ঈদ: ধর্মীয় ও জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব

শামসুজ্জামান খান | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৯:৪৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে ঈদোৎসবের সাম্প্রতিক বিপুল বিস্তার ও গভীরতা আমাদের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের একটি নতুন চিত্রকে সামনে এনেছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, ঘুষ-দুর্নীতির বিস্তার, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, সন্ত্রাসের সঙ্গে রাজনীতির সখ্য, অশান্তি ও আবিলতার সৃষ্টি করেছে, তার ভেতর দিয়েও সমাজ এগোচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে নিরন্তর এবং এই পরিবর্তনের ধারার উৎস খুঁজতে হলে আমাদের ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গ্রামীণ এবং সদ্য গড়ে ওঠা খুবই সীমিত আকারের নগরজীবনকে অবলোকন করতে হবে। তাতে হয়তো একটা সমন্বিত লোকজীবন (synthesized) খুঁজে পাওয়া যাবে, কিছু বিরোধাত্মক উপাদান সত্ত্বেও। ময়মনসিংহ গীতিকা বিষয়ে অথরিটি চেক পণ্ডিত দুশান জবাভিতেলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন (Richard Eaton) যে মন্তব্য করেছেন তার সারবত্তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ময়মনসিংহ গীতিকার-গবেষক দুশান (তার বিখ্যাত গ্রন্থ Folk Ballads from Mymensing and the problems of their Authenticity 1963) ময়মনসিংহ গীতিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন : আধুনিক-পূর্বকালের (Pre-modern) ময়মনসিংহের গীতিকাগুলো : Neither the Products of Hindu or Muslim culture but of a single Bengali Folk culture-এই সূত্র ধরে ঐতিহাসিক ইটন সাহেব আধুনিক-পূর্ব বাংলাদেশের লোকধর্মকেও শাস্ত্রীয় ধর্মের তুল্যমূল্য বিবেচনা করেছেন। সেভাবে দেখলে পূর্ব-বাংলার গ্রামাঞ্চলের প্রচলিত ইসলামও ছিল লৌকিক ইসলাম- যাতে স্থানীয় আচার-সংস্কার বিশ্বাসের ছোপ লেগেছিল বেশ ভালোভাবেই। এই সমন্বয়ধর্মিতার নানা উপাদান (various syncritistic elements) বাংলার ইসলামকে বিশিষ্ট করেছিল।
ঈদোৎসব শাস্ত্রীয় ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে দ্বাদশ শতকের বাংলায় ইসলাম এলেও চার-পাঁচশত বছর ধরে শাস্ত্রীয় ইসলামের অনুপুঙ্খ অনুসরণ যে হয়েছিল তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেকালের বাংলায় ঈদোৎসবেও তেমন কোনো ঘটা লক্ষ করা যায় না। এর কারণ হয়তো দুটি : এক. গ্রাম-বাংলার মুসলমানরা ছিল দরিদ্র এবং দুই. মুসলমানের মধ্যে স্বতন্ত্র কমিউনিটির বোধ তখনো তেমন প্রবল হয়নি। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে একটা সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অবস্থাও তখনো সৃষ্টি হয়নি। আর এটা তো জানা কথাই যে সংহত সামাজিক ভিত্তি ছাড়া কোনো উৎসবই প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। বৃহৎ বাংলায় ঈদোৎসব তাই সপ্তদশ, অষ্টাদশ এমনকি ঊনবিংশ শতকেও তেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়।

নবাব-বাদশাহরা ঈদোৎসব করতেন, তবে তা সীমিত ছিল অভিজাত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে, সাধারণ মানুষের কাছে সামাজিক উৎসব হিসেবে ঈদের তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। তবে গোটা উনিশ শতক ধরে বাংলাদেশে যে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন চলে তার প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পড়েছে নগরজীবন ও গ্রামীণ অর্থবিত্তশালী বা শিক্ষিত সমাজের ওপর। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাও এই চেতনাকে শক্তিশালী করেছে। আর তাই এই অনুকূল পরিবেশেই ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এক শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতাকে কেন্দ্রে রেখে পরিচালিত বাংলাদেশ আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার যে নবরূপায়ণ ঘটেছে তাতে ঈদোৎসব রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর যে বিপুল মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে তা বিদ্যা, বিত্ত, রুচি ও সংস্কৃতিতে তেমন পাকা না হয়ে উঠলেও তারা সামাজিক শ্রেণি হিসেবে নতুন গুরুত্ব ও তাৎপর্য লাভ করায় তাদের প্রধান উৎসব হিসেবে ঈদোৎসব জাতীয় মর্যাদা লাভ করে। এই ভূখণ্ডে ঈদের নতুন মর্যাদা এই প্রথম। বাংলাদেশে ঈদ এখন তাই যতটা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিকেতার অংশ তার চেয়ে বেশি জাতিগত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের নবপ্রকাশ। বাংলাদেশের আধুনিক বাঙালি মুসলমানদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রাকে সমন্বিত করার এক নতুন প্রকাশও আমরা লক্ষ করি ঈদোৎসবের নববিন্যাসের মধ্যে। বাঙালি মুসলমান এভাবেই তাদের জীবনের একটা কনট্রাডিকশন বা দ্বন্দ্বের সমাধান প্রত্যাশা করেছিল। কারণ তাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা আর জাতিগত সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের ভাষা ভিন্ন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রশাসকরা এই দুই ধারাকে এক করে দিতে চেয়েছিল। পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান তা হতে দেয়নি। তারা দুই ধারাকেই রক্ষা করে তার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়াস পেয়েছে। ফলে ঈদ বা বাংলা নববর্ষ কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো উৎসবই তাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের বাঙালির আশাআকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ-আত্তি (tension) সবকিছুই এর সঙ্গে মিশে আছে। এটা এই বাংলার বাঙালির এক স্বকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্জন।

বাঙালি মুসলমানের কোনো জাতীয় উৎসবই ছিল না। পশ্চিম বাংলার বাঙালি মুসলমান তাদের জন্য কোনো জাতীয় উৎসব তৈরি করে নিতে পেরেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালি বিগত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশাল ও কষ্টকর কর্মযজ্ঞের মধ্য গেছে। বাঙালি হিন্দুর শারদীয় দুর্গোৎসবের মতো ঈদোৎসবকে তারা বিশাল জাতীয় উৎসবে পরিণত করেছে। তার মধ্যে এনেছে সাংস্কৃতিক মাত্রিকতা এবং তাতে যোগ করেছে নতুন নতুন ইহজাগতিক উপাদান। ঈদোৎসব তাই যতটা ধর্মীয় তার চেয়ে বোধ হয় বেশি পরিমাণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক উপাদানে পূর্ণ। ঈদ ফ্যাশন ও ডিজাইন শো, পত্রপত্রিকার ঈদ সংখ্যা, নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠানের মঞ্চায়ন, টেলিভিশনে সপ্তাহব্যাপী ঈদের বিচিত্র সব অনুষ্ঠান ঈদ অনুষ্ঠানকে অন্য ধর্মের মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য সার্বজনীন ও লোকপ্রিয় করে তুলেছে। নিছকই ধর্মীয় এক উৎসবকে একই সঙ্গে জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করা হয়েছে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com