ঝড়ের পর ঝড়

মতিন রহমান | ১১ মার্চ ২০১৬ ৬:২৪ অপরাহ্ন

khalid-mahmud_mithu.jpg৭ মার্চ, খবরে প্রকাশ গত রাতের ঝড়ে রাজধানীর রামপুরায় নির্মানাধীন ভবনের ওপর থেকে রেলিংসহ ভিমের কিছু অংশ ভেঙে পড়ে কারিশমা (৪) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে । ৪ নং ধানমন্ডি সড়কে একটি কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষ ঝড়ের ঝাঁকুনিতে নড়ে উঠেছে। নড়ে ওঠা বৃক্ষকে পথচারী জিজ্ঞাসা করলো, বৃক্ষ তোমার বয়স কত? বৃক্ষটি উত্তর দিল, জানি না। জানে আমার নগর পিতা। যিনি আমাকে রোপণ করেছে। নগর পিতা, আপনি কি জানেন, এই মহানগরের বৃক্ষগুলোর কোনটার কত বয়স? কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ আছে কি আপনার নগর ভবনের বৃক্ষ রোপণ লেজার বইয়ে? গৃহায়ন অধিদপ্তর ও রাজউক তো জানে এই শহরে কতটি ইমারত আছে। শহরের কোন কোন ইমারত ঝুঁকিপূর্ণ। আপনার শহরে প্রতিবছর ঘটা করে বৃক্ষ রোপন উৎসব হয়। অথচ আপনার কর্মীদের জানা নেই এই শহরে কোন বৃক্ষ হঠাৎ বয়সের ভারে ঢলে পড়বে এবং আপনার সন্তানের প্রাণহানি ঘটাবে। যদি জানতেন তাহলে ঝড়ের পড়েই বেড়িয়ে পরতো আপনার বেতনভুক্ত কর্মীদল। খবর নিতে ছুটতো কোন বিদ্যুতের খুটি অথবা বৃক্ষগুলো নড়ে উঠেছে। নগর পিতা যদি এই খবর নিতে পারতো তাহলে জাতীয় চলচিত্র পুরুস্কার প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুকে উপড়ে পড়া বৃক্ষতলে প্রাণ হারাতে হতো না।

তবুও ভালো বৃক্ষ চাপা পড়া মিঠুকে নিয়ে গল্প লেখার পরিবেশ তৈরি হবার সুযোগ আপনারা দেন নাই । কোন গল্প? ঐ যে- সেই উর্দুকথা সাহিত্যিকের গল্প। ঝড়ে উপড়ে পরা বৃক্ষে পথচারী চাপা পড়লো। বাঁচাও বলে চিৎকার দিল। খবর পেয়ে পৌর কর্মকর্তারা দ্রুতযানে ছুটে আসলো। ফিল্ড জরিপ হল। ইশতেহার লিখে পাঠ করা হল। পড়ে থাকা বৃক্ষটি সরিয়ে পথচারীকে বাঁচানো পৌর বিভাগের কাজ দায়িত্বে পড়ে না। ইহা বন বিভাগের কাজ। বনবিভাগ আসলো ঘটনাস্থল জরিপ করে ঘোষণা দিলো বৃক্ষ সরানোর এবং আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার বন বিভাগের কাজ নয়। হতে পারে এটা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাজ। ত্রাণ মন্ত্রণালয়, বন মন্ত্রণালয় এবং পৌর বিভাগে শুরু হল নথি চালানো যুদ্ধ। যুদ্ধ সমাপ্তির পূর্বে বৃক্ষ তলে আটকে পড়া পথচারীর প্রাণবায়ু ততক্ষনে মহাশূন্যে মিলিয়ে গেল।

