মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৪)

অদিতি ফাল্গুনী | ১৩ জানুয়ারি ২০০৮ ২:৪৭ অপরাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

প্রকৃতপক্ষে অপরাধীর শরীরে নির্যাতনের মাধ্যমে যে তদন্ত হতো, তাই শাস্তির প্রয়োগবিন্দু গঠন করতো। গঠন করতো জোর করে সত্য আদায়ের সঠিক স্থান। যেহেতু পূর্বানুমান ছিল তদন্তের একটি অবিভাজ্য উপকরণ এবং অপরাধের অংশ বিশেষ, সেহেতু মামলার তদন্তকালীন নির্যাতনে অপরাধীকে যে নিয়ন্ত্রিত মাত্রার ব্যথা দেওয়া হতো, তা’ ছিল একই সাথে শাস্তি প্রয়োগ এবং তদন্তের একটি মাধ্যম।

এখন, বেশ কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই, অপরাধীর শরীরের মাধ্যমে শাস্তি ও তদন্ত–এই দুই আনুষ্ঠানিকতার সংমিশ্রণ অব্যাহত থাকতো। সাক্ষ্য জোরদার হলে মামলার সাজা প্রদান করা হতো।
inquisition.jpg………
স্প্যানিশ ইনকুইজিশন
……….
দণ্ডের প্রকৃত প্রয়োগ সম্ভবপর হতো এভাবেই। এবং, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অনুষ্ঠানে অভিযুক্তের দেহ আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণ্য হতো। অপরাধী ব্যক্তির কাজ ছিল প্রকাশ্যে নিজের নিন্দা বয়ে বেড়ানো। তার কাজ ছিল স্বকৃত অপরাধের সত্য প্রকাশ্যে বহন করা। জনতার প্রকাশ্য মিছিলে প্রদর্শিত তার শরীর মামলার আলো-আঁধারিতে ঢাকা প্রক্রিয়াকে জনতার কাছে সহজবোধ্য করে তোলার সহায় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ব্যবহৃত হতো তার উপর প্রণীত শাস্তিদণ্ডকে সবার কাছে স্পষ্ট করে তুলবার কাজেও। আঠারো শতকে শাস্তির প্রকাশ্য প্রয়োগের মাধ্যমে সত্যের এই প্রত্যক্ষ ও চমক লাগানো প্রকাশের কিছু দিক ছিল।

১. এর মাধ্যমে অপরাধী ব্যক্তি নিজেই নিজের নিন্দার বার্তাবাহক হতো। এক অর্থে বলতে গেলে তাকে আত্ম-নিন্দা ঘোষণা করার কাজ দেওয়া হতো যার মাধ্যমে স্বকৃত অপরাধের সত্যতাকে প্রত্যয়ন করা হতো। রাস্তায় জনতার মিছিলের ভেতর দিয়ে যাবার সময়, তার (অভিযুক্তের) পিঠে, বুকে বা মাথায় বেঁধে দেওয়া ব্যানার যা তাকে দেওয়া দণ্ডাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতো। বিভিন্ন রাস্তার সংযোগস্থলে থামার সময় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ঘোষিত দণ্ড পাঠ করা হতো, গির্জার দরজায় এ্যামেণ্ডে অনারেবল সম্পন্ন হতো, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি চারপাশের ভাবগম্ভীর পরিবেশের ভেতর নিজের অপরাধ স্বীকার করতো। ‘নগ্নপদ, একটি শার্ট পরনে, হাতে একটি মশাল, হাঁটু গেঁড়ে বসে অপরাধীকে বলতে হতো, ঘোষণা করতে হতো যে মন্দভাবে, ভয়ঙ্করভাবে, প্রতারকের মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ সে করেছে।’ জনসমক্ষে অভিযুক্তকে একটি খুঁটিতে বেঁধে তার করা অপরাধ এবং অপরাধের শাস্তি পড়ে শোনানো হতো। আবার, বধ্যমঞ্চে তুলবার সময় আর এক দফা এই শাস্তির ঘোষণা পড়ে শোনানো হতো। স্রেফ গলায় কাঠের চাকা বাঁধা, খুঁটিতে বাঁধা বা চাকায় পিষ্ট করা সহ যে ধরনের শাস্তিই তার কপালে লেখা থাকুক না কেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জনসমক্ষে দৈহিক নানা নিপীড়ন গ্রহণের মাধ্যমে নিজের করা অপরাধ এবং অপরাধের শাস্তি ঘোষণা করতে হতো।

২. মৃত্যুদণ্ডের এই প্রকাশ্য প্রয়োগের মাধ্যমে গোটা স্বীকারোক্তি প্রদানের দৃশ্যটি পুনরায় অভিনীত হতো। জনতার স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতির ভেতর জোরপূর্বক এ্যামেণ্ডে অনারেবল ঘোষণার বিষয়টি দু’বার সম্পন্ন হতো। মৃত্যুদণ্ডের এই প্রকাশ্য প্রয়োগ জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড প্রদানকে সত্যের মুহূর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোয়, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তির আর কিছুই হারাবার থাকে না, তখন যেন সত্যের আলোর বিজয় ঘোষিত হয়। মামলার শাস্তি ঘোষণার পর, আদালত অপরাধীর উপর আরো কিছু নতুন নির্যাতন চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতো। যাতে করে অপরাধে তার দুষ্কর্মের সহযোগীদের নামও জানা যায়। এমনকি অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন বধ্যমঞ্চে আরোহণ করতো, তখন অপরাধ বিষয়ে আরো কিছু নতুন তথ্য পাবার আশায় তাকে ক্ষণিকের বিশ্রাম দেবার রীতিও চালু ছিল। বধ্যমঞ্চের সামনে সমবেত জনতাও সত্যের পরিক্রমায় নতুন দিক দর্শনের আশা করতো। অনেক অপরাধী আবার মৃত্যুর আগে কিছু সময় প্রাপ্তির আশাতেও অপরাধ বিষয়ে নতুন তথ্য দিতে চাইতো। যেমন, সশস্ত্র হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত মিশেল বার্বিয়েহ করেছিল। ‘বধ্যমঞ্চের দিকে ধৃষ্টতার সাথে তাকিয়ে সে (মিশেল) বললো যে যেহেতু সে নিষ্পাপ, সুতরাং এই বধ্যমঞ্চ নিশ্চিত ভাবেই তার জন্য স্থাপিত হয় নি। প্রথমে সে আদালত কক্ষে তাকে ফিরিয়ে নেবার জন্য অনুরোধ করলো। আদালতে আধা ঘণ্টা ধরে অপরাধ বিষয়ক নানা ধরনের গাল-গল্প বলার চেষ্টা করলো সে যেখানে নিজেকে নিষ্পাপ প্রমাণ করার চেষ্টা ছিল তার। তারপর আবার যখন তাকে বধ্যমঞ্চে পাঠানো হলো, প্রথমে সে মঞ্চে উঠলো অনেকটা স্থিরসঙ্কল্প বিশিষ্ট ভঙ্গিতে। কিন্তু, নিজেকে যখন সে দেখতে পেল নগ্ন ও শোয়ানোর পূর্বে ক্রসের সাথে বাঁধা অবস্থায়, আদালত কক্ষে তাকে ফিরিয়ে নেবার জন্য সে দ্বিতীয় দফা অনুরোধ করলো এবং সেখানে সে তার অপরাধগুলোর এক পরিপূর্ণ স্বীকারোক্তি প্রদান করলো। অপর একটি খুনের সাথে জড়িত থাকার অপরাধও সে স্বীকার করলো (হার্ডি, ৪, ৮০)।’ জনসমক্ষে নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড প্রদানের উদ্দেশ্য ছিল সত্যকে প্রকাশ করা। এবং, সেই হিসেবেই প্রকাশ্য নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড প্রদানের রেওয়াজটি চালু ছিল। তবে, মামলার তদন্তের স্বার্থে যে নির্যাতন তা কিšত্ত করা হতো গোপনীয়তার আড়ালে। এ যেন কাউকে দোষী সাব্যস্তকরণের ক্ষেত্রে স্বয়ং দোষীর কাছ থেকে অপরাধ বিষয়ক স্বাক্ষর গ্রহণ। একটি সফল প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠান জনতার কাছে বিচারের সারবত্তা তুলে ধরতো। এবং, সে কাজেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির সমগ্র শরীরে তার কৃত অপরাধের সত্যতা ফুটিয়ে তুলতে হতো। এহেন এক চমৎকার দণ্ডিত পাপী ছিলেন ফ্রাঁসোয়া বিলিয়ার্ড। ফ্রাঁসোয়া ছিলেন ডাক বিভাগের জনৈক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যিনি ১৭৭২ সালে আপন স্ত্রীকে খুন করেন। জনতার অপমান থেকে রক্ষার জন্য জল্লাদ ফ্রাঁসোয়ার মুখ ঢেকে রাখতে চেয়েছিলেন। ‘ “এই যে শাস্তি আমি আজ অর্জন করেছি, তা আমাকে দেওয়া হয় নি,” ফ্রাঁসোয়া বলেন, “কাজেই, আমার মুখ দেখতে পাওয়াটা সাধারণ মানুষের উচিত নয়…।” তিনি তখনো তার স্ত্রীর স্মরণে শোকের পোশাক পরা ছিলেন…তার পরনে ছিল নতুন জুতো এবং চুলগুলো ছিল সদ্যই কোঁকড়া করা ও পাউডার মাখা। তার যাবতীয় আচরণে এমন এক বিনয়ী ও মর্যাদাবান ব্যক্তির অভিব্যক্তি ছিল যে উপস্থিত যারাই তাকে কাছ থেকে দেখেছেন, তারাই বলেছেন যে হয় তিনি সবচেয়ে নিখুঁত একজন খ্রিষ্টান অথবা ভণ্ডদের রাজা। তার বুকের উপর যে ব্যানারটি তিনি বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, সেটা খানিকটা তির্যক ভাবে ধরে রাখা ছিল। এটা লক্ষণীয় যে তিনি নিজেই ব্যানারটি সোজা করে বুকের উপর ধরেন যাতে এটা সহজে পড়া যায়’ (হার্ডি, ১, ৩২৭)। এভাবেই দণ্ড প্রদান অনুষ্ঠানটি একটি দীর্ঘ ও প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি অনুষ্ঠানের মর্যাদা অর্জন করতো যদি এই অনুষ্ঠানের প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী ঠিকঠাক মতো তার ভূমিকা পালন করতে পারতো।

