প্রবাসে ঘুমহীন রাত

দিলরুবা আহমেদ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১১:৩০ পূর্বাহ্ন

ঝড়ো হওয়া বৃষ্টি অনেকটা থেমে এসেছে। এরই মুখে ছুটতে ছুটতে ওলিদ ঘরে ঢুকলো।
: লন্ড্রি থেকে কাপড় এনেছো?
কাজরী মাথা দোলালো, এনেছে সে।
: ড্রয়ারে দিতে পেরেছিলে?
এবার কাজরী ইংরেজি ‘এল’ স্টাইলে মাথা নাড়ালো।
ওলিদ রেইনকোর্ট খুলতে খুলতে হাসলো, বললো,
: মানেটা কি ? ঢুকিয়েই বের করে নিয়েছো?
জুতো খুলছে সে।
দরজা দিয়ে ঢুকতেই জুতা খোলার কাজটা করতে হয়। পুরো এ্যাপার্টমেন্টটাই কার্পেটে মোড়ানো। তাই করতে ওলিদ এবার হাতের একগাদা কাগজপত্র কাজরীর দিকে এগিয়ে দিল। লাইব্রেরি থেকে ফিরেছে, হাতে প্রচুর বই। যদিও বই রাখবার জন্য কোন বুক সেলফ এখনও নেই। ড্রইং রুমটা একেবারেই ফাঁকা। মাসখানিকও হয়নি এই এ্যাপার্টমেন্টে উঠেছে। দুই বেড়, ড্রইং, ডাইনিং নিয়ে ছোট এ্যাপার্টমেন্ট।
তবে এ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সটা অনেক বড়। প্রায় তিনশটা এ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। নাম উইনগ্রেন এ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স।
ট্রেক্সাসের আরভিং-এ যেসব বাঙালি প্রথম তাবু করেন তাদের অধিকাংশই বোধহয় এখানে প্রথম আসেন বসবাসের জন্য। দেশীয় একটা আমেজ আছে পুরো কমপ্লেক্স জুড়ে। উপমহাদেশীয় আবেদন বলা যায়।
: কী? লন্ড্রি রুম কি বন্ধ করে দিয়েছিল। রাতের আটটায় তো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।
লাইব্রেরীতে যাওয়ার আগেই ওলিদ কাজরীকে দেখিয়ে দিয়েছিল লন্ড্রি রুমের মেশিনগুলোর অপারেশন কি ভাবে করতে হবে। কাপড় ধোয়ার জন্য দিতে হবে ১ ডলার। চারটা কোয়াটার মেশিনে পর পর বসিয়ে সুইচ চালু করে দিলেই হবে। শুকানোর জন্য ড্রয়ারে ফেলতে হবে ৭৫ সেন্টস। তারপর অটোমেটিক বাদবাকী কাজকর্ম হয়ে যাবে।
: আটটা বিশে বন্ধ হয়েছে।
: তো ?
