স্টিফেন হকিং: ‘ব্ল্যাক হোল থেকেও পদার্থ বেরিয়ে আসতে পারে’

অরণি সেমন্তি খান | ১৭ জুন ২০১৬ ৯:৩৩ অপরাহ্ন

s-h.jpgপদার্থবিজ্ঞানের জীবন্ত কিংবদন্তী স্টিফেন হকিং মহাবিশ্ব, ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব এবং এদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে দিয়েছিলেন ‘রেইথ লেকচার’। বিবিসি’র রেডিও ফোর’কে গত বছর দেয়া এ বক্তৃতার অনুলিপি এ বছরের ২৬ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ করে বিবিসি। দুই খন্ডের সেই অনুলিপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য অনুবাদ করেছেন অরণি সেমন্তি খান।

রেইথ লেকচার: ১

আমার বক্তৃতা ব্ল্যাক হোল নিয়ে। কথায় আছে, কিছু সত্য কল্পনার চেয়েও অদ্ভুত। আর এই কথাটি ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রেই মানানসই।
যদিও ব্ল্যাক হোলের ধারণাটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী থেকেও আশ্চর্যজনক, এটি দৃঢ়ভাবে বৈজ্ঞানিক। নক্ষত্র নিজেদের মহাকর্ষের বলে নিজেরাই সংকুচিত হয় এবং এর ফলে সৃষ্ট বস্তুটির প্রকৃতি কেমন হবে, এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিক সমাজ উপলব্ধি করতে অনেক সময় নিয়েছে।
১৯৩৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে আলবার্ট আইনস্টাইন দাবি করেন – যেহেতু পদার্থ একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে সংকুচিত করা যায় না, তাই নক্ষত্র নিজ মহাকর্ষ বলে সংকুচিত হতে পারে না। বহু বিজ্ঞানী তাঁর এই কথায় একমত হয়েছিলেন।
তবে একজন আমেরিকান বিজ্ঞানী সেই দলে ছিলেন না এবং তাকেই বলা যায় ব্ল্যাক হোল গল্পের পথিকৃৎ । ৫০ এবং ৬০ এর দশকে তাঁর গবেষণার কাজে তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন নক্ষত্রের সংকোচন এবং এ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যাগুলোর উপর। এছাড়াও তিনি নক্ষত্রের সংকোচনের ফলে সৃষ্ট ব্ল্যাক হোলের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পোষণ করেছিলেন।
একটি সাধারণ নক্ষত্র তার সহস্র বছরের জীবনকালে তাপীয় বহির্মুখী চাপের সহায়তায় নিজের মহাকর্ষের বিপরীতে নিজেকে বজায় রাখে। এই চাপ উৎপন্ন হয় হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তর করার পারমাণবিক প্রক্রিয়ায়।
ধীরে ধীরে নক্ষত্রের এই জ্বালানী শেষ হয়ে যায়। তারপর সে সংকুচিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে নক্ষত্রটি একটি শ্বেত বামন হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে।
তবে ১৯৩০ সালে সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর দেখিয়েছিলেন, একটি শ্বেত বামনের সর্বোচ্চ ভর হতে পারে আমাদের সূর্যের ভরের ১.৪ গুন।
এছাড়াও একজন সোভিয়েত বিজ্ঞানী লেভ লান্দাউ নিউট্রন দ্বারা নির্মিত একটি নক্ষত্রের জন্য একই ধরণের সর্বোচ্চ ভরের সীমারেখা গণনা করেছিলেন।
তাহলে পারমাণবিক জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে সেসব অসংখ্য নক্ষত্রের কি পরিণতি হবে, যাদের ভর শ্বেত বামন বা নিউট্রন নক্ষত্রের চাইতে অধিক?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই গবেষণা করেছিলেন অ্যাটম বোমার জনক হিসেবে খ্যাত রবার্ট ওপেনহাইমার। জর্জ ভল্কফ এবং হার্টল্যান্ড স্নাইডারের সঙ্গে ১৯৩৯ সালের কিছু গবেষণাপত্র তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে এমন একটি নক্ষত্র বহির্মুখী তাপীয় চাপ দিয়ে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে না। এই চাপ বাদ দিলে, একটি সুষম গোলীয় নক্ষত্র অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দুতে সংকুচিত হয়। এই বিন্দুকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।
স্থান এবং কাল নিয়ে আমাদের সকল তত্ত্ব এই অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, স্থান ও কাল মসৃণ এবং প্রায় সমতল। তাই এসকল তত্ত্ব সিঙ্গুলারিটিতে এসে অকেজো হয়ে পড়ে, যেখানে স্থান এবং কালের বক্রতা অসীম। আদতে, এখানেই সময়ের সমাপ্তি। এই বিষয়টি আইনস্টাইন মেনে নিতে পারেন নি।
এর মাঝে হাজির হল যুদ্ধ।