খালিদ মাহমুদ মিঠু, তোমার মত সতেজ প্রানবন্ত শক্তিশালী যুবকের প্রানটা একটা বৃক্ষ কেড়ে নিবে তুমি কখনো ভেবেছিলে? রিক্সাতে বসে কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষটি দেখে খন্ড চিন্তায় লাল রঙ দিয়ে শিল্পের তাগিদে তুমিতো প্রচালিত কক্ষ পথ ভাঙ্গতে চেয়েছিলে। তোমার ভাবনাটা জমাট বাধার সন্ধিক্ষণ মুহূর্তে তুমি বৃক্ষ তলে চাপা পড়লে। মাত্র একশো গজ দূরত্বে অতি আধুনিক ল্যাব এইড হাসপাতাল এবং গণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও তোমার প্রাণবায়ু আমরা ফিরে পেলাম না। বিধাতা রচিত চিত্রনাট্যের এটাই ছিল থ্রি অ্যাক্ট রিসলিউশান।

তোমার মত অগ্রসর চিন্তার শিল্পী ঝড়ে নড়ে থাকা শেকড়শূন্য বৃক্ষতলে চাপা পড়ে মারা যাবে এটাতো শিল্প সংস্কৃতি জগতে পূনঃঘটিত ঘটনা। কেনই বা তোমাদের স্বাভাবিক পরিণত মৃত্যু হবে। তোমরা কেউ মরবে সিনেমার লোকেশান দেখে ফিরতে বাসের ধাক্কায়। কেউ প্রাণ হারাবে ট্রাকের ধাক্কায় পানিতে ডুবে। কেউবা বড় ভাইকে খুঁজতে নিখোঁজ হয়ে যাবে। এ সবই আমাদের সয়ে নেওয়া, বুঝে নেওয়া ট্রাজেডি। আমরা সব বুঝি। কষ্ট পাই। তোমাদের মত শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারিয়ে মন কাঁদে। আবারো আমরা অপেক্ষায় থাকি আচমকা ধাক্কায় কোন শিল্পী ধ্বসে পড়ে। প্রাণটা তার উড়ে যায়।

