গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ৩ মে ২০১৬ ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩৫
যে সমস্ত ঘটনা মাকন্দোর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দেবে সেগুলো শুরু হবার সময়েই বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয় মেমে বুয়েন্দিয়ার ছেলেকে। সামাজিক পরিস্থিতি তখন ছিল এতই অনিশ্চিত যে কারুরই মানসিক অবস্থা ছিল না ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কেলেংকারী সৃষ্টির, আর ফলে ফের্নান্দা বাচ্চাটাকে অস্তিত্বহীনভাবে লুকিয়ে রাখার অনুকূল পরিস্থিতি পেয়ে যায়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে ফের্নান্দার পক্ষে শিশুটিকে প্রত্যাখ্যান করার কোনই উপায় থাকে না, আর ওকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। বাকি জীবনের জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওকে সহ্য করতেও বাধ্য হয় সে, কারণ তার গোপন সংকল্প, বাচ্চাটাকে গোছলখানায় ডুবিয়ে মারার ইচ্ছে পূরণের শেষ মুহূর্তে তার সাহসের অভাব হয়ে পরে। বাচ্চাটাকে তালাবদ্ধ করে সে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পুরোনো কামারশালায়, সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে বাচ্চাটাকে এক ঝুড়িতে ভাসমান অবস্থায় পেয়েছে সে। উরসুলা ছেলেটার জন্মবৃত্তান্ত না জেনেই মারা যাবে। একবার ফের্নান্দা ছেলেটাকে খাবার দেবার সময় ছোট্ট আমারান্তা উরসুলা কামারশালায় ঢুকে পরে আর সেও ভাসমান ঝুড়ির গল্প বিশ্বাস করে। মেমের ব্যাপারটাকে এরকম অযৌক্তিক করুণ পরিণতি ঘটানোর কারণে চিরদিনের জন্য দূরত্ব রচনা করা আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওর কথা জানতেই পারে না বাড়িতে নেবার তিন বছর পর্যন্ত, যেদিন একবার ফের্নান্দার অসর্তকতায় বন্দীদশা থেকে পালিয়ে মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য ও উঁকি দেয় বারান্দায়, নগ্ন অবস্থায়, মাথায় জটধরা চুল ও বিশালাকারের তিতিরের ঝুটির মত পুরুষাঙ্গ নিয়ে, যেন সে কোন মানবশিশু নয়, বরং বিশ্বকোষের বর্ণিত নরখাদক। এই ধরনের হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিশ্রী ব্যাপারটা আর তার অমোচনীয় পরিণতির কথা ফের্নান্দার হিসেবের মধ্যে ছিল না। যে লজ্জাটাকে চিরকালের জন্য নির্বাসন দিয়েছে বলে ভেবেছিল সে, শিশুটি ছিল সেই লজ্জারই প্রত্যাবর্তন স্বরূপ। ভগ্ন মেরুদন্ডসহ, মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়াকে বাড়ী থেকে সরিয়ে নেয়া মাত্রই ফের্নান্দা এই লজ্জাজনক ঘটনার সমস্থ চিহ্ন মুছে ফেলার এক সুনিপুন পরিকল্পনা আঁটে। স্বামীর সঙ্গে কোন পরামর্শ না করেই পরের দিন বাক্স পেটরা গোছায়, ওগুলোর ভেতর মেয়ের জন্য দরকার হবে বলে তিন প্রস্থ জামাকাপড় ভরে আর ট্রেন আসার আধঘন্টা আগে মেয়ের শোবার ঘরে যায় ওকে নিয়ে আসতে। “চল রেনাতা”-বলে ওকে। মেমেকে বিস্তারিত কিছুই জানায় না। ওদিকে মেমেও ওরকম কিছুর অপেক্ষা করেনি বা চায়নি। কোথায় যে যাচ্ছে তা যে শুধুমাত্র সে অবজ্ঞা করে তাই নয়, এমনকি ওকে বধ্যভুমিতে নিয়ে গেলেও সেটা ওর জন্য ছিল একই কথা। পিছনে উঠানে গুলির শব্দ ও একই সাথে মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়ার যন্ত্রনায় আর্তনাদ শোনার সময় থেকেই ফের্নান্দার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে সে, আর জীবনে কোন দিন বলবেও না। মা যখন তাকে শোবার ঘর থেকে বেরুতে বলে সে চুলও বাধে না, মুখও ধোয় না, আর ট্রেনে চড়ে নিদ্রাচ্ছন্নের মত, এমনকি ওর সহচরী হলুদ প্রজাপতি গুলোকেও লক্ষ না করে। ওর এই পাথরসম নীরবতার কারণ ইচ্ছাকৃত, নাকি করুণ সেই ঘটনার আঘাতের ফলেই সে নির্বাক হয়েছে, তা ফের্নান্দা কখনই জানেনি বা জানার কোন চেষ্টাও করেনি। প্রাচীন মনমুগ্ধকর জায়গাটা পাড় হবার সময়ই প্রথমবারের