গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ২৮ অক্টোবর ২০১৫ ৮:৫৩ অপরাহ্ন

combo.jpgবিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩০

চোখ ধাঁধানো এতসব ও এত আশ্চর্যজনক আবিষ্কারে মাকন্দোর মানুষ বুঝতে পারছিল না তারা কোনদিক থেকে তাজ্জব হতে শুরু করবে । ট্রেনের দ্বিতীয় যাত্রায় আউরেলিয়ানো ত্রিস্তের নিয়ে যাওয়া প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ দিয়ে জ্বলা পান্ডুর বাল্বগুলোর দিকে তাকিয়ে রাত কাবার করে দেয় ওরা, আর ট্রেনটার টুমটুম শব্দে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে ও কষ্ট করতে হয় ওদের। সফল ব্যবসায়ী ব্রুনো ক্রেসপি যখন সিংহের মাথাওয়ালা টিকেট কাটার ঘরঅলা থিয়েটারে মৃত্যুবরণের পর দাফন করা এক চরিত্রের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি দেখায় এক ছবিতে, যার দুঃখে সমব্যথী হয়ে চোখের জল ফেলে দর্শকরা; সেই একই প্রতিচ্ছবি যখন পরের ছবিতে আবির্ভূত হয় এক আরবে পরিবর্তিত হয়ে, জীবন্ত অবস্থায়, তখন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে পরে । চরিত্রগুলোর জীবনের উত্থানপতনের সাথী হতে যে জনসাধারণ দুই সেন্ট করে দিত তারা এই ধরনের অভূতশ্রুত বিদ্রুপ সহ্য করতে না পেরে আসনগুলো ভেঙ্গে ফেলে । ব্রুনো ক্রেসপির অনুরোধে এক বিশেষ ঘোষণার মাধ্যমে মেয়র সবাইকে জানিয়ে দেয় যে, সিনেমা হচ্ছে এক মরিচীকা সৃষ্টিকারী যন্ত্র যা নাকি দর্শকদের আবেগতাড়িত হওয়ার মত উপযুক্ততা রাখে না । এই হতাশাজনক ব্যাখ্যার পর অনেক দর্শকই মনে করে আবার তারা জিপসীদের নতুন ও তাক লাগানো কোন কিছুর শিকার হয়েছে । আর তারা ভাবে তাদের নিজেদের জীবনেই কান্নার মত এত দুর্দশা আছে যে কাল্পনিক মানুষের মিথ্যে দেখার ইচ্ছে আর তাদের নেই, ফলে তারা আর সিনেমায় যায় না । প্রায় একই রকম অবস্থা ঘটে চোঙ্গা লাগানো গ্রামোফোনের ব্যাপারে, যেগুলো নিয়ে গিয়েছিল হাস্যময়ী ফ্রান্সের নারীরা, যা নাকি প্রাচীন ব্যারেল অরগানের জায়গা দখল করে আর বাদকদের জীবিকার উপর কিছু সময়ের জন্য ভাল প্রভাব ফেলে । প্রথমদিকে নিষিদ্ধ রাস্তার খরিদ্দারদের সংখ্যা কয়েকগুণ হয়ে যায় কৌতূহলের কারণে, এমনকি জানা যায় যে সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা পর্যন্ত নষ্টলোকের ছদ্মবেশ নিয়ে, কাছ থেকে গ্রামোফোনের অভিনবত্ব দেখতে যায়, আর সেটা এত কাছ থেকে বহুবার দেখার ফলে ওরা সিদ্ধান্তে পৌছায় যে সবাই যেমনটি ভেবেছিল বা ফ্রান্সের মহিলারা যেমনটি, সেরকম কোনো যাদুকরী জাঁতাকল নয় ওটা, বরঞ্চ এটা শুধুই এক কারিগরি চাতুরী যেটা নাকি কোনভাবেই সামনাসামনি বাদকদলের মত এত মর্মস্পর্শী, এত মানবিক ও দৈনন্দিন সত্য দিয়ে ভরা কিছুর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয় । ব্যাপারটা এতই হতাশাপুর্ণ হয়ে দাড়ায় যখন গ্রামোফোন এত জনপ্রিয়তা পেয়েছে–যে প্রায় স্থান পেয়েছে প্রতিটি ঘরে ঘরে তখনও পর্যন্ত–সেটা গন্য হত ছোটদের খেলনার বস্তু হিসেবে, যেটাকে বাচ্চারা বিভিন্ন অংশে খুলে ফেলতে পারে, আর যেটা কোনভাবেই বড়দের বিনোদনের বস্তু নয় । অন্যদিকে যখন গ্রামের কারও পক্ষে রেলস্টেশনের সাথে লাগানো টেলিফোন যন্ত্রটার সত্যিকার ব্যবহার প্রমাণ করার সুযোগ ঘটে, টেলিফোনের হাতলটাকে মনে করা হয় গ্রামোফোনের প্রাচীন সংস্করণ আর সবচেয়ে অবিশ্বাসীরা পর্যন্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরে । যেন ঈশ্বর মাকন্দোবাসীর সমস্ত আশ্চর্য হবার ক্ষমতাটাকে পরীক্ষা করার আর তাদেরকে চিরকালের জন্য আনন্দ ও বেদনার, সন্দেহ ও সত্যের, মধ্যে রাখতে চান যাতে নিশ্চিতভাবে কখনোই জানা যাবে না সত্যের সীমা । ওটা ছিল সত্য ও মরিচীকার মধ্যে এমন এক বিভ্রান্তিকর অবস্থা যাতে চেস্টনাটের নীচের হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার অশরীরি আত্মা পর্যন্ত ধৈর্য হারিয়ে বিক্ষুব্ধ হতে বাধ্য হয়, সারা বাড়ি জুড়ে হেটে বেড়াতে, এমনকি প্রকাশ্য দিনের বেলাতেও । যেদিন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেললাইনটাকে উদ্বোধন করা হয়; আর প্রতি বুধবার বেলা এগারোটায় মাকন্দোতে আসতে থাকে, তখন থেকেই একটি টেবিল, একখানা টেলিফোন, টিকেট বেচার জন্য ছোট্ট এক জানালাসহ অফিস বসানো হয় আর মাকন্দোর রাস্তায় এমনসব পুরুষ ও মহিলাদের দেখা যেতে থাকে যাদের স্বাভাবিক আচার আচরন সত্ত্বেও সত্যিকার অর্থে তারা ছিল সার্কাসের লোকজনের মতো । যে গ্রাম জিপসীদের সবরকম চতুরতায় অভ্যস্ত সেখানে ভ্রাম্যমান হকাররা যারা শীষ দেয়া কেটলী বিক্রির মত একইভাবে সপ্তমদিনে আত্মার মুক্তির বিধান বিক্রি করে, তাদের সফলতা অর্জনের কোন সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু ক্লান্তি আর সবসময়ই যারা অসতর্ক তাদেরকে বিশ্বাস করাতে পারে তারা প্রচুর অর্থ রোজগার করে। এই ধরনের থিয়েটারের প্রাণীদের মধ্যেই এতগুলো বুধবারের একটিতে ঘোড়ায় চড়ার প্যান্ট ও লেগিং, খড়ের টুপি, লোহার ফ্রেমের ছোট চশমা, পোখরাজের মত চোখ ও উচুস্তরের লড়াইয়ের মোরগের মত ত্বক নিয়ে মাকন্দোতে হাজির হয় ভরাট চেহারার হাসিখুশি মিস্টার হেরবের্ট আর দুপুরের খাবার সারে বাড়িতে।

কলার প্রথম ছড়াটা খাওয়ার আগ পর্যন্ত ওকে কেউই খেয়াল করে না । ঘটনাক্রমে আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওকে পায় যখন হোটেল জ্যাকবে কামড়া খালি না থাকায় সে ভাঙা স্প্যানিশে তর্ক করছিল, আর প্রায়ই যেমনটি করত অন্যান্য বিদেশীদের ক্ষেত্রে তেমনিভাবে তাকে নিয়ে আসে বাড়িতে । ওর ছিল দড়িতে বাঁধা বেলুন ওড়ানোর ব্যবসা, যে ব্যবসার সূত্রে অর্ধেক দুনিয়া ঘুরে প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও মাকন্দোর কাউকে ওড়াতে পারেনি সে, কারণ তারা জিপসীদের উড়ন্ত কার্পেট দেখে ওতে ওঠার অভিজ্ঞতা অর্জন করার পর বেলুনে চড়াটাকে তারা মনে করে সেকেলে ব্যাপার। তার পরিকল্পনা ছিল পরের ট্রেনে ফিরে যাবার । সবসময়ই ডোরাকাটা কলাগুলো খাবার ঘরে ঝুলিয়ে রাখা হত আর ওখান থেকেই একছড়া কলা দুপুরে খাবার সময় তার সামনে নিয়ে যাওয়া হলে সে খুব একটা উৎসাহ না নিয়ে প্রথম কলাটা ছেঁড়ে । কিন্তু কথা বলতে বলতে স্বাদ নিতে নিতে, চিবুতে চিবুতে খেয়েই চলে, ভাল করে বলতে গেলে ভোজনরসিকের চেয়েও এক অভিজ্ঞ লোকের মজা নিয়ে। আর প্রথম ছড়াটা শেষ হলে অনুরোধ করে আর এক ছড়া নিয়ে আসতে। তখন সে বের করে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী অপ্টিকাল যন্ত্রপাতির এক ছোট্ট বাক্স। হীরে ক্রেতার মত সন্দিগ্ধ মনযোগ নিয়ে বিশেষ এক ছুড়ি দিয়ে ছোটছোট করে কেটে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে, ফার্মেসিতে ব্যবহৃত দাড়িপাল্লায় ওজন করে আর অস্ত্র কারবারীদের ব্যবহৃত ক্যালিপার দিয়ে আয়তন হিসেব করে। পরে বাক্স থেকে বের করে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে মাপে তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, ও আলোর তীব্রতা। ঘটনাটা এমনই কৌতূহলজনক হয়ে ওঠে যে মিস্টার হেরবর্টের মুখ থেকে শেষমেষ এক চূড়ান্ত ও রহস্য উন্মোচন করার মত ফলাফলের অপেক্ষায় থেকে কারুরই ঠিকমত খাওয়া হয় না। কিন্তু সে এমন কিছুই বলে না যাতে করে তারা তার পরিকল্পনা বুঝতে পারে।

