মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৩)

অদিতি ফাল্গুনী | ৭ জানুয়ারি ২০০৮ ১:৩৯ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

(গত সংখ্যার পর)

খণ্ড ১ : নির্যাতন

দ্বিতীয় অধ্যায়: বধ্যমঞ্চের জমকালো প্রদর্শনী

মোটামুটি ভাবে ১৭৬০ সালের আইন গ্রন্থই ফরাসী বিপ্লব পর্যন্ত সেদেশের দণ্ডবিধি আইনের সাধারণ আঙ্গিক নিয়ন্ত্রণ করেছে। সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন
sedia2.jpg……..
ইনকুইজিশনাল চেয়ার। জার্মানিতে এ ধরনের চেয়ার ব্যবহার করা হয়েছে ১৯ শতক পর্যন্ত। ইতালি ও স্পেনে ১৭০০ সাল পর্যণ্ত। ফ্রান্স ও মধ্য ইউরোপের দেশগুলিতে ১৮ শতক পর্যন্ত এই চেয়ার ব্যবহৃত হয়েছে।
……….
দণ্ডের ক্ষেত্রে নিচের পরম্পরা চালু ছিল: “মৃত্যু, প্রমাণের বিষয়টি অমীমাংসিত বা মূলতবি থাকলে বিচারাগারে শাস্তি, সশ্রম কারাদণ্ড, চাবুক বা বেত্রাঘাত, অ্যামেন্ডে অনাহাবল, নির্বাসন।” দেশের প্রচলিত নানা প্রথা, অপরাধের প্রকৃতি এবং অভিযুক্তের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী শাস্তির নানা প্রকরণ প্রচলিত ছিল। “মৃত্যুদণ্ডের আওতায় রয়েছে নানা প্রকারের মৃত্যু: কিছু কয়েদিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার আদেশ দেওয়া হতো, কারো কারো শিরচ্ছেদের আদেশ হতো, কারো আবার হাত কাটা বা জিহ্বা কাটার পর কি বিদ্ধ করার পর ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেওয়া হতো; অনেকের আবার, অপরাধের মাত্রা বেশি গুরুতর হলে, চাকায় বেঁধে
head-foucault.jpg……..
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)
………

শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করার পর হত্যা; কারো কারো ক্ষেত্রে শরীর ভেঙে দেওয়ার দণ্ড দেওয়া হতো যতক্ষণ না তাদের মৃত্যু হয়, অনেকের আবার শ্বাসরোধ করবার পর হত্যা এবং শরীর ভেঙে দেওয়া, অনেককে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা, অনেককে শ্বাসরুদ্ধ করার পর পুড়িয়ে মারা; অনেককে চারটা ঘোড়া দিয়ে টেনে নিয়ে টুকরো করা, অনেকের মাথা কেটে ফেলা এবং আরো অনেকের মাথা ভেঙে দেওয়া প্রভৃতি নানা ধরনের মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত ছিল (স্যুলাতজে, ১৬৯-৭১)।” এবং স্যুলাতজে আরো যোগ করেন যে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি নানা ধরনের তুলনামূলক হাল্কা দণ্ডও ছিল যা অবশ্য ১৭৬০ সালের আইনে উল্লেখ করা হয় নি: মামলার ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের সন্তোষ সাধন, অভিযুক্তকে হুমকি বা ভীতি প্রদর্শনী, কঠোর তিরষ্কার, সংক্ষিপ্ত সময়ের কারাদণ্ড, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশে বাধা এবং শেষতঃ আর্থিক দণ্ড অর্থাৎ জরিমানা বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রচলন ছিল।

তবে, আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত হবে না। ভীতির এই অস্ত্রাগার এবং প্রতিদিনের দণ্ড অনুশীলনের ভেতর কিছু উল্লেখযাগ্য ব্যবধান ছিল। এমন নয় যে সে সময়ের দণ্ড আইন অনুযায়ী বন্দিকে প্রকাশ্য নির্যাতন করা বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়াই শাস্তির সবচেয়ে বেশি চর্চিত প্রকরণ ছিল। ধ্রুপদী যুগে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের পরিমাণ আজকের আমাদের চোখে খুব বেশি মনে হতে পারে: ১৭৫৫-৮৫ সাল নাগাদ শাতেলেতে বিচারকদের দেওয়া রায়ের শতকরা দশ ভাগই ছিল মৃত্যুদণ্ডের বিধান: চাকা, ফাঁসিকাঠ অথবা অপরাধীকে পুড়িয়ে মারার জন্য খুঁটিতে বাঁধার রায় (পেত্রোভিচ, ২২৬); ১৭২১-১৭৩০ সালের ভেতর ফ্লেন্ডার্সের সংসদ মোট ২৬০ টি মামলার রায় প্রদান করে যার ৩৯টিই ছিল মৃত্যুদণ্ড (১৭৮১-১৭৯০ সাল নাগাদ ৫০০টি মামলার রায়ের ভেতর মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ছিল ২৬–দ্যোত্রিকোর্ট)। কিন্তু, এ কথাও ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এসব আদালত দণ্ড ব্যবস্থার কড়াকড়ি শিথিল করার নানা পথ খুঁজে বের করেছে। কখনো কখনো সে জাতীয় অপরাধের জন্য মামলা রুজু করতে চায় নি যেগুলোর জন্য খুব কঠোর শাস্তির বিধান ছিল। অথবা কখনো অপরাধের সংজ্ঞাই পরিমার্জ্জনা করতে চেয়েছে; আবার কখনো খোদ রাজশক্তিই ইঙ্গিত করেছে যে কোনো কোনো কঠোর আইন বা অধ্যাদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের প্রয়োজন নেই (১৭৪৪ সালের ৩ আগস্ট চোয়েস্যুল যেভাবে ভবঘুরেদের প্রতি আচরণের বিষয়ে ইঙ্গিত করেন–চোয়েস্যুল, ১২৮-৯)। যেভাবেই হোক, অধিকাংশ মামলার রায়েই নির্বাসন বা আর্থিক জরিমানার ঘোষণা থাকতো। ১৭৫৫ সাল হতে ১৭৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শাতেলেতের আদালত (যা শুধুমাত্র তুলনামূলক ভাবে গুরুতর অপরাধমূলক মামলাগুলোর বিচার করতো) মামলার রায় প্রদান করেছে, সেসব রায়ের অর্ধেকের বেশিই অপরাধীদের দণ্ডিত করেছে নির্বাসন দণ্ডে। কিন্তু, এই আপাতঃ অ-দৈহিক দণ্ডগুলোতেও দৈহিক শাস্তির কিছু উপাদান থাকতো: শাস্তির জনপ্রদর্শনী, অপরাধীর গলায় কাঠের চাকা ঝোলানো, চাবুকাঘাত, লোহা পুড়িয়ে শরীরের কোনো অংশে দাগ দেওয়া ইত্যাদি। পালতোলা নৌকায় নির্বাসন পাওয়া সকল কয়েদির জন্য এই ছিল মোটামুটি দস্তুর। নারী অপরাধীদের জন্য ছিল হাসপাতালে নির্বাসন দেবার রীতি। নির্বাসন দেবার আগে প্রায়ই দণ্ডিতকে জনসমক্ষে ঘোরানো হতো এবং শরীরের কোনো কোনো অংশে দাগ দেওয়া হতো; কখনো কখনো চাবুক বা বেত্রাঘাতের সাথে আর্থিক জরিমানা করা হতো। শুধুমাত্র ভাবগম্ভীর মৃত্যুদণ্ড প্রদান অনুষ্ঠানেই নয়, শাস্তির এই অন্যান্য প্রকরণেও শারীরিক অত্যাচার বা নিগ্রহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পালন করতো। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট মাত্রার গুরুত্বসম্পন্ন প্রতিটি শাস্তিই অত্যাচার বা শারীরিক নিগ্রহের কিছু উপকরণ ধারণ করতো। ফরাসী ভাষায় একে বলা হয় সাপ্লিস (supplice)।