রবার্ট ওপেনহাইমারসহ বেশীর ভাগ বিজ্ঞানী মনোযোগ দিলেন পারমাণবিক পদার্থবিদ্যার প্রতি এবং মহাকর্ষীয় বলে নক্ষত্রের সংকোচন চলে গেল পর্দার আড়ালে। এই প্রসঙ্গে পুনরায় আগ্রহ জেগে উঠল দূরবর্তী ‘কোয়াসার’ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।
১৯৬৩ সালে প্রথম ‘কোয়াসার’, ৩সি২৭৩ আবিষ্কৃত হয়। অচিরেই আরও ‘কোয়াসার’ আবিষ্কৃত হয়। অনেক দূরের হলেও, এগুলো অনেক উজ্জ্বল।
এই ধরনের শক্তির উৎপাদন শুধুমাত্র পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয় কারণ এতে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা স্থিতিভরের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। এক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হল মহাকর্ষীয় শক্তি যা মহাকর্ষীয় সংকোচন থেকে সৃষ্ট।
মহাকর্ষীয় সংকোচন পুনরাবিষ্কার হয়। একটি সুষম গোলীয় নক্ষত্র অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দুতে সংকুচিত হবে যাকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।
সিঙ্গুলারিটিতে আইনস্টাইনের সমীকরণ অসংজ্ঞায়িত। অর্থাৎ অসীম ঘনত্বের এই বিন্দুতে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব।
তাহলে খুব অদ্ভুত কিছু ঘটবে একটি নক্ষত্রের ধ্বসের পর। যদি সিঙ্গুলারিটিগুলো বাইরের থেকে আবৃত না হয় অর্থাৎ যদি কোন ঘটনা দিগন্তের সৃষ্টি না হয়, তবে ভবিষ্যদ্বাণী করাটা সম্ভব হবে। ১৯৫৭ সালে জন হুইলার ‘ব্ল্যাক হোল’ নামটির আবির্ভাব ঘটালে, পুরনো নাম ‘ফ্রোজেন স্টার’ বাতিল হয়ে যায়। এই নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে ব্ল্যাক হোলের সৃষ্টির উপায় বিবেচনা না করলেও, এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোই আগ্রহের উদ্রেক ঘটাতে পারে।
নতুন নামটি দ্রুত নজর কাড়ল। এই নামটি কোন এক অন্ধকার রহস্যময় বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করে। তবে ফরাসীরা নিজ গুনেই শব্দটিকে অনুপযোগী মনে করল।
তারা বহু বছর ধরে নামটিকে অশালীন দাবী করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তবে তা Le Week-end এবং অন্যান্য Franglais –এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত। শেষমেশ তাদের হার মানতেই হল। এমন একটা নিখুঁত নাম কে ফেলে দিতে পারে?
বাইরের থেকে বলা যায় না ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কি আছে। আস্ত টিভি, হীরের আংটি, বা তোমার পরম শত্রুকে তুমি ব্ল্যাক হোলে ফেলে দিতে পারো কিন্তু ব্ল্যাক হোলটি শুধু ওই বস্তুর মোট ভর এবং ঘূর্ণনের দশা মনে রাখবে।
এখান থেকেই জন হুইলারের ‘ব্ল্যাক হোলের কোন চুল নেই’ তত্ত্বটির সূচনা। যা ছিল ফরাসীদের কাঁটা গায়ে নুনের ছিটা।
ব্ল্যাক হোলের সীমারেখা আছে, যাকে বলা হয় event horizon (ঘটনাদিগন্ত) । আলোক রশ্মিকে আটকানো এবং ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট মহাকর্ষ বল সেখানে বিদ্যমান।
যেহেতু কোন কিছুই আলোর গতিবেগ থেকে দ্রুত নয়, তাই সবকিছুকেই টেনে নেবে ব্ল্যাক হোল। ঘটনা দিগন্তে দিয়ে একটি ডিঙ্গি নৌকায় নায়াগ্রা জলপ্রপাত পাড়ি দেয়ার মত।
যদি তুমি প্রপাতের ওপরে থাকো, তাহলে যথেষ্ট দ্রুত দাঁড় বাইলে তুমি পরিত্রাণ পাবে। কিন্তু তুমি যদি কিনারে চলে যাও, তাহলেই তুমি মরেছ। সেখান থেকে আর কোন ফিরে আসা নেই। যত প্রপাতের কাছাকাছি যাবে, তত স্রোতের বেগ বাড়বে। অর্থাৎ পেছন দিক অপেক্ষা নৌকার সামনের দিকে টান বেশী। সেক্ষেত্রে ডিঙ্গি নৌকাটির মাঝ বরাবর ভেঙে যাবে।
ব্ল্যাক হোলের ব্যাপারটি একই রকম। যদি তুমি লম্বালম্বিভাবে ব্ল্যাক হোলে পড়, মহাকর্ষের বল তোমার পায়ের উপর বেশী পড়বে যেহেতু তোমার পা ব্ল্যাক হোলের কাছে।
ফলে তোমাকে লম্বালম্বিভাবে টানা হবে এবং পাশ দিয়ে তোমাকে চ্যাপ্টা করা হবে। আর যদি ব্ল্যাক হোলটির ভর আমাদের সূর্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশী হয়, তবে তুমি ঘটনা দিগন্তে পৌছানোর আগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।
কিন্তু সূর্যের থেকে মিলিয়ন গুণ বেশী ভরের ব্ল্যাক হোলে পরলে, ঘটনা দিগন্তে সহজেই পৌঁছানো যাবে।
সুতরাং যদি তুমি একটি ব্ল্যাক হোলে অনুসন্ধান চালাতে চাও, তোমার অধিক ভরের একটি বেছে নিতে হবে। আমাদের মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রে একটি ব্ল্যাক হোল আছে, যার ভর সূর্যের চেয়ে ৪ মিলিয়ন গুণ বেশী।
black-hole.jpg