পরের দিনগুলোতে তাকে দেখা যায় একটা জাল ও ঝুড়ি নিয়ে গ্রামের চারপাশে প্রজাপতি ধরতে। বুধবারে হাজির হয় একদল ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, পানিবিজ্ঞানী, ভূ-জরিপকারী ও ভূ-সংস্থানবিদ । যারা পরের বেশ কয়েক সপ্তাহ যাবত অনুসন্ধান চালায় যেখানে মিস্টার হেরবের্ট প্রজাপতি শিকার করেছিল । আরও পরে আসে হলুদ ট্রেনের লেজের সঙ্গে জুড়ে দেয়া সম্পূর্ণ রূপার পাতে মোড়া, নীল কাঁচ দিয়ে বানানো চাঁদওয়ালা, মখমল দিয়ে মোড়া যাজকদের চেয়ার সমেত বিশেষ ওয়াগনে মিস্টার ব্রাউন। ঐ একই ওয়াগনে মিস্টার ব্রাউনের চারপাশে থাকে ভাবগম্ভীর কালো পোশাক পরিহিত তোষামোদকারী উকিলের দল যারা অন্য সময়ে সর্বত্রই অনুসরণ করত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে। তার ফলে মনে হয় দড়ি লাগানো বেলুনের মিস্টার হেরবের্টের ও তার রঙিন প্রজাপতির মতন ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, পানিবিজ্ঞানী, ভূ-জরিপকারী ও ভূ-সংস্থানবিদ, তার চারপাশে ঘুরে বেড়ানো তোষামোদকারী দল, ও তার হিংস্র জার্মান কুকুরদের সঙ্গে যুদ্ধের একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু এনিয়ে বেশী কিছু ভাববার মত সময় থাকে না কারুরই কারণ যখন মাকন্দোবাসী কেবলমাত্র জিজ্ঞেস করতে শুরু করেছে কি ছাই মাথা ঘটে চলছে, ততক্ষণে গ্রামটা রূপান্তরিত হয় দস্তার চালওয়ালা কাঠের বাড়ির এক শিবিরে, যেখানে বাস করতে আরম্ভ করে ট্রেনভর্তি অর্ধেক দুনিয়ার বিদেশীরা। তারা আসে শুধুমাত্র আসনগুলো ও পাদানীতে প্রবেশপথের সিড়িতে বসেই নয়, এমনকি ওয়াগনের ছাদ ভর্তি করেও। রেললাইনের অপর পাড়ে পামগাছ দিয়ে ঘেরা রাস্তা, লোহার গ্রীল করা জানালা, উঠানে সাদা ছোট ছট টেবিল, সিলিং থেকে ঝোলানো পাখা ও বিশাল লনে ঘুরে বেড়ানো ময়ূর ও তিতিরসমেত বাড়ি দিয়ে আলাদা একটি গ্রাম তৈরী হয় । “গ্রিংগা”(আমেরিকান)-রা নিয়ে আসে মসলিনের কাপড় পরিহিত ও শিফনের টুপি মাথায় দেয়া তাদের স্ত্রীদের নিয়ে। এক বিশাল মুরগীর খামারের মত সারাটা এলাকা ঘেরা ছিল লোহার বিদ্যুতায়িত জাল দিয়ে। গ্রীষ্মের শীতল সকালগুলোতে ঝলসানো সোয়ালো পাখী দিয়ে ভরে কালো হয়ে যেত জালটা । তখনও কেউ বুঝতো না ওরা কি খুঁজছে, অথবা সত্যিই ওরা শুধুমাত্রই কি লোকহিতৈষী। ইতিমধ্যেই ওরা বিশাল বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে ফেলে, প্রাচীন জিপসীদের চেয়ে অনেক বেশী বিরক্তিকর, কিন্তু এরা মাকন্দোতে অনেক বেশী স্থায়ী ও এদের কাজ অনেক কম বোধগম্য । অন্যসময়ে যা শুধুমাত্র ঐশ্বরিক শক্তির জন্য সংরক্ষিত ছিল, হাতে পেয়ে তারা এলাকার বৃষ্টির ধরন বদলে দেয়, ফসল ফলানোর সময়টাকে বাড়িয়ে দেয়, নদীকে সরিয়ে ফেলে ওটার সাদাপাথর ও বরফশীতল স্রোতশুদ্ধ । যেখানে সবসময় ওটা ছিল সেখান থেকেও সরিয়ে বসিয়ে দেয় গ্রামের অন্যপ্রান্তে, গোরস্থানের পিছনে । ঐ সময়টাতেই ওরা হোসে আর্কাদিওর কবরের উপর কংক্রিট দিয়ে এক শক্ত আবরন সৃষ্টি করে যাতে লাশ থেকে বের হওয়া বারুদের গন্ধ নদীর পানিকে দুষিত না করতে পারে । যেসব বিদেশীরা দয়িতাবিহীন একাকী চলে এসেছে তাদের জন্য ফ্রান্সের মমতাময়ী রমনীদের রাস্তাটাকে পরিণত করে ওদের নিজের গ্রামের চেয়েও বড় করে, আর এক স্বর্গীয় বুধবারে ট্রেনভর্তি করে নিয়ে আসে অবিশ্বাস্য বিভিন্ন ধরনের খানকীদের, সেসব বেবিলনীয় নারীরা প্রাচীন সব কলাকৌশলে পটু, যারা সঙ্গে নিয়ে আসে সব ধরনের মলম, নির্জীবকে উত্তেজিত করার জন্য, ভীতুকে জাগিয়ে তোলার জন্য, অতিলোভীদের তৃপ্ত করতে, লজ্জাশীলদের জাগিয়ে তুলতে, বারবার যারা আসে তাদের শিক্ষা দিতে ও নিঃসঙ্গদের ভুল শুধরে দিতে। পুরনো রঙবেরঙের বাজারওয়ালা তুর্কদের রাস্তা রূপান্তরিত হয় দেশবিদেশের জিনিসপত্রে ঠাসা উজ্জ্বল সব দোকানে, যেখানে শনিবারের রাতগুলো উপচে পড়ে হঠকারী লোকদের ভীরে, যারা হোঁচট খেত ভাগ্য ও সুযোগের জুয়ার টেবিলগুলোতে। ভীড় হয় শুটিং টেবিলগুলোতে, যেখানে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়া হত সেই গলিতে, ভাজাভুজি ও পানীয়ের দোকানে, যেখানে রোববার সকালে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত মাঝে মাঝে সুখী মাতালদের দেহ, কিন্তু বেশীরভাগ সময়ই দেহগুলো হচ্ছে গুলি খাওয়া, ঘুষি খাওয়া, ছোরায় আহত অথবা ভাঙা বোতলে আঘাতপ্রাপ্ত লোকদের কাতর দেহ। এটা ছিল এমন এক দিকবিদিকশূণ্য পরিকল্পনাহীন আগ্রাসন, যে প্রথমদিকে রাস্তাগুলোতে পরে থাকা আসবাবপত্র ও তোরঙ্গের আধিক্যে কারও অনুমতির ধার না ধেরে হুড়োহুড়ি করে বানানো বাড়িগুলোর ছুতোরের কার্যক্রমে ছাউনির নীচে আলমন্ড গাছগুলিতে হ্যামক বেঁধে প্রণয়রত যুগলের শীৎকারের মধ্যে রাস্তাগুলোতে হাটা অসম্ভব হয়ে পরে । গ্রামের প্রান্তে একমাত্র শান্তির জায়গাটা ছিল শান্তিপ্রিয় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান নিগ্রোদের দ্বারা বানানো, যারা গ্রামের সীমানায় এক রাস্তা বানিয়ে, খুটির উপর কাঠের ঘড় বানিয়ে, বিকেলের দিকে দরজায় বসে অবোধ্য উচ্চারণে পাপিয়ামেন্ত ভাষায় ধর্মসঙ্গীত গাইতো । এত অল্প সময়ে এত বড় পরিবর্তন ঘটে যায় যে, মিস্টার হেরবের্টের আগমনের আটা মাস পর মাকন্দোবাসীরা প্রতি সকালে জেগে উঠতো নিজেদের গ্রামকে চেনার জন্য ।
cien-anos-de-soledad.jpg
“শুধুমাত্র এক গ্রিংগোকে কলা খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে” মাঝেমধ্যে বলত কর্ণেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া- “দেখ আমরা কি আপদেই না জড়িয়েছি” ।

