মোহাম্মদ রফিক: তাদেরকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ১১ জুলাই ২০১৬ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

Rafiq
ছবি: নাসির অালী মামুন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার আপনি এ অঞ্চলের মাটি মানুষ জনসংস্কৃতিকে আপনার কবিতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গুলশান হামলার এই ঘটনার পর সবার মধ্যে যেনো একটা ভীতি ঢুকে গেছে। এ দশায় করণীয় কি স্যার বাঙালির। বাঙালি এখন কি করবে?
মোহাম্মদ রফিক: তুমি যে বাঙালি বলছো তার মধ্যেই তুমি উত্তর দিয়ে দিয়েছো। বাঙালি আরো বাঙালি হবে। বাঙালিকে আরো বাঙালি হতে হবে। আমরা ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, এবং এদের বিরুদ্ধেই তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। এদের মতো ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা কিছু মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই তো দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা কি মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি! অন্য যা কিছু থাক, আমাদের মূল উদ্দ্যেশের জায়গা ছিলো, আমরা আমাদের বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা আবির্ভূত হয়েছিলাম এদের সাথে লড়াই করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক তরুণরা ধর্মীয় রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, এমনকী তারা জীবনের তোয়াক্কা করছে না। গুলশানের হামলায় বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা বিশজন মানুষকে জবাই করে হত্যা করেছে, তাদের এই মোটিভেশনের কারণ কি বলে মনে করেন আপনি?
মোহাম্মদ রফিক: আজকের তরুণদের বিভ্রান্ত হওয়ার বড় কারণ, তাদের সামনে কোন মন্ত্র নেই। তারা জানে না, তারা কেনো জীবন ধারণ করছে। তাকে যদি এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা যায়, যেটা আমাদের মতোই, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব বলে আমি মনে করি, যে, তাকে বোঝাতে হবে, তুমি বাঙালি, তোমার বাঙালি সত্ত্বাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে— তাহলে দেখবে এই জঙ্গিবাদের ক্ষমতা অনেক কমে যাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সারাবিশ্বে জঙ্গিবাদের এই যে আগ্রাসন, উত্থান এর কারণ আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন স্যার?
মোহাম্মদ রফিক: এর থেকে জরুরী আরেকটা বিষয় আছে, এই জঙ্গিবাদের যে উত্থান হয়েছে, এটা আমরা খুব ভালো করে জানি, যে কেনো হচ্ছে! এর মূল কারণটা হচ্ছে, আমি যেটা মনে করি, ধনতন্ত্র, ক্ষয়িষ্ণু ধনতন্ত্র তার মরণদশায় পৌঁছে গেছে। যেকোনভাবে সে বাঁচতে চায়। একদিকে এজন্য সে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম দিচ্ছে, অন্যদিকে সে আইএস কে জন্ম দিচ্ছে। আল কায়েদার জন্ম দিচ্ছে। আমাদের তরুণদের কাছে এই জায়গাটা, বৈশ্বিক এই রাজনীতি স্পষ্ট করতে হবে। তাদেরকে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার দিকে, বাঙালি হবার দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ধনতন্ত্র বলতে কি স্যার আপনি পুঁজিবাদের কথাই বলছেন? আমেরিকান স্বপ্নের কথা?
