পাবলো নেরুদার প্রাচ্যবাসের অভিজ্ঞতা ও দুটি কবিতা

রাজু আলাউদ্দিন | ১৩ জুলাই ২০১৬ ১০:১৭ অপরাহ্ন

pablo nerudaলাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ভারতবর্ষে চাকরিসূত্রে এসেছিলেন। কেউ কেউ নিছক ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতি কৌতূহল থেকেও এসেছিলেন। আমাদের মনে পড়বে অক্তাবিও পাসের নাম, মনে পড়বে পাবলো নেরুদার নাম। মনে পরবে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কথাও। এসেছিলেন হুলিও কোর্তাসারও ১৯৫৯ সালের দিকে। কলকাতা শহরের সাধারণ রাস্তাঘাটের দৃশ্যাবলির বর্ণনাসহ রয়েছে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ লেখাও। এসেছিলেন আর্হেন্তিনার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রিকার্দো গুইরালদেসও ১৯১০ সালে, যিনি নিজ দেশে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মাধ্যমে ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিতি হয়েছিলেন।

নেরুদা ভারতে এসেছিলেন তিনবার। প্রথমবার এসেছিলেন রেঙ্গুনে চিলির কনসালের চাকরি নিয়ে। ১৯২৭ সালের অক্টোবরে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করে ১৯২৯ সালের শুরু পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাটান। ফুন্দাসিওন পাবলো নেরুদার দেওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের শেষের দিকে তিনি শ্রীলঙ্কা থেকে মাত্র অল্প কয়েক দিনের জন্য ভারতের কলকাতায় এসেছিলেন। জানুয়ারির শুরুর দিকেই তিনি কলকাতা থেকে আবার শ্রীলঙ্কা ফেরেন। এ সফরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘ভারতীয় মহাসভা’র জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এসে দেখা হয়েছিল মতিলাল নেহরু ও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে। দেখেছিলেন সদ্য বিলেতফেরত জওহরলাল নেহরুকে। তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ স্বীকার করি বেঁচেছিলাম ( Confieso Que he vivido : memorias )-এ তিনি এর বর্ণনা দিয়েছেন, যা আনন্দময়ী মজুমদারের অনুবাদে পাবলো নেরুদার স্মৃতিচারণ গ্রন্থে বাঙালি পাঠকরা খুঁজে পাবেন।
এরপর তিনি আরো একবার ভারতে আসেন ১৯৫০ সালে। প্যারিস থেকে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের লক্ষ্যে নেহরুকে দেওয়া জোলিও কুরির একটি চিঠি বয়ে আনার দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। অক্টোবরের দিকে তিনি দিল্লিতে এসে নেহরুর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে সেই চিঠি হস্তান্তর করেন। এ যাত্রায় তিনি ১০ দিনের মতো ছিলেন স্বাধীন ভারতে।
আরো একবার তিনি ভারতে এসেছিলেন ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে। এ সফরের কথা কোথাও খুব একটা শোনা যায় না। নেরুদা নিজেও তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থে এ নিয়ে কিছুই বলেননি। তবে বিষ্ণু দের গ্রন্থে উল্লেখিত তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি কলকাতা এসেছিলেন। ফুন্দাসিওন পাবলো নেরুদার সঙ্গেও এ তথ্য মিলে যায়। এ যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রাজিলের বিখ্যাত বামপন্থী লেখক জোর্জে আমাদো। এই তৃতীয় সফরে তিনি ভারতের কোন কোন জায়গায় কার কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ অন্য কোথাও–ইংরেজি বা স্প্যানিশে–পাওয়া যায় না।
