানতে চাই।
আবদুল মান্নান সৈয়দ: এই প্রসঙ্গে মতামত এটুকুই যে, আমি বোধহয় মূলত সমালোচক, আমি বোধহয় কবি নই। কেননা আমি ভাল কবিতায় সাড়া দিতে পারি। সেটা নজরুল ইসলামের হোক, রবীন্দ্রনাথের হোক, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় একসময় সাড়া দিতে পারতাম না,তাও তার অসংখ্য কবিতা আমার মুখস্ত। এবং আমার যত কবিতা মুখস্ত, তা খুব বেশি লোকের মুখস্ত নেই। আমার রুচির পরিধি বোধহয় একটু বিস্তারিত। হুমায়ুন আজাদ একবার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে, জন্মান্ধ কবিতার কবি কিভাবে নজরুল অনুরাগী হয়! (নজরুলেরর ওপর সে একটু চটা ছিল) এইখানে হচ্ছে সমালোচকের ব্যাপার। বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ সমালোচক যারা যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, মোহিতলাল মজুমদার এরা নিজেন কবিতার বাইরে গিয়ে কবিতাকে সনাক্ত করতে পারেন। যা নিছক কবিমানুষরা পারেন না। আমি অনেক কবিতাকেই স্বীকার করি বা বুঝে নেই, যে এ-কবিতা আমার ধরনের নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একটা হ্রস্ব বিরতির পর আপনার মাছ সিরিজ বেশ একটা আলোড়ন তৈরি করে। আপনার সামগ্রিক কবিতাচর্চা থেকে মাছ সিরিজ বেশ ভিন্ন। এই ভিন্নতার বীজ কোথায় লুকানো ও কোথায় প্রস্ফুটিত?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: যে বইটা আমার বেরুবে তার শেষে হয়ত কিছু লিখেছিলাম। মাছ সিরিজও খুবই অল্প সময়ে লেখা। কিন্তু তখন আমি যে বিষয়ে পড়াশোনা করছিলাম, তা হল, এগুলো একেবারে বিশুদ্ধ প্রতীকী কবিতা। এখানে খুব সহজভাবে খুব অন্যরকম কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে আছে আধ্যাত্মিকতা, মরমীয়তা। মরমীয় দর্শন আমার সবসময়েই আছে। ধার্মিকতা আর মরমীয়তা কিন্তু আলাদা জিনিস। ধার্মিকতা হল টোটাল নামায, রোজা, আর মরমীয়তা হল ঈশ্বরবোধ। আমার সাহিত্যে যৌনতা, মরমীয়তা দুটোই একইসাথে প্রবল। একটা জায়গায় আমার অকপটতা আছে। যা মনে আসে লিখে ফেলি। ফলে মাঝে মাঝে মুশকিলে গড়তে হয়। এটা কেন হয় জানি না। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ হিসেবে নিজেকে অনেক সৎ মনে করি না। আমারও ব্যক্তিজীবনে অনেক আপোষ, অসততা আছে। কিন্তু সাহিত্যে তা নূন্যতম। আমি আমার এই বৈপরীত্যকে আড়াল করতে চাই না। যখন আমি সকল প্রসংশা তাঁর— লিখলাম, তখন সবাই নড়ে বসল যে, এই বই তো এর লেখার কথা নয়। আমার সাহস, অভিজ্ঞতাই আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা অন্য কারো হয় নি এবং প্রেমের অভিজ্ঞতা তেমন আমার ছিল না। ঐ অর্থে প্রথম জীবনে একটা ছিল। মধ্যবর্তী জীবনেও ছিল না এটা বললে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু তা তেমন আলোড়ন তোলে নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:
আপনার কবিতা পড়া শেষ করে একজন নিরপেক্ষ পাঠক হিসেবে আপনি কি আহরণ করেন বলে আপনি মনে করেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি কিছু বুঝতে পারি না। আমার মনে হয়, অন্য কারো লেখা।
Mannan-5
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিভাবে আপনার ভেতরে কবিতা তৈরি হয়? কোনও একটা সূত্র, নাকি বক্তব্য, নাকি চরিত্র, নাকি অন্য কিছু?
আবদুল মান্নান সৈয়দ:এটার কোন নিয়ম নেই। আমার সব কবিতার ক্ষেত্রে আমি আধ্যাত্মিকতার কথা বলব যে, আমি এটা পেয়ে যাই। আমি বিশ্বাস করি যে, এক আল্লাহই আমার অহংকারী জবান বন্ধ করে দিতে পারেন। লেখা বন্ধ করে দিতে পারেন। কিন্তু পিকাসোর মতই বলতে পারি, আমাকে খুঁজতে হয় না, আমি পেয়ে যাই। এত পেয়ে যাই যে, আমি নিজে কুলোতে পারি না। এখনো না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: লেখালেখি বা শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে সোর্স ছাড়া অন্য আর কীসের প্রয়োজন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: সেটা আমি জানি না। আমার নিজের লেখার বিচার তো আমি করতে পারি না। সোর্সটা আমি জানি না। সোর্সটা বিচিত্র। এজন্য অনেক সময় আমি গাছের কাছে গিয়ে বসে থাকি। আমি আকাশ দেখি, সকালবেলা উঠে দু ঘণ্টা শুয়ে বসে থাকি। রবীন্দ্রসঙ্গীত একটু বেশি শুনি। অন্য সঙ্গীতও শুনি। আমার কাছে প্রকৃতি আবার ফিরে এসেছে। এই যে বর্ষা কাল। শ্রাবণ মাসেই আমার জন্ম। এই শ্রাবণ মাসে ২ টা কবিতা লিখলাম। ”আমার বারবার জন্ম হয়, বারবার মৃত্যু হয়। আমি এক জন্মে বহুবার জন্মলাভ করেছি। বহুবার মৃত্যু হয়েছে আমার। এইটা আমার হয় ভাই। কাজেই আগের জন্মের কথা আমাকে জিজ্ঞেস করো না। আমি আবার গৌতম বুদ্ধের ভক্ত। তিনি বলেন, নির্বাণ যতক্ষণ না হয়, ততক্ষণ জন্ম হবে। তবে আবার সাপ— আবার কিভাবে যেন মানুষ হিসেবেই পূর্ণজন্ম হয়। যতক্ষণ না নির্বাণ হয়। এখন নির্বাণের কাছাকাছি বোধ হয় চলে এসেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কবিতায় সংশোধনে বিশ্বাস করেন না বলেছেন আগেই। আপনার কবিতায়, পত্রপ্রবন্ধে, গল্পে, উপন্যাসে এমন কি হয়েছে কোনদিন যে কোন চরিত্রকে আপনি দীর্ঘসময় ধরে লালন করেছেন? গড়ে তুলেছেন? অথচ লিখতে পারেন নি? কোন কবিতাটির জন্য অপেক্ষা করেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: সংশোধনে বিশ্বাস করি না এটা আমি প্রথম বইয়েই বলেছি। একটা কবিতার কথা বলি। এটা নির্বাচিত কবিতা। সময় প্রকাশনীর প্রকাশনা। এটি খুব অসম্পূর্ণ। কবিতার নাম তেসরা আষাঢ়। নিজেকে তো বোঝা যায় না। মানুষ বারবার নিজেকে বোঝে নতুন করে। নিজেকে মানুষ ধরাও দেয় না। এই একটি কবিতায় কেমন করে যেন আমার মনে হয়েছে আমি ধরা পড়ে গেছি। তার তিনটি স্তবক আমি আপনাকে শোনাই, এতে আমি বলেছি (এই রানু, বলে কবি স্ত্রীকে কবিতার খাতা আনতে বলেন, খাতা এলে দরাজ গলায় আবৃত্তি করেন) যখন দিনের সোনা ঝরে পড়তে থাকে/ আষাঢ়ের মুক্তবৃষ্টি উজ্জ্বল বাতাসে/ মনে মনে বলে উঠি নিজস্ব স্বত্ত্বাকে… //হারিয়েছি সুন্দরের কত আমন্ত্রণ/ চলে গেছে কত শত আষাঢ় শ্রাবণ/ ঠোঁটের উন্মুক্ত কত উন্মুখ চুম্বন//… ওরে শব্দ, সর্বনাশী, প্রকৃতির শত্রু,/ দ্বিতীয় প্রকৃতি তুই/ চেয়েছিলি হতে/ অসম্ভব/ যা মিলে, দ্রুত কালস্রোতে॥ শীতকাল এবং আষাঢ় শ্রাবণ আমার খুব প্রিয়। তো আপনার, কবিতা বলুন, শিল্পচর্চা বলুন, এটা প্রকৃতির প্রতিদ্বন্দী। এবং এটা মানে দ্বিতীয় প্রকৃতি হওয়া সম্ভব নয়। অসম্ভব। সমস্ত জীবনের অনেক আমন্ত্রণ বাদ দিয়ে যে শব্দের পশ্চাৎধাবণ করে গেলাম সে-ই-ই শব্দ, কিন্তু একসময় এসে বুঝলাম, সেই সর্বনাশিনীর আহবানে আমি জীবনের অনেক আমন্ত্রণ তুচ্ছ করেছি এবং সেই সর্বনাশিনীকে কখনো কোন সময় ধরা যাবে না। এটা এই সময়ে জীবনের এই পর্যায়ে এসে আরো উপলব্ধি করছি, হয়তো এ জীবনে কিছুই হলো না। সেজন্যেই এতো শুয়ে থাকি। আর, অপেক্ষা করার কথা বললেন, না এমন হয়নি কখনো, আমার তো গদ্য আছে। ইনশাআল্লাহ আমি বসলেই লিখতে পারি। আমার যখন এসে যায় তখনও লিখতে ইচ্ছা হয়। বিশ্বাস করুন কবিতা গল্প এসব আমি বসলেই লিখতে পারি। সেটাও লিখতে ইচ্ছে হয় না। এগুলো আমার কাছে মনে হয় প্রকৃতির দান। আর প্রবন্ধ আমি পারতাম না, আমি আবার জেদি কিন্তু খুব ভেতরে ভেতরে। খুব নির্জন কিন্তু ভেতরে অসম্ভব জেদি। বাইরে থেকে খুব ভালো মানুষ, কিন্তু ভেতরে এতো ভালো মানুষ নই। সাধুও নই। ফলে বোধের সাথে শিল্প আসলে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে চায়। কিন্তু শিল্পের সাথে সেটা সম্ভব নয়। তার উদাহরণ হচ্ছে জেমস জয়েস এর ইউলিসিস। একটা দিন, ষোলই জুন, তার বর্ণনা একহাজার পৃষ্ঠা, তাও শেষ হয়নি। ফলে শিল্পচেষ্টা মানেই হচ্ছে অসমাপ্ত ব্যর্থ চেষ্টা। মাতাল কবিতা পাগল গদ্যর ভূমিকায়ও দেখবেন এই কথা আমি বলেছি। এই রানু…
