অকথিত বোর্হেস: একটি তারার তিমির

রাজু আলাউদ্দিন | ১৭ অক্টোবর ২০১৫ ৮:৫০ অপরাহ্ন

উৎসর্গ: ইমতিয়ার শামীম

border=0বোর্হেসের বন্ধু এবং অনুবাদক নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নি সেই সৌভাগ্যবান অনুবাদকদের একজন যিনি সরাসরি মূল লেখকের সহায়তায় ১০টির মতো বই অনুবাদ করেছিলেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২–পাঁচ বছরব্যাপী তাঁদের এই যৌথকর্মের ফল ছিলো বোর্হেস-পাঠকদের জন্য অবিস্মরণীয়। নরম্যানের অনুবাদগুলোর মাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্তে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য বোর্হেস-অনুরাগী আর বোর্হেসের সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠেছে আলোচনা ও তর্কবিতর্কের বিষয়। কিন্তু নরম্যান ঐ অনুবাদকর্মের পর বহু বছর পর্যন্ত বোর্হেসের নতুন কোনো অনুবাদতো করেনইনি, এমন কি বোর্হেস সম্পর্কে ছিলেন পুরোপুরি নিশ্চুপ। কিন্তু নিশ্চুপ থাকলেও বোর্হেস সম্পর্কে নিস্ক্রিয় ছিলেন না। সেটা বোঝা গেল যখন ২০০৩ সালে স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নধর্মী The lesson of the master: on Borges and his Work গ্রন্থটি বের হলো। এই বইয়ে একটি মাত্র স্মৃতিচারণধর্মী যে লেখা রয়েছে সেটা ছিল আসলে ২০১৪ সালে প্রকাশিত তার George & Elsa: Jorge Luis Borges and his wife, the untold story নামক আইসবার্গের সামান্য চূড়া মাত্র। প্রায় ৪৫ বছরের গভীর তলদেশে অদৃশ্য অবস্থায় থাকা গোটা আইসবার্গটি নরম্যান আমাদের সামনে তুলে ধরলেন তাঁর এই নতুন বইটিতে। কিন্তু নরম্যান কেন এই বই লিখতে গেলেন আর কীই-বা আছে এই বইয়ে যা অন্য কারোর বইয়ে পাওয়া যাবে না? এই বইয়ের শেষ অধ্যায়ে (Looking back) লেখক নিজেই জানাচ্ছেন যে “বোর্হেস এবং তার সাহিত্যকর্ম নিয়ে পাঠাগার-পরিমাণ অসংখ্য বই লেখা হয়েছে” (A library of books has been written about Borges and his literary work.) বোর্হেসের জীবন, সাহিত্যকর্মসহ নানান বিষয় নিয়ে গবেষণা, সমালোচনা হয়েছে বিপুল পরিমাণে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানান জনের নেয়া অসংখ্য সাক্ষাৎকার। কিন্তু এসব গ্রন্থের একটির সঙ্গে অন্যটির চরিত্রগত বা দৃষ্টিভঙ্গীর সাযুজ্য রয়েছে অনেকটাই। কিন্তু বোর্হেস-বিষয়ক নরম্যানের বই দুটি বিপুল গ্রন্থের ভিড়ে সুউচ্চ মিনারের মতো দাঁড়িয়ে আছে মূলত পর্যবেক্ষণ, কখনো কখনো গ্রন্থিমোচন, আর প্রায়শই অন্যদের নজর-এড়িয়ে-যাওয়া, অথচ গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যের উন্মোচনে। তার প্রথম বইটির সূত্রে এ বিষয়গুলোই পাঠকদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয়টি, যেহেতু এতে বোর্হেসের জীবনকাহিনীই উপজীব্য, তাই এখানে এসে ভীড় করেছে বোর্হেসের জীবনের সেই সব ঘটনাপুঞ্জ যা আগে অন্য কারোর লেখা জীবনীগ্রন্থে আসেনি। কেন অন্য জীবনী-লেখকরা এসব অজানা ঘটনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন? কারণ তারা নরম্যানের মতো কাজের সূত্রে বোর্হেসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েননি। ফলে এই গ্রন্থ কেবল হারিয়ে যাওয়া বোর্হেসকেই উদ্ধার করেনি, একই সাথে এটি ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে সেই আকরগ্রন্থ যার সাহায্যে বোর্হেসের পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখা সম্ভব হবে।

arts-2.jpg
১৯৬৯ সালের আগস্টে বুয়েনোস আইরেসে নরম্যান ও তার স্ত্রী সুজান এ্যাস-এর বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে তাদের দুই পাশে বোর্হেস ও এলসা। ছবি: নরম্যানের বই থেকে।
বোর্হেসের সঙ্গে নরম্যানের পরিচয় ১৯৬৭ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি এবং ঐ বছর থেকেই বোর্হেসের সঙ্গে তিনি অনুবাদের কাজ শুরু করেন। পরের বছর ১৯৬৮ সালে বুয়েনোস আইরেসে গিয়ে বোর্হেসের সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদের কাজ অব্যাহত রাখেন ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে বোর্হেসের সঙ্গ কেবল অনুবাদের জন্যই নয়, একই সঙ্গে বোর্হেসের জীবনের,–অবশ্যই নরম্যানের জীবনেরও–বহু ঘটনার জন্যও আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থের মাধ্যমেই নরম্যান প্রথমবারের মতো হাজির করলেন সেই “হারিয়ে যাওয়া বোর্হেসকে যাকে কোনো গ্রন্থাগারে পাওয়া যাবে না” (the missing Borges who will not be found in the library (P-246)।

কিন্তু কেমন ছিলেন এই হারিয়ে যাওয়া বোর্হেস? অন্যসব জীবনীগুলোতে আমরা পেয়েছি এমন এক বোর্হেসকে যার জীবনে নেই র‌্যাঁবো বা জাঁ জেনের মতো প্রথাবিরোধী জীবন যাপনের উত্তেজক ও কৌতুহলোদীপক ঘটনার নাটকীয় উত্থানপতন। নেই গ্যাটে বা রবীন্দ্রনাথের মতো বহু বর্ণের উজ্জল বিভা। এদের তুলনায় বোর্হেসের জীবন ছিলো একেবারেই নিস্তরঙ্গ ও অমলধবল। ধুমপান, মদ্যপান এমনকি যৌন আসক্তিরও কোনো ছিটেফোটা তার জীবনের কোনো পর্বেই প্রায় খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রচলিত বিশ্বাসে আমরা যেসবকে জীবনের কলুষ ও ক্লেদ বলে বিবেচনা করি– বোর্হেস ছিলেন এসব থেকে পুরোপুরি মুক্ত। কিন্তু নরম্যান আমাদের সামনে যে বোর্হেসকে হাজির করেছেন তিনি যৌনাসক্ত না হলেও নারীর প্রতি বীতরাগ ছিলেন না। র‌্যাঁরো বা জেনের মতো অস্ত্র ব্যবসা বা চৌর্যবৃত্তির কলঙ্কচিহ্ন না থাকলেও, তাই বলে বোর্হেসের চরিত্রে মিথ্যাচার, স্ববিরোধিতা, বর্ণবিদ্বেষ, চালাকি, অকৃতজ্ঞতা ও দ্বায়িতহীনতার দূষণের কোনো কমতিও ছিল না। এই গ্রন্থে বোর্হেসের এই দিকের উন্মোচন ঘটলেও, এই বইয়ের মূল চরিত্র আসলে বোর্হেস নন, বরং তার স্ত্রী এলসা, এলসা আস্তেতে মিইয়ান। রুচিশীল যে-কারোর কাছেই এলসা বিবমিষাকর, অসহ্য, জংলী, অর্থগৃধ্নু, ইর্ষাকাতর, বস্তুলোভী, সমকামী, অসভ্য এবং আরও বহু কিছু। কিন্তু বোর্হেসের মতো রুচিশীল ও প্রথম সারির এক লেখকের জীবনে এই নারী কিভাবে জড়িয়ে গেলেন যিনি কোনো অর্থেই বোর্হেসের কাছে আকর্ষণীয়া হওয়ার কথা নয়? তাহলে কিভাবে এই বিষম-জোড় তৈরি হয়েছিল? আর এর ফলাফলই বা কী ছিলো? নরম্যান প্রায় আখ্যানের ভঙ্গিতে, গোয়েন্দা কাহিনীর চৌম্বকীয় শক্তিতে তুলে ধরেছেন বোর্হেস-জীবনের হারিয়ে যাওয়া বা অকথিত পর্বটি এই(Georgia & Elsa) গ্রন্থে। নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি ডায়েরি, নোটবুক, চিঠিপত্র, পাণ্ডুলিপি ও ছবিসহ ভিন্ন উপদান ব্যবহার করেছেন এতে যা আগে কখনোই আমরা দেখিনি। কিন্তু এইসব উপাদানকে তিনি তিরিশটি স্বতন্ত্র শিরোনামে গল্পের মতো কালানুক্রমিকভাবে সাজিয়েছেন। প্রতিটি শিরোনাম যেমন আলাদা একটি গল্প হিসেবে পড়া যায়, তেমনি সবগুলো জোড়া দিলে একটি উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যও অর্জন করে বয়ন ও বয়ান-কৌশলের গুণে। কিন্তু এটি যেহেতু সাহিত্যের এক কিংবদন্তী পুরুষকে নিয়ে, তাই এই গ্রন্থের আধার-রূপের চেয়ে আধেয়ই আমাদের কাছে বেশি কৌতুহলের। তাই, প্রথমেই দেখা যাক ব্যক্তি ও আটপৌরে বোর্হেস সম্পর্কে নরম্যান আমাদেরকে অজানা ও অকথিত কী কী জানাচ্ছেন।

