মানুষের জাদুবিশ্বাস ও ধর্মাচারের সোনালি বৃক্ষশাখা

আবদুস সেলিম | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১০:৫৪ অপরাহ্ন

golden-bough.jpgযদিও স্কটল্যান্ডীয় নৃতাত্ত্বিক স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজার রচিত দ্য গোল্ডেন বাউ-এর নামকরণের পেছনে ওক গাছে জন্মানো ঐ নামেরই এক পরগাছার প্রতি মানবজাতির বিপুল জাদুকরী আকর্ষণের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তবুও আমি মনে করি উনবিংশ শতাব্দির শেষ দশকে রচিত এই গ্রন্থ বহুমাত্রিক মানসিক অভিঘাত সৃষ্টিতে শুধুমাত্র পাশ্চাত্যে নয়, প্রাচ্যেও বিরাট অবদান রেখেছে। এর অন্যতম কারণ গ্রন্থটিতে সমগ্র মানবজাতির ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সাযুজ্য খুঁজে পেতে ফ্রেজার তুলে এনেছেন ফলন-কৃত্যানুষ্ঠান, দেবতার উদ্দেশ্যে মানব উৎসর্গ, মরণশীল রাজ-দেবতা (রাজর্ষি) ইত্যাদির মত নৃতাত্ত্বিক বিষয়গুলো যার সাথে বিশ্বের সকল মানবগোষ্ঠীর এক ‘কালেকটিভ আনকনসাস’ সম্পর্ক বিদ্যমান ঠিক যে কারণে বক্ষ্যমান আলোচনার শিরোনাম দিয়েছি ‘মানুষের জাদুবিশ্বাস ও ধর্মাচারের সোনালি বৃক্ষশাখা’ জাদুতে বিশ্বাস সময়ে সুসংহত ধর্মে উত্তরিত হয় এবং চূড়ান্তভাবে বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয় বিজ্ঞানের শক্তিতে – মানব ইতিহাসের এটাই বিশ্বাসযোগ্য তিনটি স্তর।

অনস্বীকার্য এই গ্রন্থের প্রভাব বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর একাধিক চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিকের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। এমন একটি সবল, বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থের, যার অনুসন্ধান শুধুমাত্র দৃষ্টান্তনির্ভর অথচ যে গ্রন্থটি ‘নৃ-বিজ্ঞানের বিশৃঙ্খল অবস্থাকে . . . অনেকটাই শৃঙ্খলার শাসনে’ নিয়ে এসেছে (ভূমিকা, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস) তার বাংলা অনুবাদ নিঃসন্দেহে সর্ববিচারে একটি মাইলফলক। খালিকুজ্জামান ইলিয়াসকে এমন একটি সুকঠিন কর্মসম্পাদনের জন্য হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে সাধুবাদ।

আমরা জানি দ্য গোল্ডেন বাউ প্রথম দুই খন্ডে প্রকাশিত হয় এবং চূড়ান্তভাবে বারো খন্ডে প্রকাশ হয় ১৯০৬ থেকে ১৯১৫ – সময়কাল। এরপর লেখক নিজে একটি সংক্ষেপিত সংস্করণ প্রস্তত করেন এবং একটি অখন্ড খন্ডে প্রকাশ করেন ১৯২২ সালে। বর্তমান অনুবাদটি সেই অখন্ড সংস্করণের।

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস একজন দক্ষ ও প্রথিতযশা অনুবাদক যিনি তাঁর অনুবাদ দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন যার মধ্যে অন্যতম ২০১১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কার। তাঁর উৎকৃষ্ট অনুবাদ কর্মের মধ্যে রয়েছে গালিভারের সফর, পেয়ারার সুবাস, মিথের শক্তি-র মত গ্রন্থাবলী। গোল্ডেন বাউ সেই কর্মকাণ্ডে আর এক উজ্জ্বল মাত্রা সংযোজন করলো সন্দেহাতীতভাবে।