রেইথ লেকচার: ২

গত বক্তৃতায় নক্ষত্রের ধসের ফলে সৃষ্ট অবিশ্বাস্য ঘনত্বের ব্ল্যাক হোলের প্রকৃতি সম্পর্কিত একটি আপাতবৈপরীত্য দেখিয়ে আমি আপনাদের উৎকণ্ঠার মধ্যে রেখে গিয়েছিলাম।
একটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেছে, অসীম ধরনের নক্ষত্র থেকে অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্ল্যাক হোল তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে আরেকটি বলেছে, নির্দিষ্ট ধরনের কিছু নক্ষত্র থেকে ব্ল্যাক হোল হবে।
এটি আসলে তথ্যের সমস্যা, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল কণা এবং সব বলের মাঝে রয়েছে তথ্য- কোন এক প্রশ্নের অন্তর্নিহিত হ্যাঁ বা না উত্তর ।
একটি ব্ল্যাক হোলের ভর, বৈদ্যুতিক আধান, এবং ঘূর্ণন ছাড়া বাইরের থেকে এর ভেতর কি আছে তা বলা যায়না। কারণ, বিজ্ঞানী জন হুইলারের ভাষ্যমতে, ব্ল্যাক হোলের কোন চুল নেই।
তার মানে দাঁড়ায় এই যে, একটা ব্ল্যাক হোলের ভেতরে লুকোনো অনেক তথ্য রয়েছে। সুতরাং, এই গুপ্ত তথ্যের পরিমাণ যদি ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর নির্ভর করে, তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তার তাপমাত্রা থাকার কথা এবং গরম ধাতুর মত তার জ্বলজ্বল করার কথা।
কিন্তু এটা তো সম্ভব হওয়ার কথা না, কারণ সবাই জানে ব্ল্যাক হোল থেকে কিছুই বের হতে পারেনা। অন্তত এটাই জানা ছিল।
এই সমস্যাটা ১৯৭৪ পর্যন্ত ছিল, যখন আমি কোয়ান্টাম মেকানিকস অনুযায়ী ব্ল্যাক হোলের সন্নিকটে পদার্থের ব্যবহার কেমন হবে তা নিয়ে গবেষণা করছিলাম।
আশ্চর্যজনকভাবে আমি দেখলাম ব্ল্যাক হোল থেকে সুষম হারে কণার বিকিরণ ঘটে। তবে এই হতবুদ্ধিকর ঘটনাটি বাদ দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলাম কারণ ওই সময়ে সবার মত আমিও ‘ব্ল্যাক হোল থেকে বিকিরণ সম্ভব নয়’ ধারণাটি মেনে নিয়েছিলাম।
তবে যতই আমি এটা নিয়ে ভাবলাম, ততই এটা ফিরে আসতে লাগলো। শেষমেশ আমার এটা মেনে নিতেই হল।
শেষে আমার মেনে নেয়ার কারণ হল – বিকিরিত কণাগুলোর যে একটি সূক্ষ্ম তাপীয় বর্ণালী থাকবে, এটা একটি স্বাভাবিক ভৌত বিষয়।
আমার গণনায় এই ধারণা আসে যে একটি ব্ল্যাক হোল কণা এবং বিকিরণ সৃষ্টি এবং নির্গমন(?) করে, একটি সাধারণ উষ্ণ বস্তুর মত, যার তাপমাত্রা তার পৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণের সমানুপাতিক এবং তার ভরের ব্যাস্তানুপাতিক।
সেই সময় থেকে, ব্ল্যাক হোলের তাপ বিকিরণ করার গাণিতিক প্রমাণ বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উপায়ে নিশ্চিত করেছেন।
এই বিকিরণ বোঝার একটি উপায় এইরকম- কোয়ান্টাম মেকানিকস বলে জগতের পুরটাই ভার্চুয়াল এবং প্রতি-কণাদের দ্বারা তৈরি, জোড়ায় জোড়ায় ভার্চুয়াল কণা এবং প্রতি-কণা দিয়ে ভর্তি, যেগুলো প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় পদার্থে পরিণত হচ্ছে এবং ভাঙছে, এবং তারপর জোড়া লাগছে আর ধ্বংস হচ্ছে।
