একো-কে নিয়ে এক চিলতে

আলম খোরশেদ | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ৬:১৭ অপরাহ্ন

umberto-eco.jpgনয়ের দশকের মাঝামাঝি নাগাদ দ্বাদশ কাহিনি নামে সমকালীন বিশ্বের ছোটগল্পের একটি তরজমা সঙ্কলনের কাজ হাতে নিয়েছিলাম। এই সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্তির প্রধান পূর্বশর্ত ছিল অর্ন্তভুক্ত লেখকদের অবশ্যই জীবিত এবং সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় থাকতে হবে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার গল্পকার ও গল্প নির্বাচন হয়ে গেল সহজেই। গোল বাঁধল ইউরোপে, বিশেষ করে ইতালিতে এসে। গুন্টার গ্রাস, মিলান কুন্ডেরা, সালমান রুশদির গল্প বাছার পর চেয়েছিলাম ইতালি থেকে তাঁদেরই মতো কোন ডাকসাঁইটে লেখককেই নির্বাচন করতে। তখন ইগনাসিয়ো সিলোন, ইতালো কালভিনো, প্রিমো লেভি কেউই বেঁচে নেই। মোরাভিয়া ও নাতালিয়া গীনসবার্গও গত হয়েছেন কিছুদিন হল। সবেধন নীলমনি বেঁচে আছেন উমবের্তো একো। অতঃপর তাই তাঁকে নেয়ার কথাই ভাবা গেল। একো The Name of the RoseFoucault’s Pendulum – এর মতো আকারে ও প্রকারে ভারি কিছু উপন্যাস লিখে ইতোমধ্যে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। এছাড়া ভাষাতত্ত্বে, বিশেষ করে Semiotics বা চিহ্নবিদ্যার পণ্ডিত হিসেবেও তাঁর নামডাক রয়েছে, বিশেষত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে। আশা ছিলো সেই একোর একখানা গল্প হয়তো যোগাড় করতে পারব। কিন্তু এ-লাইব্রেরী, সে-লাইব্রেরী তন্ন তন্ন করে খুঁজেও নিরাশ হতে হল শেষ পর্যন্ত। তবে শাপে বর হিসাবে এই অনুসন্ধানের সূত্র ধরেই হাতে এসে পড়েছিলো তাঁর অভিনব একটি গ্রন্থ্, যা পড়ে তাঁর গল্প না পাবার বেদনা ভুলে যেতে পেরেছিলাম বেমালুম।
বইখানার নাম Misreadings। তাঁর উল্লেখিত বইগুলোর মতো তেমন ঢাউস কিছু নয়। সাকুল্যে শ’ দুয়েক পৃষ্ঠা। গ্রন্থকারের মুখবন্ধ পড়ে জানা যায় ১৯৫৯ সালে ইতালির Il Verri নামক একটি সাহিত্যপত্রিকায় Diario Minimmo নামে প্যারোডিমূলক একটি কলাম লিখতেন তিনি, যার উপজীব্য ছিল সমকালীন লেখক, সাহিত্য ও সাহিত্যিকেরা। তো সেসব লেখারই একটি নির্বাচিত সঙ্কলন এই গ্রন্থখানি। এটি ঐতালিক ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। তার ঠিক তিরিশ বছর বাদে বাজারে আসে তার ইংরেজি অনুবাদ, বিখ্যাত William Weaver-এর দক্ষ অনুবাদে। মোট পনেরোটি রচনা স্থান পেয়েছে এতে। বিষয়বৈচিত্র্য, উপস্থাপনার অভিনবত্ব, ভাষার জৌলুস, সর্বোপরি মৌলিক কল্পনাপ্রতিভায় এর প্রত্যেকটি লেখাই আশ্চর্য সুখপাঠ্য ও ভাবনাসঞ্চারী হয়ে উঠতে পেরেছে।