মত মেমে লক্ষ করে তাদের এই ভ্রমনের ব্যাপারটা। লাইনের দুপাশ ধরে ছায়াঘন অন্তহীন কলা বাগানগুলো সে লক্ষও করে না, দেখে না গ্রিঙ্গদের সাদা বাড়ী বা ধুলো ও রৌদ্র তাপে দগ্ধ বাগানগুলো, চোখে পরে না খাটো প্যান্ট পরিহিত রমনীদের, যারা ডোরাকাটা শার্টপরে চাতালগুলোয় তাস খেলছিল। সে দেখে না ধুলোময় পথ ধরে চলা কলার ছড়া বোঝাই বলদটানা গাড়ীগুলো। তার চোখে পরে না নদীর স্বচ্ছ জলে “সাবালো” মাছের মত লাফিয়ে পরা কুমারী মেয়েদের, যাদের সুডৌল স্তন ট্রেনের যাত্রীদের মন তিক্ততায় ভরিয়ে দিচ্ছিল, চোখে পরে না মজুরদের রংবেরংয়ের জীর্ণ কুটির, যেখানে মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়ার হলুদ প্রজাপতিগুলো ডানা ঝাপটাচ্ছিল, পরে না চোখে কুটিরগুলোর দরজায় যার যার মলত্যাগ পাত্রে বসা শীর্ণ সবুজ রংয়ের শিশুরা যেখানে গর্ভবতীরা গাল দিচ্ছিল চলন্ত্ ট্রেন দেখে। যখন সে পাঠস্থান থেকে ফিরত তখন ঐ চলমান দৃশ্য ছিল মেমের কাছে উৎসবের মত, যা কিনা আজ তার হৃদয়ে কোন অনুরনণ জাগায় না। সে জানালা দিয়ে তাকায় না, এমনকি দেখেও না কখন শেষ হয়েছে প্লান্টেশনের গায়ে জ্বালা ধরানো স্যাাতস্যাতে ভাব আর ট্রেন পার হয় আফিম চাষের বিস্তীর্ণ প্রান্ত যেখানে তখনও পড়ে ছিল অঙ্গারে পরিণত হওয়াা স্পেনের জাহাজটি, যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই একই স্ফটিক শুদ্ধ বাতাস, একই ফেনাময় নোংরা সমুদ্র আর যেখানে প্রায় এক শত বর্ষ আগে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সমস্ত সপ্নগুলো পর্যবষিত হয় ধুলোয়। বিকেল পাঁচটায় জলাভুমির শেষ ষ্টেশনে এসে মেমে নেমে পরে, কারণ নামে ফের্নান্দা । হাঁপানীতে ভোগা এক ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে, যেটা দেখতে ছিল বিশাল এক বাদুড়ের মত, পাড়ি দেয় জনশূণ্য শহর, যেটার রাস্তা ছিল অন্তহীন শোরার কারণে ফাটল ধরা, যেখানে পিয়ানো অনুশীলনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল যেমনটি ফের্নান্দা শুনতে পেত বয়ঃসন্ধিকালে সিয়েস্তার সময়। পরে ওরা চড়ে বসে নদীতে চলা এক জাহাজে যেটার কাঠের চাকা যুদ্ধের শব্দ তুলত, যেটার মরিচা ধরা লোহার পাতগুলো আওয়াজ করছিল এক চুল্লী মুখের মত। কেবিনের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মেমে দিনে দুইবার ফের্নান্দা ওর বিছানার পাশে খাবার রাখত আর দিনে দুইবার অস্পর্শ অবস্থায় নিয়ে যেত ওগুলো। মেমে যে না খেয়ে মরতে চায় সে জন্য নয় বরঞ্চ খাবারের গন্ধ তার কাছে অসহ্য লাগছিল, তার পাকস্থলী এমনকি পানিও সহ্য না করতে পেরে উগরে দিচ্ছিল। এমনকি সে নিজেও জানতো না যে তার উর্বরা শক্তি নির্বোধ বানিয়েছে সরষের তাপগুলোকে, যেমনটি ফের্নান্দাও জানতো না প্রায় এক বছর যাবৎ যতক্ষন পর্যন্ত না বাচ্চাটাকে তার কাছে নিয়ে আসা হয়েছিল। দমবন্ধ করা কেবিনের ভিতর লোহার পাতের কাপুনিতেও জাহাজের চাকার ঘূর্ণনে তোলপাড় করা কাদায় অসহ্য গন্ধে পাগল হয়ে যাওয়া মেমে ভুলে যায় দিনক্ষণের হিসেব। যখন সে দেখতে পায় শেষ হলুদ প্রজাপতিকে ফ্যানের পাখায় লেগে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতে, তখন অনেক সময় পার হয়েছে আর তখন সে অমোচনীয় সত্য হিসেবে ধরে নেয় মাউরিসিও ব্যাবিলনিয়াার মৃত্যুকে । কিন্তু সে হতাশার কাছে নিজেকে হার মানতে দেয় না। পৃথিবীতে এ যাবৎ জন্ম নেয়া সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরীর খোঁজে যেখানে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো হারিয়ে গিয়েছিল সেই অলীক মালভুমিতে, খচ্চরের পিঠে পার হওয়ার সময়, ইন্ডিয়ানদের চলার পথ ধরে পর্বতশ্রেণী পাড় হবার সময়, বত্রিশটি গীর্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্রোঞ্জের ঘন্টা বাজানো পাথুরে গলির সেই বিষন্ন নগরীতে ঢোকার সময়ও সে চিন্তা করে চলে মাউরিসিও ব্যবিলিয়নিওর কথা। সেই