ভাষার জন্য ভালবাসা: শুধু একমাস?

সৌরভ সিকদার | ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এসেছে। এরই মধ্যে আমাদের ভাষা-আবেগে নতুন করে বান ডেকেছে। এই লেখাটা একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বাংলা ভাষার বিশ্বজয় কিংবা মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের আবেগের বন্যা নিয়ে নয়। এমন কী প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা যে ভাষাপ্রেমের জোয়ারে ভেসে ভেসে ভাসা-ভাসা কিছু স্বপ্ন তৈরি করি সেসব নিয়েও নয়। শুধু একজন বাংলা ভাষা-ভাষি সাধারণ মানুষের কিছু প্রশ্ন । কিছু প্রত্যাশা বলতে পারেন। এখন প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই ভাষা নিয়ে অনেক আলোচনা, নানামত, নানা বিশ্লেষণ, নানা বির্তক এমনকী ভাষার প্রাণ যেন যায় যায় দশা । আর অন্যদিকে বেসরকারি টিভি-বেতার চ্যানেলগুলো প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে ভাষার লড়াই থেকে শুরু করে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার আধিপত্য থেকে রক্ষা করে বাংলা ভাষার প্রাণভোমরা উদ্ধারের যেন লিপ্ত সবাই। কী আশ্চর্য! যারা ইংরেজি ভাষায় লেখা নাম ফলকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন তৈরি করছেন, তাদের নিজেদের নামফলক বা প্রতীক চিহ্নের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন কি? চ্যানেল আই, এটিএন, জিটিভি, ইটিভি, এনটিভি, আরটিভি, (দু একটি ছাড়া) আর কত লিখবো। এই তো কয়েক দিন আগে বিভিন্ন পত্রিকায় টিভি চ্যানেলে অনেকেই যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার সঙ্গে আমি একমত- আমাদের চলচ্চিত্র ও টিভি ধারাবাহিকের নামগুলো দেখলে বোঝার উপায় নেই যে (মোস্ট ওয়ান্টেড, ব্যাচেলর, বাটার ফ্লাই, রেডিও চকলেট, মেট্টেলাইফ প্রভৃতি) এটি বাংলাদেশের না হলিউডের। এমনকি অনুষ্ঠানগুলোতেও এখন প্রতিযোগিতা করে বিদেশী টিভির অনুসরণে নামকরণ চলছে, কোন কোন চ্যানেলে কলাকুশলীদের নামগুলোও ইংরেজি অক্ষরে ফুটে ওঠে অথচ একই চ্যানেলে একটু আগেই দুঃখিনী বাংলা বর্ণমালা নিয়ে দারুণ একটা প্রতিবেদন প্রচার করেছে–সত্যি সেলুকাস বিচিত্র এই দেশ।

এই তো গত বৎসর ফেব্রুয়ারি মাসে নদীর মতো ভাষাদূষণের সংবাদ পড়ে মহামান্য আদালত বাংলাভাষাকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে কমিটি পর্যন্ত গঠন করে দিয়েছেন। এরপর আর জানিনা কমিটি কী কী সুপারিশ তৈরি করলো, কিংবা ভাষাদূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। এমন কি যে মহামান্য আদালত বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা নিজেদের দায়িত্ব মনে করে আদেশ দিয়েছেন সেই আদালতেই প্রতিদিন বাংলা ভাষা ও বর্ণমালাকে দুয়োরানী হয়ে থাকতে হচ্ছে। স্বাধীনতার ৪২ বৎসর পরও আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলন করতে পারিনি। এটা যে অসম্ভব নয় তার প্রমাণতো একযুগ আগে বিচারপতি এবাদুর রহমান দেখিয়েছেন। ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুদ্ধ বাংলার প্রয়োগ সম্প্রসারিত করতে মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসায় কমিটি গঠন ও বৈঠক করেছেন, কিন্তু তারপরের ইতিহাস আমাদের জানা নেই, এখন তো ফেব্রুয়াারি, কিছু একটা নিশ্চয় জানা যাবে! কমিটি কতবার বসেছেন কতোগুলো প্রস্তাব বা সুপারিশ তৈরি করেছেন অথবা করেননি তার হিসাব পাওয়া যাবে হয়তো, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে প্রচলন কতটা অগ্রসর হয়েছে সে হিসাব পাওয়া যাবে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘আমরা শুরু করি কিন্তু শেষ করিনা’- না ব্যক্তি জীবনে না সমাজ জীবনে। তা না হলে ফেব্রুয়ারি এলেই প্রিয় ভাষা প্রিয় বর্ণমালার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য খালিপায়ে হাটা, প্রভাত ফেরি, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কন্ঠে সমবেত গান ‘আমি কি ভুলিতে পারি ‘ অথচ বাকি এগারো মাস ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ পায় সন্তানের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ের ফরম উত্তোলন, এফ এম বেতারের ডিজ্যুস বাংলা আর প্রতিষ্ঠান-পণ্য-ভোক্তা বিজ্ঞাপনে ইংরেজি-হিন্দির প্রতি অদৃশ্য আকর্ষণে। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের ঐতিহ্যময় বাংলায় একসময় বিদেশী ভাষা-হাট বাজারে, শিল্প-কারখানায়, প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বসবার ঘরে জায়গা করার চেষ্টা করেছে; কিন্তু এখন আমাদের মার্কেট, ইন্ডাষ্ট্রি, কর্পোরেট-অফিস, ইউনিভারসিটি, ড্রয়িংরুম দখল করে নিয়েছে। বড় ভয়ে আছি শোবার ঘরেও কি ঢুকে পড়বে? হয়তো কারো পড়েছেও এর মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী অনেকেই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায় যখন জানতে পারে আমার সন্তানরা বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করে। আমি বা আমার মতো কেউ কেউ হয়তো সে তাচ্ছিল্যদৃষ্টি উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার পক্ষে দাঁড়াতে চেষ্ঠা করি- কিন্তু অন্য অনেকেই কি পারছে?