: তো এই ওয়াশিং মেশিন থেকে কাপড় বের করে ড্রায়ারে দিয়েছি, ১৫ মিনিট পরই দরজা লাগাতে একজন মেক্সিকান এলো।
: বলনি কেন তোমার আরও ১০/১৫ মিনিট লাগবে। কথা বলতে হবে তো।
দরজা বন্ধ করতে করতে কাজরী দেখলো, ঝড়ের বেগ আরো বেড়ে গেছে। বাইরে শো শো শব্দে ঝড়ো হওয়া বইছে। ভয়াবহ শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাজরীর কেন যেন মনে হতো আগে, এরকম ঝড় বৃষ্টির রাত শুধু কোন এক গন্ডগ্রামেই আসে, আমেরিকাতে আসে না। আশ্চর্য কেন যে এমন মনে হতো তার ! ভেবে আজ কাজরী নিজেই অবাক হয়ে যায়।
: আহ্, ভয়ে মরি এই রকম চেহারার এক লোক দেখে। আমি আর শুমাই কোন রকমে কাপড় চোপড় টেনে নিয়ে চলে এলাম, আবার কথা ! এর মধ্যে আবার কুকুরের ডাক হচ্ছিল, শুনে মনে হচ্ছিল শিয়ালের ডাক।
: চারদিকে এত এ্যাপার্টমেন্ট, এর মধ্যে ভয় পাচ্ছিলে! ওলিদ হেসে দিল।
: আরে, সব দরজা-জানালাই তো বন্ধ। কেউ বাইরে নেই। কী ঠাণ্ডা বাতাস, বজ্রপাত হচ্ছিল।
: তবুও ভাল, ভয়ে কোন সাড়া শব্দ না করে ভিতরে চুপ করে বসে থাকনি। আর কেয়ারটেকার এসে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে যায়নি।
শুমাই তার বাবার কথায় পিক করে হেসে দিল । পা ঝুলিয়ে বসে ছিল সে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে ।
ড্রইংরুমের সাথেই লাগোয়া ড্রাইনিং রুম আর কিচেন। পুরো ঘরে আছে শুধু চার চেয়ারের খুব সন্দর একটা সাদা রংয়ের ডাইনিং টেবিল আর দু’রুমে দুটো খাট। ওলিদ একটা কমপিউটার টেবিল কিনেছে কিন্তু এখনও কমপিউটার কেনেনি। সোফা নেই, টিভি নেই, খোলা ময়দান যেন। সবে তো এসেছে, যাক কিছু দিন। থাকবে, না দেশে ফিরে যাবে,তাই তো বুঝে উঠতে পারছে না। দেশে ছিল সবকিছু। এখন শূন্য থেকে শুরু করার আবার এক মহাযাত্রা কালের প্রথম পুরুষ যেন ওলিদ আর তার সাথে দাঁড়ানো কাজরী। শুমাইও বলেছে সে পারবে এই যুদ্ধে এগিয়ে যেতে। অযথা বহু জিনিষের জন্য বায়না করে পাগলপারা করে তুলবে না বাবা-মাকে। পাঁচ বছরের শুমু পারলে ৩০ বছরের ওলিদ তার বাপ হয়ে কেন পারবে না!! ২৭ বছরের কাজরীও পারবে আরেক যুদ্ধে যেতে। জীবন যুদ্ধে। জীবন বাজী রাখতে নয় তবে জীবনানন্দেই যাবে এই যুদ্ধে। অজানার পথে সাহসী হতেও এক প্রচণ্ড মনোবলের প্রয়োজন জয়ী হতে। ওরা তিনজন পরস্পরের জন্য তাই যেন যোগান দিতে তৈরি। এটাই জরুরী এখন, কাজরী বিশ্বাস করে এটাই সম্বল তাদের। এদেশে নেমে প্রথম দিনেই ওলিদ-কেও বলেছিল, আমাদের মনোবলই আমাদের সম্বল। ওমনি তা শুনে ওলিদ বললো, ‘সম্বল মোর কম্বল খানি’। কী রকম একটা মানুষ! এরকম সিরিয়াস একটা কথা শুনে হাসির কিছু বলে দিল। সেদিন যেমন রাগ করতে চেয়েও কাজরী রাগেনি আজও তেমনি মনে পড়াতে হেসে দিল। ভাল বলেছে ‘সম্বল মোর কম্বল খানি’।
