তৌহিদুল ইসলামের সাতটি কবিতা

তৌহিদুল ইসলাম | ২৭ জুলাই ২০১৬ ৪:২৮ অপরাহ্ন

বৃষ্টিতে, ইতিহাসতলা

এখন কি বৃষ্টিতে ভিজার সময়?
জুবানো ছাতারা হাসে ইতিহাস তলা—
আমারে দিয়েছে ডাক গোলামের পোলা,
তবু আকাশ কেন সে এত হয়েছে মেঘেলা!

ছাতারা হেঁটে গেছে হাঁটু পানি কেটে
রিকশার ফনা তোলা উর্বশী হাত
তিনি কি মনসা, মাগো, ভিনদেশি রাতে
চাঁদ পারিবেন নাকি এ বাসনা ফেটে
ভেসে যেতে বঙ্গ সাগরে, তাঁর দাস ব্যবসাহে—
এইসব গোলামের পুত্রদিগেরে তিনি করিবেন পার
মালয় সাগর থেকে আরো দূর সুমাত্রা জাভার!
Touhid
অথবা ভূমধ্যসাগরে কি খালি আরবীরাই
ভেড়াবেন তরী? নাকি তারা সিরিয়ার?
গ্রিস কি ইতালির লুম্পেডুসায়
ইনিসের সাথে যদি হয়ে যাবে দেখা-
পিছনে যে পুড়িতেছে ট্রয়ের নগরী
হেলেন হেলেন তিনি পড়ে আছে কোথা?

মালিবাগ মোড় থেকে কোথায় লুকালেন তিনি?
যদি সে রিকশায় অথবা ভ্যানের পিছনে
পলিথিন গায়ে একা একা মেঘেদের
ছদ্ম-কলাকুশিলব হয়ে থাকেন—

তবে ইতিহাস, ওগো ছদ্ম-উদাসিনী,
একটা সেলফি তুলে দাও দিখিনি!


শ্রীকৃষ্ণ সংবাদ

কী নিয়া কথা কবো
বলো হে রাধিকা, এই ইস্যুহীন রাতে
আমাদের পাতে তুলিয়া দিবার মত
কোন সংবাদ শিরোনাম নাই আজিকার;

গোপী সকল দ্যাখো ভাজিতেছে খই
শ্রীকৃষ্ণ বিরহে; তিনি কোথা?
কাব্যরে মূলত সংবাদ মনে করে
তাহার সংগ্রহার্থে আপনিই হয়েছে নিখোঁজ!

নিদেনপক্ষে মৃত্যু সংবাদ হইলেও দাও তার
এই নিরবতা ভেঙে
শোকে বিদীর্ণ হয়ে উঠতে পারি যেন;
গেয়ে দিতে পারি যেন আরেকটা কবিতা।

প্রিয় ফুল খেলবার দিন

Blood is the rose of mysterious union…

সৌন্দর্যের ধারণা নিয়ে ফুটে ওঠা ফুল
তুমি বলি হলে প্রেমে; (আগের জন্মে যিশু
ছিলে নাকি?) করুণার বিজ্ঞাপনে যেন
ঈশ্বরের অহংকার ছেটে নির্দ্বিধায় ক্রুশে উঠে গেলে;
প্রেমের পবিত্র জ্ঞানে গাঁথা হলো রক্ত পাপড়ি!

কিতাব লেখা হলো ভারী ভারী, কাব্য লেখা হলো-
মানুষের মুখে মুখে কীর্তন উঠিলো তব নামে,
প্রভূত প্রতিভা ব্যয়ে গড়া হলো তোমার প্রতিমা;
রাজকীয় ফরমান জারি হলো, তোমার মন্দিরে,
তোমার পায়ের তলে বলি হলো অজস্র ফুল।

আজও কি মানুষ তবু উদ্বেল হবে না বলো প্রেমে?
ভালোবেসে ছিড়িবে না ফুল? বলিকাষ্ঠে বাড়িয়ে
দেবে না গলা? পবিত্র কিতাবের নিচে, নতুন পতাকা
তলে সটান গাইবে না বসে ভ্রাতৃহননের গান?

বসন্ত! বসন্ত!

প্রাণে ভক্তি আসলো না, তবু,
এই বসন্তে, এই রূপের সাগরে
ঝলক মেরেই তুমি হারিয়ে যেওনা-
দেখা দিও ছদ্মবেশে,
অন্তত দূর থেকে যাতে চিনে নিতে পারি
দিও সেরকম চক্ষু আমার।

অথবা বিভক্তিতেই তোমারে খুঁজতেছি;
ফ্যাসাদ আর অতিভক্তির লেজে
যেই যেই নাম আর পরিচয়ের মোহর আঁকানো আছে
তার থেকে খসে যাবে বসন্তের আয়ু-
চৈত্রের ঝাঁ ঝাঁ দিন নেচে উঠবে
এসো হে বৈশাখের সমস্ত বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়ে!

