অসাধারণ রেখায় গাথা সাধারণের মুখ

রুবাইয়াৎ আহমেদ | ৭ জুন ২০১৬ ১১:১৬ পূর্বাহ্ন

masuk.jpgআমার দাদি বুড়ো হতে হতে কুঁজো হয়ে গিয়েছিলেন। সোজা হয়ে হাঁটতে পারতেন না। তার মুখে-শরীরে ছিল অগণিত ভাঁজ। আমাদের বাসা আর নানার বাড়ি ছিল নদীর এপার-ওপার। দাদি আমার মাঝে মাঝেই নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে চলে যেতেন নানাবাড়ি। সেখানে নানির সঙ্গে ছিল তার সখ্য। একদিন উলের সূতা দিয়ে দাদির পা বেঁধে দিয়েছিলাম যেন আর আমাদের বাড়ি থেকে না যান কোথাও। দাদির পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছিল, বলেছিলেন তিনি-

“বান’রে দাদু বান”।

আজো আমার কানে তার উচ্চারিত শব্দ বেজে ওঠে। মনে পড়ে, আমার কাণ্ডকীর্তি দেখে তার মুখখানায় ব্যথার বদলে স্নেহের হাসি উথলে উঠেছিল। সেই মুখে ছিল শত ভাঁজ, সুবিন্যস্ত রেখার চলনে গড়ে ওঠা সেই মুখ আজ আমার মাঝে পৌরাণিক অভিজ্ঞতার ছায়া হয়ে দোলে। সেই অত ছোটকালে বুঝে উঠতে পারিনি দাদির অবয়বটুকু পৃথক হয়ে যায় কেন? শুধুমাত্র রক্তসম্পর্কীয় বলে? নাকি অশেষ স্নেহের ভাণ্ডার তিনি সেকারণেই? না, মুখের ভাঁজগুলো তাকে ওই বয়সে বিশেষ সৌন্দর্য দান করেছিল। আত্মীয়তা, স্নেহ ইত্যকার বিষয়ের সঙ্গে বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত সেই সৌন্দর্যও নিশ্চিতভাবেই টেনেছিল আমাকে। সেই সৌন্দর্য মুখের উপর লেপ্টে থাকা রেখার। রেখার শক্তি অথবা বিভ্রান্তি আমাকে মার খাইয়েছিল গৃহশিক্ষকের কাছে। মানুষ আঁকতে গিয়ে পুরুষাঙ্গ জুড়ে দিয়ে শিক্ষকের রোষানলে পড়েছিলাম। নিশ্চয় তার মনে আমার গোল্লায় যাওয়ার সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে থাকবে। রেখা নিয়ে এসবই আমার শৈশবের স্মৃতি। মাঝে মাঝে উঁকি দেয় মনের গহ্বরে। আজ বুঝি, রেখা চিত্রকলার প্রাণ। রেখার বিন্যাসেই চিত্র পায় প্রাণ আর তার বিচিত্র চলনে সেটি হয়ে ওঠে আরো বিশিষ্ট। রেখার পরতে পরতে গুপ্ত থাকে ইতিহাস।

border=0একজন শিল্পীর কথা বলি। শুধু রেখা আর সামান্য রঙ দিয়েই মাত করে দিয়েছেন। এঁকেছেন অসংখ্য মানুষের অবয়ব। ফটোগ্রাফ নয় অথচ সেইসব অবয়ব চিনে নিতে বেগ পেতে হয় না কারো এক মুহূর্তের জন্যও। তাতেই বোঝা যায়, কতটুকু নিখুঁত তিনি এই মাধ্যমটিতে। এ কথা সত্য শুধু পরিচিত মানুষের ক্ষেত্রে। কিন্তু যারা পরিচিত নন, যারা বিশিষ্ট হয়ে ওঠেননি, যাদের নুন আনতে ফুরায় পান্তা, যাদের শ্রমে-ঘামে অর্জিত হয় আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য তাদের মুখ কতটুকু নিখুঁত এঁকেছেন তিনি? আর কেনই বা সেখানে কোনো রঙের ব্যবহার নাই, শুধু পেন্সিলে আঁকা হয় তাদের ভাঙাচোরা চেহারা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আরও পরে। তার আগে পরিচিত হই এই শিল্পীর সঙ্গে। তিনি মাসুক হেলাল। রাজধানী ঢাকায় বিচিত্র পেশার মানুষের বাস। এই নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, প্রয়োজনীয় তারা, অথচ প্রাপ্য মর্যাদাবঞ্চিত। মাসুক হেলাল এই বিচিত্র মানুষ আর তাদের পেশাকেই তার বিষয়ে পরিণত করেছেন। এঁকেছেন তাদের মুখ পরম মমতায়, লিখেছেন তাদের কর্মের কথা অল্প শব্দে অথচ বড় যত্ন নিয়ে। আর সেসবই মলাটবন্দি করেছেন মুখ ও মুখোশ শীর্ষনামের একটি গ্রন্থে। উপশিরোনামে লিখেছেন ‘বাছাই’। গুণে দেখি সেখানে স্থান পেয়েছে বিচিত্র পেশার ৬৭ জন মানুষের মুখচিত্র। কিন্তু ‘বাছাই’ কেন? তার উত্তর পেয়েছি শিল্পীর নিজের ভাষ্যে-