৩. শাস্তির প্রকাশ্য প্রয়োগের এই রেওয়াজ জনসমক্ষে নির্যাতন ও অপরাধের ভেতর সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলতো। একরকম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে প্রকাশ্য নির্যাতনের বিষয়টি অপরাধের ঘাড়ে চাপাতো। অপরাধী যে জায়গায় অপরাধটি করেছিল, সেখানে তার শবদেহ প্রদর্শন করা হতো। অথবা, আশপাশের কোনো রাস্তার মোড়েও দেখানো হতো তার লাশ। সাধারণতঃ যে নির্দিষ্ট স্থানে অপরাধী অপরাধ করেছে, ঠিক সেখানেই তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হতো। যেমন, ১৭২৩ সালে যে ছাত্র একটি সরাইখানায় কয়েকজন ব্যক্তিকে খুন করেছিল, তাকে ঠিক সেই সরাইখানার সামনেই বধ্যমঞ্চ স্থাপন করে নান্তের আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদানের নির্দেশ দেয় (নান্তেস, এফ. এফ. ১২৪, পারফৌরু, ২৫। এছাড়াও ছিল ‘প্রতীকি’ নানা অত্যাচারের প্রকরণ যা অপরাধের প্রকৃতি নির্দেশ করতো: যেমন, ঈশ্বর নিন্দাকারীর জিহ্বা বিদ্ধ করা হতো, অশুচিদের পোড়ানো হতো, খুনীদের ডান হাত কেটে ফেলা হতো; মাঝে মাঝে আবার অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যে অস্ত্র দিয়ে সে অপরাধ সঙ্ঘটন করেছে, সেটা তাকে প্রকাশ্যে বহন করতে হতো তার অন্যায়ের স্মারক হিসেবে। যেমন, দেমিয়েঁকে তার পাপী ডান হাতে বইতে হয়েছে সেই কুখ্যাত তরবারী যা দিয়ে সে সম্রাটকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। দেমিয়েঁর হাত এবং তরবারী একই সাথে গন্দকের আঠালো প্রলেপ মাখিয়ে একত্রে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পুরনো এই আইনশাস্ত্রকে ভিকো যেমন অভিহিত করেছেন ‘একটি গোটা কাব্যশাস্ত্র’ হিসেবে।

এমনকি কিছু কিছু মামলায় অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের সময় অপরাধের একটি হুবহু মঞ্চাভিনয় প্রদর্শিত হতো। মূল অপরাধ সঙ্ঘটনের সময় যে সমস্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন অঙ্গভঙ্গি করা হয়েছে সেসবই পুনরাবৃত্ত হতো। এভাবেই বিচার ব্যবস্থা চাইতো সবার চোখের সামনে অপরাধটি পুনরাবৃত্ত হোক। হোক সত্যের প্রকাশ। এবং সবশেষে অপরাধী ব্যক্তির মৃত্যুর মাধ্যমে দূরীভূত হোক সমস্ত অপরাধ। এমনকি ১৭৭২ সালের মতো আঠারো শতকের শেষদিকেও কাম্ব্রাইয়ে (Cambrai) বাড়ির কর্ত্রীকে খুনের দায়ে এক গৃহপরিচারিকাকে খুব কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়। কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে ‘রাস্তার মোড়ে আবর্জনা কুড়ানোর গাড়িতে করে’ তার মৃত্যুদণ্ড প্রদানের স্থানে নিয়ে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। অতঃপর ফাঁসিকাঠটি স্থাপন করা হয় এমন এক জায়গায় যার পায়ের কাছে সেই আরাম কেদারাটি বসানো হয় যে কেদারায় উপবিষ্ট অবস্থায় গৃহকর্ত্রী লালেউকে এই পরিচারিকা খুন করেছিল। ঠিক সেই আরাম কেদারাতেই অভিযুক্ত পরিচারিকাকে বসানোর পর উচ্চ আদালতের জল্লাদ তার ডান হাত কেটে ফেলে তার (পরিচারিকার) সামনেই হাতটি ছুঁড়ে ফেলে জ্বলন্ত আগুনে। এর পরপরই মাংস কাটার যে ছুরি দিয়ে এই মেয়েটি বাড়ির গৃহকর্ত্রীকে খুন করেছিল, সেই ছুরি দিয়ে তাকে উপর্যুপরি চারটি আঘাত করা হয়। প্রথম দুটো আঘাত জল্লাদ করে মেয়েটির মাথায়। তৃতীয় আঘাতটি করা হয় তার বাঁহাতের কনুই থেকে কব্জি বরাবর এবং চতুর্থ আঘাতটি করা হয় মেয়েটির বুকে। এটা করার পর, তাকে ফাঁসিকাঠে শ্বাসনালী রুদ্ধ করে ঝোলানো হয় যতক্ষণ না তার মৃত্যু ঘটে। দু’ঘণ্টা পর তার মৃতদেহ সরিয়ে নেয়া হয় এবং বধ্যমঞ্চের ফাঁসিকাঠের পাদদেশে সেই মাংস কাটার ছুরি দিয়েই মেয়েটির মস্তক তার ধড় থেকে আলাদা করা হয়, যে ছুরি দিয়ে সে তার গৃহকর্ত্রীকে হত্যা করেছিল। সবশেষে কাম্ব্রাইয়ের দরজার বাইরে একটি বিশ ফুট উঁচু খুটিতে তার ছিন্ন মস্তকটি প্রদর্শন করা হয়। খুঁটিটি দোয়াইয়ের দিকে যাবার রাস্তার নাগালে স্থাপন করা হয় যাতে সবাই এই কর্তিত মাথাটি দেখতে পায়। হতভাগ্য মেয়েটির অবশিষ্ট শরীর একটি বস্তায় পুরে ওই খুঁটির পাশেই মাটির দশ হাত গভীরে পুঁতে ফেলা হয় (উদ্ধৃত, দ্যোত্রিকোর্ট, ২৬৯-৭০)।