Mannan-6
(মান্নান ভাই এরপর রানু অর্থাৎ তাঁর সহধর্মিনীকে ডাকেন, আমরা খাই ও হাসাহাসি করি, এতে নাকি কবির বিশ্রাম হয়)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শুরু করি আবার মান্নান ভাই। একজন লেখক বা কবির প্রফেশনালিজম কতটুকু দরকার বলে মনে করেন? আপনি কতটুকু প্রফেশনাল?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: মোটেও না। লেখালেখি প্রফেশন হতে পারে না। আমি বেঁচে থাকার জন্য উঞ্ছবৃত্তি করেছি, কিন্তু সেসব আমার লেখালেখিকে স্পর্শ করতে পারেনি, কিংবা আমি স্পর্শ করতে দিইনি। আমি মোটামুটি ভালো চাকরি করেছি, কিন্তু আমার বিরামহীন শিল্পচর্চায় আমার চাকরির কোন ছাপ নেই। সেজন্য আমি আমার আব্বার কাছে ঋণী। এম.এ পাশ করিয়ে তিনি আমার চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি আমাকে এম.এ পাশ করিছেন। আমার আব্বা-আম্মা জানতেন যে আমি জীবন ধারণের অনুপযুক্ত। হয়তো শিল্পচর্চার জন্য উপযুক্ত, কিন্তু জীবন ধারণের অনুপযুক্ত। আমার আম্মার ইন্তেকালের পর থেকে বস্তুত আমি অসহায় হয়ে গেছি। কারণ আমি জীবনের জন্য অনুপযুক্ত। ফলে যারা বলেন আমি জীবনবিচ্যুত, তারা একদিক থেকে ভুল বলেন না। তবে আমার একটা চেষ্টা হচ্ছে যে যারা বলেন যে আমার কিছু হয় না, তাদের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। হয় না বলেই আমি আবার মাঝে মাঝে, বারবার লিখি, অজস্র লিখি, লিখে লিখে রাখি, যদি একটা দুটো হয়। এইজন্যেই আমি লিখি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: লেখককে কতটুকু সামাজিক হতে হবে বলে মনে করেন? অনেকে বলেন, একজন মানুষ সামাজিক না হলে তার পক্ষে লেখক হওয়াই সম্ভব নয়। লেখকের সামাজিকতা নিয়ে আপনার মতামত কি?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: কোন নিয়ম নেই। চূড়ান্ত সামাজিক নজরুল, চূড়ান্ত অসামাজিক জীবনানন্দ দাশ। দুজনই মহৎ কবি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যিনি লিখছেন, তিনি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়েও কোন সামাজিক বিশ্বাসকে সার্ভ করবেন। এরকম মনে করেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: জ্ঞাতসারে তো অনেকেই করেন। অজ্ঞাতসারেও করেন। যেমন আমি। আমি যেদেশে আছি, সেই দেশের জন্যে কি আমি কোন কাজ করিনি! আমার সাহিত্যের মধ্যে দিয়েতো আমি কওমের খেদমত করে গিয়েছি। বাঙালি মুসলমানের জন্য করেছি, পুরো বাঙালি জাতির জন্য করেছি। এবং এইটা কি এমনিই। আমার এই বিরামহীন শ্রম, আমার পুরো ব্যক্তিজীবনকে নষ্ট করে দিয়ে, আমি তো আমার পৈতৃক বাড়িতে আছি। আমি তো কোন গুলশানে বসবাস করি না। গুলশানে আমি যাইনি। আপনার, আমি একটি কাজই করেছি, আমি দেশ ও জাতির জন্য করেছি, অনগ্রসর বাঙালি মুসলমানের জন্য করেছি। সুতরাং আমি মনে করি, আপামর বাঙালি, মুসলমান আমাকে মনে রাখবে। আর মনে যে রাখবে এটা একভাবে আমি নিশ্চিত, নইলে আজকে বিকেলে আপনি আমার কাছে আসতেন না, আপনি এতো তরুণ, আপনার সাথে আমার আলাপ পরিচয়ও নেই, আমাকে ভালোবেসেই তো এসেছেন। আর একটা জিনিস আমি এই সুযোগে আপনাকে বলবো, আমি একটু আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়লাম, আমার সমস্ত হতাশা, ক্রোধ, বিদ্বেষ, এসবের বাইরে আমি যদি আমার লেখায় একটি কথা না বলে থাকি, সেই রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায়, ভালোবাসি ভালোবাসি, না বলে থাকি, তবে আমার কবিতা, আমার গল্পে, আমার উপন্যাসে সমস্ত সৃষ্টি মিথ্যে। আমার সমস্ত সাহিত্যে আমি মনে করি ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভালোবাসি ভালোবাসি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার সম্পর্কে বিভিন্নজন লিখেছেন, নানা ভাবে মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় গোটা বাংলা সাহিত্যের মধ্যে বিভিন্ন প্রবণতা রয়েছে, এর মধ্যে আপনি কোথায় আলাদা, অনন্য?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: এইটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি যে কারো কবিতা, সাহিত্য বিশ্লেষণ করতে পারি, করেছি, নিজের ক্ষেত্রে এটা অসম্ভব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সামনেই ২২ শে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: রবীন্দ্রনাথের সাথে আমার সম্পর্কটা গভীর। গভীরতম। ১৮ শ্রাবণ আমার জন্ম হলো, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হলো ২২ শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিত হয়ে মারা গেলেন যে এইবার আমি মারা যেতে পারি, একজন আসছে। আমার জন্মের তিনদিন পরেই তাহলে কেন ওঁর মৃত্যু হবে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার মতো বিদগ্ধজনদের মধ্যে শতকরা সবাই যে একটা সমস্যার ধাপ পেরিয়ে আসেন তা হচ্ছে যখন সমসাময়িকদের কাছে, বন্ধু-বান্ধব কিংবা কাছের মানুষদের কাছে যখন পরিষ্কার হয়ে যায় যে ঐ প্রতিভাধর মানুষটি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছেন বা সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে যাচ্ছেন তখন চারপাশের ঐ মানুষগুলোর কারো কারো কাছ থেকে এমন আচরণ আসতে শুরু করে যে সে যেনো এই সাফল্য মেনে নিতে পারছে না কিংবা এমন দুঃখজনক পোষাকী আচরণ করে এবং উপস্থিত অন্যান্যদের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করে যে প্রতিভাধর ঐ ভদ্রলোকের উপস্থিতি সেখানে যেন কোন অনাহুতের মতো বা কোন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীর মতো মানে বড়ো হতে চাইলে কাছের কোন না কোন মানুষের সাথে একটা অনিবার্য দূরত্ব তৈরী হবেই। আপনার উদ্ভাসলগ্নে কি আপনি এমন কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমার উদ্ভাসলগ্নে কেনো, এইমুহূর্তেও। আমাকে তো প্রতিমুহূর্তে, অগ্রাহ্য করা হয়। এবং রবীন্দ্রনাথের ঐ গানটা আমার প্রিয় এমনি নয়, “এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি খেলায় আমি যে গান গেয়েছিলাম, মনে রেখো” হয়তো আমারই দোষ। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় এটা আমার দুর্ভাগ্য সেই প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত আমি যে বিরামহীন লিখে গেলাম, আমি কোন স্বীকৃতি পেলাম না। সমসাময়িক বলুন, অগ্রজ বলুন, অনুজ বলুন, বিরামহীন আঘাত, প্রত্যাঘাত, আর আমার মনে বেজে চলা, কবে আমি একটু প্রতিষ্ঠিত হবো! আমাকে আহমাদ মাযহার আড্ডায় একবার বললো, মান্নান ভাই আপনি একই সাথে প্রতিষ্ঠিত এবং বিতর্কিত। তো আমি প্রতিষ্ঠিত শব্দটা শুনলে কিন্তু ক্ষিপ্ত হই। প্রতিষ্ঠিত সবাই হয় না। আমি মনে হয় কখনো প্রতিষ্ঠিত হবো না। দু’বার অসুস্থ হবার পরে যখন মৃত্যুর দুয়ার থেকে আমি ফিরে এসেছি তখন যখন আমি স্বীকৃতি হইনি, তখন আমার মৃত্যুর পরও আমাকে নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকবে। এই আমার বিধিলিপি। অসংখ্য লেখা হয়েছে আমাকে নিয়ে, আমার পক্ষে যত লেখা হয়েছে, বিপক্ষে তার চেয়ে ঢের বেশি লেখা হয়েছে। এবং আজও হচ্ছে। আমার সাথে গভীর সম্পর্কে সম্পর্কিত এই বাড়িতে আসতো আগে, আমার শিক্ষক, আমার বিরুদ্ধে লিখিয়ে আনন্দ পান। সেটা আমার দুর্ভাগ্য।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার শিক্ষক মানে? কণ্ঠস্বর এর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি তো নাম বলিনি। বলবো না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: থাক, যেহেতু বলতে চান না, আমিও বুঝলাম না, না হয়! বলুন—