বর্ণবিদ্বেষী বোর্হেস

border=0এর আগে কারো কারোর সাথে একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি বিভিন্ন সময় ইহুদীদের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন। মনে পড়ে, ফের্নান্দো সররেন্তিনোর সঙ্গেই এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইল-ফিলিস্তিনি যুদ্ধে তিনি ইহুদীদের পক্ষ নিয়ে অভিমত জানিয়েছিলেন। অন্য কোনো এক সাক্ষাৎকারে, এমনি কি তার আত্মজীবনীতেও এক জায়গায় তিনি আর্হেন্তিনার পাম্পা অঞ্চলের নিম্নবর্গীয় আদিবাসীদেরকে তিনি নির্বোধ, এবং বুদ্ধিমত্তায় নিম্নস্তরের বলে ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু খোলামেলাভাবেই তিনি বর্ণ ও জাতিবিদ্বেষী ছিলেন, তা এই প্রথমবারের মতো জানা গেল নরম্যান-কথিত এক ছোট্ট ঘটনায়।

১৯৬৭ সালের দিকে বোর্হেস যখন আমেরিকায় বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন তখন হার্ভার্ডের এক কৃষাঙ্গ তরুণ ছাত্র সাহিত্যে উৎসাহের কারণে বোর্হেসের সঙ্গে রান্না ঘরে এসে বসতো। তরুণ ছাত্রটি বোর্হেসের কাছ থেকে শুনবার আশায় চুপচাপ ছিল; কিন্তু বোর্হেস কোনো কথাই বলেননি ছেলেটির সাথে। নরম্যানের মনে হয়েছিল বোর্হেস চাচ্ছিলেন সে চলে যাক, তাই তিনি কোনো কিছু না বলে নিশ্চুপ থেকেছিলেন। বোর্হেস ওকে পাত্তা না দেয়ায় সে বোর্হেসের কাছে আসা বন্ধ করে দেয়। বর্ণবিদ্বেষী বোর্হেসের আরেকটি ঘটনার কথাও নরম্যান জানিয়েছেন এভাবে:

বোর্হেসের আর্হেন্তিনিয় গৃহকর্মী ফানি বললো যে বুয়েনোস আইরেসে একদিন বোর্হেসকে দেখতে এসেছিলেন দুই ব্রাজিলিয় নারী। “সারাটা বিকেল ওরা ছিল”, ফানি বললো, “ওরা চলে যাওয়া মাত্র সাহেব (Señor) রান্নাঘরে এসে জানতে চাইলেন, তারা দেখতে কেমন ছিল। আমি বললাম, “ওরা কালো।” “কী বলছ তুমি, কালো ছিল? আমাকে বলনি কেন? কী বিভৎস (Que horror), আমারতো উচিৎ ছিল ওদেরকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলা! (পৃ: ৪৬)

নপুসংক বোর্হেস

elsa-with-borges.jpg
সস্ত্রীক বোর্হেস। ছবি : নেট থেকে নেয়া ।

বোর্হেস দুবার বিয়ে করেছিলেন, প্রথমবার তার ৬৮ বছর বয়সে এই এলসা আসতেতের সঙ্গে, দ্বিতীয়বার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, ১৯৮৬ সালে এপ্রিলে। দুজনের কারোর সাথেই বোর্হেস কোনো সন্তান রেখে যাননি। বোর্হেস যে সমাজ ও দেশে জন্মেছিলেন সেখানে অবশ্য বিয়ে না করেও সন্তান নিতে কোনো সামাজিক আপত্তি নেই। কিন্তু ঘটনা হলো বিয়ের আগেপরে বোর্হেসের একাধিক বান্ধবী বা প্রেমিকা থাকলেও তাদের কারোর সাথেই যৌন-সম্পর্কের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তার কোনো বান্ধবী, প্রেমিকা বা গবেষকদের কেউ এধরনের কোনো দাবী আজও উত্থাপন করতে পারেননি। না পারার কারণ, তিনি নারীর প্রতি প্রবল টান অনুভব করলেও কখনোই যৌন-পর্বে গিয়ে পৌঁছাতে পারেননি। নরম্যান এই বইয়ে বোর্হেসের এই অক্ষম দিকটি কয়েক জায়গায়তেই তুলে ধরেছেন। নারম্যানের ভাষায়:
সে (এলসা) নির্ঘাত প্রতারিত বোধ করেছে। সে বললো, জর্জি (পরিবারের লোকজনরা বোর্হেসকে এই উচ্চারণেই ডাকতো) নপুংসক, সব সময়ই তাই ছিল। কেন এলসাকে এ কথা শুরুতেই বলেনি? তাদের বিয়ের রাত্রটি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো তাকে, হাঁটু গেড়ে এলসার সামনে ফুপিয়ে কাঁদলো সে। এই বিষয়টা যদি সে আগেই জানাতো, ক্রোধে ফেটে পড়ে তিক্ততার সাথে বললো এলসা, ‘একটা পুরুষকে কিভাবে বিছানায় নিতে হয় আমি তা জানি।’

পুরোপুরি স্তম্বিত আমি উত্তরে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারিনি। এলসার হতাশা, তার ক্রোধ, তার অপমান, তার অসুখী অবস্থা তখন আমার কাছে পরিস্কার হয়ে উঠলো। (পৃ: ৫২)

বোর্হেসের যৌন অক্ষমতার আরেকটি ভাষ্য নরম্যান পেয়েছেন বোর্হেসের বাসার গৃহকর্মী ফানির সুবাদে যেটা তিনি প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছেন বইয়ের মাঝামাঝি `An aside’ অধ্যায়ে:

দোনঞা লেওনোর(বোর্হেসের মা)-এর গৃহকর্মী ফানির ভাষ্যমতে, বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে বোর্হেসের মা এলসাকে একপাশে নিয়ে তাকে বললেন, ‘শোন, জর্জি চাইবে না ওর শয্যায় কেউ সঙ্গী হোক। এলসা এই কথার জবাবে দম্ভের সঙ্গে বললো ক্যাম্ব্রিজে আমাকে যে কথাগুলো বলেছিল, সেগুলোই ব্যবহার করে–‘পুরুষ মানুষকে কিভাবে বিছানায় নিতে হয় আমি তা জানি।’ (পৃ: ১৭০)

এই বইয়ের `The salem mystery solved’ অধ্যায়ে বোর্হেসের যৌন-অক্ষমতার আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন নরম্যান বোর্হেসের আইনী সহায়তা দানকারী ভেইল রীডের জবানীতে:
‘ধন্যবাদজ্ঞাপক (Thanksgiving) সেই বর্ষণমূখর সন্ধ্যায় বোর্হেস জানালেন যে ‘মাচো’ (Macho) হতে অস্বীকার করায় এলসা তার সাথে তিন দিন কোনো কথা বলেনি। ভেইল লিখেছেন, ‘ভ্যান ডেল-এর বাড়ির কাছে পুরোনো কবরস্থানে হাটতে হাটতে বোর্হেস সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিল: “আমি অসহায়। অন্ধ! বিয়ের আগে আমি ওকে (এলসা) বলেছিলাম আমি কখনোই সহবাস করতে পারবো না, কারণ আমি নপুংসক।”(পৃ: ২৩৬)

কিন্তু প্রশ্ন হলো যিনি নিজেকে নপুংসক বলে জানেন তিনি কেন বৃদ্ধ বয়সে বিয়ে করতে গেলেন? এর কোনো সদুত্তর কারো কাছ থেকেই পাননি নরম্যান।

রাজনৈতিক অজ্ঞতা

নানান সময় বোর্হেস দেশি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে অভিমত জানিয়েছেন এবং সে সব অভিমত তার বন্ধুবান্ধব ও অনুরাগীদের হতবাক করতো, কারণ বোর্হেস ঘটনার তলদেশ না জেনেই সে সব মতামত জানিয়েছিলেন। এবং সাহিত্যবোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন তার অবিবেচক মন্তব্য এবং চিলির তৎকালীন স্বৈরশাসক আউগুস্তো পিনোসেতের আমন্ত্রণ রক্ষাই শেষে তার কাল হয়েছিল: সম্ভাব্য তালিকায় থাকা সত্ত্বেও নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন চিরকালের জন্য। কোনো রকম কূটনৈতিক ছলচাতুরীর আশ্রয় না নিয়ে তিনি রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে এতই সোজাসাপ্টা ও অপরিপক্ক মন্তব্য করেছেন যে তা শেষ পর্যন্ত তার অনুরাগীদেরকেও অস্বস্থিতে ফেলে দিত। নরম্যান এই বইয়ে তার দুএকটি নমুনা তুলে ধরেছেন।

একদিন হার্ভার্ডের ছাত্রদের পত্রিকা, `দি এ্যাডভোকেট’-এর এক তরুণ সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য ফ্ল্যাটে এলেন। সাহিত্যের সব বিষয় নিয়েই তিনি প্রশ্ন করলেন এবং প্রসঙ্গক্রমে বোর্হেসের কাছে জানতে চাইলেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তিনি কী ভাবছেন। বোর্হেস সংক্ষেপে যুদ্ধের পক্ষেই তার মত প্রকাশ করলেন–অর্থাৎ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার পক্ষে।

সাংবাদিক চলে যাওয়ার পর আমি বোর্হেসকে প্রশ্ন করলাম যুদ্ধ সম্পর্কে তিনি কী জানেন। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। আমি জানতে চাইলাম কিসের ভিত্তিতে তিনি মার্কিন সরকারের নীতি সমর্থন করলেন। পরে আমি তাকে বুঝালাম যে ভিয়েতনামকে কেন্দ্র করে দেশ প্রায় গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও এ নিয়ে তোলপাড়, আর তার সব সহকর্মী–লেখক ও বুদ্ধিজীবী–প্রতিদিন প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং ওয়াশিংটনের দিকে পদযাত্রা করছেন বিরোধিতা জানাতে। (পৃ: ৬০)

কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতিই নয়, নিজের দেশের রাজনৈতিক দল সমর্থন করার ব্যাপারেও তিনি কখনোই বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি। নরম্যানের ভাষায়:

বোর্হেসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির–যেগুলোর বেশির ভাগই ভুল এবং স্ববিরোধী–ব্যাপারে যেটা আশ্চর্যের তাহলো পেরন-বিরোধিতা তার মগজধোলাই করে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে বৈধ বা অবৈধের তোয়াক্কা না করে যে-কোনো সরকারকেই তিনি বুকে টেনে নিয়েছেন, যেহেতু তা পেরন-বিরোধী। এই ব্যাপারটা তাকে সরাসরি ‘দুষিত যুদ্ধের’ (Dirty war) খুনী জেনারেল বিদেলার দুবাহুতে আশ্রয় দিয়েছিল, যার স্বৈরাচারী দলটিকে বোর্হেস উল্লেখ করেছেন ‘ভদ্রলোকদের’ দ্বারা গঠিত বলে। (পৃ: ২৫১)

মিথ্যেবাদী বোর্হেস

arts-3.jpg
ভাঁড়ের বেশে বোর্হেস। ছবি: নরম্যান-এর বই থেকে নেয়া।

“সাহিত্যের মিথ্যা খাঁটি সত্যের চেয়েও সর্বজনীন।” অথবা কথাটা এভাবেও বলা যায় “এ তেমন মিথ্যা যা ইতিহাসের সত্যের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও বিস্তৃত এবং সেই কারনে অনেক বেশি সত্যাশ্রয়ী।”–অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব গ্রন্থের ভূমিকায় সাহিত্যের মিথ্যার প্রয়োজন ও গুরুত্ব বুঝাবার জন্য এই কথাগুলো বলেছিলেন। বহু বছর আগে লাতিন আমেরিকান কথাসাহিত্যের দিকপাল মারিও বার্গাস যোসাও মিথ্যার সপক্ষে সত্যাহরণী সাফাই গেয়েছিলেন এভাবে: “আসলে উপন্যাস মিথ্যা কথা বলে, তার পক্ষে অন্য কিছু করা সম্ভব নয়। তবে এটা আখ্যানের কেবল একটা দিক। অন্যদিক হচ্ছে, মিথ্যা বলতে গিয়ে সে কৌতুহলোদ্দীপক এক সত্যকে প্রকাশ করে।” (La verdad de las mentiras, punto de lectura, 2009. P-16)। সাহিত্যে এই ‘মিথ্যা’র চর্চা করেছেন বোর্হেস সারা জীবন প্রায় নিখুঁত শিল্পকৌশলের মাধ্যমে এবং নিশ্চিতভাবেই সেই কৌতুহলোদ্দীপক এক সত্যকে প্রকাশ করার লক্ষ্যেই। সেই লক্ষ্যে তাঁর সাফল্য ইর্ষণীয় রকমের তুঙ্গে। কিন্তু বোর্হেসের ব্যক্তিজীবনে মিথ্যার ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না। নরম্যান, সাহিত্যে মিথ্যার অনন্য-রূপকার বোর্হেসের ব্যক্তিজীবনের কিছু মিথ্যার নমুনা তুলে ধরেছেন এই বইয়ে:

বোর্হেসের হীনতম খুঁতগুলোর একটি হচ্ছে তার মিথ্যা ব্যবহারের ধরন। তার মিথ্যাগুলো সচরাচর যথেষ্ট ক্ষুদ্রাকারে শুরু হতো যা উপক্ষো করার মতোই। কিন্তু সেগুলোকে যখন একদম উল্টে ফেলেন তখন সেগুলো ক্ষুদ্রাকার থেকে বাড়তে শুরু করে এবং মাথার মধ্যে সেগুলোকে তিনি অলংকৃত করে তোলেন। La calunnia e’un verticello, রোসসিনির সেবিইয়ের নরসুন্দরের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। কারণ তিনি ছিলেন বোর্হেস, বিশেষ ক্যারিশমাসম্পন্ন এবং স্বীকৃত লেখক, ফলে তার মিথ্যাগুলোকে আপনাআপনিই এবং সর্বজনীনভাবেই বিশ্বাস করা হবে। (পৃ: ২৫৩)

নরম্যান সুনির্দিষ্ট কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন:
তার নিজের করা বেশ কিছু অনুবাদ সম্পর্কে তিনি জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন। তার আত্মজীবনীতে তিনি দাবী করেছেন “তার মা মেলভিল, ভার্জিনিয়া উলফ এবং ফকনারের কিছু অনুবাদ করেছেন যেগুলো আমার বলে বিবেচনা করা হয়।” এটা কি সত্যি নাকি সম্ভাব্য সমালোচনা থেকে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন তিনি? সমকালীন মার্কিনী সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত ১৯৪৪ সালের ‘সুর’ (Sur) পত্রিকার একটি সংখ্যা তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। এই সংখ্যাটিতে তিনি বিয়ই (কাসারেস)-এর সাথে যৌথভাবে অনুবাদ করেছিলেন জন পেল বিশপ, ই ই কামিংস, হার্ট ক্রেন, ওয়ালেস স্টেভেনস এবং আরও কয়েকজনের কবিতা, কিন্তু উনি আমাকে বললেন, এই অনুবাদগুলোকে কঠোরভাবে বিচার করতে যেও না কারণ ওগুলো আসলে সব বিয়ইয়ের করা। ফকনারের wild palms- এর তিনি অনুবাদ করেছেন কি করেননি তার উল্লেখ ছাড়াই আর্হেন্তিনায় এটি আকশচুম্বী প্রশংসা পেয়েছিল। এটা সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে এটি এতই ভালো, বা এমনকি মূলের চেয়েও ভালো।

বোর্হেসের স্ববিরোধিতা

বোর্হেসের আরও একটি দিকের প্রতি আলো ফেলেছেন নরম্যান, সেটি তার স্ববিরোধিতা। একদিনের ঘটনা উল্লেখ করে নরম্যান বলছেন:
তিনি (বোর্হেস) ড্রাইভারের পাশের আসনে বসা। আমি ছিলাম পেছনের আসনে এক তরুণের পাশে যিনি ঘটনাক্রমে বললেন যে তার পিতামহ কলোম্বিয়ার নেতৃস্থানীয় আধুনিকতাবাদী কবি গিইয়ের্মো বালেন্সিয়া। কয়েক সপ্তা আগে আমি বোর্হেসের কাছে এই কবি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম এবং তিনি সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে বললেন যে তার সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। এখন, হঠাৎ করে পেছনের আসনে বসে তাদের কথাবার্তা আড়িপেতে শুনতে গিয়ে দেখছি ঐ লোকের পিতামহের বিখ্যাত কবিতাগুলোর একটি বোর্হেস আবৃত্তি করতে শুরু করেছেন। আমি এর কোনো তল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এই অদ্ভুত স্ববিরোধিতার কোনো ব্যাখ্যা আমি তার কাছে কখনো জানতে চাইনি। (পৃ: ৫৫-৫৬)
১৯৬৭ সালে প্যারিস থেকে বেরিয়েছিল বোর্হেসের পুস্তকদীর্ঘ একটি গ্রন্থ Entretien avec Jorge Luis Borges, সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ফরাসী লেখক জঁ দ্য মিলেরে। তিনি দীর্ঘদিন বুয়েনোস আইরেসে ছিলেন। পরে এই বইটি স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়ে উৎসভূমিতে ফিরে আসে। বুয়েনোস আইরেসে অনূদিত হয়ে বেরোনোর পর মিলেরে একদিন বোর্হেসের সাথে দেখা করতে এলেন। বোর্হেসের সচিব এসে জানালেন যে ভদ্রলোক তার সাথে দেখা করতে চায়। কিন্তু তিনি দেখা করা দূরের কথা, ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন,
“আমি তাকে দেখতে চাই না; তাকে চলে যেতে বল।” উনি একটু শান্ত হয়ে এলে আমি তাকে বললাম, ব্যাপারটা কি বলুন তো? আপনি কি ওনার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বইটি করেননি?
‘হ্যাঁ’, বোর্হেস জবাব দিলেন।
‘তাহলে?’
‘আমার পরিবার সম্পর্কে অপ্রিয় কিছু কথা সে আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছে’, বোর্হেস উত্তর দিলেন।
‘আপনাকে দিয়ে বলিয়েছে । কথাগুলো আপনি বলেছেন কিনা?’ বোর্হেস কাঁচুমাচু হয়ে গেলেন।
‘ হ্যাঁ, কিন্তু আমি ভাবিনি যে বইটা বুয়েনোস আইরেসে ফিরে আসবে।’

(পৃ: ১৫২-১৫৩)

অকৃতজ্ঞ বোর্হেস

11.jpg
বাদিক থেকে: হোসেফিনা দোরাদা, আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো এবং বোর্হেস। মার দেল প্লাতা, ১৭ মার্চ ১৯৩৫ সাল। ছবি: বিয়ই কাসারেসের Borges গ্রন্থ থেকে নেয়া।

বোর্হেসকে নিয়ে ২০০৬ সালে প্রকাশিত আদোল্ফো বিয়ই কাসারেসের ১৬৬৪ পৃষ্ঠার যে-বিশাল দিনপঞ্জীটি বেরিয়েছিল তাতে পাঠক হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন বোর্হেস প্রায় নিয়মিত অথিতি ছিলেন আদোল্ফো-দম্পতির। প্রায় প্রতিদিনই খানাপিনা আর আড্ডা ছিল অবধারিত। আর আড্ডা শেষে গাড়িতে করে বোর্হেসকে তার বাসায় পৌঁছে দেয়া। যারা জানেন না কেবল তাদের অবগতির জন্য বলি, সিলবিনা(ওকাম্পো) ছিলেন আদোল্ফোর স্ত্রী, অর্থাৎ বিক্তোরিয়ার ছোট বোন। বোর্হেস ছিলেন তাদের প্রায় পারিবারিক বন্ধু। ওকাম্পো-পরিবারের সাথে বোর্হেস-পরিবারের সম্পর্ক একেবারে বোর্হেসের যৌবনেই শুরু হয়েছিল। যদি বলি আদোল্ফো-দম্পতির দ্বারাই লালিত পালিত হয়েছেন প্রবীণ বোর্হেস, তাহলে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। বিক্তোরিয়া বোর্হেসকে তার যৌবনের শুরু থেকেই চেনেন। Sur-এর এক সাধারণ সংখ্যায়(১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) যৌবনের এই বোর্হেসকে নিয়ে স্মৃতিচারণাও করেছিলেন তিনি: “বোর্হেসকে চিনি প্রায় ৩৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে। রিকার্দো গুইরালদেস আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।”( Conoci a Borges hace la friolera de 35 años o mas. Me lo presento Ricardo Guiraldes. Saludo a Borges, P-76)। তিনি ছিলেন বোর্হেসের প্রতি চিরউদার, দুঃসময়ের সহায়। বোর্হেস নিজেই একথা স্বীকার করেছিলেন বিক্তোরিয়াকে নিয়ে তার মরণোত্তর এক শ্রদ্ধাজ্ঞাপক বক্তৃতায়:
বিক্তোরিয়ার স্মৃতি আমাকে সব সময় সঙ্গ দেবে। আমি তখন কেউ না, বুয়েনোস আইরেসে আমি তখন এক অপরিচিত যুবক, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো Sur প্রতিষ্ঠা করলেন, আমাকে যা বিস্মিত করেছিল তাহলো, আমাকে তিনি এর সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেন। সেই সময় আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। লোকজন আমাকে হোর্হে লুইস বোর্হেস হিসেবে দেখতো না, দেখতো লেওনোর আসেবেদোর ছেলে হিসেবে, দেখতো ড. বোর্হেস (পিতা)-এর ছেলে হিসেবে, কর্নেল(বোর্হেস)-এর নাতী হিসেবে ইত্যাদি। কিন্তু তিনি আমাকে দেখতেন আলাদা করে, যখন কিনা আমি প্রায় কেউ না।
(Borges en sur-1931-1980, Jorge Luis Borges, Emece, 1999, p-329)
নরম্যানের সাক্ষ্য থেকেও জানা যাচ্ছে পরোপকারী এই বিদুষী নারীর অভিন্ন চিত্র:
অন্তত তার (বোর্হেসের) প্রথম দিককার চোখের এক অপারেশনের জন্য ব্যয়ভার বহন এবং জাতীয় গ্রন্থগারে তার পরিচালকের পদটি নিশ্চিত করার জন্যে মুদ্রিত পৃষ্ঠায় বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর প্রশংসা করেছেন এবং ধন্যবাদ জানিয়েছেন বোর্হেস।
(পৃ: ২৪৭-২৪৮)

