বিনয় বর্মনের পাঁচটি প্রত্নতাত্ত্বিক কবিতা

বিনয় বর্মন | ২৭ এপ্রিল ২০১৬ ৫:৩৩ অপরাহ্ন


গোবেক্লি তেপে

হৃদয় আমার ঘুমিয়ে ছিলো মাটির গভীরে
বারো হাজার বছরের ঘুম
পৃথিবীর প্রথম মন্দিরে
অস্পষ্ট সৌরবৃত্ত
মধ্যগগনে জন্মবিন্দু
দুহাত ছড়িয়ে যিশু দাঁড়িয়ে আছেন বারোজন শিস্যসমেত
নাকি শিবপার্বতীর যুগলমূর্তি মাঝখানে
আদিম ইতিহাস ঘুরপাক খায় রাশিচক্রে
পাথরঘড়িতে সমাহিত স্বপ্ন
আমি আজ জেগে উঠেছি
গাঁইতির ঘায়ে তোমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎসবে
শিকারে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
কেনো আমার ঘুম ভাঙালে বিংশনিষাদ?
তোমাদের ক্রুরতা আমাকে পীড়া দেয়
বুনো মোষ দুই শিঙে বিদ্ধ করে আমাকে
সাপ পেঁচিয়ে ধরে শরীর
গিরগিটি মাকড়শা পিল পিল করে ঢোকে নাকমুখ দিয়ে
হে সারস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাও আকাশে
যেখানে থাকে আমার হৃদয়সখা।

gobekli-tepe.jpg
গোবেক্লি তেপে তুরস্কের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সুপ্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রায় বারো হাজার বছর পূর্বে এখানে নির্মিত হয় প্রস্তরস্তম্ভ। স্থানে স্থানে বারোটি করে স্তম্ভ চক্রাকারে দাঁড় করানো; মাঝখানে আরো দুটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ স্তম্ভ। এটিকে বলা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন মন্দির। ক্লাউস শ্মিট নামে একজন জার্মান প্রত্নত্তত্ববিদ ১৯৯৪ সালে এটির সন্ধান পান।

কুফুকাব্য

তোমরা আমাকে কেউ চিনতেই পারনি
মমি করা স্বপ্নগাথা
তুলে আনো হৃদয় খুঁড়ে
প্রবেশদ্বারে স্পিংসের পাহারা
দাঁড়াও ভেতরে ঢোকার আগে ধাঁধার উত্তর দাও
মিশরের সম্রাট মহান ফারাও
প্রস্তরগৃহে শুয়ে দু হাত নাড়াও
বিজ্ঞানপ্রযুক্তি ছাড়া এইরূপ বিশাল নির্মাণ
কি করে সম্ভব কি করে সম্ভব
তোমরা কেবলই ধাঁধায় পড়ো
হায়ারোগ্লিফে খোঁজো রহস্যের সমাধান
কেনো এতো আয়োজন মরণযাত্রায়
কেনো এতো পরিশ্রম এতো অর্থব্যয়
প্রতিধ্বনি আকাশচুম্বী গম্বুজে
ভাষাহারা আশাহারা উদ্ভট উট
ওরিয়ন থেকে লাফ দেয় প্লেয়াডিসে
সভ্যতার উষালগ্নে নীল সঙ্গীত
বালিঝড়ে ঢাকা পড়ে অতীতকাহিনি
গিজায় তবু উন্নত শিরে দণ্ডায়মান কুফু
মানুষ দেবতা নাকি শঙ্কর রূপ
ভূমধ্যসাগর নিশ্চুপ
তোমরা আমাকে কেউ চিনতেই পারোনি।

pyramid-of-giza-khufu.jpg
কুফু খৃস্টপূর্ব ছাব্বিশ শতকের মিশরীয় সম্রাট। তিনি চতুর্থ ডাইনেস্টির দ্বিতীয় ফারাও। তার অমর কীর্তি গিজার মহাপিরামিড, যেটি পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি। এটি এখনো ধরনীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর উচ্চতা ৪৮১ ফিট, যা প্রাচীন পৃথিবীর সর্বোচ্চ মনুষ্যনির্মিত স্থাপনা।

মৃৎগ্রন্থশালা

শুষ্ক কর্দমে হৃদয়কথন
তোমাকে ভালবাসি মৃৎবালিকা
অদেখা আমাদের ভাগ্যরেখা
চলো পাঠ করি কিউনিফর্মে লেখা স্তোত্র
বাইবেলবীজ প্লাব্নকাহিনি
আসিরিয় বাহিনীর প্রচণ্ড প্রতাপ
দেবতা আনু দেবী ইনানা
আবার সৃষ্টির আয়োজন করো ভূমণ্ডলে
গিলগামেশের অমরত্ববাসনা পূর্ণ করো
পৃথিবীর প্রথম এপিক মাটিতে উদগত
শত শত পদ্মলোচন অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে
নিনেভের গুপ্ত সম্পদ
অগ্নিতে ভস্মীভূত প্রেমপত্র
আমরা এখন পাষাণের প্রতিভূ
আমাদের হৃদয় জলশূন্য
হংসমিথুন সাঁতারবিস্মৃত
সম্রাট অসুরবানিপাল
মহৎ জ্ঞানের আজ তীব্র আকাল
তোমার গ্রন্থশালা থেকে নির্গত আলোকে
পৃথিবী পরিশুদ্ধ হোক।

ashurbanipal-library-clay-tablet.jpg
আসিরিয় সাম্রাজ্যের অপূর্ব নিদর্শন অসুরবানিপালের গ্রন্থাগার। খৃস্টপূর্ব সপ্তম শতকে জ্ঞানপিপাসু আসিরিয় সম্রাট অসুরবানিপালের নামানুসারে এর নামকরণ হয়েছে। গ্রন্থাগারটির অবস্থান প্রাচীন আসিরিয়ার রাজধানী নিনেভে অঞ্চলে। এটি পড়েছে বর্তমান ইরাকে। এখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে প্রায় ত্রিশ হাজার মৃৎপত্র (ক্লে ট্যাবলেট), যাতে কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা আছে নানা কাহিনি। কাহিনিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত গিলগামেশ মহাকাব্য। মহাপ্লাবন এবং মানবসৃষ্টির কথাও এখানে আছে।