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমার কোন কাজ নেই, তো আমি বিরামহীন প্রবন্ধ, গবেষণা করে গেছি, নাটক লিখেছি, আমি কেন এতো লিখবো এটা তাদের কাছেও মাথাব্যথা। ফলে এটাকে বিধিলিপি ছাড়া কি বলবো। এর ফলেও আমি কিছুটা অসামাজিক হয়ে গেছি। কিন্তু তারা বোঝে না, এটা না করে যদি আমার সাথে একটু ভালো ব্যবহার করতেন তাহলেই আমার ক্ষতি হতো, তারা এই বোকামীটা করেছেন। তার আমার উপকার করেছেন। তাদের কথায় ব্যথিত হয়ে আমি আরো বেশি লিখেছি। আমার শিক্ষক কেউ কেউ করেছেন এটা। সকলেই নন। আবু হেনা মোস্তফা কামালের মতো স্যারকে আমি শ্রদ্ধা করি, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো স্যারকে আমি শ্রদ্ধা করি, ড. রফিকুল ইসলাম স্যারকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু সকলকেই শ্রদ্ধা করতে পারি না। আপনাকে বলি, (হাতের বই দেখিয়ে) এই বই আমি উৎসর্গ করেছি খান সারওয়ার মুর্শেদ স্যারকে, উনিও আমার শিক্ষক, আমাদের পড়িয়েছেন, আমাদের সময়ে ফাঙ্কশনাল ইংলিশ পড়তে হতো, উনাকে দেখলাম, উনি, স্কুল থেকে আমার প্রসংশা শুরু করেছেন গায়ক খুরশিদ আলমের বাবা, প্রয়াত তসলীম উদ্দিন আহমদ, কলেজে হিশামউদ্দিন স্যার, আব্দুল লতিফ চৌধুরী, দুই জন, ইংরেজীর অধ্যাপক, নাম ভুলে গেছি, বলেন, আপনি কি কবিতা লিখেন! খুব আদর করলেন। কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে এসে আমার শিক্ষকদের কোন সহায়তা আমি পাইনি, পরে আমি যখন বিরামহীন প্রোগ্রাম আরম্ভ করলাম, ওদিকে কবিদের সাথে আমি অনুষ্ঠান করছি, সেরা অধ্যাপকরা তখন আমার বিরুদ্ধে বলতে লাগলেন, তখন কবিদের দ্বারাও ধিকৃত হতে লাগলাম, অধ্যাপকদের দ্বারাও ধিকৃত হতে থাকলাম। এটা আমার কপাল। এছাড়া আর কি বলবো!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবিকূলাচার্য রবীন্দ্রনাথের ভাষায়— আপনি কি সুর উঠলো বেজে আপনা হতে এসেছে যে, কবিরা এমনই সৌভাগ্যধর যে উনাদের ভেতরে অনন্যসব সাব্জেক্টম্যাটার এবং প্রকাশভঙ্গিগুলো আপনাতেই যেন-বা ভগবানের মত চলে আসে। কিন্তু তারা কোন স্থান-কাল-পাত্র মেনে কিন্তু আসে না। তো স্যার, আপনি আপনার কবিতা লিপিবদ্ধ করার নির্ধারিত ব্যবস্থার আগে বা লিখার পরিবেশের আগে এলোমেলো ভাবে উড়ে আসা কবিতার মণিরত্নগুলোকে ইথার থেকে কি ভাবে সংগ্রহ করে রাখতেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: কবিতা আমার কাছে চলে আসলে আমি ধরে ফেলি। চলে এলে আমি বরং যেতে দেই না। কখনো কখনো কবিতার প্রতি আমি অবহেলা করে ফেলেছি। অনেক চমৎকার লাইন মনে এসেছে, আলসেমী করে লিখিনি, আপনি নিজে কবি, আপনার কবিতার যে ধরন, আপনি বুঝতে পারবেন, আমার কবিতা যেই ধরনের যখন আসে তখন না লিখতে পারলে আর লেখা হয় না। আমার একটি কবিতা আছে নাম হচ্ছে, যে কবিতা লেখা হয়নি সে গিয়েছে কোথায়! সে অভিযানে ফিরে গেছে, সে শব্দের ভাণ্ডারে ফিরে গেছে। তো এটা খুব সুক্ষ্ণ একটা অনুভূতি। আমার গল্পও তাই। গল্পের থিমটা অনেক সময় এত সুক্ষ্ণ, ওটা হারিয়ে গেলে আর পুনুরুদ্ধার করা যায় না।
Mannan-3
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে গেলে তা চিত্রশিল্পই হোক আর কবিতাই হোক অধ্যবসায়ী মানুষটির জন্যে একটা নিয়তিকৃত নিয়মরহিত ব্যাপার অপেক্ষা করবেই। তা হচ্ছে কবিতা যেমন অনন্য এবং অসাধারণ বিষয় তেমনি কিন্তু অস্বাভাবিকও বটে। কবিতা অস্বাভাবিক এটা না মেনেও উপায় নেই। কবিতার অধ্যবসায়ী মানুষটির ব্যবহারিক জীবনে এই অস্বাভাবিকতার ছাপ আসতে বাধ্য যা তাকে পরিবার পরিজনসহ চারপাশের সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ পাওয়ার আগের এ অবস্থানগুলো প্রত্যেক কবির জন্যেই নিদারুন ছিল। প্রত্যেক কবিকেই সে যত স্বচ্ছল পরিবারেরই হোক না কেন এমন একটা অমানিশাকাল অতিক্রম করতে হয়। এ বিষয়ে আপনার জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে চাচ্ছি।
আবদুল মান্নান সৈয়দ: দেখুন, আমি যে বাংলা সাহিত্যে এতো কাজ করেছি ৪০ বছর ধরে, আমার আত্মীয় স্বজনকে বোঝাতে পারবেন না। তারা বলে ও কোন কাজটাজ করে না, বাপের খায়, ভাইদের খায়। আর এইটা হচ্ছে আমাদের সমাজ, সমাজের স্ট্রাকচারের কারণে। ফলে কবিরা একটু ভিন্ন গোত্রের। সেখানে আমারটা বোধহয় আরেকটু বেশি। এর একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ বলবো, আমাদের ত্রিদিব দস্তিদার, যার জন্য আমার হৃদয় ক্রন্দিত হয়, হৃদয় মথিত হয়, ত্রিদিব ছিলো আপাদমস্তক কবি। এবং কবিরা এখন প্রত্যেকেই একটু অসামাজিক। সামাজিক কবি, যেমন নজরুল ইসলাম, ও তো গোত্রছাড়া। তাই আপনি যে শব্দটা বললেন, অস্বাভাবিক করে দেয় কবিতা কবিকে। কবি কেন! মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাকেও, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, তাই কবিরা তো বটেই ঔপন্যাসিকেরাও, অর্থাৎ যে লিপ্ত, সৌখিন না সে অসামাজিক হতে বাধ্য, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সৌখিন মজদুর-ই নয়, যার কাছে লেখালেখি সৌখিন মজদুরি নয় সে মানুষটাই গোত্রছাড়া। সে মানুষটাই অন্যদের সাথে মিলতে পারে না। আমার পরিবারে আমরা ছ ভাই, আপনি কি মনে করেন ছ’ভাইয়ের সাথে আমার কোন মিল আছে! রবীন্দ্রনাথ যেমন ঠাকুর পরিবারে একটি, আমিও সৈয়দ পরিবারে একটি। আমার নামের পরে সৈয়দ। সবার মধ্যে আমি আলাদা। তাদের সাথে (অন্যভাইদের) কথা বলে আমার সঙ্গে কোন মিল পাবেন না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবিতার মধ্যে অনেক কবি গদ্যের স্বাদ এবং চেহারা চরিত্রকে আরোপ করে থাকেন; রীতিমতো সুখপাঠ্য গদ্যকে অনেকে সরাসরি কবিতাই বলে থাকেন। তাহলে চেতনাপ্রবাহরীতি এবং ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শন গদ্য রচনায় যেভাবে আরোপিত হয় কিংবা এগুলোকে কিয়ের্কেগার্দ, জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফরা যেভাবে গদ্যে প্রয়োগ করেছেন, যে ধারাটি বাংলা গদ্যে একভাবে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ নিয়ে এসেছেন সেভাবে গদ্যের অনুগামী হয়ে কবিতায়ও চেতনাপ্রবাহরীতি এবং ইয়োরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শন আরোপিত হতে পারে কি?

আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি বিশ্বাস করি যেটা, হতে পারে, নাও হতে পারে। মূল বিষয় যেটা আপনি কবিতা রচনায় সফল হলেন কি না! প্রকৃত বিচার হবে আপনি ওই যে গদ্য রচনার কথা বললেন, গদ্যাত্মক কবিতাও কবিতা। ব্রেখটের কিছু কবিতা আছে কেবল গদ্য কিন্তু অসাধারণ। ব্রেখট একবার কবিতার জাজ ছিলেন, কাব্যবিচারে, সেখানে এরিস্টটলের যে থিওরি, টোটাল থিওরিকে অস্বীকার করে তিনি কাহিনী কবিতাকে পুরস্কৃত করলেন, বিজয়ী করলেন। কাজেই, সুকান্তের কবিতা, সুকান্তের যে খুব সাদামাটা কবিতা একটি মোরগের কাহিনী, দেশলাই কাঠি, কিংবা সিগারেট এইগুলোকে আমিতো কবিতা বলে মনে করি, আমি এইগুলোকে সমান মূল্য দিই। বনলতা সেন যেই অর্থে মূল্যবান এটাও সেই অর্থে মূল্যবান। এটা নির্ভর করে কবি তার কবিতাকে স্রষ্টা হিসেবে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারলেন কি না! এখন জীবনানন্দ পেরেছিলো, সুকান্ত পেরেছিল, সকলের পারে না। অভিলাসী, অভিপ্রায়ী অনেকে আছে, কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে, শিল্পের সঙ্গে একটা কোথাও সাজুয্য না থাকলে এটা সম্ভব নয়। আজকে সুকান্তের রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিতাটা পড়ছিলাম। এই কবিতা রবীন্দ্রনাথের ওপর দশটা যদি ভালো কবিতা লেখা হয়ে থাকে তাহলে তার একটি কবিতা। চারটে লাইন মন্ত্রের মতো। জীবনানন্দের যেকোন কবিতাকে যে অর্থে মূল্যবান মনে করি সুকান্তের এই কবিতাকে সে অর্থে মূল্যবান মনে করি। সেটা নির্ভর করে, জীবনানন্দের মতো, হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে– এখানে ‘ধরে’ আর ‘হাঁটিতেছি’ সাধু-চলতি গুরুচণ্ডালী, ভুল, এটা কি আর ভুল মনে হয়। এটাই হচ্ছে আদর্শ প্রয়োগ। পিকাসো বলছেন, কে বলে অ্যাবস্ট্রাক্ট! অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্প বলে কিছু নেই! প্রতিটি শিল্পকর্মের মূল আছে বাস্তবে। যারা তথাকথিত বাস্তববাদী, আমি বলি তারা যেহেতু বাস্তবকে বাদ দেন সে জন্যে তারা বাস্তববাদী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কারো কারো শ্লোগান, কবিতায় কাব্যশ্রীবর্জিত পংক্তি লেখার চেষ্টা যেন থাকে। কেউ আবার বলেন— কবিতা লিখতে বসে কাব্যশ্রীর বাইরে আমি যাব না। রুচি নির্মাণে অনেকের মাধ্যমেই আপনি সমালোচিত। কাব্যশ্রী বা রুচির প্রশ্নে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি।
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমার পরিষ্কার কথা, আমি মনে করি শ্লোগানও কবিতা হতে পারে, গল্পও কবিতা হতে পারে। তার উদাহরণ আমি একটু আগে বল্লাম, তার উদাহরণ জীবনানন্দের কবিতা, সুকান্তের কবিতা। এখানে জরুরি কবিতায়নটা কবি করতে পারছেন কিনা!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শ্রেষ্ঠতম শব্দসমূহের শ্রেষ্ঠতম বিন্যাস হচ্ছে কবিতা— মনে হয় কবিতা এ পরিচয়ের মধ্যে আজকাল আর আটকে নেই। স্বর্গ এবং নরকে বিরাজিত অনুভূতিগুলো ধরে আনার জন্যে যে শব্দ এবং ছন্দের বিন্যাস শুধু মাত্র ছটফট করে কিন্তু প্রকাশিত হয় না আমি তাকেই কবিতা বলি। এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি কি? আপনার কাছে যদি কবিতার সংজ্ঞা চাওয়া হয় তাহলে আপনি কি বলবেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমার পরিষ্কার কথা, এখনকার কথা, যেকোন কিছুই কবিতা হতে পারে, শ্রেষ্ঠতম শব্দের সন্নিবেশ যেমন কবিতা হতে পারে, নিকৃষ্টতম শব্দের সন্নিবেশও কবিতা হতে পারে, যদি আপনি উত্তীর্ণ করতে পারেন। খুব সম্প্রতি আপনি যে আমার দুয়েকটা কবিতা দেখছেন এগুলো কিন্তু পুরোপুরি গদ্যাত্মক কবিতা, এগুলো কি কবিতা না! আপনি যে বিষয় এখন আমার কবিতায় দেখছেন, আপনিই বলছেন আমার বিষয়ের সঙ্গে আমার সেই ছন্দমিলের ঝংকার কোথায় গেল! এখানে তো বিশুদ্ধ গদ্য। কারণ এখনকার বিষয় গদ্যশীলতা দাবী করছে। এই বিষয়গুলোই আমাকে দিয়ে কবিতাকে উদ্ভাবন করেছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কবিতার প্রথম দাবী সে অস্পষ্ট হবে। সে শুধু চাঁদের আলোয় এলোচুলে দাঁড়াবে। দিনের আলোয় মুখের ন্যাকাবটাও খুলবে না। আসলে স্যার আধুনিক কবিতার চূড়ান্ত পরিচয় কি এটাই?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি এটা বলেছিলাম কিন্তু এখন এটা আমি বিশ্বাস করি না। যেকোন ডিরেক্ট কবিতাও কবিতা হতে পারে। ‘লাথি মার ভাঙরে তালা’ও চূড়ান্ত আধুনিক কবিতা। তাই যেকোন ডিরেক্ট এক্সপ্রেশনের কবিতাও কবিতা হতে পারে, সেটা নির্ভর করে কবির ক্ষমতার উপর।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার একটা কাব্যগ্রন্থের নাম সকল প্রশংসা তাঁর। আদিকালে কবিতার প্রধান কাজ ছিলো ধর্ম প্রচার করা অথচ বর্তমানে সত্যপ্রকাশ করতে গিয়ে সেই কবিতাই ধর্মের শৃঙ্খলে বাঁধাগ্রস্থ হয়। এই অসঙ্গতিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
আবদুল মান্নান সৈয়দ: এইটা তো খুব সেনসিটিভ প্রশ্ন, আমার জন্য খুব নাজুক প্রশ্ন হলো। আমার পরিষ্কার কথা হচ্ছে, আমি ব্যক্তিজীবনে যে বিলোড়নের মধ্য দিয়ে গিয়েছি সেই সময় ১৯৯৩ সালের দিকে, তারই ফসল হচ্ছে সকল প্রশংসা তাঁর । আমার মেয়েই আমাকে জিজ্ঞেস করে, আব্বা, তুমি সত্যের মতো বদমাশ লিখেছো আবার তুমিই লিখলে সকল প্রশংসা তাঁর! মেয়ে আমার বন্ধুর মতো। খোলামেলা সম্পর্ক। যতটা সম্ভব। আমি বললাম, দেখ, জীবন এরকমই। জীবন তোকে কোথায় থেকে কোথায় এনে ফেলবে, সেটা তুই জানিস না। আপনি জিজ্ঞেস করার আগেই আমি বলেছি, সকল প্রসংশা তাঁরকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এই প্রথম কেউ ইন্টারভিউতে এটা নিয়ে বললো। আপনার প্রস্তুতি তাই আমাকে প্রীত করছে। কেন করি, তার কারণ হচ্ছে, এইসব ভুলে গিয়ে আপনি বিচার করুন এটা কবিতা হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা! শামসুর রাহমানকে এই বই আমি দিয়েছি। আমি কিন্তু লুকোছাপায় বিশ্বাসী না। আমার পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকীতে উনারা সমবেত হয়েছিলেন। আবুল হোসেন সাহেবকে জিজ্ঞেস করলে তিনি রাহমান ভাইকে বললেন, মান্নানের কবিতা তো, সেতো কবিতা হয়েছে। আস্তিকতা, নাস্তিকতা দিয়ে কবিতা বিচার করা যাবে না। তাহলেতো রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে দিতে হবে ভাই। রবীন্দ্রনাথ তো আস্তিক মানুষ ছিলেন। আস্তিকতা নাস্তিকতা তাই কোন নির্ণায়ক নয়। আপনি আস্তিকতা দিয়েও অসাধারণ কবিতা লিখতে পারেন তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ রবীন্দ্রনাথ, নাস্তিকতা দিয়েও অসাধারণ মহৎ কবিতা হতে পারে উদাহরণ জীবনানন্দ দাশ। তো এইটা, জীবনান্দকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছে আপনি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন, তিনি বলেছেন, না। আমি বিশ্বাস করি মানুষের নৈতিকতায়। জীবনে একটি অনৈতিক কাজ করেননি। আমি সেইসময়, আরেকটা জিনিস আজকে আপনাকে বলি, আপনাকে খোলামেলা অনেক কথা বলছি শিমুল, এগুলো আগে বলিনি, আগের কথার সাথে এগুলো তুলনা দেবেন না, আর এক জায়গায় তো সবসময় থাকিনা, আমার যাত্রা তো, একটা মানস যাত্রা আছে, আমি যেটা দেখেছি, কবিতা আমাকে বাঁচায়ও, আশ্রয় দেয়, সকল প্রশংসা তার আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল, হে বন্ধুর বন্ধু হে প্রিয়তম আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল, আশ্রয় এটা দেয়নি এটা প্রশ্রয় দিয়েছিল, পরে আবার সাম্প্রতিক কবিতা বোধহয় আমাকে আশ্রয় দিচ্ছে। কবিতা আমার সবসময় আমার আশ্রয়ের উপকরণ, আপনারা কি বললেন, সমালোচক কি বললো, তা যদি পরোয়া করতাম তাহলে সকল প্রসংশা তার কি আমি ছাপতাম! বা এই এখনকার প্রেমের কবিতা সেগুলো কি আমি ছাপতাম! এগুলো আমার আশ্রয়। কবিতা আমাকে আশ্রয় দেয়। কবিতা আমার আবেগের নির্মোচন আবার আবেগের মুক্ততাও। কবিতা আমার দ্বারা প্রভাবিত হয়, তরুণ কবিরা আমার কবিতার দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু দেখি যে আমিও আমার কবিতার দ্বারা প্রভাবিত হই। ফলে এমন একটা জটিল মানসতার অধিকারী আমি, কবিতা আমি আবেগগ্রস্থ হয়ে লিখি, যে কবিতা লিখে ফেললাম তার আবেগ আমাকে তাড়িত করে। আশ্রয় দেয় আবার আশ্রয়চ্যুত করে, এ এক মহামুশকিলের ব্যাপার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটাই হয়তো জীবনের যাত্রা…
