গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ১৫ জুন ২০১৬ ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩৭
বৃষ্টি চলে চার বছর এগারো মাস দুদিন। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির কিছু সময় এসেছিল যখন সকলেই ঢোলা যাজকীয় পোশাক পড়ে, বৃষ্টি ধরে আসাটাকে উদযাপন করার জন্য অসুখ থেকে আরোগ্য লাভের মত চেহারা করলেও, শিঘ্রই তারা বুঝতে পারে যে এই বিরতিগুলো হচ্ছে আবার কয়েকগুণ বেগে বৃষ্টি নামার পূর্ব-ঘোষনা। প্রচন্ড ঝড়ে আকাশ ভেঙ্গে পরত। উত্তর থেকে পাঠানো ঘূর্ণিঝড় ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে দেয়ালগুলো করে ধ্বংস, আর শিকড়শুদ্ধ উপরে ফেলে আবাদের শেষ কলা গাছটিকেও। মনে পরে যায় উরসুলার সেই কথা, যেমনটি ঘটেছিল অনিদ্রা মহামারীর সময়, খোদ বিপর্যয়ই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল একঘেয়েমীর বিরুদ্ধে। অলসতায় যাতে ভেঙে না পরে তার জন্য যারা সবচেয়ে বেশী কাজ করেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। যেদিন সেন্যর ব্রাউন ঝড়ের ঘোষনা দেয় সেদিন সাধারণ কোন ব্যাপারে বাড়িতে যায় সে, আর ফের্নান্দা দেয়ালকুঠুরীতে পাওয়া অর্ধেকটা শিক থেকে বেরিয়ে যাওয়া এক ছাতা দিয়ে তাকে সাহায্য করতে গিয়েছিলো যাতে সে বেরুতে পারে। “দরকার নেই” – বলে সে “ঝড় থামা পর্যন্ত এখানেই থাকব আমি।” অবশ্যই এটা কোন ধনুভঙ্গ পণ ছিল না কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই সেটাকে পালন করে চলে সে। তার কাপড়চোপর পেত্রা কতেসের বাড়িতে থাকায় প্রতি তিনদিন অন্তর পরনের কাপড় খুলে শুধু জাঙ্গিয়া পরে অপেক্ষা করত ওগুলো ধোয়ার জন্য। একঘেয়েমী কাটাতে বাড়ির বিভিন্ন খুঁত মেরামতের কাজে লেগে পরে সে। কব্জাগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করে, তালাগুলোতে তেল দেয়, দরজার কড়ায় স্ক্রু আঁটে ও চৌকাঠ লেভেল করে। অনেক মাস যাবৎ, সম্ভবত হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সময় জিপসীদের ভুলে ফেলে যাওয়া যন্ত্রপাতির এক বাক্স হাতে, ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায় তাকে, আর কেউই বুঝতে পারে না যে তার অনিচ্ছাকৃত ব্যায়ামের কারনে, শীতকালীন ক্লান্তিতে, নাকি বাধ্যকৃত উপোসের ফলে, তার পেটটা চুপসে গিয়ে শুধু চামড়ায় পরিণত হয়, ভোজন তৃপ্ত কচ্ছপের মাখাটার রক্তাভা কমে আসে, গলার নীচের ঝোলা মাংশ আর তেমন চোখে পরে না, সর্বশেষে শরীরের সব জায়গার স্থুলত্ব কমে আসে আর পুনরায় সে নিজের জুতোর ফিতে বাঁধতে পারে। তাকে দরজার হুড়কো ঠিক করতে দেখেও ঘড়িগুলো খুলে ফেলতে দেখে ফের্নান্দার মনে প্রশ্ন জাগে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মত সেও সোনার মাছ গলিয়ে পুনরায় তৈরীর বা আমারান্তার শবাচ্ছাদনের কাপড়ে বোতাম খোলা ও লাগানোর, হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর পার্চমেনট বারবার পড়ার অথবা উরসুলার স্মৃতি নিয়ে খেলার মত তাকেও একইভাবে একই জিনিষ ভেঙে আবার গড়ার বদভ্যাসে পেয়েছে কিনা। সমস্যা হল বৃষ্টি সবকিছুই নষ্ট করে ফেলত, সবচেয়ে শুকনো মেশিনেও প্রতি তিনদিন অন্তর তেল দেয়া না হলে গিয়ারের মধ্যে ফুল গজাতো, মরিচা ধরত রেশমী পোশাকের শুতোয় আর ভেজা পোশাকে গজাতো জাফরান রংয়ের ছত্রাক। আবহাওয়ায় এতই আর্দ্রতা ছিল যে মাছেরা দরজা দিয়ে ঢুকে ঘড়ের বাতাসে ভাসতে ভাসতে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। আনন্দঘন