সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: স্রোতের বিরুদ্ধে স্নোডেন, অরুন্ধতী, কুসাক

বিপাশা চক্রবর্তী | ৫ december ২০১৫ ৯:৫৭ পূর্বাহ্ন

মস্কোর ক্রেমলিনের কাছেই হোটেল রিৎজ কার্লটন। বাইরে তখন রাশিয়ান শীতের হিম শীতল আবহাওয়া, কিন্তু হোটেলের ভেতরে অন্যরকম উষ্ণতা । ধোপদুরস্ত অভিজাত কোটিপতি, শিল্পপতি, ডাকসাইটে সুন্দরী, মডেল, সুপার মডেল, অর্থের বিনিময়ে তাদের কাছে পেতে চাওয়া কিছু মাতাল উঠতি ধনী, আর সৌভাগ্যের সন্ধানে ঘুর ঘুর করতে থাকা সুদর্শন তরুণদের ভীড় এড়িয়ে আরেকটু সামনে। তারপর, সুস্বাদু খাবার আর দামী বাসনকোশনে বোঝাই ট্রলি ঠেলে শিষ কেটে চলে যাওয়া ব্যস্ত ওয়েটার, লবীর হৈ চৈ আর সঙ্গীতের মূর্ছনার রেশটুকু যেখানে এসে শেষ হয় সেই করিডোর ধরে এগিয়ে গেলেই কক্ষ নম্বর ১০০১। এখানকার পরিবেশটাই আলাদা , হোটেলের চিরচেনা ঐ পরিবেশের সাথে ঠিক খাপ খায় না। কারণ এই কক্ষের ভেতরে এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় মেতেছেন বিশ্বে বিভিন্ন সময় আলোচিত বাকস্বাধীনতার পক্ষের চারজন মানুষ। না কোনো পূর্বনির্ধারিত আড্ডা ছিল না এটা। বা ছিল না কোন গোপন বৈঠক। ‘ফ্রিডম অব প্রেস ফাউন্ডেশন’-এর আমন্ত্রণে ও প্রচারণার কাজে অংশ নিতে এসে মস্কোর হোটেল রিৎজ কার্লটনে দেখা হয়ে যায় তাদের। এরা হলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক বিশেষজ্ঞ, যুদ্ধ বিরোধী প্রবক্তা এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার ‘পেন্টাগন পেপারে’র গোপনীয়তা ফাঁস করে আলোচিত মানুষ ড্যানিয়েল এলসবার্গ। দ্বিতীয় জন হলিউড অভিনেতা, পরিচালক, ও রাজনৈতিক সমালোচক জন কুসাক। তৃতীয়জন ভারতীয় উপন্যাসিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়। আর চতুর্থ ও সর্বশেষ ব্যক্তিটি হলেন, এই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফেরারী! মার্কিন গোপন-নথি ফাঁস করা এডওয়ার্ড স্লোডেন যাকে ছোটখাট, নরম প্রকৃতির তুলতুলে আদুরে অথচ পরিচ্ছন্ন বিড়ালের সাথে তুলনা করেছেন অরুন্ধতী রায়।

এই মানুষগুলো সম্পর্কে জানেন এমন পাঠকরা নিশ্চই অনুমান করতে পারছেন, কী কী বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে তাদের মধ্যে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়ার স্নায়ুক্ষয়ী কূটনীতি, বিশ্বে সামরিক আগ্রাসন, জনগণের উপর নজরদারী, বাক-স্বাধীনতা, পৃথিবীর ভবিষ্যত রাজনীতি–এসবের কিছুই বাদ যায়নি তাঁদের আলোচনা থেকে। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে উপন্যাসিক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়, অভিনেতা জন কুসাক লিখেছেন ও কথা বলেছেন তাঁদের এই আড্ডার মুহূর্তগুলো আর কথোপকথনের বিষয় সম্পর্কে ।

