সীমানা-ভাঙা চিত্রশিল্পী মারিসলের প্রয়াণ

জাকিয়া সুলতানা | ২১ মে ২০১৬ ১১:৪৮ অপরাহ্ন

marisol.jpg
নিজের শিল্পকর্মের সামনে মারিসল
চিত্রকলার জগতে শুধু মারিসল নামেই তিনি পরিচিত, পুরো নাম মারিসল এস্কোবের। পিতৃভূমি বেনেসুয়েলা হলেও তিনি জন্মেছিলেন প্যারিসে। শিল্পী হিসেবে আমেরিকায় পপ, অপ আন্দোলনের সময় তার উত্থান হলেও ছিলেন শৈল্পিক স্বাতন্ত্র্যের কারণে উভয় গোষ্ঠী থেকে অনেকটাই আলাদা। ১৯৬৫ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস মারিসলের এই স্বাতন্ত্র্যকে “‘Not Pop, Not Op, It’s Marisol!’ শিরোনামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে স্বীকৃতি জানাতে ভুল করেনি। জীবদ্দশায় তুমুল জনপ্রিয় এই শিল্পীর জন্মদিনটি ছিল তার মৃত্যুরই পরের মাসে, অর্থাৎ ২২ মে। প্রতিভাবান এই শিল্পীর মৃত্যুর পরপরই ২ মে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ উইলিয়াম গ্রাইমস তাকে নিয়ে যে নিবন্ধটি লেখেন, জাকিয়া সুলতানার অনুবাদে সেটি এখানে প্রকাশ করা হলো। বি. স.

marisol-1.jpg
মারিসল ১৯৬৪ সালে তাঁর নিজস্ব ভাস্কর্য “কেনেডি পরিবার”-এর সাথে
মারিসল ছিলেন একজন বেনেসুয়েলিয়-মার্কিন চিত্রশিল্পী যিনি পপ আর্ট ও ফোক-আর্টকে এমনভাবে মিশিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর নিজস্ব রহস্যময়তা এবং সৌম্যচেতনার কারণে তাঁকে ১৯৬০-এর দশকের সবচেয়ে প্রত্যয়ী শিল্পীদের একজন করে তুলেছিল।

তাঁর পারিবারিক নাম- মারিয়া সোল এস্কোবের হলেও ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে নিউ ইয়র্কে প্রথম প্রদশর্নীর সময়েই নিজেকে দ্বিখণ্ডিত পরিচয় থেকে মুক্তি দিতে তাঁর পারিবারিক উপাধি পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র ‘মারিসল’ নাম গ্রহণ করেন এবং উদীয়মান পপ আর্টের অভিধায় এক নতুন স্বতন্ত্র উপাদানের সূচনা করেন। প্রাক-বেনেসুয়েলিয় আর্ট এবং রবার্ট রশেনবার্গের সমাবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি অঙ্কন, ফেব্রিক্স, হাতের কাছে যা পাওয়া সব উপাদান ব্যবহার করে বক্র কাঠের প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেছিলেন।

১৯৬২ সালে স্ট্যাবল গ্যালারিতে কাঠে আঁকা তাঁর “ দ্য ফ্যামিলি” প্রদর্শিত হয়, যেখানে মায়ের কোলে একজনসহ আরও তিনজন পাশে দাঁড়ানো সন্তান, যারা সকলেই যেন দৃঢ়ভাবে একদৃষ্টিতে দর্শকের দিকে তাঁকিয়ে আছে। তাদের পায়ে সত্যিকারের জুতা এবং স্নিকারস্ ছিল। এটা ছিল ১৯৬০ সালে শিল্পের বাজারে মার খেয়ে যাওয়া আদিবাসী টোটেমের মতো পারিবারিক চিত্রকর্ম “দ্য কেনেডি ফ্যামেলি”-এর প্রতিরূপ।

সে সময়ে চিত্রসমালোচকেরা মারিসল একজন পপ আর্টিস্ট কি না- এই বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পরেছিলেন। পপ আর্টের সমালোচক লুসি রিপার্ড বলেছিলেন,
-না, তাঁর কাজ বরং “অত্যাধুনিক নাটুকে ফোক আর্ট” এবং পপ আর্টের সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। এটা স্পষ্টভাবেই কৌতুকপূর্ণ এবং রাজনৈতিক। জন কানাডাই ১৯৬৭ সালে লিন্ডন বি. জনসন এবং অন্যান্য প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গসহ ব্রিটিশ রাজপরিবারের এক ব্যাঙ্গাত্মক ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছিলেন যে- তিনি “কিছুটা শয়তানের মতোই চতুর এবং যতটা না হিংসুটে হওয়া যায় ঠিক ততটুকুরই পরিচয় দিয়েছেন”। মারিসল জন ওয়েন এবং বব হপস্ এর মতো অনেক খ্যাতিমান ব্যাক্তিদের ছবি এবং ভাস্কর্য করেছিলেন।
marisol-2.jpg
প্লাস্টার ও কাঁচ দিয়ে ১৯৬২ সালে নির্মিত “লাভ’’। কোকাকোলা বোতলের সাথে মারিসলের মুখের নিজের আদল ব্যবহার করা হয়েছে এই শিল্পকর্মে

