জয়তু জননী

নওশাদ জামিল | ২৬ জুন ২০১৬ ১:২০ অপরাহ্ন

01শাহবাগ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিকতার শুরু হয়েছিল মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে। একদিন ঘোরলাগা সন্ধ্যায় শাহবাগ চত্বরে জ্বলে উঠেছিল শত শত মোমবাতি–তারপর দাবানলের মতো সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশময়। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তে বাংলা ভাষাভাষির হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল দীপশিখা। শাহবাগ আন্দোলনের ঢেউ, তার প্রভাব, ব্যাপ্তি, উত্থান-পতন নিয়ে নানা গবেষণা হবে। লেখা হবে নানা ঐতিহাসিক গ্রন্থ। আমার কেবলই মনে হয়, ইতিহাসের শুরুটা হবে শাহবাগ থেকে নয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে ফিরে এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই বলেছিলেন, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। অনেক বছর পরে সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে উঠেছিল তুমুল গণআন্দোলন। আর সেই আন্দোলনের প্রধান মানুষটি ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। খানিকটা তলিয়ে ভাবলেই টের পাওয়া যায় শাহবাগে লাখো মানুষের হৃদয়ে, সারাদেশের কোটি মানুষের মানসপটে প্রতিবাদের দীপ প্রজ্জ্বলন করেছিলেন তিনিই।

অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল আর জনগণেরর ওপর প্রবল আস্থা ছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের। আমৃত্যু সংগ্রামী ছিলেন এ জননী সাহসিকা। একদিকে তিনি লড়াই করেছেন মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক হাসপাতালে যখন ঘনিয়ে আসছিল তাঁর মৃত্যক্ষণ, তখনও আন্দোলনকে ভুলে যাননি তিনি। মৃত্যুর আগেও আন্দোলনের কর্মীদের উদ্দেশে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লিখে যান তাঁর শেষ বার্তা। তাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভার দিয়ে যান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন মানুষের ওপর। মৃত্যুর আগে শেষ বাক্যে তিনি দৃঢ়ভাবে লিখে যান: ‘জয় আমাদের হবেই’।
শহীদ জননীর সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের দুই দশকেরও বেশি সময় পর যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে, তখন পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রবল ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাকে জাগিয়ে গেছেন। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের জন্য রেখে গেছেন বুকভরা ঘৃণা ও প্রতিবাদের ভাষা। যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে তিনি যে আন্দোলন সূচনা করে গেছেন সেটাই প্রেরণা জুগিয়েছে শাহবাগের তরুণ প্রজন্মকে। মূলত এই তরুণ প্রজন্মই পালন করে তাঁর সেই মহান দায়িত্ব।

নতুন দিনের নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ তরুণ-তরুণী যুদ্ধপরাধীদের বিচার চান মনেপ্রাণে। তাঁদের প্রত্যেকের হৃদয়ের মধ্যমণি জাহানারা ইমাম। তাঁর আদর্শ, চেতনা তুমুল জাগরণ সৃষ্টি করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। শাহবাগের গণজাগরণেও তাই মধ্যমণি তিনি। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি নাম, একটিই চিত্র–সেটি হলো শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম এবং অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেখে যেতে পারেননি জাহানারা ইমাম। কিন্তু তিনি যে চেতনার মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তিনি যে পথ দেখিয়েছিলেন সেই পথ ধরেই এসেছে নতুন দিনের সূর্য। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি যে মহীরুহে পরিণত হয়েছে, জনতার মানসপটে ওই বীজটি বপন করেছিলেন তিনিই।