ড্যানিয়েল আর স্নোডেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থায় প্রশাসনে কাজ করার সময়ের অভিজ্ঞতা আর ভাবনার কথা বলেছেন।
অরুন্ধতী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁরা দুজনেই মার্কিন নাগরিক হিসেবে পেন্টাগনে ও জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সিতে কাজ করার স্মৃতিচারণ করেন। কিভাবে তাঁরা প্রভাবিত হয়েছেন মার্কিন ভুল নীতির বিপক্ষে, বিবেকের দংশনে তাদের গোপন-নথি প্রকাশ করা এবং কিভাবেই বা তাদের জীবন বদলে গেলো, ইত্যাদি। স্নোডেন আর ড্যানিয়েলের বক্তব্য প্রায়ই মিলে যায় মানবিকতা ও বিবেকের প্রশ্নে। হঠাৎ করেই তাঁদের মাঝে এসব বিষয়ে বোধোদয় হয়েছে–তা কিন্তু না। এটি শুরু হয়েছে সেই সময়কাল থেকেই, ড্যানিয়েল যখন যুক্তরাষ্ট্রকে সমাজতন্ত্র থেকে মুক্ত করার মিশনে লিপ্ত ছিল। আর স্নোডেনের ক্ষেত্রে হয়েছে মুসলিম সন্ত্রাসবাদ থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করার কাজে যোগদানের সময় থেকে।

অরুন্ধতী জানতে চেয়েছিলেন স্লোডেনের কাছে, ওয়াশিংটনের অন্য রাষ্ট্র ধ্বংস করার ক্ষমতা আর যুদ্ধ জয়ের অক্ষমতা সম্পর্কে । ‘প্রশ্নটা হয়তো একটু রূঢ় হয়েই গেল’,–সে সময় নাকি এমনই মনে হচ্ছিল অরুন্ধতীর। অনেকটা, ‘মার্কিনিরা শেষ কবে যুদ্ধে জয় লাভ করেছে’?–এমন। অরুন্ধতী তাঁর কাছে আরো জানতে চেয়েছেন- ইরাকের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও গণহত্যা বিষয়ে। কিভাবে সিআইএ অনুধাবন করল যে, ‘বিশ্বে একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে শুধু যুদ্ধই করবে না বরং রাষ্ট্রের ভিতরেও যুদ্ধ করতে হবে, যার জন্য গণনজরদারী প্রয়োজন। আর প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও একটি দেশের সেনাবাহিনী প্রশাসক হিসেবে পুলিশবাহিনীর বিকল্প ভূমিকা পালন করে–এগুলোই ছিল অরুন্ধতীর প্রশ্ন।
স্নোডেন, তাঁর উত্তর শুরু করেন একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর গোয়েন্দা নজরদারীর বিষয় থেকে। তিনি এটিকে অন্ধকার ভবিষ্যৎ বলেছেন। যেখানে সত্য হলো ‘একদল লোক আমাদের সব কিছুর খবর রাখবে অথচ তাদের সম্পর্কে আমরা কিছুই জানব না। এর কারণ তারা গোপনীয় ও সুবিধাভোগী একটি আলাদা শ্রেণী। অনেকটা সমাজের ধনিক শ্রেণী ও রাজনীতিবিদদের মতো উঁচু স্তরের। তারা কোথায় থাকেন, কী করেন, তাদের বন্ধু কারা, কিছুই আমরা জানি না। অথচ আমাদের সম্পর্কে সবকিছু জানার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। আর এটিই হলো আগামীর নির্দেশনা । এভাবেই সবকিছু পরিবর্তিত হচ্ছে।

আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির জনগণের উপর এই নজরদারী কার্যক্রমের ফলে নাগরিকের মনে সবসময় ভয়ভীতি, ভারসাম্যহীনতা কাজ করে কিনা ? অনেকটা কাঁধের উপর দিয়ে কেউ দেখছে ও নিয়ন্ত্রণ করছে–তাদের এমন মনে হয় কিনা? অরুন্ধতী জানতে চান স্নোডেনের কাছে। উত্তরে তিনি বলেন, “নাইন ইলিভেনের পর আসলে দৃশ্যপটের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আমেরিকা হয়তো এখনো পুরোপুরি পুলিশি-রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। তবে আরেকটি নাইন ইলিভেন হলে নিশ্চিত পুলিশি-রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এখনকার সাদা মানুষেরা হয়তো পুলিশি-রাষ্ট্রে বাস করছে না কিন্তু যারা কালো, মিশ্র, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ তারা কিন্তু ঠিকই এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন পরবর্তীতে নাইন ইলিভেনের মত কোনো দুর্ঘটনা হলে তাঁর ফলাফল ভয়াবহ হবে। তখন শত শত হাজার ডিটেনশন ক্যাম্প হবে, অজস্র মানুষ গ্রেপ্তার হবে, মুসলিমদের ধরে ধরে ক্যাম্পে ঢুকানো হবে। আর এটি করা হবে কিন্তু বর্তমানে জনগনের উপর নজরদারী থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করেই”। পুরো আলাপচারিতার সময়টুকুতে গা এলিয়ে এক প্রকার চুপচাপভাবেই ছিলেন ড্যানিয়েল। কারন অভিজ্ঞ এই মানুষটির এখানে নতুন কিছু যোগ করবার ছিল না, কারন সবই তিনি জানেন। তারপরেও মাঝে মধ্যে যখনই তিনি আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে কথা বলেছেন, বারবারই ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। তাকে দেখে অরুন্ধতীর মনে হচ্ছিল, আমেরিকা এমন একটি দেশ যেখানে ‘ভাল মানুষ’ যারা আছেন হয় তাদের জেলে যেতে হয়, নয়তো হতে হয় নির্বাসিত। অন্যদিকে, আলাপচারিতায় প্রসঙ্গচ্যুতি ধরিয়ে দেবার কাজটি করছিলেন জন কুসাক।