সাপ্লিস কী? “দৈহিক শাস্তি, যা কম বা বেশি মাত্রায় হলেও বেদনাদায়ক এবং ভীতিকর,” জোক্যুর্ট তাঁর ‘এনসাইক্লোপেদি’
the-executioner-s-mask.jpg………
জল্লাদের জন্য লোহার শিরস্ত্রাণ
……..
প্রবন্ধে বলেন এবং সেই সাথে যুক্ত করেন: “এটা এক অব্যাখ্যেয় ব্যাপার যা নিষ্ঠুরতা এবং পাশবিকতা থেকে মানুষের কল্পনার বিস্তারের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।” অব্যখ্যেয় হলেও, দৈহিক শাস্তি কোনো অনিয়মিত বা প্রাগৈতিহাসিক ব্যপার নয়। অত্যাচার একটি কৌশল। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলাহীন ক্রোধের কোনো চূড়ান্ত প্রকাশ নয়। অত্যাচার হবার জন্য শাস্তিকে তিনটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, শাস্তিকে একটি নির্ধারিত মাত্রার ব্যথা তৈরি বা উৎপাদনে সক্ষম হতে হবে, যা নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা যায়, কিম্বা কমপক্ষে গননা করা যায়, তুলনা করা যায় এবং ক্রমমান অনুযায়ী সাজানো যায়। মৃত্যু হলো সেই বিশেষ প্রকারের নির্যাতন যা শুধুই ব্যক্তির জীবনের অধিকারকে কেড়ে নেয় না বরং এটি একটি ঘটনা বা উপলক্ষ্য এবং একটি বিশেষভাবে পরিকল্পিত স্তরের যন্ত্রণার যোগফল। যেমন: শিরচ্ছেদ (যা একটি মাত্র অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সব যন্ত্রণা হ্রাস করে, অত্যাচার বা নির্যাতনের শূন্য মাত্রা মুহূর্তেই সম্পন্ন হয়–), ফাঁসি, কয়েদিকে অগ্নিদগ্ধ করার খুঁটি এবং চাকা (যন্ত্রণাকে প্রলম্বিত করে), দণ্ডিতের শরীরকে চার টুকরো করা যা মৃত্যুযন্ত্রণাকে প্রায় অসীমতার দিকে চালিত করে। আসলে মৃত্যু-নির্যাতন হলো যন্ত্রণার ভেতর জীবনকে রেখে দেবার শিল্প, মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করার আগে “হাজারটি মৃত্যুর” বোধ অনুভব করানো, জীবন তার “সবচেয়ে তীক্ষè যন্ত্রণা”(অর্থাৎ, মৃত্যুকে) অর্জনের আগেই অপরাধীকে এই “হাজারটি মৃত্যুর” বোধ ও কষ্ট দেওয়া (অলিফি)। নির্যাতন ব্যথার পরিমাণগত শিল্পের সামগ্রিকতার উপর নির্ভর করে। কিন্তু, এখানে আরো কিছু বিষয় আছে: যন্ত্রণার এই উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত। নির্যাতন দৈহিক অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া, যন্ত্রণার গুণগত মান, তীব্রতা ও স্থায়িত্বকে অপরাধের ভয়াবহতা, অপরাধীর ব্যক্তিগত পরিচয় এবং ভিকটিমের সামাজিক মর্যাদার সাথে সম্পর্কযুক্ত করে। যন্ত্রণার একটি আইনী বিধি আছে। শাস্তির ভেতর যখন নির্যাতনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, অপরাধীর শরীরে যে নির্বিচারভাবে আঘাত করা হয় বা সমান পরিমাণে আঘাত করা হয় তা’ নয়। পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়মাবলী হিসেব করেই দেওয়া হয়: চাবুকের আঘাতের সংখ্যা, যে লৌহশলাকা দিয়ে অপরাধীকে দাগ দেওয়া হবে সেই লৌহশলাকার বিশেষ অবস্থান, খুঁটি বা চাকায় বাঁধা থাকা অবস্থায় অভিযুক্তের মৃত্যু যন্ত্রণার স্থায়িত্ব। আদালতই নির্ধারণ করে যে অপরাধীকে সাথে সাথে শ্বাসরূদ্ধ করে হত্যা করা হবে নাকি ধীরে ধীরে মৃত্যু দেওয়া হবে, এবং নির্যাতনের ঠিক কোন মুহূর্তে তাকে দয়া প্রদর্শনের ইঙ্গিত করা যেতে পারে, কোন ধরনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করা হবে (হাত কাটা হবে নাকি ঠোঁট অথবা জিহ্বা বিদ্ধ করা হবে)। এই যাবতীয় উপকরণই শাস্তিকে বহুগুণ বর্ধন করে এবং আদালত ও অপরাধ অনুযায়ী শাস্তিকে একীভূত করা হয়। রসি বলেন, ‘দান্তের কবিতার নরক বর্ণনাকে আইনে পরিণত করলে যা হয়, তাই হলো শাস্তি। যে কোনো ক্ষেত্রেই অপরাধীকে দেওয়া যন্ত্রণা হলো দৈহিক-শাস্তি সংক্রান্ত জ্ঞানের এক দীর্ঘ গতিপথ।” এছাড়াও, নির্যাতন আচারানুষ্ঠানের অংশও গঠন করে বৈকি। শাস্তির গণপ্রার্থনার ক্ষেত্রে নির্যাতন হলো অন্যতম উপকরণ। এবং দুটো চাহিদাই সে পূরণ করে। চাহিদা দুটো হলো, এক. শাস্তি এমন হবে যা অপরাধীকে চিহ্নিত করবে: শাস্তির প্রধান লক্ষ্যই হলো অপরাধীকে চিহ্নিত করা। সে তার শরীরে কলঙ্ক চিহ্ন আঁকার মাধ্যমে হোক অথবা অপরাধীকে ঘিরে ধরা জনতার মাঝে তাকে প্রকাশ্য প্রদর্শন করার মাধ্যমেই হোক। অপরাধীকে কলঙ্ক চিহ্নে চিহ্নিত করাটাই শাস্তির মূল লক্ষ্য, এমনকি যদি সে শাস্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য অপরাধীকে শুদ্ধ করাও হয়। নির্যাতন বিরোধ নিষ্পত্তি করে না। বরং এটি চারপাশে চিহ্ন দিয়ে বেড়ায়, অভিযুক্ত ব্যক্তির শরীরে এমন চিহ্ন সেঁটে দেয় যা কিছুতেই মোছা যাবে না। যাতে মানুষ মনে রাখে জনসমক্ষে দণ্ড কার্যকর করার প্রকাশ্য প্রদর্শনী, অপরাধীর গলায় ঝোলানো কাঠের চাকা, নির্যাতন এবং ব্যথার যথার্থ প্রাপ্তি। এবং যে আইন এই দণ্ডের প্রয়োগ করে, সেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে জনসমক্ষে নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান হতে হবে জমকালো ও আড়ম্বরপূর্ণ। সমবেত জনতা এটা দেখবে যেন বা বিজয়োৎসবে অংশ নিচ্ছে এমনি সহর্ষ ভঙ্গিমায়। অপরাধীকে নির্যাতন করার সময় যে বাড়তি সন্ত্রাস প্রয়োগ করা হয়, তা শাস্তির বিজয়ের অন্যতম উপাদান। প্রতিটি প্রহারের সাথে অপরাধী ব্যক্তি চিৎকার করে গোঙাবে, দণ্ডদাতাদের দৃষ্টিতে তা শাস্তির কোনো লজ্জাজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয় বরং এটিই বিচার কার্যকরী হবার আড়ম্বর উদযাপন যা যাবতীয় শক্তিযোগে প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। একারণেই কোনো সন্দেহ নেই যে এমনকি অনেক সময় মৃত্যুর পরও হতভাগা অপরাধীর মৃতদেহটার উপরও চলে শাস্তি প্রয়োগের নামে নানা নিষ্ঠুরতা। শবদেহ পোড়ানো হয়, বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ছাই, নানা ধরনের প্রতিবন্ধক বেড়ার উপর দিয়ে লাশ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রাস্তার পাশে প্রদর্শিত হয়। সম্ভব যাবতীয় যন্ত্রণার সীমা অতিক্রম করে বিচার অপরাধীর শরীরকে অনুসরণ করে চলে।