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আসলে কি মনে হয়, শিমুল, আমি মনে হয় খুব জটিল মানুষ। ফলে লোকে যে আমাকে ভুল বুঝেছে সেটার জন্য আমি খুব দুঃখ করি না। কেননা, আমাকে একেকজন একেকভাবে দেখেছে, যেমন আজকে আপনি আমার সাথে যে শ্রদ্ধা নিয়ে কথা বলছেন কালকে হয়তো আমার একটি লেখা পড়ে আপনার সে শ্রদ্ধা সমূলে বিনষ্ট হলো, তাতে আমার আবার ব্যথাবোধ হবে। আহত হবো আমি। শিমুল ছেলেটা আমার অনুরক্ত ছিলো সে এমন হলো কিন্তু আমি তো নিজেকে বন্ধ করে রাখবো না। আমার যে সৎ অনুভূতি সেটা আমি জানিয়ে যাবো। সুকান্ত যেটা বলেছে পৃথিবীর কাছে, সুকান্ত তার অনুভূতির কাছে সৎ ছিল, জীবনানন্দ তার অনুভূতির কাছে সৎ ছিল, তিনি বলেছেন, কবিকে তার অনুভূতির কাছে সৎ থাকতে হবে, তাহলে পৃথিবীর তাকে কোন একসময় দরকার হবে। আজকে জীবনানন্দকে দরকার হয়েছে, আজকে সুকান্তকে আমার কাছে দরকার হয়েছে, অনেকের কাছে হয় না, কিন্তু আমার কাছে দুজনকেই দরকার হয়েছে, কে কত বড় কবি আমি ভাই স্কেল নিয়ে বসি নাই, দুজনই সাচ্চা কবি।
Mannan-4
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি লিখেছেন, “মেঘ আমার বেদনা/ তারই ভিতরে লুকিয়ে আছ তুমি/সূর্য/এক-একবার ফলে উঠতে চাচ্ছ/ মেঘে আবৃত হয়ে যাও ফের// প্রথম উত্তুরে হাওয়া বইছে/হাওয়ায় ক্ষুধার ধার/ অন্ধকার হাওয়া প্রায় শিশ দিয়ে উঠতে চাচ্ছে/ সিল্ক মসৃণ একটা কালো পাখির মতো// আমার বেদনার উত্তুরে হাওয়া/কোন গোপন উৎস থেকে/এম্নি এক-একদিন জেগে ওঠে/ এম্নি এক-একদিন বয়ে যায়/ তোমার ডাক-নাম এক-একদিন বুকের খুব ভিতর থেকে বেজে ওঠে/ এক-একদিন নদীপাড় থেকে চীৎকার করে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে করে/ আমার চেতন-অবচেতনের পাহাড়ে-গহ্বরে/ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে এক-একদিন তোমার নাম/ কারফ্যুর কালো শহরে হঠাৎ মানবিক জয়ধ্বনির মতো/ নিশানে-ব্যানারে- পোস্টারে ছেয়ে-যাওয়া প্রতিবাদী শহরের মতো/এক-একদিন ইচ্ছে করে তোমাকে তোমার সমাজ সংসার সন্তান থেকে/ ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে যাই/ সবুজ বাগান থেকে একগুচ্ছ গোলাপ চুরি করে/ দেয়াল টপকানো দুষ্ট ছেলের মতো/ ভেঙে পড়া পাতা-ভরা ডাল নিয়ে চঞ্চল নীলজলের মতো// তোমার গ্রীষ্মমন্ডলের দেশ/ এক একদিন আমার মেঘ-মেঘালিতে ভরে যায়॥”— এই যে পড়লাম কবিতাটির বরাতে আপনার প্রেম প্রসঙ্গে বলতে চাই, প্রথম থেকে, আপনি বলেছেন আপনার বলার সময় হয়েছে, বয়স অনেক হয়েছে, আপনি অন্তরঙ্গ ভাবে অনেক কথা বললেন মান্নান ভাই, আপনি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন, এরপর আপনিও জানেন না এভাবে আর বসা হবে কিনা! আমিও জানিনা। আপনি এতো সুস্থভাবে কথা বলতে পারবেন কিনা! আমি জানতে চাই আপনার প্রেম নিয়ে, শামীম ভাই বলছিলেন আজকে, মান্নান ভাই তো এখনো প্রেম করছেন, তো, এই কবিতা প্রচণ্ড বেদনার কথা মনে করায়, তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে করে আমি ডাকতে পারি না, সেই কথা মনে করায়, এই যে বৈপরীত্য, পাওয়া এবং না পাওয়া…
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আপনি অসাধারণ আবৃত্তি করেছেন। এর মধ্যে একটি জিনিস লক্ষ্য করুন, যারা বলেন, আমার কবিতায় দেশকাল নেই, উপমাগুলো খেয়াল করুন, (আমি বলি, নিশানে ব্যানারে ছেয়ে গেছে দেশ) । আপনি ভালো পড়েছেন, আপনার মুখস্ত দেখে আমার চোখে জল এসে যাচ্ছে, আমার এই কবিতার কথা তো মনে নেই, মনে আছে এই আবেগের কথা। আমি জীবনে অনেক মেয়ের আহ্বান পেয়েছি। কোন কোন আহ্বানে সাড়া দিয়েছি, কোন কোন আহ্বানে সাড়া দিইনি। এবং এ কবিতা একটু আগের দিকে লেখা। পরাবাস্তব কবিতায় মনে হয় আছে। এটা আমার সারাজীবনের একটা সৌভাগ্যই বলবো, এটাও আমি না চাইতে পেয়ে এসেছি, আমি যাকে সময় দিতে পারি নি, তার জন্যও আমার গভীর বেদনা রয়েছে। সময় দিতে পারিনি কারণ ওহে শব্দ, সর্বনাশিনী, তার জন্য আমার হৃদয়ে বেদনা রয়ে গেছে। আমার প্রেম দুটো উত্তালতায় দুবার পৌঁছেছে। একটা উত্তালতায় আমার কৈশোরে, ডালিয়া যার নায়িকা, আরেকটা আমার উত্তালতা রবীন্দ্রনাথ যে বয়সে ওকাম্পোর দেখা পেয়েছিলেন সেই বয়সে। তো এই দুটো অভিজ্ঞতাই আমাকে তুমুলভাবে নাড়িয়ে গেছে, নাড়িয়ে গেছে মানে আমার ডালপালা শুদ্ধ নাড়িয়ে গেছে। শেকড়মূলডালপালাসমেত নাড়িয়ে গেছে। আবার যেখানে আমি সাড়া দিতে পারিনি, সব কথাতো বলা যায় না, বলবোও না, সেটা হচ্ছে, আমি শরীরকে অস্বীকার করিনা, প্রেমকেও অস্বীকার করি না, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে শরীরের প্রতাপ যেমন প্রবল, তেমনি হৃদয়ের প্রতাপও প্রবল। আমার শরীরী প্রেমের অভিজ্ঞতা যেমন আছে, বিশুদ্ধ হৃদয়, প্লেটোনিক প্রেম কোথায় যেতে পারে তারও উদাহরণ আছে। এসবের স্পর্শ আমি জীবনে পেয়েছি। আমার সারাজীবনে যেসব নারীর ভেতর দিয়ে আমি ভ্রমণ করে এসেছি, হয়তো অনেক কে অগ্রাহ্য করেছি, যাদের অগ্রাহ্য করেছি তাদের জন্যও আমার গভীর বেদনা রয়েছে। একটি মেয়ের কথা আজকে আপনাকে বলবো, অবশ্য তার নাম বলবো না। আমার ছাত্রী, টিউলিপ, এটা আমার প্রদত্ত নাম। টিউলিপ আমার জন্য উন্মাদ ছিল, যেভাবেই হোক আমার, আমি বোধ করিনি। কিন্তু তার জন্য এখন গভীর বেদনা বোধ করি আমি। আপনার ভাবী কিন্তু শিমুল আমার চাচাতো বোন। কাজেই পুরো বিষয়গুলো আমার জীবনে আছে, কিন্তু কিভাবে যেনো আবার দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমি আমার একটা কবিতায় লিখেছি, ‘অক্ষর’ কবিতাটির শিরোনাম, সরে যাক আমার অক্ষর, আমি তোমাকে ভুলবো না। এইটা কিন্তু অন্য কেউ বলেছে কি না আমি জানি না। অক্ষর কিন্তু ভুলে যাবে, আমার ক্রমাগত সংগ্রাম অক্ষর নিয়ে সেখানে কিন্তু ভুলে যেতেই হবে, তবে আমি তোমাকে ভুলবো না। এবং অনেকসময় আমার লেখাকে আমার শত্রু মনে হয়, যে আমি কি আমার প্রেমিকাকে ব্যবহার করলাম, আমি তার ভেতরের প্রবহমান উত্তাপকে ব্যবহার করলাম, কবিতার জন্য ব্যবহার করলাম, এটাতো তার সঙ্গে আমি অন্যায় করলাম! কিন্তু আবার মনে হয় পিকাসোর ডোরা মার, ফ্রাঁসোয়া জিলো, নেরুদা তাদেরটা এসেছে কেন! তাদের সমাজ আর আমাদের সমাজ তো এক না। তবে আমার যেটা হয়েছে, ‘অক্ষর এবং আমি’ নামে আমার একটা কবিতা আছে, তার শেষ লাইনে তাই আমি লিখেছি, সরে যাক আমার অক্ষর, আমি তোমাকে ছাড়বো না। তাই এইজন্য আমার গভীর বেদনা আছে, আমার রচিত অক্ষর তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু আমি তোমাকে ভুলছি না। জিনিসটা বুঝতে পারছেন, আমি এবং আমার অক্ষরের মধ্যে একটা ব্যবধান রয়ে গেছে কোথাও! আমার যে সন্ধান, যে আত্মিক সন্ধান সেখানে কোন নারী নেই। কিন্তু তুমি আমার মনে থেকে যাবে। এই যাওয়াটা আমি এখন বিশ্বাস করি। যে কোন বিচ্ছেদই বিচ্ছেদ নয়। তবু শূন্য শূন্য নয়, অগ্নিময়, ব্যথা বাষ্পে পূর্ণ সে গগন, একা একা সে অগ্নিতে দীপ্ত গীতে সৃষ্টি করি স্বপ্নের ভূবন। রবীন্দ্রনাথের পূর্ণতা নামে অসাধারণ একটি কবিতা আছে। প্রথম লাইনগুলি ভুলে যাচ্ছি। প্রথম লাইনগুলোতে আছে, একদিন রাতে তুমি বলেছিলে আমি যদি দূরে চলে যাই তাহলে কি তুমি আমাকে ভুলে যাবে! তারপরে, মৃত্যুরূপে, চুপে চুপে মৃত্যুরূপে/ মধ্যে এলো বিচ্ছেদ অপার/ দেখাশোনা হলো সারা/ স্পর্শহারা, সে অনন্তে বাক্য নাহি আর/ তবু শূন্য শূন্য নয়, অগ্নিময়, ব্যথা বাষ্পে পূর্ণ সে কবর, একা একা সে উদগীতে/ দীপ্তগীতে/ সৃষ্টি করি স্বপ্নের ভূবন। কাদম্বরী দেবী আমারও পাওয়া হয়ে গিয়েছে। এর বেশি আর কিছু বলবো না।