রাতে ওরা ঘুমায় এক পরিত্যাক্ত ঔপনিবেশিক ম্যানশনে ফের্নান্দার পেতে দেয়া তক্তায়, আগাছা দ্বারা আগ্রাসিত মেঝেতে। জানালার থেকে টেনে ছিড়ে নামানো ছেড়া পর্দা গায়ে জড়িয়ে, যেটা শরীরের প্রতিটি গড়াগড়ির সঙ্গেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। মেমে জানতে পারে সে কোথায় এসেছে কারন অনিদ্রার আতংঙ্কের মধ্যে দেখতে পায় কালোপোষাক পরিহিত সেই ভদ্রলোককে, যাকে অনেক আগে বড়দিনের কিছু আগে এক সীসের কফিনে ভরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়িতে। পরের দিন, ফের্নান্দা তাকে নিয়ে যায় এক ছায়াঘন দালানে, যেটাকে মেমে একনজরেই চিনতে পারে কারণ যে কনভেন্টে তাকে রানী হবার শিক্ষা দেয়া হয়েছে তার কথা অনেক গল্প করেছে তার মা, আর সে বুঝতে পারে তাদের ভ্রমনের সমাপ্তিতে এসে পরেছে ওরা। ওর মা যখন পাশের অফিসে কোন একজনের সঙ্গে কথা বলছিল মেমে তখন অপেক্ষা করছিল দাবার কোর্টের মত সাদাকালো মেঝের ঔপনিবেশিক আর্চবিশপদের বড় বড় তৈলচিত্র ভরা বৈঠকখানায়, শীতে কাঁপতে কাঁপতে, কারণ তখনও তার পরনে ছিল কালো ফুল তোলা সুতীর পোষাক আর পায়ে ছিল মালভুমির বরফে শক্ত হয়ে ফুলে ওঠা উচুঁ জুতো। বৈঠকখানার কেন্দ্রে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সে ঘষা-কাচের মধ্যে দিয়ে আসা হলুদ আলোর নীচে মাউরিসিও ব্যাবিলনিওর কথা চিন্তা করতে করতে, যখন বেরিয়ে আসে এক নবদীক্ষিতা নান যে বহন করছিল তার তিন প্রস্থ কাপড়সহ তোরঙ্গটি। মেমের পাশ দিয়ে যাবার সময় না থেমেই হাত বাড়িয়ে দেয় সে। ”চল রেনাতা”- ওকে বলে, মেমে হাতটি ধরে, আর ওকে নিয়ে যেতে দেয় । শেষবার ফের্নান্দা যখন তাকে দেখে তখনও নবদীক্ষিতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটার চেষ্টা চালাচ্ছিল সে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার পিছনে লোহার গরাদ বন্ধ হয়ে যায়। তখনও সে ভাবছিল মাউরিসিও ব্যাবিলনিওর কথা, ওর তেলের গন্ধের কথা, আর প্রজাপতি বেষ্টনীর কথা, আর সে ভাবতে থাকবে সাড়া জীবন, ওকে যতদিন না এক সুদূর শারদ সকালে মারা যাবে সে বৃদ্ধাবস্থায় ক্রাকোভিয়ার এক অন্ধকার হাসপাতালে কখনও একটিও কথা না বলে আর যখন তার নাম বদলে দেয়া হয়েছে।

ফের্নান্দা মাকন্দো- ফিরে আসে অস্ত্রধারী পুলিশ প্রহরাবাধীন এক ট্রেনে করে। ভ্রমনের সময় তার চোখে পরে যাত্রীদের মাঝে উত্তেজনা, রেললাইনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে সামরিক কড়াকড়ি, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো বিরল, ভয়ংকর কিছু ঘটার নিশ্চয়তা। কিন্তু মাকন্দোয় পৌঁছুনোর আগ পর্যন্ত ঠিকমত কিছু জানতে পারে না। আর পৌঁছুনো মাত্র তাকে বলা হয় যে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কলা কোম্পানির শ্রমিকদেরকে ধর্মঘটের জন্য উস্কানী দিচ্ছে। “একমাত্র এটাই বাকী ছিল ”-আপনমনে বলে ফের্নান্দা। পরিবারের মধ্যে এক নৈরাজ্যবাদী ধর্মঘট পালিত হয় দুসপ্তাহ পর আর নাটকীয় এমন কিছুই ঘটে না যেমনটি সে আশঙ্কা করেছিল। শ্রমিকদের দাবী ছিল তাদের যেন রোববারে কলা কাটা এবং তা পরিবহনে বাধ্য না করা হয়, আর এই দাবীকে এতই ন্যায্য বলে মনে হয় যে এমনকি ফাদার আন্তনিও ইসাবেল পর্যন্ত ওদের পক্ষ নিয়ে ওকালতি করে, কারণ দাবীটা ইশ্বরের আইন অনুযায়ী করা হয়েছে। এই ব্যাপারটার সফলতা ও পরের মাসগুলোতে হাতে নেয়া অন্যান্য বিভিন্ন কার্যক্রমে সফলতা হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোকে বের করে আনে তার দুর্নাম-জড়িত পূর্বপরিচিতি থেকে, তার সমন্ধে বলা হতো যে শুধু ফরাসি বেশ্যা এনে গ্রাম ভর্তি করা ছাড়া আর কিছুই সে জানে না। যে ঝোঁকের বশবর্তী হয়ে সে তার লড়িয়ে মোরগগুলো নিলামে তুলে পাগলাটে জাহাজ ব্যবসায় নামে, সেই একইভাবে সে পদত্যাাগ করে কলা কোম্পানির ফোরম্যানের চাকুরী, আর যোগ দেয় শ্রমিকদের পার্টিতে। শিঘ্রই তাকে