“দণ্ডনীয় নির্যাতন” নামক শব্দবন্ধটি কোনো দৈহিক শাস্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে না। এটি যন্ত্রণার পার্থক্যকৃত উৎপাদন, অপরাধীকে চিহ্নিত করার এবং দণ্ডপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা প্রদর্শনের সংগঠিত আচার। এ কোনো উত্তেজিত আইনী ব্যবস্থার অভিব্যক্তির প্রকাশ নয় যে ব্যবস্থা তার সব সংযম হারিয়েছে। নির্যাতনের যা কিছু বাড়াবাড়ি, তাতে আসলে ক্ষমতার সমগ্র অর্থনীতিই বিনিয়োগকৃত।

অভিযুক্তের নির্যাতিত দেহ আইনী আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সবার দেখার জন্য উন্মুক্ত করা হয় যা নিশ্চিত ভাবেই উৎপাদন করে অপরাধের সত্যতা।

অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশের মতো ফ্রান্সেও গোটা ফৌজদারি কার্যবিধিই শাস্তি ঘোষণা হওয়া অবধি গোপন থাকতো। ইংল্যান্ডের কথা অবশ্য ছিল আলাদা। সাধারণ মানুষ তো বটেই, খোদ অভিযুক্তের কাছেও এই প্রক্রিয়াটি থাকতো আলো-আঁধারিতে ঢাকা। অপরাধীকে ছাড়াই মামলার তদন্তের কাজ
knee-splitter.jpg……….
হাটু ভাঙার যন্ত্র
………
চলতো। অনেক সময়ই মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা গৃহীত সাক্ষ্য প্রমাণাদি সম্পর্কে অপরাধীর এমনকি কিছু জানাও থাকতো না। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার এই প্রক্রিয়ায় মামলা সংক্রান্ত সকল তথ্যের অধিকার ছিল বাদীপক্ষের একচেটিয়া। ১৮৯৪ সালের অধ্যাদেশে বর্ণিত তথ্যানুযায়ী প্রাথমিক তদন্তের কাজ যতটা সম্ভব অধ্যবসায় এবং গোপনীয়তার সাথে সম্পন্ন হতো। ১৬৭০ সালের অধ্যাদেশ বিগত বছরগুলোর আইনের কঠোরতা নিশ্চিত করেছিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনী নিমর্মতার পুনরুৎপাদন করেছিল । এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী অভিযুক্তের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না মামলার নথিপত্র জানার ন্যূনতম সুযোগ পাওয়া, সম্ভব ছিল না বাদীপক্ষের সম্পর্কে কিছু জানা কিম্বা, মামলায় গৃহীত সাক্ষ্য প্রমাণাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া যতক্ষণ না কাঠগড়ায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যের প্রতিবাদ করতে তাকে আনা হতো। বিচারের শেষ মুহূর্তের আগ অবধি প্রমাণের জন্য আনীত নথিপত্র বা দলিল-দস্তাবেজের ব্যবহার করাটাও ছিল তার পক্ষে অসম্ভব। অসম্ভব ছিল মামলায় সঠিক আচরণ পাবার জন্য অথবা মূল বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য একজন আইনজীবী ঠিক করা। ম্যাজিস্ট্রেটের অধিকার ছিল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অনামা কারো উড়ো অভিযোগ গ্রহণ করার, অভিযুক্তের কাছ থেকে আদালত কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সে বিষয়ে তথ্য গোপন করার, অভিযুক্তকে হাতে-নাতে ধরার উদ্দেশ্যে যেন-তেন প্রশ্ন করার, বক্রোক্তি ব্যবহার করার (অষ্টাদশ শতক অবধি আদালত পাড়ায় লম্বা লম্বা সওয়াল জবাব প্রচলিত ছিল, অভিযুক্তকে ছিদ্রান্বেষী যত প্রশ্নে বিচারকের জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অসত্য বাক্য, দ্ব্যর্থবোধকতা সম্পন্ন শব্দ ব্যবহার করাটা ছিল তার আইনসঙ্গত অধিকার)। একক কর্তৃত্বগর্বে ম্যাজিস্ট্রেট একটি সত্য অনুমান করতেন যার ভিত্তিতে তিনি অভিযুক্তকে তদন্ত করতেন; এবং বিচারকরা এই সত্যকে নানা দলিলপত্রে এবং লিখিত বর্ণনায় পূর্বপ্র¯ত্তত তথ্যের মতো গ্রহণ করতেন। বিচারকদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেটের পেশকৃত এই দলিলপত্র বা লিখিত বিবরণ সমূহই ছিল প্রমাণ। বিচারের রায় ঘোষণা করার আগে অভিযুক্তকে তারা মাত্র একবার প্রশ্ন করতেন। ফৌজদারি কার্যবিধির গোপন ও লিখিত আঙ্গিক এই নীতিই প্রতিফলন করে যে ফৌজদারি মামলায় সত্যের প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণভাবেই সম্রাট ও তাঁর বিচারকদের ক্ষমতাধীন। এইরোল্ট (Ayrault) অনুমান করেছিলেন যে গোপনে তদন্ত সম্পন্ন করার এই প্রক্রিয়া (যা কমবেশি ষোড়শ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল) গৃহীত হয়েছিল মূলতঃ “জনতার বিস্ফোরণের ভয় থেকে। সাধারণ মানুষ যেমন বিক্ষোভ বা হর্ষধ্বনি দেয়, তার প্রতি ভয় থেকে। সম্রাটের আরো ভয় ছিল যে তদন্ত প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের নাগালের আওতায় নিলে জনতা থেকে থেকে মামলায় বিবদমান পক্ষসমূহের প্রতি বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস এবং ক্ষোভে ফেটে পড়তে পারে, এমনকি খোদ বিচারকদের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ প্রকাশ করতে পারে;” সম্রাট আরো আগ্রহী ছিলেন এটা দেখাতে যে সাম্রাজ্যের যে সার্বভৌম ক্ষমতা হতে শাস্তি প্রদানের অধিকার উৎসারিত, তা কোনোক্রমেই জনতার অধিকারের আওতাভুক্ত নয় (এইরোল্ট, অধ্যায় LIII, LXXII & LXIX)। সার্বভৌম সম্রাটের ন্যায়দণ্ডের সামনে সব কণ্ঠস্বরকে হতে হবে নিঃশব্দ।