এই কণাগুলোকে ভার্চুয়াল কণা বলা হয় কারণ বাস্তব কণার মত এদেরকে সরাসরি ডিটেক্টর দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়।
তাদের পরোক্ষ প্রভাব পরিমাপ করা সম্ভব এবং এদের অস্তিত্ব একটি ছোট বিচ্যুতি থেকে নির্ণয় করা যায়, যার নাম ল্যাম্ব শিফট, যেটা তারা উত্তেজিত হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে আগত আলোর বর্ণালীতে দেখায়।
এখন, ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে, ভার্চুয়াল কণার একটি ব্ল্যাক হোলে পড়লে এবং জোড়ার অপরটি থেকে গেলে, সে আর ধ্বংস হতে পারবেনা যেহেতু তার জোড়াটি নেই।
এই প্রতি-কণাটি তার সঙ্গীর পরেই ব্ল্যাক হোলে পড়তে পারে, তবে সে অসীমেও চম্পট দিতে পারে, এবং এখান থেকেই সে ব্ল্যাক হোলের বিকিরণ হিসেবে পরিচয় পায়।
সূর্যের ভরের সমান ভরের একটি ব্ল্যাক হোল খুব ধীরগতিতে কণা বিকিরণ করে যা শনাক্ত করা অসম্ভব। তবে একটি পাহাড়ের ভরের সমান ভরের ব্ল্যাক হোল-ও থাকতে পারে।
এরকম ক্ষুদ্র একটি ব্ল্যাক হোল ১০ মিলিয়ন মেগাওয়াট হারে এক্স-রে ও গামা-রে বিকিরণ করে- এই পরিমাণ পৃথিবীর বৈদ্যুতিক চাহিদার সমান।
তবে এই শক্তি ধারণ করে কাজে লাগানো সহজ হবে না। ব্ল্যাক হোলটিকে একটি বৈদ্যুতিক কেন্দ্রে রাখা যাবে না কারণ সে তো মেঝে ভেঙে বেরিয়ে একেবারে পৃথিবীর কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছাবে।
একটি ব্ল্যাক হোলকে রাখার উপায় হবে যদি পৃথিবীর চারিদিকে কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।
এমন ব্ল্যাক হোল মানুষ এই পর্যন্ত অনেক খুঁজেছে কিন্তু আজ অব্দি পায়নি। এটা দুঃখের, কারণ খুঁজে পেলে আমি নোবেল প্রাইজ পেয়ে যেতাম।
আরেকটা উপায় হবে যদি স্থান কালের অতিরিক্ত মাত্রাগুলোতে একটি অতি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি করা। কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী ১০-১১ মাত্রিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আমরা শুধু ৪ মাত্রিক বিশ্বের অভিজ্ঞতা পাই।
‘Interstellar’ সিনেমাটি এ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। বাকী মাত্রাগুলো আমরা অনুভব করিনা কারণ এগুলোর ভেতর দিয়ে আলো সঞ্চারিত হয় না।
তবে মহাকর্ষ অন্য মাত্রাগুলোর উপর প্রভাব ফেলতে পারবে। আমাদের অভিজ্ঞতার বিশ্বে যত শক্তিশালী তার চেয়ে বেশী হবে অন্য মাত্রায়। ফলে একটু ছোট্ট ব্ল্যাক হোল এখানেই তৈরি সম্ভব।
এই ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে Large Hadron Collider, যেটি সুইটজারল্যান্ড এর CERN এ অবস্থিত।
এ Large Hadron Collider একটি ২৭ কিমি দীর্ঘ গোলাকার সুড়ঙ্গ নিয়ে নির্মিত। কণার দুটো রশ্মি এই সুড়ঙ্গে গমন করে বিপরীত দিকে আর তারপর তাদের মাঝে সংঘর্ষ হয়। আর এই সংঘর্ষ থেকেই তৈরি হতে পারে অতি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল যার বিকিরণের হারও খুব সহজে নির্ণয় করা যাবে।
তার মানে শেষমেশ আমি নোবেল প্রাইজ পেতেও পারি। ব্ল্যাক হোল থেকে কোন কণা বের হলে তার ভর কমবে এবং সে সংকুচিত হবে। এতে কণার বিকিরণের হার বেড়ে যাবে।

