হোর্হে লুইস বোর্হেস: লেখক যখন চিত্রশিল্পী

জাকিয়া সুলতানা | ১৭ এপ্রিল ২০১৬ ৯:০৩ অপরাহ্ন

প্রবল সৃষ্টিশীলতা অনেক সময়ে একইসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন রূপের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করতে চাইতে পারে। যৌবনকালে রবীন্দ্রনাথ একবার(১৮৯৩) লঘুভাবে লিখেছিলেন, `muse’-দের মধ্যে কোনওটাকেই তিনি নিরাশ করতে চান না, সবকিছুরই চর্চা করতে ইচ্ছে করে, এমনকী ছবিরও। সে-ইচ্ছেকে অবশ্য বহুকাল পরে চরিতার্থ করে তুলেছিলেন। তিনি, এঁকে ফেলেছিলেন দু-হাজারেরও বেশি ছবি, ‘Volcanic irruption’ বলে যার বর্ণনা করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ।
তাহলে এইভাবে, কবিতা লেখার বাইরেও যেতে চান কবি, শিল্পরচনার বাইরেও যেতে চান শিল্পী। পৃথিবীজোড়া শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে এমন যাওয়া-আসার অনেক উদাহরণ পড়ে আছে আমাদের চোখের সামনে ।
( শঙ্খ ঘোষ, অল্পস্বল্প কথা, প্রকাশনী: পাঠক, কলকাতা, প্রকাশকাল: বইমেলা জানুয়ারি ২০১৬, পৃ ৪০)

borges-4.pngবিশ শতকের বিদেশি লেখকদের মধ্যে আমাদের মনে পড়বে কাফকার অসামান্য স্কেচগুলোর কথা, মনে পড়বে আরও অনেকের নামই। কিন্তু আর্হেন্তিনার হোর্হে লুইস বোর্হেস যিনি আমাদের কালের নেতৃস্থানীয় কথাসাহিত্যিক ও কবি হিসেবেই বেশি পরিচিতি, তিনিও যে আঁকার হাতছানির কবলে পরেছিলেন সেটা তার লেখক পরিচয়ের মতো অতটা ব্যাপক নয়।
border=0
চার বছর বয়সে আঁকা বোর্হেসের একটি ড্রয়িং। তার এই সময়ের আঁকা ড্রয়িংগুলো সম্পর্কে মা লেওনোর আসেবেদো দে বোর্হেস স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, “মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে শুয়ে নানা সব প্রাণীদের ছবি আঁকতো আর সবসময় প্রাণীদের পা আঁকার মাধ্যমে শুরু করতো উল্টোদিক থেকে। সর্বোপরি আঁকতো বাঘ, বাঘই ছিল ওর প্রিয় জন্তু।”
এমনকি এও আমাদের কাছে অজ্ঞাত ছিল যে বোর্হেস চার বছর বয়সেই চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখার, মানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এঁকেছিলেন তার স্কুলের খাতায়। শৈশবের সেই বাঘ তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে আমৃত্যু। ফলে তার একাধিক গল্পে আর কবিতায় বাঘ এসেছে ফিরে ফিরে।
untitled-2.jpg
untitled-3.jpg
উপরে চার বছর বয়সে আঁকা বোর্হেসের অন্য ‍দুটি বাঘের ড্রয়িং

কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। চিত্রশিল্পের প্রতি তার আকর্ষণের কথা জানা থাকলেও এই শিল্প চর্চার কথা আমাদের কাছে অজ্ঞাতই ছিল। যদিও সকলেই জানেন যে তার ছোট বোন নোরা বোর্হেস ছিলেন চিত্রশিল্পী।
border=0
১৯০৬ সালে সাত বছর বয়সে বোর্হেসের আঁকা পিতা হোর্হে গিইয়ের্মোর প্রতিকৃতি