চিহ্নিত করা হয় সামাজিক স্থিতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী আন্তর্জাাতিক চর হিসেবে। বিভিন্ন গুজবে অন্ধকার হয়ে আসা একটি সপ্তাহের একরাতে গোপন এক সমাবেশ থেকে বের হবার সময় তার উদ্দেশ্যে ছোড়া রিভলবারের চারটি গুলির হাত থেকে অলৌকিকভাবে পালাতে সক্ষম হয় সে। পরের মাসগুলোতে পরিস্থিতি এতই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে পরে যে এমন কি উরসুলা পর্যন্ত তার অন্ধকার কোণ থেকে তা বুঝতে পারে আর তার মনে হয় আবার সে বাস করছে নতুন করে সেই ঘটনাবহুল সময়ে যখন তার ছেলে আউরেলিয়ানো পকেটে ধ্বংসের হোমিওপ্যাথিক গুলি নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই ঘটনা জানানোর জন্য হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু আউরেলিয়ানো সেগুন্দো জানায় যে হামলার রাতের পর থেকে তার অবস্থানের কথা কেউ জানে না, ঠিক আউরেলিয়ানোর মত বিস্ময়পূর্ণ কণ্ঠে বলে ”উরসুলা, পৃথিবীটা যেন ঘুরছে”। এই সমস্ত দিনের অনিশ্চয়তা ফের্নান্দাকে স্পর্শ করে না। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ না করেই মেমের নির্বাসনের কারণে তুমুল ঝগড়া হয় তাদের মধ্যে। তার পর থেকে বাইরের জগতের সঙ্গে কোন সম্পর্ক থাকে না তার। মেয়েকে উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত ছিল আউরেলিয়ানো সেগুন্দো, এমনকি পুলিশ ব্যবহার করে হলেও, কিন্তু ফের্নান্দা তাকে কাগজপত্রে দেখায় যে মেমে নিজের ইচ্ছেতেই মঠে যোগ দিয়েছে। সত্যিই মেমে লোহার গরাদের অন্যপাশ থেকে কাগজে সই করে আর করে সেই একই রকমের তাচ্ছিল্য নিয়ে, যে রকম তাচ্ছিল্যের কারণে সে তাকে নির্বাসনে পাঠাতে দিয়েছে। অন্তরের অন্তস্থলে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ঐ প্রমাণের বৈধতায় বিশ্বাস করেনি যেমনটি কখনই বিশ্বাস করেনি, যে মাউরিসিও ব্যবিলনিও মুরগী চুরী করতে উঠানে ঢুকেছিল, কিন্তু দুটো ব্যাপার একীভূত হয়ে তার বিবেককে শান্ত রাখতে সাহায্যে করে আর ফলে কোন বিবেকদংশন ছাড়াই পেত্রা কত্রেসের ছায়াতলে ফিরতে পারে সে যেখানে আবার আরম্ভ করে কোলাহলপূর্ণ পার্টি ও লাগামহীন ভোজনের। শহরের উত্তেজনা থেকে দূরে থেকে উরসুলার ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণীতে কান না দিয়ে ফের্নান্দা তার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার শেষ প্যাচ কষে। কেবলমাত্র ছোটখাটো কাজ পেতে আরম্ভ করা ছেলে হোসে আর্কাদিওকে এক বিস্তারিত চিঠি লিখে জানায় যে তার বোন রেনাতা কালো বমি করে মারা গেছে। পরে আমারান্তা উরসুলার দেখাশোনার ভার সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের হাতে দিয়ে অদৃশ্য ডাক্তারদের সঙ্গে পত্র বিনিময়ের কাজে নিজেকে নিয়োগ করে যা নাকি মেমের ব্যাপারটার কারণে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। প্রথমেই যা করে তা হচ্ছে মূলতবী রাখা টেলিপ্যাথিক অপারেশনের জন্য নির্দিষ্ট দিন ঠিক করা। কিন্তু অদৃষ্ট চিকিৎসকেরা উত্তর দেয় যে মাকন্দো-এর সামাজিক অবস্থার এরকম টালমাটাল অবস্থায় এটা করা উচিৎ হবে না। অপারেশনটা তার জন্য এতই জরুরী ছিল আর সে এতই কম খবর রাখতো যে আরেক চিঠিতে সে জানায় যে সে রকম কোন আলোড়ন মাকন্দো- এ বিরাজ করছে না আর এসবই হচ্ছে তার দেবরের পাগলামীর ফল, যে এখন শ্রমিক সংঘের ঘূর্নী বাতাস নিয়ে মত্ত, যেমনটি অন্য সময়ে মত্ত ছিল মোরগ লড়াই ও জাহাজ ব্যবসা নিয়ে। দুপক্ষ এ ব্যাপার নিয়ে একমত হবার আগেই এক উত্তপ্ত বুধবারে এক বর্ষিয়ানী নান দরজা থেকে ডাকে যার বাহুতে ঝুলানো ছিল এক ঝুড়ি। দরজা খুলে সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ উপহার মনে করে সুন্দর লেসের কাজ করা মোটা কাপড় দিয়ে ঢাকা ঝুড়িটি নেবার চেষ্টা করে। কিন্তু নান বাধা দেয়। কারণ তার প্রতি নির্দেশ ছিল ব্যাক্তিগতভাবে, কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সেটাকে