মোহাম্মদ রফিক: ভালো বলেছো। এই আমেরিকান ড্রিম আমাদের তরুণদের নষ্ট করছে। পুঁজিবাদ। পুঁজি তো পুঞ্জিভূত করেছে সারা পৃথিবী থেকে লুট করে পশ্চিমারা। ধনতন্ত্র বলতে আমি পুঁজিবাদই বলছি, যার প্রধান অস্ত্র মুক্তবাজার অর্থনীতি। এই পুঁজিবাদ এখন নিজেই নিজের কবর খুঁড়েছে। সে প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে সে আত্মরক্ষার পথ খুঁজছে। তার স্টেক বাঁচাবার জন্য এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে না। সর্বত্র। সারা পৃথিবীতে। যেখানে ধর্ম উস্কানোর দরকার সেখানে ধর্ম উসকাচ্ছে। যেখানে জাতিত্ব উসকানো দরকার সেখানে জাতিত্ব উসকে দিচ্ছে। যেখানে রেসিজম, উগ্র বর্ণবাদ উসকে দেয়া দরকার সেখানে সেটি ছড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থ এবং অস্ত্রের ক্ষমতায় মানবিকতাকে পদদলিত করছে, যার ফলাফল এইসব ঘটনা। ব্রেইনওয়াশ করে কিছু ছেলেকে দিয়ে কি মর্মান্তিক সব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে জাতিগতভাবে এক হয়ে এখন পৃথিবীর মানুষকে লড়াই করতে হবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:
যুক্তরাষ্ট্র হুমকী দিচ্ছে সৈন্য পাঠানোর, বিভিন্ন দেশে—
মোহাম্মদ রফিক: আসল জায়গাটাই তো আমি বললাম, ওর ক্ষমতা আছে, আমেরিকার ক্ষমতা আছে সে হুমকী দিচ্ছে এটাই কিন্তু প্রকৃত সত্য না, তাদের আমরা হুমকী দেবার মতো পাত্তা দিচ্ছি, সুতরাং আমাদের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু আমার মনে হয়, এখনকার এটা বাড়াবাড়ি। আমাদের কোনভাবেই সৈন্য পাঠানোর মতো অবস্থা হয় নাই। আমাদের কি ইরাক আফগানিস্তানের মতো অবস্থা? আমরা কি সিরিয়ার মতো প্রেক্ষাপটে আছি? এমন অবস্থা তো সারাবিশ্বেই হচ্ছে। বাংলাদেশে আমি কোন বিদেশী সৈন্য দেখতে চাই না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: গুলশানের, শোলাকিয়ার ঘটনায় সিএনএন কিন্তু বাংলাদেশের অব্স্থাকে সিরিয়া, ইরাকের সাথে তুলনা করেছে।
মোহাম্মদ রফিক: সিএনএন আমার ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য এটা করেছে। এখনো আমাদের ওরকম অবস্থা হয়নি। আমি অন্তত এটা অনুভব করি না।
হ্যাঁ, আমরা বিপন্ন, আমরা ব্যথিত। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের শক্তি যথেষ্ট। আমরা যদি সবাই নেমে আসি, আমরা কেনো রাস্তায় নামছি না! আমাদের মুক্তিকামী শান্তিপ্রিয় জনগণ কোথায়? সেই জনগণ কোথায় যারা ঊনসত্তুরের গণআন্দোলন করেছে? তাদের বংশধররাই তো আজো এদেশে বসবাস করছে। তারা যদি নেমে আসে, প্রতিবাদ করে, ঘরে বাইরে সমানভাবে নজর দেয়, গানে কবিতায় ফিরে আসে তাহলে এমনিতেই এসব জঙ্গিবাদফাদ উড়ে যাবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:
তো স্যার আপনার মতে এখন এই জাতির করণীয় কি?
মোহাম্মদ রফিক: প্রতিবাদ শুধু না, এই জাতিকে এখন দৃঢ়ভাবে শক্তভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। এই আইএসওয়ালাদের বুঝিয়ে দিতে হবে, এতো সহজ না, এটা বাংলাদেশ। এই দেশের মানুষ মাথা নত করে না। এই খেলা বহুদিন যাবৎ চলছে, এই খেলা উপনিবেশ আমল থেকে চলছে— বাঙালিকে ধ্বংস করো। কারণা বাঙালির যে আত্মশক্তি, ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তাকে সারা পৃথিবী ভয় পায়। বিশেষ করে ই্য়োরাপ এবং আমেরিকানরা ভয় পায়। কারণ তুমি তাকালেই দেখতে পাবে, আমাদের এই, এতো খারাপ অবস্থা, তাও দেখো আমাদের মানুষের এগিয়ে যাওয়া কেউ থামাতে পারে নাই। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার দেখো, আমাদের স্কলারদের সারাবিশ্বে অবদান দেখো। আমাদের নারীরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর কয়টা দেশ পেরেছে তা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: খুব কম।
মোহাম্মদ রফিক: সুতরাং, বিশ্বশক্তি জানে আমাদের দুর্বার স্পৃহা আছে। শক্তি আছে। পরিশ্রম করার সামর্থ আছে। তারা আমাদের দাবায়ে রাখতে চায়। আমি বঙ্গবন্ধুর কথাটাই পুনরুক্তি করতে চাই, আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমাদের দাবায়া রাখার কলকাঠি হলো এইসব, জঙ্গি হামলা। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের ভেতর ধর্মের বিষ ঢুকিয়ে দেয়া। আমাদের এসবের বিরুদ্ধে এক হয়ে সম্মিলিত ভাবে লড়াই করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। শিল্পের আশ্চর্য ক্ষমতার দিকে তরুণদের নিয়ে আকৃষ্ট করতে হবে। এমন সময়ে তাই শিল্পী সাহিত্যিকদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেলো বলে আমি মনে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জরুরী কথা বলছেন, ধন্যবাদ স্যার।
মোহাম্মদ রফিক: তোমাদেরও ধন্যবাদ।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com