ভারতের দলিত কন্ঠের আপোষহীন ভাষ্যকার মহাশ্বেতা দেবীর প্রয়াণে

নন্দিতা বসু | ৩১ জুলাই ২০১৬ ২:১৫ পূর্বাহ্ন

Mahasweta1_0001মহাশ্বেতা দেবী চলে গেছেন। রেখে গেলেন তাঁর অজস্র কর্মসম্ভার, যার মধ্যে লেখা একটা বড় জায়গা অবশ্যই। কিন্তু লেখাতেই তিনি নিজেকে নিঃশেষ করেনি। কত অসংখ্য কাজ করেছেন নিরন্ন-ন্যাংটাদের জন্য, মেদিনীপুরের লোধা-শবরদের জন্য, পুরলিয়ার খেড়িয়াদের জন্য। বিহার-উত্তর প্রদেশের যে লাল লাখ শিশুশ্রমিক বস্ত্রশিল্পে, কার্পেট শিল্পে ভারতবর্ষের নানা জায়গায় লোপাট হয়ে যায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাদের সঙ্গে মহাশ্বেতা যুক্ত হয়েছিলেন। ‘সারা ভারত বন্ধুয়া মুক্তি মোর্চা’র কর্মীরা তা বিশদভাবে জানেন। মহাশ্বেতা লোধা মেয়ে চুনী কোটাল যাকে নিজের সম্পাদিত পত্রিকা ‘বর্তিকা’তে লিখিয়েছেন যে-লোধারা কোনদিন কোমরে দড়ি ছাড়া মেদিনীপুর-পুরুলিয়া শহরে ঢুকতে পারেনি, সেই সমাজের মেয়ে চুনী কোটালকে উৎসাহ দিয়ে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডী পার করিয়েছিলেন। আমাদের অশেষ দুর্ভাগ্য যে জাতপাতের দাপটে চূনী বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকতে পারলো না, নিজেকে শেষ করে দিল। (চূনীকে নিয়ে মহাশ্বেতা শিকার-পর্ব উপন্যাসটি লিখেছেন।)

বাংলার বিখ্যাত দলিত লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারী রিকশা চালাতেন। হয়ত গত শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিকে বা আশির গোড়ায় মহাশ্বেতা যখন বিজয়গড়ের জ্যোতিষ রায় কলেজে পড়ান, কলেজ শেষে একদিন মনোরঞ্জন ব্যাপারীর রিকশায় ওঠেন তখন মনোরঞ্জন ব্যাপারী যিনি জীবনযুদ্ধে লড়তে লড়তে রিকশাচালকে পরিণত হয়েছিলেন ও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা একটু একটু করে লেখার চেষ্টা করেছিলেন– তিনি মহাশ্বেতাকে ‘জিজীবিষা’ শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করেন। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিয়ে মহাশ্বেতা মনোরঞ্জনের হাতে একটা চিরকূট ধরিয়ে দেন, বলেন “কাগজে আমার নাম ঠিকানা লেখা আছে। সামনের রোববার আমার সঙ্গে দেখা করো”। চিরকূটে লেখিকার নাম দেখে মনোরঞ্জন লাফিয়ে ওঠেন কারণ একটু আগে তিনি অগ্নিগর্ভ বইটি পড়ছিলেন। এরপর থেকে মনোরঞ্জন ‘বর্তিকা’র নিয়মিত লেখক হয়ে যান। এই ঘটনাটি আমি মনোরঞ্জন ব্যাপারীর মুখে ২০০৪-এ হায়দ্রাবাদে একটি কনফারেন্সে শুনেছি। পরে তা ছাপাও হয়েছে।

এইভাবে কত লোককে যে মহাশ্বেতা অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছেন। একজন মুন্ডা ব্যক্তিও একবার ‘বর্তিকা’র সংখ্যায় জানিয়েছিলেন যে কত উৎসাহ দিয়ে মহাশ্বেতা তাঁকে পত্রিকায় লিখিয়েছিলেন।