একো তাঁর প্রথম প্যারোডি শুরু করেন নবোকভ-এর ললিতাকে নিয়ে। তবে এই ললিতা দিদিমার বয়সি, তাই নাম গ্রানিতা। প্রথম থেকেই নবোকভীয় উজ্ছাসপূর্ণ ভাষায় একো গ্রানিতার রূপ ও তার প্রতি নায়কের শরীরী আকর্ষণের এমন বর্ণনা দিয়ে যান যে, ঘুণাক্ষরেও সংশয় জাগে না নায়িকার বয়স নিয়ে। ধাক্কাটা লাগে একেবারে অন্তিম বাক্যে এসে, যখন একটি পার্শ্বচরিত্র বলে ওঠে –She is my Granny। একো সম্ভবত এর দ্বারা নবোকভীয় যৌনতারই একটি রসালো সমালোচনা উপস্থিত করতে চেয়েছিলেন। তেমনি আর দু’খানি তীব্র ব্যাঙ্গাত্নক অথচ গভীর মননশীলতায় উজ্জ্বল রচনা, Regretfully, We are Returning Your ও Three Eccentric Reviews। এতে তিনি এক কাল্পনিক প্রকাশক সেজে বাইবেল, ওদিসি, ডিভাইন কমেডি, দন কিহোতের মতো ক্লাসিক থেকে শুরু করে হালের প্রুস্ত, কাফকা বা জয়েস-এর বিখ্যাত গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিসমূহ ছাপার অযোগ্য বিবেচনা করে ফেরত পাঠাচ্ছেন তাঁর তীক্ষ্ণ, তির্যক মন্তব্য সমেত। এর ভিতর দিয়ে বস্তত একোর সাহিত্যচিন্তারই একটি বঙ্কিম আভাস মেলে। বোঝা যায়, আধুনিক সাহিত্যের যাবতীয় ফ্যাশনেরই তিনি ঘোর বিরোধী।

মার্কিন নভোচারীর চাঁদে অবতরণ-এর টিভি ধারাভাষ্য রচনার মধ্য দিয়ে একো আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর যে ঐতিহাসিক অবিচার ও অত্যাচার করেছিল শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা তার একটি ক্ষুরধার আলোচনা উপহার দেন। The Thing নামে একটি স্বল্পায়তন রচনায় আধুনিক বিজ্ঞানের বিধ্বংসী চেহারাটি তিনি উদোম করে দিতে সক্ষম হন। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও আশ্চর্য মৌলিক কল্পনাশক্তির অধিকারী একো তাঁর এই Misreadings গ্রন্থে বর্তমান বিশ্বের সাহিত্য ও সমাজের ভ্রান্তপাঠসমূহকে আমাদের সামনে হাজির করেন। সেই সঙ্গে আর যে কাজটি তিনি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন তা হলো হালকা ও চটুল ভঙ্গিতে, অত্যন্ত সরস গদ্যে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম, রাজনীতি, ইতিহাসের মতো সিরিয়াস বিষয়ের মৌলিক কিছু পর্যালোচনার উপস্থাপনা। সাহিত্যের অপরাপর রসগুলোর মধ্যে হাস্যরস ও ব্যাঙ্গরসের গুরুত্বও কম নয়। কিন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের সমকালীন সাহিত্য থেকে সেটা যেন ক্রমে হারিয়ে যেতে বসেছে। উমবের্তো একোর মতো একজন সিরিয়াস লেখক তাকে পুনরায় সাহিত্যসভায় সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করার সফল ও প্রশংসনীয় প্রয়াস চালিয়েছেন এই গ্রন্থে। এর জন্য তাঁর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই! সেই একো-ই এরকম বেরসিকের মতো দুম করে আমাদের বিদায়চিহ্ন দেখাবেন চিরদিনের জন্য, সেটা কিছুতেই মানা যায় না!
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৬ @ ১০:০৫ অপরাহ্ন

      শাহীন, (আলম খোরশেদ) বন্ধুবরেষু
      আপনি আমাদের অনেক ঠকিয়েছেন। সেই সব ‘দ্বাদশ কাহিনী/ দূর দিগন্তে/ জাদু পরবাস্তবতা’ থেকে কোথায় হারিয়ে গেলেন। আমরা বঞ্চিত হলাম আপনার অনূদিত এবং মূল্যায়নধর্মী সেই সব দুর্দান্ত বিদেশি সাহিত্য বিষয়ক লেখাগুলো থেকে।
      আপনি আবার ফিরে আসুন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com