দোনঞা (মিসেস) ফের্নান্দা দেল কার্পিও দে বুয়েন্দিয়ার হাতে দিতে। ঝুড়ির ভেতর ছিল মেমের ছেলে। ফের্নান্দার আগেকার আধ্যাত্মিক শিক্ষক একটি চিঠিতে খোলাশা করে লিখে দিয়েছে যে ছেলেটার জন্ম হয়েছে দুমাস আগে আর ব্যাপটাইজের সময় নানার নামে নাম রাখা হয়েছে আউরেলিয়ানো কারন ছেলের মা তার ইচ্ছে জানাতে দুঠোঁট আলাদা করেনি, নিয়তির প্রতি প্রচন্ড রাগ অনুভব করলেও নানের সামনে তা গোপন করতে সমর্থ হয় ফের্নান্দা । ”সবাইকে আমরা বলবো ঝুড়িসহ ভাসমান অবস্থায় ওকে পেয়েছি আমরা”- হেসে বলে। ”আপনাকে কেউই বিশ্বাস করবে না” বলে নান। ”বাইবেলে বর্ণিত একই গল্পে লোকে বিশ্বাস করতে পারলে”- উত্তর দেয় ফের্নান্দা- ”আমার কথা বিশ্বাস না করার কোন কারণ দেখছি না”। বাড়িতেই দুপুরের খাবার সাড়ে নান, ফেরার ট্রেন ধরার অপেক্ষায় আর গোপনীয়তার কঠোর নির্দেশ মান্য করে বাচ্চাটি সমন্ধে আর কোন কথা না উচ্চারণ করলেও ফের্নান্দা তাকে লজ্জার এক সাক্ষী হিসেবে গণ্য করে, আর তার আপসোস হয় লোকে মধ্যযুগীয় ফাঁসির রীতি বর্জন করেছে বলে, আর খারাপ খবর নিয়ে আসা এই দূতকে না ঝুলাতে পারায়। আর তখনই সিন্ধান্ত নেয় নান ফিরে যাওয়া মাত্রই শিশুটিকে গোসলের টাবে ডুবিয়ে মারার। কিন্তু মন অতটুকু শক্ত হতে না পারায় অসীম কৃপাময় ইশ্বর তাকে এই অন্তরায় থেকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাই সমীচীন মনে করে। যখন নতুন আউরেলিয়ানোর বয়স এক বছর পূর্ণ হয় তখন কোন আগাম ঘোষণা ছাড়াই জনসাধারনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও অন্যান্য সিন্ডিকেটের নেতারা এতদিন আত্মগোপন করে থাকা জায়গা থেকে, এক সপ্তাহান্তে হঠাৎ করেই উদয় হয় আর কলা অঞ্চলের শহরগুলোতে মিছিল করে। পুলিশ শুধু মাত্র নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষা করেই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু সোমবার রাতে নেতাদের বাড়ী থেকে বের করে পাঁচ কিলোর বেড়ি পায়ে পরিয়ে, পায়ে হাটিয়ে প্রাদেশিক রাজধানীর জেলে পাঠানো হয়। ওদের মধ্যে ছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ও লরেন্স গাবিলান। মাকন্দো-এ নির্বাসিত মেহিকানো বিপ্লবের এক কর্ণেল যার কথানুযায়ী সে তার কম্পাদ্রে আরতেমিও ক্রুজের বীরত্বের চাক্ষুস সাক্ষী। যদিও তিন মাসের মধ্যেই ওরা ছাড়া পেয়ে যায় কারণ সরকার ও কলা কোম্পানি একমত হতে পারছিল না কাকে জেলে ঢুকাবে এ ব্যাপারে। এসব কর্মচারীদের ক্ষোভের ভিত্তি ছিল অসাস্থ্যকর পরিবেশে বাসস্থান, চিকিৎসার সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে প্রতারণা, আর কর্মস্থলের শোচনীয় পরিবেশ। এছাড়াও তারা জোর করে বলে যে তারা নগদ টাকায় বেতন না দিয়ে জিনিসপত্র কেনা যায় এমন টিকেট দেয় যার বিনিময়ে কমিসারি থেকে ভার্জিনিয়া হ্যাম ছাড়া আর কিছুই কেনা যায় না। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোকে জেলে পোরা হয় কারণ সে-ই ফাঁস করে দিয়েছিল যে টিকেট দিয়ে বেতন দেয়ার ব্যবস্থা আসলে ফলের জাহাজগুলোর জন্য টাকা জোগানোর ব্যবস্থা কারণ, তা না হলে জাহাজগুলোকে খালি ফিরতে হতো কলা ওঠানোর ডক থেকে নিউ আরলিন্স পর্যন্ত। অন্যান্য অভিযোগগুলো ছিল সর্বজনবিদিত। কোম্পানির ডাক্তাররা রোগীদের পরীক্ষা করত না, তার বদলে রোগীদের কে ডিসপেন্সারির সামনে লম্বা লাইনে দাঁড় করিয়ে এক নার্সকে দিয়ে তাদের জিভের উপর কপার সালফেটের রংয়ের বড়ি দেওয়াতো। তা ম্যালেরিয়া, গনোরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিণ্য যে রোগই হোক না কেন সব রোগের বেলাতেই ছিল একই চিকিৎসা। চিকিৎসাটা এমন সাধারণভাবে করা হতো যে বাচ্চারা বার বার লাইনে দাড়িয়ে বড়ি না গিলে বাড়ি নিয়ে যেত লটারি খেলার গুটি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কোম্পানির কর্মচারীরা ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে থাকত। কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা শৌচাগার না বসিয়ে বড়দিনের সময় ভ্রাম্যমান টয়লেট ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে প্রতি পঞ্চাশজন লোকের জন্য একটি করে দিয়ে, কিভাবে সেটি ব্যবহার করলে দীর্ঘদিন সেটা টিকে থাকবে তার প্রদর্শনী করতো। কালো পোশাক পরিহিত জড়ায় আক্রান্ত অন্য সময়ে কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে ঘিরে থাকা উকিলরা ছিল কলা কোম্পানির আইনগত প্রতিনিধি, আর তারা এই সব দাবী এমন সব যুক্তির সঙ্গে বাতিল করে দিত যে সেটাকে মনে হতো জাদুর খেলা। যখন শ্রমিকরা এক সর্বসম্মত দাবীর তালিকা দাড় করায়, সেটাকে কলা কোম্পানির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে প্রচুর সময় লেগে যায়। এই সর্বসম্মত দাবীর কথা জানার সঙ্গে সঙ্গেই সেনঞর ব্রাউন তার কাঁচের ওয়াগনটা ট্রেনের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আরও কিছু কোম্পানির বহুল পরিচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একসঙ্গে মাকন্দো থেকে উধাও হয়। অবশ্য পরের শনিবার কয়েকজন শ্রমিক বেশ্যালয়ে গিয়ে এক মেয়েকে দিয়ে ফাঁদে ফেলে উলঙ্গ অবস্থায় তাকে দিয়ে দাবীর কাগজটায় সই করিয়ে নেয়। বিষন্ন উকিলের দল বিচারকের কাছে প্রমাণ করে যে সই করেছে তার সঙ্গে কোম্পানির কোন সম্পর্কই নেই আর যাতে কোন সন্দেহ সৃষ্টি না হয় তার জন্য তাকে প্রতারক হিসেবে জেলে ভরা হয়। পরে ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে বেনামে ভ্রমণকৃত সেনঞর ব্রাউন ধরা পরে যায় শ্রমিকদের কাছে আর তাকে দিয়ে আবার দাবীর অন্য এক অনুলিপিতে সাক্ষর করানো হয়। সে পরের দিন বিচারকদের সম্মুখে হাজির হয় চুলে কালো কলপ লাগিয়ে ও নিখুঁত কাস্তেইঞানো (স্প্যানিশ) বলে। উকিলরা প্রমাণ করে যে সেই লোক আলাবামার গ্যাটাভিলে জন্মগ্রহণকারী কলা কোম্পানির সুপারিন্টেডেন্ড নয়, বরঞ্চ মাকন্দো-এ জন্মগ্রহনকারী এক নিরীহ ভেষজ গাছগাছড়ার বিক্রেতা যাকে ব্যাপটাইজ করা হয়েছিল দাগোবের্ত ফনসেকা নামে। কিছুদিন পর শ্রমিকদের নতুন এক প্রচেষ্টার ফলে উকিলরা জন সম্মুখে প্রদর্শন করে কনসাল ও বিদেশ মন্ত্রীকৃত সত্যায়িত সেনঞর ব্রাউনের মৃত্যু সনদ যেটা অনুযায়ী সে মারা গেছে গত জুনের নয় তারিখে শিকাগোতে দমকল বাহিনীর গাড়ি চাপা পরে। এই সব বাজে প্রলাপে ক্লান্ত হয়ে শ্রমিকরা মাকন্দোর কর্তৃপক্ষকে বাতিল করে দিয়ে উচ্চতর আদালতে তাদের দাবী তুলে ধরে। সেখানেই আইনের যাদুকররা প্রমাণ করে এই সমস্ত দাবীর কোন সত্যকার ভিত্তি নেই কারণ কলা কোম্পানির কখনও কোন শ্রমিক নেই, কোন দিন ছিলওনা এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। বরঞ্চ যারা সেখানে কাজ করে তারা সকলেই অস্থায়ী কর্মী, ফলে ভার্জিনিয়া হ্যামের কথা, জাদুকরী বড়ীর কথা বড়দিনের পবিত্র শৌচাগারের কথা সবই ভিত্তিহীন হয়ে পরে আর আদালতের হুকুমে সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় আর প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিকদের অস্থিত্বহীনতার কথা।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
আরম্ভ হয় মহা ধর্মঘট। চাষবাস পরে থাকে অসমাপ্ত, ফল পঁচতে থাকে গাছে আর একশ বিশ ওয়াগনের ট্রেন পরে থাকে রেল লাইনের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায়। বেকার শ্রমিকে উপচে পরে শহরটা । তুর্কদের রাস্তায় সম্মিলিত চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়। অনেক দিনের মধ্যে এক শনিবারে আর হোটেল জ্যাকব-এর বিলিয়ার্ড রুমগুলোতে চব্বিশ ঘন্টার শিফট চালু করা হয়। যেদিন ঘোষণা করা হয় জন-সাধারণের মধ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর হাতে দেওয়া হয়েছে, সেদিন হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো ওখানেই ছিল যদিও সে পূর্ববোধ অনুভবের মানুষ নয় তবু ওর জন্য সেটা যেন ছিল মৃত্যুর ঘোষণা যার জন্য সে অপেক্ষায় ছিল সুদূর অতীতের সেই সকাল থেকে যে সকালে কর্ণেল হেরিনেল্দ মার্কেজ ওকে মৃত্যুদন্ড দেখবার সুযোগ দিয়েছিল। অবশ্য এই অশুভ সংকেতটা তার গাম্ভীর্যে কোন পরিবর্তন আনে না। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই সে নির্ভুলভাবে বিলিয়াার্ডের কিউ বলটাকে খেলে। খানিক পর ড্রামের শব্দ, বিউগলের তীব্র আওয়াজ লোকজনের চিৎকার ও অনেক লোকের দৌড়াদৌড়ির শব্দ ওকে জানায় যে শুধুমাত্র বিলিয়ার্ড খেলাই যে শেষ হয়েছে তা নয়, নিঃশব্দে একাকী যে খেলাটা সে খেলে আসছিল মৃত্যুদন্ডের ঊষা থেকে সেটারও শেষ পর্যন্ত সমাপ্তি ঘটেছে। সর্বমোট তিন রেজিমেন্ট ছিল ওরা আর গ্যালি ড্রামের শব্দের সঙ্গে করা মার্চ মাটি কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ওদের অসংখ্য ড্রাগনের নাক থেকে বের হওয়া বিশ্রী গন্ধের বাষ্প দুপুরের নির্মলতাকে ভড়িয়ে দিয়েছিল। ওরা ছিল ছোটখাটো, গাট্টাগোট্টা, রূঢ়। ঘোড়ার মত ঘামতো ওরা, রোদে পোড়া বলে এক ধরনের শুকনো চামড়ার গন্ধ বের হত গা থেকে আর ওদের ছিল পাহাড়ি লোকের মৌনতা ও অভেদ্য অধ্যবসায়। যদিও জায়গাটা পার হতে ওদের এক ঘন্টার বেশী সময় লাগে তবুও মনে হতে পারত যে সামান্য কিছু স্কোয়ার্ড বৃত্তাকারে মার্চ করছে কারণ ওরা ছিল সকলেই একই রকম। একই মায়ের গর্ভে জন্ম আর সকলেই একই রকমের বুদ্ধুতা নিয়ে বয়ে চলেছে হ্যাভারস্যাক, ক্যান্টিন বেয়নেট সমেত বন্দুকের লজ্জা, অন্ধ বশ্যতার অস্বস্তি ও সম্মানবোধ। উরসুলা ওদের শুনতে পায় ওর ছায়াান্ধকার বিছানা থেকে আর হাত তোলে ক্রস আঁকতে । সদ্য ইস্ত্রি করা নকশা করা খাবার টেবিলের চাদরে ভর দিয়ে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাড়ায় সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ আর ভাবে ছেলে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর কথা যে তখন হোটেল জ্যাকবের সামনে দিয়ে শেষ সৈন্যটিকে চলে যেতে দেখছে।

সামরিক আইন, এই বিরোধে মধ্যস্থতা করার সুযোগ করে দেয় সেনাবাহিনীকে । কিন্তু ওরা সমঝোতা ঘটানোর কোন চেষ্টাই করে না দুপক্ষের মাঝে। মাকন্দো-এ মুখ দেখানো মাত্রই বন্দুক একপাশে সরিয়ে রেখে কলা কেটে বোঝাই করে ট্রেন চালিয়ে দেয়। শ্রমিকরা, যারা এযাবৎ অপেক্ষা করেই সন্তুষ্ট ছিল। তারা নিজেদের একমাত্র কাজের হাতিয়ার মাচেতে (বড় কাস্তে) নিয়ে টিলায় ঢুকে অন্তর্ঘাতের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতে নেমে পরে। আগুন জ্বালিয়ে দেয় কলা বাগানে ও রসদের দোকানে, ধ্বংস করে রেলপথ, বাধা সৃষ্টি করে সেই সব রেল চলায় যে রেলগুলো মেশিনগানের গুলি ছুড়ে পথ করে নেয়া শুরু করেছিল, আর কেটে দেয় টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের তার। সেঁচের খালগুলো রক্তে লাল হয়ে উঠে। বিদ্যুতায়িত মুরগীর খোয়াড়ের ভিতরে তখনও জীবিত সেনঞর ব্রাউনকে তার অন্যসব সঙ্গী ও পবিরারসহ মাকন্দো থেকে সরিয়ে ফেলা হয় নিরাপদ জায়গায় সামরিক বাহিনীর প্রহরাধীনে। পরিস্থিতি যখন এক অসম রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে তখন কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের কে মাকন্দো-তে জড়ো হতে আহবান করে। সেখানে ঘোষণা করা হয় সামরিক ও বেসামরিক প্রাদেশিক নেতারা বিরোধে মধ্যস্থতা করতে পরের শুক্রবারে এসে পৌঁছুবে।