তবু, গোপনীয়তার ব্যবহার সত্ত্বেও, সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু আইন মেনে চলা ছিল অবশ্য কর্তব্য। গোপনীয়তা নিজেই শাস্তি সংক্রান্ত সত্যের কঠোর আদর্শ সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে। মধ্যযুগ থেকে আইনী নানা ঐতিহ্যের ধারা, যা রেনেসাঁ যুগের বড় আইনজীবীদের হাতে লক্ষণীয়ভাবে বিকাশ লাভ করে, সাক্ষ্যের প্রকৃতি এবং ব্যবহার বিষয়ে প্রচুর বিধিনিয়ম রচনা করেছিল। এমনকি খোদ অষ্টাদশ শতকেও নিম্নোক্ত সাক্ষ্য প্রমাণাদির ভেতর ভেদরেখা টানবার প্রচলন ছিল। সত্য, প্রত্যক্ষ অথবা বৈধ প্রমাণ (উদাহরণস্বরূপ, ঘটনার সাক্ষীদের দ্বারা বর্ণিত)। এবং অপ্রত্যক্ষ, অনুমানমূলক ও কৃত্রিম প্রমাণ (সওয়াল জবাবের মাধ্যমে অর্জিত)। অথবা, প্রকাশ্য প্রমাণ, বিবেচনাযোগ্য প্রমাণ, ত্র“টিপূর্ণ বা অসমাপ্ত এবং মৃদু প্রমাণ (জ্যুসে, ৬৬০)। কিম্বা, “জরুরি অথবা প্রয়োজনীয়” প্রমাণ যা কাউকে কৃত অপরাধ কর্মের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করার অনুমতি দেবে না (একে বলা হতো সম্পূর্ণ প্রমাণ: এভাবেই দু’জন সাক্ষী, যাদের কিনা প্রশ্ন করা যেত না, জোর দিয়ে বলতেন যে তারা দু’জন অভিযুক্তকে দেখেছেন রক্তমাখা ও খোলা তলোয়ার হাতে কোনো স্থান পরিত্যাগ করতে যেখানে কিছুক্ষণ পরে মৃত ব্যক্তিকে ছুরিকাহত অবস্থায় দেখা গেছে); নিকটবর্তী বা অর্ধেক প্রমাণ, যা কিনা ততক্ষণ পর্যন্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে যতক্ষণ না অভিযুক্ত ব্যক্তি এর বিপরীতে কোনো সাক্ষ্য দিয়ে এই প্রমাণকে বাতিল করছে (খুনের আগে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অথবা মৃত্যুর হুমকি)। শেষত, ফরাসী ভাষায় যাকে বলা হতো adminicules অর্থাৎ দূরবর্তী সাক্ষ্য বা যোগসূত্র, যা গঠিত হতো শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে (গুজব, সন্দেহভাজন ব্যক্তির পলায়ন, আদালতে প্রশ্নোত্তর পর্বে তার আচরণ ইত্যাদি–ম্যুয়ার্ট দ্যু ভোগলানস, ১৭৫৭, ৩৪৫-৭। এখন, সাক্ষ্যপ্রমাণের এই শ্রেণীভেদ শুধুই তাত্ত্বিক সূক্ষ্মাগ্রদর্শীতা (theoretical subtleties) নয়। এই প্রভেদগুলোর কিছু কার্যকরী দিকও রয়েছে। প্রথমত, নির্জনতায় গৃহীত এই প্রতিটি শ্রেণীর সাক্ষ্যেরই একটি নির্দিষ্ট ধাঁচের বিচারগত প্রভাব থাকতে পারে। “সম্পূর্ণ” প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হতে পারে। “অর্ধ-পূর্ণ” প্রমাণের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত যে কোনো কঠিন দৈহিক শাস্তির দণ্ড ঘোষিত হতে পারে, ফরাসীতে যাকে বলা হয় peines afflictievs। “ত্রুটিপূর্ণ” বা “মৃদু” প্রমাণের ভিত্তিতেই সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে রিট বা তদন্তের জন্য সরকারী আদেশপত্র জারি করা যেত, অথবা নতুনতর তদন্তের জন্য মামলাটি সাময়িকভাবে মূলতবি রাখা বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আর্থিক জরিমানা দানের আদেশ দেওয়া যেত। দ্বিতীয়ত, এই উভয় বিষয়কে নিখুঁত গাণিতিক নিয়মে যোগ করা হয়েছে। দু’টো “অর্ধ-পূর্ণ” প্রমাণ মিলে একটি সম্পূর্ণ প্রমাণ গঠিত হবে। কতিপয় দূরবর্তী সাক্ষ্য বা যোগসূত্রের (adminicules) ভিত্তিতে গঠিত হবে একটি “অর্ধ-পূর্ণ” প্রমাণ। তবে শর্ত এই যে ঐসব দূরবর্তী যোগসূত্রের ভেতর ঐকমত্য থাকতে হবে। অবশ্য এই দূরবর্তী যোগসূত্রগুলোর অনেকেই নিজেরা মিলে একটি সম্পূর্ণ প্রমাণের চেহারা বা আকার ধারণ করতে ব্যর্থ হতে পারে। এভাবেই আমরা পেয়ে যাচ্ছি শাস্তির গণিত যা বিভিন্ন বিষয়েই অত্যন্ত সতর্ক। তবে, এই গণিত তর্ক-বিতর্কের জন্যও কিছু জায়গা রেখে দেয়। ধরা যাক, একটি মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার জন্য একটি পূর্ণ প্রমাণই যথেষ্ট নাকি এর সাথে আরো কিছু মৃদু বা দূরবর্তী যোগসূত্র প্রয়োজন? দু’টো নিকটবর্তী প্রমাণ মিলে কি একটি সম্পূর্ণ প্রমাণ গঠনে সক্ষম? তিনটি বা অন্ততঃপক্ষে দু’য়ের অধিক দূরবর্তী যোগসূত্রের কি প্রয়োজন নেই? এমন উপকরণাদি রয়েছে কি যেগুলো আদালতে অপরাধের যোগসূত্র বা ক্লু হিসেবে বিবেচিত হবে শুধুমাত্র বিশেষ কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এবং বিশেষ কিছু ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে? যেমন, ভবঘুরে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে আসা সাক্ষ্য আদালত আমলে নেয় না, কিন্তু ঐ একই সাক্ষ্য আদালত বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে যদি এটি কোনো “গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি” প্রদান করে কিম্বা কোনো গার্হস্থ্য অপরাধের (domestic offence) ক্ষেত্রে বাড়ির কর্তা যদি সাক্ষ্য প্রদান করে? এই গণিত কারণতত্ত্ব (causistry) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যার কাজই হলো কীভাবে একটি আইনী প্রমাণকে গঠিত করা যায় সেই বিষয়ে সংজ্ঞা দান করা। একদিকে, “আইনী প্রমাণাদি”র এই ব্যবস্থা সত্যকে শাস্তির ক্ষেত্রে একটি জটিল শিল্পের ফলাফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে; বিশেষজ্ঞদের জানা নিয়মগুলোই শুধু মান্য করে, এবং, ফলাফলস্বরূপ, গোপনীয়তার নীতিকে এটি পুনরুৎপাদন করে। “এটাই যথেষ্ট নয় যে বিচারকের অন্য যে কোনো যৌক্তিক মানুষের মত প্রত্যয় থাকলেই চলবে…একটি কম-বেশি সুগঠিত মতামতের ভিত্তিতে যে বিচার সম্পন্ন হয়, তার চেয়ে ভুল বিচার আর থাকতে পারে না।” কিন্তু, অন্য দিকে, নিয়মানুবর্তীতার অভাব ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য একটি মারাত্মক প্রতিবন্ধকতাও হয়ে দাঁড়ায়, “নিয়মানুবর্তিতার অভাবে প্রতিটি রায়ই বেপরোয়া হয়ে উঠবে, এবং কোনো কোনো হিসেবে এটাও বলা যেতে পারে যে এমনকি অভিযুক্ত যদি সত্যিই অপরাধীও হয়ে থাকে, তাকে একপেশে শাস্তি দানের বিষয়টি ন্যায্য নয় (পুলেইন দ্যু পার্ক, ১১২-১৩–আরো দেখুন এসমেইন, ২৬০-৮৩ এবং মিত্তেহমেইয়েহ (Mittermaier), ১৫-১৯)। এমনও দিন আসবে যখন এই বিচারগত সত্যের অনন্যতা রীতিমতো কলঙ্কজনক হয়ে দাঁড়াবে। যেহেতু সাধারণ সত্যের নিয়ম মানার কোনো বাধকতা আইনের কখনোই ছিল না। “বিক্ষোভ প্রদর্শনে সক্ষম বিজ্ঞানে একটি অর্ধ-পূর্ণ প্রমাণ সম্পর্কে কী বলা হবে? একটি জ্যামিতিক বা বীজগণিতীয় অর্ধ-প্রমাণই বা কোন মূল্য বহন করবে? (সেইন্যেক্স দ্যু করেভেন, ৬৩। কিন্তু, সেই সঙ্গে এটিও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে আইনী প্রমাণাদির উপর এই আনুষ্ঠানিক বাধাগুলো ছিল নিয়ন্ত্রণের একপ্রকার পন্থা যা চূড়ান্ত ক্ষমতা এবং জ্ঞানের একচেটিয়াপনার অন্তর্গত।

