জাতিসত্তার মানবিক প্রকাশ কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা

হামিদ রায়হান | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:৫০ অপরাহ্ন

border=0১.
কবি-সমালোচক বুদ্ধদেব বসু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত’র ‘অর্কেস্ট্রা’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনার সূত্রপাতেই একটি কথা লিখেছিলেন, যা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য ও উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছিলেন: কবিদের মধ্যে দুটো জাত আছে: যারা ঝোঁকের মাথায় লেখেন আর যারা ভেবে-চিন্তে লেখেন। … সুধীন্দ্রনাথকে প্রথম দলে না ফেলে দ্বিতীয় দলে ফেলবো।
[কালের পুতুল]
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্পর্কে আমরা এমন কথার একটা সমান্তরাল প্রতিধ্বনি তাঁর কবিতা পাঠ করলে উপলব্ধি করতে পারি। তাঁর কবিতায় আছে দীপ্তির মনন, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যুক্তির কল্পনাময় প্রতীক ও প্রতিমার রহস্যময় ভাষণ এবং বহুমাত্রিক দ্যোতনার বিস্তৃত অন্বেষণ। আর এ অন্বেষণ একজন কবিকে একটি যৌগ মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যায় একটি প্রোজ্জ্বল রৌদ্রময় পৃথিবীর দিকে, যে পৃথিবীর স্বপ্নের পেছনে যার অগ্রণী ভূমিকা, যেখানে কেবল হিরন্ময় যাপনের ইশারা।
অন্যদিকে মুহম্মদ নূরুল হুদার অধিকাংশ কবিতায় প্রাণি ও জড়, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান, মিথ ও প্রাসঙ্গিকতা, উপাখ্যান ও দর্শন, ঐতিহ্য ও পুরাতত্ত্ব, মহাজাগতিক বস্তু থেকে গাণিতিক প্রস্বর প্রভৃতির ব্যঞ্জনায় গড়ে তুলেছেন তাঁর কবিকৃতির ফিকশনাল ডাইমেনশন। আমাদের এ পারিপার্শ্বিক বিশ্বের মধ্যে নবায়ন করতে চেয়েছেন এ ভিন্ন মাত্রিকতায় নিজস্ব স্বপ্নবিশ্ব। তাই তাঁর কবিতায় রূপক, সাংকেতিকতা, আঙ্গিক, ভাষা, চিত্র ও দৃশ্যকল্প এক ভিন্নধর্মি মেটাফর তৈরি করেছে। এ ভিন্ন মেটাফর কবি হিসেবে তাঁর সময়ের থেকে তাঁকে আলাদাভাবে পৃথক করেছে যেমন তাঁর সময়ের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে।
মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রকৃত পক্ষে পরিশ্রমী কবি। শব্দ নির্বাচন, প্যারাডাইমিক শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে তিনি সবসময় চিন্তা-ভাবনা করেন, এর প্রতিফলন তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় কবিতা খুঁজে পাওয়া যায় ঠিকই, তবে মাঝে মধ্যে মনে হয় নির্মাণকেই তিনি প্রাধাণ্য দিয়েছেন বেশি। সৃষ্টি ও নির্মাণ–এই যুগ্মবৈপরীত্যকে গ্রাহ্য করলে, নির্মাণের স্বাক্ষর বেশি মাত্রায় পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। কবিতার লক্ষণ বা গুণ হিসেবে যেভাবে চিহ্ণিত, সেগুলোর ধারণাই তাঁকে নির্মাণের পথে নিয়ে গেছে। তবে নির্মাণের পথ বেয়ে কোনো কোনো সময় সৃষ্টির স্তরেও উঠে যান, এর স্বাক্ষর দেখি আমরা তাঁর কবিতায়–
১. “ এতো রাতে কে কড়া নাড়ো, কে?
ঘুমের ভেতর আমি শস্যপতনের শব্দ শুনি
কড়ানাড়া শুনি না।
… … … …
অন্তত এইভাবে তুমি জেনে নাও
আমার মা কিষাণী
অন্তত এইভাবে আমাকে জানতে চাও
আমি আর অনাবাদী নই।
[আমার মা কিষাণী, আমরা তামাটে জাতি, ১৯৮১]”