border=0গবেষক ও লেখক তাহমীদা সাঈদা তাঁকে নিয়ে লিখেছেন ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম’ শীর্ষক গ্রন্থ। বইটির এক জায়গায় তিনি লিখেছেন: ‘জাহানারা ইমাম যে সংগ্রাম করেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজাকারমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা তাঁকে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত করেছে বাঙালি জাতির একবিংশ শতাব্দী ও তৃতীয় সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূর্ত প্রতীকে। তাঁর আন্দোলন সংগ্রাম তাঁকে পরিণত করেছে ইতিহাসের অমোঘ চালিকা শক্তিতে।’
তাহমীদা সাঈদা এই কথা বাড়িয়ে বলেননি। সময় যত যাচ্ছে, জাহানারা ইমাম ততই হয়ে উঠছেন মুক্তিযুদ্ধের এক জ্বলন্ত প্রতীকে, তাঁর দীপশিখা তো অনির্বাণ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ছেলে শাফী ইমাম রুমী শহীদ হন, স্বামী শরীফ ইমামও মারা যান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে। স্বামী-সন্তানহারা এই মা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের হয়ে ওঠেন অনন্ত প্রেরণার নাম।
নতুন প্রজন্মের সন্তান আমরা, মুক্তিযুদ্ধের বহু বছর পরে আমাদের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো দেখতে পাই জাহানারা ইমামের লেখায়। অধিকাংশ তরুণ-তরুণীর প্রিয় বই একাত্তরের দিনগুলি। বইটি পড়তে পড়তে ভেসে ওঠে একজন মুক্তিযোদ্ধার মায়ের দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ; চোখের সামনে জেগে ওঠে একাত্তরের বিভিষিকাময় দিনগুলো। বইটি নিছক এক দিনলিপি নয়, মুুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিলও বটে। হৃদয়কে পাথর করে, বুকের গভীরে অতল বেদনা ধারণ করে তিনি লিখে গেছেন এক অমরগাথা। এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধার গবির্ত মা, এক দেশপ্রেমিক সংগ্রামী পুরুষের স্ত্রী হয়ে নয়, সাধারণ একজন মা হয়ে তিনি কলম ধরেছিলেন। বুকভরা আর্তনাদ লুকিয়ে, শোক চাপা দিয়ে জাহানারা ইমাম মেলে ধরেছেন উত্তাল দিনগুলোর মর্মকথা। তাতে ব্যক্তিগত শোকস্মৃতি রয়েছে, তা যেন যুদ্ধকালীন সময়ে প্রতিটি মায়েরই আত্মকথা। ফলে একাত্তরের দিনলিপি সব মানুষেরই জীবনজয়ী অনুপ্রেরণার উৎস।

মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি আমরা, ফলে রাজাকার-আল বদর ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞও দেখিনি, কিন্তু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে যিনি ন্যায়-অন্যায় দেখিয়েছেন, প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানাতে প্রাণিত করেছেন তিনি জাহানারা ইমাম। শুধু তাঁর লেখনী দিয়ে নয়, মাঠে-ঘাটে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে তিনি জনমত তৈরি করেছেন, মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তারপর অনেক বছর পরে সোহরাওয়ার্দীর পাশে এই শাহবাগেই জড়ো হয়েছিলেন তরুণ-তরুণীরা। তাঁদের চেতনায় ছিল শহীদ জননীর দৃপ্ত মশাল।

সংগঠক হিসেবেই বেশি আলোচিত জাহানারা ইমাম, সেটাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান, পাশাপাশি লেখক হিসেবেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু-কিশোরদের জন্য অতুলনীয় বহু গ্রন্থের প্রণেতা তিনি। শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি যেমন অনেক মৌলিক রচনা লিখেছেন, তেমনই অনুবাদ করেছেন প্রচুর। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর লেখা তো ঐতিহাসিক দলিল। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক রচনাগুলো অত্যন্ত উঁচুমানের। ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস, প্রবাসের দিনলিপি, বুকের ভিতর আগুন তাঁর গুরুত্ববহ রচনা। এ ছাড়াও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি লিখেছেন নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ। রাজনৈতিক জাহানারা ইমাম দিনকে দিন যেমন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন, পরিণত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের এক ধ্রুবসত্যে, প্রতীকে; বিশ্বাস করি, সাহিত্যিক জাহানারা ইমামও প্রদীপ্ত শিখার মতো আলো ছড়াবেন।