শিমুল সালাহউদ্দিন: আমি যৌনতা নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই বেদনার পর আর না এগোই।
আবদুল মান্নান সৈয়দ: আমি আগেই বলেছি। কোন অসুবিধা নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই অসুস্থ শরীর নিয়ে জন্মদিনের দিন আপনার বাড়িতে অনেক অতিথিদের সময় না দিয়ে আমাকে সময় দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আপনাকে মান্নান ভাই। আপনি আরো শত বছর আমাদের মধ্যে থাকুন আপনার অনুসন্ধিৎসু কাব্যযাত্রা নিয়ে। এই কামনা—

আবদুল মান্নান সৈয়দ: আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা। আপনাকে, আপনাদের সবার জন্য আমার শুভেচ্ছা। যে এইদেশের মানুষ, যত ছোটই হোক তার জন্যও আমার গভীর বেদনা রয়েছে। তার জন্যে আমার সমান ভালোবাসা আছে। আমাদের দেশ যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, এটা আছে বলে আপনি, আমি আজ বসে কবিতা নিয়ে কথা বলতে পারলাম। এই দেশ আছে বলেই এমন নতুন একটি কাগজ বেরুলো, একাত্তরের আগে হলে এটা আপনারও আসতে হতো না, আমারও কথা বলা হতো না, এ পত্রিকাও হতো না। কাজেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, আমি বিশ্বাস করি এদেশের স্বাধীনতা শত কিছুর পরও কেউ খর্ব করতে পারবে না, এ দেশ আমার থাকবে, এই বিশ্বাস রেখেই আপনাদের সকলের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে শেষ করছি।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (29) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abdus Selim — আগস্ট ৩, ২০১৬ @ ৮:১৯ অপরাহ্ন