মারিসলকে প্রায়ই এ্যান্ডি ওয়্যারহোলের সাথে বিভিন্ন পার্টিতে দেখা যেত। ওয়্যারহোলই তাঁকে তার আন্ডারগ্রাউন্ড ফিল্ম “The kiss(১৯৬০)” এবং “13 Most Beautiful Women (১৯৬২)”-এ মারিসলকে কাজ করার সুযোগ করে দিয়ে তাঁর প্রতি সবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়েছিল। পরে অবশ্য তাঁর এই প্রতিদানে মারিসল একটা কাগজের বাক্সে টেবিলের পায়াসহ ওয়্যারহোলের ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন।

মারিসলও ওয়্যারহোলের মতো নিজের প্রতি অভিনিবিষ্ট হয়ে একটি নিজস্ব শিল্পকৌশল আয়ত্ব করেন যেখানে তিনি নিজের শরীরের বিভিন্ন অংশ এবং মুখোচ্ছবি একত্রিত করে কাজ করা শুরু করে যেমন- “দ্য পার্টি” তাঁর এমন একটি শিল্পকর্ম যেখানে ১৫ জন দাঁড়ানো মূর্তি (২ জন ভৃত্যসহ), অঙ্কিত বক্র কাষ্ঠতল, আয়না, প্লাস্টিক, টেলিভিশন সেটের এক সমাবেশ, সেখানে প্রতিটি চরিত্রের মুখাবয়ব তিনি তাঁর নিজস্ব অবয়ব থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্যকে তাঁর কাজে অর্ন্তভুক্ত করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- “Love” (১৯৬২), নিজের মুখোমণ্ডলের একটি ভাস্কর্যের হা-করা মুখ-গহ্বরে কোকাকোলার বোতল পুরে দিয়েছিলেন।

ওয়্যারহোল এবং তার অনুগামী জেফ কুনের মতো মারিসলও প্রবাদধর্মী মতবাদ প্রদানের ক্ষেত্রে কিছুটা নির্লিপ্ত এবং ধোঁয়াটে। ১৯৬৪ সালে টাইমস পত্রিকায় সমালোচক ব্রেইন ও’ দোহার্তেকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি নিজেকে নিয়ে একদমই ভাবি না, যখন প্রায় কিছুই ভাবি না তখনই সব রকমের বিষয়বস্তু নিজেরাই আমার কাছে এসে ধরা দেয়”।

১৯৬৫ সালে গ্রান্স গ্লুক নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে “কিংবদন্তী মারিসল” নামে এক প্রতিবেদন করেছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন- মারিসলের পারিপাট্য, স্প্যানিশ অভিজাত্য এবং জিপসিদের মতো জবরদস্ত টোলপরা মুখোমণ্ডল, মাথাভর্তি কালো ঝলমলে চুল; তাঁর রহস্যময় গাম্ভীর্য এবং আবেশ, কম্পিত কণ্ঠস্বর, নিদ্রাচরের মতো নিঃশব্দ কিন্তু একধরনের মর্মস্পর্শী অভিজাত স্প্যানিশ উচ্চারণ তাঁকে ব্যাক্তিত্বের অনন্যতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

লোকজনের প্রতি আপাতদৃষ্টিতে উদাসীন হওয়ায় এবং আর্ট ক্যারিয়ারের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তাঁর ডিলারদের হতবুদ্ধি করে দিয়ে প্রায়ই নিয়ম করে কয়েক বছরের জন্য বিশ্বের আনাচে-কানাচে ভ্রমণের জন্য বেড়িয়ে গেছেন।

মেম্ফিস ব্রুক মিউজিয়াম অব আর্টের প্রধান কিউরেটর মেরিনা ২০১৪ সালে মারিসলের ওপরে এক ভ্রাম্যমান জরিপ পরিচালনা করেছিলেন, তাঁর মতে -“তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর যাকে ইতিহাসে যথাযথভাবে ঠাঁই দেয়া হয় নাই । ১৯৬০-এর দশকে সংবাদ মাধ্যমে এ্যান্ডি ওয়্যারহোলের চাইতে তাঁর বেশি আনাগোনা ছিল”।

মারিয়া সোল এস্কোবার ১৯৩০ সালের ২২শে মে প্যারিসে এক বেনেসুয়েলিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ছিলেন। মারিসলের বয়স যখন ১১ তখন তাঁর মা হোসেফিনা এর্নান্দেস আত্মহত্যা করেন।
marisol-3.jpg
সিডনি জেনিস গ্যালারিতে ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্যামিলি নামক ভাস্কর্যের পাশে মারিসল ১৯৬৭ সালে।