প্রথমবার চাকরিসূত্রে যে উচ্ছ্বাস ও কৌতূহল নিয়ে তিনি প্রাচ্যে এসেছিলেন, তা দ্রুতই লুপ্ত হতে থাকে এ অঞ্চলের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আবহের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে। আত্মজীবনীতে তিনি ‘সিংহল’ অধ্যায়ে স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘সাহেব আর হিন্দুদের মাঝখানে পড়ে আমার জীবন হয়ে উঠল দুঃসহ। না পারতাম প্রতি সন্ধ্যায় ডিনার-জ্যাকেট চড়িয়ে ক্লাব আর নাচের আসরে যোগ দিতে, না সইত হিন্দুদের জাতিভেদের নিয়মকানুন। ভয়ানক একাকিত্ব তখন গ্রাস করেছে আমাকে (‘পাবলো নেরুদা, অনুসৃতি’)
চাকরিসূত্রে যে কয়টা দিন তিনি এ অঞ্চলে ছিলেন তার বেশির ভাগ সময়ই ছিল একাকিত্বের। এর বর্ণনা ওই অধ্যায়ের বেশ খানিকটা জায়গাজুড়েই দেখা যাবে। কলম্বোর ওয়েলাওয়াতিতে থাকার সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে এভাবে : ‘একাকিত্বের যে কী অসহনীয় যন্ত্রণা–ওয়েলাওয়াতির ওই কটা বছরের জীবনেই আমি তা উপলব্ধি করেছিলাম। সঙ্গী বলতে ছিল একটি খাট, একটি টেবিল, দুটি চেয়ার আর আমার কুকুর ও বেজিটি। আর ছিল একজন ভৃত্য–যার নাম ছিল ভ্রাম্পি। এই নিঃসঙ্গতা আমার কিন্তু কবিতা লেখার কোনো উপাদানই দেয়নি বরং দিয়েছে বন্দিশালার অসহ্য যন্ত্রণা।’ (প্রাগুক্ত)
তিনি যদিও বলেছেন, এ নিঃসঙ্গতা তাঁকে লেখার কোনো উপাদান দেয়নি, কিন্তু তাঁর লেখার ইতিহাসের ক্রমপঞ্জি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলেই দেখা যাবে ঘটনা ঠিক উল্টো। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত তাঁর Residencia en la tierra কাব্যগ্রন্থের প্রথম খণ্ডের বেশির ভাগ কবিতা লেখা হয়েছিল এই প্রাচ্যবাসের সময়।
এটা ঠিক যে প্রাচ্যবাস তাঁর জন্য যত একাকিত্ব ও দুঃসহ যন্ত্রণাই নিয়ে আসুক না কেন, এমনকি নেহরুর সঙ্গে তাঁর শীতল সাক্ষাৎ, দিল্লির বিমানবন্দরে পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের লোকদের অপমানকর ও অমর্যাদাকর আচরণ সত্ত্বেও এ সময়ই তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা জন্ম হয়েছিল রেঙ্গুন, শ্রীলঙ্কা ও কলকাতায়। এ ছাড়া তার প্রাচ্যদেশীয় রোমান্সের ঘটনা তো আছেই। বার্মিজ রমণী জোসি ব্লিস যাকে নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন, আর আছে ডাচ সেই নারী–মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনার–যার সঙ্গে ১৯৩০ সালে বিয়ে হয়, তার সঙ্গেও তিনি পরিচিত হন এই শ্রীলঙ্কার কলম্বোয়।
জোসি ব্লিসের সাথে তার সম্পর্ক ছিল তীব্র, তবে ক্ষণস্থায়ী। সম্পর্কের প্রগাঢ়তা ও তীব্রতা তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত Memoria de la isla Negra (iii) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘ভালোবাসা : জোসি ব্লিস’-এর মতো কবিতা। জোসির জন্য স্মৃতিকাতরতা নেরুদার সঙ্গী হয়েছিল বহুদিন। কবিতার সর্বশেষ স্তবকটি পাঠকের হৃদয়কে বিষণ্ন করে দেয় নেরুদার স্মরণ-কৌশল আর অভিব্যক্তি :
এখন, হয়তো-বা
বিশ্রামে শুয়ে আছে
হয়তো বা শুয়ে নেই
রেঙ্গুনের সুবিশাল গোরস্থানে
অথবা হয়তো সেই ইরাবতী নদীটির তীরে
সমস্ত বিকেলজুড়ে পুড়িয়েছে দেখখানি তার,
আর নদী সে সময় নিচু স্বরে বলে গেছে
বলতে যা পারতাম কান্নাভেজা স্বরে।

