পথে, প্রদেশে (পর্ব-৭)

মাসুদ খান | ২১ জানুয়ারি ২০১৬ ৭:৩৪ অপরাহ্ন

(পূর্ব-প্রকাশিতের পর)

ফ্ল্যাশব্যাক: হকসেদ ও যমদূতগণ

এই যে হকসেদ, এ হকসেদ যে-সে হকসেদ না। একে বাগে আনা, বিপাকে ফেলা যার-তার কাজ না। এমনকি মরণদূতদের পর্যন্ত তাড়িয়ে দিয়েছে সে মিষ্টি-মিষ্টি কথা ব’লে, চাপা ছেড়ে। একবার হকসেদের শক্ত অসুখ। যমে-জীবে-টানাটানি দশা। জান কবজ করতে আজরাইল এসে দাঁড়িয়ে আছে দুয়ারে।

হকসেদ নির্বিকার। একসময় আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে আজরাইলকে। মোলায়েম স্বরে থেমে-থেমে বলতে থাকে, “আদাব আজরাইল সাহেব, কী সৌভাগ্য আমার! আসুন আসুন, অনুগ্রহ করে আসন গ্রহণ করুন। আপনি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, দীর্ঘ পরিভ্রমণে পথশ্রম হয়েছে প্রচুর। একটু বিশ্রাম নিন, মুখমণ্ডলে শীতল জল ছিটিয়ে একটু আচমন করুন, দেখবেন প্রশান্তি বোধ করছেন। তারপর প্রসাদ খান। জানিই তো, জাতকস্য হি ধ্রুবো মৃত্যু।”

এটুকু ব’লে জলভরা পিতলের কমণ্ডুলু আর সকালে নন্দলাল পুরোহিতের বউ তাকে দেখতে এসে কাসার থালাভর্তি যে নাড়ু আর সন্দেশ এনেছিল, খুব তাজিমের সাথে সেগুলি এগিয়ে ধরে হকসেদ, আজরাইলের দিকে।

তারপর বলতে থাকে, “মহামহিম, অনুমতি দিলে একটা কথা বলতে চাই– আসলে আমি কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়েছি, প্রাণ নেবার জন্য আপনি এসেছেন দেখে। আমি তো ভাই মুসলমান নই। আমি তো ঠিক আপনার অধিক্ষেত্রের মধ্যেই পড়ি না। বিলক্ষণ না। পড়ি কি? ক্ষমা করবেন, দোষ নেবেন না, জলখাবার গ্রহণশেষে আপনি বরং চলে যান। আপনার অনেক কাজ…।”

হকসেদকে সনাতন ধর্মগোষ্ঠীর কোনো শিরোমণি ভেবে ফিরে চলে যায় আজরাইল।

এরপর একদিন আসে যমরাজ। হকসেদ তাকে কদমবুচি করে চটপট বলে ওঠে, “আসেন আসেন দেবদূত, আদাব আদাব, মেহেরবানি করে তশরিফ গ্রহণ করেন হুজুর, থুক্কু, দেবদূত। লম্বা সফর, বহুৎ পেরেশানি গেছে আপনার। দম নেন, একটু জিরান, তারপর হাতমুখে একটু ঠাণ্ডা পানির ছিটা দিয়ে ব’সে রুহ আফজা খান। খেজুরও খাবেন। জানিই তো, কুল্লু নাফছিন জায়িকাতুল মাউত। তবে ইজাজত দেন তো একটা কথা ফরমাইতে চাই– এসেছেন, ভালো কথা, কিন্তু আমার জান কবজ করতে আপনি এসেছেন যে! আপনি কেন, দাদা? আমার জবান শুনে কি আমাকে হিন্দু মনে হয়? আপনিই বলেন। তাই বলি-কি, শরবৎ আর খেজুর-টেজুর খেয়ে-দেয়ে মেহেরবানি করে ফিরে যান-গিয়া বাবুমশায়। গোস্তাখি মাফ করবেন, অন্য প্রজার কাছে গিয়ে আপনার প্রজাসংযম-ব্রত পালন করলে ভালো হতো না-কি? ইমানে বলছি, আমি তো আপনার এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ি না। খোদা হাফেজ। মাফি খালাস…।”