মঙ্গলবারতা

একবারের জন্যেও যদি আমি
মানুষের মঙ্গল কামনার ফাঁকে ফাঁকে
তাহার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতাম!

এই গোপন বাসনার থেকে থেকে দূরে আছি বলেই
টিকে আছে আমাদের বৈধ প্রনয়;

আর দ্যাখো ভিতরেই কারা কত কিছু চাই বলে
চেঁচামেচি শুরু করে দিছে,
ছুটে যাচ্ছে ঘন ঘন যৌন মনোযোগ
শিথিল হয়ে আসছে শিশ্নের উত্থান!

আর আমি যত দ্রুত কোন কিছু ভুলে যেতে পারছি
তত বেশি আধুনিক হয়ে উঠছি,
আর লিখে ফেলছি শতশত প্রোজেক্ট প্রোপোজাল-

এই গাঙ্গেয় ডেল্টার ধারে
কালো কালো মানুষের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষার ভিতরে নেমে।


কাব্যকল্পদ্রুম

কী জন্য যেন অপেক্ষা করতেছি, নির্বাক ডিমের ভিতরে বসে
গাহিতেছি স্বরচিত রবীন্দ্র সংগীত, এই আউলা ঝাউলা কালে,
মাথার ভিতরে এক শান্তিকল্যান বিরাজিত রহে, হে পরম,
আপন হইলা না তুমি, কীবা দোষে, তুমি রইলা পরেরও চরম!

সাক্ষাত দোটানায় আছি, অথবা ততোধিক টানা, আমারে
টানিতে আছে, টানতে টানতে, টাঙায়ে রেখেছে এই ঘরে,
অফিস কক্ষে, ফেসবুকে, মানুষের অনিবার্য সম্মুখের বেগে,
এক নৈতিক জাতিসংঘ বোধ তবু দারোয়ান বাসনা বাজারে।

হয়তো অজানা, একটু আগেও যারা মনে ছিল, ভুলে গেছি,
সংবাদ শিরোনামগুলি, গতকাল যাহা কিছু ঘটে নাই বলে
আগামীর সম্ভাবনা ওৎ পেতে আছে, আর ঘটবার তাড়নায়
ডিমের খোলস ছেড়ে চুঁইয়ে পড়েছে বাক্যেরা, অসমাপ্ত ভাষা।

ফাটা ডিমেই তাই দিতে আছি তা, যদিও মনে অনুতাপ নাই বলে
ফুটবে না ফুটবে না, বাক্যগুলি কাব্য হবে না, তারা পেতে দিবে
মাথা, আগামীকল্যের এক স্বকীয় রেললাইনে, না ঘটা সংবাদ
শিরোনাম হবে শুধু, অজস্র পাতায়, যারা শীতকালে গেছিল গা ঝরে।

বাক্যমনের গান

এই দেহ যে সুর ধারন করে দেহে
সেই সুর যে বাক্য অভিলাষে
সেই বাক্য তোমার আধারে,
মনে বাক্য নাই তাই কাব্য লেখি না।

ছিলাম হদ্দবোকা চাষা
এই ভাষা কার শরীর ধারন করে
কান্ধে কীসের জোয়াল আছে বসা
সেই সন্ধানে আসি তোমার কাছে-

এই যে এ সুর অন্য কোথাও বাজে
সম্প্রচারে দেহের ইস্টিশনে
যে বাক্য পাই তাও লাগেনা কাজে
যে অভিলাষ হর্ষ করে মনে

মিথ্যা তাহা, অন্য কারোর হয়।
তারচে আসো পরস্পরে চাষি
বাক্য ফলাই পরস্পরের মনে-
মনে বাক্য নাই তাই কাব্য লেখি না।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — জুলাই ২৭, ২০১৬ @ ১০:৫০ অপরাহ্ন

      ভালো গালার জন্য পড়লাম। কিন্তু পুরো সময়টাই নয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুম বায়েজীদ — জুলাই ২৮, ২০১৬ @ ৪:০৬ অপরাহ্ন

      কবিতাগুলো দুর্দান্ত লাগল। সাম্প্রতিকের সাথে ইতিহাস বা মিথের ব্লেন্ডিং অসাধারণ। সামগ্রিক একটা বিশ্ববিক্ষা আছে এই কবির।

      সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল পাঠক হিসেবে হেলাফেলা করে কবিতাগুলি পড়েছেন, তা তার মন্তব্য দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ভালো ‘লাগা’ ব্যাপারটা আবার কি?

      নতুন কিছু নিতে পারা কবির ও পাঠকের যোগ্যতা। এই কবির কবিতা নতুন লাগল আমার কাছে।

      কবির জন্য শুভকামনা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুস্তাফিজ রহমান — জুলাই ২৯, ২০১৬ @ ১০:৫১ অপরাহ্ন

      চমৎকার, কবিতাগুলো পাঠ করে নতুন সোয়াদ পেলুম…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com