এক মূর্ছার মধ্য দিয়ে মৃত্যুবরণ করছে এমন এক অনুভূতি নিতে এত সকালে জেগে ওঠে উরসুলা, আর সে সকলকে বলে যে খাটিয়ায় শুইয়ে হোলেও তাকে যেন ফাদার আন্তোনিও ইসাবেলের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ তাকে দেখতে পায় তখন তার পিঠ পিচ্ ঢালা রাস্তার মত জোঁক দিয়ে ভরে গিয়েছে। একটা একটা করে ছাড়িয়ে নিয়ে আগুনে ফেলে ওগুলোকে মারা হয় সমস্ত রক্ত শুষে শেষ করে ফেলার আগেই, বাড়ির ভেতরে খাল কাটার প্রয়োজন পরে পানি সরাবার জন্য, যাতে করে ব্যাঙ ও শামুকগুলোকে মেঝে থেকে সরানো যায়, আস খাটের পায়া থেকে ইট সরিয়ে আবার জুতো পায়ে হাটা যায়। বিভিন্ন ছোট খাটো মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন এমন ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বুঝতে পারে না যে সে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, যে বিকেলে দোলচেয়ারে বসে দ্রুত ঘনিয়ে আসা সন্ধেটাকে তাকিয়ে দেখছিল আর পেত্রা কতেসের কথা ভাবছিল কোনরকম উত্তেজনা বোধ না করেই। ফের্নান্দোর নীরস শরীরের পাশে ফিরে যেতে কোন অসুবিধেই ছিল না তার, বয়স বাড়লেও রূপ যাকে ছেড়ে না গিয়ে পরিপূর্নতা দিয়েছে, কিন্তু বৃষ্টি তাকে মুক্তি দিয়েছে সব কামতাড়না থেকে, আর ওর ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে এক প্রশাস্ততা যেটা নাকি শুষে নেয় সবধরনের ক্ষুধা। সে চিন্তা করতে থাকে এই এক বছর ধরে ঝরতে থাকা বৃষ্টি অন্য সময়ে হলে সে কি করতে পারত। সেই সময়ে মাকন্দতে যারা প্রথম দিকে দস্তার পাত নিয়ে আসে সে ছিল তাদেরই একজন। পেত্রা কতেসের শোবার ঘড়ের উপরে ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির আওয়াজ যে গভীর প্রণয়ের অনুভূতি তৈরী করত তা উপভোগের জন্য কলা কোম্পানি জিনিষটাকে ফ্যাশানে তৈরী করার অনেক আগেই সে আনে সেটা। এমনকি যুবা বয়সের এইসব বুনো স্মৃতিগুলোও তাকে কেন্দ্রভ্রষ্ট করে নিরাসক্ত করে, যেন গত পানোৎসবের সময় বরাদ্দকৃত কামোত্তেজনাটুকু খরচ হয়ে শুধুমাত্র অবশিষ্ট রয়েছে কোন রকমের তিক্ততা বা অনুতাপ ছাড়াই সেটাকে মনে রাখার মত চমৎকার স্মৃতির উপহার। তার সম্মন্ধে ভাবা যেত হয়তবা এ মহাপ্লাবন ওকে সুযোগ করে দিয়েছে বসে স্থির হয়ে চিন্তা ভাবনা করার অথবা এই প্লায়ারস ও তেলের ক্যান নিয়ে দৌড়াদৌড়ির, দেরীতে হলেও তার ভেতর জাগিয়ে তুলেছে অনেক প্রয়োজনীয় কাজের ইচ্ছে, যেগুলো সে অনেক আগেই করতে পারত কিন্তু জীবনে কখনই করে নি, কিন্তু দুটোর একটিও আসলে সত্য নয়, কারণ অলসভাবে বসে কাটানোর লোভ বা ঘরমুখী হবার ব্যাপারটা নিজেকে নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা বা ধাক্কা খেয়ে যে শিক্ষা পেয়েছে তার ফল নয়। ইচ্ছেটা এসেছিল আসলে অনেক দূর থেকে। বৃষ্টির আঁকশি দিয়ে টেনে আনা হয়েছিল ওগুলোকে, মেলকিয়াদেসের ঘরে বসে যখন উড়ন্ত গালিচা ও জাহাজসহ নাবিকদের দিয়ে তিমি মাছের আহার সাড়ার মত আশ্চর্য সব গল্প পড়ত তখন থেকে। ঐ দিনগুলোতেই ফের্নান্দার অসাবধানতার ফলে বারান্দায় উদয় হয় ছোট্ট আউরেলিয়ানো আর দাদা জানতে পারে ওর পরিচয়ের গোপনীয়তা। ওর চুল কাটানো হলো, ওকে ভাল কাপড় পড়ানো হলো, শেখানো হলো লোকজনকে ভয় না পেতে, আর খুব শিঘ্রই ওর হনু, বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টি ও ওর থেকে আসা নিঃসঙ্গতার হাওয়া থেকে বোঝা গেল সে এক খাঁটি বুয়েন্দিয়া, আর ব্যাপারটা ফের্নান্দার