২.
সৃষ্টি প্রচলিত প্রথাবদ্ধ প্রতীক-শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বিশেষভাবে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতার ক্ষেত্রে এরকম একটি ধারণা প্রতিস্থাপন করা যায়; এর কারণ, তাঁর কবিতা মানসিক চৈতন্যের প্রকাশ। এই প্রকাশ নানা বিষয়, নানা উপকরণের সিনেকডোচি বা অখণ্ডতা নির্দেশ করে এবং অন্যদিকে এর অন্তর্ভুক্ত স্থান, কাল, পাত্র, ইতিহাস, দেশ, বোধ, চেতনা, ইত্যাদি। এসব উপাদান চূর্নিত হয়ে মিশে ঐতিহ্যিক টেক্সটকে জাগিয়ে তোলে কাব্যিক অনুসন্ধিৎসার বিমোচনে।
ক. “ বেড়ে ওঠো প্রদীপের পাশে হে মুখ, জরুরী মুখ।
জানালার পাশে রাত
তোমার গ্রীবার মতো নুয়ে আছে বলে
বাইরে শ্লোগান
বাইরে উদ্যত হাত, দুলছে কৃপাণ;
এখানে হাওয়ার রাত, চুলের প্রপাত।
… … … …
আজ রাতে তোমার এ মুখ
আমাকে বদলে দেবে, বদলাবে মানুষের বুক।
[জরুরী মুখ, শোণিতে সমুদ্রপাত, ১৯৭২]”

খ. “ যৌবন-ঘুঙুর হয়ে যায় বেজে যায়
ব্রক্ষান্ড্রের মত এক সমম্ভূ স্বপন–
সব স্মৃতি সব ধ্বনি একাঙ্গে পুষেছি
আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।
[আমরা তামাটে জাতি, আমরা তামাটে জাতি, ১৯৮১]”

উপরে উল্লিখিত কবিতাসব এর উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়। এসব কবিতার পঙক্তির ভাষা বিন্যাস, বিষয় উপকরণ, কাব্যবোধ, কল্পনা, চিত্রকল্প ও ঘটনার বিন্যাস শৈল্পিক দ্যোতনা, যা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। ঐতিহাসিক মূলচ্যুত মানুষের নতুন সৃষ্টিশীলতা এবং শঙ্কাপূর্ণ এই অন্ধকার সময়ে জাতিসত্তার চোরাবালি প্রতিযোগিতা, যা তাঁর কবিতার মধ্যে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রিক বৈচিত্র্যের ইমেজের বিশ্ব।

কিন্তু প্রশ্ন হলো; ভিন্ন টেক্সট ও গঠনশৈলি কিংবা ভিন্ন আন্তঃপ্রদেশিয় চিত্ররূপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে একাত্ম হয়ে নির্মাণ করেছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তাঁর কবিতার ভুবন। তবে, তাঁর কবিতার চারিত্র্য কী, যা তাঁর নির্মাণকে অর্থাৎ কবিতাকে নিয়ে গেছে হয়ে ওঠার দিকে। এক কথায় বলা যায়, সংহতি ও ঘনবদ্ধ, টেক্সটের স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ, সংশ্লেষণ প্রবণতা এবং সর্বোপরি বহুমাত্রিক দ্যোতনার উপস্থিতি, যা তাঁর কবিতার মধ্যে প্রতীয়মান দেখা যায়। কিন্তু এই সবের পেছনে, যা কাজ করছে তা হলো বৈদগ্ধ্য। তবে, এই বৈদগ্ধ্য স্থূল কিংবা খাটো চোখে দেখার কোনো অবকাশ নেই। অন্যভাবে বলা যায়, বৈদগ্ধ্য শব্দ এখানে আভিধানিক অর্থে ব্যবহার করা হয় নি। বৈদগ্ধ্য হলো এমন এক মেটাফর, যা তৈরি হয় ঐতিহ্য পেষণের আবেগের সঙ্গে আধুনিক মননের দ্বান্দ্বিক ঐক্যের মাধ্যমে।
এ বৈদগ্ধ্য উদ্ভূত হয়েছে প্রকৃতি থেকে, যা লোকসংস্কৃতির দ্বান্দ্বিক স্রোতের পরিশীলিত রূপ; আর, এই ঐতিহ্যের অধিকারী কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। তবে এটা সত্য যে, এই দ্বান্দ্বিক তাঁর সময়ের অধিকাংশ কবি স্রোত সম্বন্ধে যেমন সতর্ক নয়, তেমন সচেতন নয়। এ দ্বান্দ্বিক স্রোতের খণ্ডিত ও অর্ধাংশে পা দিয়েছে তাঁর সময়ের কবি । এর ফলে, অল্প সংখ্যক কবি সফল হয়েছেন, বাকি সবাইকে সফলতার চোরাবালির মধ্যে মুখ লুকাতে হয়েছে। ভিন্নভাবে বলা যায়, দ্বান্দ্বিকহীন তরল স্রোতের দিকে তিনি ভাসিয়েছেন তাঁর কাব্য তরী; আর এ কারণে, তাঁর কিছু কিছু কবিতার মধ্যে যূথবদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বিশেষভাবে দেখা যায়। যেমন আমরা দেখি , তাঁর কবিতা–
ক. “নাতাশা আমার বোন দূর রাশিয়া;
নাতাশা বাংলা শেখে, নাতাশা বাংলা জানে
ভাটির দেশের গান নাতাশার প্রাণে
সংগ্রামী বাংলার রূপ প্রিয় থীশ তার
সড়কি-বল্লম তার লাঠিয়ালী ভাষা
ভলগা-তীরের মেয়ে আমাকে শোনায়
… … … …
নাতাশার বাকবন্ধে প্রতীতি যোগায়
নাতাশা সবুজ বাংলা দূর রাশিয়ায়?
[নাতাশা, আমরা তামাটে জাতি, ১৯৮১]