dandp.jpgলিখিত, গোপন, প্রমাণ গঠনার্থে এবং কঠোর নিয়মের স্বার্থে শাস্তি বিষয়ক তদন্ত ছিল সেই যন্ত্র যা অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতেও সত্য উৎপাদন করবে। এবং এ ঘটনার মাধ্যমেই, আইন ঠিক কড়াকড়িভাবে না চাইলেও, এই প্রক্রিয়া অনায়াসে অভিযুক্তের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের দিকে গড়াত। মূলতঃ দু’কারণে এমনটি হতো: প্রথমত, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি এত শক্ত প্রমাণ হিসেবে আবির্ভূত হতো যে এর সাথে আর কোনো প্রমাণ যুক্ত করার কোনো দরকার হতো না, কিম্বা ঘটনার জটিল ও দ্ব্যর্থক নানা যোগসূত্রের ভেতর ঢোকারও দরকার হতো না। সঠিক পন্থায় গৃহীত স্বীকারোক্তি মামলার বাদীপক্ষকে অন্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব থেকে একদম মুক্ত করে দিত। যে কোনো ক্ষেত্রেই, স্বীকারোক্তিকেই সবচেয়ে কঠিন সাক্ষ্য মনে করা হতো। দ্বিতীয়ত, একমাত্র যে পন্থায় এই প্রক্রিয়া তার দ্ব্যর্থহীন কর্তৃত্ব ব্যবহারে সক্ষম হতো এবং অভিযুক্তের উপর জিততে সক্ষম হতো, একমাত্র যে পন্থায় সত্য তার সকল ক্ষমতা প্রয়োগে সক্ষম হতো, তা হলো স্বকৃত অপরাধের জন্য অপরাধীর দায়িত্ব স্বীকার করে নেওয়া। এবং প্রাথমিক তদন্তে দক্ষতার সাথে এবং সকলের অজ্ঞাতসারে যেভাবে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ গঠন করা হয়েছে, সেটা নিজ স্বাক্ষরে স্বীকার করে নেওয়া। আইরোল্ট, যিনি এই গোপন প্রক্রিয়াগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না, মন্তব্য করেন: “এটাই যথেষ্ট নয় যে অন্যায়কারী শাস্তি পেয়েছে। যদি সম্ভব হয়, তবে তাদের নিজেদের বিচার করতে এবং নিন্দা করতে পারতে হবে (আইরোল্ট i. I, অধ্যায় ১৪)।” লিখনের দ্বারা পুনর্গঠিত অপরাধের অভ্যন্তরে যে অপরাধী স্বীকারোক্তি দান করতো, সে যেন বা মূর্তিমান সত্যের রূপ পরিগ্রহ করতো। অপরাধীর স্বীকারোক্তিই লিখিত ও গোপন প্রাথমিক তদন্তের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হতো। উল্লেখ্য, অপরাধীই ঘটনার জন্য দায়ী ও ঘটনার বিবরণ দেয়। সুতরাং, এই তদন্তমূলক প্রক্রিয়ার সব গুরুত্বই স্বীকারোক্তির ঘাড়ে বর্তাতো।

এখানেই স্বীকারোক্তির ভূমিকার দ্ব্যর্থকতাও নিহিত। একদিকে যেমন অপরাধীর স্বীকারোক্তিকে সাক্ষ্যের সাধারণ গণিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা গৃহীত হয়েছিল; সেইসাথে এটাও আবার জোরের সাথে বলা হয়েছিল যে এই স্বীকারোক্তি অনেক প্রমাণের ভেতর একটির বেশি কিছু নয়। এটা ফরাসীতে যাকে বলে evidentia rei বা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ নয়। প্রত্যয় আনয়নে স্বীকারোক্তি একাই যথেষ্ট নয়। এর সাথে আরো যুক্ত হওয়া প্রয়োজন কিছু অতিরিক্ত এবং আনুষঙ্গিক সাক্ষ্য। যেহেতু এটি একটি সুপরিজ্ঞাত তথ্য যে অনেক সময়ই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এমন অনেক অপরাধের স্বীকারোক্তি দেয় যে অপরাধ সে আদৌ হয়তো করেনি, সেহেতু তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে কিছু অতিরিক্ত তদন্তও করতে হতো যদি তার হাতে অপরাধীর স্বীকারোক্তি ব্যতীত অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকতো। কিšত্ত, অন্যদিকে আবার সব ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভেতর স্বীকারোক্তির গুরুত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। একটি নির্দিষ্ট স্তর অবধি, স্বীকারোক্তি অন্য যাবতীয় সাক্ষ্যকে অতিক্রম করতে পারতো। সত্যের নিরিখ বিচারে স্বীকারোক্তি একটি উপকরণ। স্বীকারোক্তি প্রদানের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধের দায় গ্রহণ করতো এবং সত্যকে স্বীকার করতো। স্বীকারোক্তি অপরাধীর অনুপস্থিতিতে সঙ্ঘটিত তদন্তকে তার স্বেচ্ছা দৃঢ়োক্তি বা সত্যাপনে (affirmation)-এ রূপান্তরিত করতো। স্বীকারোক্তি প্রদানের মাধ্যমে অভিযুক্ত নিজেই শাস্তি সংক্রান্ত সত্য উৎপাদনের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতো। মধ্যযুগের আইন বলে যে স্বীকারোক্তি ‘গোটা বিষয়কে কুখ্যাত এবং প্রকাশ্য করে তোলে।’ এই প্রথম অষ্পষ্টতার সাথে পরবর্তী সময়ে যুক্ত হয় দ্বিতীয় অস্পষ্টতা। অভিযুক্তকে যথার্থ অপরাধী হিসেবে প্রতিপন্ন করতে অতিরিক্ত কিছু যোগসূত্রকে (পষঁবং) বলিষ্ঠ প্রমাণ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিকে অত্যন্ত উচ্চ মূল্য দেবার অংশ হিসেবে তদন্তের কাজ এবং বিক্ষোভের কৌশলকে ন্যূনতম স্তরে কমিয়ে আনা হয়। এবং অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের জোর-জুলুম চালানো হয়। তবে, ফৌজদারি এই কার্যবিধি প্রক্রিয়ায়, প্রাথমিক লিখিত তদন্তের মৌখিক এবং জীবন্ত প্রতিলিপিকে অভিযুক্তের পক্ষ তেকে এর বৈধ উত্তর হিসেবে নানা লিখিত অঙ্গীকার ও আনুষ্ঠানিকতায় আচ্ছাদিত হতে হতো। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা লেন-দেনের মতো। এ কারণেই একে হতে হতো স্বতঃস্ফূর্ত। যেমন, কেন এই স্বীকারোক্তি একটি দক্ষ আদালতের সামনে পেশ করতে হতো, কেন এটি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে করতে হতো, কেন কোনো অসম্ভব বিষয়কে জড়িয়ে এই স্বীকারোক্তিতে কোনো বক্তব্য থাকবে না ইত্যাদি। এই স্বীকারোক্তি আদায়ের মাধ্যমে, অভিযুক্ত আদালতের কার্যবিধির কাছে নিজেকে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ করতেন; তিনি প্রাথমিক তদন্তের সত্যকে স্বাক্ষর করতেন।