টেম্পল অব বেল

এখন বিষাদের কাল
মরুপ্রেয়সীর ঠোঁট থেকে আর মুক্তো ঝরে না
প্রস্তরিত বুকে আজ হাহাকার
মেসোপট আলোঅন্ধকার
শিলাক্ষে জেগে থাকে স্বপ্নমরীচিকা
নিভে যাওয়া সভ্যতার শিখা
দিগবিজয়ী গ্রীক রোমান সেমিটিক
সংঘাতে ভরা চারদিক
ইতিহাস জুড়ে শুধু উপাস্য বদল
প্রভু, তোমার নামে একদা এখানে
জ্বলেছে অগ্নি
বেজেছে ঘণ্টা
হয়েছে সেজদা
এখন হায় কিছুই নেই
অস্তমিত চাঁদ আক্কাদ আসিরিয়া ব্যাবিলন
পালমিরা পালতোলা ব্যথার প্লাবন
রণে বিস্ফোরণে পাঁজর ছিন্নভিন্ন
তোমার রক্ত শুষে নেয় বিভ্রান্ত বালিকণা
প্রত্নরক্ষকেরা কিছুই করতে পারে না।

temple_of_bel_palmyra.jpg
গ্রেকো-রোমান স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন টেম্পল অব বেল সিরিয়ার পালমিরায় অবস্থিত। প্রথম খ্রিস্টাব্দে মেসোপটেমীয় দেবতা বেলের নামে নির্মিত এই মন্দিরটি বায়জান্টাইন শাসনামলে গীর্জা হিসেবে এবং মুসলিম শাসনামলে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে তালিকাবদ্ধ। ২০১৫ সালের আগস্টে আইএসআইএস পালমিরা দখল করে ‘ব্রাইড অব দ্য ডেজার্ট’ বা ‘পার্ল অব দ্য ডেজার্ট’ নামে খ্যাত এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে।

আঙ্কর ওয়াট

জঙ্গলে মঙ্গল জেনে হারিয়ে যাই অন্ধকারে
মেঘের আড়ালে বিষ্ণুলোকে
আমাকে কেউ আর পাবে না খুঁজে
আঙ্কর কঙ্করে শঙ্খধ্বনি
বৃষ্টি পড়ে পদ্মপাতায়
ভেজে চক্র ভেজে গদা
বৈষ্ণব পদাবলী বট আর ডুমুর শাখায়
অবতার বার্তা ওড়ে গরুড় পাখায়
তীব্র সৌন্দর্যব্যথা রাজার বক্ষে
চিরন্তন সূর্যবাসনা
নিখাঁদ স্বর্ণালংকার চাই
জীর্ণ পৃথিবীতে চাই স্বর্গশোভা
মেরুপ্রভা পুন্যশ্লোক
বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি
বোধিমন্ত্র যতোই উচ্চারিত হোক
যতোই বাড়ুক দর্শনার্থী ভিড়
আমি তিমিরেই থেকে যাবো
আমি আর মেলবো না চোখ
অঁরি মুহ সম্মোহিত বনান্তরে
মর্ত্যে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই!

angkor-wat.jpg
চারশো বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত আঙ্কর ওয়াট পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনা। ক্যাম্বোডিয়ায় অবস্থিত এই অপূর্বসুন্দর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় দ্বাদশ শতকে খেমের সম্রাট সূর্যবর্মনের রাজত্বকালে। এটি হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর নামে উৎসর্গিত। বিচিত্র নকশা ও ভাস্কর্যমণ্ডিত এই উপাসনাময়টি পরবর্তীকালে বৌদ্ধমন্দিরে রূপান্তরিত হয়। প্রায় চারশো বছর এটি ঘন জঙ্গলে আকীর্ণ ছিলো। উনিশ শতকের মাঝামাঝি অঁরি মুহ নামে এক ফরাসি পর্যটক এর তথ্য পশ্চিমে ছড়িয়ে দেন। এটি এখন ক্যাম্বোডিয়ার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams — এপ্রিল ২৮, ২০১৬ @ ৪:৫৫ অপরাহ্ন

      Is it a new dimension in modern Bengali poetry? I can see some attempts to make use of the far-fetched imagery as we find in the metaphysical poetry of the John Donne era and also in many poems of Jibanmanada Das (Is the spelling OK?). However, the five poems of Binoy Barman show that he has a good grasp of our ancient heritage. Congrtaulations to the poet.
      Shams Hoque

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — এপ্রিল ২৯, ২০১৬ @ ১১:১২ অপরাহ্ন

      কবি বিনয় বর্মনের পাচটি কবিতা পড়িলাম । কিম্ভুত কিমাকার প্রাণী, যাহাকে আমরা ধর্ম নামে জানিয়াছি, উহা যে মানব মনের ইতিহাস পরিভ্রমণ, তাহাই এইখানে অঙ্কিত হইল । কবিতাগুলো যদিও সচেতন মনের কাজ, তবুও ভালো লাগিয়াছে । “টেম্পল অব বেল” কবিতাটির প্রতি আমার পক্ষপাত থাকিয়া গেল । বন্ধু বিনয় বর্মন, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা তুমুল ভাবেই রহিয়া গিয়াছে !

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com