কিন্তু বোর্হেস, তার গল্পের মতোই এক জটিল গতির অনুগামী ছিলেন, সে গতি, তার ‘প্ররোহী পথের বাগান’(The Garden of forking paths)-এর মতোই পরস্পরবিরোধী বুনন ও চরিত্রে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। নরম্যানের তীক্ষ্ম দৃষ্টি আর গোয়েন্দাসুলভ পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় বোর্হেস আপাতভাবে যতই বিনয়ী আর কৃতজ্ঞবোধের পরিচয় দিন না কেন অতলে রয়েছে এক কৃতঘ্নের গোপন আয়ুধ যা অলক্ষ্যে ঝলসে ওঠে নিমকের তোয়াক্কা ছাড়াই:
যদিও তিনি (বোর্হেস) তার (বিক্তোরিয়া) অজ্ঞাতে তাকে খাটো করার কোনো সুযোগই হাত ছাড়া করেন না। হায়, এক সময় যিনি তার প্রবল শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন প্রথমে তাকে উজ্জ্বল করা এবং পরে তাকে ছুঁড়ে ফেলার এক ক্ষমাহীন নিখুঁত স্বভাব ছিল বোর্হেসের। তার খ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কাজটি তিনি করেছেন সেই সব লেখকদের সঙ্গেও যাদেরকে তিনি আকাশচুম্বী গৌরবে ভূষিত করেছেন, যেমন রিকার্দো গুইরালদেস, মাসেদোনিও ফের্নান্দেস, এবারিস্তো কাররিয়েগো, মিগেল দে উনামুনো।
(পৃ: ২৪৮)
নরম্যানের এই কথার অনুুকূলে আমাদের মনে পড়বে পল থরোর সাথে বোর্হেসের সেই সাক্ষাতের নমুনা যেখানে বিক্তোরিয়া ওকাম্পো সম্পর্কে একই রকম অমর্যাদাকর উক্তি করেছিলেন:
লক্ষ্য করলাম তিনি(বোর্হেস) স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। তিনি বললেন ‘রবীন্দ্রনাথ বুয়েনোস আইরেসে এসেছিলেন।’

‘এটা কি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরের ঘটনা?’

অবশ্যই তাই। পুরস্কার পাওয়ার আগে বিক্তোরিয়া ওকাম্পো তাঁকে দাওয়াত করবেন–এটা আমি কল্পনাই করতে পারি না। হা হা করে হাসলেন তিনি। ‘আর আমরা ঝগড়া করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ এবং আমি।’

( Old Patagonian Express, Marinar books, 1979, p-317)

12.jpg
বাদিক থেকে: বোর্হেস, বোর্হেসের সচিব ও সহলেখিকা মারিয়া এসতের বাসকেস, সিলবিনা ওকাম্পো, সেসিলিয়া বোলদারিন, আদোল্ফো বিয়ই কাসারেস এবং মার্তা বিয়ই। মার দেল প্লাতা, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ সাল। ছবি: বিয়ই কাসারেসের Borges গ্রন্থ থেকে নেয়া।

বোর্হেস এই দ্বিমুখী আচরণ কেবল এদের সঙ্গেই নয়, এমনকি বিক্তোরিয়ার বোন সিলবিনার সাথেও করেছেন যিনি বোর্হেসের প্রতি ছিলেন যত্মশীলা, উদার ও সংবেদনশীল। কিন্তু এই সিলবিনাকেও তিনি ছাড় দেননি কৃতঘ্নতার ছোবল থেকে:
বিয়ই-এর চেয়ে ১১ বছরের বড় সিলবিনা ছিলেন তার(বোর্হেসের) চেয়ে বয়ঃকনিষ্ঠ কিন্তু বোর্হেসের পরিচিত এক দল লেখকের কাছে তিনি ছিলেন প্রীতিভাজন। জর্জি বিশ্বাস করতেন এই তরুণ প্রজন্মের সবাই ছিল কমুনিস্ট আর সিলবিনা এদের মন জোগাবার চেষ্টা করতেন যদি কখনো হঠাৎ কোনো বিপ্লব ঘটে যায়। বোর্হেস তার অদ্ভুত আসক্তির বাইরে ছিলেন না। সিলবিনার কিছু ব্যাপার কখনো কখনো বোর্হেসকে বিরক্ত করেছিল এবং যা তাকে সিলবিনা সম্পর্কে যাচ্ছেতাই মন্তব্যে উদ্ধুদ্ধ করেছে। এই ধরনের একটি ক্রুদ্ধ মন্তব্য ছিল এই যে সিলবিনার পরিবার নাকি ইহুদী। সিলবিনার গল্পের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা ছিল না এবং তার কবিতাগুলোর ছন্দবিন্যাস নিয়েও করতেন তামাশা।
(পৃ: ৯৪)

অথচ এই সিলবিনাকে নিয়েই ১৯৪৩ সালে Sur পত্রিকার ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় (Num-101) বোর্হেস তার `Silvina Ocampo, Enumeracion de la Patria’ প্রবন্ধে ছন্দপতনের কোনো ইঙ্গিততো নয়ই বরং বললেন, যে “Si alguna vez ha intercalado su nombre en el endecasilabo, lo ha hecho para ensayar un efecto retorico ge los persas y de algunos occidentales: Browning, Herrick, Ben Johnson, Ronsard, Virgilio…”(Borges en Sur, Jorge Luis Borges, Emece, Argentina, 1999, P-258). এমন কি কবিতায় সিলবিনার যে অর্জন সে সম্পর্কে কবি বোর্হেস ইঙ্গিত করে বলেন যে একই কাজ করেছেন পারস্যের কবিকুল এবং পাশ্চাত্যের কয়েকজন যাদের মধ্যে আছেন ব্রাউনিং, বেন জনসন, হেরিক, রঁসার এবং ভার্জিল।
আরও পরে যখন সিলবিনার Sueño de Leopoldina গল্পের বইটি বের হলো সেখানে বোর্হেস লিখলেন এক নীতির্দীঘ ভূমিকা যাতে বলা বাহুল্য, নিন্দা নয়, প্রসংশাই ছিল। তিনি লিখলেন:
“Silvina Ocampo is a poet, one of the greatest poets in the Spanish language, whether on this side of on the other. The fact that she is a poet elevates her prose. In the other parts of South America, the story is usually on more than a simple sketch of daily life or a simple social protest, or often an unhappy mixture of the two; among us in Argentina, it tends to be the product of an imagination granted the fullest freedom. The book i am introducing is a clear example of this.” ( Silvina Ocampo, Leopoldina’s Dream, translated by Daniel Balderston, Penguin, 1988, p-viii)
অর্থাৎ, সিলবিনা স্প্যানিশ ভাষায় মহত্তম কবিদের একজনতো বটেই, গল্পকার হিসেবেও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকাশ্যে প্রস্রাব