প্রসঙ্গক্রমে তারা চারজন কথা বলছেন, যুদ্ধ, লোভ, সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্র, দেশপ্রেম, পতাকা, জনমত, নৈতিকতা, উদ্বাস্তু সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক থেকে ইউরোপে অবস্থান করা উদ্বাস্তুদের সকলেই জীবনযাত্রা পরিবর্তনের এক কষ্টকর যুদ্ধে অবতীর্ণ। আর এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু হচ্ছেন উইকলিকসের প্রতিষ্ঠাতা লন্ডনের এক দূতাবাসে আশ্রিত জুলিয়ান এসেঞ্জ এবং রাশিয়ায় আশ্রিত এডওয়ার্ড স্নোডেন।
স্নোডেনের ভাগ্যে কী আছে? সে কি কখনো আমেরিকায় ফিরতে পারবে? তা বোধ হয় সম্ভব নয়। আমেরিকান সরকার যে কোনো মূল্যে স্নোডেনকে শাস্তি দিতে চায়। তাদের সব রাজনৈতিক দলগুলিও এ বিষয়ে একমত। তারা তাকে কারাদন্ড বা হত্যা করতে না পারলেও সে যেন আরও বেশি তথ্য দিতে না পারে বা যতটুকু ক্ষতি করেছে তা পূরণ করা যায় তাঁর জন্য আমেরিকার কোনো চেষ্টাই বাদ থাকবে না।

অরুন্ধতী ভাবছেন, ড্যানিয়েল ও স্নোডেনের মতো সাহসী মানুষ আছে বলেই এখনো মানুষের মঙ্গল হয়। কী অপরাধ তারা করেছেন? কেন তারা রাষ্ট্রদ্রোহী? তারা নিজের দেশের ও পৃথিবীর লোকদের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন বলে।