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার মধ্যে বিশ্বায়নের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বর্ণিত কবিতাটির মধ্য দিয়ে। এই রকম চিহ্ণ তাঁর নির্মাণের প্রতীতি, যা প্রায় সব কবিতায় দেখা যায়। তবে, তাঁর নিজস্ব কথনভঙ্গি, নিজস্ব শব্দের নির্বাচন, যা এই বক্তব্যকে সমর্থন করে। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা নৃতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী নন। তবু, নৃতাত্ত্বিকতা তাঁর কবিতার দিগন্তকে সম্প্রসারিত করেছে । নৃতাত্ত্বিকতা কিংবা ঐতিহ্য ভাবনা আর যূথবদ্ধ সামাজিকায়ন যে শুধু বিষয়ের সঙ্গে নৈকট্য ঘটায়নি, একই সঙ্গে তাঁর কবিতার মধ্যে এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে, এবং অন্তরঙ্গ ও অতি ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে এক নৈর্ব্যক্তিকতার বোধ এনে দিয়েছে ।
এ নৈর্ব্যক্তিকতার স্বরূপ কী হয়, যা তাঁর পাঠককে একটি আন্তঃসম্পর্কের দ্বিমাত্রিকতার সঙ্গে একীভূত করে, একটি যাপিত সম্পর্কের মতো; একদিকে, তিনি যেমন তাঁর কবিতার সঙ্গে তাঁর পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন; অন্যদিকে, তেমনি তিনি একাত্ম করে নেন পরিচিত পৃথিবীর যাপিত সময়ের মধ্যে খণ্ডিত চেতনা । এ হেতু, যেমন একদিকে পাঠকরা উদ্বেলিত হয়ে থাকে তাঁর কবিতা দ্বারা; তেমনি অন্যদিকে পাঠকদের উৎসাহিত করে তোলে কবি এর প্রতি। এখানে, একটি ইতিবাচক দিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার, যা পাঠকদের দেখায় না শুধু; সেই সঙ্গে, জারিত করেছে তাঁর কবিতার আন্তঃসৌন্দর্যের প্রবহমাণতা।

“কবিতা অনেক রকম”–এই কথা লিখেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর কথাকে সম্বল করে নিজের কণ্ঠে বলা যায়, এর দ্বারা তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাবীন্দ্রিক অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে আসার কোনো না কোনো পথের খোঁজ। রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতার শেষ কথা নয়, এটা বুঝেছিলেন বাংলা কবিতার তিরিশের কবিরা ছাড়া অারও কেউ কেউ। সেই চেতনার ধারক যাটের প্রণিধানযোগ্য কবিদের মতো কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় এই গূঢ় ইঙ্গিতময়তা উপস্থিত। এ কারণে, তাঁর কবিতায় আমরা পাঠকরা দেখি ভিন্নতারও অন্বেষণ। যেমন, তাঁর কবিতার বই ‘আমি যদি জলদাস তুমি জলদাসী”-এর কবিতা ‘কাহিনী’তে আমরা দেখি-
“তারপর?
কখন যে সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেলে কি এক খেয়ালে,
আমরা স্থবির মূর্তি পাটকে হরপ্পার প্রাচীন দেয়াল”

এটা সত্যি যে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতায় মোটা দাগের সমাজসচেতনতা নেই; তবে, সমাজলগ্নতা রয়েছে। প্রেম ও রাজনীতিসর্বস্ব পদ্যকুহকের পিচ্ছিল পথে পা বাড়াননি তিনি। চোরাবালি পাশ কাটিয়ে তারা খুঁজেছে আত্মোন্মোচনের ভিন্ন পথ, যেখানে তারা খুঁজে কেবল অতল-ছোঁয়া সংবেদ, গভীরে প্রোথিত কিংবা সুদূর নক্ষত্রের আলোর মতো।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com