২০০৮ সালে নরম্যানের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে এই গ্রন্থের কিছু কিছু ঘটনার কথা তিনি ঢাকার আড্ডায় আমাদের দুএকজনকে জানিয়েছিলেন। সেখানে অবশ্য ঘটনার এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তাতে ছিল না, কিন্তু এই গ্রন্থে সে ব্যাপারটি তিনি চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যমান করে তুলেছেন আখ্যান্যসুলভ দক্ষতায়।
এইসব মনোরম রাস্তায় এক বিকেলে বোর্হেসের মূত্রাশয়ে এক বিপত্তি ঘটে গেল। তৎক্ষণাৎ আমার বাহুতে তার মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের চাপ আরও শক্ত হয়ে উঠলো আর তার চেহারায় আতংকটা দেখে আমি সেটা বুঝতে পারলাম। কোনো কিছু ধরে রাখার চেষ্টায় ঠোঁট চেপে আছেন তিনি। একটা বার (Bar)-এর খোঁজে আমি এদিক-সেদিক তাকিয়ে শেষে একটা খুঁজে পেলাম। “আমি ধরে রাখতে পারবো না”, বললেন তিনি। “একটু অপেক্ষা করুন, কাছেই এসে গেছি।”
বুয়েনোস আইরেসের `বার’-এর টয়লেটগুলো মূলত ভেতরে পেছন দিকে থাকে। সেখানে যাওয়ার রাস্তাটা বেশ অপ্রশস্থ। তার পড়নে ছিল ধুসর রংয়ের Tweed স্যুট। তিনি যখন দ্রুত গতিতে এগুচ্ছিলেন তখন বার-এর লোকজন তার পথ ছেড়ে এক পাশে সরে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্যান্টের ভিতরে তার দুই পা বেয়ে তীব্র বেগে প্রস্রাব নেমে এসে তার জুতোর দুই পাশে পচপচ করছে। তিনি প্রস্রাব করার জন্য রওয়ানা হয়েছিলেন, কিন্তু ইতিমধ্যে জুতা, মোজা আর প্যান্ট প্রস্রাবে ভিজে গেছে।
আমরা রাস্তায় উঠে এসে বললাম, “আপনার কাপড় পাল্টানোর জন্য আমরা বরং বাসায় ফিরে যাই।”
“না, আমরা এগুতে থাকি,” তিনি বললেন, “এটা নিছকই এক ইল্যুশন(দৃষ্টিবিভ্রম)।”

(পৃ-১৪৮-১৪৯)

borges-and-elsa.jpg
বোর্হেস ও এলসা। ছবি : নেট থেকে নেয়া।

শুরুতেই বলেছিলাম যে এই বইয়ের কেন্দ্রিয় চরিত্র আসলে বোর্হেসের স্ত্রী এলসা। সেটা হওয়ার কারণ যেহেতু এই বইয়ের ঘটনাকাল বোর্হেসের সঙ্গে নরম্যানের পরিচয়ের থেকে শুরু করে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে নরম্যান স্বদেশে ফিরে আসার আগেই অবশ্য বোর্হেসের সঙ্গে তার স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। আর এই বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য–আশ্চর্য এই যে–দায়ী করা হয়েছে অন্য কাউকে নয়, বরং তৃতীয় পুরুষ হিসেবে নরম্যানকেই। মহিলাদের একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে এলসা নরম্যানের প্রতি অভিযোগ তুলে বলেছিলেন:
আমি মনে করি নরম্যান টমাস ডি জিওভান্নির প্রভাব… আমাদের বিয়ের ক্ষতি করে থাকতে পারে। বোর্হেসের উপর সে সব সময়ই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতো। সে কোনো সমবেদনা জানায়নি। ডি জিওভান্নি আদালতে জর্জিকে সঙ্গ দিয়েছে, এবং সে-ই আসলে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
(পৃ: ২৫৮)

এক অর্থে এলসার এই উক্তির মধ্যে সত্য আছে অনেকটাই। এই সত্যের মূল ভিত্তি বোর্হেস ও এলসার পরস্পরবিমুখ দুই বৈশিষ্ট যার ইঙ্গিত আমি এই লেখাটির শুরুতেই দিয়েছি। এখানে আরেকটু বিশদ করার জন্য শুধু বলবো যে তাদের বিয়ে কোনো অর্থেই পারস্পরিক আকর্ষণের ভিত্তিতে হয়নি, তাছাড়া এলসার কাছে বোর্হেসের মূল্য ছিল বোর্হেসের সাহিত্যের কারণে নয় মোটেই, বরং সাহিত্য থেকে অর্থাগমের কারণে। ফলে এলসার অর্থগৃধ্নু স্বভাবের সাথে বোর্হেসের কোনোভাবেই মানসিক বন্ধন তৈরি হওয়ার কথা নয়। এর ফলে যা হবার তা-ই হয়েছে: বিবাহবিচ্ছেদ। তবে নরম্যানের কারণে এটি হয়তো তরান্বিত হয়েছে এই অর্থে যে যৌথভাবে অনুবাদের কারণে নরম্যান বোর্হেসকে অনেক বেশি সময় পেতেন, ফলে ইর্ষা বোধ করতেন এলসা, ভাবতেন বোর্হেস সর্বাধিক সময় নরম্যানের নিয়ন্ত্রণে। সম্ভবত এটাই এলসার সাথে বোর্হেসের সম্পর্ককে শিথিল করে তোলে। এবং এই শৈথিল্যকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে নানা রকম তিক্ত ও অপ্রীতিকর ঘটনা। সেই সব ঘটনার কিছু কিছু এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