স্বীকারোক্তির এই দ্বৈত অস্বচ্ছতা (প্রমাণের একটি উপকরণ এবং প্রাথমিক তদন্তের প্রতিপক্ষ; প্রতিবন্ধকতার প্রভাব এবং আধা-স্বেচ্ছাকৃত লেন-দেন) ধ্রুপদী অপরাধ আইন কর্তৃক অপরাধীর স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য দুটো বড় উপায়কে ব্যাখ্যা করে। প্রথমত, জিজ্ঞাসাবাদের পূর্বে অভিযুক্তকে শপথ গ্রহণ করতে বলা হয় এবং এভাবেই তাকে মানবীয় এবং স্বর্গীয়, উভয় ধরনের বিচার ব্যবস্থার সামনে মিথ্যা বলার বা শপথভঙ্গের ভয়ে মানসিক ভাবে ভীত করে তোলা হয় এবং একইসাথে শপথ বা প্রতিশ্র“তির একটি আচারানুষ্ঠানও তাকে দিয়ে পালন করানো হয়। এবং বিচারগত নির্যাতন (সত্য আদায়ের জন্য শারীরিক নির্যাতন, এবং এহেন নির্যাতনের মাধ্যমে আদায়কৃত স্বীকারোক্তিই কিন্তু বিচারকদের সামনে পুনরাবৃত্ত করা হবে “স্বতঃস্ফূর্ত” স্বীকারোক্তি হিসেবে, যদি তা’ প্রমাণ গঠনে সমর্থ হয়)। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে, নির্যাতনকে আর একটি যুগের বর্বরতার অবশিষ্ট হিসেবে নিন্দা করা হতো। নিন্দা করা হতো গথিক যুগের নিষ্ঠুরতার স্মারক হিসেবে। এটা সত্য যে নির্যাতনের চর্চার শেকড় রয়েছে অতীত যুগে: ইনক্যুইজিশন (১৫-১৬ শতক নাগাদ প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত হতে বিচ্যূতদের তালিকা প্রণয়নের জন্য রোমের গির্জার ধর্ম-বিচারসভা) বা তারও আগে ক্রিতদাসদের নির্যাতনের যুগে। তবে, ধ্রুপদী আইনে নির্যাতনকে কোনো ত্রুটি বা অতীত বর্বরতার স্মারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। একটি জটিল দণ্ডবিধি ব্যবস্থায় নির্যাতনের ছিল একটি নির্দিষ্ট অবস্থান। যেখানে তদন্তের প্রক্রিয়া অভিযোগমূলক ব্যবস্থার উপকরণাদির সাথে পুনরুৎপাদন করা হয়েছিল। যে ব্যবস্থায় লিখিত প্রতিবাদের সাথে একটি মৌখিক বক্তব্যও যুক্ত করা দরকার হয়। যে ব্যবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেটগণ কর্তৃক চালু করা প্রমাণাদির কৌশল অভিযুক্তের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আয়োজিত অগ্নিপরীক্ষার পদ্ধতির সাথে মিশ্রিত করা হতো। এহেন চারিত্রিক শুদ্ধতার পরীক্ষায় সবচেয়ে উগ্র প্ররোচণার মাধ্যমে অভিযুক্তকে ডাকা হতো ফৌজদারি কার্যবিধি প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছায় অংশীদার হতে। যে ব্যবস্থায় দুটো উপকরণের সংযোগে গঠিত কৃৎকৌশল দ্বারা সত্য উৎপাদনের বিষয়টি ছিল একটি প্রশ্ন। এই উপকরণদ্বয় ছিল মামলার কর্তৃপক্ষ দ্বারা গোপনে পরিচালিত তদন্ত এবং অভিযুক্ত কর্তৃক আচারানুষ্ঠানের মতো করে করা কাজ। অভিযুক্তের শরীর বা প্রয়োজনবোধে তার যন্ত্রণাদগ্ধ শরীর ও তার বক্তব্য, উপরোক্ত দুই কৌশলের সংমিশ্রণ বিষয়টিকে নিশ্চিত করতো। সে কারণেই যতক্ষণ না পর্যন্ত শাস্তির ধ্র“পদী ব্যবস্থা উপর হতে নিচ অবধি পুনর্পরীক্ষা করা হয়েছে, নির্যাতন বিষয়ে খুব হাতে গোনা বিপ্লবী সমালোচনাই পাওয়া গেছে। এদের ভেতর সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ১৮৬২ সালে করা নিকোলাসের উক্তি: Si la torture est un moyen a verifier les crimes – যেহেতু অত্যাচার হলো অপরাধকে যাচাই করার একটি মাধ্যম। বিচারকদের বিবেচনাবোধ প্রয়োগের অজস্র পরামর্শ লক্ষ্য করা যায়: “মামলার অত্যাচার (Judicial Torture) হলো সত্য সংক্রান্ত জ্ঞানে পৌঁছবার একটি বিপজ্জনক মাধ্যম; এ কারণেই যথোপযুক্ত বিবেচনা ছাড়া বিচারকদের অত্যাচারের রাস্তা ধরা উচিত নয়। কোনো কিছুই এর চেয়ে বেশি আর দ্ব্যর্থবোধক নয়। প্রচুর অপরাধী ব্যক্তি রয়েছে যারা সত্যি সত্যি অপরাধ সঙ্ঘটন করেও তা’ গোপন করতে পারার মতো মানসিক দৃঢ়তা রাখে…এবং একইসাথে প্রচুর নিষ্পাপ ব্যক্তিও রয়েছে যারা অত্যাচারের মুখে যে অপরাধ করেনি তাও করেছে বলে স্বীকারোক্তি প্রদান করে (ফেরিয়ের, ৬১২)।