সবে ঢাকা ছেড়ে এসেছে। এখনও কোন চাকুরি পায়নি দুইজনার কেউই , সহসা ক্লাশ শুরু হচ্ছে ,ওলিদদের মাইগ্রেশনটা না হলে ঢাকার এত ঠাট-বাটের জীবন ফেলে আসার কোন দরকার ছিল না। এদেশে তো আবার এদেশীয় ডিগ্রী লাগে ভাল চাকুরির জন্য। এদেশের ডিগ্রী না থাকলে ওলিদের এত দেশের এত পড়াশুনা সব অচল । ওলিদ পড়তে ভালবাসে, সে হয়তো পড়ে ফেলবে অনেক কিছু কিন্তু কাজরী আর চায় না পড়তে। এবার সে চায় বই থেকে মুখ তুলে দুনিয়া দেখতে, সাধারণ অসাধারণ যে কোন একটা চাকুরি নিয়ে আমেরিকার জীবনের পথ-ঘাট ঘুরে দেখতে। বাংলাদেশের এলিট বুর্জোয়া শ্রেণীর জীবন তার দেখা হয়েছে, মন চাইছে আম জনতার স্তরে নেমে এবার আরেকটা মহাদেশ দেখতে। হয়তোবা এদেশের প্রথম সারিতে পৌঁছাতে তার যে বহু পথ আরো পেরুতে হবে জেনেই কি মনকে বুঝিয়ে ফেলেছে শুরু করতে একজন সাধারণ মানুষের জীবন!! অট্টালিকা আর প্রাসাদের জীবন শেষ। এখন দুই রুমের ছোট এ্যাপাটমেন্টের জীবন। কিন্তু সে জানে এটাই হবে তার সুখী গৃহকোণ। হিসেব করে খরচ করাও শুরু করেছে।
এই বাজারে ১৫শ ডলার দিয়ে কমপিউটার কিনতে খুব টেনশন হচ্ছে। দোটানায় পড়ে আর কেনাও হচ্ছে না। অথচ চাকুরি খুঁজতেও এখন কমপিউটার লাগে। ‘ডালাস মরনিং নিউজের অধিকাংশ বিজ্ঞাপনেই E-mail-এ বায়োডাটা পাঠাতে বলছে। অথবা ON-LINE এ তাদের Job-line দেখতে বলে যাচ্ছে।
ওলিদ নিজের কথাতেই ব্যস্ত, বললো,
: তারপরে দেখা যেত তোমরা দুজন ভেতরে বসে আছ আর আমি বাইরে রাতভর ঝড়-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে তোমাদের পাহারা দিচ্ছি। আশেপাশের সব এ্যাপার্টমেন্ট থেকে লোকজন জানালার পর্দা তুলে আমাদের দেখছে। আর হি হি করে হাসছে।
বলে ওলিদ নিজেই হাসতে লাগলো। শুমাইও বাপের সাথে হাসিতে যোগ দিল। বাপকে সাপোর্ট করে যাওয়াই যেন তার এই পাঁচ বছরের জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান।
কিন্তু কাজরী এদের হাসিতে যোগ দিতে পারল না।
কাজরীর মনে পড়ে আরেকজন বাবার কথা, মনে পড়ে ধানমন্ডির লেকের পাড়ের বাড়ি-টার কথা ,যার পাশে কৃষ্ণচূড়ার গাছ আছে কিছু। রাধাচূড়াও আছে। সেই লেকের পানির উপর যখন এই বৃষ্টি পড়তো তখন নয়ন ভরে সে দৃশ্য দেখতে কাজরীর বড় মন চাইতো। বহুক্ষণ সে চেয়েও থাকতো। মনে পড়তো ‘নয়নাভিরাম’ শব্দটা । বিশেষ করে যখন আমেরিকা আসার ব্যাপারটা ঠিক হয়ে গেল তখন সে আরো বেশি করে দেখতো। মনে হতো, কতকাল বুঝি সে এসব আর দেখতে পাবে না। আহ!