সংগঠক জাহানারা ইমাম সারা দেশে যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, একাত্তরের ঘাতক-দালালদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের দাবিতে তিনি যে জোয়ার তুলেছিলেন, এক কথায় তা ছিল ঐতিহাসিক। সেই জাগরণের সূত্রপাত ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সেদিন ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে আমীর ঘোষণা করে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী। শহীদ জননীর বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের আগুন। ছেলেহারা মায়ের মুখে জেগে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। প্রতিবাদ জানাতে তিনি নেমে আসেন রাজপথে। তাঁর সঙ্গে প্রতিবাদে নামে অসংখ্য দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষ। তারপর সারা দেশেই শুরু হয় জনবিক্ষোভ। বিক্ষোভ ক্রমেই বাড়তে থাকে, ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা দেশে। এ সময় ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ১০১ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটি গঠন করা হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বেই। তিনি হন সংগঠনটির আহ্বায়ক। আন্দোলন তুমুল গতি পায় তখন। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, জনতা–সবাই ছুটে আসেন তাঁর আহবানে। পাশাপাশি ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এটিরও আহ্বায়ক হন জাহানারা ইমাম। তারপর তাঁর নেতৃত্বগুণেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি হয়ে ওঠে গণমানুষের প্রাণের দাবি।

জাহানারা ইমামের উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসানো হয় গণ-আদালত। পুলিশের বাধা ভেঙে জমায়েত হয় কয়েক লাখ মানুষ। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ওই গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধ ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১২ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত গণ-আদালত ১০টি অপরাধে গোলাম আযমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গণ-আদালতের সেই রায় কার্যকর করার দাবি নিয়ে তিনি নিজেই ছুটে যান সংসদে। স্মারকলিপি নিয়ে যান তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার কাছে। ১০০ সংসদ সদস্য জনতার এ রায় সমর্থন করেন। সংসদে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তবে থেমে যাননি জাহানারা ইমাম। পরের বছরের ২৬ মার্চ গঠন করেন গণতদন্ত কমিশন। ঘোষিত হয় আরো আট যুদ্ধাপরাধীর নাম। তাঁরা হলেন : আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মো. কামারুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ ও আবদুল কাদের মোল্লা।
১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের সড়কে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাতে কমিশনের চেয়ারপারসন কবি সুফিয়া কামাল প্রতিবেদন পেশ করেন। দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, এসব কর্মযজ্ঞে সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দেন জাহানারা ইমাম।