এইতো কয়েকমাস পূর্বে আমাদের প্রতিবেশি দেশ নেপালে তাদের সরকার এবং শিক্ষামন্ত্রণালয় এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম বিদেশী ভাষা পরিত্যাগ করে স্থানীয় ভাষায় রাখার আদেশ জারি করেছে- দু মাসের মধ্যে পরিবর্তন না করলে আধিভূক্তিকরণ বাতিলসহ শাস্তি প্রদানের কথা বলেছে। সেখানে ইস্টার্ন বিদ্যালয় যদি হিমালয় বিদ্যালয় হয়ে যেতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে ৮৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাদের মাত্র কয়েককটি বাদে সবগুলিই ইংরেজি নামে চলছে সরকার চাইলে (মন্ত্রণালয় বা মঞ্জুরি কমিশন প্রস্তাব করতে পারে) বাংলা নাম দেয়া কি অসম্ভব? বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারের কি এতই দৈন্যদশা যে ৮৭টি সুমধুর অর্থপূর্ণ নাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য পাওয়া যাবে না? নাকি মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঔপনিবেশিক দাসত্বের দায়ভার বহন করতেই আমরা ভালবাসি, মাতৃভাষাকে নয়? একুশ শতকের এই বিশ্বে নব্য-বহুজাতিক বণিক সংস্কৃতির চাপে না হয় ইংরেজি প্রীতি আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইংরেজি নামকরণ প্রবণতা মেনেই নিলাম, কিন্তু সেখানে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান আর ডিজ্যুস সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠার মধ্যে আমাদের ছয় ঋতু আর বাংলা ১২ মাস কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে– তা শুধু বিস্ময় নয় লজ্জার ব্যাপারও। দেশের নামকরা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (তারা নিজেদের ইউনিভার্সিটি বলতে ভালবাসে) পাঠদানের সুবাদে দেখেছি শ্রেণিকক্ষের ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২ জন বাংলা ১২ মাসের নাম বলতে পেরেছে। আর ঋতু কয়টা এই তথ্যই জানে না ২৪ জন শিক্ষার্থী। এভাবেই আমরা সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি ভালবাসাহীন এক নতুন প্রজন্ম তৈরি করছি। অনাগত দিনে এদের কাছে আমাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি টুয়েনটি ফাস্ট ফেব্রুয়ারিতে রূপান্তরিত হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

ইংরেজি মাধ্যম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কোনটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে নেতিবাচক নয়। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি আমাদের সন্তানকে শিক্ষিত করছি নাকি পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতির (জ্ঞান নয়) প্রতি অকারণ আকৃষ্ট করে তুলছি, সেই ঘরের ঠাকুর ফেলে বিদেশী কুকুর ধরার মতো। পৃথিবীর কোন জাতিই তার ভাষা-সংস্কৃতিকে পিছনে ঠেলে ফেলে সামনে এগোতে পারে না। এগোনো যায় না। বাংলাভাষার প্রতি আমাদের ভালবাসা আর আবেগ যে কত তা পৃথিবীর মানুষ দেখে ফেব্রুয়ারি এলে- আর আমরা দেখি এগারো মাস অবহেলা আর অভাগা দশা। কুম্ভকর্ম এগারো মাস ঘুমিয়ে একমাস জেগে থাকে। এই একমাস সে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালবাসে, বাংলায় লেখা নতুন বইয়ের খোঁজে বই মেলায় ধুলো ওড়ায়, আমার ভায়ের রক্তের অক্ষরে পাওয়া বর্ণমালা নিয়ে অহংকারে বুক ফুলিয়ে চলে, বক্তৃতা বিবৃতিতে শহীদদের আত্মত্যাগ আর মাতৃভাষার গৌরব গাঁথার স্ফূলিঙ্গ ছড়ায়, সেমিনার আলোচনায় বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী ভাষা, টিভি-বেতারে প্রতিদিনই আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো অনুষ্ঠান হয়। একুশ এলেই শহীদ মিনার ভরে ওঠে ফুলে ফুলে- আমার তখন বলতে ইচ্ছে করে প্রিয় বাংলা ভাষা– ‘আমি একমাস তোমায় ভালবাসি’।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com