নেরুদা এই অবিস্মরণীয় প্রেমিকার কথা মনে করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মিষ্টি মেয়ে জোসি ব্লিস আমার প্রতি এতটাই আবেগঘন আর আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল যে শেষ পর্যন্ত সে ঈর্ষায় আক্রান্ত হয়ে পড়ল। এ রকম না হলে হয়তো তার সাথে আমার জীবনটা চিরকাল কেটে যেত।”
জোসি ব্লিসের সাথে সম্পর্কের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একাধিক কবিতা তিনি লিখেছিলেন। তিনি নিজেই ওই একই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন :
“হ্যাঁ, জোসি ব্লিস ছিল এমন এক নারী আমার কবিতায় যার গভীর প্রভাব মুদ্রিত হয়ে আছে। আমি সব সময়ই তাকে স্মরণ করি, এমনকি আমার সাম্প্রতিক বইগুলোতেও।” ( Interview with Reta Guibert )
আধা ডাচ-আধা মালয়ী মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনার-এর সাথে নেরুদার বিয়ে হলেও জোসি ব্লিসই তার জীবনে সবচেয়ে বেশি গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কারণ হাগেনার বিয়ের অল্প কিছুদিন পরই মারা গিয়েছিলেন। জোসি ব্লিসের ঈর্ষাময় প্রেম থেকে বাঁচার জন্য একাকী না হলে এবং হাগেনারের মৃত্যু না হলে হয়তো নিঃসঙ্গতা এতটা দুঃসহ হয়ে উঠত না নেরুদার জন্য।
সুতরাং দুঃসহ একাকিত্বের যন্ত্রণার সঙ্গেই যমজ ভাইবোনের মতো সৃষ্টিশীলতা ও রোমান্সের উষ্ণ ধারা প্রবহমান ছিল একটা সময় পর্যন্ত। সত্য বটে, নেরুদা এ অঞ্চল সম্পর্কে অক্তাবিও পাসের মতো কৌতূহলী ছিলেন না। পাসের মতো তিনি প্রাচ্যকে আবিষ্কার করতে চাননি। পাসের জীবনে ভারত এনে দিয়েছিল ‘পরিপক্বতা’, অন্যদিকে নেরুদার জীবনে এ পর্বটি ছিল বন্দিত্বের। কিন্তু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, এ বন্দিত্বের মধ্যেই উন্মুক্ত হয়েছিল তার সৃষ্টিশীল সত্তা; জন্ম নিয়েছিল কয়েকটি কবিতা, ছোট ছোট কয়েকটি গদ্য, আর আর্হেন্তিনীয় লেখক ও বন্ধু এক্তর এয়ান্দিকে লেখা সেই বিখ্যাত চিঠিগুলো। এ ছাড়া রয়েছে চিলির লেখক বন্ধু হোসে সান্তোস গনজালেস বেরা ও মাকে লেখা চিঠিপত্র। ‘অনুস্মৃতি’র বাইরে, উপরোক্ত এসব লেখায় নেরুদার নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি দেখতে পাব তাঁর অন্তরঙ্গ উন্মোচন।
‘আত্মস্মৃতি’তে নেরুদা প্রাচ্যদেশীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন, আবার অনেক কথাই আমাদের জানাননি সেখানে। সেসব অজানা কথার কিছু সন্ধান পাওয়া যাবে সে সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আর তাঁর বিভিন্ন বইয়ের স্প্যানিশ সংস্করণগুলোয়।
১৯২৭ সালে মাদ্রিদ থেকে প্যারিস, পোর্ট সৈয়দ, জিবুতি, কলম্বো, সিঙ্গাপুর হয়ে রেঙ্গুন পৌঁছানোর আগে বঙ্গোপসাগরে এলসিমোর ( Elsimor ) জাহাজে বসে লিখেছিলেন ‘El sueño de la tripulacion’ বা ‘the Dream of crew’ শিরোনামে কাব্যময় এক গদ্য-টুকরো। এটি ভ্রমণকালীন জাহাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষজনের বর্ণনা। তবে বর্ণনাটা ঘুম আর স্বপ্নকে কেন্দ্রে রেখে। লেখাটির এক জায়গায় তিনি বলছেন :
“হিন্দুরা কাপড় দিয়ে চোখ-ঢেকে ঘুমায়, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে মৃত্যুর স্মারক এই আচ্ছাদনের মাধ্যমে। কেউ কেউ হৃৎপিণ্ড বরাবর বুকের কাছে আলতোভাবে হাত রেখে তীব্র স্বরে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ে।”
(Pablo Neruda: Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
বঙ্গোপসাগর এলাকায় থাকতে থাকতেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি কবিতা লেখেন, যা পরে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত Residencia en la tierra-1 গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতাটির শিরোনাম Coleccion Nocturna বা Nocturnal Collection. কবিতাটির রচনাকাল কেবল ১৯২৭ সাল উল্লেখ করা হলেও এটি সম্ভবত লেখা হয়েছিল ওই বছরের সেপ্টেম্বরের দিকেই। কারণ আগের লেখাটির রচনাকাল সেপ্টেম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুটো লেখাই যে কাছাকাছি সময়ে তার আরেকটি প্রমাণ রচনাস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘বঙ্গোপসাগর রেঙ্গুন ১৯২৭’ বলে। আগের লেখাটির যে উদ্ধৃতি একটু আগে হাজির করা হয়েছে, তার এক কাব্যিক রূপান্তর দেখা যাবে এই কবিতাটির এক জায়গায় :
ঘুমন্ত মৃতদেহ যারা প্রায়শই
হাত ধরে নেচে যায় আমার মর্মযাতনায়,
কত যে ধূসরতর শহর বন্দর আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি।