বিখ্যাত রকফেলার পরিবারের আমন্ত্রণে এলসাসহ বোর্হেস এসেছেন ফিফ্থ এভিন্যুর ফ্লাটে নৈশভোজে। বোর্হেস-দম্পতি ছাড়াও গণমান্য আরও বেশ কয়েকজন আছেন। আছেন বোর্হেসের প্রায় সার্বক্ষণিক সঙ্গী বন্ধু নরম্যানও। রুচিশীল, একই সঙ্গে বিপুল বিত্তের অধিকারী রকফেলার পরিবারের বৈভবে এলসার মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগার। সম্মানিত দ্ইু অতিথিকে তারা ঘরের মধ্যে নিয়ে গেলেন। রোডম্যান রকফেলার তার ফ্ল্যাট দেখার আমন্ত্রণ জানালে এলসার কাছে মনে হলো তার স্বপ্ন যেন সত্যি হতে যাচ্ছে। রকফেলার দম্পতির শোবার ঘরে ঢোকার পর এলসার কৌতূহল ও কথাবার্তার নমুনা নরম্যান দিয়েছেন সংলাপধর্মী গল্পের ভঙ্গিতে:
‘আর এটা কী মিস রকফেলার’,
‘এটা সিল্কের, মিস বোর্হেস’,
আবারও। ‘আর এটা কী মিস রকফেলার’,
‘এটা উলের তৈরি, মিস বোর্হেস।’
এলসা যখন ছবি তুলছেন তখন মিস রকফেলারের আরেক অতিথি এসে হাজির টয়লেট ব্যবহারের জন্য।
মিস রকফেলার নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করলেন।
‘আর এটা, মিস রকফেলার?’ এলসার অনুসন্ধান অব্যাহত। তিনি উত্তর দিলেন এলসাকে।
‘আর এটা কী, মিস রকফেলার?’ পরের সুযোগে আবারও জিজ্ঞেস করলেন।
তিনি উত্তর দিলেন।
একের পর এক এভাবে চলছিল। এলসা কোনো কিছু দেখিয়ে জানতে চাইছে, রোডম্যান রকফেলার ব্যাখ্যা করছেন। প্রত্যেকবার সে যা দেখাচ্ছে, আমি যদি বুঝিয়ে বলতে পারি, তাহলে সেটা পেইন্টিং, ড্রয়িং, ট্যাপেস্ট্রি, বা কোনো ধরনের শিল্পকর্মকে দেখাচ্ছে না। টয়লেটে ঢুকে সে দেখাচ্ছে সাবানের পাত্র, হাত মোছার তোয়ালে। এসব দেখে সে অভিভূত। সেইখানে তার পিছু পিছু আমি নিঃশ্বাস চেপে রেখে, লজ্জায় সহস্রবার মরে অনুসরণ করে যাচ্ছি। অন্য সবাই তাকে না-দেখার প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

(পৃ: ১৩৯)
শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উচ্চতর আলাপের এই ঘরোয়া সম্মেলনে রুচিশীল মানুষদের কাছে এলসা কিভাবে বিবেচিত হয়েছিলেন তার একেবারে খোলামেলা বর্ণনা পাওয়া যাবে এখানে:
পার্টির এর একজন, যার সাথে সবেমাত্র পরিচয় হয়েছে, আমার দিকে ঝুঁকে বললেন, “এই নিম্ন প্রজাতির শুকরীটা তিনি (বোর্হেস) কোত্থেকে জোগার করেছেন?”
এলসা যেভাবে নিম্নরুচির একজন হিসেবে নিজেকে লক্ষনীয় করে তুলেছিল তাতে আমি যতটা না দুঃখ পেয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছি এই লোকটির মন্তব্যে।

(পৃ: ১৪০)
এলসার ছোটলোকী অরুচি, ক্ষুদ্রতা, চৌর্য্যাঁধি(kleptomania)সহ নানান বিষয় ও ঘটনা ছড়িয়ে আছে এই গ্রন্থের অলিগতিতে ও বিভিন্ন বাঁকে।
বোর্হেস ও এলসা যখন আমেরিকা সফরে গিয়েছিলেন আমন্ত্রিত হয়ে তখন বুয়েনোস আইরেস ফেরার পথে এলসা ভুলে তার পশমী কোটটি ফেলে আসেন। সেই কোট উদ্ধারে রীতিমত অধ্যাপক ও রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। অনেকেই এই উদ্ধারের বিরক্তি ও অরুচিকে নিরবে সহ্য করে গেছেন নিছক বোর্হেসের স্ত্রী বলে। এই পশমী কোটটি নিখোঁজের পেছনে এলসা তার যুক্তিবোধ ও অসৌজন্যের সমস্ত সীমাকে অতিক্রম করেছিলেন। এও বলেছেন বোর্হেসকে যে নরম্যানই এটি হাতিয়ে নিয়েছেন। অবশেষে বহু পথ ঘুরে এই গৃহহীন (Houseless Nutria) পশমী কোটটি এলসা যখন ফিরে পেলেন তখন এলসার তৃপ্তির বর্ণনা দিয়েছেন নরম্যান এভাবে:
সুতরাং এলসা তার চামড়া(র কোট) ফিরে পেয়েছে, তার বহুদিনের দীর্ঘ বিলাপ তৃপ্তিকর এক উপসংহারে এসে পৌঁছুলো, চুরির অভিযোগ থেকে কি আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে? না।
(পৃ: ১৬০)
এরপরই, নরম্যানের ঘৃণা ও কৌতুক মেশানো মন্তব্যটা এলসার চরিত্রকে পরিপূর্ণ মাত্রায় স্পষ্ট করে তোলে এই কারণে যে এই কোট নিয়ে কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি, “Best let sleeping dogs, or in this case bitches, lie.”

অন্যত্র নরম্যান জানিয়েছেন যে যতবারই এলসা ভ্যান ডেলস্ নামের এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতে যেতেন, প্রত্যেকবার ছোটখাট এক ভাণ্ডার লোপাট করতেন। এলসা যদিও দুবার বিয়ে করেছেন, ছিল এক সন্তানও, কিন্তু নিজে গোপনে রক্ষা করেছিলেন সমকামিতার সম্পর্ক, ওলগা নামের তারই এক জ্ঞাতি বোনের সাথে।
এই বইয়ের সবচেয়ে মজার অংশ বুয়েনোস আইরেস থেকে এলসার ভয়ে ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে পার্দোর কাছে রিঙ্কন বিয়েহোতে বোর্হেসের পালিয়ে যাওয়া। নরম্যান গোয়েন্দা ঔপন্যাসিকের মতো কেবল এই অংশটুকুই নয়, গোটা বইটিকেই কৌতূহল ও ক্লুসমূহের অপূর্ব বিন্যাসে এটাকে পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের এক জীবনী করে তুলেছেন।

face-down-to-light3246.JPG
২০০৮ সালে ঢাকার হোটেল র‌্যাডিশনে নরম্যান। ছবি: রাজু আলাউদ্দিন

বিশ্বসাহিত্যে প্রথম সারির অনুবাদক হিসেবে তার খ্যাতি বিস্তৃত হওয়ায় তাঁর গদ্যশৈলীর অনন্যতা নিয়ে আলোচনা প্রায় হয়নি। কিন্তু যে-কেউ একটু মনোযোগ দিলেই লক্ষ্য করবেন নরম্যানের গদ্যে রয়েছে ভাষা ও ভাবনা বুননের ক্ষেত্রে নিপুন দক্ষতা। গরমের মৌসুমে বুয়েনোস আইরেসে অসহ্য গরম। এই সময়ের একটি বর্ণনা দিচ্ছেন নরম্যান: এই সময় শহরে সবাই স্যুট টাই পড়তো। না পড়লে সেটা হতো এক সামাজিক আত্মহত্যা। কিন্তু স্যুট-টাই পড়াটাও আত্মহত্যার এক ধরন। রাস্তায় বা বাসে সবাই গলে যাচ্ছে এবং যে-কেউ তার গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে ঘামে জবজবে অবস্থায়।
(পৃ:৮৬)

তার গদ্যের সুষমার অন্য এক উদাহরণ। এলসা থেকে বোর্হেসকে উদ্ধারের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন অনেকেই, এদের মধ্যে উগো সান্তিয়াগোও ছিলেন। তার যোগদানকে নরম্যান বর্ণনা করেছেন এভাবে: বোর্হেসকে মুক্ত করার ষড়যন্ত্রে উগো হয়ে উঠলেন মহান মূল ষড়যন্ত্রকারী। (পৃ: ২০৫)