৪. সবশেষে, নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদান প্রক্রিয়ার ধীরগতি, এর হঠাৎই আসা নাটকীয় মুহূর্তগুলো, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির কান্না ও যন্ত্রণা যেন অপরাধীর অন্যায়ের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে মামলার শেষ পর্যায়ে আবির্ভুত হয়। প্রতিটি মৃত্যুযন্ত্রণাই একটি নির্দিষ্ট সত্যকে প্রকাশ করে। কিন্তু, যখন এই মৃত্যুযন্ত্রণা বধ্যমঞ্চের উপর অনুষ্ঠিত হয়, তখন এটা তীব্র আকার ধারণ করে। অপরাধীকে দেওয়া হয় কঠোরতর যন্ত্রণা। যেহেতু বধ্যমঞ্চের এই শাস্তি যেন সঙ্ঘটিত হচ্ছে খোদ মানবীয় বিচার ব্যবস্থা ও ঐশ্বরিক বিচার ব্যবস্থার এক মিলনবিন্দুতে। জনসমক্ষে এই শাস্তি প্রদর্শন করা হয় বলে লোকদেখানো আড়ম্বরও এতে থাকে বেশি। অভিযুক্ত ব্যক্তির যন্ত্রণা ইতোপূর্বেই তার উপর সঙ্ঘটিত তদন্তকালীন বিভিন্ন নির্যাতনেরই যেন বা সম্প্রসারণ। তদন্তকালীন নির্যাতনের সময় অবশ্য অবস্থাটি এমন যে তখনো খেলা শেষ হতে কিছু বাকি এবং তখনো জীবনে বেঁচে যাবার সম্ভাবনা আছে অপরাধীর। কিন্তু, বধ্যমঞ্চের নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রেক্ষিতটি ভিন্ন। নিঃসন্দেহে অভিযুক্ত ব্যক্তি এগিয়ে চলেছে মৃত্যুর দিকে। তার শরীর বাঁচানোর কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও তার আত্মাকে বাঁচানো যেতে পারে। ইতোমধ্যেই সূচনা হয়েছে শাশ্বতের খেলা: মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগকালীন নির্যাতন বর্ণনা করে সামনে কী আছে। এই নির্যাতন প্রদর্শন করে আপন স্বরূপ। এ যেন খোদ নরকের মঞ্চায়ন, অভিযুক্তের কান্না ও তার লড়াই, তার অভিসম্পাত সবই যেন তার অমোঘ নিয়তিকেই নির্দেশ করছে। তবে, ধরাধামে প্রাপ্ত এই যন্ত্রণাই তো অভিযুক্তের শাস্তি যা স্বর্গলোকে তার প্রাপ্ত শাস্তির বোঝা কমালেও কমাতে পারে। ঈশ্বর নিশ্চয়ই এমন এক শহীদান হওয়ার ঘটনাকে তার হিসাবের খাতায় টুকে নেবেন। অবশ্য যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি এই শাস্তি বিনা প্রতিবাদে ও শান্তভাবে মেনে নেয় তবেই। মর্ত্যলোকে প্রাপ্ত দণ্ডের নিষ্ঠুরতা অমর্ত্যলোকের শাস্তির বোঝার ভার লাঘব করবে। এতে করে ক্ষমা পাবার এক প্রতিশ্র“তির ঝলক বুঝি দেখা যায়। কিন্তু, পাশাপাশি একথাও বলা যেতে পারে যে অপরাধীকে দেওয়া এই নিষ্ঠুর যন্ত্রণা কি তবে এই ইঙ্গিত বহন করে না যে ঈশ্বর পাপী-তাপীকে বিচারের ভার তাঁরই সৃষ্ট অন্য মনুষ্যদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন? এবং আইনের প্রহরীরা স্বর্গলোকে পাপীর ভবিষ্যৎ পাপমোচনের প্রশ্নে যাবার বহু আগেই কখনো কখনো পাপীকে দ্রুতই নরকদণ্ডের মুখোমুখি করছেন কিনা তেমন প্রশ্নও এসে যায়। যেমন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দীর্ঘ যন্ত্রণা ভোগের আগেই দ্রুত মৃত্যুবরণ করে, তবে পৃথিবীতেই তার প্রায়শ্চিত্ত হয়ে স্বর্গে ক্ষমা পাবার ব্যাপারটি নিশ্চিত হয় না। আবার, পাপীর ত্বরিত মৃত্যু এটা প্রমাণ করে না তো যে ঈশ্বর এই অভিযুক্তকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন? চেয়েছিলেন তাকে হতাশা ও যন্ত্রণার সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে? এভাবেই অভিযুক্তের প্রাপ্ত যন্ত্রণার ভেতর থেকে যায় কিছু দ্ব্যর্থকতা। এই দ্ব্যর্থকতা একই সাথে মূর্ত করে তোলে অপরাধের সত্যতা কিম্বা বিচারকদের ভুল, অপরাধীর ভালোত্ব বা মন্দত্ব, মানবীয় বিচার এবং ঐশ্বরিক বিচারের ভেতর মিল বা অমিল। ঠিক এই কারণেই অপরিমিত কৌতূহল নিয়ে দর্শকরা বধ্যমঞ্চের কাছে যেত অভিযুক্তের সওয়া সত্যকারের যন্ত্রণা দেখতে। সেখানে যেন একজন মানুষ সত্যিকার অর্থেই পাঠ করতে সক্ষম হতো অপরাধ ও অপরাধহীনতা, অতীত ও ভবিষ্যৎ, বধ্যমঞ্চের বাস্তবতা ও শাশ্বতের অমোঘতা। এই সত্য ছিল যেন মুহূর্তের সত্য যাকে সব দর্শকই প্রশ্ন করতো। বধ্যমঞ্চের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কান্না, যন্ত্রণার স্থায়ীত্বকাল, অপরাধীর প্রতিরোধী শরীর, জীবন যা শত নির্যাতনের পরও শরীরটা সহজে ছাড়তে চাইতো না…এ সব কিছ্ ুমিলেই যেন গঠন করতো একটি বিশেষ চিহ্ন। একজন অপরাধী ‘চাকার উপর তোলার পরও ছ’ঘন্টা বেঁচেছে এবং এই ছ’ঘন্টা সময়ের একটি মুহূর্তের জন্যও দণ্ড প্রদানকারীকে কাছ ছাড়া করতে চায় নি যেহেতু দণ্ড প্রদানকারী তাকে আন্তরিক ভাবে স্বান্তনা দিয়েছে এবং সাধ্যানুযায়ী তাকে হাসি-খুশি রাখার চেষ্টা করেছে।’ একজন অপরাধী আবার মারা গেছে ‘যথার্থ খ্রিষ্টিয় বোধ নিয়ে এবং প্রদর্শন করেছে সত্যিকারের অনুতাপ।’ একজন অভিযুক্তকে ‘চাকায় তোলার এক ঘণ্টার ভেতরেই মারা গেছে এবং দর্শকরা তার ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুতাপের প্রকাশে সত্যিই সমবেদনা বোধ করে।’ বধ্যমঞ্চে আরোহণের সময় একজন অভিযুক্ত সবচেয়ে অনুতাপগ্রস্থ চেহারা দেখালেও চাকায় জীবন্ত তোলার পর ‘সবচেয়ে জোরে চিৎকার ও কান্নাকাটি করা থেকে বিরত থাকে নি।’ আবার একজন মহিলা ‘মৃত্যুদণ্ড পড়ে শোনানো অবধি খুব শান্ত থাকলেও দ্রুতই ধৈর্য্য হারাতে থাকেন তিনি। ফাঁসিতে ঝোলানোর সময় নাগাদ তিনি প্রায় উন্মাদিনী হয়ে যান (হার্ডি ১, ১৩; ৪, ৪২; ৫, ১৩৪)।’