হকসেদের চটপটে কথার ঝাপটায় বিফল মনোরথে উল্টাপথ ধরে যমদূত।

এরপর একদিন আসে খ্রিস্টানদের ডেথ-অ্যানজেল, কালো জোব্বা প’রে। ইতোপূর্বে দুই-দুইজন ডাকসাইটে মরণদূতকে ফিরিয়ে দিতে পেরে হকসেদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। ডেথ-অ্যানজেলকে দেখেই হকসেদ খুব স্মার্ট ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে উষ্ণ করমর্দন করে তার সঙ্গে।

যেন কতকালের চেনা, এমন একটা ভাব করে ঝটপট বলে ওঠে, “হেই ডিয়ার অ্যানজেল, লং টাইম নো সি… হোয়াট্স আপ? হাউ ইজ ইট গোয়িং? গুড? এভরিথিং ওকে?”

হকসেদের এহেন বেমক্কা কাণ্ডকারখানায় কিছুটা হকচকিয়ে যায় ডেথ-অ্যানজেল। কিছুক্ষণ থেমে থেকে, রাশভারি গলায় বলে ওঠে অ্যানজেল, “গুড, গুড… এভরিথিং ইজ গুড।”

হকসেদ সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “গুড টু হিয়ার দ্যাট। ইউ নো, গুড ইজ গুড, ব্যাড ইজ নট গুড।’’

তারপর বেশ বিনয় করে বলতে থাকে, “আই নো, এভরি ক্রিয়েচার হ্যাজ টু টেক দ্য টেস্ট অব ডেথ। সো আই মাস্ট সে… ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম! বাট…তার আগে, আই মাস্ট টেক দ্য টেস্ট অব লাইফ টু দ্য ফুল… হোয়াট ডু ইউ থিংক, অ্যানজেল? বাই দ্য ওয়ে, আরেকখান ইমপর্ট্যান্ট কথা, ডিয়ার অ্যানজেল… আই অ্যাম নাইদার ক্রিশ্চান, নর মুসলিম, নর জ্যুয়িশ… বাট ইফ ইউ উইশ, ইউ ক্যান টেক মাই লাইফ… নো প্রবলেম অ্যাট অল… বাট…।”

হকসেদের বাচালতায় বিরক্ত হয়ে অ্যানজেল মুখ ফসকে বলে ফেলে, “ঠিক আছে ঠিক আছে, আর ইংরেজি বলতে হবে না। লাইফ এনজয় করতে থাকেন, আমার অনেক কাজ, আমি যাই। সময় হলে খবর দিয়েন।”
বলেই ধ্রাম করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে হনহন করে ছুটতে থাকে মরণদূত, গোমেজ-পাড়ার দিকে।

দুখিনী মাতৃকুল ও তাদের হতভাগ্য সন্তানেরা

হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি অনেক দূরে, অনেক উত্তরে। সম্ভবত শিবগঞ্জ পার হয়ে গেছি। রাস্তার ধারে পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ইটের ভাটা। পড়ন্ত বেলা। ইট তৈরির জন্য মাটির স্তূপ থেকে মাটি এনে পানি দিয়ে তা ভেজানো, ভেজা মাটি দলনমন্থন, মথিত মাটিকে কাঠের চৌকোনা ছাঁচের মধ্যে ফেলে একের পর এক কাঁচা ইট বানিয়ে রোদে ফেলে রাখা সার-সার… তারপর সেই রোদে-সেঁকা কাঁচা ইট মাথায় করে নিয়ে গিয়ে ভাটা সাজানো… ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। কাজ করছে বেশ কজন নারীপুরুষ। ব্যস্তসমস্ত সবাই। এরই ফাঁকে ক্ষুধার্ত এক নারীশ্রমিক খেতে বসেছে এক কোনায়। পান্তাভাত, বাসি ডাল, মরিচপোড়া আর একটু পাটশাক। পেছনে তার ছোট রোগাটে শিশুপুত্রটি ঘ্যানর ঘ্যানর করেই চলেছে। মাথায় ঝাঁকাভর্তি মিঠাই নিয়ে এক মিঠাইঅলা ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। উস্কানির মতো ঘনঘন ঝুনঝুনি বাজাচ্ছে আর হাঁক দিচ্ছে “মিঠাই নিবেননি, মিঠাই, গরম গরম গজা, কটকটি, বাতাসা, তিলের খাজা…”