জন্য নিয়ে আসে এক স্বস্তি। অনেক আগেই নিজের গর্বকে খর্ব না করার জন্য কৃতকর্মের পরিমাপ করলেও তার কোন প্রতিষেধক খুঁজে পায়নি সে, আর যতই চিন্তা করত তার সমাধান নিয়ে ততই অযৌক্তিক মনে হত সমাধানের পথগুলোকে। যদি সে জানতে পেত, যেভাবে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ব্যাপারটাকে গ্রহণ করেছে সে ভাবে নেবে, এক ভাল পিতামহের মত, তাহলে ব্যাপারটা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করত না বা এত সময়ও পার না করে আগের বছরই নিজেকে এই প্রায়শ্চিত্তের যন্ত্রনা থেকে রেহাই দিত। আমারান্তা উরসুলা যার দুধদাঁত এরই মধ্যে পরে গিয়ে আবার গজাচ্ছে তার জন্য ভাইপো ছিল একঘেয়েমীময় বৃষ্টির মধ্যে সান্ত্বনা নিয়ে আসা ছোটাছুটি করা এক খেলনা। আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর মনে পরে যায় মেমের পুরোনো শোবার ঘরে রাখা ইংরেজী বিশ্বকোষটার কথা যেটাকে আর কেউ ছুঁয়েও দেখেনি। বাচ্চাদেরকে সে দেখাতে শুরু করে বইটা থেকে ছবিগুলো, বিশেষ করে জীবজন্তুর ছবি, পরের দিকে মানচিত্র, দূরদূরান্তের নানা দেশের ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি– যেহেতু সে ইংরেজী জানত না আর যেহেতু কোন রকমে কেবলমাত্র বিখ্যাত শহরগুলো ও সবচেয়ে প্রচলিত খ্যাতনামা ব্যাক্তিদেরকে চিনত সেহেতু সে বাচ্চাদের অসীম কৌতুহল মেটাতে বিভিন্ন নামের আবিষ্কার ও গল্প বানানোর আশ্রয় নেয়।
ফের্নান্দা বিশ্বাস করত সত্যি সত্যিই স্বামী উপপত্নীর কাছে ফিরে যাবার জন্য বৃষ্টি ধরে আসার অপেক্ষায় আছে। বৃষ্টির প্রথম মাস গুলোতে সে ভয়ে ভয়ে ছিল যে সে যেন আবার তার শোবার ঘরে ঢুকে না পরে, আর তাকে সমস্ত লজ্জা নিয়ে বলতে হয় যে আমারান্তা উরসুলার জন্মের সময় থেকেই সে পূর্বসম্পর্কে ফিরে যেতে অক্ষম হয়ে পরেছে। এই সময়ে ডাক-ব্যবস্থার ঘনঘন বিপর্যয়ের কারণে অদৃশ্য চিকিৎসকদের সঙ্গে উৎকন্ঠাজনিত চিঠি চালাচালি বাধাপ্রাপ্ত হয়। প্রথম মাসগুলোতে যখন সে জানতে পারে যে ঝড়ের ফলে ট্রেনগুলো লাইনচ্যুত হয় তখন অদৃশ্য চিকিৎসকরা এক চিঠিতে জানায় যে তারা আর ফের্নান্দার চিঠি পাচ্ছে না। পরে যখন অচেনা পত্রলেখকের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিঘ্নপ্রাপ্ত হয় তখন সে সত্যি সত্যিই ভাবে রক্তাক্ত কার্নিভালে স্বামীর ব্যবহৃত বাঘের মুখোশ পরে এক ছদ্মনাম নিয়ে কলা কোম্পানীর ডাক্তারের শরণাপন্ন হবার কথা। কিন্তু এই প্রচন্ড প্লাবনের সময় প্রতিদিনই বাড়ির সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করা হাজারো বাজারে লোকের মাঝে কেউ একজন ওকে বলে যে কলা কোম্পানী ওদের ডিসপেন্সারী সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি হয় না এমন জায়গায়। ফলে সে হারিয়ে ফেলে আশা প্রত্যাশা। সে অপেক্ষা করে বৃষ্টি থেমে ডাক-যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের, আর সেই অপেক্ষার সময়টাতে সে তার গোপন ব্যথা প্রশমন করে চলে অনুপ্রেরণা থেকে কারণ মাকন্দোতে বাস করা শেষ ডাক্তারটির কাছে যাওয়ার চাইতে মরে যাওয়া শ্রেয় মনে করে সে, কারণ ডাক্তারটি হচ্ছে এক বর্বর ফরাসী যে গাধার মত ঘাস খায়। সে উরসুলার নিকটবর্তী হয় এ বিশ্বাসে যে উরসুলা হয়তবা ব্যাধি উপশমের কোন উপায় জানে। কিন্তু যে-জিনিষের যে-নাম সে নাম না বলে অন্য নাম ধরে ডাকার ও আগের ব্যাপারটাকে শেষে বলার বা বাচ্চা হওয়াকে “বের করা”-র অথবা যাতে করে কম লজ্জাজনক হয় তার জন্য মেয়েলী