কিন্তু বোর্হেসও তা-ই ছিলেন? রবীন্দ্রনাথ অঙ্কনদেবীকে নিরাশ করতে চাননি বলে শেষ জীবনে তুলি হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু বোর্হেসের ব্যাপারে ঘটনা ছিল ঠিক উল্টো। তিনি প্রথম জীবনেই ধরেছিলেন তুলি। আর শেষ জীবনে স্থিত হয়েছিলেন শব্দের জাদুকরী দুনিয়ায়, রং হয়তো এখানে নেই, কিন্তু ছিল শব্দ ও কল্পনা দিয়ে ছবি তৈরির আশ্চর্য জগত।

borges-1.gif
চিত্রকর্মটি নতরদেম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সংগ্রহ থেকে নেয়া।
border=0
১৯১৫ সালে আঁকা বোর্হেসের কয়েকটি প্রতিকৃতি
গোয়েন্দা উপন্যাস, কাউবয়দের( Gaucho) জীবনযাপন, গ্রন্থাগার অথবা বিভিন্ন রকম জটিল ধাঁধার প্রতি হোর্হে লুইস বোর্হেসের মোহ ছিল দুর্বার এবং এগুলো তাঁকে খুবই আকর্ষণ করে গেছে আমৃত্যু। এর পাশাপাশি আরও দুটি বিষয় তাঁর মনকে আলোড়িত করেছিল, তা হলো আর্হেন্তিনার ট্যাঙ্গো নৃত্য এবং বিভিন্ন পুরাণের দানব, যা পাণ্ডুলিপির পাতায় তিনি এঁকেছিলেন। আর্হেন্তিনীয় ভোগবিলাসী নৃত্য ট্যাঙ্গো, যার সূচনা হয়েছে মূলত গনিকালয়ে, পাণ্ডুলিপির পাতায় তিনি ট্যাঙ্গো নৃত্যরত যুগলের ছবি এঁকে এর উপরে লিখেছিলেন, ” ট্যাঙ্গো গণিকালয়ের নাচ এবং এতে আমার কোন সন্দেহ নেই।”

border=0
১৯২৬ সালে আঁকা বোর্হেসের একটি ড্রয়িং

বিভিন্ন উপলক্ষ্যে বোর্হেসের এই দাবীর পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাবো পরবর্তীকালেও। ১৯৩০ সালে বোর্হেসের লেখা এবারিস্তো কাররিয়েগো ( Evaristo Carriego)র জীবনীতে তিনি বলেছিলেন যে, “আমার তথ্যদাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত যে ট্যাঙ্গোর উৎপত্তি গণিকালয়েই।”

কেন এই ইতিহাস বোর্হেসকে এতটা আলোড়িত করেছে তা আমাদের জানা নেই তবে এটা জানি যে, একবার ১৯৬৫ সালে তিনি আর্হেন্তিনীয় সুরকার (কম্পোজার) আস্তোর পিয়াসসোলা’র একটি ট্যাঙ্গো অ্যালবামে সহযোগিতাও করেছিলেন।

borges-2.jpg
উপরে বোর্হেসের আরেকটি স্কেচ রয়েছে। এটা অবশ্য ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্হেসের বিস্তীর্ণ সংগ্রহশালা থেকে গৃহীত। এই চিত্রকর্মটিও ১৯৪৬ সালে লিখিত ‘আর্হেন্তিনীয় পুরনো অভ্যাস’ শীর্ষক আরেকটি পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যায় এবং ১৯৫২ সালে বোর্হেসের প্রবন্ধ সংকলন অন্যান্য তদন্ত( Other Inquisitions ) নামক বইয়ে “Our Poor Individualism” নামে প্রকাশিত হয়েছিল।

সি. জার্ড লোয়েস্টাইনের মতে এই চিত্রকর্মটি জার্মান ভাষায় “Die Hydra der Diktator” বা একনায়কতন্ত্রের হাইড্রা* নামে পরিচিত ছিল এবং বহুমস্তকবিশিষ্ট এ প্রাণির প্রতিটি মাথায় রোজাস, (হুয়ান) পেরন, (বেনিতো) মুসোলিনি, (এডলফ) হিটলার এবং (কার্ল) মার্ক্স চিহ্নিত হয়েছে এবং এটি “হোর্হে লুইস বোর্হেস-৪৬” নামে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