“প্রথম আলো’তে ‘ঢাকায় থাকি’র পাতায় ‘মুখ ও মুখোশ’ লিখেছি ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত।”

অর্থাৎ অর্ধযুগ ধরেই তিনি নিয়মিতভাবে এঁকেছেন অসংখ্য মানুষের মুখ রেখার বিন্যাসে আর তাদের কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন পরম মমতায় শব্দের কারুকাজে। সেখান থেকেই বাছাই করে গ্রন্থে মেলে ধরেছেন ৬৭ জনের গল্প।

কিন্তু এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে আঁকার এতো এতো বিষয় থাকতে শুধুমাত্র মানুষের অবয়ব কেন? কেন নয় অন্যকিছু? মাসুক বলেন-

“মানুষের মুখ আমার আঁকার প্রিয় বিষয়। ইন্টারেস্টিং মুখ পেলেই আঁকতে চাই, সেই লোকের সাথে কথা বলতে চাই।”

border=0মানুষ ছাড়া অন্যকোনো প্রাণী সৃজনশীল নয়। তাদের সৃজন তাদের জীবনযাপনের অংশ, ফলে তা অবধারিত এবং স্বাভাবিক। বাড়তি ব্যঞ্জনা তাতে নাই। কিন্তু মানুষের শুধু বেঁচে থাকলেই পোষায় না। তার যেন আরো কীসব, কত কী যেন লাগে, তার শিল্প লাগে, সৌন্দর্য লাগে, নান্দনিকতার প্রকাশ লাগে। শিল্পী একারণেই প্রকাশোন্মুখ। আর পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বিচিত্রতর প্রাণী আর একটিও রয়েছে কি? সব প্রাণীই প্রায় একই গড়ন-গঠন আর চেহারা নিয়ে বেড়ে ওঠে। শুধু মানুষের মাঝে রয়ে গেছে শতকোটি বৈচিত্র্য। একজনের সঙ্গে অন্যজনার নাই কোনো মিল, যেমন মুখে-শরীরে-গঠনে ঠিক তেমনি চিন্তায়-চেতনায়-বিবেচনায়। মানুষ তাই একই জাতিগোষ্ঠীর হয়েও ব্যক্তিপ্রতি পরিপূর্ণরূপে পৃথক। আর এই পৃথকত্বকেই নিজের বিষয়ে পরিণত করেছেন বৈচিত্র্যপিয়াসী শিল্পী মাসুক হেলাল।

মাসুকের আঁকা নিয়ে নানাজনে নানান মন্তব্য করেছেন। তার গ্রন্থে সেসব স্থানও পেয়েছে। আর তাতে করে তার আঁকার মুন্সিয়ানা সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ ধারণা পাওয়া সম্ভব। যেমন, প্রখ্যাত প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ এই গ্রন্থের ফ্ল্যাপে লিখেছেন:

“মাসুক হেলাল চিত্রী-লেখক। তাঁর ড্রয়িং ও লেখার বই মুখ ও মুখোশ। ড্রয়িং বলতে কিছু মানুষের মুখ। মাসুক হেলাল পথ-ঘাটের কিছু মানুষকে দেখেছেন, এঁকেছেন এবং লিখেছেন। পোর্ট্রেটের বাস্তব মডেলদের ছোট সুখ, ছোট দুঃখ, বড় সুখ, বড় দুঃখের কথা লিখেছেন বড় মমতায়, এঁকেছেন বড় মমতায়। আঁকায়-লেখায় সেই রূপকে ধরেছেন, যে রূপ কখনোই দেখা হয়ে উঠে না।”

কিংবা ভূমিকা অংশে চারুকলার শিক্ষক এবং প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন নবী বলেন:

border=0“পথে-ঘাটে দেখা মানুষদের কাছাকাছি যাওয়া, তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার বৃত্তান্ত শোনা এবং লেখার মতন বিভিন্ন দিককে লেখাতে উপস্থাপন একটি দুরূহ কাজ বলেই আমার মনে হয়। মাসুক এসবকে সফলভাবে উপস্থাপন করেছে তার শিল্পীসুলভ অনুভূতির মিশ্রণ ঘটিয়ে। ছোট ছোট উপাখ্যান কিন্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী। প্রকাশের ধরনটি তার একান্তই নিজস্ব। বোঝা যায়, পুরো ব্যাপারটাই তার ইমোশনাল ভাবনা থেকে উৎসারিত। রিপোর্টের মতো নয়।”

