মনির ইউসুফের গুচ্ছ কবিতা

মনির ইউসুফ | ১৭ এপ্রিল ২০১৬ ২:২০ অপরাহ্ন


আমার মনের সৈকতে

painting1.jpgআমার মনের সৈকতে এত অবাধ্য ঢেউ বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতার জোয়ার নিয়ে আসে
পৃথিবীর সমস্ত সতেজ বাতাসে মাখামাখি করে পুরো শহর, তখন আমার মন
অতীতের জাহাজের দিকে ফিরে যায়;

যখন আমার পূর্বপুরুষ মাছের ঝাঁক তুলে নিত জাহাজে জাহাজে
দিগন্তের ভেতর দিয়ে তারা আবার ফিরে আসত কূলে
তীরে ফিরে আসার আনন্দে জেলেনীর সঙ্গে মিশত, তখন কি উজ্জ্বল তাদের মনের উল্লাস
কূলে ফেরার আনন্দ জীবন ও যৌবনে, আরা রাঙা বুকে শরীরে রোদেপোড়া চামড়ায়
কোচকানো উজ্জ্বল চোখে, আমাদের জেলেনীর বুকে তখন অনাগত স্বপ্ন দোল খেত

সেই সমুদ্র তীর এখন আধুনিক শহর, শতাব্দী কালব্যাপী ব্যাপ্ত থেকে ভাঙাগড়ায়
এক কথার মানুষ সরল জেলে ও জেলেনী এখন স্কুল মাষ্টার, উকিল, বড় ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ কেরানি
ঔপনিবেশিক হীনমন্যতার ভেতর বেড়ে ওঠা বিভিন্ন পদবীধারী আধুনিক মানুষে রূপান্তরিত

সাগর সেই আগের মতই গর্জন করে, আমরাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছি ব্যাপ্তির বিন্যাসে
আমাদের পুরোনো সব মূল্যবোধ দেখে আমরা নাক ছিটকাই, হীনমন্যতায় নিজেদের ছোট করতে থাকি
আধুনিকতার নামে সভ্যতাকে গ্রহণ করতে গিয়ে সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলেছি
উপড়ে ফেলেছি মায়ের চোখে চোখ রেখে পরিতৃপ্তির শান্ত ও স্নিগ্ধ বিশ্বাস

আমার মনের সৈকতে যে তাজা বাতাস বহে তার বুকে হাত বুলাতে বুলাতে ভাবি
আধুনিক হতে গিয়ে কর্পোরেটের কাছে আমরা কি পরাজিত হয়ে গেছি
আমরা কি আত্মসমপর্ণ করেছি বহুজাতিক কোম্পনির কাছে !…

আমার ভাষা

আমার বৃদ্ধ মা আমার জন্য আকুল হয়ে চিন্তায় মগ্ন থাকে
বিয়ে করতে পারিনি বলে ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে
অসুস্থ হয়ে পড়ে প্রায়

বঙ্গোপসাগরীয় ভাষায় আমার ভবিষ্যৎ সুখের জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে
আমিও মা’র কাছে গেলে শিশু হয়ে ওঠি বঙ্গোপসাগরীয় বাংলার বদলে
বঙ্গোপসাগরীয় চাটি ও রোয়াই ভাষায় মার সঙ্গে কথা বলি

এই ভাষা এত আপন, মা ও আমার মধ্যে ভাষার দূরত্ব থাকে না আর
বাংলা ভাষার উচ্চারণ এখনও শিখতে পারিনি বলে
সিসাগলা পূজেঁভরা রাজধানীতে আমাকে কত কথা শুনতে হয়
সাম্প্রচারিক মিডিয়ার শিকার এদেশের মানুষের মুখে

আমি ভাবতেই পারি না, মাতৃভাষাকে আলাদা করে আমার নতুন ভবিষ্যত
কারণ আমার ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গোপসাগর এবং সাত সমুদ্রের তাজা বাতাস
আছে মৈনপাহাড়, চাষের জমি, পাহাড় ও সমুদ্র বাতাসের অবারিত শিসধ্বনি

আমার ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গৃহপালিত পশুর ডাক এবং
শিকারী মুরগি ও পাড়ায় পালিত মোরগের ডাক
জড়িয়ে আছে আমার বাবার একজীবনের দুঃখ, গ্লানি, কষ্ট ও সুখ

আমার চাচা ও ফুফুর দুঃখ, পাড়ার মানুষের দুঃখ ও উৎসব
আমার ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক দুর্দশা ও অর্থনৈতিক মুক্তি

শোন, গোপনে বলি- আমার ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার হৃদয়
আমার প্রেম, আদর ও চুমো, প্রেয়সীর ঠোঁটে ঠোঁট রাখার সুখ
আর সমাজকে ভেঙে চুরে তছনছ করে ফেলার শক্তি

সাহসী ও অবাধ্য নতুন এক পৃথিবী

আমার জন্য প্রতিটি ভোরই নতুন ভোর, প্রতিটি স্বপ্নই নতুন স্বপ্ন
কেননা আমি, আমার কৃষক ও ধার্মিক বাবা থেকে শূন্য হাতেই যাত্রা করেছি
যে কোনো সামন্তীয় সন্তানের মত বাপ থেকে পঞ্চাশ কিংবা
আশি ভাগ সম্পদ ও সমৃদ্ধি নিয়ে পথ চলতে পারিনি