অন্যদিকে আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর আনন্দের সীমা থাকে না বিদেশীদের এই আকস্মিক ঢলে। অতি সত্বর বাড়িটা ভরে যায় অচেনা সব অতিথিদের দিয়ে; বেপরোয়া পার্টি, পার্টিপ্রিয় দুনিয়াজোড়া লোকজনে। এর ফলে উঠানে যোগ করতে হয় কিছু শোবার ঘড়ের, বাড়াতে হয় রান্না ঘড়টাকে আর প্রাচীন খাবার টেবিলটা বদলে বসাতে হয় ষোলোজন বসার মত এক টেবিল, নতুন বাসনকোসন আর তারপরেও সকলের এক সঙ্গে জায়গা না হওয়ায় পালা করে দুপুরের খাবার খেতে হয় । নিয়মনিষ্ঠতার কথা ভুলে গিয়ে সবচেয়ে বিকৃত রুচির লোকটাকেও রাজার মত করে আপ্যায়ন করতে বাধ্য হয় ফের্নান্দা। ওরা উঠোনটা বুটজুতো দিয়ে কাঁদায় মাখামাখি করত, বাগানে পেশাব করত, দুপুরে ঘুমাত যে কোন জায়গায়, মাদুর বিছাতো আর ভদ্রলোকদের নিয়মনিষ্ঠার ধার না ধেরে মেয়েদের স্পর্শকাতরতার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে মুখে যা কিছু আসত তাই বলত। আমারান্তা এই আগ্রাসনে এতই মর্মাহত হয় যে আগের দিনের মত আবার রন্ধনশালায় গিয়ে খেতে আরম্ভ করে। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মনে স্থির বিশ্বাস জন্মে যে যারা তাকে অভিবাদন জানাতে আসে তাদের মধ্যে বেশীরভাগই আসে এক ঐতিহাসিক পুরাদর্শনের কৌতূহল থেকে, যাদুঘরের এক ফসিল দেখতে, তার প্রতি সহানুভূতি বা সম্মান দেখাতে নয়, আর সে নিজেকে বন্দি করে ফেলে দরজা বন্ধ করে। পরে দুই একটা বিরল সময়ে যখন সে রাস্তার পাশের দরজায় এসে বসত সেই সময়টা ছাড়া তাকে দেখাই যেত না । অন্যদিকে উরসুলা যদিও ঐ সময়ে পা টেনে টেনে দেয়াল ধরে ধরে হাটত, তখনও সে রেল আসার সময় হলে অনুভব করত এক শিশুসুলভ আনন্দ । “মাংস ও মাছ রাধতে হবে” নির্দেশ দিত চারজন পাচককে। ওরা সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের নির্বিকার তদারকিতে সাধ্যানুযায়ী কাজ করে যেত । “সব কিছুই বানাতে হবে”- জোর করত, কারণ কেউ জানে না বিদেশীরা কী খেতে চাইবে । রেল চলে আসত দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে । দুপুরের খাবার সময়ে বাড়ি কাঁপত হাটবাজারের মত হট্টোগোলে, বাড়ি ভরে যেত অতিথিদের ঘামে, এমনকি ওরা জানতো না নিমন্ত্রনকর্তার পরিচয়, আর দলবেঁধে ছুট লাগাত টেবিলের ভাল জায়গাটা দখলের জন্য, আর সে সময় পাচকরা হোঁচট খেত বিশাল আকৃতির স্যুপের পাত্র হাতে, মাংসের গামলা নিয়ে অথবা ভাতের পাত্র নিয়ে, আর বড় বড় চামচ দিয়ে পরিবেশন করত লেমনেড পিপে থেকে। ব্যাপারটা ছিল এতই বিশৃঙ্খলার যে ফের্নান্দা রেগে যেত অনেকেই দুবার খেত এই ভেবে, ও অতিথিদের মধ্যে কেউ কেউ ভুল করে তার কাছে খাবারের বিল চাওয়ায়। সে রাগটা উগড়ে দিতে গিয়েছিল সব্জিওয়ালাদের মত খিস্তি করে। তখন মিস্টার হেরবের্টের আসার এক বছর পার হয়ে গেছে। আর একমাত্র যা জানা যায় তা হচ্ছে, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ও তার সঙ্গীরা বড় বড় আবিষ্কারের উৎপত্তিস্থলের খোঁজে পাহাড় অতিক্রম করা মায়াবী জায়গাটাতে গ্রিংগোরা কলা চাষের চিন্তা করছে। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার অপর দুই ছেলে কপালে ছাইয়ের ক্রস নিয়ে হাজির হয় সেই উদগিরনরত আগ্নেয়গিরির আকর্ষণে আর তাদের আসার স্থিরসংকল্পের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে একটি মাত্র বাক্য দিয়ে, যেটা খুব সম্ভবত ব্যাখ্যা করবে অন্য সকলেরই আসার কারণ ।