ছেলেটি বায়না ধরেছে মিঠাই খাবে। একে তো কাজে দম ফেলবার জো নাই, তার ওপর ছেলের এই ঘ্যানরঘ্যানর! ভীষণ বিরক্ত মা। পাতের এক কোণে কিছুটা খাবার রেখে দিয়েছে শিশুটার জন্য। নিজের খাওয়াশেষে ছেলেকে সাধছে ওটুকু খেয়ে ফেলতে। শিশুটা খাবে না, সে খেতে চায় মিঠাই। শিশুটা রাগ করে থালাটা ধরে যেই ফেলে দিতে গেছে, অমনি মহিলাটা তার হাত থেকে এক ঝটকায় তা ছিনিয়ে নিয়ে ঘুরে উঠে এগুতে থাকে ইটভাটার দিকে। ক্ষুব্ধ, অভিমানী শিশুটা হাত পা নাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছোটে মায়ের পেছন পেছন। মা বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে হাঁটতে হাঁটতেই খেয়ে ফেলে ছেলের জন্য রাখা খাবারটুকু। এবার ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে ক্ষুধার্ত শিশুটা। মা কাজে মন দেয় ভাবলেশহীনভাবে।

এখানকার বাস্তবতা ইটভাটার গনগনে আগুনের মতোই নির্মম ও লেলিহান! শিশু যে একটু বায়না ধরবে, কিংবা অভিমান করবে মায়ের সাথে, তারও কোনো জায়গা নাই সেই নিষ্করুণ বাস্তবতায়। কেবলই ক্ষুধা আর ক্ষুধা, সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। সামান্য গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যেখানে খাটতে হয় উদয়াস্ত, সেখানে সাধ-আহ্লাদ-আবদার-অভিমান এসব প্রশ্রয় দেবার পরিসর কই?

কাঁচা ইটের স্তূপ মাথায় নিয়ে নতুন গড়ে-উঠতে-থাকা ইটভাটার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় মা-টা। কাঁদতে কাঁদতে উঠে আসে শিশুটি মায়ের পিছে-পিছে। গায়ে গা লাগানো দুটি ইটভাটা– একটা কাঁচা, নির্মাণের শেষ পর্যায়ে, আরেকটাতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এদিকে বিরক্ত হয়ে রোষকষায়িত চোখে মা যেই ফিরে তাকিয়েছে বাচ্চাটার দিকে, অমনি বাচ্চাটা পিছু হটতে থাকে। মায়ের আগুনঝরা চোখে চোখ রেখে ভয়ে একটু একটু করে পিছাতে পিছাতে একসময় হঠাৎ পা হড়কে পড়ে যায় জ্বলন্ত ইটভাটার ভেতর। কয়লা ঢালার জন্য ভাটায় যেসব গহ্বর থাকে তাদের কোনো একটার মধ্য দিয়ে। সঙ্গে-সঙ্গে মাথার ইট ছিটকে ফেলে দিয়ে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে আর্তচিৎকার দিয়ে ওঠে মা। কাজ ফেলে হাহাকার করতে করতে ছুটে আসে শ্রমিকেরা।