মিঠু, তুমি বৃক্ষতলে চাপা না পড়ে হাওড়ে ডুবতেও পারতে। শুনতে পেতে হাওড়ে গহীণের শব্দ। ট্রাকের ধাক্কায় যেমনটি ডুবে ছিলো মুন্নি ভাবী, অভিনেত্রী টিনা খান এবং তোমার মামা চলচিত্র শিক্ষক পরিচালক আলমগীর কবির। কারন তুমি যখন রিস্কাতে বসেছিল তখন তোমার ভাবনায় উঁকি দিচ্ছিল ইমপ্রেস টেলিফ্লিম-এর গল্পটি ‘গাঙের মানুষ’ চিত্ররূপ দেবার পরিকল্পনা । ক’দিন পরেই তুমি ‘গাঙের মানুষের’ চিত্ররূপ দিতে ছুটে যেতে বন জঙ্গল কিংবা হাওড়ের কুল কিনারে। এমনতো হতে পারতো তোমার জীবনের শেষ শটটির চিত্রগ্রহণকালে তুমি একটা বেগবান ট্রলারে ধাক্কা খেতে। ট্রলারের ধাক্কায় ক্যামেরাসহ দরিয়ার ডুবে যেতে। ফরিদুর রেজা সাগর তোমাকে উদ্ধার করতে নৌবাহিনির তল্লাশি টিম নিয়ে ছুটে যেতো। যেমন করে তিনি ছুটেছিলেন মসজিদ থেকে তোমার মরদেহ তোমার ফ্লাট উঠোনে রাখতে। ইমাম সাহেবের হাত ধরে জানাজায় দাঁড় করাতে।
মিঠু, তুমি দেশ বিদেশে কনকভাবীকে নিয়ে কত চিত্র প্রদর্শনীতে গেছো। মিনিয়েচার শিল্পসহ দেশে কত চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। অথচ তোমার আয়োজন ছাড়া তোমারই ৪নং ধানমন্ডি ফ্লাট বাড়িতে ৭মার্চ একটা প্রদর্শনী হয়ে গেল। ছবির হাট নয়, শিল্পের প্রদর্শনী নয়। বসেছিল শিল্পীর হাট। সবাই এসেছিল তোমাকে নিয়ে বিধাতার আঁকা একটি চিত্র দেখতে। খাটিয়ার পাটাতনের চেয়ে দীর্ঘ সাদা কফিনে মোড়ানো একটা লম্বা দেহ। স্পষ্ট কালো ভ্রু। কোকরানো বাবরি চুল। নাকটা সাদা খন্ড কাপড়ে শক্ত করে বাধা। কেন বাধা ছিল? নাক দিয়ে নাকি রক্ত ঝরছিল। গলগল করে লাল রক্ত। তোমার মস্তিষ্কের কোটরে স্বপ্নগুলো লাল রং হয়ে জমেছিল। তুমিতো কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষটি দেখে ৭ই মার্চ-এর ভাষণ মনে করে একটা চিত্র আঁকতে চেয়েছিল। তোমার নাকের ছিদ্র পথে সেই লাল রংয়ের ক্ষরণ ছিল যা দেখে তোমার প্রিয় শিল্পী সুবর্না, তারিন, সুইটি, কুসুম শিকদার গ্লিসারিন ছাড়া কেঁদেছিল। তোমার শিক্ষক অনেকের মতোই জ্ঞানতাপস মোস্তফা মনোয়ার আবেগটা সামলে রাখতে সর্বক্ষণ চুইংগাম চিবিয়ে নিজেকে সামাল দিয়েছিল। অনেক আলোকচিত্রীর সাথে স্টামফোর্ড ফিল্ম এন্ড মিডিয়ার ছাত্ররা তোমার ক্লোজ শটে আলো ফেলে এক্সপোজার মিলিয়ে নিয়েছিল। তখন তুমি ছিলে গহীনে চিরঘুমে। জেগে থাকলে ধমকে দিয়ে বলতে তোমাদের ক্যামেরার কম্পোজিশান ঠিক কর। অ্যাপারচার অ্যাডজাস্ট করো।
খালিদ মাহমুদ মিঠু, তোমাদের মত আগুয়ান শিল্পীরা আমাদের ধাক্কা দিয়ে চলে যাবে এটাই প্রচলিত সত্য। আমাদের জীবন অভিজ্ঞতার পুরাতন বিশ্বাস। তোমাদের মত শিল্পীদের হারানোর শংঙ্কা ও সন্দেহ ভয় নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকা এবং মানসিক উৎকণ্ঠা। তারেক মাসুদ, মিশুক মনির, আলমগীর কবির, টিনা খান অথবা জহির রায়হানের মত শিল্পীদের নিমজ্জনের করুন চিত্রপাঠ। এই আমাদের প্রিয় নগর জনপদের ক্ষমতাবানদের দোষশূন্য ‘সিনোপসিস’।
তারপরও ঝড়ের পর ঝড় আসবে। ধাক্কা আসবে। আবারো আমরা কাউকে অকালে হারাবো। আমাদের জীবনের অতীত অভিজ্ঞতাগুলো আরো পুরাতন হবে। আমরা শুধু তোমাদের হারাতেই এসেছি। এই বিশ্বাসগুলো দৃঢ় হবে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — মার্চ ১১, ২০১৬ @ ৭:৫৬ অপরাহ্ন

      মিঠু চারুকলা থেকে পড়াশোনা করলেও তার প্রথম প্রদর্শণী ছিলো আলোকচিত্র প্রদর্শণী। আর তা হয়েছিলো বাংলা একাডেমীর বইমেলার সময় প্রবেশ পথে পোষ্ট অফিসের পর দেয়াল ঘিরে। আমি তখন সাপ্তাহিক পূর্বাণীতে একটা রিপোর্ট করেছিলাম। সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্বের শুরু। আর এই বন্ধুটির সাথে দেখা হলো গত বছর। আমি বল্লাম- তোমার যে দারুণ নায়কোচিত চেহারা, তাতে তোমার অভিনেতা হবার কথা। আর তুমি হলে পরিচালক! মিঠু হেসে বলেছিলো, ‘সবাইকে দিয়ে সব কিছু হয় না। যেমন ঠিক মতো ছবিটাও আঁকা হলো না!’

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com