      Reading Razu’s reminisces & this interview I’m suddenly overwhelmed in emotion. Mannan was one of my best friends and there was a time when I couldn’t even think of spending even one day without meeting him & spending hours together. I’d do anything to get those days back again!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন টিপু কিবরিয়া — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৯:২২ পূর্বাহ্ন

      অসাধারন, অমূল্য একটা সাক্ষাৎকার পড়লাম। খুবই সুন্দরভাবে পোট্রে করা হয়েছে মান্নান ভাইকে। আজীজ মার্কেটে প্রচুর আড্ডা দিয়েছি আমি কবির সাথে। সেইসব স্মৃতি উস্কে দিলো এই কথাবার্তা।

      মহাকাব্যিক সাক্ষাৎকারটি নেবার জন্য কবি শিমুলকে এবং প্রকাশ করার জন্য আর্টসকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরাফাত হামিদ — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন

      সাক্ষাৎকারগ্রহীতার প্রস্তুতি দুর্দান্ত ছিল। ঈর্ষা করার মতো একটা সাক্ষাৎকার হয়েছে। ব্রাভো শিমুল ভাই। লাভ ইউ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মিশু সাব্বির রহমান — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ১০:০২ পূর্বাহ্ন

      শিমুল ভাই, আপনে যে এতো বড়ো মাল আগে জানতাম না। স্যালুট আপনারে ভাই। আপনার ধৈর্য সাংঘাতিক ভাই। এত বড় জিনিস শুইনা লিখছেন কেমনে?
      একটানে পড়লাম ভাই। আমি সাহিত্যের লোক না হইয়াও খুবই আনন্দ পাইলাম। একজন সত্যিকারের সাধক আর ভালোমানুষ ছিলেন কবি মান্নান সৈয়দ। আপনি হাতে নাতে প্রেম করতেছে ধইরা ফেলাটায় খুব মজা পাইছি।

      মিরপুরে মানে ড্রিউড্রপে আসেন ভাই, কি খাবেন বলেন!

      খাওয়ানোর আগে আপনারে একবার জড়ায়া ধরবো, এই সাক্ষাৎকারটার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Masuda Kazi — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

      তোমার মুর্তজা বশীর ও অরুণাভ সরকারের সাক্ষাৎকার পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। এটাও হৃদয় ছুঁয়ে গেল। এমন কাজ আরো বেশি করে করা উচিত তোমার শিমুল। পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নিজের ইচ্ছায় যা করছো তার জন্য আমার সামর্থ থাকলে তোমাকে বড় পুরস্কার দিতাম। আফসোস, এই দেশে গুণীর কদর করে না কেউ। বিডিনিউজ তোমার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেও একটা বড় কাজ করছে। তাদেরও শুভেচ্ছা।

      মাসুদা কাজী
      সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Issa Ataur — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ১২:১৮ অপরাহ্ন

      নদীর পাড়ে গিয়ে চিৎকার করে বন্ধুকে ডাকব। আমার চোখ ভেজানোর জন্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আদনান সৈয়দ — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৩:৫৪ অপরাহ্ন

      আবদুল মান্নান সৈয়দের ভুবন আবিষ্কারের মজা পাওয়া গেল। অভিনন্দন কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কার্জন জোবায়ের — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৩:৫৫ অপরাহ্ন

      জড়তাহীন একটানে পড়া গেল। সাবলীল। স্বতঃস্ফূর্ত। ধন্যবাদ আর্টসকে। আরো এমন লেখা ছাপা হোক অন্য কবিদের নিয়ে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হিমেল আশরাফ — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৩:৫৮ অপরাহ্ন

      বাংলা কবিতার পাঠককে অবশ্যই আবদুল মান্নান সৈয়দ পড়তে হবে। এ সাক্ষাৎকার সেটাই বলে যাচ্ছে বারবার। আনন্দের এক পাঠ শেষ করলাম। অভিনন্দন লেখককে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নওশাদ পার্থ — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৪:০৬ অপরাহ্ন

      এক নিঃশ্বাসে পড়লাম। দুর্দান্ত সাক্ষাৎকার। প্রশ্নগুলিতে বোঝা যাচ্ছে কত ভাল প্রস্তুতি নিয়ে সাক্ষাৎকারটা নেয়া হয়েছে। প্রাণ থেকে করা বলেই এতো প্রাণোচ্ছল আর স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছে সাক্ষাৎকারটা। অভিনন্দন শিমুল ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জয়ীতা নাহরিন — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৪:০৮ অপরাহ্ন

      অসাধারন সাক্ষাৎকার। আমি সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর সাথে ধন্যবাদ দিতে চাই কবি শামীম রেজাকেও। তার কারণেই সম্ভব হয়েছে এমন একটা সাক্ষাৎকার নেয়া।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন asma sultana shapla — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ৭:২৯ অপরাহ্ন

      অসাধারণ এক পাঠ হলো, অনেক অনেক জানা হলো কবিতা সম্পর্কে, কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে। তাঁর কথা, ‘কবিতা আবেগের উত্তাল দশা ছাড়া লেখা সম্ভব না।’একটি অকাট্য সত্যি। আমারও একদম তাই মনে হয়। আর শিমুল সালাহউদ্দিনের নেয়া ইন্টারভিউ-এ কি যেন এক অন্য রকম কিছু থাকে। বরাবরই আমাকে দারুণ এক আনন্দ দেয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পবিত্র সরকার — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ১১:১০ অপরাহ্ন

      অত্যন্ত সর্বাঙ্গীণ এক সাক্ষাৎকার। আমি মানুষটিকে চিনতাম, কবিতার বাইরেও গল্পকার এবং সমালোচক হিসেবে তাঁর শক্তি ছিল অসামান্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মঈন চৌধুরী — আগস্ট ৪, ২০১৬ @ ১১:৩৭ অপরাহ্ন

      আমি পড়েছি। খুব ভাল লেগেছে। একটা ভাল কাজ হলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফারহান ইশরাক — আগস্ট ৫, ২০১৬ @ ১২:৩১ পূর্বাহ্ন

      ভূমিকাসহ সাক্ষাৎকারটা পড়লাম। চমৎকার। অবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ দুই বছরে বেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো আমার। কাঁটাচামচের জন্য একটা সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম তাঁর, কিন্তু সেটা এত দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছিলো না। আপনার নেওয়া সাক্ষাৎকারটা যেমন বিস্তৃত তেমনি তথ্যবহুল ও আন্তরিক। প্রশ্নোত্তরের বৈচিত্র্য আমাকে ঋদ্ধ করলো বেশ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফ জুয়েল — আগস্ট ৫, ২০১৬ @ ১০:০১ পূর্বাহ্ন