তাই, সমস্ত বিভোরতার ভাঁজে ভাঁজে আঁকা থাকে আামার কষ্টে জয় করা দর্পিত পদচিহ্ন
আমার পৃথিবী তাই সাহসী ও অবাধ্য নতুন এক পৃথিবী

তোমরা যারা আমার বিপদ দেখে দূরে সরে যাও, কুৎসা রটাও আমার বিরুদ্ধে
তোমরা কেউ আমার প্রতিদ্বন্দী নও, তোমাদের বেগানা ঈর্ষা ও নিরর্থক সময়ক্ষেপণ
আমাকে সামনে চলতে আরও বেশি তেজোদীপ্ত করে দেয়

আমার প্রতিদ্বন্দী যদি কেউ থেকে থাকে তা সেই মহাকাল
সেই মহাকাল জয় করাই আমার লক্ষ্য, হে ক্ষুদ্র রুগ্নমানসিকতার শিল্পসেবী
তোমাদের নিয়ে আমার ভাববার সময় কই
তোমরাও অযথা আমায় নিয়ে তোমাদের সময় নষ্ট করেছ
আর নিজেদের মুখ নষ্ট করেছ

যদিও আমি পৃথিবীর সমস্ত অপরাধে অপরাধী তবুও বলতে চাই
আমাকে অতটা বাজে ভেব না,
সুন্দরের স্বপ্ন আঁকতে আঁকতে বুক ঘষে ঘষে পথ চলা আমার
সুন্দরের জন্য ছুটতে ছুটতে শিল্পজীবনে কাহিল হয়ে পড়া

যার যার পথ তার তার, যার যার স্বপ্ন তার তার বলে
নিজেকে যতই বিনয়ী করে তুলি ততই দ্বগ্ধ হতে থাকে বুক

এই দ্বগ্ধ সময় কেটে যে সুবেহ সাদেক আসে সেই সুবাহ থেকে প্রতিটি সুবাহ
প্রতিটা ভোরই যেন সাহসী অবাধ্য এক নতুন ভোর

সমাজবদ্ধ বেদনা

মানুষের শিরায় শিরায় অবাধ্যতা, কেশে কেশে শিহরণ
কি করে তাকে বাধ্য করবে পৃথিবী,
কি করে তাকে করবে গ্রহণ
পুষ্পবাগানে আরক্ত সে, সৃষ্টিশীলতায় অন্তহীন

সাতষট্টি অশ্বমেধ জাহাজের চেয়েও দ্রুত তালে চলে তার চিন্তা
মানুষ ভ্রমণ করে মনোচোখে
তিনভুবনের মসজিদ মন্দির গির্জা

শালিক ঘুঘু টিয়ে হরিৎবন চারণভূমি
আবাদী এই সমাজবদ্ধ বেদনা
তাকে গ্রহণ করে না,
গ্রহন করে না সময়সিদ্ধ কোন স্বাধীন অধীনা

গুহা থেকে বের হয়ে নারী ও পুরুষ যেমন শরীর ঢেকেছিল বল্কলে
তেমনি বনের আরক্ত গোলাপকে বাগানে তুলে এনে
মানুষ বাধ্য করতে চেয়েছিল
পারেনি
সে এখন আরও বহুগামী
নরকের কাঁটাঝোপে সচেতন ঢুকে পড়ে
বাধ্য সে কখনো হতে পারে না

সচেতন সে, আত্মসচেতন নয়
তাই, তার কাছে নরক প্রিয় দেবালয়

সমাজবদ্ধ দুঃখ কাতর এই আর্তনাদ বেদনা ও বিষাদে উড়ে
এই যুগেও যাদের হৃদয় গুহার অন্ধকারে ঢাকা
আত্মার ঐশ্বর্য পায়নি খুঁজে
তারাই উপেক্ষায় ফেলে রাখে মানুষের সকল অধিকার ও সম্ভাবনা
আলোকায়নটাই মানুষের জন্য এক আশ্চর্য নরক।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদ আনোয়ার — এপ্রিল ১৭, ২০১৬ @ ৫:৫৯ অপরাহ্ন

      ‘আলোকায়নটাই মানুষের জন্য এক আশ্চর্য নরক।’
      খুব ভাল লাগল প্রতিটি কবিতাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিষাদ আব্দুল্লাহ — এপ্রিল ১৯, ২০১৬ @ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

      প্রতিটি কবিতা।সত্যের সমান, বাস্তবতার মুখ….
      কবি, অনেক অনেক ভালো লাগলো, শুভ কামনা আপনার জন্য…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zulqar Zillu — এপ্রিল ১৯, ২০১৬ @ ১২:৪১ অপরাহ্ন

      কবিতায় সমাজের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে,যা সবাই হয়তবা পারে না,কবিতা পড়ে মনে হল এ যেন আমার কথা। এই কবি বেঁচে থাক অনাদিকাল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু এম ইউসুফ — এপ্রিল ১৯, ২০১৬ @ ৭:৫১ অপরাহ্ন

      প্রতিটি কবিতা ভাল লাগলো। দেশ ও সমাজ চেতনার সুন্দর এবং সাবলীল অভিব্যক্তি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com