আশির দশকের গোড়ায় মিলন নামে একজন মহিলা মহাশ্বেতার দেখাশোনা করত। মিলন ও অন্য আরেকজন পরিচারিকা– তাঁর নামটা মনে পড়ছে না–তাঁদের পড়ানোর জন্য মহাশ্বেতা একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন।

থাকতেন তো কত সাদাসিধেভাবে, বালিগঞ্জের দেড়খানা ঘরের ফ্ল্যাটে। সঙ্গী নির্মল ঘোষ ও তাঁর কিশোর ছেলে খোকনও ওখানে থাকত। গাড়িরাবন্দোর উপরে ঘোরানো লোহার সিড়ি দিয়ে উঠতে হয়। ফ্ল্যাটের দরজা কখনোই বন্ধ হয় না, অনবরত লোকের যাওয়া-আসা চলছে। তারই মধ্যে ঘরের কোনে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে মহাশ্বেতা লিখে চলেছেন, দিনে ১৭/১৮ ঘন্টা করে।

কাউকে তোয়াক্কা করতেন না মহাশ্বেতা দেবী, মুখের আগল বলে কিছু ছিল না, যার জন্য সকলেই তাঁকে সমঝে চলতো। আর তোয়াক্কা করবেনই বা কেন? ছোট্ট ছেলে নবারুন, প্রায় উপার্জনহীন স্বামী বিজন ভট্টাচার্যকে ফেলে ঝাঁসী চলে গেলেন নিজের ২৫/২৬ বয়সে লক্ষীবাই-এর জীবনী রচনার মালমশলা সংগ্রহ করবেন বলে, করলেন ও লিখলেনও জীবনী যা ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে থাকলো। কম্যুনিস্ট সন্দেহে সরকারী চাকরী থেকে বরখাস্ত হলেন, তা কখনো আমেরিকায় বাঁদর রফতানীর ব্যবসা ধরলেন, কখনো বা রঞ্জক সাবান বানানোর কাজ। জিম করবেট রচনাবলী অনুবাদ করলেন, OUP( Oxford University Press)-এর হয়ে আট খন্ডে শিশুপাঠ্য বাংলা ভাষা শেখার বই আনন্দপাঠ লিখলেন, সাহিত্য একাডেমীর হয়ে Makers of India series এর তারাশঙ্করের জীবনী ইংরেজিতে লিখলেন। মধ্যযপঞ্চাশ বা প্রথম ষাটের দশকে দশটা টাকা পকেটে থাকলে ঐ সময়ের কম্যুনিষ্ট মাতদর্শে দীক্ষিত ব্যক্তিদের আত্মপ্রত্যয় যেন অনেক বেড়ে যেত একথা তাঁরা নিজের মুখে বলতে শুনেছি।

লেখার কাজে সময় বার করবার জন্য মহাশ্বেতাকে অনেক সময় অভদ্র/নির্দয় হতে হয়েছে। একটা উদাহরণ দেবো। ১৯৮৮ নাগাদ মহাশ্বেতা একবার আমার কাছে তাঁর ‘অমৃত সঞ্চয়’ বইটির একটি ফটোকপি চান, কলকাতায় নাকি বইটি পাওয়া যায় না। আমি বইটির ফটোকপি তৈরি করে আমার এক বন্ধুর হাত দিয়ে পাঠাই। সে একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটোকপিটি মহাশ্বেতাকে দিতে যায়, ইচ্ছে, এতবড় লেখিকার সঙ্গে একটু কথা-টথা বলার। মহাশ্বেতা নাকি ফটোকপির প্যাকেটটি হাতে নিয়ে বলেন, “আচ্ছা ভাই, অনেক ধন্যবাদ”। আমার সে বন্ধুটি তো খুবই অপমানিত বোধ করে, কিন্তু মহাশ্বেতা জানেন লেখা আর ভদ্রতা পরস্পরের বৈরী। একটা করলে আরেকটা করা যায় না। লেখার প্রতি দায়বন্ধ হতে হলে স্বভাবের কোমলতা খানিকটা হত্যা করতে হয়।

দেজ থেকে তাঁর পুরো রচনাবলী বেরোলে ২৫ খন্ড মনে হয় ছাড়িয়ে যাবে। তা-ও জীবনের শেষ কয় বছর তো কিছুই লেখেননি প্রায়।