অবশেষে ব্ল্যাক হোল তার সব ভর হারাবে, আর হারিয়ে যাবে। তাহলে সেইসব কণাগুলো আর হতভাগা নভোচারীদের কি হবে যারা ব্ল্যাক হোলে পড়েছিলো? তারা তো ব্ল্যাক হোলটি নিঃশেষ হয়ে গেলে আর ফিরে আসবে না।
আসলে যে তথ্যগুলো তাদের সাথে পড়েছিলো ব্ল্যাক হোলে তা হারিয়ে গেছে- শুধু মোট ভর আর ঘূর্ণায়নের পরিমাণ বাদে। কিন্তু তথ্যের এই বিনাশ আমাদের বিজ্ঞানের বোঝাপড়ার(?) ঠিক কেন্দ্রে গিয়ে একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি করে।
২০০ বছরের বেশী সময় ধরে আমরা বৈজ্ঞানিক নিয়তিবাদে বিশ্বাস করে এসেছি, অর্থাৎ আমরা বিশ্বাস করি বিজ্ঞানের নিয়মনীতি দ্বারাই বিশ্বের বিবর্তন নির্ণয় হয়। এই ধারণার প্রবর্তক পিয়েরে সাইমন ল্যাপলেস, যিনি বলেছিলেন যদি আমরা কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বের অবস্থা জানি তাহলে বিজ্ঞানের নীতিবিধির দ্বারা বিশ্বের অতীত ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব।
নাপলিয়ন ল্যাপলেসকে এই ধারণায় ঈশ্বরের স্থান কোথায় এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। ল্যাপলেসের উত্তর ছিল, ‘মহাশয় এই hypothesis বিবেচনা করার প্রয়োজন মনে করিনি।’
আমার মনে হয়না ল্যাপলেস সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। সৃষ্টিকর্তা হয়ত বিজ্ঞানের নিয়মাবলীতে নাক গলান না। এটাই হয়তো সব বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস। বিজ্ঞানের একটি নীতিকে তখনি স্বীকৃতি দেয়া যায়না যখন সেটি বলে অতিপ্রাকৃতিক কোন সত্ত্বার ইচ্ছামাফিক নানা ঘটনা ঘটে।
ল্যাপলেসের নিয়তিবাদ বলে ভবিষ্যতের অবস্থা নির্ণয় করতে হলে সকল কণার অবস্থান এবং গতি জানা প্রয়োজন। আবার অন্যদিকে আছে ১৯২৩ সালে ওয়াল্টার হাইজেনবার্গের আবিষ্কৃত অনিশ্চয়তা তত্ত্ব, যা কিনা কোয়ান্টাম মেকানিকসের মূলমন্ত্র।
অর্থাৎ যত নিখুঁতভাবে কণার অবস্থান নির্ণয় করা হবে, গতি নির্ণয়ে ততটাই অনিশ্চয়তা থাকবে এবং ঠিক উল্টাটাও সত্য। একই সাথে দুটোকে সঠিকভাবে বের করা সম্ভব নয়।