আমরা গোটা বৃত্তটি পরিক্রমা করে এসেছি। তদন্ত থেকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান অবধি অপরাধীর শরীর উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করেছে অপরাধের সত্যতা। অথবা, এই বৃত্ত সেইসব উপকরণের ভিত্তিতে গঠিত যা বিভিন্ন আচারানুষ্ঠান এবং বিচারের মাধ্যমে এ কথা স্বীকার করে নেয় যে অপরাধটি ঘটেছিল। স্বীকার করে নেয় যে অভিযুক্তই প্রকৃতপক্ষে অপরাধটি করেছে এবং অপরাধী এই অপরাধের দায় নিজের ঘাড়ে খোদাই করে নিয়েছে। আর, এই গোটা বৃত্ত পরিক্রমার মাধ্যমে অপরাধী নিজেই দণ্ড ব্যবস্থার প্রয়োগকে সমর্থন যোগায় এবং শাস্তির অভিঘাতকে সবচেয়ে বেশি বিস্ময়করভাবে প্রকাশ করে। অপরাধীর শরীর, বার কয়েক অত্যাচারিত, অভিযুক্তের কৃতকর্মের বাস্তবতা এবং তদন্তের সত্যতার এক সংশ্লেষণকে প্রকাশ করে। প্রকাশ করে মামলার নথিপত্র এবং অপরাধীর বিবরণ, অপরাধ ও শাস্তির সংশ্লেষণ। সুতরাং, শাস্তির গণপ্রার্থনায় অপরাধীর শরীর এক জরুরি উপকরণ। অপরাধীর শরীর ফৌজদারি প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবে কাজ করতে বাধ্য। যে ফৌজদারি প্রক্রিয়া আবার সার্বভৌম সম্রাটের নিরঙ্কুশ অধিকার, মামলা এবং গোপনীয়তাকে কেন্দ্র করে নির্দেশিত হয়ে থাকে।

প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিষয়টি শুধুমাত্র একটি বিচারগত অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলেই চলবে না। এটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানও বটে। ছোট ছোট মামলার ক্ষেত্রেও এমন সব আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে শাস্তি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে যে এর মাধ্যমে ক্ষমতার প্রদর্শনীই ঘটে থাকে।

ধ্রুপদী যুগের আইন অনুযায়ী একটি অপরাধকে কিন্তু এই অপরাধের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়-ক্ষতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা হয়। এমনকি যেসব নিয়ম সে ভঙ্গ করে বা আইন মেনে চলা যেসব ব্যক্তির সাধুতাকে সে ক্ষতিগ্রস্থ করে, সেসব থেকেও অপরাধকে আলাদা করে দেখা হয়। ‘যদি কেউ আইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো কাজ করেন, যদি সেই কাজে কোনো ব্যক্তির কোনো ক্ষয়-ক্ষতি নাও হয়, তবু এটি একটি অপরাধ যার ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন। যেহেতু এই নিষিদ্ধ কাজ করার মাধ্যমে শ্রেয়োতর মানবের অধিকার ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং এটা তার চরিত্রের মর্যাদাকেও আহত করে।’ (রিসি, ৯)। অপরাধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ছাড়াও, অপরাধ আঘাত করে সার্বভৌম সম্রাটকেও। আঘাত করে এক্কেবারে ব্যক্তিগত মাত্রায়ও যেহেতু ‘আইন হলো সার্বভৌম সম্রাটের ইচ্ছা।’ অপরাধ সার্বভৌম সম্রাটকে শারীরিক ভাবেও আঘাত করে যেহেতু আইন হলো খোদ সম্রাটের শক্তি। ‘এই রাজ্যে আইনকে কার্যকরী হতে হলে, তা সরাসরি সম্রাটের নিকট হতে উৎসারিত হতে হবে। অথবা অন্ততঃ সম্রাটের কর্তৃত্বের মোহরানা দ্বারা নিশ্চিত হতে হবে।’ (মুয়্যার্ট দু ভোগলান্স, ৩৪)। সার্বভৌম শাসকের হস্তক্ষেপ তাই দুই বিবদমান পক্ষের ভেতর কোনো সালিশী বা মধ্যস্থতা নয়। এটা ব্যক্তির অধিকারের প্রতি সম্মান আদায়ের জন্য একটি তৎপরতাও বৈকি। সম্রাটের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি আঘাতকারী ব্যক্তির প্রতি এটি প্রত্যক্ষ ও সমুচিত জবাব। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না যে ‘অপরাধের শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ বিচার ব্যবস্থার অন্যতম জরুরি উপাদান (জুসে, ৭ম।’ শাস্তিকে তাই ক্ষতিপূরণের সাথে এক করে দেখলে চলবে না। এমনকি ক্ষতিপূরণের দ্বারা শাস্তিকে পরিমাপ করাটাও উচিত হবে না। শাস্তির ক্ষেত্রে সবসময়ই সম্রাটের জন্য বরাদ্দ একটি অংশ থাকে। এবং যদি কখনো বা শাস্তিকে ক্ষতিপূরণের সাথে মেলানোও হয়, সেক্ষেত্রেও অপরাধের দণ্ডের হিসাবের ক্ষেত্রে সম্রাটের জন্য বরাদ্দ অংশটুকু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন সম্রাটের জন্য বরাদ্দ এই অংশটুকু একাই যথেষ্ট নয়। এক দিক থেকে দেখলে, শাস্তি সম্রাটের সাম্রাজ্যের প্রতি করা আঘাতের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। নৈরাজ্যের উপকরণ এবং অন্যদের প্রতি প্রদত্ত উদাহরণ হিসেবে ব্যক্তির প্রতি করা এই অপরাধ সকল হিসাব-নিকাশ ছাড়িয়ে যায়। সেই সাথে শাস্তি এটাও দাবি করে যে সম্রাট তার প্রতি করা অপমানেরও একটি প্রতিশোধ নিন।

সুতরাং, দণ্ডদানের ক্ষমতার একটি দিক হলো শত্র“র বিরুদ্ধে সার্বভৌম সম্রাটের যুদ্ধ করার অধিকার। দণ্ডদান ‘জীবন মরণের সেই পরম ক্ষমতা নির্দেশ করে যাকে রোমক আইনের ভাষ্যে বলা হয় মেরাম ইম্পেরিয়াম (merum imperium)। এই অধিকারের মাধ্যমে সম্রাট দেখতে পান যে অপরাধের শাস্তি বিধানের মাধ্যমে সবাই তাঁর আইনকে মান্য করছে।’ (ম্যুয়ার্ট দ্যু ভোগলান্স, ৩৪। এক অর্থে দেখলে, আইনে সার্বভৌম সম্রাটের শারীরিক-রাজনৈতিক শক্তি উপস্থিত থাকে। একারণেই শাস্তি হলো ব্যক্তিক ও জনজীবন, এই উভয় পরিসরেই প্রতিশোধ আদায়ের পন্থা। “আইনের সংজ্ঞাতেই যে কেউ এটি পরিষ্কার দেখতে পাবেন যে আইন শুধুমাত্র নিষেধ করার কাজই করে না, বরং যারা আইনের বাধা-নিষেধ অমান্য করে, তাদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে এই অমান্যকরণের প্রতিশোধও আদায় করে। (ম্যুয়ার্ট দ্যু ভোগলান্স, ৪৪)। সবচেয়ে সাধারণ শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কিম্বা আইনী কাঠামোর সবচেয়ে আদব-কায়দাবিশিষ্ট দণ্ডের ক্ষেত্রেও প্রতিশোধের সক্রিয় শক্তিই রাজত্ব করে।