(Pablo Neruda: Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
পরের মাসে তিনি রেঙ্গুনে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯২৯ সালের শুরু পর্যন্ত অবস্থান করেন। ১৯২৮ সালে তিনি আলবারো ইনোহোসাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ান ইন্দোচীন, সাইগন, ব্যাংকক, বাট্টামব্যাং এবং বেরেমবার্গ। ফেব্রুয়ারিতে তিনি চীনে যান। কাউলুন, হংকং ও সাংহাই থেকে পরে জাপানে যান। সাংহাই অবস্থানকালে তিনি ফেব্রুয়ারিতে ‘Invierno en los puertos ‘ বা ‘নানান বন্দরে শীতকাল’ শিরোনামে একটি ভ্রমণাখ্যান লেখেন, যা তার ‘আত্মস্মৃতি’তে ঠাঁই পায়নি। বাট্রামবাং, বেরেনবেং, সাইগন, ব্যাংকক, চীন, কাউলুন, হংকং, নানকিন, সাংহাইসহ বিভিন্ন শহর বন্দর ভ্রমণের ওপর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এই লেখাটি।
১৯২৮ সালের ১১ মে নেরুদা এয়ান্দিকে রেঙ্গুন থেকে এক চিঠিতে তাঁর নিঃসঙ্গতার কথা জানান। এই চিঠির এক জায়গায় তিনি লেখেন : ‘মাঝেমধ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য আমি এত শূন্য হয়ে থাকি যে না থাকে কোনো কিছু প্রকাশের শক্তি, না পারি নিজের অভ্যন্তর খনন করতে। তীব্র কাব্যিক ব্যাকুলতা আমাকে ছেড়ে যায় না।’
(Pablo Neruda: Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
রেঙ্গুনে লেখা আরো একটি জার্নাল ধরনের টুকরো গদ্য রয়েছে যার শিরোনাম La noche del soldado (সৈনিকের রাত), এটি পরে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ‘মর্তের বাসিন্দা’ বা Residencia en la tierra -এর প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, যেখানে তার নিঃসঙ্গ অবস্থার পাশাপাশি রয়েছে সেখানকার জীবনশৈলী ও সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর তার পর্যবেক্ষণ।
নিঃসঙ্গতার একটা চমৎকার কাব্যিক বর্ণনা আছে এই লেখাটির তৃতীয় স্তবকের শেষ পংক্তিটিতে : ‘একই অবস্থানের ঘণ্টাগুলো আমার দু’পাকে ঘিরে আছে। দিবস ও রাত্রির রূপে দিন যেন প্রায় সবসময় আমার ওপর থমকে আছে।’ (Pablo Neruda : Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-87)
এর পরের মাসে (জুলাই ১৯২৮) লেখেন তিনি Juntos nosotros (আমরা একসঙ্গে) শিরোনামে রেঙ্গুনে তাঁর প্রথম কবিতাটি। একই বছরের জুলাই-আগস্টে লেখেন Sonata Y Desctrucciones (সোনাটা ও ধ্বংস) কবিতাটি।
৬ আগস্ট রেঙ্গুন থেকে চিলির লেখক বন্ধু হোসে সান্তোস গনছালেস বেরাকে লেখেন এক চিঠি, যাতে তিনি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বর্ণনার পাশাপাশি জানাচ্ছেন তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের সম্ভাব্য শিরোনাম–মর্তের বাসিন্দা। ধর্মীয় সংস্কৃতির সূত্রে তিনি চিঠির শুরুতেই বলছেন : ‘এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে। চমৎকার এই জায়গাটার এমন সব লোকজনের মধ্যে আছি যারা গরু আর সাপকে পূজা করে। ….’ (Pablo Neruda : Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-99)
নিজের নিঃসঙ্গতার কথা জানিয়ে এই একই চিঠিতে তিনি বলছেন : ‘কথা বলি আমার কাকাতুয়ার সঙ্গে, একটা হাতিকে মাসকাবারি টাকা দিই। দিনগুলো আমার মাথার ওপর লাঠির মতো এসে পড়ে; কিছুই লিখছি না কিছুই পড়ছি না, সাদা কাপড়-পরা মাথায় শোলার টুপি, একেবারে বিশুদ্ধ ভূত,…’ (Pablo Neruda : Antologia General, Alfaguara, España, 2010, P-99)
বন্ধুর কাছে নিজের নিঃসঙ্গতার একটা অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ধরার স্বার্থে, নিছক অভিব্যক্তি হিসেবে ‘কিছুই লিখছি না’ বললেও তিনি লিখছিলেন অনেক কিছুই।
আগস্ট মাসেই তিনি লেখেন El joven monarca (তরুণ রাজা) নামে একটি কাব্যধর্মী টুকরো গদ্য বা গদ্য কবিতা। এটিও পরে মর্তের বাসিন্দায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
৮ সেপ্টেম্বর এয়ান্দিকে আরেকটি চিঠি লেখেন, যেখানে তার মর্তের বাসিন্দা শেষ করে এনেছেন বলে জানিয়েছেন। রেঙ্গুনে পরের মাসেই (অক্টোবর ১৯২৮) লেখেন Diurno Doliente (যন্ত্রণার দিন) নামে একটি কবিতা।
সম্ভবত নভেম্বর-ডিসেম্বর-=-দুটি মাসই তিনি কলকাতায় কাটান। কারণ এখানে লেখা তার দুটি বিখ্যাত কবিতার রচনাকাল এবং রচনাস্থান সেই সাক্ষ্যই দেয়। নভেম্বরে লেখেন তিনি Tango del viudo (বিপত্নীকের তাঙ্গো) নামক সেই বিখ্যাত কবিতাটি যা তাঁর খ্যাতি ও কাব্যকৃতির এক আশ্চর্য নমুনা। এরই ধারাবাহিকতায় লেখেন আরো একটি অসাধারণ কবিতা Arte poetica (শিল্পতত্ত্ব বা কাব্যতত্ত্ব) যা তাঁর কাব্যকৃতির মূল দর্শনকে তুলে ধরে।
এই দুটি কবিতাও তার মর্তের বাসিন্দা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সম্ভবত ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে তিনি কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয়। এখান থেকে ১৪ মার্চ মাকে এক চিঠিতে তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের কথা জানান। একই সঙ্গে জানান এখানকার পরিবেশ ও জীবনে তাঁর অনুভূতির কথা।
প্রাচ্যজীবনের সঙ্গে নেরুদা খাপ খাওয়াতে না পেরে নিঃসঙ্গ ছিলেন বটে; কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তা স্তব্ধ ছিল না। একাকিত্ব ও যন্ত্রণা, তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তাকে যে গভীরতা ও মুখরতা এনে দিয়েছিল, তা নেরুদার কাব্যজীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি।