রক্তস্রাবের বদলে সেটাকে জ্বালা যন্ত্রনার মত শব্দ ব্যবহারের বদভ্যাসের কারণে উরসুলা সিদ্ধান্তে আসে যে ব্যাপারটা জরায়ু-সংক্রান্ত নয় বরঞ্চ আন্ত্রিক, আর ওকে পরামর্শ দেয় খালি পেটে এক পুরিয়া মারকিউরিক ক্লোরাইড খেতে। এই সমস্যাটা না থাকলে আর একই সঙ্গে লজ্জারোগের রোগী না হলে আর একই সাথে চিঠিগুলো হারিয়ে না গেলে ফের্নান্দার কাছে বৃষ্টি কোন গুরুত্বই পেত না কারণ শত হলেও সারা জীবনই তো প্রায় তার বৃষ্টির মধ্যে কেটেছে। সে তার কাজকর্মের সময়ে কোন পরিবর্তন করে না এমন কি আচার অনুষ্ঠানও বাদ দেয় না। খাবার সময় যাতে পা না ভিজে যায় তার জন্য ইটের উপর টেবিল আর তক্তার উপর চেয়ার বসানো ছিল তখনও সে লিনেনের টেবিল ক্লথ ও চিনেমাটির বাসন কোশনে খাবার পরিবেশন করত, এবং রাতের খাবারের সময় মোমবাতি জ্বালাত কারণ মনে করত যে দুর্যোগকে আচার আচরণে শৈথিল্য আনার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিৎ নয়। কেউই আর রাস্তার দিকে উঁকি দিতো না, কারণ যদি ব্যাপারটা ফের্নান্দার উপর নির্ভর করত তাহলে শুধু বৃষ্টি আরম্ভের সময় থেকেই নয় তারও অনেক আগে থেকেই সে ওটাকে বন্ধ করত, যখন সে মনে করত দরজা আবিষ্কৃত হয়েছে বন্ধ করে রাখবার জন্য আর রাস্তায় কি হচ্ছে তা দেখার কৌতূহল হচ্ছে বেশ্যাসুলভ। তারপরও যখন ওকে জানানো হল যে কর্নেল হেরিনেল্দো মার্কেসের শবযাত্রা যাচ্ছে তখন সেই সবার আগে রাস্তায় উঁকি দেয়। যদিও সামান্য খোলা জানালা দিয়ে যা দেখে তার জন্য সে নিজের দুর্বলতার জন্য অনুতাপদগ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ যন্ত্রনায় ভোগে।

এমন বিস্বাদময় শবযাত্রার কথা সে ভাবতেও পারত না কখনও। বলদটানা এক গাড়ির উপর কলাপাতা দিয়ে এক ছাউনি দেয়া হলেও বৃষ্টির তোর এমনই ছিল আর প্রতি পদে যেভাবে চাকা কাঁদায় আটকে যাচ্ছিল তাতে ছাউনিটা ভেঙ্গে পড়বার উপক্রম হচ্ছিল। বিষন্ন পানির ধারা ঝড়ে পরছিল কফিনের উপর রাখা ভিজে সপসপে রক্ত ও বারুদ মাখা পতাকাটার উপর, যে পতাকাটা ছিল প্রাক্তন সৈনিকদের মধ্যে একটু সম্মানীয়দের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। কফিনের উপর আরো রাখা ছিল তামা ও সিল্কের ঝালরওয়ালা তরবারি খানা যেটাকে সে নিরস্ত্র অবস্থায় আমরান্তার সেই ঘড়ে ঢোকার সময় বৈঠকখানার হ্যাংগারে ঝুলিয়ে রাখত। গাড়িটার পিছনে খালি পায়ে কিছু লোক, তাদের পাতলুন ছিল হাঁঠু পর্যন্ত গোটানো, কাদায় হুটোপুটি করছে নিরলান্দিয়ার আত্মসমর্পনকৃতদের মধ্যে জীবিত শেষ ক’জন, এক হাতে পশু ব্যবসায়ীদের লাঠি ও অন্য হাতে বৃষ্টিতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া এক কাগুজে ফুলের বিড়ে নিয়ে। ওরা উদয় হয় তখন পর্যন্ত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার নামে পরিচিত সড়কের উপর এক অবাস্তব দৃশ্যের মত, আর সকলেই বাড়ি অতিক্রমের সময় একবার তাকায় আর প্লাজার কোনার দিকে মোড় নেয়, যেখানে আটকে যাওয়া গাড়িটাকে নড়ানোর জন্য ওদের সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন হয়। উরসুলা বাধ্য করে সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদকে দরজা পর্যন্ত নিয়ে যেতে। এমন মনোযোগ দিয়ে সে শবমিছিলটার বাধাবিপত্তি অনুসরন করে যে কারো মনেই সন্দেহ জাগে না যে সে দেখছে, বিশেষ করে এই কারণে যে বার্তাবাহক দেবদুতদের মত তার ওঠানো হাত বলদটানা গাড়িটা দুলুনির সাথে তাল মিলিয়েই দুলছিল।