কী আছে মহাশ্বেতার লেখায়? যে বিষয়বস্তু নিয়ে মহাশ্বেতা লিখেছেন, অন্য কিছু কিছু লেখকও সেই একই বিষয়বস্তু নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু মহাশ্বেতার রচনায় ঐ বিষয়বস্তু যেন ত্রিস্তরীয় বাস্তবতায় অবয়ব পায়: “… এই সব আদি অধিবাসীরা ভারত সরকারকে না জেনে নানাবিধ মর্মপীড়া দেয়। উন্নয়ন দপ্তরকে ডিফাই করে এরা অনুন্নত থাকে।

MAHA
‘ছবি: লেখিকার সঙ্গে সদ্যপ্রয়াত মহাশ্বেতা দেবী
ছুয়াছুত সরকারের পছন্দ নয় জেনেও এরা উচ্চবর্ণকে ভয় পায়। দেশের ধনসম্পদে এদের অধিকার থাকাই সরকারের ঘোষিত বাসনা, তবু ম্যাঙ্গাঁনিজ, বকসাইট, মাইকা লোহা, তামা, সিমেন্ট, কয়লা সব অনাদিবাসীদের হাতে তুলে দিয়ে এরা দূর থেকে অনাহারে শীর্ণ শরীর নিয়ে কলকারখানার শোভা দেখে। সবচেয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার হল, আকালের সময় দেশি ও বিদেশী প্রেস ফটোগ্রাফার এলে এরা কেন যেন ছবি তুলতে দেয় এবং মানুষ নামের ক্যারিকেচারসদৃশ সেসব চেহারার ছবি বাইরে প্রচার হয়ে ভারত রাষ্ট্রের ইমেজ নষ্ট করে। আসলে এঁরা দুঁদিয়া খচ্চর”। (জগমোহনের মৃত্যু,–নৈঋতে মেঘ, মহাশ্বেতা রচনাবলী, ১০ম খন্ড, পৃ ৩১৩, দেজ, কলকাতা) এই ছোট্ট অংশেই যে ব্যঙ্গ-ক্রোধের মধ্যদিয়ে সাধারণ নাগরিকদের পীড়নকারী ভারতরাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে, আর কোনো লেখক কিন্তু তা করতে পারেননি। বিভূতিভূষন বন্দ্যোপাধায় খুবই বড় লেখক। কিন্তু আরণ্যক উপন্যাসে যে ধাতুরিয়া, মুনেশ্বর সিং বা ভানুমতীর ছবি আঁকা হয়েছে তারা যেন প্রকৃতিসৃষ্ট মানুষ, তাদের সরলতা পরিশ্রম ক্ষমতা আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু তাঁদের করুন অবস্থা যেন নিয়তিনির্দিষ্ট, তারা যেন কখনোই নিজের ভাগ্যকে জয় করতে পারে না। অন্যদিকে, মহাশ্বেতা আদিবাসীদের অবস্থার জন্য সরাসরি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেছেন আর তার জন্য হাতিয়ার করেছেন এক অসম্ভব ব্যঙ্গময় ভাষাকে।