কীভাবে ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব? যদিও কণার অবস্থান ও গতির একইসাথে সঠিক ধারণা করা যায় না, তবে তার কোয়ান্টাম অবস্থা নিয়ে ধারণা করা সম্ভব। কোয়ান্টাম অবস্থা থেকেই আপাতত অবস্থান ও গতি দুই-ই বেশ কিছুটা নির্ভুলতার সাথে গণনা করা যায়।
এরপরেও আমরা আশা করতে পারি মহাবিশ্ব নিয়তিবাদী যেহেতু একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বের কোয়ান্টাম অবস্থা জানা গেলে বিজ্ঞানের নিয়মকানুন অনুসারে অন্য এক সময়ের কোয়ান্টাম অবস্থা নির্ধারণ করা যায়।
যদি ব্ল্যাক হোলে তথ্য-উপাত্ত হারিয়ে যেত তবে আমরা ভবিষ্যতের কথা বলতে পারবো কারণ ব্ল্যাক হোল যেকোনো এক সেট কণা বিকিরণ করতে পারে। ব্ল্যাক হোলটি একটি টিভি বা শেক্সপিয়ারের সমগ্র বিকিরণ করতে পারে। তবে এমন অদ্ভুত বিকিরণের সম্ভাবনা খুবই কম।
এখান থেকে আবার এমন ধারণার জন্ম হতে পারে যে, ব্ল্যাক হোল থেকে কী বিকিরণ হতে পারে তা নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন নেই। অবশ্য আমাদের ধারে কাছে কথাও ব্ল্যাক হোল নেই। এটি আসলে নীতিগতভাবে একটি ভাবনার বিষয়।
ব্ল্যাক হোলে যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে ধারণা করার সুযোগ না থাকে তবে অন্য কোথাও এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। নিয়তিবাদ ভেঙে পড়লে আমরা নিজেদের অতীত সম্পর্কেই তো নিশ্চিত হতে পারবো না।
ফলে ব্ল্যাক হোলে তথ্য –উপাত্ত হারাল কিনা বা তাত্ত্বিকভাবে এগুলো ফিরে পাওয়া যাবে কিনা ব্যপারটি জানা জরুরি হয়ে পড়ল।
অনেক বিজ্ঞানী ভেবেছিলো তথ্য হারাতে পারে না তবে তথ্য সংরক্ষণ করা সংক্রান্ত কোন ধারণা কেউ দিতে পারেনি। অনেক বছর ধরে এই বিতর্ক চলতে থাকলো। শেষমেশ আমার মনে হল আমি উত্তর পেয়েছি।
উত্তরটি নির্ভর করে রিচার্ড ফ্রেমানের ধারণার উপর – আসলে ইতিহাস একটি নয়। অনেক রকম ইতিহাস থাকতে পারে এবং প্রত্যেকটার নির্দিষ্ট সম্ভাব্যতা আছে।
এই অবস্থায়, দুই রকমের ইতিহাস আছে। একটি ব্ল্যাক হোল আছে যাতে কণা পড়ে যেতে পারে এবং অন্যটিতে ব্ল্যাক হোল নেই।
ব্যাপারটা এমন, বাইরের থেকে কোন ব্ল্যাক হোল আছে কিনা বলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ব্ল্যাক হোল না থাকার একটি সম্ভাবনা থাকে।
আর তাই তথ্য সংরক্ষণ করার একটি সম্ভাবনা থাকে, তবে তা ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ফেরত পাওয়া যাবে না। যেমন একটি বিশ্বকোষ পোড়ালে, তার ছাই রেখে দেয়া মানে তথ্য ধরে রাখা তবে বইটা পড়া তখন দুষ্কর হবে।