-“বিদায় হেরিনেল্দো বাছা আমার”-চিৎকার করে-“আমার লোকদের শুভেচ্ছা জানাস আর বলিস যে বৃষ্টি ধরে গেলেই দেখা হবে ওদের সঙ্গে।”
আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওকে সাহায্য করে বিছানায় ফিরে যেতে আর বরাবরই যেরকম লৌকিকতাবিহীন ব্যবহার করে তার সঙ্গে, সেভাবেই জিজ্ঞেস করে তার এধরনের বিদায় জানানোর অর্থ।-“সত্যিই ” সে বলে – “আমি মরার জন্য বৃষ্টি ধরে আসার অপেক্ষায় আছি”।
রাস্তাগুলোর এই অবস্থা শংকিত করে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে। শেষ পর্যন্ত জন্তু জানোয়ারগুলোর দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করে মাথায় এক মোম দেয়া ক্যানভাস দিয়ে পেত্রা কতেসের বাড়ি যায়। কোমড় অবধি পানি সমেত ঘোড়ার এক মৃতদেহ সরানোর চেষ্টা করার সময় দেখতে পায় তাকে। একটা লম্বা কাঠের বার দিয়ে তাকে সাহয্য করে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো আর সেই বিশাল ফুলে ওঠা শরীর ঘন্টার মত এক পাক দিয়ে তরল কাদার স্রোতের টানে ভেসে যায়। বৃষ্টি আরম্ভ হবার সময় থেকে পেত্রা কতেস উঠানে মরা জন্তুর শব পরিষ্কার করা ছাড়া আর কিছুই করেনি। প্রথম সপ্তাহগুলোতে সে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল যাতে করে সে এই জরুরী অবস্থার একটা ব্যবস্থা করে আর সে জবাব দিয়েছিল যে তাড়াহুড়োর কিছু নেই; অবস্থা এত খারাপ নয়, আর যখন বৃষ্টি থেমে যাবে সে কিছু একটা করবে। পেত্রা কতেস তাকে খবর পাঠায় যে চারনভূমি পানিতে ডুবে যাচ্ছে সেখানে খাবার নেই, গবাধিপশুগুলো পালিয়ে যাচ্ছে উচুভূমিতে, আর ওগুলোর জীবন নির্ভর করছে বাঘ ও রোগ বালাইয়ের দয়ার উপর। “কিছুই করার নেই,”- উত্তর পাঠায় আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। “বৃষ্টি থামলে আরো জন্মাবে”। পেত্রা কতেস ওদের মরতে দেখে দলে দলে, আর যেগুলো কাদায় আটকে গিয়েছিলো শুধুমাত্র সেগুলোকেই জবাই করতে পারে সে। এক বধির অসহায়তার সঙ্গে দেখে যায় দয়া মায়াহীন মহাপ্লাবন কিভাবে একসময়ে মাকন্দোর সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সম্পদকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, শেষ অবধি যেগুলোর অবশিষ্ট বলতে মহামারী ছাড়া কিছুই থাকে না। কী ঘটছে দেখার জন্য যখন আউরেলিয়ানো সেগুন্দো যাবার সিদ্ধান্ত নেয় তখন আস্তাবলের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে একটি ঘোড়া ও নোংরা খচ্চরের মৃতদেহ ছাড়া সে আর কিছুই পায় না। পেত্রা কতেস ওকে আসতে দেখে কোন বিস্ময়, আনন্দ বা রাগ ছাড়াই শুধুমাত্র এক ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হাসে। -“ভাল সময়েই এসেছ।”- বলে।

শরীরে হাড়সর্বস্ব বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া পেত্রা কতেসের মাংসাশী প্রানীর মত সরু চোখ অনবরত বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বিষন্ন ও বশ্যতার চোখে পরিবর্তিত হয়েছে। তিন মাসেরও বেশী সময় আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওর বাড়িতে থেকে যায় এজন্য নয় যে নিজের পরিবারের চেয়ে ওখানে থাকতে সে বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, বরঞ্চ এই জন্য যে মোম দেয়া ক্যানভাসের টুকরোটা আবার মাথার উপর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তার তিন মাসেরও বেশী সময় লাগে। “তাড়াহুড়োর দরকার নেই”- বলে, যেমনটি বলেছিল অন্য বাড়িতে থাকতে সময় ও বৃষ্টি উপপত্নীর