border=0সর্বমোট উনসত্তরটি পরিচ্ছেদের বিস্তৃত এই গ্রন্থের অনুবাদ বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ ইতিহাসে অনন্য হয়ে থাকার দাবি রাখে। বিশেষ করে উৎস ভাষা থেকে অনূদিত ভাষার রূপান্তর দু’টি কারণে সহজ ছিল না : উনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজি শব্দ ও বাক্যগঠনে ক্ল্যাসিক্যাল প্রভাব এবং বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে তা সহজপাঠ্য ও বোধগম্য করে তোলা; বেশ কিছু কবিতাকে বাংলায় ছন্দোবদ্ধ করা। গদ্যের উদাহরণ : ‘ টার্নারের আঁকা গোল্ডেন বাউ ছবিটা কে না দেখেছেন? টার্নারের মহৎ অন্তর ছিল কল্পনার কনকরশ্মিতে উদ্ভাসিত।’ (পৃ ২৯)। কিংবা, ‘বাপকা বেটা, সেপাইকা ঘোড়ার আরেকটা চরম উদাহরণ আছে। এটাও পাওয়া যায় চিনাদের মধ্যেই। চিনারা বিশ্বাস করে যেকোনো শহরের ভাগ্য নির্ভর করে আকৃতির ওপর, এবং এই ভাগ্য পরিবর্তন হয় যে বস্তুর আকৃতির সঙ্গে শহরের সবচেয়ে বেশি মিল তাঁর স্বভাব-চরিত্রের সঙ্গে মিল রেখে।’ (পৃ ৭৭)। অথবা, ‘এখন কনে নামকরণের পেছনে অনেক সময় যে ধারণা কাজ করত তা উদ্ভিদজগতে বরকনের উৎপাদনক্রিয়ার শক্তি দ্বারাও প্রকাশ পায়।’ (পৃ ৭৭)। এই উদ্ধৃতাংশগুলো অনুবাদকের অনূদিত ভাষার প্রাঞ্জলতা ও সহজবোধ্যতার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। সবচেয়ে প্রশংসনীয় ব্যাপার হলো, উনসত্তরটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম ও অনু-শিরোনামের যথোচিত অনুবাদ। যেমন : অরণ্যরাজ; সন্তরাজা; বৃক্ষপূজা; অবতার বেশে জাদুকর; ওক বৃক্ষ অর্চনা; করতে মানা; কুফাগ্রস্ত মানুষ; কথার কুফা; দুদিনের বাদশা– এবং এমন অনেক। খুবই প্রচলিত বাগধারা ও শব্দসমষ্টি অনুবাদকে কাছে টানে।

বেশ কিছু দ্বিপদী ও চতুর্পদী শ্লোক অনিবার্যভাবে এমন একটি গ্রন্থে স্থান পেয়েছে – কারণ এমন শ্লোক মানুষের জাদুবিশ্বাস ও ধর্মাচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ বটে। এগুলোর অনুবাদ সুকঠিন, কারণ ঠিক শব্দ ও ছন্দ অক্ষুন্ন এবং সর্বোপরি শ্লোকের অন্তর্গত বানীকে দূষণহীন রাখা অনুবাদকর্মের একটি কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় খালিকুজ্জামান উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রায় শতভাগ। উদাহরণ :

আমি তো মোম পোড়াচ্ছি না, সত্য
পোড়াচ্ছি তাঁর কলজে, পিন্ড, পিত্ত।

কিংবা,

গ্রাম থেকে দূর করি মরণ-পহর
গাঁয়ে ফের নিয়ে আসি বসন্ত বাহার।

অথবা,

জানি আমি নয় রাত কাটিয়েছি ঝুলে
শনশন হাওয়া প্রবাহিত তরুশাখে
অডিনের নামে উৎসর্গিত শরে
আমার নিজেরই শর সে তো কোলে কাঁখে।

সবচাইতে সুন্দর উদাহরণ সম্ভবত বইটির স্বীকৃতি পৃষ্ঠায় (XII.s) মার্সাল রচিত ছন্দবদ্ধ তিন পংক্তির অনুবাদ :

দশম ও একাদশ সর্গ ছিল একটু বড়
কেটে ছেঁটে এখন সেটা হলো জড়সড়
অলসজনে, ইচ্ছে হলে সবটুকুনই পড়।

১০৩২ পৃষ্ঠার এই অনুবাদগ্রন্থ সব অর্থেই বাংলাদেশের অনুবাদরাজ্যে এক বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস-এর অনুবাদ কর্মসম্ভারকে আরও উজ্জ্বল করলো এই গ্রন্থটি। সেই সাথে এই গ্রন্থের প্রকাশনা সংস্থাকে ধন্যবাদ তাদের মুদ্রণ-উদ্যোগের জন্যে, বিশেষ করে বেশ কিছু ছবি ও স্কেচের অলংকরণ গ্রন্থটির আকর্ষন বৃদ্ধি করেছে। তবে একথাও সত্য পরবর্তি সংস্করণে এই অনুবাদের সম্পাদনা ও পরিমার্জন গ্রন্থটিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

গোল্ডেন বাউ
মূল: স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজার
অনুবাদ: খালিকুজ্জামান ইলিয়াস
প্রকাশক: বিপিএল (বিডিনিউজ পাবলিশিং লিমিটেড)
পৃষ্ঠা: ১০৩২
টাইপোগ্রাফি: রকিবুল হাসান
প্রচ্ছদ: পিজিএম
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ২০১৬
মূল্য: ৯৫০

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে চলমান বইমেলা উপলক্ষ্যে বিশেষ ছাড়ে এ বইসহ বিপিএল-এর অন্যান্য বইও কেনার ‍সুযোগ পাবেন আগ্রহী ক্রেতারা। যারা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে বিপিএল-এর বই কিনতে আগ্রহী তারা এই লিংকটি দেখতে পারেন:http://bpl.bdnews24.com/index.php/

গোল্ডেন বাউ সম্পর্কে সর্বসাম্প্রতিক নিউজ:
বিপিএল স্টলে ‘রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি’, অপেক্ষায় ‘গোল্ডেন বাউ’

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Farhad Hossain Shawon — জুলাই ১০, ২০১৬ @ ১২:৫১ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ এতো ভালো একটি উদ্যোগের জন্য।।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com