ব্ল্যাক হোলে তথ্য হারিয়ে যাবে বলে আমি এবং বিজ্ঞানী কিপ থর্ন পদার্থবিদ জন প্রেস্কিলের সাথে বাজি ধরেছিলাম। যখন আমি আবিষ্কার করলাম কীভাবে তথ্য ধরে রাখা সম্ভব তখন আমি হেরে গেলাম। আমি প্রেস্কিলকে একটি বই দিলাম, হয়তো আমি তাকে ছাইভস্ম দিতে পারতাম।
বর্তমানে আমি আমার ক্যামব্রিজের সহকর্মী ম্যালকম পেরি এবং হার্ভার্ডের আন্ড্রু স্ট্রোমিংগারের সাথে একটি নতুন তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছি।
এই তত্ত্বটি ‘সুপারট্রান্সলেসন’ নামক গানিতিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে এবং ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফেরত আনার কৌশল ব্যাখ্যা করে।
ব্ল্যাক হোলের দিগন্তে তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ…
এখান থেকে আমরা ব্ল্যাক হোলে পড়ে যাওয়া এবং অন্য একটি মহাবিশ্বে পৌঁছানোর ব্যাপারে আমরা কি বুঝতে পারি? ব্ল্যাক হোলের সাথে বিকল্প ইতিহাসের বোঝায় এটা সম্ভব। ব্ল্যাক হোলটি বৃহদাকার ও ঘূর্ণায়মান হলে, এটি অন্য মহাবিশ্বে প্রবেশদ্বার হতে পারে।
এরপরে আমাদের বিশ্বে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। আমার মহাকাশ ভ্রমনে যথেষ্ট আগ্রহ থাকলেও আমি আর চেষ্টা করতে চাইনা।
এই বক্তৃতার মূলকথা হল ব্ল্যাক হোল আসলে ততটা কালো যতটা এর বর্ণনায় উঠে এসেছে। আবার এটা কোন অনন্তকালের বন্দিশালা নয়। ব্ল্যাক হোল থেকে পদার্থ বেরিয়ে আসতে পারে, সম্ভবত অন্য এক মহাবিশ্বে।
তাই তুমি কোনো গর্তে আটকা পড়লে, হার মেনো না। বের হবার পথ আছে।
ধন্যবাদ।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — জুন ১৮, ২০১৬ @ ৮:৪৪ অপরাহ্ন