স্বাস্থ্যের যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে তাতে সপ্তাহের মধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে পরে সে, আর ধীরে ধীরে তাকে বোধ করতে থাকে আগের মতই, মনে পরে তার আনন্দময় দিনগুলো আর তাদের সঙ্গম জীবজন্তুদের মধ্যে বর্বর উম্মাদনা তৈরী করেছিল তার কথা, দ্বিতীয় সপ্তাহের এক রাতে জরুরী আদর করার তাগিদে তার ঘুম ভেঙে যায়। পেত্রা কতেস্ সাড়া দেয় না। “শান্ত হয়ে ঘুমাও”- বিড়বিড় করে –“এখন আর এসবের সময় নয়।” আউরেলিয়ানো সেগুন্দো নিজেকে দেখে সিলিংয়ের আয়নায়, দেখে পেত্রা কতেসের মেরুদন্ডের হাড় একছড়া শুকনো স্নায়ুতন্ত্রের দ্বারা সাড়ি বেধে গাঁথা, আর বুঝতে পারে যে যথেষ্ট কারণ আছে তার কথায়, আর কারণটা সময় নয় বরঞ্চ তারা নিজেরাই; যারা আর এসব করার জন্য নয়।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
শুধু উরসুলাই নয়, সারা মাকন্দোর বাসিন্দারা মৃত্যুর জন্য বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় রয়েছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তোরঙ্গগুলো নিয়ে বাড়ি ফেরে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। সামনে দিয়ে পার হবার সময় দেখতে পায় লোকগুলোকে, অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে দু বাহু জড়ো করে প্রবহমান অনন্ত সময়কে অনুভব করতে যে সময় ছিল অবিভাজ্য;মাস, বছর, দিন ও ঘন্টায় ভাগ করা ছিল নিরর্থক, যেখানে ওরা বৃষ্টি থামার অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিল না। শিশুরা উল্লাসের সাথে গ্রহণ করে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর হাপানীগ্রস্থ অ্যাকোর্ডিয়ানটা আবার বাজানোতে, কিন্তু বিশ্বকোষের আসরগুলোর মত কনসার্টটা ওদের এত মনযোগ আকর্ষণ করতে পারে না, যাতে করে আবার মেমের শোবার ঘড়ে জড়ো হয় ওরা, যেখানে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো এক উড়োজাহাজকে বানিয়ে ফেলে মেঘের মাঝে ঘুমোনোর জায়গা খুঁজতে থাকা এক উড়ুক্কু হাঁতি। এক সময় তার চোখে পরে ঘোড়ার পিঠে চড়া এক লোক। তার গায়ে অদ্ভুত পোশাক থাকলেও তাকে চেনা চেনা লাগে, পরে খুব ভাল করে পরীক্ষা করার পর সে সিদ্ধান্তে আসে যে ওটা কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ছবি। ফের্নান্দাকে দেখায় ওটা আর সেই মিল শুধুমাত্র কর্নেলের সাথেই নয় বরঞ্চ সমস্ত পরিবারের সঙ্গে মিল খুঁজে পায় তার, যদিও ছবিটি ছিল এক তাতার যোদ্ধার। এভাবেই সময় কাটতে থাকে কলসাসের রোড্স আর সাপুড়েদের সঙ্গে যতক্ষণ পর্যন্ত না ওর স্ত্রী ঘোষণা করে যে ভাঁড়ারে সবেমাত্র অবশিষ্ট আছে ছয় কেজি লবনাক্ত মাংস ও এক বস্তা চাল – “ তো এখন, আমি কি করব?” – সে জিজ্ঞেস করে – “আমি জানি না” – ফের্নান্দা উত্তর দেয়- “এটা তো পুরষদের কাজ”। “ঠিক আছে”- আউরেলিয়ানো সেগুন্দো বলে- “বৃষ্টি থামলে কিছু একটা করা যাবে”। গৃহস্থালী সমস্যার চেয়ে বিশ্বকোষের ব্যাপারে বেশী উৎসাহ দেখা যায় তার, এমনকি যখন দুপুরের খাওয়ার সময় একটুকরো মাংশ ও ভাত নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এখন কোন কিছুই করা সম্ভব নয় সে বলত। “সারাজীবন তো বৃষ্টি হতে পারে না”। আর ভাঁড়ার ঘরের অবস্থা যতই খারাপ হতে থাকে ফের্নান্দার রাগও ততই বাড়তে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না মাঝে মাঝে করা প্রতিবাদ ও ক্ষোভগুলো উপচে অপ্রতিরোধ্য স্রোতের মত