প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের তাই একটি বিচারগত-রাজনৈতিক সক্রিয়তা রয়েছে। এটি একটি অনুষ্ঠান যার মাধ্যমে ক্ষণিকের ক্ষতিগ্রস্ত সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠিত হয়। সবচেয়ে বেশি জাঁক-জমকপূর্ণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাই শাস্তি তার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করে। প্রকাশ্য দণ্ডপ্রয়োগ, যতই তাড়াহুড়ো করে করা ও নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে থাকুক না কেন, এটি বিশাল নানা আচারানুষ্ঠানের আওতাধীন। এই যাবতীয় আচারানুষ্ঠানের ভেতর ক্ষমতার গ্রহণ ও পুনর্গঠন সাধিত হয়। যেমন, রাজ্যাভিষেক, বিজিত নগরীতে সম্রাটের প্রবেশ, বিদ্রোহী জনতার আত্মসমর্পণ ইত্যাদি। সর্বোপরি যে অপরাধ স্বয়ং সার্বভৌম সম্রাটকে অবমাননাকর অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে, তা সবার চোখেই আবির্ভূত হয় এক অদম্য শক্তি হিসেবে। ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠিক শাস্তির উদ্দেশ্য নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ তার আইন অমান্য করার সাহস পাওয়া প্রজা ও সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী সম্রাটের ভেতরকার ক্ষমতার অসঙ্গতিকে নাটকীয় ভাবে ফুটিয়ে তোলায়। শাস্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত মুহূর্তে এই নাটকীয়তা সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করে। অপরাধের ফলে সৃষ্ট কোনো বিশেষ ব্যক্তির ক্ষয়-ক্ষতি শাস্তির মাধ্যমে অবশ্যই পূরণ হয়। মামলার রায়কেও হতে হয় ন্যায়পরায়ণ। তবে, এসব কিছু ছাপিয়ে শাস্তি এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যা দর্শকদের পরিমিতি বোধের চেয়ে অতিরিক্ত ও ভারসাম্যহীন কোনো কিছুর প্রতিরূপ দান করে থাকে। শাস্তির এই গণপ্রার্থনা বিধিতে, ক্ষমতার জোরালো ঘোষণা ও এর অন্তর্নিহিত শ্রেষ্ঠত্বই ফুটে ওঠা বাধ্যতামূলক। এই শ্রেষ্ঠত্ব শুধু অধিকারের শ্রেষ্ঠত্বই প্রকাশ করে না। বরং সার্বভৌম সম্রাট কর্তৃক তার প্রতিপক্ষের শরীর পিটিয়ে তার উপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার শারীরিক সামর্থ্যকেও প্রকাশ করে বৈকি। আইন ভঙ্গ করার মাধ্যমে অপরাধী সম্রাটের খোদ শরীরকেই যেন আঘাত করেছে। এবং প্রত্যুত্তরে সম্রাট বা সম্রাট যাদের ক্ষমতা অর্পণ করেন তারা অপরাধীর শরীর দখল করেন এবং প্রকাশ্যে দাগ দিয়ে, পিটিয়ে, ভেঙে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রদর্শনী চালান। শাস্তির অনুষ্ঠান তখন ‘সন্ত্রাসে’র চর্চা হয়ে দাঁড়ায়। আঠারো শতকে আইনবিদদের সাথে সংস্কারপন্থীদের বিতর্কের সময়, আইনবিদরা আইনে বিধিবদ্ধ শাস্তির শারীরিক নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে সংযত তবে ‘আধুনিক’ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তারা বলেন যে কঠোর শাস্তি এ কারণেই প্রয়োজন যে তা মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে থাকবে। তবে, প্রকৃতপক্ষে এখনো পর্যন্ত অপরাধীকে নির্যাতনের চর্চার যে ধারাবাহিকতা, তাতে পরিমিতি বোধের উদাহরণ তেমন একটা দেখা যায় না। অন্ততঃ ইদিওলোগের সময়ে যে অর্থে পরিমিতি বোধের ব্যবহার হতো সেই অর্থে পরিমিতি বোধ বলতে গেলে নেইই। ইদিওলোগের সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গী প্রচলিত ছিল যে শাস্তির প্রতিনিধিত্ব অপরাধের স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর হতে হবে। শাস্তি প্রয়োগে পরিমিতি বোধের চেয়ে বেশি দেখা যায় সন্ত্রাসের নীতির ব্যবহার। অপরাধীর শরীরে আঘাতের মাধ্যমে উপস্থিত সবাইকে সম্রাটের অমিত উপস্থিতির বিষয়টি বোঝানো। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ তাই ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেনি। এটি ক্ষমতাকে পুনরায় সক্রিয় করেছে মাত্র। সতেরো শতকে এবং আঠারো শতকের শুরুতে শাস্তি তাই এর অন্তর্নিহিত যাবতীয় সন্ত্রাসী নাটকীয়তা সত্ত্বেও আগের যুগের বিলম্বিত খোঁয়ারি ছিল না। শাস্তি ব্যবস্থার রাজনৈতিক সক্রিয়তাতেই এর নির্মমতা, দর্শক শ্রেণী, শারীরিক সন্ত্রাস, শক্তির ভারসাম্যহীন প্রদর্শনী, পুঙ্খানুপুঙ্খ আনুষ্ঠানিকতা এবং যাবতীয় উপকরণ প্রোথিত ছিল।

শাস্তির উপরোল্লিখিত দিকগুলোই নির্যাতনের গণপ্রার্থনাবিধি ও মৃত্যুদণ্ডের চারিত্র্য বুঝতে সাহায্য করবে। সর্বোপরি, জনসমক্ষে শাস্তির জাঁক-জমকপূর্ণ প্রদর্শনী আয়োজন করার গুরুত্ব বুঝতেও সাহায্য করবে। মূল মনোভাব হলো আইনের বিজয় ঘোষণায় কোনো কিছুই লুকিয়ে-চুরিয়ে করা ঠিক নয়। শাস্তির পর্বগুলো ঐতিহ্যগত ভাবে ছিল একই ধাঁচের। তবু, মামলার রায়ে এই প্রতিটি পর্বই পালনের তালিকা বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করতে কখনো ভুল হতো না। অপরাধীকে নিয়ে মিছিল, রাস্তার মোড়ে মোড়ে আর গির্জার সামনে থামা, প্রকাশ্যে বিচারের রায় পড়ে শোনানো, অপরাধীর হাঁটু গেড়ে বসা, ঈশ্বর ও সম্রাটের কাছে অন্যায়ের জন্য অনুশোচনা ঘোষণা–এই প্রতিটি পর্বই দণ্ডের কৃৎকৌশলে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে আদালত নিজেই অপরাধীকে নিয়ে প্রকাশ্য মিছিলে আদালতের কোন কর্মচারী কার আগে হাঁটবেন ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতার খুঁটিনাটি প্রশ্নগুলো সুরাহা করে ফেলতো। “আদালতের কর্মকর্তাবৃন্দ নিম্নোক্ত ভাবে বিন্যস্ত হবেন: মিছিলের একদম পুরোভাগে থাকবেন দু’জন পুলিশ সার্জেন্ট। তারপর রোগী (অপরাধী)। রোগীর ঠিক পিছনেই বাঁদিকে হাঁটবেন বঁ ফোঁ (Bon Fort) এবং লো কোহে (Le Corre)। তাদের পিছনে হাঁটবেন আদালতের কেরাণী। গোটা মিছিলটি এভাবে বাজারের চত্বর অবধি পৌঁছাবে। সেখানেই মামলার রায় পড়ে শোনানো হবে (উদ্ধৃত: কোহে, ৭)।’ এখন এই পুঙ্খানুপুঙ্খ আনুষ্ঠানিকতা শুধু আইনী আনুষ্ঠানিকতাই ছিল না। বরং এর বেশ খোলামেলা একটি সামরিক চারিত্র্যও ছিল। সম্রাটের ন্যায়বিচারকে দেখাতে হতো সশস্ত্র ন্যায়বিচার হিসেবে। যে তরবারি অপরাধীকে শাস্তি দেয়, সেই একই তরবারি শত্র“ বিনাশে সক্ষম, এটাই ছিল এই বিচারের মোদ্দা কথা। বধ্যমঞ্চ ঘিরে থাকতো একটি গোটা সামরিক যন্ত্রকৌশল: পাহারাদারদের অশ্বারোহী বাহিনী, তীরন্দাজ, নিরাপত্তারক্ষী, সৈন্য। বধ্যমঞ্চকে ঘিরে এই সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হতো যেন কোনো অপরাধী পালিয়ে না যেতে পারে। সেইসাথে সম্রাটের ক্ষমতার প্রদর্শনী একটি বড় ব্যাপার তো ছিলই। সেই সাথে উপস্থিত সাধারণ দর্শক যেন অভিযুক্তের পক্ষে সমবেদনা ও ক্রোধে ফেটে না পড়ে সে বিষয়টি প্রতিরোধ করাও ছিল একটি বড় উদ্দেশ্য। আরো উদ্দেশ্য ছিল যেন সমবেত সাধারণ জনতা অপরাধীকে বাঁচানোর বা সময়ের আগেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার চেষ্টা না করে। সেইসাথে শাস্তির এ প্রদর্শনীর আরো একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যে প্রতিটি অপরাধই আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং অপরাধী সম্রাটের শত্রু। এ যাবতীয় বিষয় মিলেই (সে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে গৃহীত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ বা আইনী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার উপকরণ যাই হোক না কেন) প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের ব্যাপারটি ন্যায়বিচারের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু একটি হয়ে দাঁড়ায়। শাস্তির এ প্রদর্শনী একই সাথে শক্তিরও প্রদর্শনী। এ যেন বধ্যমঞ্চে সম্রাটের ভয় ও সম্ভ্রমজাগানিয়া শারীরিক এবং মানসিক শক্তির প্রকাশ। প্রকাশ্য নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড উপস্থিত সকল দর্শককে ক্ষমতা সম্পর্কের প্রদর্শনী আয়োজন করতো যা সম্রাটের আইনকে যোগাতো শক্তি।