-“এসেছি” ওরা বলে- “কারণ সবাই আসছে” ।

রেমেদিওস লা বেইয়া ছিল কলা-মহামারী থেকে বিমুক্ত। সে থিতু হয় অপূর্ব এক বয়োসন্ধিতে, প্রতিক্ষণই লৌকিকতার দ্বারা আরও অস্পর্শ, খারাপ কাজ বা সন্দেহবাতিক থেকে আরও দূরে নিজের জগতে সাধারণ বাস্তবতার সুখী জীবনে। সে বুঝতে পারত না কেন মেয়েরা তাদের জীবনকে জটিলতায় ভরে ফেলে বক্ষবন্ধনী ও পেটিকোট দিয়ে, আর সে নিজের জন্য সেলাই করে ক্যানভাসের কাপড় দিয়ে তৈরী এক বালান্দ্রা (হাতা ছাড়া মোটা কাপড়ের তৈরী হাটু পর্যন্ত নেমে আসা আলখাল্লার মত পোশাক) যেটার মধ্য দিয়ে সে মাথা গলিয়ে দিয়ে বস্ত্র ধারণের সমস্যাটার সমাধান করত নিরাবরন থাকার অনুভূতিটাকে বিসর্জন না দিয়ে, তার মতে ওটাই ছিল ভব্যভাবে বাড়িতে থাকার একমাত্র উপায়। বৃষ্টির মত চুল (লাতিন আমেরিকায় ঘন লম্বা চুলকে বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা হয়) গোড়ালি পর্যন্ত নেমে আসায় তাকে এতই বিরক্ত করা হয় ছেটে ছোট করে চিরুনী আর ফিতে দিয়ে চুল বাধতে, আর রঙ বেরঙের ফিতে দিয়ে বেনী করতে যে স্রেফ নেড়ে করে ফেলে মাথাটা কামিয়ে, আর কাটা চুলগুলো দিয়ে সেন্টদের মত পরচুলা বানায়। ওর এই সরলভাবে থাকার সহজাত প্রবৃত্তির মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে যতই হালফ্যাশনকে বাদ দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজত ও যতই সে স্বতঃস্ফূর্ততার কাছে বাধ্য হয়ে গতানুগতিকতাকে বর্জন করে তার চালচলন ততই উদ্বেগপূর্ণ হয়ে ওঠে তার অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য । ততই পুরুষদের জন্য উত্তেজক হয়ে ওঠে সে ।
যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ছেলেরা প্রথমবারের মত মাকন্দোতে আসে উরসুলার মনে পরে ওদের শরীরেও বইছে পরনাতনীর মত একই রক্ত আর সে শিউরে ওঠে এক বিস্মৃত আতংকে । “চোখ কান খোলা রাখ” ওকে সাবধান করে- “ওদের যে কারুর সঙ্গে সঙ্গম করলে তোর সন্তান শুয়োরের লেজ নিয়ে জন্মাবে” । রেমেদিওস লা বেইয়া সাবধানবাণীকে তোয়াক্কা না করে পুরুষদের পোশাক পরে বালুতে গড়াগড়ি করে, তেল মাখানো খুটিতে ওঠার জন্য। আর এই অসহনীয় দৃশ্যে উন্মাদ হয়ে যাওয়ায় আর একটু হলেই সে তার সতেরজন জ্ঞাতি ভাইয়ের মধ্যে সে এক বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছিল। আর সেই কারণেই ভাইয়েরা যখন গ্রামে আসত তখন বাড়িতে ঘুমুতো না তারা, আর যে চারজন গ্রামে থাকতো তারা উরসুলার নির্দেশে ভাড়া ঘড়ে থাকত। অবশ্য যদি রেমেদিওস লা বেইয়া জানতে পারত এই সাবধানতার কথা সে হেসেই খুন হয়ে যেত। পৃথিবীতে বাসের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে জানত না তার বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অবশ্যম্ভাবী নারী নিয়তি প্রতিদিনই কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল নিত্য নতুন অনাসৃষ্টির। উরসুলার আদেশ অমান্য করে খাবার ঘড়ে ওর উপস্থিতি প্রতিবারই বিদেশীদের মধ্যে এক অজানা আতংকের সৃষ্টি হোত। এটা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান যে, এই কর্কশ কাপড়ের নীচে সে ছিল সম্পূর্ণ নগ্ন, আর কেউ বুঝতে পারত না যে তার নিখুঁত কামানো মাথার খুলিটা আগ্রহ উদ্দীপক কোনো আহবান নয়, অথবা গরম দূর করার জন্য তার লজ্জাহীন উরুযুগলকে উন্মুক্ত করা বা হাত দিয়ে খাবার পরে যে মজা করে আঙ্গুল চুষতো সেগুলো কোনো অপরাধমুলক প্ররোচনা নয়। যে ব্যাপারটা পরিবারের কেউ কখনোই জানতে পারেনি আর বিদেশীদেরও তা বুঝে উঠতে দেরী হয় না তা হচ্ছে রেমেদিওস লা বেইয়া ছড়িয়ে দিত শান্তিহরনকারী প্রশ্বাস, ঝড়ের এক দমকা হাওয়া, আর সেটা টের পাওয়া যেত সে চলে যাওয়ার পরও কয়েক ঘন্টাব্যাপী, প্রেমের বিভ্রান্তিতে অভিজ্ঞ পুরুষরা, সারা পৃথিবী ঘুরে প্রেমের স্বাদ নেয়া পুরুষরা দৃঢ়তার সঙ্গে জানাতো যে রেমেদিওস লা বেইয়ার শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ যেভাবে তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরী করত, এমনটি তাদের মধ্যে কখনোই হয়নি। বেগনিয়া ভরা বারান্দায়, বৈঠকখানায় অথবা বাড়ির যে কোনো জায়গায়, ওরা দেখিয়ে দিতে পারত ঠিক কোনখানে সে ছিল আর সে স্থান ত্যাগ করার পর কতক্ষণ সময় পার হয়েছে। তার গন্ধ-চিহ্নটা সুনিশ্চিত ও নির্ভুল হলেও বাড়ির লোকদের কেউই পার্থক্য নির্নয় করতে পারতো না কারণ অনেকদিন আগে থেকেই গন্ধটা দৈনন্দিন সব গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। কিন্তু বাইরের লোকেরা সেটা ধরতে পারত সাথে সাথেই। এই কারণে শুধু ওরাই বুঝতে পারত যুবক রক্ষীদলের কমান্ডারের ভালবাসার জন্য মৃত্যু ও অন্য জায়গা থেকে আসা এক ভদ্রলোকের হতাশায় নিমজ্জিত হবার কারণ। যে অস্থির পরিবেশে সে ঘুরাফেরা করত তার পদচারণা যে অসহ্য প্রণয়ঘটিত বিপর্যয়ের অবস্থা তৈরী করত সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না রেমেদিওস লা বেইয়ার, আর পুরুষদের সঙ্গে তার ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরূপে বিদ্বেষহীন, আর তার নিষ্পাপ আনন্দ ওদের উন্মাদ করে ছাড়ত। বাইরের লোকেরা যাতে দেখতে না পায় সেই উদ্দেশ্যে উরসুলা যখন তাকে আমারান্তার সঙ্গে রান্না ঘরে খেতে বাধ্য করতে সক্ষম হয় তখন সে ভাল বোধ করে কারণ এতে করে সে সকল নিয়ম শৃঙ্খলার নাগালের বাইরে চলে যায়। সত্যিকার অর্থে ওর কাছে যে কোনো জায়গায় খাওয়াই ছিল একই ব্যাপার, আর কোনো সময় ধরে নয়, সে খায় ক্ষিধের ইচ্ছানুযায়ী। মাঝে মাঝে খেতে উঠতো ভোর তিনটার সময় ও ঘুমোত সারাদিন, আর এভাবেই কাটিতে দিত সময় উলটো করে কয়েকমাস যাবত যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো আকস্মিক ঘটনা তাকে ফিরিয়ে আনত স্বাভাবিক নিয়মে। যখন সব ভালোভাবে স্বাভাবিক নিয়মে চলত তখন সে ঘুম থেকে বেলা এগারোটার সময় উঠে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় দুই ঘন্টার জন্য নিজেকে আবদ্ধ করত গোসলখানায় আর লম্বা গভীর ঘুমের রেশ কাটাতে কাকড়া বিছে মারতো। পরে সে স্কোয়াশের খোল দিয়ে বানানো পাত্র দ্বারা জলাধার থেকে গায়ে পানি ঢালতো । ব্যাপারটা ঘটাত সে এতই প্রলম্বিত সময় নিয়ে, এতই নিখুঁতভাবে, এতই আনুষ্ঠানিকতার সাথে, যে যারা তাকে চিনত না তাদের কাছে মনে হবে যে সঙ্গত কারণেই সে নিজের শরীরের বন্দনা করছে । ওর জন্য সে নিভৃত আচার ছিল সম্পূর্ণভাবে ইন্দ্রিয়ের বাইরে, আর ব্যাপারটা ছিল ক্ষুধা না পাওয়া পর্যন্ত সময় কাটানোর উপায় মাত্র। একদিন, যখন কেবলমাত্র গোসল আরম্ভ করছে, এক বহিরাগত ছাদের এক টালি সরিয়ে ফেলে আর সেই দুর্দান্ত নগ্নতার দৃশ্যের সামনে নিঃশ্বাস হারিয়ে ফেলে। রেমেদিওস লা বেইয়া ওর চোখ দুটো দেখতে পায় ভাঙ্গা টালির ভেতর দিয়ে, কিন্তু তাতে লজ্জাজনক কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না তার, বরঞ্চ উদ্বিগ্ন হয়।
-“সাবধান” চেঁচিয়ে ওঠে- “পড়ে যাবে তো”
-“শুধুমাত্র তোমাকে দেখতে চাই” বিড়বিড় করে লোকটা
-“ও আচ্ছা”- বলে সে –“ কিন্তু সাবধান, টালিগুলো সব পচে গিয়েছে” ।

বহিরাগতর মুখে ছিল বেদনার অভিব্যক্তি যেন সে তার আদিম প্রবৃত্তির সঙ্গে নিঃশব্দে লড়াই করছে যাতে এই মরিচীকা মিলিয়ে না যায় । রেমেদিওস লা বেইয়া ভাবে, টালি ভাঙার সম্ভাবনায় লোকটা ভয় পেয়েছে, আর যাতে লোকটাকে এই বিপজ্জনক অবস্থায় বেশীক্ষণ না থাকতে হয়, সে অন্যান্য দিনের চেয়ে দ্রুত পানি ঢালতে শুরু করে। জলাধার থেকে পানি ঢালতে ঢালতে মন্তব্য করে যে ছাদের এই অবস্থা হচ্ছে এক সমস্যা আর বৃষ্টিভেজা পচা পাতার স্তরের জন্যই গোসলখানাটা ভরে গিয়েছে কাকড়া বিছেয়। বহিরাগত লোকটা ভুল বোঝে, মনে করে এই ধরনের টুকরো আলাপ তার আনন্দকে আড়াল করারই চেষ্টা, ফলে যখন সে সাবান মাখতে শুরু করে, আর এক পা এগিয়ে যাবার লোভ জাগে তার ।
-“তোমাকে সাবান মাখাতে দাও” বিড়বিড় করে
-“তোমার সদিচ্ছাকে ধন্যবাদ” বলে সে –“কিন্তু এর জন্য আমার দুই হাতই যথেষ্ট” ।
-“শুধু অন্তত পিঠটাতে লাগাতে দাও”- আকুতি করে আগন্তুক ।
-“ওটা হবে এক উদ্দেশ্যহীন কাজ”- বলে সে-“ পিঠে সাবান মাখাতে আজ পর্যন্ত কাউকে দেখা যায়নি” ।
পরে যখন গা মুছতে শুরু করে চোখে জল নিয়ে আগন্তুক মিনতি করে তাকে বিয়ে করার জন্য। সে আন্তরিকতার সঙ্গে উত্তর দেয় যে-লোক এতই সরল যে একজন নারীর গোসলের দৃশ্য দেখার জন্য প্রায় এক ঘন্টা নষ্ট করেছে আর এমনকি প্রায় দুপুরের খাবারটাও না খেয়ে থাকছে এমন কাউকে সে কখনই বিয়ে করবে না । পরিশেষে যখন সে বালাদ্রানটা গায়ে চরায় তখন লোকটা আর সহ্য করতে পারে না। সবাই যেমনটি ভেবেছে তেমনি নীচে সে কিছুই পড়ে না, আর যেন সেটা রেখে যায় তার গায়ে সবসময়ের জন্য এক গরম লোহার ছ্যাকার ছাপ। সে আরও দুটো টালি খুলে ফেলে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে গোসলখানার ভিতরে নামার জন্য ।
-“এটা খুবই উঁচু” সতর্ক করে সে ভয় পেয়ে –“তুমি মারা যাবে” ।