এই প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে যে কেউ মামলার অত্যাচারের সক্রিয়তা, নির্যাতনের মুখে জিজ্ঞাসাবাদকে সত্যের নির্যাতন হিসেবে ভাবতে পারেন।
the-guillotine.jpg……….
গিলোটিন
………
শুরুর কথা বলতে গেলে, মামলার নির্যাতন কোনো মূল্য বিচারেই সত্য আদায়ের পন্থা হতে পারে না। ছিলও না কখনো। আধুনিক তদন্ত পদ্ধতির লাগামহীন অত্যাচারও এটি ছিল না, যা নিঃসন্দেহে নিষ্ঠুর ছিল তবে বর্বর ছিল না। এই নির্যাতন সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ফৌজদারি কার্যবিধি মেনে চলত। এটি ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত অনুশীলন। নির্যাতনের বিভিন্ন ধাপ, ধাপগুলোর স্থায়িত্ব, নির্যাতনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিসমূহ যেমন দড়ির দৈর্ঘ্য বা ব্যবহৃত ওজনের ঘনত্ব, তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদের সংখ্যা…এ সব কিছুই ছিল বিভিন্ন স্থানীয় অনুশীলন অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কভাবে নথিবদ্ধ। ১৭২৯ সালে, ওগোসো ফ্রান্সে ব্যবহৃত নির্যাতনের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং নিয়মের একটি তদন্ত করেন। এই তদন্তের ফলাফলের সংক্ষিপ্তসার দেখতে হলে দেখুন জলি দ্যু ফ্লোরি (ঔড়ষু ফব ঋষবঁৎু), ৩২২-৮। নির্যাতন ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি ধরনের একটি বিচার পদ্ধতিগত খেলা। এবং পুরনো যত পরীক্ষা ও বিচারের সাথে নির্যাতন ছিলো সম্পর্কযুক্ত। ইনক্যুইজিশনের সময়কালীন নির্যাতনের কৌশলাদি আবিষ্কৃত হবার অনেক আগেই চারিত্রিক পরীক্ষা, বিচারের দ্বন্দ্বযুদ্ধ, ঈশ্বরের বিচার প্রভৃতি অভিযোগ আনয়নকারী ফৌজদারি কার্যবিধিতে চর্চা করা হতো। মামলার নির্যাতন শুরু করার আদেশদাতা বিচারক এবং সন্দেহভাজন ও নির্যাতিত ব্যক্তি, এই উভয়ের মাঝে সেই প্রাচীনকালের নাইটদের ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করার মতো (joust) কিছু একটা যেন বা ছিল। “রোগী”কে–অভিযুক্তকে এ নামেই ডাকা হতো–মুখোমুখি করা হতো পরপর অনেকগুলো জিজ্ঞাসাবাদ পর্বে। তাকে নির্মম অত্যাচারে অত্যাচারিত হবার স্নাতক সনদ পেতে হতো। এহেন অত্যাচার সয়েও অপরাধ স্বীকার না করলে সে বিজয়ী হতো। আর পরাজিত হতো যদি অত্যাচারের মুখে সে স্বীকারোক্তি দিয়ে বসতো। নির্যাতনের প্রথম মাত্রা ছিল অত্যাচার করবার যন্ত্রপাতিগুলো দেখা। শিশু আর সত্তরোর্ধ বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি নির্যাতন করা হতো না। কিন্তু, তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট নিজে কিছু ঝুঁকি না গ্রহণ করে নির্যাতন চালাতেন না। এছাড়াও, অনেক সময় এতে সন্দেহভাজনের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকতো। এই খেলায় ম্যাজিস্ট্রেটের হাতের তাস ছিল তার হাতে ইতোমধ্যে সংগৃহীত সাক্ষ্য। কারণ ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়মটি ছিল এই যে যদি অভিযুক্ত নির্যাতনের মুখে ভেঙে না পড়তো এবং অপরাধ স্বীকার না করতো, তবে ম্যাজিস্ট্রেট বাধ্য হতো তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো খারিজ করতে। তখন নির্যাতিত ব্যক্তিই জয়ী হতো। এ কারণেই “প্রমাণের অভাবে” সবচেয়ে গুরুতর মামলাগুলোয় দণ্ডমূলক নির্যাতন চালানোর প্রথা ছিল। তবে, নির্যাতনের মুখেও যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ স্বীকার না করতো, তারপরও ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত চালিয়ে যেতে পারতেন। নির্যাতনের মুখেও অনমনীয় প্রতিরোধের কারণে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে যে নিষ্পাপ ঘোষণা করা হতো, তা নয়। তবে অন্ততঃ তার মৃত্যুদণ্ডটা এতে করে ঠেকানো যেত। বিচারক তার হাতের তাসগুলো একটাও ছাড়তেন না, শুধু মূল তাসটি ছাড়া। আর এই তাসটির নাম হলো Omnia citra mortem. একারণেই অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের ক্ষেত্রে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পরিমাণ সাক্ষ্য প্রমাণ হাতে থাকলে ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রায়ই পরামর্শ দেওয়া হতো সে যেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে স্বীকারোক্তির জন্য নির্যাতনের মুখে দাঁড় না করায়। কারণ, যদি সন্দেহভাজন ব্যক্তি সব নির্যাতন সয়েও অপরাধ স্বীকার না করে, তবে ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে কিছুতেই আর তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা ঘোষণা করা সম্ভব হবে না। যদিও সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তি হয়তো মৃত্যুদণ্ডই। এমন খেলায় সবচেয়ে বেশি যে হারে সে হলো ন্যায়বিচার। যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গৃহীত সাক্ষ্য এই পরিমাণ পর্যাপ্ত হয় যা “এমন অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডের জন্য সাব্যস্ত করবে” তবে কারোরই উচিত নয় “অভিযুক্তকে নির্যাতনের মুখে ছেড়ে দিয়ে গোটা বিষয়টা হতে তাকে সুযোগ নেবার পথ করে দেওয়া এবং তাকে এমন একটি অস্থায়ী তদন্তের মুখোমুখি করা যা হতে প্রায়ই কোনো ফলাফল দাঁড়ায় না; কারণ মূলতঃ জননিরাপত্তার স্বার্থেই ভয়াবহ, আতঙ্কজনক এবং প্রধান অপরাধগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।” (রুশো দো লা কম্ব, ৫০৩)।

আপাতঃদৃষ্টে এক দৃঢ়সঙ্কল্প ও সত্যের জন্য অধীর সন্ধানের আড়ালে ধ্রুপদী নির্যাতনের চারিত্র্যে যে কেউ খুঁজে পাবেন চরিত্র পরীক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রিত করণকৌশল। সত্যকে সংজ্ঞা দানকারী একটি শারীরিক চ্যালেঞ্জ। ‘রোগী’ বা অপরাধী যদি সত্যিই পাপটি করে থাকে, তবে তাকে যন্ত্রণা দেওয়াটা অন্যায় নয়। আর, যদি সে নিষ্পাপ হয়ে থাকে, তবে এই নির্যাতন তাকে অভিযোগ হতে নি®কৃতি দানেরও একটি স্মারক বৈকি। নির্যাতনের এই অনুশীলনে, ব্যথা, সংঘাত এবং সত্য পরস্পরবদ্ধ ছিল: রোগীর শরীরে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করতো। দণ্ডমূলক নির্যাতনের মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান ছিল নিঃসন্দেহে সাক্ষ্য আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা। এবং এদের ভেতর আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অপরাধী ব্যক্তির স্বীকারোক্তি আদায়। তবে, এটা ছিল যেন অনেকটাই যুদ্ধের মতো একটি ব্যপার যেখানে এক পক্ষ আর এক পক্ষের উপর জয়ী হতো আর এভাবেই রীতিমতো আচার-আনুষ্ঠানিকতা মেনে সত্য ‘উৎপাদিত’ হতো। স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য অপরাধীকে নির্যাতন করার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, তাতে তদন্তের একটি উপাদান ছিল। ছিল দ্বন্দ্বযুদ্ধের উপকরণ।