লেকের পাড়ের মসজিদটার উচু মিনার গাছপালা ভেদ করে দেখা যেতো । মাগরিবের আজানটা যখন শুরু হলো, কাজরী এসে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে লেকের দিকে চেয়ে থাকতো। মসজিদের উঁচু মিনারের মাথায় একটা বাতি জ্বলে থাকতো, জ্বল জ্বল করে। মনে হয় ওটা বুঝি লাইট হাউস। কাজরী নিজের বুকটায় পেত হু হু করে উঠা কি যেন এক বেদনার আতংক । বহুদূরে যাবে সে চলে। কোথায় যেন হারিয়ে যাবে। কোন এক অজানার দেশে। চলেও এসেছে সে সেই বহুদূরে। ফেলে এসেছে অনেককিছু , অনেকখানি জীবন।
হা, চলে এসেছে সে , ফেলে এসেছে অনেককিছু। কোথায় যেন হারিয়ে যাবে, কোন এক অজানায়।
ওলিদ ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশে শুমাইও। অনেক রাত। অথচ ঘুম আসছে না কাজরীর দুচোখে। মন পড়ে থাকে দূরে কোথাও। শুমাই বাপের বুকে ঘুমাচ্ছে। কী নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয় তার। নিজের রুমে একা ঘুমাবে না, বাপ-মাকে নিয়ে ঘুমাতে হবে। সবাই মনে হয় একসাথে দলা পাকিয়ে থাকতে ভালবাসে। সম্ভবত এটা মানুষের স্বাভাবিক একটা চাহিদা। না হলে সেও বা কেন এত বছর পার করে দেওয়ার পরও এত দূরে একা একা চলার সময়ও বারে বারে আপনজনের কথা ভেবেই যাচ্ছে। মা-কে ফোন করতে বড় মন চাইছে। শ্বশুর শ্বাশুড়ীকেও। কিন্তু করছে না। বিল উঠবে অনেক। ফোন কার্ড কিনে ঐভাবে ফোন করলে কমে সারা যায়। কাল কিনে নেবে। উঠে জানালার ভেনেশিয়ান বেলাইনড় সরালো। লম্বা লাঠিটা ঘুরাতেই সাইডগুলো খুলে গেলো। এর উপর পর্দা চড়ানো হয়নি এখনও। খুলতেই মায়াবী রাত। হলুদাভ আলো চারদিকে। সামনে কোন বিদেশ দেখছে না। শান্ত একটা শহরের প্রতিচ্ছবি দাঁড়িয়ে। ঘুমন্ত এ্যাপাটমেন্ট কমপ্লেক্স এরিয়া। সারি সারি দাঁড়ানো সব দোতলা বিল্ডিং। সবক’টা দেখতে একই রকম। উপরে নিচে আশেপাশে সব দিকে এক, দুই বা তিন বেড রুমের এ্যাপাটমেন্ট, বিভিন্ন সাইজের, ভাড়াও বিভিন্ন। সামনে এক ফালি বারান্দা। গ্যারাজ নেই কোন। খোলা আকাশের নীচে সারি বেধে দাড় করানো সব গাড়িগুলো। কিছুদূর পর পরই লাম্প পোস্ট। সব এ্যাপার্টমেন্টের সামনেই একটা করে বাল্ব জ্বলছে। আলোময় চারদিক। কিছু দূর পরপরই দেখা যাচ্ছে লন্ড্রি রুম তার পাশেই এক রুম সমান বিশাল একটা ময়লা ফেলার বুথ। দুটো গাড়ি একটার উপর আরেকটা রেখে এর মাঝে ফেলে দেয়া যাবে। সবই মনোহর। এমন নিশুতি রাত দেখে তার একবারও মনে হচ্ছে না যে সে বিদেশ। এ রাতের এই দৃশ্যকে বাংলাদেশের রাতও বলা যেতে পারতো তাকে, যে জানে না সে কোথায় আছে। রাতের চাঁদের আলোও তো সেই একই রকম লাগছে। সে জানে দরজা খুলে বারান্দায় গেলে বেলী ফুলের সুবাসও পাবে, হাসনাহেনাও। বুঝতেই তখন পারবে না সে কোথায় আছে। পাশের এপার্টমেন্টে এক ইরানী থাকেন। সে নাকি ১৯৮২ সালে থেকেই এখানে আছেন। এখন কত! ২০০১। নতুন শতাব্দীর প্রথম বছর। সেও এসেছে ঐ মৌ মাতানো ফুলের সৌরভ পেতে। এক পশলা আলো, এক খণ্ড দৃশ্যে, এই ঘ্রাণ সুবাসে এক নিমিষে মনে হবে সে বুঝি ধানমন্ডীতেই আছে।