পচা টালিগুলো দুর্ঘটনার ভীষণ শব্দ তুলে ভেঙে পরে, লোকটা কোনভাবে শুধুমাত্র এক ভয়ার্ত চীৎকারের সময় পায়, মাথা ভেঙে ফেলে, আর সিমেন্টের মেঝের উপর মারা যায় মৃত্যু যন্ত্রণা ছাড়াই। আগন্তুকরা খাবার ঘর থেকে ছাদ ভাঙার শব্দ পেয়ে দ্রুত লাশ সরানোর ব্যবস্থা করে আর লাশের গায়ে পায় রেমেদিওস লা বেইয়ার দম-বন্ধ-করা গায়ের সুবাস। সেটা শরীরে এত গভীর পর্যন্ত ঢুকে আছে যে ফাটা খুলির ফাঁকগুলো দিয়ে রক্ত না, বেরিয়ে আসে লালচে হলুদ রঙের সেই গোপন সুবাস মাখা তেল, আর ওরা বুঝতে পারে রেমেদিওস লা বেইয়ার সুবাস মৃত্যুর পরও উৎপীড়ন করে চলবে হাড়গুলো ধুলো হওয়া পর্যন্ত । তারপরও এই ভয়ংকর দুর্ঘটনাকে রেমেদিওস লা বেইয়ার কারণে মৃত অন্য দুজনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করে না কেউ । রেমেদিওস লা বেইয়া যে ভালবাসার নিঃশ্বাস ফেলে না, ছড়ায় মৃত্যুর স্রোত, এই কথাটা বিদেশীদের মধ্যে, মাকন্দোর প্রাচীন বাসিন্দাদের মধ্যে কিংবদন্তীতে পরিণত হওয়ার জন্য আরও একজন লোককে দুর্ঘটনার শিকার হবার প্রয়োজন পরে। সেই প্রমাণযুক্ত ঘটনাটা ঘটে আরও কয়েকমাস পরে, যখন রেমেদিওস লা বেইয়া একদল বান্ধবী নিয়ে নতুন লাগানো কলার আবাদ দেখতে যায়। মাকন্দোবাসীর জন্য এই ভেজা, অন্তহীন সাড়িসাড়ি কলাগাছের সারির মধ্য দিয়ে হাটা ছিল এক নতুন চিত্তবিনোদক ব্যাপার, যেখানে নৈঃশব্দ্যকে নিয়ে আসা হয়েছে অন্য জায়গা থেকে আর এখনও তা ব্যবহৃত হয়নি, আর ফলে সেখানে শব্দ করা ছিল এক উদ্ভট ব্যাপার। মাঝে মাঝে আধামিটার দূর থেকে বলা কথা বোঝা যেত না কিন্তু প্লানটেশনের অপর প্রান্ত থেকে তা শোনা যেত পরিষ্কারভাবে। মাকন্দোর মেয়েদের জন্য ব্যাপারটা ছিল এক নতুন খেলা, যা নিয়ে আসত হাসি, লাফালাফি চমক ও বিদ্রূপ, আর রাতেরবেলা সেই বেড়ানো নিয়ে ওরা এমনভাবে আলাপ করত যেন সেটা হচ্ছে এক স্বপ্নে ঘটা অভিজ্ঞতা। সেই নৈঃশব্দ ছিল এমনই সম্ভ্রমের ব্যাপার যে উরসুলার, রেমেদিওস লা বেইয়াকে এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করার মতো মন ছিল না। এক বিকেলে তাকে যেতে অনুমতি দেয় টুপি ও যথাযথ পোশাক পরার শর্তে।

বান্ধবীদলসহ প্লানটেশনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ভরে ওঠে মরণ সুবাতাসে। গর্তে কাজ করতে থাকা পুরুষরা অনুভব করে এক বিরল সম্মোহন, বোধ করে এক অদৃশ্য বিপদের হুমকি, আর অনেকে নিজেকে অর্পন করে এক অদম্য কান্নার ইচ্ছের কাছে । এক হিংস্র পুরুষদল ওদেরকে আক্রমণ করায় ভয়ার্ত রেমেদিওস লা বেইয়া ও বান্ধবীরা নিকটস্থ এক বাড়িতে আশ্রয় নেয় । আউরেলিয়ানো কিছুক্ষণ পর উদ্ধার করে ওদের। আউরেলিয়ানোদের কপালের ক্রস পবিত্র এক সমীহের সৃষ্টি করে, যেন দাগগুলো এক ধরনের বিশেষ সামাজিক স্তরের চিহ্ন, দুর্দম্যতার ছাপ। যে কথাটা রেমেদিওস লা বেইয়া কাউকে বলেনি তা হচ্ছে বিশৃঙ্খলার সুযোগে এক লোক ঈগলের থাবা দিয়ে শৈলশিরার প্রান্ত আকড়ে ধরার মতো হাত দিয়ে তার পেট খামচে ধরে। সে আক্রমণকারীর মোকাবেলা করে এক ধরনের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া উজ্জ্বল চকিত চাহনী দিয়ে, আর তা দেখে এক হতভাগ্যের দুটি চোখ, যে দৃশ্য তার মনে গেঁথে যায় এক করুনার অঙ্গারের মতো। সেই রাতে এক ঘোড়ার লাথিতে বুক বিদীর্ন হবার কয়েক মিনিট পূর্বে, তুর্কদের রাস্তায় লোকটা তার সাহস ও সৌভাগ্য নিয়ে বড়াই করে, আর বহিরাগতদের এক দঙ্গল লোক দেখে কিভাবে রাস্তার মাঝে রক্তবমি করতে করতে সে মৃত্যু যন্ত্রণায় ভোগে ।

রেমেদিওস লা বেইয়া যে মরণ ক্ষমতা ধারন করে–সেই ধারণাটা এই চারটে অখন্ডনীয় ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত হয় তখন, যদিও কিছু বাচাল লোক বলে আনন্দ পায় যে এমন এক কামোদ্দীপক এই রমনীর সঙ্গে একরাত শোওয়ার বদলে জীবনটাও দিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে কেউই সে রকমের কোনো চেষ্টা করে না । হয়তো বা শুধুমাত্র তাকে বাগে আনার জন্য নয়, তার থেকে আসা বিপদগুলো এড়াবার জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে ভালবাসার মতো এক আদিম ও মামুলি অনুভূতি কিন্তু একমাত্র এই কথাটাই কারও চিন্তায় আসে না । উরসুলা আর ওকে নিয়ে ভাবনা করে না । অন্য সময়ে তখনও ওকে জাগতিক বিষয়ে কাজে লাগাবার চিন্তায় অব্যাহতি দেয়নি । ওকে সংসারের মৌলিক ব্যাপারগুলোতে উৎসাহী করার চেষ্টা করে। “তুই যা চিন্তা করিস পুরুষেরা তার চেয়েও বেশী কিছু চায়,” রহস্যভরা কন্ঠে বলে- “রান্নার চেয়েও আরও বেশী কিছু, ঝাড়ু দেবার চেয়েও বেশী কিছু, ছোটখাটো ব্যাপারগুলো নিয়ে ভোগান্তি, বা তুই যা বিশ্বাস করিস তার চেয়েও বেশী কিছু” । আসলে মনের গভীরে সে নিজেকেই ব্যঙ্গ করছিল। রেমেদিওসকে গৃহস্থালি আনন্দের ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে কারণ সে নিশ্চিত ছিল যে একবার প্রণয়ে তৃপ্ত হবার পর পৃথিবীতে এমন একজন লোকও নেই যে নাকি একদিনের জন্য হলেও, এমনকি বোধের অগম্য হলেও কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করতে পারবে। সর্বশেষ হোসে আর্কাদিওর জন্ম ওকে পোপ বানানোর শিক্ষা দেবার অদম্য ইচ্ছে তাকে পরনাতনীর ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করা থেকে অব্যাহতি দেয়। ওকে ভাগ্যের হাতে অর্পন করে এই ভেবে যে আজ হোক, কাল হোক কোন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটবে আর এই দুনিয়ায় যেখানে সবই আছে, সেখানে অবশ্যই এমন এক আলসে পুরুষ থাকবে যা নাকি ওর ভার নিতে পারবে। আমারান্তা অনেক আগেই ইস্তফা দিয়েছে ওকে গৃহস্থালি ব্যাপারে কর্মী মহিলা বানানোর চেষ্টায়। সেই বিস্মৃত সেলাইয়ের বিকেলগুলোতে, যখন সেলাইকলের হাতল ঘোড়ানোর ব্যাপারে কোনো আগ্রহই দেখে না তখনই বুঝে ফেলে মেয়েটা হচ্ছে জড়বুদ্ধির। “তোকে লটারীতে তুলতে হবে”- পুরুষদের ব্যাপারে ওর অনুৎসাহ দেখে বলে। পরে যখন উরসুলা স্বচ্ছ কাপড়ের শাল দিয়ে মুখ ঢেকে ওকে উপাসনা সভায় পাঠায়, আমারান্তা তখন ভাবে এই রহস্যময় ব্যাপারটা এত উত্তেজক হয়ে দাঁড়াবে যে খুব শীঘ্রই এমন এক ধৈর্য্যসম্পন্ন লোকের আবির্ভাব ঘটবে যে ওর হৃদয়ের কোমল জায়গাটা খুঁজে পাবে । কিন্তু যখন দেখে কিভাবে সেই লোকটাকে অবহেলা করে যে সবদিক থেকে রাজপুত্রের চাইতেও বেশী গ্রহণযোগ্য, তখনই সে সকল আশা ত্যাগ করে। ফের্নান্দা এমনকি ওকে বোঝার কোনো চেষ্টাও করে না। যেদিন রক্তাক্ত সেই কার্নিভালে রেমেদিওস লা বেইয়াকে রানীর সাজে দেখেছিল তখন ওকে তার অলৌকিক এক মেয়ে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু যখন ওকে দুই হাত দিয়ে খেতে দেখে, দেখে যে এমনকি একটি সাধারণ প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারে না, তখন আর ওকে সারল্যের বিস্ময়কর প্রতিমূর্তি বলে মনে হয় না। আর একমাত্র যে ব্যাপারে তার খেদ হয় তাহলো পরিবারের হাবা মানুষরাই সবচেয়ে বেশী আয়ু পায়, যদিও কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া বিশ্বাস করত ও সবসময়ই বলত, সত্যিকার অর্থে রেমেদিওস লা বেইয়া হচ্ছে এ পর্যন্ত তার পরিচিত লোকদের মাঝে সবচেয়ে স্বচ্ছ, আর তাকে প্রতি মুহূর্তেই সবাইকে অবহেলা করার ক্ষমতা দিয়ে তাই প্রমাণ করত। তারপর সকলে ওকে ঈশ্বরের ইচ্ছের উপর ছেড়ে দেয়। ঐ দিন পর্যন্ত রেমেদিওস লা বেইয়া ঘুরে বেড়ায় নিঃসঙ্গতার মরুতে, কোনো বিবেকদংশন ছাড়া, দুঃস্বপ্নহীন ঘুমিয়ে, তার অন্তহীন গোসল দিয়ে, তার অনিয়মিত খাবার নিয়ে, তার গভীর ও প্রলম্বিত স্মৃতিবিহীন নৈঃশব্দ নিয়ে। সেদিন মার্চের এক বিকেলে ফের্নান্দা বাগানে তার কর্ড কাপড়ের বিছানার চাদর ভাঁজ করার জন্য বাড়ির মেয়েদের কাছে সাহায্য চায় । ওরা কেবলমাত্র কাজটা আরম্ভ করেছে, এমনি সময় আমারান্তার চোখে পরে রেমেদিওস লা বেইয়ার প্রচন্ড পান্ডুর মুখ ।
-“তোর কি খারাপ লাগছে?” প্রশ্ন করে ।
রেমেদিওস লা বেইয়ার হাতে চাদরের অপর প্রান্ত ধরা ছিল, সে ক্লিষ্ট এক হাসি ছড়ায় মুখে ।
-“উল্টো”- বলে –“কখনই এমন ভালো বোধ করিনি”