border=0
১৯১২ সালে বোর্হেসের আঁকা আরেকটি প্রতিকৃতি

লোয়েস্টাইন বলেছেন, বোর্হেসের এই চিত্রকর্মের মূলভাব বেশ তীর্যকতা পেয়েছে রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে অথচ বোর্হেসকে কিনা প্রায়শই অরাজনৈতিক বলে নিষ্প্রভ করে রাখা হয়।
এটা উল্লেখযোগ্যভাবেই বিস্তারিত চিত্রাভাস, বিশেষ করে যারা বোর্হেসের মতো সেইসময়ে তাদের দৃষ্টিশক্তি খুইয়েছে। এই বিস্ময়কর বর্ণনা বোর্হেসের সেই বার্তার সাথে মিলে যায় যে আর্হেন্তিনিয়রা নিজেদের কোনো বিশেষ জাতির নাগরিক হিসেবে না দেখে বরং একক ব্যক্তিসত্তা হিসেবেই দেখে।

(ওপেন কালচার ওয়েবসাইট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে।)

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত জাকিয়া সুলতানার আরও লেখা:
মাইকেল ম্যাকক্লুরের কাব্য: এক বিজ্ঞানীর দৃষ্টি

আন্তর্জাতিক পপ আর্ট: ওয়্যারহোল ও লিচটেন্সটাইনকে পেরিয়ে

আই হেট দ্য ইন্টারনেট

সোনার মানুষের খোঁজে

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — এপ্রিল ১৭, ২০১৬ @ ১০:০৩ অপরাহ্ন

      লেখাটি তথ্যবহুল। তবে রবি ঠাকুরের আঁকা ছবির মতো বোর্হেসের শিল্পকর্ম আমার ভালো লাগেনি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাকিয়া সুলতানা — এপ্রিল ১৮, ২০১৬ @ ২:৫৭ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ, দুলাল ভাই।
      স্বনামধন্যতার কারণে রবি ঠাকুরের ছবিগুলো আমাদের চোখে পড়েছিল প্রথমে, যদিও এগুলোর শিল্পমান ও অভিনবত্ব নিয়ে আজ আর কোনো সংশয় নেই।
      লাতিন আমেরিকান এ কথাশিল্পীর ক্ষেত্রে হয়তো তেমনটা বলা যাবে না। তবে অভিনবত্ব না থাকলে আঁকায় তার দক্ষতা যে ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই লেখাটিতে তিনি কি এঁকেছেন তার চেয়ে বরং বিষয়বস্তু নিয়েই এখানে আমাদের কৌতূহল বেশি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন SABIHA SULTANA — এপ্রিল ১৮, ২০১৬ @ ১:১৯ অপরাহ্ন

      অভিনবত্ব বলতে যা বুঝায় রবি ঠাকুরের চিত্রকর্মে তার যথার্থই প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু লুইস বোর্হেসের চিত্রকর্ম, রবি ঠাকুরের চিন্তাধারার বিপরীত না হলেও আমার ভিন্ন বলেই মনে হয়। ভিন্ন ভিন্ন তাত্পর্য বহন করে। ধন্যবাদ জাকিয়া সুলতানা অনেক নতুন তথ্য পেয়েছি। আরও লেখা আশা করছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাকিয়া সুলতানা — এপ্রিল ১৮, ২০১৬ @ ৪:৪৪ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ, Sabiha Sultana আপনার মন্তব্যের জন্য।
      বোর্হেসের চিত্রকর্মের ব্যপ্তি হয়তো বেশি নয় তবে তাঁর আঁকা স্কেচসমূহে অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ripon Kumar Aich — এপ্রিল ১৯, ২০১৬ @ ৩:০০ অপরাহ্ন

      It’s a nice presentation. We hope that you’ll inform us in future about extra-ordinary arts related matters by your writing. Thanks

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — এপ্রিল ২৩, ২০১৬ @ ৬:১২ অপরাহ্ন

      Borges was a hydraheaded literary and artistic genius from his philosophic stand as Tagore was. Borges was a great observer of Shakespeare also whose four hundredth death anniversary the world is observing.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com