03তখন শহীদ জননীসহ অনেকের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল রাষ্ট্রদোহের মামলা। তাঁদের বেশির ভাগই আজ আর বেঁচে নেই। জাহানারা ইমামেরও শারীরিক উপস্থিতি আমাদের মাঝে নেই। তবে দেশব্যাপী আন্দোলনে তাঁর সঙ্গে যেসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ছিলেন, তাঁরা এখনো সক্রিয় আছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন তরুণ প্রজন্মের লাখো তরুণ-তরুণী। দুই যুগ আগে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তরুণ প্রজন্মের হাতে সেই যুদ্ধেরই চূড়া- পর্বের সূচনা হয় শাহবাগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় ঘোষণার পর পরই দেশজুড়ে নেমে এসেছিল হতাশার ছায়া। নিমেষেই সেই হতাশা পরিণত হয়েছিল প্রতিবাদে। ক্রমেই প্রতিবাদ পরিণত হয়েছিল শক্তিতে। তারপর শুরু হয়েছিল ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে খ্যাত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন। যাত্রা শুরু হয় অনন্য এক বাংলাদেশেরও।
ব্যক্তিগতভাবে আমরা যারা শাহবাগের গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম, তাঁদের অনেকেই দেখিনি শহীদ জননীকে; দেখিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণ-আদালতও। তারপরও আমাদের চেতনাজুড়ে রয়েছে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিশ্বাস করি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে দাবি তুলেছিলেন জাহানারা ইমাম, যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এরই ধারাবাহিকতার ফসল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গণমানুষের দাবি তিনি শুধু উপলব্ধিই করেননি, বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেন। দেশ-বিদেশের নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার উদ্যোগেই যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের বিচারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে পুরোদমে। ইতিমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কয়েকজনের ফাঁসিও কার্যকর হয়েছে। কিছুদিন আগেই জামায়াতের আমির ও একাত্তরের ঘাতক সংগঠন আলবদর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। একের পর এক ঘৃণ্য অপরাধীদের যে বিচার হচ্ছে বাংলাদেশে, কলঙ্কমুক্ত হচ্ছে শহীদের রক্তভেজা প্রিয় স্বদেশ তার পেছনে অনুপ্রেরণা তো জাহানারা ইমামই।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম আমার কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। গভীর মনযোগসহকারে লক্ষ্য করি তাঁর যাত্রাপথটি। পুত্রহারা এক নারী শোক না করে, মাতম না করে প্রতিবাদের মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন সারাদেশে, হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের প্রাণের কণ্ঠস্বর। শরীরে ক্যান্সার, কিন্তু মনে তাঁর অপরিমেয় দৃঢ়তা। রাজপথে ছিল পুলিশের পিটুনি, মাথার ওপর ছিল মামলা, কিন্তু তিনি দমে যাননি। চারদিক থেকে তিনি বিড়ম্বনার শিকার হন, রাষ্ট্রযন্ত্রের হয়রানির শিকার হন, আবার পান লাখো মানুষের ভালোবাসা। তাঁর বন্ধুর যাত্রাপথ ধরে এগোলে এও লক্ষ করি শত্রু চিনতে ভুল করেননি তিনি। পাশপাশি মিত্র চিনতেও ভুল করেননি। মানুষের প্রাণের দাবি উপলব্ধি করেন, তাঁদের একসুরে একলয়ে বেজে উঠতে বলেন। আর তাঁর এসব কর্মযজ্ঞের মূলেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিক সমাজ নির্মাণ। শহীদ জননী জানতেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হলে, সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার শিকড় না উপড়ালে তা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে বাংলাদেশে। আমরা এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে পারি। আশা করি, একদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মিত হবে। আর সেই পথেও আমাদের প্রেরণা হবেন একজন জাহানারা ইমাম। জয়তু জননী।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভানু ভাস্কর — জুন ২৬, ২০১৬ @ ২:০০ অপরাহ্ন

      শাহবাগের মঞ্চ জননী জাহানারা ইমামের আদর্শগত অবস্থানের প্রতিনিধি হয়েছে কি না তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু মঞ্চের একেবারে গোড়ার দিকে একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে এই কথা বলতে আমি দ্বিধাহীন যে, ‘সিচুয়েশন’ তৈরি হলে আগেকার ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে ঝুলিয়ে প্রসঙ্গ তৈরি করা যায়। শহীন জননীকে আদর্শ করেই মঞ্চটা শাহবাগে ঘনীভূত হয়েছে এমন না বলে, মঞ্চকে একটা স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে ভাবলেই মনে হয় সমীচীন হয়। তাতে বঙ্গবন্ধুর সোহরাওর্দী মাঠের ভাষণ কিংবা এই মাঠেই জাহানারা ইমামের শুরু করা আন্দোলনকেও অসম্মান করা হয় না। অতিভক্তি আর যা হোক ভক্তি তো আর নয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — জুন ২৮, ২০১৬ @ ৯:২৩ অপরাহ্ন

      ‘গণ-আদালত’ থেকে ‘গণ জাগরণ মঞ্চ’! আমাদের দীর্ঘ ইতিহাস। আমাদের প্রেরণার ইতিহাস। সেই সূত্র ধরে আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। জামিলের লেখাটি অনেক কথা স্মরণ করিয়ে দিলো।
      এ প্রসঙ্গে মনে পড়লো, নিউ জার্সি থেকে ড. নূরুন্নবী আমার মাধ্যমে জাহানারা ইমামের কাছে ২৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন, গণ- আদালত পরিচালনার জন্য।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com