      বেশ কিছুদিন আগে Toronto Starএ স্টিফেন হকিং এই বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন পড়েছিলাম। এবার বিস্তারিত পড়লাম অরণি সেমন্তি খানের অনুবাদের। এর আগে সেমন্তি কোনো লেখা পড়িনি। তবে খুব ঝরঝরে অনুবাদ!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন milon — জুন ১৮, ২০১৬ @ ১১:০৫ অপরাহ্ন

      ব্ল্যাক‌হোল , যার অর্থ নি‌ঃশেষ হওয়া । এটি এক‌টি প্র‌ক্রিয়া মাত্র । প‌রিবর্ত‌নের প্র‌ক্রিয়া । বিশ্বব্রম্ভান্ড হোক আর মহাজাগ‌তিক কোন‌কিছুই হোক , একেবা‌রে নি‌ঃশেষ তো সম্ভব নয় , প্র‌ত্যেক বস্তুু ভিন্ন ভিন্ন রূপে প‌রিবর্ত‌নের মাধ্য‌মে পুনরায় আর্বিভূত হয় । তেমনই প‌রিবর্ত‌নের এক‌টি বৃহত মাধ্যম এই ব্ল্যাক‌হোল । মহাজাগ‌তিক কর্মকা‌ন্ডের ব্যালান্স ঠিক রাখার যত প্র‌ক্রিয়া আছে তার ম‌ধ্যে ব্ল্যা‌ক‌হোলও এক‌টি । ব্ল্যাক‌হোল নি‌য়ে ভয় পাওয়ার কিছু নাই । হয়‌তো এই ব্ল্যাক‌হোল আমা‌দের পৃ‌থিবী‌কে কোন না কোনভা‌বে ধ্বং‌সের হাত থে‌কে রক্ষা কর‌ছে ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শেখর দেব — জুন ১৯, ২০১৬ @ ১০:০৮ পূর্বাহ্ন

      একটি গুরুত্বপুর্ণ বক্তৃতার অনুবাদের জন্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভানু ভাস্কর — জুন ২০, ২০১৬ @ ১০:১৮ পূর্বাহ্ন

      ব্লাক হোল হলো আইনস্টাইনের এন্টি-থিসিস। মিস্টার ওপেনহেইমার এটম বোম ফাটাবার আগে (!) আর কোনও জব পাচ্ছিলেন না, তাই আইনস্টাইনের বিপক্ষে গিয়ে জর্নল/পত্রিকার শিরোনাম হওয়ার জন্য এর চেয়ে মুখোরোচক ‘গল্প’ কি আর হতে পারতো!
      এমআইটি এর এক প্রফেসরের এক ছাত্রের সঙ্গে গত সপ্তাহে স্টিফেন হকিং নিয়ে কথা হতে তিনি আমাকে বললেন, আরে বাদ দাও, বেটা তো কথা কইতে জানে না, নড়তে পারে না, ওঁর সাঙ্গপাঙ্গরা ‘ওর হয়ে’………
      না মানে…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মীর রেজাউল হোসেন — জুন ২১, ২০১৬ @ ১:২৭ অপরাহ্ন

      Black hole আছে কি নেই, তার সিংগুলারিটি,হরাইজন এসব নিয়ে গবেষণা হচ্ছে , সিনেমা হচ্ছে । আজকের যা কিছু আবিষ্কার সব কিছুই কিন্তু চিন্তা ,চেতনা ও কল্পনা থেকে।অনুবাদটি খুবই ভাল । ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com