কাউকে করো না দায়ী

কারোর বিরুদ্ধ তুমি কোরো না নালিশ কখনোই,
কোন কিছুকেই দায়ী কোরো না কখনো;
কারণ জীবনে তুমি যা চেয়েছ
তা-ই তুমি করেছ মূলত।
মেনে নাও নির্মানের অন্তরায় আর
নিজেকে শোধরানোর শুরুর সাহস।
ভুলের ভস্ম থেকে উঠে আসে প্রকৃত
মানুষের সফলতা।
কখনো কোরো না দায়ী নিয়তি ও একাকিত্বকে
মোকাবেলা করো সব সাহসের সঙ্গে।
যেকোনভাবেই হোক-এ তোমারই কাজের ফসল,
তুলে ধরো নিয়ত জয়ের লক্ষণ।
নিজের ব্যার্থতায় তিক্ত হোয়ো না আর
অন্যের কাঁধে তাকে দিয়ো না চাপিয়ে,
এই বেলা মেনে নাও কিংবা শিশুর মতো
ভাববে তুমি নিজেকে সঠিক।
যেকোন সময়েই, শোনো, সুসময় সূচনা করার
ভন্ডুলের জন্য এত ভয়ানক আর কিছু নেই।
ভুলো না, তোমার এই মূহুর্তের কারণটি তোমারই অতীত
যেমন তোমার ভবিতব্যের কার্যকরণ
হবে এই মুহুর্ত তোমার।