যে বিপ্লব স্বপ্ন দেখায়

বর্তমান যুগে যেকোনো আন্দোলন আর প্রতিবাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর মিডিয়া বেশ ভালোভাবেই সাড়া ফেলতে সক্ষম। তাই অনেক সময়ই শাসকশ্রেণী নানা অজুহাতে এসবের ব্যবহার সীমিত করে জনগণের অধিকারের স্বাধীনতায় লাগাম টেনে ধরতে চান। কিন্তু যেখানে সংগ্রাম টিকে থাকার, স্বাধীনতার ইচ্ছা যেখানে প্রবল, মানবিকতা যেখানে অবরুদ্ধ সেখানে ঠিকই প্রতিবাদ সংগঠিত হবে কোনো না কোনোভাবে । বার বার বাধাপ্রাপ্ত হবার পরেও। সর্বকাল আর সর্বদেশে এই আসল প্রতিবাদটি করতে হয় বাস্তবের রণাঙ্গনে। বুলেটের সামনে তোপের মুখে। সেটা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েই হোক কিংবা মাইক্রোফোন, গিটার, কলম, রঙ-তুলি অথবা ক্যামেরা। সৃষ্টিশীল প্রতিবাদের এই অস্ত্রগুলোই যুগে যুগে স্বাধীনতার পক্ষে অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে কথা বলেছে। হাতিয়ার হয়েছে মানুষের মুক্তি-সংগ্রামের। বর্তমান পৃথিবীর যুদ্ধবিধস্ত সিরিয়ার দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাবো কিভাবে সেখানে সংগঠিত হয়েছিল এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। এখনো সিরিয়ার সাধারণ বেসামরিক ও উদ্বাস্তু নাগরিকরা চলমান গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে এই সব হাতিয়ার নিয়েই রুখে দাঁড়াচ্ছে, প্রতিবাদ করে যাচ্ছে যে যার জায়গা থেকে। ২০১১ সালের আগের সাংস্কৃতিক অবস্থার সাথে বর্তমান সিরিয়ার সাংস্কৃতিক অবস্থার কোন মিল নেই বলতে গেলে। তখন সংস্কৃতিকচর্চা ছিল অভিজাত শ্রেণীকেন্দ্রিক; অনেকাংশে মেকি ও নিছক বিনোদনমূলক। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। উপরতলা নয়, বরং সমাজের নিচুতলা ও তুলনামূলকভাবে গরীব মানুষদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে সিরিয়ার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সশস্ত্র যুদ্ধের বিপরীতে শান্তিপূর্ণ বিপ্লব।
syria-1.jpg
শরণার্থী দুই র‌্যাপ শিল্পী। ছবি:রয়টার্স।
মুক্তির দাবীতে শুরু হওয়া আরব বসন্তের প্রথম দিককার দিনগুলিতে সিরিয়ার সামাজিক গণমাধ্যমগুলি স্বৈরশাসক আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঢেউ তুলেছিল। তাদের আশা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার দাবী ছিল এই বিক্ষোভে। বিক্ষোভকারীরা দাবী আদায়ের জন্য মুক্তাঙ্গনে আয়োজন করেছিল স্লোগান, দেয়ালচিত্র, কার্টুন, নাচ আর গানের। বুলেটের নিশ্চিত আঘাত আসবে– এটা জানা থাকার পরেও এসব আয়োজিত হয়েছিল।
শুরুটা হয়েছিল বিক্ষোভকারীদের সেন্ট্রাল স্কয়ারে (মারজেহ স্কয়ার ) অবস্থানকে কেন্দ্র করে। মিশরের তাহরির স্কয়ার দখলের ঘটনা তাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। পূর্ব-দামেস্কের শহরতলীর বাসিন্দারা রাজধানীর আব্বাসীয়ন স্কয়ারে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিল সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে। কিন্তু ডজন ডজন লাশ পড়ছিল। অন্যদিকে প্রতি হাজারে মাত্র দশজন করে ক্লক স্কয়ারে হমস দখল করতে পারল। সেখানে তারা প্রার্থনা করছিল আর গান গাইছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়।

২০১১ এপ্রিলের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিণাম হলো গণহত্যা । অসহনীয় নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে শান্ত জনগণই ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ধাবিত হয়। ২০১২ সালের গ্রীষ্মে আন্দোলন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। সরকার আরো কঠোর হয়, বাড়তে থাকে আগ্রাসনের মাত্রা। এরই মাঝে শুরু হয় বিদেশি হস্তক্ষেপ। বহুজাতিক কোম্পানির মতো আন্তর্জাতিক জিহাদী দলগুলিও এর সাথে জড়িয়ে পড়ে। উদ্বাস্তু মানুষ যে যার মতো জীবন নিয়ে পালাতে থাকে।
এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে কাজ শুরু করে বেসামরিক বিপ্লবীরা। স্ব-সাংগঠনিক কমিটি ও কাউন্সিলগুলোর সাথে সিরীয় স্বাধীন সংবাদ সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে। দশটির মতো রেডিও স্টেশন ও ৬০টির বেশি পত্রিকা ও সাময়িকী ছিল এর মধ্যে। এই বিপ্লবের জ্বলন্ত উদাহরণ সিরিয়ার উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম কাফরনাবল। প্রত্যন্ত এই গ্রামটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিখ্যাত হয়ে ওঠে তার বিদগ্ধ আর মানবিক স্লোগানের জন্য। গ্রামের নিজস্ব রেডিও স্টেশন ‘রেডিও ফ্রেশ’ থেকে নিয়মিত প্রচারিত হতে থাকে স্বাধীনতাকামী সম্প্রচার, আলোচনা ও নারী অধিকার বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো। অতর্কিতে প্রচন্ড জঙ্গি আক্রমণ চালানো হয় কার্যক্রম থামাবার জন্য। স্থানীয় ভাষায় ‘এনাব বালাদি’ বা ‘গ্রেপস অফ মাই কান্ট্রি’ নামের পত্রিকাটি নারীদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হতো দামাস্কাসের শহরতলী দারাইয়া থেকে। এটিও স্তব্ধ করে রাখা হয়েছে। কারণ পত্রিকাটি স্পষ্টভাবেই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলতো ।