বেড়িয়ে পরে, আর সেটা আরম্ভ হয় এক সকালে গিটারের একঘেয়ে সুরের মত। আর দিন যতই গড়াতে থাকে সুর চড়তে থাকে ততই উপরে, প্রতিবারই চড়তে থাকে উঁচু থেকে উচ্চতরে। পর দিন সকালের নাস্তা খাওয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বিলাপ আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর কানে কোন অনুশোচনার উদ্রেগ করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বৃষ্টির শব্দের চেয়েও উচ্চতর ও আরো দ্রুত গতির শব্দ ওর কানে তালা লাগায়। আসলে ওটা ছিল সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ানো ফের্নান্দার অনুযোগ; বলে চলছে, যাকে গড়ে তোলা হয়েছিল শিক্ষা দিয়ে রানী হওয়ার জন্য, এখন তাকে কাজ করতে হচ্ছে অলস মূর্তি-পুজারী ও লম্পট স্বামীর জন্য, যে উপরের দিকে মুখ করে থাকে যেন আকাশ থেকে রুটি পরবে বলে, অন্যদিকে সে নিজের বৃক্ককে ফালি ফালি করে খেটে মরছে, ঈশ্বরের দেয়া সকাল থেকে শোবার সময় যেখানে এত কিছু করার আছে, এত কষ্ট সহ্য করার ও মেরামত করার, যে বিছানায় সে যেত চোখ ভরা কাঁচের গুড়ো ও ধুলো নিয়ে, তা সত্বেও যেখানে কেউ কখনই সুপ্রভাত বলেনি, জিজ্ঞেস করেনি রাতটা কেমন কাটিয়েছিস ফের্নান্দা, এমনকি সৌজন্য করেও কখনও শুধায়নি কেউ, কেন তাকে এত ফ্যাকাশে লাগছে, কেন বেগুনী রংয়ের চোখের নীচের ফোলা নিয়ে জেগেছে সে, যদিও সে কখনই সে এগুলোর আশা করেনি সেই পরিবার থেকে যে পরিবারের লোকজন ওকে দেখেছে এক আপদ হিসেবে, উনুন থেকে গরম জিনিষ নামানোর ন্যাকড়ার মত, দেয়ালে আঁকা পুতুল হিসেবে,আনাচে-কানাচে যারা সবসময়ই তার নামে কুৎসা রটিয়েছে ভন্ড বলে, শব বলে, গিরগিটি বলে, আর এমনকি আমারান্তা পর্যন্ত ‘ঈশ্বর তাকে শান্তিতে রাখুন’ প্রকাশ্যে বলেছে যে, সে হল সেই মানুষ যারা পায়ুপথকে পায়খানা বলে ভুল করে, ঈশ্বর এসব কথা ক্ষমা করুন, আর সে সবকিছু সহ্য করে গেছে বিন্দুমাত্র রা না করে, শুধু মাত্র পবিত্র পিতার ইচ্ছায়, কিন্তু সহ্য করতে পারেনি পাজি হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো যখন বলল সংসারে সর্বনাশ নেমে এসেছে ঐদিনই, যেদিন সে কাচাকা-র (উচু ভূমি থেকে আসা মহিলা, বিশেষত বোগোতা অঞ্চলের লোকদেরকে কাচাকো বা কাচাকা বলা হয়) জন্য বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিল, ভাবো একবার, এক কাচাকা, যে সব সময় কর্তৃত্ব ফলায়, হায় ঈশ্বর, এক কাচাকা বিচ্ছিরি কথা বলা মায়ের মেয়ে, সরকার যে সমস্ত কাচাকোদের শ্রমিকদেরকে খুন করতে পাঠিয়েছিল, তাদের মত একই স্বভাবের, আর এগুলো বলে সে এমন একজনকে বুঝিয়েছে যে নাকি আলবার ডিউকের ধর্মকন্যা, বুঝিয়েছিল এমন এক গৌরবময় বংশের মেয়েকে যে নাকি প্রেসিডেন্টের বউদেরও পিলে চমকে দিয়েছিল, তার মত এমন খাঁটি রক্তের অভিজাত রমনীর অধিকার ছিল এগারোটা উপদ্বীপের পরিবারের উপাধি ব্যবহার করে স্বাক্ষর করার, আর যে নাকি এই জারজ সন্তান ভরা শহরে একমাত্র জীবিত, ষোল পিসের রুপোর ছুড়ি কাঁটা চামচের সামনে বসে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়না, যাতে নাকি তার লম্পট স্বামী হেসে মরতে মরতে বলে এত চামচ, এত কাঁটাচাম্‌চ এত ছুরি ও ছোট চামচ কোন মানব সন্তানের জন্য নয়, বরঞ্চ শত পা বিশিষ্ট বিছের জন্য, আর চোখ বন্ধ অবস্থায় একমাত্র যে বলতে পারে কখন সাদা মদ পরিবেশন করা হয়েছে কোন পাশে ও কোন গ্লাসে আর কখনই বা পরিবেশন করা হয়েছে লাল মদ, কোন পাশে ও কোন গ্লাসে নয়, আমারান্তা ঈশ্বর