সশস্ত্র আইনের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের ছিল দুটো দিক। একটি বিজয় ও অপরটি সংগ্রাম। উল্লেখ্য, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের এ অনুষ্ঠানে সম্রাট নিজেকে প্রদর্শন করতেন গোটা প্রদর্শনীর অবিভাজ্য অংশ হিসেবে। এই প্রদর্শনী ভাবগম্ভীর ভাবে সমাপ্তি ঘোষণা করেছে একটি যুদ্ধের। যে যুদ্ধের ফলাফল আগেই স্থির করা হয়েছে। অপরাধী এবং সার্বভৌম সম্রাটের ভেতরে যুদ্ধ। শাস্তির এই প্রদর্শনীকে প্রকাশ করতে হতো অধীনস্থ প্রজাদের উপর সম্রাটের অপরিমিত শক্তি হিসাবে, যাদের তিনি নপুংসক হিসেবে খর্ব করে রাখতে পারেন। সম্রাটের সাথে সাধারণ মানুষের শক্তির এ ভারসাম্যহীনতা, এই অপ্রতিস্থাপনযোগ্য অসমতাই ছিল শাস্তির প্রকাশ্য প্রদর্শনীর অত্যাবশকীয় উপকরণ। একটি শরীর মুছে ফেলে, ধূলোয় মিশিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া। সার্বভৌম সম্রাটের অসীম ক্ষমতায় একটি শরীরকে টুকরো টুকরো করে ধ্বংস করা শুধুমাত্র দণ্ডের আদর্শিক সীমানাই নয়, বরং বাস্তব সীমারেখাও নির্দেশ করেছে। মাসোলার বিখ্যাত অত্যাচার ও মৃত্যুদণ্ডের উদাহরণই ধরা যাক। আভিগননে এ ঘটনা ঘটেছিল যা সমসাময়িকদের ভেতর প্রবল নিন্দার ঝড় তোলে। এটা ছিল স্ববিরোধিতায় পূর্ণ এক ঘটনা যেহেতু অপরাধীর মৃত্যুর পরপরই এটি ঘটেছিল। এ ঘটনায় বিচার শুধুমাত্র তার জমকালো নাটকীয়তাই প্রদর্শন করেনি, করেছে আরো বেশি কিছু। সম্রাটের শক্তির আনুষ্ঠানিক গুনকীর্তন সম্পন্ন করা হয়েছে অপরাধীর লাশের উপর। কীভাবে জানতে চান? শুনুন সেই লোমহর্ষক কাহিনী! প্রথমে অপরাধী ব্যক্তিকে চোখ বেঁধে একটি খুঁটিতে বাঁধা হয়। বধ্যমঞ্চের চারপাশ জুড়ে লোহার আঁকড়ি পোঁতা ছিল। ‘স্বীকারোক্তি আদায়কারী রোগীর কানে ফিসফিস করলেন এবং এভাবে আশীর্বাদ দানের পরপরই জল্লাদ একটি লোহার মুগুর দিয়ে সর্বশক্তি সহকারে অপরাধীর কপালের কাছে করলো আঘাত। হতভাগার সাথে সাথে মৃত্যু হলো। সে পড়ে গেল। মর্টিস এক্সাকটর (মৃত্যুদণ্ড প্রদানকারী বা জল্লাদ) একটি বিশাল ছুরি দিয়ে তখন শবদেহের গলনালী কেটে দিল। রক্ত ছলকে উঠলো। এ ছিল বীভৎস এক দৃশ্য! জল্লাদ এরপর শবদেহের দুই গোড়ালির কাছের স্নায়ুতন্তুগুলো কেটে দিল। তারপর জল্লাদ অপরাধীর পেট চিরে একে একে টেনে বার করলো হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলি, প্লীহা এবং ফুসফুস যা সে একটি লোহার সাঁড়াশিতে সেঁটে দিল। তারও পর সে মৃতের শরীরের এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো টুকরো টুকরো করে কেটে আরো কিছু লোহার সাঁড়াশিতে সেঁটে দিল। জন্তুর শরীর কেটে যেমন করা হয়। দ্যাখো, কে পারো এমন দৃশ্য সহ্য করতে! (ব্রুনো, ২৫৯)।’ কসাইবৃত্তির এই সুস্পষ্ট সূত্রে অপরাধীর শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে ধবংস করার প্রক্রিয়াটি দর্শকদের সামনেই সম্পন্ন হয়। অপরাধীর শরীরের প্রতিটি টুকরোই তখন হয় দর্শনীয় বস্তু।

মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের যাবতীয় অনুষ্ঠানমালাই ছিল বিজয়সূচক। দণ্ড প্রয়োগ অনুষ্ঠানের একঘেঁয়ে বিবর্তনের ধারায় একটি নাটকীয় অন্তর্ভুক্তি হলো সংঘাতমূলক দৃশ্যের অবতারণা। ‘রোগী’র শরীরে জল্লাদের প্রত্যক্ষ ও সরাসরি আঘাতের দৃশ্য। অবশ্য জল্লাদের এই আঘাত কিন্তু আইনে লিপিবদ্ধ ছিল বলেই করা হতো। আইনের প্রচলিত প্রথা এবং বিচারের রায়েই সুষ্পষ্টভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের আনুষ্ঠানিকতা গুলো ধাপে ধাপে বিন্যস্ত থাকতো। তথাপিও যুদ্ধের কিছু রেশও এই আনুষ্ঠানিকতায় সংরক্ষণ করা হতো। মৃত্যুদণ্ডপ্রয়োগকারী শুধুমাত্র আইনই প্রয়োগ করতেন না। তিনি শক্তিও ব্যবহার করতেন। অপরাধের সহিংসতাকে আয়ত্তে আনতে তিনি আর এক ধরনের সহিংসতার দূত হিসেবে কাজ করতেন। বস্তুগত ও শারীরিক ভাবে তিনি ছিলেন এই অপরাধের প্রতিপক্ষ। এমন এক প্রতিপক্ষ যে কিনা দয়া বা নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনে সক্ষম। দামহুদ্রে, তাঁর অন্যান্য সমসাময়িকদের মতোই অভিযোগ করেছেন যে, দণ্ড প্রয়োগকারীরা ‘মন্দ-কাজ করা রোগীদের (অপরাধীদের) সাথে সব ধরনের নিষ্ঠুরতা চর্চা করতেন। কিল-চড়-ঘুষি মারা হতে শুরু করে হত্যা করা, যেন বা তাদের হাতে তারা একটি পশুকে পেয়েছে’ (দামহুদ্রে, ২১৯)। এবং একটি দীর্ঘ সময় ধরে এই অভ্যাস মরে যায় নি। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের এই আনুষ্ঠানিকতায় চ্যালেঞ্জ এবং মধ্যযুগের নাইটদের ঘোড়ায় চড়ে পরষ্পরকে তলোয়ার প্রদর্শন খেলার মতো কিছু একটা তখনো ছিল। যেমন, জল্লাদ যদি জিততো, যদি সে একটি আঘাতেই অপরাধীর মস্তক ছিন্ন করতে পারত, তাহলে সে এই কাটা নরমুণ্ডু ‘সমবেত দর্শকমণ্ডলীকে দেখাতো, মাটির উপর কাটা মাথা রাখতো এবং তারপর মাথাটি দর্শকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরে নাড়াতো। দর্শক তার এই দক্ষতাকে বিপুল করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানাতো।’ (১৭৩৭ সালে মন্তিগনির (Montigny) ফাঁসির সময় টি, এস, গিয়ুলেত্তে (T.S.Gueulette) এই দৃশ্যটি দেখেছেন, আঞ্চেল, ৬২-৯)। উল্টোদিকে, যদি এই জল্লাদ ব্যর্থ হতো, যদি সে চাহিদা মাফিক ‘রোগী’কে হত্যা করায় অসমর্থ হতো, তবে তারই বরং শাস্তি হতো। এমনটি ঘটেছিল দেমিয়েঁর জল্লাদের ক্ষেত্রে। নিয়মানুযায়ী দেমিয়েঁকে চার টুকরো করায় ব্যর্থ হয়ে তাকে ছুরি দিয়ে দেমিয়েঁকে হত্যা করতে হয়। ফলাফল হিসেবে দেমিয়েঁর চুল, যা তার পাওয়ার কথা ছিল, বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং চুল বিক্রির অর্থ গরীবদের দিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক বছর পর, আভিগননে এক জল্লাদ তিনজন ডাকাতকে ফাঁসি দেবার সময় অত্যধিক যন্ত্রণা দেয়। যদিও এই তিন ডাকাতই ছিল অত্যন্ত মন্দ স্বভাবের মানুষ, তবু দর্শকরা ফাঁসির সময় অত্যধিক যন্ত্রণার প্রয়োগ দেখে ক্রুদ্ধ হয় এবং জল্লাদের নামে ‘দুয়ো’ দেয়। অতঃপর এই জল্লাদকে শাস্তি দিতে এবং জনতার ক্রোধের হাত থেকে রক্ষা করতে ‘জেলে’ নেওয়া হয় (দুহামেল, ২৫)। এবং অদক্ষ জল্লাদের হাতে শাস্তির পেছনে একটি ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল। এই প্রথা আজো আমাদের খুব অপরিচিত নয়। প্রথাটি হলো যদি কোনো অদক্ষ জল্লাদ অপরাধীকে হত্যা করতে অসমর্থ হয়, সেক্ষেত্রে অভিযুক্তকে ক্ষমা করা উচিত। এই প্রথাটি পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে যেমন, বার্গান্ডিতে (চাসানি, ৫৫) পরিষ্কার ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সাধারণ মানুষ সবসময় এই প্রথাটির প্রয়োগ প্রত্যাশা করতো এবং অদক্ষ জল্লাদের হাতে প্রথম বার মৃত্যু না হওয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মাঝে মাঝে রক্ষা করতো। এই প্রথা ও প্রত্যাশা দূর করতে কর্তৃপক্ষকে পুরনো আপ্তবাক্য ফিরিয়ে আনতে হয়, ‘ফাঁসিকাঠ কখনো তার শিকারকে অস্বীকার করে না।’ শুরু হলো মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সুষ্পষ্ট ঘোষণা প্রদান, ‘মৃত্যু না হওয়া অবধি অপরাধীর গলায় ফাঁসির রজ্জু ঝোলাতে হবে।’ আঠারো শতকের মধ্যভাগে সার্পিলন এবং ব্ল্যাকস্টোনের মতো আইনবিদরা জোরের সাথে একথা বলা শুরু করেন যে জল্লাদ কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের ব্যর্থতা মানে এই না যে অপরাধী প্রাণে বেঁচে গেল (সার্পিলন, ৩, ১১০০)। ব্ল্যাকস্টোন তাঁর কমেন্টারিজ অন দ্য ল অফ ইংল্যাণ্ড-এ মন্তব্য করেন: ‘এটা বেশ পরিষ্কার যে মৃত্যু না হওয়া অবধি ফাঁসিতে ঝোলানোর দণ্ডাজ্ঞা পাওয়া অপরাধী যদি পুরোপুরিভাবে মারা না-ও যায়, সে যদি বেঁচে ওঠে, শহরের শেরিফা আবার তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেবেন। কেননা, আগের ঝোলানোতে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ সম্পন্ন হয় নি। কাজেই, এমন সব ক্ষেত্রে মিথ্যে কোমলতা দেখালে, পরবর্তীতে প্রচুর গোপন চুক্তি সৃষ্টি হতে পারে (জল্লাদ ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর ভেতর টাকার বিনিময়ে গোপন চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে যেন জল্লাদ তার মৃত্যুদণ্ড যথার্থ ভাবে কার্যকর না করে), ব্ল্যাকস্টোন, ১৯৯।’ প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের এই অনুষ্ঠানের চরিত্র ছিল কিছুটা অপরাধীর চরিত্রপরীক্ষা আর কিছুটা ঈশ্বরের বিচার মেশানো অনির্ণেয় এক অনুভূতি। অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে এই সংঘর্ষে, জল্লাদ যেন অনেকটা রাজার পক্ষে যুদ্ধে নামে। তবে, রাজার পক্ষে যুদ্ধে নামলেও সে যেন অনেকটা স্বীকৃতিহীন বা স্বীকৃতি অযোগ্য রাজার যোদ্ধা। প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী, জল্লাদের চিঠি যখন সিলমোহর যুক্ত করা হতো, তখন এসব চিঠি টেবিলে রাখার বদলে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলা হতো। জল্লাদের দপ্তর একই সাথে ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’ তবে ‘অস্বাভাবিক’ দপ্তর হিসেবে পরিচিত ছিল। এই দপ্তর ঘিরে টেবিলের বদলে মাটিতে চিঠি ছুঁড়ে ফেলার মতো অস্পৃশ্যতার নানা বিধি-বিধান প্রচলিত ছিল (লয়সো, ৮০-৮১)। জল্লাদ এক অর্থে ‘রাজার তরবারি’ সম প্রতীকী অস্তিত্ব বহন করলেও সে আবার তার প্রতিপক্ষ অপরাধীর কলঙ্কেরও ভাগিদার। সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতা যা জল্লাদকে নির্দেশ করে অপরাধীকে হত্যা করার এবং যে সার্বভৌম ক্ষমতা জল্লাদের মাধ্যমে বাহিত হয়ে অপরাধীকে হত্যা করার কাজটি করে, জল্লাদ নিজে কিন্তু ওই ক্ষমতা ধারণ করে না। তার নিজস্ব নিষ্ঠুরতার সাথে এই রাজকীয় ক্ষমতা খাপ খায় না। এবং এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়তো যখন সম্রাটের দপ্তর হতে অপরাধীকে ক্ষমা করার চিঠি এসে জল্লাদের হত্যা উদ্যত অঙ্গভঙ্গি থামিয়ে দিত। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা এবং প্রয়োগের ভেতর একটি সংক্ষিপ্ত সময় বরাদ্দ ছিল (সাধারণতঃ কয়েক ঘণ্টা)। এই সংক্ষিপ্ত বিরতিকালীন সময়ে অপরাধীকে ক্ষমা করা হলে ক্ষমার চিঠিটি আসতো সাধারণতঃ একদম শেষ মুহূর্তে। এবং তা যাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগেই এসে পৌঁছাতে পারে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অনুষ্ঠানটি খুবই ধীরগতিতে সম্পন্ন হতো। (হার্ডি, ৩০ জানুয়ারি ১৭৬৯, ১, ১২৫ এবং ১৪ ডিসেম্বর ১৭৭৯, ৪, ২২৯; আঞ্চেল, ১৬২-৩, আন্তোইন বুল্লেটিক্সের গল্প বলেন। ঐ ঘটনায় বুল্লেটিক্স যখন একদম ফাঁসিকাঠের গোড়ায়, ঠিক তখনি সম্রাটের অশ্বারোহীরা সেই বিখ্যাত পশুচর্মের প্রচ্ছদে লেখা ক্ষমার অনুজ্ঞা নিয়ে হাজির হয়। ‘ঈশ্বর সম্রাটকে রক্ষা করুন’ শ্লোগানে নিনাদিত হয় চারপাশ এবং বুল্লেটিক্সকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তার সরাইখানায়। আদালতের কেরানী বুল্লেটিক্সের হয়ে কিছু চাঁদা সংগ্রহের কাজ করলেন।) অভিযুক্ত ব্যক্তির মনে সবসময়ই ক্ষমা পাবার আশা থাকতো। এবং সময়ক্ষেপণ করতে অভিযুক্ত ব্যক্তি এমনকি ফাঁসিকাঠের গোড়ায় পা রেখেও এমন আচরণ করতো যে তার আরো কিছু গোপন তথ্য জানানোর আছে। জনতা যখন অভিযুক্তের পক্ষে ক্ষমা চাইতো, তখন তারা চিৎকার করে ক্ষমা চাইতো এবং শেষ মুহূর্তটি স্থগিত করতে চাইতো। জনতা অনেক সময় রাজার পত্রবাহকের আসার অপেক্ষায়ও থাকতো যে কখন সে সবুজ মোমের গালাই করা খাম নিয়ে হাজির হবে। এবং দরকারবোধে জনতা কখনো কখনো এমন দাবিও তুলতো যে সম্রাটের পত্রবাহক পথে আছেন, কাজেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান বিলম্বিত করা হোক। ১৭৫০ সালের ৩ আগস্ট শিশু অপহরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দায়ে অভিযুক্তদের পক্ষে এমনটি ঘটেছিল। মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র আইনী প্রতিশোধ আদায়ের ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে সম্রাট উপস্থিত থাকতেন না। বরং আইন ও প্রতিশোধ দুটোই থামিয়ে দেবার শক্তি হিসেবে সম্রাট উপস্থিত থাকতেন। নিঃসন্দেহে সম্রাট একাই বিরাজ করবেন প্রভু হিসেবে। তাঁর কোনো প্রজার বিরুদ্ধে করা অপরাধ তাঁর নিজের বিরুদ্ধেই করা। এবং এই অপরাধ তিনি একাই ধুয়ে মুছে ফেলতে পারেন। যদিও এটা সত্য যে আদালতকে তিনি শাস্তি প্রয়োগের জন্য তাঁর রাজকীয় ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। তবে এই ক্ষমতা কিন্তু তিনি আদালতকে হস্তান্তর করেন নি। ক্ষমতা পুরোটাই তাঁর নিজের কাছে তিনি রেখে দিয়েছেন এবং ইচ্ছামাফিক এটা তিনি পুরোপুরি রদ করতে পারেন অথবা বাড়াতেও পারেন।