শিখে নাও হিম্মত ও বল
তোয়াক্কা যে করবে না পরিস্থিতির;
বেঁচে রও উজানে ও তোমার নিজের
মসিবত নিয়ে ভাবো কম, কাজ করো বেশী।
তোমার সমস্যাগুলো এমনিই ঝরে পড়ে যাবে।
বেদনার মধ্য থেকে জন্ম নিতে শেখো
বাধার চেয়েও বেশী বড় হয়ে ওঠো।
নিজের দর্পণে দেখো নিজেকে এবং
মুক্ত হও, বলবান হও;
হয়ো না পুতুল তুমি পরিস্থিতির,
কেননা নিজেই তুমি নিজের নিয়তি।
ওঠো, দেখো প্রতুষ্যের সুর্যের দিকে
নাও শ্বাস ভোরের আলোয়।
তোমার জিন্দেগিরই অংশ যে তুমি;
চোখ খোলো, যুদ্ধ করো, হাটো আর ঠিক করো তোমার
নিশানা;
জয় করো জীবনকে,
নিয়তির কথা তুমি ভেবো না কখনো
কেননা নিয়তি হল:
ব্যর্থতারই অজুহাত।

এখানে নাজিম হিকমত

Nazim
অনূদিত কবিতাটি সম্পর্কে দুটি জরুরি কথা পাঠকদের আগেই জানিয়ে রাখি। ইংরেজিতে অনূদিত নেরুদার কবিতার যে বইগুলো সহজলভ্য তাতে এ কবিতাটি আমি খুঁজে পাইনি। তবে ইন্টারনেটের বদৌলতে এটি স্প্যানিশ ভাষায় পাওয়া যায়। আমার উৎস এ ইন্টারনেট। এর দু-একটি ইংরেজি অনুবাদও আছে এ কবিতাটির নেরুদার অনুরাগী পাঠকদের কোনো কোনো ওয়েবসাইটে। তবে আমি নির্ভর করেছি স্প্যানিশ সংস্করণটিতেই। আরেকটি জরুরি কথা হলো এই যে হাতের কাছে নেরুদার স্প্যানিশ রচনাসমগ্র বা কবিতাসমগ্র না থাকায় এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না কবিতাটির রচনা বা প্রকাশকাল। সম্ভবত ১৯৫১ সালে মস্কোতে পরস্পরের সাক্ষাতের পর রচিত।

সদ্য মুক্তি পাওয়া
বন্দীদের একজন নাজিম হিকমত
তার কবিতার মতো
লাল রং সোনার সুতায়
বোনা জামা উপহার দিয়েছে আমায়।

তুর্কি লহুর সুতাগুলো
তার পদাবলি।
প্রাচীন প্রত্যয়ে গড়া,
—বাঁকা বা সরল—
সত্যিকার গল্পগুলো
ভোজালি বা তরবারির মতো।
গোপন কবিতাগুলো তার
আলোকিত দুপুরের
মুখোমুখি হবে বলে তৈরি হয়েছিল;
আজ তারা লুকায়িত আয়ুধের মতো,
জ্বলজ্বল করছে তারা মেঝের নিচে,
কুয়ার ভেতরে তারা অপেক্ষমাণ,
তার জনতার কালো চক্ষুযুগলের
দুর্গম আঁধারের নিচে।
বন্দিশিবির থেকে সে এল আমার
ভাই হতে আর
আমরা হেঁটেছি একসাথে
বরফে মোড়ানো স্তেপে;
রাত ছিল প্রজ্বলিত
আমাদের নিজস্ব আলোয়।

দেহের গড়ন তার ভুলব না বলে
আমি তার প্রতিকৃতি আঁকছি এখানে:

পুষ্পময় ভূখণ্ডের শান্তিতে উত্থিত
টাওয়ারের মতো
লম্বা সে
এবং ওপরে
তুর্কি আলোয় ভরা চক্ষুযুগল
দুটি বাতায়ন।