তাকে শান্তিতে রাখুন-র মত নয়, যে বিশ্বেস করত সাদা মদ পরিবেশন করা হয় দিনে ও লালমদ রাতে, আর সারা উপকূলে একমাত্র যে মানুষ মলত্যাগ করে সোনার মলত্যাগপাত্রে, যাতে করে বদমেজাজী কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, ঈশ্বর তাকে শান্তিতে রাখুন, যে নাকি জিজ্ঞেস করার সাহস পায় কোথা থেকে সে এই অধিকার পেয়েছে, সে মলত্যাগ করে কিনা, চিন্তা করে দেখ, এই ধরনের শব্দ দিয়ে, যাতে করে তার নিজের মেয়ে রেনাতা, যে কিনা হঠাৎ করেই একবার শোবার ঘড়ে আগুয়াস মাইয়রেস(শাব্দিক অর্থ বড় পানি, আসল অর্থ হাগু) দেখে ফেলায় সত্যি মলত্যাগপাত্র সোনা দিয়ে তৈরী কিনা, অনেক গৌরব ধারন করে কিনা, কিন্তু যা নাকি ওর ভিতরে ছিল তা হচ্ছে খাঁটি গু, বাস্তব গু তাও আবার কাচাকার গু হওয়ায় তা হচ্ছে অন্য সকলের থেকে খারাপ গু, চিন্তা করে দেখ নিজের মেয়ে, ফলে পরিবারের আর কাউকে নিয়েই উচ্চাশা করেনি সে, কিন্তু তাহলেও অন্তত স্বামী থেকে আর একটু ছাড় পাবার প্রতীক্ষা করার অধিকার তার ছিল, শত হলেও সে তার পবিত্র জীবনসঙ্গী, তার কর্তৃত্ব, তার আইনানুগ ক্ষতি করার ক্ষমতাধারী, যে নিজের স্বাধীন ইচ্ছেয় তাকে বাপের বাড়ি থেকে বের করার মত গুরু দায়িত্ব নিয়েছিল, যে বাড়িতে সে কিছুরই অভাববোধ করেনি বা যেখানে কোন কষ্ট ভোগই তার করতে হয়নি, যেখানে অন্তেষ্টিক্রিয়ার জন্য তালপাতার মালা গাথঁতো সে শুধুমাত্র অবসর কাটানোর জন্য, যেখানে তার ধর্মপিতা নিজের সই করা ও মোমের উপর আংটির সীলসহ চিঠিতে জানায় যে তার ধর্মকন্যা হাতদুটো ক্ল্যাভিকোর্ডিও বাজানো ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন কাজের জন্য তৈরী হয়নি, অথচ তারপরও গাধা স্বামী তাকে বাড়ি থেকে বের করেছিল সমস্ত বাধা ও সতর্কবানী উপেক্ষা করে, আর এনে এমন এক নরকের কড়াইতে ফেলেছিল যেখানে গরমের চোটে সে নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারে না, আর তার পেন্টাকষ্টের উপবাস শেষ হবার আগেই প্রব্রজনকারী তোরঙ্গ ও অকেজো অ্যাকোর্ডিয়ান নিয়ে ব্যাভিচারে মত্ত হতে চলে গিয়েছিল এমন একজনের সঙ্গে যার শুধু পাছা দেখলেই চলে ইয়ে, মানে যেমনটি লোকে বলে, যার ঘোটকীর মত পাছাটা দোলাতে দেখলেই বোঝা যেত যে সে কি ধরনের, আর সে নিজে ঠিক তার উল্টো, যে নাকি এক সত্যিকারের ভদ্রমহিলা, সে প্রাসাদেই হোক বা শুয়োরের খোয়াড়েই হোক, খাবার টেবিলেই হোক অথবা সঙ্গমের বিছানাতেই হোক সে হোল এক নারী, ঈশ্বরভীরু, আইননিষ্ঠ।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — জুন ৩০, ২০১৬ @ ১২:৪৭ অপরাহ্ন

      Sometimes I fail to pay proper attention to my loving matters and well-wishing writers. I like Garcia’s ‘One hundred Years of Solitude’ more than I like Homer’s ‘Iliad’. But, my contact with literature sometimes suffers from failure like Coleridge’s “painted ship in a painted sea”. Mr. Anis has offered me the rare opportunity to read ‘Solitude’ in Bengali. It is his credit that he has presented this twentieth century prose epic in life-like Bengali. I have asked my fellow students to preserve the translation serially for their own reading. Sorry, Anis that I have failed to communicate you personally. Shall look forward to see ou if you allow me an opportunity.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com