আমাদের সবার চোখের সামনে তেলেসমাতি ঘটে গেল ঘটনাটা। পূর্বাপর পুরো দৃশ্য ধারণ করে নিয়েছে আমাদের চোখ, মুভি ক্যামেরার মতো। ইটভাটার নিচের দিকে যে সুড়ঙ্গপথ, যেখান দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগুনের লকলকে জিহ্বা, সেখানকার গোটা দুই ইট সরিয়ে ফেলে কেউ একজন কয়লা খোঁচানোর স্টোকার দিয়ে টেনে টেনে বের করে আনল শিশুটার জ্বলন্ত দেহখানা। বীভৎস দৃশ্য, বিকট গন্ধ। চারদিকে আহাজারি। মাটিতে শুয়ে পড়ে বুক থাবড়ে মাতম করছে মা।

এদিকে রাস্তা থেকে দ্রুত দৌড়ে নেমে এসে, “কী হয়েছে, দেখি দেখি, সরেন সরেন” বলে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায় হকসেদ। গিয়েই নাকে হাত দিয়ে বলে, “এহ! কী দুর্গন্ধ রে বাবা!” তারপর শিশুটার দাহিত দেহটা নেড়েচেড়ে দেখে নির্লিপ্ত, নির্বিকার কণ্ঠে বলে ওঠে, “গন্ধ হবে না? ভালো করে পোড়ে নাই তো! কমপ্লিট কমবাসশন তো হয় নাই, অক্সিজেনের অভাবে। আর দুর্গন্ধের দেখলেন কী? দুর্গন্ধ তো আরো হইত, বডিটা যদি নাদুসনাদুস মাখনের ডিব্বা হইত।” বলেই পোড়া দেহপিণ্ডটা যে সুড়ঙ্গপথে বের করে আনা হয়েছিল, সেখানেই ফের ঢুকিয়ে দিল হকসেদ। হাতের কাছে ভাঙা চাটাইমতো একটা জিনিশ পড়ে ছিল, সেটাই কুড়িয়ে নিয়ে তা দিয়ে জোরে-জোরে অক্সিজেন দিতে থাকল আগুনের জিহ্বায়।

আহাজারি আর মাতমে এমনিতেই উদ্ভ্রান্ত ও বিহ্বল সবাই, তার ওপর অচেনা এক বিশালবপু মানুষের অদ্ভুত কথাবার্তা আর আচমকা কা-কারখানা দেখে তারা যারপরনাই বিস্মিত, হতভম্ভ। হকসেদের এই নিষ্ঠুর, রোমহর্ষক নির্লিপ্ততায় স্তম্ভিত আমরাও। আসলে, ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই এতটাই হতচকিত যে হকসেদকে বাঁধা দেবার মতো সাড় ও শক্তি নাই কারো। বেশ কিছুক্ষণ পোড়ানোর পর হকসেদ বের করে আনে দেহ-অঙ্গার। তারপর সবার উদ্দেশে বলতে থাকে, “এইবার দ্যাখেন আর কোনো দুর্গন্ধ আছে? নাই। যান, এইবার শ্মশানে নিয়া গিয়া ফাইনাল পোড়ানি পোড়ান, যান, কাম সহজ কইরা দিলাম।” তারপর বসে পড়ে মাটিতে লিখতে থাকে দহনক্রিয়ার রাসায়নিক সমীকরণ।

তারপর সমীকরণ দেখিয়ে বলতে থাকে, “কমপ্লিট কমবাসশনের জন্য তিন ভাগ মাংসপিণ্ডের জন্য দরকার দুইভাগ অক্সিজেনের। এয়ারটাইট ইটভাটার ভিৎরে তো বাতাস ঢুকবার পারে না, তাই কমবাসশনটা ইনকমপ্লিট আছিল। এই যে অহন আমি কমপ্লিট কইরা দিলাম।”