চলচিত্র নির্মাতা মনজার দারউইশ। যার নির্মিত চলচিত্র ‘মেটাল ইজ ওয়ার’ স্বৈরশাসকের বন্দুকের নলের বিপরীতে প্রতিবাদের শোরগোল তুলতে সক্ষম হয়। যার পর্দা জুড়ে ছিল হেভি মেটালের সুর আর রণভূমির দৃশ্য। এই নির্মাতাকেও দেশ ছাড়তে হয়। অন্যদিকে, সাহিত্যিক খালেদ খলিফার হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল শাসকের নির্মম আঘাত। কারণ তিনি লিখেছেন অধিকার আদায়ের স্বপ্নের কথা। সিরিয়ার প্রথম হিপ হপ গানের ব্যান্ড দল ‘ রিফিউজি অফ র‌্যাপ’ এই দলের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়, এমনকি তাদের স্টুডিওটি গুড়িয়ে দেয়া হয়। র‌্যাপ গানের কথা ও শব্দের ব্যবহারে তারা যুদ্ধের বিভীষিকার এমন বর্ণনা ছিল যা শাসকের কাছে ভয়ঙ্কর হিসেবে ধরা দেয়। আরো অনেকের মতোই এই দলটিরও আশ্রয় এখন ইউরোপ।
syria-2.jpg
কাফরানবেল-এ রেডিও ফ্রেশ-এ কর্মরত এ্যাক্টিভিস্টরা। ছবি:রয়টার্স।
ইব্রাহীম কাশাশ তরুণ কবি ও গীতিকার। বিদ্রোহের দিনগুলোতে যে হামার জনসমুদ্রে গেয়ে উঠেছিল ‘ইয়ালা হিরহাল! ইয়া বাসার!’ অর্থাৎ ‘গেট আউট বাসার! তোমার চলে যাবার সময় হয়েছে!’ খুব শিঘ্রই কণ্ঠনালী বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায় নদীর তীরে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কার্টুনিস্ট আলী ফিরজাত যার অসংখ্য কার্টুন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে কথা বলে। সর্বশেষ আগস্ট ২০১১তে কার্টুন এঁকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন আসাদ সরকারকে। সেই কার্টুনটিতে দেখা যায়, জীপ গাড়িতে পলায়নরত তৎকালীন লিবীয় প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফীর গতিরোধ করে আসাদ লিফট চাইছেন, সঙ্গে ফরেন সেক্রেটারী, একগাদা কাগজপত্র আর একটি পেটমোটা ব্রিফকেস। এই কার্টুনটি প্রকাশিত হবার পর পরই আসাদ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী তার দুহাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে দেয়। বর্তমানে এই কার্টুনিস্ট কুয়েতে পালিয়ে আছেন। আকরাম রাসলান নামে আরেক কার্টুনিস্টের ভাগ্য এর চেয়েও খারাপ। তাকে শাসকের নির্যাতনে প্রাণ হারাতে হয়। এভাবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বিরুদ্ধে একের পর এক শাস্তি দিয়ে যাওয়াটা চরম ভয়ানক প্রতীকী আইনে পরিণত করে শাসকশ্রেণী।