মাসুকের গুণমুগ্ধ জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণও। তিনি উচ্ছ্বাস ভ’রে মন্তব্য করেন:

“তাঁর পোর্ট্রট শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, অঙ্কনশৈলীর বিচারেও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর এবং উন্নত মানসম্পন্ন।”

এই মুগ্ধতা প্রকাশ থেকে দূরে সরে থাকেননি ক্যামেরার শিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠা নাসির আলী মামুনও। তিনি আরো একধাপ এগিয়ে ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেন:

“মাসুক হেলালের হাতে অঙ্কিত মানুষের মুখচ্ছবিগুলো সার্থক উপন্যাসের চেয়ে দীর্ঘতম ও স্থায়ী, চিরদিনের জন্য চিহ্ন রেখে যায়।”

border=0এসব বয়ানের প্রতিটিই অর্থবহ এবং সত্যের নিরিখে গ্রহণযোগ্য। দৈবচয়ন ভিত্তিতে মুখ ও মুখোশর পৃষ্ঠা উল্টাতেই পেয়ে যাই ‘পথের মানুষ রেবেকা’ শীর্ষক একটি ছোট্ট কাহিনি আর তার সঙ্গে একটি মুখাবয়বের ড্রয়িং। কাহিনি পরম্পরায় জানতে পারি, রেবেকা বেগম নামের ওই নারীর বয়স ৮০, তেজগাঁও রেলস্টেশন আর কাওরান বাজারে তাকে দেখা যায়। নানাজনের সহায়তাই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।

border=0নাকে নাকফুল আর কানে দুল পরিহিত ভাঁজ খাওয়া মুখ, মাথায় কোনরকমে আঁচল আটকে থাকা রেবেকার চিত্রদর্শনে বাংলার পোড়-খাওয়া চিরকালীন নারীর মূর্তিই যেন বা জ্বলজ্বল করে ওঠে আমাদের মানসপটে। পাঠক-দর্শকের মনে যদি এই চিত্রটুকু গুঁজে দিতে পারেন তিনি তবে তার আঁকার সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই তো অপরাধ। হরেক রঙেই আঁকতে পারতেন তিনি। শুরুতেই এই প্রশ্ন রেখেছিলাম। কিন্তু তাতে করে এই কষ্টক্লিষ্ট মানুষগুলোর জীবনের সত্য থেকে যেতো অন্তরালে। রঙের বৈভবে যাপিত জীবনের সংগ্রামটুকু মার খেয়ে যেতো হয়তো বা। যে মানুষের জীবন বর্ণিল নয় তাকে কেনই বা রঙের ছলনায় ধরতে চাওয়া। এ কারণেই সর্বগ্রাসী কালো বর্ণেই চিত্রিত হয়েছে কতিপয় অনুল্লেখ্য মানুষের মুখাবয়ব, সঙ্গে তাদের সংগ্রামমুখরতার ছোট্ট বয়ান।

চিত্রকলায় পড়তে আসা একজন শিক্ষার্থী এই গ্রন্থ থেকেই নিতে পারেন ভবিষ্যৎ চিন্তা অথবা পৃথক কিছু করার প্রেরণা।

১৯৬৪ সালে কুমিল্লার বরুড়ার গোহালিয়ায় জন্মগ্রহণকারী মাসুক হেলাল পড়েছেন চারুকলায়। ২০১৬ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পারিজাত প্রকাশনী থেকে উন্নতমানের কাগজ ও ছাপায় প্রকাশিত তার এই চতুর্থ বইটির মূল্য ৫০০ টাকা। আর প্রচ্ছদ করেছেন অতুল অভিনেতা ও শিল্পী আফজাল হোসেন।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত রুবাইয়াৎ আহমেদের আরও লেখা:
গ্লোবের হ্যামলেটে মুগ্ধতা

শিল্প হল মূলে অভেদ পারদের বল

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Minhaj uddin — জুন ৯, ২০১৬ @ ৬:১১ অপরাহ্ন

      মাসুক হেলালের হাতে অঙ্কিত মানুষের মুখচ্ছবিগুলো সার্থক উপন্যাসের চেয়ে দীর্ঘতম ও স্থায়ী, চিরদিনের জন্য চিহ্ন রেখে যায়। রেখা, এককভাবে কিছু না হলেও জীবনের প্রতিটা ধাপে এর অবদান অনেক। রেখা সরল হলে ভালো, না হলে ঝামেলা আছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাকিয়া সুলতানা — জুন ১২, ২০১৬ @ ৯:২১ পূর্বাহ্ন

      মাসুক হেলালের ছবি এতটাই জীবন্ত যে পত্রিকায় কোন প্রতিকৃতি দেখলে মনের অজান্তে তারই নাম ভেসে ওঠে। ভালো লেগেছে তার এ উপন্যাসোপম বইয়ের গল্প। ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com