প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগকে আমাদের অবশ্যই সম্মান করতে হবে। আঠারো শতকেও প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড একটি রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে খুঁটিনাটি আনুষ্ঠানিকতার সাথে পালন করা হতো। বেশ যৌক্তিকভাবেই এই আনুষ্ঠানিকতা শাস্তি ব্যবস্থায় নথিবদ্ধ ছিল। সার্বভৌম সম্রাট এই শাস্তি ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অপরাধের জন্য শাস্তি দাবি, শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রদান করতে পারতেন। আইনানুযায়ী রাজ্যে অপরাধ করা হলে এ অপরাধে স্বয়ং তিনিই যেন ক্ষতিগ্রস্থ হন। প্রত্যেক অপরাধেই ক্রাইমেন মেইসতাতিস (crimen maiestatis) উপস্থিত ছিল এবং প্রত্যেক অপরাধীর ভেতরেই একজন সম্ভাব্য রাজহত্যাকারী লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা। এবং রাজহত্যাকারী, যে কিনা অপরাধীর চেয়ে একফোঁটা কম বা বেশি নয়, আর দশ জন অপরাধীর মতো সার্বভৌম সম্রাটের কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছাকে আঘাত করার চেয়ে আঘাত করতো সম্রাটের নীতি এবং সরাসরি তাঁর শরীরেই। রাজহত্যার আদর্শ শাস্তিকে সম্ভাব্য যাবতীয় অত্যাচারের সম্মিলনকে ধারণ করতে হতো। এ যেন অনন্ত প্রতিশোধের এক প্রকাশ। ফরাসী আইনে এই নিষ্ঠুরতার কোনো ধরা-বাঁধা শাস্তির নিয়ম ছিল না। হাভাইলাকের (Ravaillac) মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের জন্য তদানীন্তন ফ্রান্সে প্রচলিত যাবতীয় নিষ্ঠুর নির্যাতনকে একত্রিত করে এক নতুন অনুষ্ঠান উদ্ভাবন করতে হয়েছে। দামিয়েঁর জন্য এর চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর নির্যাতনের
hava1.jpg
চতুর্থ হেনরির হত্যাকারী হাভাইলাকের মৃত্যুদণ্ড কাযর্কর করা হচ্ছে। ফ্রান্সে প্রচলিত যাবতীয় নিষ্ঠুর নির্যাতনকে এক করা হয় এই অনুষ্ঠানে।

সমন্বয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের প্রচেষ্টা বা চিন্তা করা হয়েছিল। অত্যাচার বিষয়ক কিছু পরামর্শ দেওয়া হলেও সেগুলোকে যথেষ্ট মনে করা হয় নি। সুতরাং, হাভাইলাকের মৃত্যুদণ্ডটিরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল। এবং ১৫৪৮ সালে উইলিয়াম অফ অরেঞ্জের মৃত্যুদণ্ডের কথা বিবেচনা করলে সে তুলনায় হাভাইলাকের মৃত্যুদণ্ড বরং তুলনামূলক নরমই ছিল। উইলিয়াম অরেঞ্জকে এমনভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় যা অনন্ত প্রতিশোধপরায়ণাকেই কেবল ইঙ্গিত করে। ‘প্রথম দিন তাকে একটি চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে সে এক কড়াই ফুটন্ত পানি দেখতে পায়। যে হাতে সে অপরাধ কাজটি করেছিল, তা কেটে সেই গরম পানিতে ডোবানো হয়। পরের দিন তার অন্য হাতটিও কেটে ফেলা হয়। এবং হাতটি যেহেতু তার পায়ের কাছে পড়ে যায়, বধ্যমঞ্চে আসা-যাওয়ার পথে তার পায়ে এই কর্তিত হাতটি বারবার আঘাত পাচ্ছিল। তৃতীয় দিনে, গনগনে চিমটা তার বুক ও কাটা হাতের উপরিভাগে চেপে ধরা হয়। চতুর্থ দিনে, ঠিক একইভাবে, গরম চিমটা তার পিঠ ও নিতম্বে চেপে ধরা হয়। এবং, এভাবেই এই মানুষটির উপর টানা আঠারো দিন অত্যাচার করা হয়।’ শেষ দিনে, তাকে চাকায় চড়ানো হয় এবং ‘মেইল্লো’তে (maillote) নামক কাঠের লাঠি দিয়ে তাকে পিটানো হয়। ছয় ঘণ্টা পর, সে তখনো পানি চাচ্ছিল, তাকে পানি দেওয়া হয় না। ‘শেষর্পন্ত পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করা হয় তাকে গলায় ফাঁসি দেবার মাধ্যমে হত্যা করার জন্য যাতে তার আত্মা হতাশ না হয় এবং হারিয়ে না যায়।’ (ব্রন্তোমে, ২, ১৯১-২)।

কিস্তি ৫

তথ্যনির্দেশ

৩. ৬ জুলাই ১৮৩৭ সালের ‘দ্য গেজেট ট্রাইব্যুনাক্স’-এ গ্লুচেস্টারের সংবাদপত্র হতে একটি প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনটি ছিল জনৈক জল্লাদের ‘নিষ্ঠুর ও পরিতাপযোগ্য’ আচরণ বিষয়ক। ওই জল্লাদ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পর ‘শবদেহের কাঁধ ধরে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে শরীরটি উল্টে দেয়। এবং বারকয়েক সেই মৃতদেহে আঘাত করে বলে, ‘তুই ঠিকমতো মরেছিস তো?’ এরপর সমবেত জনতার দিকে ফিরে হেসে এবং বিদ্রূপের ভঙ্গিতে সে কিছু অশালীন মন্তব্য করে।

a_falgun@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com