কিন্তু তা নেই।
মাস প্রায় ঘুরে এলো, সে ঢুকে গেছে আরেক বিশ্বে। মাস গড়াতে চললো প্রায়। এক গোলার্ধের মানুষ আরেক গোলার্ধে চলে এসেছে। স্কুলগুলোতে সামার ভেকেশান চলছিল। শুমাইয়েরও স্কুল মিস হলো না তাই ।

সহসাই ফিরে যাবে বাচ্চারা স্কুলে। রীতিমত তোড়জোর। মলে মলে বিভিন্ন দোকানে ‘Back to School sale’ চলছে। শুমুও উৎসাহী। ভাগ্যিস শুমাই জন্মেছিল জুলাইতে আগস্টের আগে পাঁচে পা দিলেই কিন্ডারগার্ডেনে যেতে পারবে নতুবা একদিনের ছোট হলেও Prc k তে যেতে হবে। বাঁচা গেছে।
আল্লাহ আল্লাহ করে সব ভাল হলেই হয়। শুমার শুরুটা ভাল। ওকে কিছু টিকা দিতে হবে শুধু। তৃতীয় বিশ্ব থেকে আসা বাচ্চাদের সময় মতন অনেক ভেকসিন দেওয়ার সুযোগ থাকে না। ওলিদ এত সচেতন তরা অনেক কিছুই বাদ পড়ে গেছে। সিস্টেম লস।
স্কুল থেকে চার-পাঁচদিন আগেই প্রয়োজনীয় সব ভেকসিনের লিস্ট দিয়ে দিয়েছে। ভেকসিন দেওয়া না হলে স্কুলে ভর্তি করাবে না।
মজার ব্যাপার হলো এই এপার্টমেন্টের নীচের তলাতে থাকেন আরেকজন বাংলাদেশী, শমীদ ভাই। সহজসরল ভাল মানুষ। উইনগ্রীন এপার্টমেন্টে বাসা নিতেই ওনার সাথে পরিচয়। প্রায় নয়/দশ বছর আছেন আমেরিকাতে। প্রথম দিনেই উনি শুনেই বললেন,
: বাচ্চার টিকা দেওয়া, এটা আবার কোন সমস্যা নাকি? আমিই নিয়ে যাব। বিদেশে প্রতিবেশীরাই সব। বাঙালি প্রতিবেশী। বলে হাসলেন।
: আপনার অফিস আছে না?
: কাজ তো দুটোয় শুরু। দুটো থেকে রাতের দশটা। এখানে অফিস শব্দটার তেমন কোন ব্যবহার নাই। ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে ‘কাজ।’ সবাই কাজে যায়। আগমীকালকে গেলে আমার অফ আছে। মঙ্গল, বুধ আমার ছুটি। না, সরি, বুধ বৃহস্পতিবার ছুটি। এত পরিবর্তন করে ছুটির দিন, নিজেরই মনে থাকে না। আগামীকালকে তো বুধবার।

রোদে যেন পুড়ে যাচ্ছে চারদিক। প্রায় প্রতি বছরই রোদে আগুন ধরে যায় বহু জায়গায়। খোলামেলা চারদিক। ডানে বায়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত একবারে দেখা যায়। টেক্সাসের সবকিছুতেই বিশালতার একটা ছাপ আছে। দিগন্ত দেখা যায়। বহুদূর পর্যন্ত আকাশ আর ভূমির মিলেমিশে একাকার হয়ে চলা। একেকটা রাস্তা চার-পাঁচ তলা। মনে রাখে কেমন করে মানুষ কোন রাস্তায় যেতে হবে। একেবারে জিলাপীর প্যাঁচ। ওলিদ এ কথা শুনে খুব বিরক্তও হয়েছিল। বলেছিল,
: এত দেশ ঘুরে এ আবার কি কথা। সব রাস্তার উপর নম্বর দেওয়া থাকে। সব কিছুতেই ডাইরেকশন থাকে। আমেরিকাতে কেউ পথ হারায় না।
: এখানে বাস সার্ভিস কেমন ? কাজল জানতে চেয়েছিল শমীদ ভাইয়ের কাছে।
: একেবারেই ভাল না। বাসে কেউ ওঠেও না। সবারই দু-তিনটে করে গাড়ি আছে। বউয়ের একটা, নিজের একটা, ভ্যান জাতীয় একটা কিছু।
: দাম কেমন ?