তিনি প্যারিস এবং কারাকাসে বেড়ে উঠেন। তার পরিবার ১৯৪৬ সালে লস এঞ্জেলস্-এ চলে আসার পর তিনি প্রথমে ওয়েস্টলেক বালিকা বিদ্যালয়ে এবং পরে জেপসন স্কুলে আর্টসে পড়ালেখা শেষ করে প্যারিসের École des Beaux-Arts -এ পড়তে যান কিন্তু একবছর পরেই সেখান থেকে ফিরে এসে নিউ ইয়র্কের স্টুডেন্ট লীগ অব আর্টস-এ কিছু কোর্স সম্পন্ন করেন, এখানেই তাঁর এক শিক্ষক ইয়াসুয়ো কুনিয়োশির সাদাসিধে কিন্তু অলংকারিক শিল্পের ধরন তাঁকে চূড়ান্তভাবে আকৃষ্ট করে ।

১৯৫৭ সালে লিও ক্যাসেলি তাঁকে জ্যাসপার জোন্স এবং রশেনবার্গের সাথে এক গ্রুপ প্রদশর্নীতে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং সেই বছরেই তিনি তাঁর একক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এটা হতে পারতো শিল্প-জগতের খ্যাতির এক ধরনের আশু প্রত্যাবর্তন যদি না তিনি রোম থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে না আসতেন, যেখানে তিনি আগেই দু’বছর ছিলেন।

নিউইয়র্কে তার প্রত্যাবর্তনের পর স্ট্যাবল গ্যালারী এবং সিডনী জেনিস গ্যালারীতে তাঁর প্রদর্শনীসমূহ তাঁকে দ্রুত তারকাখ্যাতি এনে দেয়। মারিসলকে ১৯৬১ সালে মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট-এর “The Art of Assemblage” প্রদর্শনীতে অর্ন্তভুক্ত করা হয় এবং ১৯৬৩ সালে আমেরিকার শো-কেস প্রদর্শনীতে তাঁকে নিজস্ব আলাদা রুমের বরাদ্দ দেওয়া হয়। গ্ল্যামার পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে প্রোফাইল করা হয়। ১৯৬৮ সালে তিনি ভেনিসের দ্বিবার্ষিক চিত্রপ্রদশর্নী এবং পশ্চিম জার্মানীর ‘ডকুমেন্টা ইন ক্যাসেল-এর প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন ।

তারপরে তিনি প্রায় দু’বছরের জন্য বিশ্বভ্রমণে বেড়িয়ে পরেন। যখন তিনি ফিরলেন ততদিনে তাঁর আর্টের পট পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি আরো বেশি অবাস্তবধর্মী, লোকজ-নির্ভর কাজ, মেহগনি কাঠে মৎসখোদাই -এর কাজসহ নিজের আরও একান্ত জগতে, যেমন কাগজে বিভিন্ন আধা-পরাবাস্তব, রগরগে কাল্পনিক দৃশ্যে পরিপূর্ণ “Lick the Tire of My Bicycle” এবং “ I Hate You Creep and Your Fetus” নামক বিভিন্ন শিরোনামে কাজ করতে আরম্ভ করলেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংশোধনবাদী সমালোচকগণ এবং সংকলকগণ তাঁর কাজসমূহ পুনঃআবিষ্কার করেছেন। ২০০১ সালে the Neuberger Museum of Art ,N.Y-এ তাঁর কাজসমূহের বিষয়বস্তু ছিলেন নিজেই, এবং ২০১০ সালে তার ব্রুকলিন জাদুঘরে “সম্মোহনী প্রলয়: নারী পপ আর্টিস্ট” শিরোনামে এবং ভিয়েনার কুন্সথালে “জেগে ওঠো: নারী পপ আর্ট” শিরোনামে দুটি প্রদর্শনী হয়। “মারিসল: ভাস্কর্য এবং কাগজের কাজসমূহ”- শিরোনামের কাজটি ম্যানহাটনের এল মিউজিও দ্য ব্যারিও থেকে ঘুরে আসে।

তাৎক্ষণিক কোনো উত্তরসূরি না রেখে-যাওয়া মারিসল নতুন করে মনোযোগ পাওয়ার ব্যাপারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বা দেননি। কিন্তু সমালোচক এবং জনগণ তাঁর কাজ কী দৃষ্টিতে দেখছে সে বিষয়ে ১৯৬৪ সালে প্রশ্ন করা হলে তিনি হয়তো কিছুটা ধাঁধায় পরে যান। কিন্তু তার দ্বিধাহীন উত্তর ছিল, “কে কি ভাবলো তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না”।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত জাকিয়া সুলতানার আরও লেখা:
মাইকেল ম্যাকক্লুরের কাব্য: এক বিজ্ঞানীর দৃষ্টি

আন্তর্জাতিক পপ আর্ট: ওয়্যারহোল ও লিচটেন্সটাইনকে পেরিয়ে

আই হেট দ্য ইন্টারনেট

সোনার মানুষের খোঁজে

হোর্হে লুইস বোর্হেস: লেখক যখন চিত্রশিল্পী

পুশকিন ও রবীন্দ্রনাথের সাথে বেড়ে ওঠা

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com