হকসেদের দুর্বোধ্য সমীকরণ আর ইংরেজি-মেশানো বীভৎস বাতচিতে সম্বিৎ ফিরে পায় লোকজন। পেয়েই আহাজারি বন্ধ করে শুরু করে দেয় দুর্বোধ্য ধোলাই। এলোমেলো কিল ঘুষি লাথি পড়তে থাকে অনবরত হকসেদের সারা গায়ে, কেবল মুখমণ্ডলটুকু বাদে, অত উঁচুতে নাগাল পায়নি কেউ। তাতানো স্টোকারের বাড়িও পড়ল পিঠে বেশ কয়েকবার। হকসেদের সফরসঙ্গীরাও, এমনকি আলে-খাটোটাও– যে কিনা কয়েক ঘন্টা আগে ঠ্যাক ও ঠ্যাঙানি বাহিনীর আক্রমণ থেকে হকসেদকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল প্রাণপণ– সেও লাগিয়ে দিল কয়েক ঘা হকসেদের পিঠে। এই সুযোগে আমিও দিলাম কয়েকটা। আচ্ছামতো উত্তমমধ্যম খেয়ে কোনোক্রমে ভিড়ের ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগল হকসেদ। আমরাও দৌড়াতে থাকলাম তার সঙ্গে, কারণ লোকজন আমাদের দিকেও তেড়ে আসছে মারতে।

তেড়ে-আসা কুপিত শ্রমিকদের অনেক পিছনে ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে একসময় রাস্তায় উঠে এলাম আমরা। চোখের সামনে ক্ষুধিত ও অভিমানী শিশুটার মর্মান্তিক মৃত্যু, বীভৎস দৃশ্য, পোড়া মাংসের বিকট গন্ধ, হকসেদের হঠাৎ এমন অবিশ্বাস্য আচরণ, সম্ভাব্য গণপিটুনির আতঙ্ক, সর্বোপরি প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা… এবং সব কিছু এমন দ্রুত ঘটে গেল যে ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধবাক হয়ে গেছি সবাই।

আকাশ বাতাস থমথমে। কে যেন এক টুকরা ঝলসানো মাংস ছুড়ে মেরেছে জোরে, অস্তগামী সূর্যের দিকে। গেঁথে গেছে সেই মাংসপিণ্ড একদম সূর্যের গায়ে। জব্দ-হওয়া, ক্রোধে-রক্তিম-হওয়া সূর্যের গা থেকে মাংসপোড়া নালঝোল ঝরছে টুপটাপ। মাথার ওপরে মুখোমুখি দুটি বিষণ্ন শাদা মেঘ, লালকালচে ছোপ-লাগা। একটার ভেতরে হঠাৎ-হঠাৎ উদ্ভাস দিচ্ছে শিশুটার কান্নারত আবছা ছবি, আরেকটাতে তার ঝলসে যাওয়া বিকৃত দেহ।

চুপচাপ হাঁটতে থাকলাম অনেক্ষণ। কারুর মুখে কথা নাই কোনো। সমস্ত প্রকৃতিজুড়ে এক ধরনের অদ্ভুত বিষণ্নতা। ঝুপঝুপ করে ঝেঁপে নেমে আসছে খণ্ড-খণ্ড সন্ধ্যা। হাঁটতে হাঁটতে একসময় ঘাউরা লোকটা শান্তমুখে হকসেদকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, আপনে আচানক এই রকম একখান কা- কইরা বসলেন যে! আপনেরে তো কোনোদিন এরকম করতে দেখি নাই।” বিষণ্ন চুপচাপ হাঁটতে থাকে হকসেদ। কিছু বলে না। তারপর একসময় বলে ওঠে, “ঘটনার এমন উল্টাপাল্টা ঝাপটা যে কী কমু, হামি আসলে তালবেতাল হারায়া ফালাইছিলাম।”

তারপর আবার চুপচাপ সবাই। কিছুক্ষণ পর দুম করে বলে উঠল হকসেদ, “এহ্! জ্যান্ত মানুষের জন্যে দরদ নাই, মরা মানুষের জন্যে হাহাকার! দুনিয়ায় ধনী আর গরিবের ভিৎরে ফারাক বাইড়া গ্যাছে কী পরিমাণ, জানোস? এইসব বোঝোস কিছু তোরা? বুঝলে তো গায়ের লোম সব খাড়া যাইত-গা। যা, এত পারোস লুটেরাগুলানরে চোরাগোপ্তা ধইরা ধইরা ভুঁড়ি ফাঁসায়ে দে-গা। হেইটা পারোস না? কইবি, ‘হামরা না খাইতে পাইলে কী করমু আর! তোগো মাংস খামু।’ হাসতে হাসতে কইবি আর খাইবি। পারোস না?”