আমরা দুই ভবঘুরে
পেয়েছি শক্ত ভূমি আমাদের
পায়ের তলায়
বীর আর কবিদের
বিজিত ভুবন,
মস্কোর রাস্তায়, দেয়ালে দেয়ালে
পুষ্পিত হতে থাকে
পূর্ণিমার চাঁদ,
রমণীর প্রতি প্রেম
আনন্দ আর
প্রণয়ের প্রতি অনুরাগ
আমাদের একমাত্র গোত্র-পরিচয়।
সমগ্র বাসনাকে ভাগ করে নেওয়া,
সর্বোপরি, জনতার সংগ্রামের এক একটি ফোঁটা,
মানবসমুদ্রের ফোঁটাগুলো
তার আর আমার কবিতা।

কিন্তু
হিকমতের আমোদের অন্তরালে
অন্য এক নির্মাণ,
নির্মাণ ছুতারের মতো
কিংবা দরদালানের ভিত্তির মতো।

বহু বছরের নীরবতা
আর কারাবাস।
এসব বছর
বসাতে পারেনি দাঁত,
কিংবা পারেনি খেতে, গিলে ফেলতে
বীরোচিত যৌবনেরে তার।

আমাকে সে বলেছিল
দশ বছরের বেশি
বিজলিবাতির আলো
রাখত জ্বালিয়ে ওরা সমস্ত রাত
আজ সে গিয়েছে ভুলে সেই সব রাত
ভ্রুক্ষেপ নেই তার বিদ্যুতালোকে।
ডোবার ফুলের মতো
তার আমোদের
কালো রং শিকড়-বাকড়
প্রোথিত স্বদেশে;
আর তাই
যখন সে হাসে,
মানে নাজিম,
মানে নাজিম হিকমত
তখন সে হাসি নয় তোমার মতন;
তার হাসি অনেক সফেদ,
তার সে হাসিতে হাসে চাঁদ
নক্ষত্র,
শরাব,
মৃত্যুহীন মৃত্তিকা,
তাবৎ সোনালি ধান জানায় সম্ভাষণ
তার হাসি দিয়ে।
তার কণ্ঠে গান গায় মাতৃভূমি তার।

আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিনের অন্যান্য প্রবন্ধ:
বোর্হেস সাহেব

অনুবাদ, আদর্শ ও অবহেলা

“একজন তৃতীয় সারির কবি”: রবীন্দ্রকবিতার বোর্হেসকৃত মূল্যায়ন

রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ

কার্লোস ফুয়েন্তেসের মৃত্যু:
সমাহিত দর্পন?

মান্নান সৈয়দ: আমি যার কাননের পাখি

বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব প্রসঙ্গে আঁদ্রে মালরো

স্পানঞল জগতে রবীন্দ্র প্রসারে হোসে বাসকোনসেলোস

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ:
‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমার কয়েক টুকরো স্মৃতি

বনলতা সেনের ‘চোখ’-এ নজরুলের ‘আঁখি’

ন্যানো সাহিত্যতত্ত্ব: একটি ইশতেহার

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: তাহলে গানের কথাই বলি

অজ্ঞতার একাকীত্ব ও আমাদের মার্কেস-পাঠ

আবেল আলার্কন: স্পানঞল ভাষায় গীতাঞ্জলির প্রথম অনুবাদক

জামান ভাই, আমাদের ব্যস্ততা, উপেক্ষা ও কদরহীনতাকে ক্ষমা করবেন

এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘দর্পন’-এ বাংলাদেশ ও অন্যান্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

আবুল ফজলের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

আবু ইসহাকের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

কুদরত-উল ইসলামের ‘গন্ধলেবুর বাগানে’

মহীউদ্দীনের অগ্রন্থিত আত্মজৈবনিক রচনা

বোর্হেস নিয়ে মান্নান সৈয়দের একটি অপ্রকাশিত লেখা

অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

ধর্মাশ্রয়ী কোপ

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্পর্কে অক্তাবিও পাস

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন

উপেক্ষিত কাভাফির অর্জুন ও আমরা

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদুজ্জামান — জুলাই ১৫, ২০১৬ @ ২:২৮ পূর্বাহ্ন

      তথ্যবহুল, অনবদ্য। ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিনকে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — জুলাই ১৫, ২০১৬ @ ১১:২২ পূর্বাহ্ন

      A Bengali poet cum diiplomat Belal Chowdhury is reported to have come in contact with Neruda in Delhi. I am interested in Neruda, for his Canto General in particular and also for Residence on Earth. I express my thanks to Poet essayist Razu Alauddin for the rare informations and high quality translation of Neruda poems. Congratulations.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com