      প্রথমেই শুভেচ্ছা জানাতে চাই শিমুল সালাহউদ্দিন
      কে। তিনি সাক্ষাৎকার নিয়ে অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন। যারা আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক তাদের জন্য এটা অসাধারণ একটি লেখা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Debahuti Chakraborty — আগস্ট ৫, ২০১৬ @ ১:০৭ অপরাহ্ন

      সময় লাগলো পাঠ শেষ করতে । তারপরেও মনে হচ্ছে ,আরো সময় নিয়ে এই পাঠশালায় প্রবেশ প্রয়োজন । প্রতিষ্ঠিত এবং স্বেচ্ছা-নির্বাসিত কবি বা লেখক-গবেষক মান্নান সৈয়দ এর বক্তব্য তার নিজস্ব। যে কথাগুলো অনায়াসে মানি, তা হচ্ছে কবিতা কারখানার যন্ত্রতাড়িত বিষয় হতে পারে না। অবশ্যই আবেগ তাড়িত বিষয় । ধরণ যাই হোক। আদি কবি বাল্মিকীর কবিজন্মর মূলেও সেই আবেগ। আর এই কারণেই বিশ্বাস করি, কবির অন্তরাত্মাকে নকল করা যায় না ।সচেতনতায় শব্দ ,ছন্দ অঙ্গ তৈরি হয়। প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় অবচেতনে । আর সেখানেই কবি নির্জনতার সাধক।

      যাহোক,কবির মুখ থেকে তার ভালোমন্দ আবেগ অনুভূতি তুলে আনার কাজটা শুধু দক্ষতার নয়, অনেক পরিশ্রমের। সেই কাজটা খুব সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে। এখানে তোমার উদ্দেশেও বলা যায়, ”এ যেন সেই অভিমন্যু গর্ভাবস্থায় ব্যুহভেদ করতে ‘পেরেছ”।

      ধন্যবাদ শিমুল। এই মূল্যবান সাক্ষতকারের সাথে আমাকে পরিচিত করানোর জন্য, পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Gautam Guha Roy — আগস্ট ৫, ২০১৬ @ ৫:৩৪ অপরাহ্ন

      darun bolle kom bola hobe. A red salute to Interviewer and poet Shimul Salauddin. thanks to the Editor of this literature issue. Is there any other writings from this young writer here in arts?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব হাসান — আগস্ট ৫, ২০১৬ @ ৫:৩৮ অপরাহ্ন

      আমি আবদুল মান্নান সৈয়দকে, তার কবিতা,গদ্য এবং গল্প পছন্দ করি। তার জীবনের শেষ সাক্ষাৎকার আমার ভালো লেগেছে। যে সব চিন্তার ফল্গু তিনি মেলে ধরেছেন, আমাদের ভেতরেও তার ধারা বহমান। আমাদের কেউ কেউ তা ধরতে পারেন, বেশিরভাগটুকুই কেউ পারেন না। আমার এবং আবিদ আজাদের [সাতের দশকের অকালপ্রয়াত কবি] প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে মান্নান ভাইয়ের সাথে। আমি হয়তো তার কিয়দংশ লিখবো। সব লিখবো না। কারণ কিছু কিছু কথা অপ্রকাশিত এবং ভুল ধারণা দিতে উদ্যত হবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খালিদ সাইফ — আগস্ট ৫, ২০১৬ @ ১১:৫৩ অপরাহ্ন

      খুবই সাহিত্য মগ্ন মানুষ ছিলেন সৈয়দ সাহেব। এদেশে এমন মানুষ বিরল। সাক্ষাৎকারের জন্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাহাত মাহবুব — আগস্ট ৬, ২০১৬ @ ১:৫৬ পূর্বাহ্ন

      অসাধারন একটা আত্মজীবনীমূলক (প্রায়) সাক্ষাৎকার পড়া হল। এতো দীর্ঘ সাক্ষাৎকার, আন্তরিক, প্রজ্ঞাপূর্ন। সাক্ষাৎকারগ্রহীতাকে ধন্যবাদ একটা ঐতিহাসিক কাজ করার জন্য।

      সম্পাদকের কাছে জানতে চাওয়া, কৌতুহলে। আর্টস পাতা কি এমন লেখার জন্য সম্মানী দেয়?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nuray Alam Raympu — আগস্ট ৬, ২০১৬ @ ১:০৪ অপরাহ্ন

      শিমুল, বিশাল একটা সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েছি। উপভোগ করেছি সমুদ্রের ঢেউ। আর আপনার দুর্দান্ত সার্ফিং ।

      কবিতা সুস্বাদু কিন্তু অনন্ত অতৃপ্ত তৃষ্ণা, এমন মাধুর্যপূর্ণ আলাপ সেই তৃষ্ণাকে আরো মহিমান্বিত করেছে। খুব ভাল লেগেছে, এখানে ত্রিদিব ছিলো ।

      রবীন্দ্রনাথের আস্তিকতা, আমার ভাবনায় যেটুকু ভাসতো, তা আপনাদের কথোপকথনে আরো জোরালো ভাবে পেয়েছি।

      নজরুল যে সামাজিক, এটা জানতাম না, আর কেনো জীবনানন্দ অসামাজিক তার ব্যাখাও জানিনা। কিন্তু গবেষক হিসেবে সমুদ্রমান সৈয়দে আমার আস্থা রাখতেই হচ্ছে।

      খুব সুন্দর প্রশ্নগুলো রেখেছিলেন আপনি। তাতে তিনিও পুলকিত হয়ে উঠেছিলেন। এটা আপনার যোগ্যতাকে পরিস্ফুট করে আরো সুনিপুণভাবে।

      ভাল লেগেছে, সৈয়দ যে আমাদের ভালবেসে গেছে , সে আমরা যত ছোটই হই, তাঁর এই ভালবাসাকে শ্রদ্ধা জানাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শামস আরেফিন — আগস্ট ৬, ২০১৬ @ ৩:৩২ অপরাহ্ন

      একটা অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকার পড়লাম অনেকদিন পর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তামিম ইয়ামীন — আগস্ট ৬, ২০১৬ @ ৭:১১ অপরাহ্ন

      জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছের মতই, বাইরে শক্ত, ভিতরে নরম, এরকম উটপাখির ডিমের মত মানুষ সৈয়দ সাহেব। সেই শক্ত খোলস ভেঙ্গে ভিতরের কুসুম বের করে এনেছ তুমি। অভিনন্দন। এরকম আরো সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় থাকলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sazzad biplob — আগস্ট ৬, ২০১৬ @ ৯:২৯ অপরাহ্ন

      চমৎকার এ সাক্ষাৎকারটি আগেও পড়েছিলাম। আবারো পড়লাম। বারবার, বহুবার পড়ার মতো একজন বহুমাত্রিক কবিব্যাক্তিত্ব আবদুল মান্নান সৈয়দ। অসংখ্য স্মৃতি আমার তার সাথে। আমার লিটলম্যাগাজিন “স্বল্পদৈর্ঘ্য” এর নামলিপি তার করা। এ জন্য আমি গর্বিত। ইভেন, আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “কবিতাং শরণং গচ্ছামি” প্রকাশোত্তর, আমি যখন আলোচনা-সমালোচনায় জর্জরিত, তখন সমর্থন ও দিকলাভের আশায় কবিকে পাঠাই, পাঠোত্তর মন্তব্যের আশায়। উনি নিরাশ করেননি। সমর্থন করে একটি অমূল্য চিঠিও পাঠান। যা আমার গর্বের সম্পদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইমতিয়াজ কায়সার — আগস্ট ১৪, ২০১৬ @ ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

      সুখপাঠ্য সাক্ষাৎকার। শিমুল সালাহ্উদ্দিনের সাক্ষাৎকারে কি একটা যেন থাকে, খুবই আন্তরিক। অনন্য কাজ ব্রাদার। এগিয়ে যাও।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আহমেদ শিপলু তমাল — সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৬ @ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

      সাক্ষাৎকারের জন্য শিমুল একটা ব্র্যান্ড হইয়া উঠছেন। সৃজনশীল তারুণ্যের উচিত উনারে অনুসরন করা। এমন কাজ করা যায় তার প্রমান রাখার জন্য শিমুল সালাহ্উদ্দিনকে অভিনন্দন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলী মাহমুদ — আগস্ট ৯, ২০১৭ @ ৮:১৭ অপরাহ্ন

      কবি পরিচিতিতে ভুল আছে। উনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন না করেই চলে আসেন, কলকাতা থেকে।

      এটি সংশোধন হওয়া দরকার।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com