একদিকে আসাদ সরকারের ব্যারল বোমার আঘাত আরেকদিকে, আইসিসের অত্যাচার লুটপাটের শিকার প্রায় ১২ মিলিয়ন সিরিয় নাগরিক অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুহারা হয়েছে। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া গ্রাম আর বসতবাড়ি ছেড়ে থাকতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে গাছের তলায় অথবা সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে। কেউ কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে বর্ডারগুলোতে সীমানা পাড়ি দেবার আশায় আর কেউ কেউ হাহাকার করছে ইউরোপিয়ান সমুদ্রতীরগুলোতে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় চার মিলিয়ন শরণার্থী। এই সব মানুষরা তাদের দুঃখ কষ্ট রাগ ক্ষোভ স্বজন হারাবার বেদনার পাশিপাশি মনন ও সৃজনশীলতাও সাথে করে নিয়েই শরণার্থী হয়েছে। ইতিমধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়া সিরিয়রা তাদের উদ্বাস্তু ইমেজে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। যারা একসময় রাতের আধারে নীরবে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছিল তারাই এখন আবার স্বপ্ন দেখছে তাদের অধিকার মর্যাদা ফিরে পাবার। এ জন্য তারা রাজনীতি, যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ বা ধর্মকে নয়, বরং বেছে নিয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদকে। তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কথা, তাদের ত্যাগের ইতিহাস জানাতে চায় শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠতে থাকা ছেলেমেয়েদেরকে। ধর্মীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চায় একটি নতুন প্রজন্মকে। ক্রোধকে ভালবাসায়, হিংসাকে সৃষ্টিকর্মে, হতাশা আর দুঃখকে আশায় পরিণত করতে শিখে গেছে তারা।
তথ্যসূত্র : দি গার্ডিয়ান-এর চিত্র ও তথ্যাশ্রয়ে রচিত।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত বিপাশা চক্রবর্তীর আরও লেখা:
জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গম: অর্ধনারীশ্বর অথবা তৃতীয় প্রকৃতি

মানব তুমি মহীরুহ তুমি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য: আইনস্টাইন, শেক্সপিয়র, আঁদ্রে গ্লুক্সমাঁ, ফের্নান্দো ও বিয়োরো

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন poliar wahid — december ৫, ২০১৫ @ ২:৪১ অপরাহ্ন

      বিডি নিউজ-এর কল্যাণে আপনার কয়েকটি লেখা পড়ার সৌভাগ‌্য হয়েছে। অাপনার অনূদিত বিষয় নির্বাচন অসাধারণ। সমসাময়িক ও প্রাসঙ্গিক তো বটেই। তথা আপনার লেখাগুলো সাবলীলভাবে পথ চলতে থাকে আর হঠাৎ করেই যেন শেষ হয়ে যায়। মনে হয় আমি কোনো সিনেমা দেখছিলাম বা কোনো গান শুনছিলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ। অাপনার কাছ থেকে আরো ইনফরমেটিভ লেখা আমরা অাশা করতেই পারি। আমি অাপনার লেখার ভক্ত হয়ে গেলাম। আপনার সব লেখা এখন আমার সংগ্রহে থাকলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah mahmud dulal — december ৫, ২০১৫ @ ৭:৪২ অপরাহ্ন

      প্রাসঙ্গিক, সমসাময়িক বিষয়ে তথ্যবহুল এবং এত সাবলীলভাবে লেখা, একটানে পড়ার মতো। কি দারুণ বর্ণনা, যেনো চোখের ক্যামেরায় সব ভাসছে। ধরা যাক, শুরুটাই- ” মস্কোর ক্রেমলিনের কাছেই হোটেল রিৎজ কার্লটন। বাইরে তখন রাশিয়ান শীতের হিম শীতল আবহাওয়া, কিন্তু হোটেলের ভেতরে অন্যরকম উষ্ণতা । ধোপদুরস্ত অভিজাত কোটিপতি, শিল্পপতি, ডাকসাইটে সুন্দরী, মডেল, সুপার মডেল, অর্থের বিনিময়ে তাদের কাছে পেতে চাওয়া কিছু মাতাল উঠতি ধনী, আর সৌভাগ্যের সন্ধানে ঘুর ঘুর করতে থাকা সুদর্শন তরুণদের ভীড় এড়িয়ে আরেকটু সামনে। তারপর, সুস্বাদু খাবার আর দামী বাসনকোশনে বোঝাই ট্রলি ঠেলে শিষ কেটে চলে যাওয়া ব্যস্ত ওয়েটার, লবীর হৈ চৈ আর সঙ্গীতের মূর্ছনার রেশটুকু যেখানে এসে শেষ হয় সেই করিডোর ধরে এগিয়ে গেলেই কক্ষ নম্বর ১০০১।”
      ধন্যবাদ আর্টস। ধন্যবাদ বিপাশা, বিপাশা চক্রবর্তী।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ML Gani — december ১১, ২০১৫ @ ৮:৩৮ পূর্বাহ্ন

      “..সৃষ্টিশীল প্রতিবাদের এই অস্ত্রগুলোই যুগে যুগে স্বাধীনতার পক্ষে অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে কথা বলেছে। ..”
      লেখাটি অসাধারণ!
      ধন্যবাদ বিপাশা |

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com