বলা শেষ করা মাত্র ফের্নান্দা অনুভব করে আলোর এক পেলব হল্কা তার হাত থেকে চাদরটাকে ছিনিয়ে নিয়ে শূণ্যে মেলে ধরেছে । আমারান্তা স্কারটের ঝালড়ে অনুভব করে এক রহস্যময় কাঁপুনি আর পতন ঠেকাতে চাদরটি আকরে ধরতে চেষ্টা করে যখন রেমেদিওস লা বেইয়া শূণ্যে উঠে যেতে শুরু করে । একমাত্র প্রায় অন্ধ উরসুলাই এ অসংশোধনীয় বাতাসের প্রকৃতি বোঝার মতো শান্ত অবস্থায় ছিল, সে চাদরকে আলোর দয়ার উপর ছেড়ে দেয়, দেখতে পায় রেমেদিওস লা বেইয়া হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। ওরই সঙ্গে উঠে উড়তে থাকা পতপত শব্দে আলোকোজ্জ্বল চাদরগুলোর ভেতর থেকে, ওর সঙ্গে বিদায় নিচ্ছে গুবড়ে পোকা ও ডালিয়ার সুবাস, উঠে যাচ্ছে বাতাস কেটে যেখানে বিকেল চারটে বাজা শেষ হয়েছে, আর ওরই সঙ্গে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় সুউচ্চ বাতাসে যেখানটা স্মৃতির সবচেয়ে উর্ধগামী পাখীদেরও নাগাল পাবার সম্ভাবনা নাই ।
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0

বহিরাগতরা অবশ্য মনে করে রেমেদিওস লা বেইয়া শেষ পর্যন্ত তার রানী মৌমাছি হবার অলংঘনীয় নিয়তি বরণ করেছে আর ইজ্জত রক্ষা করতে পরিবারের সকলে উর্ধগমনের গল্প ফেঁদেছে। ফের্নান্দা ঈর্ষায় জ্বলেও অলৌকিক ব্যাপারটাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়, আর অনেকদিন পর্যন্ত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে চাদরগুলোকে ফেরত দেবার জন্য। বেশিরভাগ লোকই অলৌকিক ব্যাপারটা বিশ্বাস করে, এমনকি তারা মোমবাতি জ্বালে ও নয়দিনের প্রার্থনা শেষ করে। হয়তবা অনেকদিন যাবত লোকের মুখে এই ব্যাপারটা ছাড়া অন্য কিছু শোনা যেত না যদি না আউরেলিয়ানোদের বর্বর হত্যাকান্ডের আতংক এই বিস্ময়কে সরিয়ে সে জায়গা দখল না করত। কোনো পূর্ববোধ না হলেও কোনভাবে কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া তার ছেলেদের করুন শেষ পরিণতির কথা বুঝতে পারে। যখন আউরেলিয়ানো সেররাদর ও আউরেলিয়ানো আর্কাইয়া বিশৃঙ্খলার সময় চলে আসে ও মাকন্দোতে থাকতে ইচ্ছে প্রকাশ করে, ওদের বাবা তাতে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে, সে বুঝতে পারছিল না রাতারাতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠা গ্রামে ওরা কী করতে পারবে। কিন্তু আউরেলিয়ানো সেনতেনো ও আউরেলিয়ানো ত্রিস্তে, আউরেলিয়ানো সেগুন্দোর অনুমতি নিয়ে ওদের ব্যবসার কাজ দেয়। তখন পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তে সায় দেয়ার ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছিল কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার। যে দিন থেকে সে মিস্টার ব্রাউনকে মাকন্দোতে আসা প্রথম গাড়িতে চড়ে আসতে দেখে- যে কমলা রঙের কনভার্টিবেলের ভেঁপুর শব্দে কুকুরগুলো চমকে উঠত ঘেউ ঘেউ শব্দে- বৃদ্ধ যোদ্ধা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে লোকজনের আদিখ্যেতা দেখে; আর সে বুঝতে পারে বৌ ছেলেকে ফেলে রেখে বন্দুক কাঁধে যুদ্ধে যাবার সময় থেকে লোকজনের প্রকৃতিতে কোনো একটা বড় পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। নির্লান্দার যুদ্ধ বিরতির পর স্থানীয় সরকার বলতে ছিল উদ্যমহীন মেয়র, ও শান্তিপ্রিয় ক্লান্ত মাকন্দোবাসী রক্ষণশীলদের মধ্য থেকে বেছে নেয়া কিছু লোক দেখানো বিচারক ।

-“এটা হচ্ছে এক নচ্ছারদের এলাকা”- খালিপায় কাঠের লাঠি হাতে পুলিশদের যেতে দেখলে মন্তব্য করত কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া, “এতগুলো যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র যাতে করে আমাদের বাড়িগুলো নীল রঙ্গ না করা হয়” । অবশ্য কলা কোম্পানী আসার পর স্থানীয় সরকারের বদলে আসে বহিরাগত স্বৈরাচারী, যাদেরকে মিস্টার ব্রাউন নিয়ে যায় বৈদ্যুতিক জাল দিয়ে ঘেরা মুরগীর খামারে বাস করতে, তার কথানুযায়ী যাতে তারা নিজ নিজ পদানুযায়ী সম্মানের সঙ্গে জীবনকে ভোগ করে, যাতে তাদের গরম না লাগে, মশা বা গ্রামের অগুনতি অসুবিধা যাতে তাদেরকে পোহাতে না হয়। পুরনো পুলিশদের জায়গায় আসে মাচেতে হাতে ভাড়াটে খুনির দল। কর্মশালায় আবদ্ধ কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে তার নিঃশব্দ নিঃসঙ্গতার বছরগুলোতে এই প্রথমবারের মতো এক স্থির বিশ্বাস জ্বালিয়ে মারে যে যুদ্ধটা শেষ ফলাফল দেখা পর্যন্ত চালিয়ে না যাওয়াটা বড় এক ভুল হয়েছে । ঐ দিনগুলোর মধ্যে একদিন বিস্মৃত কর্নেল ম্যাগনিফিকো ভিসবালের ভাই তার সাত বছর বয়সের নাতিকে নিয়ে প্লাজার ঠেলাগাড়ির কাছে যায় ঠান্ডা পানীয় পান করাতে, আর বাচ্চাটা দুর্ঘটনাবশত পুলিশের কর্পোরালের সঙ্গে হোঁচট খাওয়ায় পানীয় ছলকে পুলিশের ইউনিফরমে পরে, আর বর্বর পুলিশ বাচ্চাটাকে মাচেতে দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে আর দাদা বাঁধা দিতে গেলে এক কোপে তার মাথাটা নামিয়ে দেয় সে। সারা গ্রাম দেখতে পায় একদল লোক মাথাবিহীন ধড়টা আর এক মহিলা টুকরো টুকরো করা বাচ্চার লাশ থলেতে ভরে, কাটা মাথার চুল ধরে ছেঁচড়িয়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায় ।

কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার কাছে সেটা ছিল প্রায়শ্চিত্ত ভোগের চরম সীমা, যৌবনে পাগলা কুকুরে কামড়েছিল বলে পিটিয়ে মেরে ফেলা মহিলার লাশের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে যেরকম ক্রুদ্ধ হয়েছিল, সেই একই রকমের ক্রুদ্ধতা অনুভব করে সে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু কৌতূহলী মানুষ দেখে নিজের উপর গভীর ঘৃণার ফলে তার ভারি গলা পুনরুদ্ধার করে ঘৃণার সমস্ত ভার উগরে দেয় ওদের উপর যে ভার সে নিজে আর বইতে পারছিল না ।

-“এরই মধ্যে একদিন”- চিৎকার করে –“এই গুখেকো গ্রিংগোদেরকে শেষ করতে আমার ছেলেদের হাতে অস্ত্র তুলে দেব” ।

ঐ সপ্তাহের মধ্যেই উপকূলে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় তার সতেরজন ছেলেকে শিকার করা হয় খরগোশ শিকারের মত করে। অদৃশ্য আততায়ীরা ওদের ছাইয়ের ক্রসের মাঝখানে গুলি করে। আউরেলিয়ানো ত্রিস্তে তার মার বাড়ি থেকে বেরুচ্ছিল রাত সাতটার সময়, যখন অন্ধকার থেকে আসা এক বুলেট ওর কপাল ভেদ করে। আউরেলিয়ানো সেন্তেনোকে পাওয়া যায় কারখানায়, হ্যামকে যেখানে সবসময় সে শুত আর বরফকুচি করার সূচালো যন্ত্রটা হাতল পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেয়া হয় তার দুই ভুরুর মাঝখানে। সিনেমা শেষে বান্ধবীকে বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তুর্কদের উজ্জ্বল রাস্তা ধরে ফিরছিল আউরেলিয়ান সেররাদর, ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন রিভলবার দিয়ে গুলি করে ফুটতে-থাকা শুয়োরের চর্বির কড়াইয়ের মধ্যে ফেলে, আর সেই আততায়ীর পরিচয় কখনই পাওয়া যায়নি। কয়েক মিনিট পর কেউ আউরেলিয়ানো আরকাইয়ার দরজা ধাক্কা দেয় যেখানে সে একটি মেয়ে নিয়ে ছিল আর চীৎকার করে “তাড়াতাড়ি কর, তোর ভাইদের মেরে ফেলছে” । যে মেয়েটার সঙ্গে সে ছিল তার কথানুযায়ী আউরেলিয়ানো আরকাইয়া লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুললে অপেক্ষারত এক মাউজারের গুলিতে তার খুলি চুরমার হয়ে যায়। সেই মরণ-রাতে বাড়িটা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল চারটে লাশের শোক পালনের, ফের্নান্দা তখন পাগলের মত গ্রামময় খুঁজে বেড়ায় আউরেলিয়ানো সেগুন্দোকে যাকে পেত্রা কতেস কর্নেলের নামের একই নামের সকলকে খুন করা হবে এই বিশ্বাসে কাপড়জামা রাখার দেয়াল কুঠুরিতে আবদ্ধ করে রাখে। চতুর্থদিনের আগে তাকে বেরুতে দেয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপকূলের ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে আসা টেলিগ্রাম পরিষ্কার করে দেয় যে অদৃশ্য শত্রুর আক্রোশ ছিল ছাইয়ের ক্রস দাগা ভাইদের উপর। আমারান্তা হিসেবের খাতাটা খুঁজে বের করে, যেটাতে ভাইপোদের বিবরণ লিখে রাখা হয়েছিল আর টেলিগ্রাফ আসার ক্রম অনুযায়ী এক এক করে নামগুলো কেটে দিতে থাকে যতক্ষণ না শুধুমাত্র বাকী থাকে সবচেয়ে বড়জন। তার বড় বড় সবুজ চোখের সঙ্গে গাঢ় চামড়ার বৈপরীত্যের কারণে সকলেই ওকে মনে রেখেছিল। ছুঁতোর ছিল সে, তার নাম ছিল আউরেলিয়ানো আমাদর আর বাস করত পাহাড়ের পাদদেশে এক নিভৃত গ্রামে। ওর মৃত্যুর খবর নিয়ে আসা টেলিগ্রামের জন্য দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করে, আউরেলিয়ানো সেগুন্দো ওকে সতর্ক করে দেবার জন্য এক দূত পাঠায়। সে ভেবেছিল জানের উপর এই হুমকির কথা ওর অজানা। আউরেলিয়ানো আমাদর নিরাপদেই আছে এই খবর নিয়ে ফিরে আসে দূত। সেই করাল রাতে দুই লোক তাকে বাড়িতে খুঁজতে গিয়ে ওর উপর রিভলবার খালি করলেও ছাইয়ের ক্রুসে লাগাতে ব্যর্থ হয়। আউরেলিয়ানো আমাদর লাফিয়ে উঠানের বেড়া পার হয়ে পাহাড়ের গোলকধাঁধার মধ্যে হারিয়ে যায় যে জায়গাটা তার হাতের তালুর মতই চেনা; ধন্যবাদ আদিবাসীদের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বকে যাদের সঙ্গে সে ব্যবসা করত। সেদিন থেকে ওকে আর দেখা যায়নি ।

কালো দিন ছিল ঐ সময়টা কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার জন্য। সহানুভূতি জানিয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট এক টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ব্যাপক তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেন আর মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তার আদেশে চারটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার করোনা (ফুলের গোলাকৃতি মালা) নিয়ে আসে কফিনে দেবার জন্,য কিন্তু কর্নেল তাকে রাস্তায় দাড় করিয়ে রাখে। লাশ দাফনের পর প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে এক অগ্নিবর্শী টেলিগ্রাম লিখে নিজ হাতে নিয়ে গেলে টেলিগ্রাম প্রেরনকারী লোকটা পাঠাতে রাজী হয় না। ফলে আরও আক্রমণাত্মক অনেক শব্দ কাগজটার সঙ্গে যোগ করে সেটাকে ডাকে ফেলে। যেমনটি ঘটেছিল তার স্ত্রীর মৃত্যুতে, ঘটেছিল যুদ্ধের সময় অনেকবার তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মৃত্যুতে। সে কোনো শোক অনুভব করে না, অনুভব করে দিকবিদিকহীন অন্ধ ক্রোধের ও অসহায় অক্ষমতার স্পষ্ট অনুভূতি, এমনকি ফাদার আন্তনিও ইসাবেলকে অভিযুক্ত করে শত্রুদেরকে চিনিয়ে দেবার জন্য তাঁর ছেলেদেরকে অমোচনীয় ছাই দিয়ে চিহ্নিত করার জন্য। জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ যাজক যে আর গুছিয়ে চিন্তা করতে পারেন না, আর যার বেদী থেকে দেয়া উদ্ভট ব্যাখ্যা শুনে যাজকপল্লীর লোকজন ভয় পেতে আরম্ভ করছে, সেই বৃদ্ধ এক বিকেলে বাড়িতে আসে পাত্র নিয়ে যেটাতে সে ছাইয়ের বুধবারে ছাই প্রস্তত করে আর সেগুলো পরিবারের সকলের কপালে মেখে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে ওগুল ধুলেই চলে যায়। কিন্তু এই দুর্ভাগ্যের আতংক সবার মধ্যে এমন গভীরে প্রোথিত হয়েছিল যে এমনকি ফের্নান্দা পর্যন্ত তাঁর উপর এই পরীক্ষা চালাতে অস্বীকার করে, আর কখনই বুয়েন্দিয়াদের কাউকে ছাইয়ের বুধবারে বেদীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে দেখা যায়নি ।