বহুপঠিত ‘দ্রৌপদী’ গল্পটাই ধরা যাক, নারীবাদীরা তো গল্পটির শরীরে নারীবাদের জবরদস্ত তকমা এটে দিয়েছেন। এই গল্পটি যখন প্রথম ১৯৭৭-এ ‘পরিচয়’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল মনে হয়েছিল এর আগে সমগ্র ভারতবর্ষ তার বহুভাষিক, বহুজতিক সত্তা নিয়ে কোনও একটি গল্পে এভাবে মূর্তি লাভ করেনি। এই প্রথম দেখা গেল ভারতরাষ্ট তার নাগরিককে চেনে না, তার ভাষা বোঝে না। ধরা পড়ার পূর্ব-মুহর্তে আকাশ ফাটানো গলায় দোপদীর কুলকুলি ‘হামারি সাজুলেনেকো মার গোয়ে কাপে’র অর্থ উদ্ধার করতে দুই মক্কেলকে উড়িয়ে অকুস্থলে আনানো হয়। কারণ দোপদীর মুন্ডারী ভাষায় দেওয়া কুলকুলি যাতে সে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা নকশাল কর্মীদের জানায় যে ‘আমাদের সবাইকে ধরবার জন্য লোক এসে গেছে।’ তা কেউ বুঝতে পারে না। সত্তরের দশকের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাদী আন্দোলন ভারতবর্ষের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ‘গপ্পো’কে সবার সামনে ফাঁস করে দিয়েছিল, গ্রামে/জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা নকশালকর্মীকে ধরবার জন্য পুলিশের জিপ কীভাবে যাবে? রাস্তা কোথায়? ভদ্র, শিক্ষিত, আর্মি অফিসার নগ্ন দোপদীকে কীভাবে মোকাবেলা করবেন? তিনি যে সকালে ব্রেকফাস্ট-খাওয়া, কাগজ-পড়া রেডিও মেসেজ শোনা ভদ্রসন্তান। নগ্ন দোপদী তাকে ‘কাঁউটার’ করতে বলে। কারণ সম্পূর্ণ নিরক্ষর হলেও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে কাউটার মানে হাত পেছন থেকে বেধে দিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাক গুলি চালনা। ‘কাঁউটারের মানে নিয়ে আধুনিকোত্তর পন্ডিতরা গলদঘর্ম হলেও দোপদী শব্দটির আসল অর্থটা জানে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। আর সঙ্গে সঙ্গে গল্পটিতে এই ব্যঞ্চনাও থাকে যে “[তুই/তোরা] কাপড় খুলতে পারিস, পরাতে পারবি? মরদতু? লে, কাউটার কর।” দোপদীর এই প্রশ্নের উত্তর সেনানায়ক কীভাবে দেবে। সে তো পুরুষ নয়। দোপদী গল্পের পূর্ব বঙ্গের ভাষা, পশ্চিমবঙ্গের ভাষা, মুন্ডারী ভাষা, হিন্দি, পাঞ্জাবী ইংরেজী সব ভাষা ব্যবহৃত হয়ে বহুভাষিক ভারতবর্ষের একটি মানচিত্র যা বহুজাতিকও– কত অনায়াসে যেন লেখিকা এঁকে ফেলেন।

মহাশ্বেতাকে নিয়ে আজ আমরা শোকাহত, আবেগাপ্লুত কিন্তু তাঁকে ঠিকমত বোঝারও দরকার আছে। তাঁর সমগ্র শিল্পকর্মকে বিশ্লেষণ করার মত বীক্ষণযন্ত্র যদি আমরা বের করতে না পারি তাহলে তাকে ঘিরে আমাদের সকল আবেগই কি নিছক অর্থহীন উচ্ছ্বাসে পরিণত হবে না? একি শুধু হুজুগ মাত্র? আর কিছু নয়?

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত নন্দিতা বসুর লেখা ও সাক্ষাৎকার:
তসলিমা নাসরিনের ‘নির্বাচিত কলাম’ নিয়ে কিছু প্রশ্ন

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত মহাশ্বেতা দেবী সম্পর্কে অন্য লেখকের লেখা:
মহাশ্বেতা দেবী: সাক্ষাতে, অসাক্ষাতে

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খলিল মজিদ — আগস্ট ১, ২০১৬ @ ১১:২৪ পূর্বাহ্ন

      এত অল্প কথায় মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও লেখাকর্মের জাতটা চিনিয়ে দেয়ার সক্ষমতা রাখেন সম্ভবত নন্দিতা বসু-ই। মানুষ মহাশ্বেতা, নাগরিক মহাশ্বেতা, সমাজবাদী মহাশ্বেতা, নির্যাতিত ও বঞ্চিতদের বান্ধব মহাশ্বেতা, বাংলা কথাসাহিত্যের স্বতন্ত্র ভাষা-নির্মাণকর্মী মহাশ্বেতা- এমন নানান বৈশিষ্ট্যের পরিচয় এই একটুখানি লেখায় আমরা পেয়ে যাই।

      লেখিকা নন্দিতা বসুকে সাধুবাদ জানাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com