শুক্রবার ভোর হতে রেলষ্টেশনে জড়ো হওয়া ভীড়ের মধ্যে ছিল হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো। আগেই সে অংশগ্রহণ করেছিল ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে এক বিশেষ আলোচনায়, আর কর্ণেল গাভিলান ও তার দায়িত্ব ছিল ভিড়ের মধ্যে মিশে যেয়ে অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা নেবার। খুব একটা ভাল বোধ করছিল না সে আর আঠালো কিছু দলা অনুভব করতে শুরু করেছিল তার টাকরার উপর, যখন থেকে সে দেখতে পায় ছোট্ট প্লাজার চারদিকে মেশিনগান বসানো হয়েছে ও কলা কোম্পানির তার ঘেরা শহর সুরক্ষিত করা হয়েছে গোলন্দাজ বাহিনীর অস্ত্র দিয়ে তখন থেকেই। বারোটা বাজতে চলেছে, না আসা রেলের জন্য অপেক্ষা করছে তিন হাজারের বেশী লোক, যাদের মধ্যে ছিল শ্রমিক, মহিলা ও শিশু যাদের দ্বারা রেল ষ্টেশনের সামনের খালি জায়গাটা ভরে উপচে পরেছে পার্শবর্তী রাস্তায় সারি বেধে রাখা সামরিক বাহিনীর মেশিনগানধারীদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। অভ্যর্থনা জানানোর অপেক্ষারত ভীড়ের চেয়ে, তাদেরকে মনে হচ্ছিল আনন্দমুখর এক মেলা। তুর্কদের রাস্তা থেকে ভাজাভুজি ও পানীয়ের ভ্রাম্যমান দোকানগুলো স্থানান্তরিত হয়েছে ওদের মাঝে আর লোকেরা প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে সহ্য করছিল অপেক্ষা ও গা জ্বলানো রোদের যন্ত্রনা। তিনটে বাজার কিছু আগে গুজব ওঠে সরকারী রেলটা পরের দিনের আগে আসছে না। ক্লান্ত ভিড় ফেলে এক হতাশার দীর্ঘশ্বাস। এই সময় ভিড়ের দিকে তাক করা চারটে মেশিনগান বসানো স্টেশনের ছাদের উপর ওঠে সেবাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট আর মুহূর্তের জন্য নেমে আসে নীরবতা। হোসে আর্কাদিও সেগুন্দোর পাশে ছিল চার ও সাত বছরের শিশুসহ খালি পায়ে দাড়ানো এক ভীষন মোটা মহিলা, ওকে না চিনলেও ছোট ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে অন্যটাকে উঁচু করে তুলে ধরতে বলে মহিলা হোসে আর্কাদিওকে যাতে ভাল করে শুনতে পারে যা বলা হবে, ছেলেটাকে কাঁধে তুলে নেয় হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো । অনেক বছর পর সেই শিশু যদিও কেউ বিশ্বাস করবে না তবুও গল্প করবে যে লেফট্যানেন্টকে সে গ্রামোফোনের মধ্যে দিয়ে প্রাদেশিক সামরিক ও বেসামরিক ৪ নম্বর ডিক্রি পড়তে শুনেছে। ওটা সই করা ছিল জেনারেল কার্লোস কর্তেস ভার্গাস ও তার সেক্রেটারি মেজর এনরিকে গার্সিয়া ইসায়ার দ্বারা আর আশি শব্দের তিন ধারায় ধর্মঘটীদের দুষ্কৃতিকারীদল বলে ঘোষণা করা হয় এবং সেনাবাহীনিকে গুলি করে মারার ক্ষমতা দেয়া হয়।

কানে তালা লাগানো শীষ-এর মধ্যে দিয়ে ডিক্রিটা পড়া শেষ হলে ষ্টেশনের ছাদে লেফট্যান্টের জায়গা দখল করে ক্যাপ্টেন ও গ্রামোফোনের চোঙ্গা দিয়ে ইশারা করে যে সে কিছু বলতে চায়। নিঃশব্দ হয়ে যায় জনতা। ”ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গন”- বলে ক্যাপ্টেন খানিকটা ক্লান্ত নিচু স্বরে, ধীরে ধীরে “জায়গা ত্যাগ করার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দেয়া হচ্ছে”।

শীষ ও দ্বিগুণ চিৎকারে চাপা পরে যায় নির্ধারিত সময় আরম্ভের বিউগলের আওয়াজ। কেউ নড়ে না। ”পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে”-একই স্বরে বলে ক্যাপ্টেন ”আর এক মিনিট, তারপরই গুলি শুরু হবে”। বরফশীতল ঘাম নিয়ে হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো শিশুটিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মহিলাকে দেয়। ”বেজন্মারা গুলি চালাতেও পারে”-বিড়বিড় করে মহিলা। কথা বলার সময় পায় না হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো কারণ একই সময় মহিলার বলা কথার প্রতিধ্বনি তুলে চিৎকার করে বলা কর্ণেল গ্যাভিলানের কর্কশ কন্ঠস্বর মূহুর্তেই চিনতে পারে সে। টানটান উত্তেজনার আশ্চর্য নৈঃশব্দের গভীরতায় মদির হওয়া আর মৃত্যুর আকষর্ণে সম্মোহিত এই জনতাকে কিছুই নড়াতে পারবে না এই বিশ্বাসে নিশ্চিত হয়ে, হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো তার সামনের মাথাগুলোর উপর উচুঁ হয়ে জীবনের প্রথম বারের মত গলা চড়ায়, “বেজন্মার দল”- চিৎকার করে “তোদের উপহার দিচ্ছি বাকি মিনিটটা”।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com