শান্ত অবস্থাটা ফিরে পেতে অনেকদিন লেগে যায় কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার। সে ত্যাগ করে সোনার মাছ বানানো। কোনরকমে খাওয়া দাওয়া সেড়ে কম্বল টানতে টানতে নিজের ক্রোধটাকে নীরবে বিশ্লেষণ করতে করতে বাড়িময় ঘুড়ে বেড়াত স্বপ্নগ্রন্তের মতো। তিন মাসে তাঁর সমস্ত চুল সাদা হয়ে যায়, ঠোঁটের উপর ঝুলে থাকা মোম দেয়া সূচালো গোঁফগুলো ঝুলে পরে কিন্তু তাঁর চোখগুলো অঙ্গারের মত জ্বলে আগেকার দিনগুলোর মতো, যে চোখ দেখে জন্মের সময় ভয় পেয়েছিল লোকে আর অন্য সময় যে চোখ শুধুমাত্র দৃষ্টি দিয়ে চেয়ার নড়াতে পারতো। সেই ক্রোধের তান্ডবলীলার মধ্যে নিষ্ফলভাবে জাগিয়ে তুলতে চাইতো অতীতের সেই পূর্ববোধ, যেগুলো যৌবনে শত বিপদের মধ্যেও তাকে পথ দেখিয়েছে গৌরবের উর্বর ভূমি পর্যন্ত । হারিয়ে গিয়েছিল সে তখন, পথ হারিয়েছিল এমন এক অচেনা বাড়িতে যেখানে কোন কিছুই অথবা কেউই তার ভিতরে ভালবাসার সামান্য কণাটুকুও জাগাতে পারেনি ।

যুদ্ধের আগেকার অতীতের চিহ্ন খুঁজতে একবার মেলকিয়াদেসের ঘড়টা খোলে আর শুধুমাত্র পায় জঞ্জাল, এত বছর পরিত্যক্ত থাকার কারণে তা হয়ে উঠেছে জমা আবর্জনার স্তুপ। যে বইগুলো আর কেউই পড়েনি তারই মধ্যে স্যাতস্যাতে পুরনো পার্চমেন্টে ফুটেছিল এক বিবর্ণ ফুল, আর সাড়া বাড়ির মধ্যে ভেসে থাকা সবচেয়ে পরিশুদ্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল পচে যাওয়া স্মৃতির এক অসহ্য গন্ধ। এক সকালে সে উরসুলাকে চেস্টনাটের নীচে মৃত স্বামীর কাছে কাঁদতে দেখে। বাড়ির সকল বাসিন্দাই অর্ধ শতক ধরে এই বিধ্বস্ত শক্তিশালী বৃদ্ধকে খোলা হাওয়ায় দেখতে পেত আর কর্নেল আউরেলিয়ানো ছিল তার একমাত্র ব্যতিক্রম। “বাবাকে অভিবাদন জানাও” ওকে বলে উরসুলা। সে চেস্টনাটের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাড়ায়। আর অনুভব করে সামনের ফাঁকা জায়গাও তাঁর মধ্যে কোনো ভালবাসার উদ্রেক করে না । “কী বলছে” জিজ্ঞেস করে।
“সে খুব বিষণ্ণ” উত্তর দেয় উরসুলা “কারণ সে বিশ্বাস করে তুই মারা যাচ্ছিস” ।
“ওকে বল” হাসে কর্নেল- “যখন মরা উচিৎ তখন কেউ মরে না, মরে যখন মরতে পারে”

মৃত বাবার পূর্ববোধ তাঁর হৃদয়ে অবশিষ্ট অহংকার জাগিয়ে তুললেও সে এটাকে ভুল বোঝে শক্তির এক দমকা হাওয়া ভেবে। ফলে সে উরসুলার কাছে জানতে চায় প্লাস্টারের সেন্ট যোসেফের মূর্তির ভিতরকার স্বর্নমুদ্রা লুকিয়া রাখার জায়গার হদিস । “কখনই জানতে পারবি না” অতীতে পাওয়া এক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ উরসুলা দৃঢ়তার সাথে বলে। “কোনো একদিন” যোগ করে- এই সম্পদের মালিকের আবির্ভাব ঘটবে আর শুধুমাত্র সে-ই মাটির নীচ থেকে ওগুলো বের করবে। “কেউই জানতে পারে না যে তার মতো উদার মানুষ হঠাৎ কেন টাকার জন্য এত নির্লজ্জ হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে, আর সেটা কোনো জরুরী প্রয়োজন মেটাবার মতো কোনো মোটামুটি অংকের টাকা নয়, সে যে বিশাল সম্পদের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তার অংক শুনেই আশ্চর্যের সাগরে ডুবে যায় আউরেলিয়ানো সেগুন্দো। পুরনো দিনে যারা ওকে অর্থ সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছিল তাদের কাছে নতুন করে সাহায্য চাইলে তারা ওর সঙ্গে দেখা না করার জন্য লুকিয়ে পরে। ঐ সময়েই তাকে বলতে শোনা যায় “উদারপন্থী ও রক্ষণশীলদের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে উদারপন্থীরা উপাসনা সভায় যায় পাঁচটার সময় আর রক্ষণশীলরা যায় আটটায়”। তারপরও সে এতই অধ্যবসায়ের সাথে চেষ্টা করে, এমনভাবে মিনতি করে, তার আত্মমর্যাদাকে এমনভাবে নীচু করে যে এখান ওখান থেকে কিছু কিছু করে সব জায়গায় নিঃশব্দে খেটে, প্রচন্ড অধ্যবসায়ের সঙ্গে আটমাসের মধ্যে উরসুলার পুঁতে রাখা সম্পদেরও বেশী সম্পদ জড়ো করে ফেলে, পরে দেখা করে অসুস্থ কর্নেল হেরিনেলদো মার্কেজের সঙ্গে যাতে সে তাকে সাহায্য করে এক সম্পূর্ণ যুদ্ধে ।

কোন এক সময়, সত্যিকার অর্থে একমাত্র কর্নেল হেরিনেলদো মার্কেজই পারতো, এমনকি তার পক্ষাঘাতগ্রস্থ চেয়ার থেকেও, মরচে পড়া বিদ্রোহের সুতো ধরে টান দিতে। নিরলান্দিয়ার সন্ধির পর যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া ছোট ছোট মাছের কাছে আশ্রয় নিয়েছে, সে’ই তখন শেষ পরাজয়ের আগ পর্যন্ত বিশ্বস্ত অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। ওদের সঙ্গেই সে শুরু করেছিল নিত্যদিনের করুণ, অপমানজনক, অনুনয় বিনয়ের, আবেদনপত্রের, ‘আগামীকাল আসুন’, ‘প্রায় হয়ে এল’, ‘যথাযথ মনোযোগ সহকারে আপনাদের কেসটা আমরা দেখছি’, ‘আপনার একান্ত বিশ্বস্ত সেবক’দের বিরুদ্ধে সেই নিস্ফল যুদ্ধের, যেখানে আজীবন পেনশন দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু কখনই দেয়া হয়নি। অন্য যুদ্ধ, রক্তাক্ত সেই বিশ বছরেও এতটা ক্ষতি হয়নি, যতটা হয়েছে এই অন্তহীন ক্ষয়কারী স্থগিত রাখার যুদ্ধটায়, এমনকি প্রাণের উপর তিন তিনটে হামলা থেকে পালিয়ে যাওয়া, পাঁচবার আহত হবার পর সেরে ওঠা, অসংখ্য যুদ্ধ থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে যাওয়া কর্নেল হেরিনালদো মার্কেজ পর্যন্ত ভয়ংকরের কাছে পরাজয় বরণ করে ডুবে যায় ভাড়া করা বাড়িতে, খোপ খোপ আলোর ভেতর আমারান্তার কথা ভাবতে ভাবতে। খবরের কাগজে ছাপা প্রতিচ্ছবির মাধ্যমে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের কথা সে জানতে পারে, মর্যাদাহীন মুখ নিয়ে প্রজাতন্ত্রের এক আড্ডাতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছিল তারা আর প্রেসিডেন্ট তাদেরকে নিজেও ছবি খোদাই করা বোতাম দিচ্ছিল কোর্টের গলার পাশে লাগানোর জন্য, আর ফেরত দিচ্ছিল কফিনের উপর রাখার জন্য রক্ত ও বারুদ দিয়ে নোংরা হওয়া এক পতাকা। অন্যেরা, সবচেয়ে বেশী মর্যাদাসম্পন্নরা, তখনও জনসাধারণের দাক্ষিণ্যের চিঠির আশায়, ক্ষিধেয় মুমুর্ষু, প্রচন্ড রাগে ক্ষুব্ধ, কোন রকমে বেঁচে ছিল অতীতের গৌরবের মধ্যে ধুকতে ধুকতে। কাজেই যখন কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সমস্ত দুর্নীতিবাজ ও বিদেশী দখলদারদের জঘন্য নিষ্ঠুরতার শেষ দেখার জন্য এক মরণ-যুদ্ধের আহবান করে কর্নেল হেরিনালদো মার্কেজ চেপে রাখতে পারে না তার সহানুভূতির শিহরণ ।

“হায়” আউরেলিয়ানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে – “জানতাম যে বৃদ্ধ হয়েছিস কিন্তু এখন বুঝতে পারছি। মনে হওয়ার চেয়েও অনেক বুড়িয়ে গেছিস তুই”।

(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com