আবার চুপচাপ সবাই। অনেকক্ষণ পরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে হকসেদ, “সবকিছু সহ্য করা যায়, শিশুদের কষ্ট সহ্য করা যায় না। একদম না।”

রাস্তার ধারে বিশাল জায়গাজুড়ে বামনাকৃতি প্রাণীদের অভয়ারণ্য, তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ডাইনোসর, টেরাডাকটাইল, লম্বা দাঁতের বাঘ, সারা গায়ে লোমভর্তি উলুকঝুলুক ম্যামথ– প্রাগৈতিহাসিক সব জীবজন্তুর জ্যান্ত মিনিয়েচার। প্রাণীগুলি খুব ছোট ছোট, যেন প্রকৃতি নিজেই পরম যত্নে ওদের বনসাই করে বাঁচিয়ে রেখেছে কল্প-কল্পান্তর।

ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে সান্ধ্যকালীন। মন-প্রসন্ন-করা সেই হাওয়ার ভেতর তারের বেড়ার পাশে গিয়ে বসল হকসেদ। বেড়ার চৌকোনা ফাঁকফোকরের ভেতর দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে চুপচাপ বসে রইল একা-একা। লিলিপুট প্রাণীগুলি ঘনিয়ে এল হকসেদের কাছে। দেঁতো বাঘ আর ম্যামথ এসে চাটতে থাকল হকসেদের দুই হাত। ডাইনোসর এসে গা ঘষতে থাকল বেড়ার সঙ্গে। মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ বসে থাকল হকসেদ। তারপর একসময়, পেছন থেকে আমাদের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেল সে। আস্তে আস্তে উঠে হাঁটতে থাকল আমাদের সঙ্গে।

চলছি তো চলছিই, উত্তর অভিমুখে, ক্রমে উত্তরোত্তর অঞ্চলে। পথের পাশে একটি কুঁড়েঘর। চারপাশ ঝোপজঙ্গলে ঘেরা। উঠানের অর্জুন গাছটার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে কাতরাচ্ছে একটি শিশু। পাশে একটি নেউল। নেউলটি বারবার জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে, কী-এক জংলা গুল্মগাছের গোড়া কামড়াচ্ছে আর দৌড়ে এসে শিশুটার পায়ের পাতায় লাগিয়ে দিচ্ছে চিবিয়ে জীর্ণ-করা সবুজ বাকলচূর্ণ। আবার দৌড়ে যাচ্ছে, গাছটার গোড়ায় কিছুক্ষণ কামড়াচ্ছে আর দৌড়ে এসে শিশুটার পায়ে লাগিয়ে দিচ্ছে গুল্মচূর্ণ। এরকম বেশ কয়েকবার। হঠাৎ শিশুটার মা কোত্থেকে এক চ্যালাকাঠ এনে বসিয়ে দিল ধাবন্ত নেউলের মাথায়। দূরে ছিটকে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল নেউল।

দৌড়ে গেলাম আমরা অকুস্থলে। শিশুটির কাতরানি বেড়েই চলছে। দেখলাম নীল হয়ে উঠছে পায়ের পাতা। সাপে কেটেছে শিশুটিকে। অদূরেই ছিল নেউলটা। সে-ই তাড়িয়ে দিয়েছে সাপকে, আর যে-গুল্মের রস এনে সে লাগিয়ে দিচ্ছিল শিশুটার পায়ের পাতায়, দংশনস্থলে, তা ছিল তীব্র বিষবিনাশী। অনেকটা ধন্বন্তরী। বিষয়টি বুঝে ফেলে মা। সঙ্গে-সঙ্গে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গিয়ে নেউলের হা-করা মুখের ভেতর থেকে চিবানো গুল্মচূর্ণ বের করে এনে লাগিয়ে দেয় শিশুটির পায়ে, সাপের-দাঁত-ফুটিয়ে-দেওয়া নীল-হয়ে-যাওয়া জায়গাটিতে। প্রকৃতিতেই বিষ, আবার প্রকৃতিতেই বিষক্ষয়ী দাওয়াই। প্রকৃতিই দেয় চরম বালাই, আবার সে-ই দেয় পরম শুশ্রূষা।

এদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে ছুটে আসছে আশপাশের লোকজন। মা ততক্ষণে শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তা দিয়ে সন্তানের হাঁটুর নিচের দিকটায় কষে বেঁধে দিয়েছে, যাতে বিষ ছড়িয়ে পড়তে না পারে সারা শরীরে।
বিষতাড়ানো ওঝা এল, ওঝার সহযোগীরা এল, এল দোহারেরা। কালীসন্ধ্যাবেলা অর্জুন গাছের নিচেই পাটি বিছিয়ে শুইয়ে দেওয়া হলো কাতরাতে-থাকা শিশুটিকে। তারপর চলল উন্মাতাল ঝাড়ফুঁক আর বিষতাড়ানিয়া গান। ওদিকে অনুতাপে পুড়তে-থাকা মা গিয়ে মরা নেউলকে তুলে এনে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল আহাজারি করতে করতে।

নিসর্গের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসে রাগ ও উত্তাপ, আবার এই নিসর্গই দেয় শোক ও অনুতাপ। আসে অবিমৃষ্যকারিতা, ভুল বুঝতে পেরে পরক্ষণেই মনে জ্বলে ওঠে অনুশোচনার চিতা।

সম্ভবত গোবিন্দগঞ্জের কাছাকাছি কোনো এক গ্রাম। রাত যে খুব বেশি হয়েছে তা নয়। কিন্তু গাঁওগেরামের মানুষেরা ঘুমিয়ে একদম কাদা হয়ে থাকে এই সময়টায়। মানুষ যখন ঘুমায় তখন প্রাণবায়ু ছাড়া তার দেহের ভেতরে আরো যে চার রকম বায়ু আছে– অপান, সমান, উদান, ব্যান– সবগুলি বেরিয়ে আসে দেহ ছেড়ে। বেরিয়েই তারা বিচরণ করতে থাকে এখানে ওখানে। উঠানে, উনুনের আশেপাশে, ডালিম আর কামরাঙা গাছের নিচে, রাস্তার ধারে, চায়ের স্টলে, বালুচরে, ভেঙে যাওয়া বান্নির মেলায়…। নিমকদহের বিলে বাউত নেমেছে। দল বেঁধে খালুই-পলো নিয়ে মাছ ধরতে বিলে নেমেছে বহু মানুষ। উদান ও ব্যান-বায়ুরা গিয়ে মিশে যায় সেই বাউতে। অপানবায়ুরা হয়তো যোগ দেয় ছাতিয়ানতলির মাঠে ধানকাটা নিয়ে লেগে-যাওয়া লাঠালাঠিতে। আর সমানবায়ুরা? তারা হয়তো যায় শিমুলডাঙা হাইস্কুলের মাঠে সারি-সারি শামিয়ানা টানানো জেয়াফতের অনুষ্ঠানে। কখনো কখনো বায়ুগণ ঝাঁক বেঁধে বকুল কুড়াতে যায় গোরস্তানে, কিংবা কেউ কেউ হানা দিয়ে বসে রাধাচূড়া গাছে জমে-ওঠা ঘুমন্ত মৌচাকে। মৌমাছি উড়তে থাকে প্রচুর।

আর ঘুমন্ত মানুষেরা এইসব দেখতে থাকে তাদের স্বপ্নের ভেতর। এজন্যই প্রবীণেরা বলেন, ঘুমন্ত মানুষকে তাড়াহুড়া করে জাগাতে নেই। কারণ শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া ওইসব বিচরণমগ্ন বায়ুদের নাকি খুব কষ্ট হয় অত তাড়াতাড়ি দেহের ভেতর ফিরতে। কখনো কখনো একটি বা দুটি বায়ুকে বাইরে রেখেই জেগে ওঠে ঘুমন্ত শরীর। তখন বোবা ধ’রে ধুম্বা দিয়ে বসে থাকে জেগে-ওঠা মানুষ। সময় লাগে পুরোপুরি ধাতস্থ হতে।