আসলে এই সমগ্র প্রক্রিয়াটিই ছিল যেন বা তদন্ত ও শাস্তির একটি মিশেল। এবং এ বিষয়ে এটাই ন্যূনতম স্ববিরোধিতার দিক নয়। ‘বিচারে যথেষ্ট পরিমাণ শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে’ দণ্ডমূলক অত্যাচারকে সংজ্ঞায়িত করা হতো প্রমাণ পূর্ণ করার পন্থা হিসেবে। যেহেতু স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য করা নির্যাতনকে শাস্তি হিসেবে ধরা হতো। ১৭৬০ সালের অধ্যাদেশ, শাস্তির ক্রমমান তালিকায়, স্বীকারোক্তি আদায়ের নির্যাতনকে মৃত্যুদণ্ডের পরেই প্রধান শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। যে কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে কীভাবে শাস্তি স্বীকারোক্তি আদায়ের পন্থা হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে? প্রমাণ প্রদর্শনের পন্থা হিসেবেই বা কেউ শাস্তিকে কীভাবে বিবেচনা করবেন? ধ্রুপদী যুগে অপরাধ বিচার ব্যবস্থা যেভাবে সত্য উৎপাদন করতো, সেপথেই এর কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সাক্ষ্যের বিভিন্ন টুকরো একত্রে গেঁথে পাপের বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চিত প্রমাণ হাজির করতো, ততক্ষণ সাক্ষ্যের এই ভগ্নাংশগুলো অনেক নিরপেক্ষ উপাদান গঠনে সক্ষম হতো না। সাক্ষ্যের প্রতিটি টুকরো একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ঘৃণা বা বিভীষিকা তৈরি করতো। সমস্ত সাক্ষ্য একত্র করা হলেই যে পাপের শুরু হতো তা কিন্তু নয়। বরং টুকরো টুকরো করে যখন সাক্ষ্যের প্রতিটি একক জোড়া দেওয়া হতো, তখন এই প্রতিটি উপাদান দিয়ে অপরাধী ব্যক্তিকে শণাক্ত করা সম্ভব হতো। এভাবেই একটি অর্ধ-প্রমাণের কারণে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নিষ্পাপ মনে করা হতো না। অর্ধ-প্রমাণের কারণে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অর্ধেক পাপী মনে করা হতো। কোনো গুরুতর অপরাধের সামান্য সাক্ষ্য সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে সামান্য অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতো। সংক্ষেপে বলতে হলে, দণ্ডমূলক প্রমাণ সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, কোনো দ্বৈত ব্যবস্থা মেনে চলতো না। বরং এটি মেনে চলতো সদা মানবিন্যাসের নীতি। প্রমাণের ক্ষেত্রে একটি মাত্রা অর্জিত হওয়া অর্থ হলো অপরাধীর অপরাধ বিষয়ে একটি মাত্রা অর্জন এবং সেই সাথে শাস্তির ক্ষেত্রেও একটি মাত্রা অর্জন করা। সন্দেহভাজন ব্যক্তি সর্বদাই একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শাস্তির জন্য বিবেচিত হতো। কেউ একই সাথে সন্দেহভাজন ও নিষ্পাপ হতে পারে না বলেই সাধারণভাবে মনে করা হতো। বিচারকের ক্ষেত্রে সন্দেহ প্রমাণের একটি উপাদান হিসেবে ইঙ্গিত বহন করতো। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘিরে উত্থাপিত সন্দেহ ইঙ্গিত করতো অপরাধের একটি বিশেষ মাত্রা। এবং শাস্তির ক্ষেত্রে এটি ইঙ্গিত করতো একটি সীমিত মাত্রার শাস্তি প্রয়োগ। সন্দেহভাজন ব্যক্তি কখনোই নিষ্পাপ হিসেবে ঘোষিত হতো না। যেহেতু তার সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যেত। বরং তাকে আংশিক ভাবে শাস্তি পেতে হতো। কেউ যখন পূর্বানুমানের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অবধি অর্জন করতো, তখন সে বৈধ ভাবেই দ্বৈত ভূমিকা সম্পন্ন কোনো খেলা চালু করতে পারতো। ইতোমধ্যে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে শাস্তি চালু করা এবং এই প্রথম স্তরের শাস্তির ভিত্তিতে এখনো অধরা সত্য আবিষ্কারের জন্য হুমকি প্রদান। অষ্টাদশ শতকে দণ্ডমূলক শাস্তি সেই অদ্ভুত অর্থনীতিতে কাজ করতো যেখানে সত্য উৎপাদনের আনুষ্ঠানিকতা ও শাস্তি প্রয়োগের আনুষ্ঠানিকতা হাত ধরাধরি করে চলতো।

তথ্যনির্দেশ


১. পুরাতন প্যারিসের দুটো দুর্গ: ছোট এবং বড় শাতিলেত। প্রথম দুর্গটি ১৮০২ সালে ভেঙে ফেলা হয়। এটি ছিল সিন নদীর তীরে। প্যারিসের ভিইকাউন্ট এবং নগরাধ্যক্ষের ফৌজদারি আদালত এখানেই বসতো। দ্বিতীয় দুর্গটি নদীর বাম তীরে, হোটেল-দিউয়ের বাসে কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

২. ত্রয়োদশ বা চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ মামলার প্রমাণের তালিকায় আমরা স্বীকারোক্তির উপস্থিতি দেখতে পাই। পাভিয়ার বার্নার্ড (Bernard of Pavia) এসম্পর্কে কোনো কিছু নির্দেশ না করলেও হোস্টিমিস (Hostiemis) কিন্তু উল্লেখ করছেন। ক্রেটারের সংজ্ঞা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ: ‘Aut legitime convictus aut sponte confessus,’ (স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকারোক্তিই হলো বৈধ সাক্ষ্য)।” মধ্যযুগের আইনে, শুধুমাত্র প্রতিপক্ষের সামনে প্রদত্ত প্রাপ্তবয়ষ্কদের স্বীকারোক্তিই বৈধ বলে গণ্য করা হতো, দ্রষ্টব্য, লেভি (Levy)।

কিস্তি ৪

a_falgun@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সরকার আমিন — জানুয়ারি ৭, ২০০৮ @ ৮:২৩ অপরাহ্ন

      মানুষকে আপন করার চেয়ে নির্যাতন করার পদ্ধতি বেশি। একে সভ্যতা বলে। অনুবাদটি ভালো লেগেছে।

      সরকার আমিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিপ্লব রহমান — জানুয়ারি ১১, ২০০৮ @ ৩:৫১ অপরাহ্ন

      কি ভয়ংকর!…

      অনুবাদটি খুব সাবলীল। ধন্যবাদ।।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফয়সল নোই — জানুয়ারি ১১, ২০০৮ @ ১০:৪৮ অপরাহ্ন

      ভালো লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md: Jahidul Islam — december ১৩, ২০১২ @ ৩:২৮ অপরাহ্ন

      # মানুষ মানুষকে ভুলে যায় , ‌ক‌ি‌‍ন্তু তার প্রভু , তাকে ভুলনো । এই পৃথবীতে মানুষ সৃষ্টি আর ‍‍”আল্লাহ স্রস্টা” । —- রিতন

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com