নরম্যানের গদ্যভঙ্গী আপাতভাবে শীতল মনে হলেও, বিন্যাসের সৌকর্য আর মাঝেমাঝে অনুভূতির আলংকারিক উন্মোচন আমাদের হৃদয়কে উঞ্চ ও স্পন্দিত করে তোলে। যত্ন, নিষ্ঠা ও মননের পুষ্টিতে এই গদ্য অর্জন করেছে এমন এক বিরল সুষমা যা অনুবাদক বা সমালোচকেই কেবল নয়, কথাসাহিত্যিকদের মধ্যেও ইর্ষা জাগিয়ে তুলতে পারে।
বর্ণনায় নিরুচ্ছ্বাস পরিমিতি গুণ, গদ্যের স্বচ্ছ ও সাবলীল প্রবাহ এবং ঘটনার নাটকীয় বিন্যাস এই গ্রন্থকে স্মৃতিচারণ বা জীবনীর অধিক এক প্রসাদগুণে মণ্ডিত করেছে। এই গ্রন্থের শেষ হয়েছে এলসাকে খৃষ্টধর্মীয় সেই ধুলি ও ছাইয়ের(Dust to dust, ashes to ashes) মতো বিলুপ্তির শূণ্যতায় মিশিয়ে দিয়ে। কিন্তু এই শূণ্যতার মধ্যে রয়েছে অনুচ্চারিত বৈপরীত্যের এক বিষন্নতা। বৈপরীত্য এই জন্য যে তারই স্বামী ‘জর্জি’ বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে ক্রমসম্পসারণশীল এক ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে এলসা একমাত্র বৈধ স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, বোর্হেসের সবকিছু থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সংকুচিত, পুরোপুরি বিস্মৃত ও বিলুপ্ত। এই গ্রন্থের শেষ পৃষ্ঠায় নরম্যান তার বিলুপ্তির যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এরকম:
এলসা সম্পর্কে কী বলার থাকছে? কখন বা কোথায় কিংবা কোন পরিস্থিতিতে সে মারা গেছে আমরা তার কিছুই জানি না। জানি না কোথায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে। আমরা জানি তার আগেই তার ছেলে মারা গিয়েছিল। তার পরিবারের একজন–তার বোন আলিসিয়ার নাতনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে কেবল এটুকু জানা গেছে যে তাদের সঙ্গে বহুদিন থেকেই কোনো যোগাযোগ নেই। মনে হয় এলসা অজানা চিরন্তনে অজ্ঞাতসারে পিছলে পড়েছে। (পৃ: ২৫৯)

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (9) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন একরাম আলি — অক্টোবর ১৮, ২০১৫ @ ১:২৩ পূর্বাহ্ন

      বোর্হেস নামের চরিত্রটির জন্যে কষ্ট হয়। অক্ষমতাকে গোপন করা মানুষ স্বভাব থেকে অর্জন করে।
      দুর্ভাগা সেই লেখকটি– যিনি ছিলেন নপুংশক, স্ববিরোধী, মিথ্যাবাদী (কে নই?), কপট, জাতিবিদ্বেষে ভরপুর– তাঁকে আবার কাছের মানুষ বলে মনে হল।
      এবং শেষ পর্যন্ত এইসব দোষাবলীর জন্যে তিনি সেই পংক্তিতে চলে গেলেন, যেখানে আগেই দাঁড়িয়ে আছেন র‍্যাঁবো বা জাঁ জেনে!
      লেখককে ধন্যবাদ, এই লেখাটির জন্যে।

      একরাম আলি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তানভীর আকন্দ — অক্টোবর ১৮, ২০১৫ @ ২:৫৪ পূর্বাহ্ন

      ইন্টারনেট ঘেটে বইটি পাইনি, ফ্রি ভার্শন হয়তো পাওয়া যাবে না। বইটা পড়ার সুযোগ হলে ভাল হত। আপনার লেখা থেকে একটা ব্যাপার ঠিক বুঝলাম না, নপুংশক বলতে ঠিক কী বুঝানো হচ্ছে? যৌনক্রিয়ায় অক্ষম না ক্যাস্ট্রেটেড?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন razualauddin — অক্টোবর ১৮, ২০১৫ @ ২:৩৬ অপরাহ্ন

      জনাব তানভীর আকন্দ,
      নপুংসক বলতে ক্যাস্ট্রেটেড নয়, যৌনক্রিয়ায় অক্ষমতাকেই বুঝানো হয়েছে।
      ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rahima afrooz munni — অক্টোবর ১৮, ২০১৫ @ ৯:৩৯ অপরাহ্ন

      আইসবার্গটির ধাক্কায় সামান্য কাত হলাম…আমার অবশ্য ওনাকে সাধারণ মনে হচ্ছে না…সাধারণ্যে এত বৈচিত্র!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mostafa tofayel — অক্টোবর ১৮, ২০১৫ @ ১১:১৯ অপরাহ্ন

      Borges I knew not earlier. He is made known to me with this article. His private life, like the private life of British novelist Thomas Hardy,is of minor importance. A writers psyche is of major importance. As an essayist, Razu Alauddin is an authority apart, but this one would demand a bit more editing.The Bengali translation of forking path necessitates improvement. I would like to thank Razu Alauddin highly.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুহিত হাসান — অক্টোবর ১৯, ২০১৫ @ ৭:১৬ পূর্বাহ্ন

      প্রিয়জন রাজু আলাউদ্দিন বোর্হেস বিশারদ হিসেবে খ্যাতনামা। কিন্তু তাঁর বোর্হেস প্রীতি যে নিছক ভক্তির দ্বারে সমর্পিত নয়, বরং প্রিয় লেখকের গুণের পাশাপাশি তাঁর যাবতীয় দোষত্রুটি সম্পর্কেও যে তিনি অবগত থাকেন, (এবং সবচেয়ে বড় কথা যেটা, সেটা আবার এরকম নিপুণ গদ্যে আমাদের জানানও) এতে লেখক-সমালোচক হিসেবে তাঁর খোলা মনের ও দৃষ্টিভঙ্গির উদারতার পরিচয় মেলে। এমনটা এই বঙ্গদেশে খুব একটা সুলভ নয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prokash — অক্টোবর ২০, ২০১৫ @ ৬:৪৮ পূর্বাহ্ন

      বোরহেসের এ পিঠটি একদম অনালোকিত, অন্তত বাংলাভাষায়। এমন করে নিমোর্হ কথাসূত্রে বোর্হেস সাহেবের জীবনযাপনের ধরণ ধারণ, চিন্তা, কর্ম, বিভিন্ন বিষয়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আর বিভিন্ন লেখক, শিল্পীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার বিষয় এসেছে রাজু আলাউদ্দিনের লেখাটিতে যা সত্যই ব্যতিক্রমী। এ লেখাটি আমাদের পাঠকদের ইলিউশন কাটিয়ে রিয়্যালিটিতে নিয়ে যাচ্ছে। রক্তমাংসের একজন বোর্হেস আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন। এই দলিল আমাদের খুব কাজে লাগবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বপ্নসতী — নভেম্বর ১, ২০১৫ @ ১২:৫৮ অপরাহ্ন

      রিভিউ পড়ে দি জিওভানি’র বইটাকে মোটেও বস্তুনিষ্ঠ মনে হয়নি।

      The writing is scarcely distinguished (‘Borges opened up like a sun-kissed blossom’). Di Giovanni’s impulse to belittle Borges at every turn is presumably vengeance for his high-handed treatment (as he sees it) by the writer’s estate. Jorge Luis Borges, a strange and lonely prospector in the universe of words, can survive the sour- grapes scrutiny.
      তথ্যসূত্র – http://new.spectator.co.uk/2014/05/the-very-odd-couple/

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলমগীর হক — অক্টোবর ৩০, ২০১৬ @ ১২:৪২ অপরাহ্ন

      আমি ভাবিনি যে রাজু বোরহেসের ব্যাক্তি চরিত্র্য নিয়ে এমন নির্মম হবে ! আসুন এখন আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক জলাশয় থেকে আমাদের দেশজ আধুনিক কবি সাহিত্যিকদেরও মুক্তমনে দেখার চেস্টা করি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com