এরকমই এক সুনসান ঘুমগুমসুম জনপদের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা কয়েকটি নির্ঘুম নিশাচর প্রাণী। গন্তব্য জানা নাই কারো। ওদিকে চাঁদ উঠেছে আকাশে। শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথির চাঁদ। একটি টিনের চারচালা, একটি ছনের দোচালা আর একটি ছনের পাকঘর দিয়ে ঘেরা একটি উঠান। উঠানের বরই গাছটাতে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বর্ণলতা। চকচকে নতুন টিনের চাল বেয়ে পিছলে পিছলে ঝরছে জ্যোৎস্না। স্বর্ণলতাগুলি হয়ে উঠেছে আরো সোনালি।

টিনের ঘরটায় থাকে স্বামী, স্ত্রী আর তাদের শিশুসন্তান। আর ছনেরটায় লোকটার বৃদ্ধা মা। পাড়াপড়শি সবাই ঘুমিয়ে গেছে। তারা ঘুমায়নি কেউই। ফোকলা দাঁতের বুড়ি। বিধবা। শাপশাপান্ত করে চলেছে অনর্গল,
“বুকের দুধ খিলাইয়া এমন একখান হারামি ছোল বানাইছি। গজব পইড়ব, গজব। খালি বউওর কথা হোনে আর মোক খালি কষ্ট দ্যায়! আল্লাহ্! এত মাইনষেরে ন্যাও, মোক ক্যানে উঠায়া ন্যাও না? এমন নেমকহারাম ছোল প্যাটোত ধরছিলাম!”

মায়ের শাপশাপান্তের এক পর্যায়ে ছেলে অসহ্য হয়ে বলছে,
“ওই এক খোটা পাইছে, খালি কয় বুকের দুধ খিলাইছে, বুকের দুধ খিলাইছে। যাও, হাটোত থাকি কাইলকাই জগ ভইরা দুধ কিন্যা আইনা খিলামু। শোধবোদ। তহন আর কী কয়া খোটা দিবা?”

ছেলের এমন আজগবি জবাব শুনে গভীর মনস্তাপের মধ্যেও হেসে ফেলে বুড়ি। হাজার হারামিপনা করলেও সন্তান তো মায়ের কাছে শিশুই। বুড়ির ছানি-পড়া চোখে হয়তো ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য-ন্যাংটা নাদুসনুদুস শিশুপুত্রটি তার হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে সারা উঠান, থেমে-থেমে মায়ের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে আর খিলখিল করে হেসে উঠছে ফোকলা দাঁতে। শিশুপুত্রের সেই অনির্বচনীয় অহৈতুকী হাসির সম্মোহনে দৌড়ে গিয়ে মা ধরে ফেলছে ছেলেকে, ধূলিময়লাসহ কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেতে খেতে বলছে, “ফোকলা দাঁতের হাসি/ মুই বড়ই ভালবাসি।”

প্রকৃতি থেকেই উঠে আসে মানুষ, আর তার মানবিকতা, স্নেহ, প্রেম, প্রীতি ও বাৎসল্য, আবার এই প্রকৃতিতেই উদ্ভব ঘটে নিষ্প্রেম, নিষ্প্রীতি, তঞ্চকতা, নিষ্ঠুরতা ও হারামিপনার।

(চলবে…)

পর্ব ১, ২, ৩, ৪, ৫ এবং ৬ এর লিংক:
http://arts.bdnews24.com/?p=1537
http://arts.bdnews24.com/?p=4310
http://arts.bdnews24.com/?p=4400
http://arts.bdnews24.com/?p=6173
http://arts.bdnews24.com/?p=6689
http://arts.bdnews24.com/?p=6910

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।