: আরে ওলিদ ভাই, গাড়ির দাম নিয়ে ঘাবড়াবেন না। ২০০০ ডলারেই ভাল সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি পাওয়া যায়। আর নতুন গাড়ি তো ডাউন পেমেন্ট, জিরো পেমেন্টে কেনাই যায়। মাসে মাসে অল্প অল্প করে টাকা দেবেন। এক সময় গাড়িটা আপনার হয়ে যাবে।
: সমস্যাটা হচ্ছে, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি কেনাও যাবে না।
: জ্বী না ভাই, লাইসেন্সবিহীন লোককে গাড়ি বিক্রি করবে না কেউ। ড্রাইভিং টেস্টটা দিয়ে দেন।
: জ্বী, রিটেন পরীক্ষায় পাশ করেছি। এবার রোড টেস্ট। রোড টেস্ট-এ পাশ করলে শুক্রবার থেকেই আমার গো গো-টাকে নিজেই স্কুলে নিয়ে যেতে পারতাম।
: গো গো কে ?
: আমি। শুমাই পেছনের সীট থেকে নিজেই জবাবটা দিয়েছিল।
কাজরী হেসে বললো,
: ওর বাবা ওকে আদর করে গো গো ডাকে।
শুমাইয়ের গো গো নামটা ওলিদের নিজস্ব উদ্ভাবন। শুমাই যখন খুবই ছোট, পুটলীর মতন একটুখানি, তখন থেকেই ওলিদ মেয়েকে গো গো ডাকে।
কৃষ্টিভাবী, ওলিদের এক বন্ধুর বউ, শুমাইয়ের গো গো নামটা শুনেই একদিন বলেছিল,
: ও ছেলে হলে, ভাই মনে হয় ওকে পড়সব পড়সব ডাকতেন। মড় মড় না।
কথাটা বুঝতেই কাজরীর কিছুটা সময় লেগেছিল, ‘প্রত্যক্ষণ’ বিষয়টা মনোবিজ্ঞানে সে পড়েছিল। এটা জীবনে এতটা যে গুরুত্ববহ সে আগে তা বুঝতে পারেনি। মানুষ তার নিজস্ব আঙ্গিকে ঢেলেই সবকিছু দেখতে ভালবাসে।
শুমাইয়ের গোল্লা গোল্লা দুটো গালের জন্য ওলিদ তাকে গো গো ডাকে, অথচ….. গল্পটা গাড়িতে এখন আর কাজরী শমীদ ভাইকে বললো না। শুমাই শুনবে। সে চায় না কোনভাবেই শুমাই বুঝতে পারে এ সমাজে ছেলেদের কদর বেশি কিছু পাগলা মানুষের কাছে। কাজরী প্রার্থনা করে, বিশ্বাস করে মনে প্রাণে ইনশাল্লাহ, শুমাই বড় হতে হতে এ সমাজ বদলে যাবে।
: এ্যাই, ওই পাকিস্তানী মহিলার নামটা যেন কি ?
: কার ?
: আরে, ছিলে কোথায়, রাইড দেয় যে সেই মহিলা। মনে পড়েছে আমীর বানু। প্রয়োজনে সে শুমাইকে স্কুলে আনা নেওয়া করবে। টেক্সী থেকে কিছুটা কম চার্জ করে।
: আপনারা দেখছি ইতিমধ্যেই অনেক খবর যোগাড় করে ফেলেছেন।
কাজরী হাসতে হাসতে বলে
: Survival of the fittest
তার আব্বুর মুখে প্রায়ই কথাটা সে শুনতো। সব কিছুই যথার্থ মানুষের জন্য। অযোগ্যের কোথাও কোন স্থান নেই।
Beltline রাস্তা ধরে গিয়ে বাঁ দিকে story রোডে বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর ESL এর অফিস কাঠের তৈরি। দেখতে মনে হয় নিচে চাকা আছে। গড়িয়ে অন্যখানে নিয়ে চলে যাওয়া যাবে। ভেতরে গার্জিয়ানরা বাচ্চা সহকারে দাঁড়িয়ে আছে। সময় লাগবে অনেকক্ষণ।
: কি করবো এখন ? ওলিদ কাজরীর দিকে চেয়ে জানতে চায়।
: এত লম্বা লাইন ! শমীদ ভাইয়ের অফিসে দেরি হয়ে যাবে। এখনও ‘কাজ’ শব্দটা ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি কাজল। মুখে অফিস কথাটাই আসে।
: আমি না গেলে তো আবার এয়ারপোর্টের গেইট খুলবে না। সিসিম ফাঁক করার চাকুরি আমার।
বাংলাদেশের একজন সাবেক কৃষিবিদ শমীদ ভাই দুষ্টামী করলেন? না দুঃখ করলেন? অথচ আশা নিয়ে এসেছিলেন এদেশে তার সৌভাগ্যের দরজা খুলে যাবে। খোলেনি। প্রথমবার আমেরিকাতে এসেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল কাজে। দ্বিতীয়বার ভিজিট ভিসাতে এসে থেকে গেছেন। তাও প্রায় ৯/১০ বছর আগে। লম্বা একটা সময় পার হয়ে গেছে। তারপরও ওনার মন বসে না। টাকা পয়সা রোজগার হয় প্রচুর কিন্তু তারপরও মন কাঁদে একটা সন্মানজনক পেশার জন্য। এদেশের সব কাজই সম্মানজনক। সবই মর্যাদাকর। কিন্তু এখানে তো জন্ম হয়নি শমীদ ভাইয়ের। যে দেশে জন্ম সেখানকার সংস্কৃতি কি ভুলতে পারবে? আজন্ম লালিত বাসনা থেকে মানুষের মুক্তি কি আছে ! নেই।
আজ রাতের আকাশ মনে করিয়ে দিল কাজরীকে শমীদ ভাইয়ের কথাগুলো ,বলতে বলতে খুব হেসেছিলেন তিনি সেদিন। আসলেই কি উনি হেসেছিলেন? টিকা দেওয়া হয়নি সেদিন। Esl test- ও না। শুধু জায়গাগুলো চেনা হয়েছে। আরেকদিন যেতে হবে। ছুটে চলে গেলেন শমীদ ভাই তার কাজের জায়গায়। নিদারুণ অপ্রিয় কাজ তারপরও করে যাচ্ছেন তারা জীবিকার টানে।
কাজরী খোলা আকাশ থেকে চোখে সরিয়ে বড় বিষণ্ন চোখে চেয়ে থাকে ঘুমন্ত প্রিয় দুই মানুষের মুখের দিকে। কোথায় এলো তারা। নতুন এই দেশে, মহাদেশে কি অভিনবত্ব অপেক্ষা করছে তাদের জন্য কে জানে। মনোবল চাই। খুব শক্ত হাতে ধরতে হবে মনটাকে। Survival is for the fittest. Survival of the fittest.

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com